আবদুল্লাহ মারুফ
‘এটা কীভাবে সম্ভব, হে আল্লাহর রাসূল! মাজলুমকে না হয় সাহায্য করা গেলো, কিন্তু জালেমকে, তাকে কীভাবে সাহায্য করবো ! আদৌ কি জালেমকে সাহায্য করা যায়? সাহাবায়ে কেরাম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে, হুজুর কী বলেন, বা বলবেন!
তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, জালেমকেও সাহায্য করা যায়। তোমরা জালেমকে জুলুম করা থেকে বাঁধা দিবে, তার সামনে হক কথা বলবে, এটাই তাকে সাহায্য করার নামান্তর।
হ্যাঁ, জালেমকে সাহায্য করতে হয়। যুগে যুগে এই কাজটি করেছেন ইসলামের সেবকগণ, তারা নিজের জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে, জেল জুলুমের ভয় জানা সত্ত্বেও জালেমকে তার অবস্থান দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন যে কাজটি ভুল। তাদেরকে সতর্ক করেছেন; কথা দিয়ে, বাঁধা দিয়ে, বুঝিয়ে সুজিয়ে। এমনকি স্বৈরাচারের মোকাবেলায় তরবারি উঠিয়েও তাদেরকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছেন জুলুম থেকে।
কিন্তু আধুনিক যুগে ইসলামের প্রচারক বলে যারা নিজেদের উপস্থাপিত করছেন, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ যেনো শাসকের সবরকম কাজেকর্মে হালালের সার্টিফিকেট দিয়ে রেখেছেন। শাসকের জুলুম দেখেও তারা চোখ মুদে থাকেন! ফতোয়া দেন, শাসক যেভাবে চায়! শাসকের পক্ষে নিত্যনতুন ফতোয়া আবিষ্কার করে শাসককের কাজে বৈধতা দানই যেনো তাদের কর্ম।
অপরদিকে শাসকের জুলুমের প্রতিবাদে আন্দোলন করাটাও তারা হারাম মনে করে থাকেন! তারা হাদিস টেনে উদাহরণ দেন, গীবতকারী বা কুৎসা রটায় যারা, ওরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। অথচ হযরত হাসান বসরি ও হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রাহিমাহুমুল্লাহর ফতোয়া হলো, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলাটা গীবত হবে না।
হ্যাঁ এটা ঠিক, পূর্ববর্তী আসলাফদের মাঝেও শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পদ্ধতি নিয়ে ইখতেলাফ ছিলো। তবে প্রয়োজন-পরিস্থিতি বুঝে বিদ্রোহের মাধ্যমে জুলুম মোকাবেলার বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। পূর্ববর্তী সালাফদের শাসকের বিরোধিতার সুদৃঢ় ইতিহাস রয়েছে। আমরা এখানে ইসলামের প্রাথমিক যুগের কয়েকটি দৃষ্টান্ত নিয়ে আলোচনা করবো।
কেন সালাফগণ শাসকের নৈকট্য অপছন্দ করতেন
কারণ তাদের অধিকাংশই হাদিস বর্ণনা করতেন, আর একজন রাবির (বর্ণনাকারী) ন্যায়পরায়ণতা থাকা জরুরি। শাসকের অত্যাধিক নৈকট্যতা ন্যায়পরায়ণাতাকে নষ্ট করে দেয়। তাছাড়া শাসকের নৈকট্যলাভের পর সম্মানী হিসেবে যা দেয়া হবে সেগুলো সন্দেহপূর্ণ, আর সন্দেহপূর্ণ মাল তারা ভয় করতেন। এজন্যই তারা রাষ্ট্রীয় ভাতা এবং প্রশাসনের অন্তর্গত হতে অপছন্দ করতেন।
বর্ণিত রয়েছে, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার চাচা ইসহাক ইবনে হাম্বলের পেছনে নামাজ পড়তেন না, তার সঙ্গে কথাও বলতেন না, অনুরূপ তার দুই ছেলের সঙ্গেও কথা বলতেন না। কারণ, তারা শাসকের পারিতোষিক গ্রহণ করতেন !
সালাফরা সযত্নে ধারণ করা মিরাসে নববীর সঙ্গে শাসকের সন্দেহপূর্ণ কদর্য ভাতার সংমিশ্রণ করতে চাইতেন না। তারা সিরাতুন্নাবী সাল্লাল্লাহু আলািহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন, তাদের হৃদয় ছিলো পবিত্র ভালোবাসায় ভরপুর, সেই পবিত্র হৃদয়ে অত্যাচারী শাসক ও তার মন্ত্রীবর্গের স্থান দিতে অপছন্দ করতেন তারা। আর এজন্যই তাদের অন্তরে সেইসব রাজসিংহাসন অত্যন্ত তুচ্ছভাবে আমন্ত্রিত হতো।
সাহাবায়ে কেরামের প্রতিবাদের ধারা
হযরত আবু যর গিফারী রাদিয়াআল্লাহু আনহু এবং হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াআল্লাহু এর মাঝে كنز الذهب والفضة এর মাসআলাটি নিয়ে ইখতেলাফ হয়েছে । ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে লিখেন, হযরত যায়েদ ইবনে ওয়াহহাব রাদিয়াআল্লাহু বলেন, আমি মদীনা মুনাওয়ার যাবাযা জায়গা দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। তখন হযরত আবু যর রাদিয়াআল্লাহু আনহুকে দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার এই অবস্থা কেন! কোন জিনিস তোমাকে এখানে তোমাকে নামিয়ে এনেছে?
তখন হযরত আবু যর রাদিয়াআল্লাহু আনহু বলেছিলেন, আমি সিরিয়াতে ছিলাম, সেখানে হযরত মুআবিয়া রাদিয়াআল্লাহু আনহুর সঙ্গে আমার كنز الذهب والفضة আয়াতটি নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে। হযরত মুআবিয়া বলেন এই আয়াতটি আহলে কিতাবদের জন্য নাজিল হয়েছে। আর আমি বলেছি এটি আমাদের জন্য এবং তাদের জন্য নাজিল হয়েছে।
এই নিয়ে তার সঙ্গে আমার বাদানুবাদ হয়। তারপর তিনি আমার বিরুদ্ধে হযরত উসমান রাদিয়াআল্লাহু আনহুর কাছে চিঠি লিখেন। হযরত উসমান চিঠি পেয়ে আমার নামে ফিরতি চিঠি পাঠান। তিনি আমাকে মদীনায় তলব করেন। মদীনায় এলে তিনি আমাকে বলেন, তুমি চাইলে এখানে থাকতে পারো, আর যদি চাও তাহলে দূরে কোথাও চলে যেতে পারো! এই হলো সেই কারণ, যা আজকে আমাকে এই অবস্থায় নামিয়ে এনেছে। আমি কসম করে বলছি, যদি একজন হাবশি গোলামকেও আমার আমির নিযুক্ত করা হয়, তাহলে আমি তার আনুগত্য করবো।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াআল্লাহু আনহু শিয়াদের বিরুদ্ধে উমাইয়া শাসনের অনেক কাজে নিজেও নমনীয় ছিলেন। এরপর তার সামনে উমাইয়া শাসনের অনেক বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু তিনি চুপ থাকেন। এরপর উমাইয়া শাসনের শেষার্ধে তিনি মুখ খুলেন, বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে দুটি পাত্র সংরক্ষণ করেছি। তার একটি প্রকাশ করেছি, আর দ্বিতীয়টি প্রকাশ করি নি। যদি করতাম, তাহলে আমাকে হত্যা করা হত !
ইবনে হাজার আসকালানি এই হাদিসটির শরাহ করতে গিয়ে বলেন, উলামায়ে কেরাম হাদিসের আরো একটি পাত্র বহন করেছিলেন, যেখানে জালেম আমির উমারাদের নামধাম, তাদের অবস্থা ও সময়কাল সম্পর্কে বলা ছিল, কিন্তু হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াআল্লাহু আনহু নিজের জীবনের উপর শঙ্কিত হয়ে সেগুলো বলা থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি বলেছেন, أعوذ بالله من رأس الستين وإمارة الصبيان
এখানে তিনি ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কেননা সে হিজরতের ষাটতম বছরে খলিফা নিযুক্ত হয়। আল্লাহপাক হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াআল্লাহু আনহুর দুআ কবুল করে নিয়েছিলেন। ইয়াযিদের ক্ষমতারোহনের একবছর পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
সাহাবায়ে কেরামের বিদ্রোহ
ইয়াযিদের বিরুদ্ধে হযরত হুসাইন রাদিয়াআল্লাহু আনহুর বের হওয়াটা সাহাবায়ে কেরামের বিদ্রোহের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছিয়েছে। এই বিদ্রোহের সব পর্যায়ের নেতৃত্বে ছিলেন উলামায়ে কেরাম। ৬১ হিজরি থেকে শুরু করে ১৪৫ হিজরি পর্যন্ত দীর্ঘব্যাপ্তির এই আন্দোলনটি চলে প্রায় ৮৫ বছর।
হযরত হুসাইন রাদিয়াআল্লাহু আনহুর বিদ্রোহের পর শুরু হয় সুলাইমান ইবনে সুরাদ আল খুযাইর (سليمان بن صُرَد الخزاعي) এর বিদ্রোহ। তিনি অনেকগুলো হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইরাকে বনি উমাইয়া শাসকদের জুলুমের বিরুদ্ধে তিনি جيش التوابين এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই বাহিনীতে চার হাজারের মতো সশস্ত্র যোদ্ধা শরিক হয়েছিল।
এরপর খলিফা মালেক বিন মারওয়ান ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের বিরুদ্ধে বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (عبد الله بن الزبير بن العوام) বিদ্রোহ করেন। এইসব আন্দোলনের ফিরিস্তি ইতিহাসের কিতাবে আগ্রহী পাঠকগণ খুঁজে পাবেন। মোটামুটি প্রসিদ্ধ হওয়ায় এখানে এসব বিদ্রোহের বিস্তারিত আলোচনা করা হল না।
তবে সাহাবায়ে কেরামের যুগে মদীনাবাসীর পক্ষ থেকে আরো একটি বিদ্রোহ হয়েছিলো ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়ার বিরুদ্ধে। যার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রাহ. বলেন, হযরত হুসাইন রাদিয়াআল্লাহু আনহুর পর মদীনা থেকে এটিই ছিল সর্ববৃহৎ বিদ্রোহ। একে হাররাদের বিদ্রোহ নামে অবিহিত করা হয়ে থাকে। এই বিদ্রোহে মুহাজিরিনদের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুতি আল আদুউয়ি (عبد الله بن مطيع العدوي) আর আনসারদের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা আনসারি রাদিয়াআল্লাহু আনহুম। (عبد الله بن حنظلة الأنصار)।
ইবনে মুতি একটি প্রতিনিধিদলের মারফত জানতে পেরেছেন, ইয়াযিদ মদ্যপান করে, নামাজ তরক করে এবং আল্লাহর আইনের অবাধ্যতা করে। এরফলে মদীনাবাসী ইয়াযিদকে প্রত্যাখ্যান করে আবদুল্লাহ ইবনে মুতির হাতে রাসূলের মিম্বারে বায়াতগ্রহণ করে। এবং মসজিদকে তার স্থান নির্ধারণ করেন। তার সঙ্গে মদীনার অনেক লোক ইয়াযিদের বাহিনীর মোকাবেলা করবার জন্য শামেল হোন।
ইবনে কাসীর ইমাম ইবনে শিহাব যাহাবি রাহ. থেকে বর্ণনা করেন, তাকে হাররাদের সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, তিনি বলেন, মুহাজির ও আনসার মিলিয়ে সাতশোর অধিক ছিলো, আর স্বাধীনব্যক্তি, গোলাম ও অন্যান্য মিলিয়ে কত ছিল সেটা আমি বলতে পারবো না। এই যুদ্ধে মদীনার বড় বড় অনেক মুহাদ্দিস শাহীদ হন। তাদের মধ্যে হযরত معقل بن سنان الأشجعي অন্যতম। তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবি রাহ. বলেন, তিনি মক্কা বিজয়ের সময় পতাকা বহন করেছিলেন, এবং তার বর্ণিত অনেকগুলো হাদিস রয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আসেম আনসারিও ছিলেন। তার সম্পর্কে ইমাম আবু নাঈম ইসবাহানি বলেন, তিনি বদরের মুজাহিদ। ইমাম যাহাবি যুক্ত করেন, তিনিও হাদিস বর্ণনা করেছেন।
কুররাদের বিদ্রোহ
এটা বিনাতর্কে সুবিদিত যে তাবেঈদের যুগটা ছিল মুহাদ্দিসীনদের বিদ্রোহের যুগ। সেই যুগে মুহাদ্দিসীনে কেরামের যে বিদ্রোহ করেছিলেন তা “ثورة القـُـــرّاء” নামে অবিহিত করা হয়। কুররা পরিভাষাটি সাধারণভাবে বিশেষিত হবার কারণ সেখানে শরীয়তের নানাদিকের বিশেষজ্ঞদের সম্মিলন ঘটেছিল।
এই বিদ্রোহটি ইরাকের বসরা ও কূফায় খলীফা আবদুল মালেক ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলো। আবদুর রাহমান ইবনে আশআত আল কানয়ীর (عبد الرحمن بن الأشعث الكندي) হাতে লোকজন ভ্রষ্টশাসকের থেকে মুক্ত হতে, এবং মুলহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বায়াত নিয়েছিল। ইবনে কাসীরের মতে তার সঙ্গে তেত্রিশ হাজার ঘোড়সওয়ার ও এক লক্ষ বিশ হাজার পদাতিক বাহিনী ছিল।
উলামাদের এই বিদ্রোহের কারণ হিসেবে ইমাম যাহাবি তার কিতাব سير أعلام النبلاء তে উল্লেখ করেন, ইবনে আশআছের সঙ্গে উলামাগণ বের হয়েছিলেন হাজ্জাজের অত্যাচার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে। তারা উমাইয়া খলীফাদের হৃৎকম্পন সৃষ্টি করে বসরা ও কূফা দখল করে নিয়েছিলো। সেখানে হাজ্জাজের নেতৃত্বাধীন অফিসগুলো অপসরণ করে। এমনকি উমাইয়া শাসকদের হাত থেকে প্রায় সমগ্র ইরাক তারা ছিনিয়ে নিজেদের করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।
বিদ্রোহের ধারা
তাবে তাবেঈনদের যুগ থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের ধারা কিছুটা ঝিমিয়ে গেলেও প্রত্যেক যুগের উলামায়ের কেরামের কাছে সালাফের আদর্শ হিসেবে স্বৈরাচারের মোকাবেলায় তরবারির প্রয়োজনীয়তা সবসময় জারি ছিল। তবে পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা মোতাবেক তারা ব্যবস্থাগ্রহণ করেছেন। তাতে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রচণ্ডতা কমে আসলেও সর্বশেষ কর্মপন্থা হিসেবে সবসময় চূড়ান্ত বিকল্প আকারে প্রাসঙ্গিক ছিল।
The post ‘অস্ত্র করুক সমাধান’ : সালাফের যুগে স্বৈরাচারের মোকাবেলায় তরবারি appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%95-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ab/
No comments:
Post a Comment