মুজাহিদুল ইসলাম
সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ক কৌশলগত। উভয় পক্ষই বার বার এমনটি বলছে। মিত্রতা ও শত্রুতার মধ্যে দিয়ে তারা সিরিয়া ইস্যু অতিক্রম করছে। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে লিবিয়া ও ইদলিব।
এমনই টানপোড়েনের মধ্যে সোচি ও আস্তানা-চুক্তির আলোকে ইদলিবে অবস্থানরত তুর্কি সেনাদের ওপর রাশিয়ার গ্রীণ সিগ্যনালে হামলা চালায় বাশার। খন্ড খন্ড পাল্টাজবাব দেয়ার এক পর্যায়ে তুরস্ক বাশার ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ’অপারেশন স্প্রিং শেল্ড’ নামে শুরু করে স্থল ও আকাশ পথে হামলা।
সিরিয়ায় তুরস্কের অবস্থানের যৌক্তিকতা
বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি সিরিয়ায় রয়েছে। সংকটের সকল পক্ষের মধ্যে সিরিয়ার সাথেই রয়েছে তুরস্কের সীমান্ত। বিভিন্ন সময়ে তুরস্ক ও সিরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা ও শীতলতার মিশ্র অবস্থা বিরাজ করেছে। ১৯৯৮ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা যায়। তুরস্ক সীমান্ত সেনা মোতায়েন করে। সরাসরি সামরিক সংঘাত দেখা দেয়। ইরান ও মিসরের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত হয় ‘আযনাহ’ প্রটোকল। আযনাহ প্রটোকলে সিরীয় সীমান্তের ওপাশ থেকে আসা হুমকি রোধে তুরস্কের বৈধ অধিকার মেনে নেওয়া হয়।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট বার বার সিরিয়ায় তাদের অবস্থানের জন্য এই চুক্তির কথা তুলে ধরছেন। সম্প্রতি সিরীয় সংকটে সীমান্তের ওপাশ থেকে কুর্দিস্থান ওয়ার্কার্স পার্টির হুমকিতে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কথা তুলে ধরছেন তুর্কি কর্মকর্তারা। তাছাড়া সিরীয় জনগণের আহবানে তারা সেখানে গিয়েছেন, তারা ফিরে আসতে বললেই তবে তুরস্ক ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন এরদোগান।
সোচি-চুক্তি ও বাস্তবতা
সিরীয় সংকটে বাশার আল আসাদের পক্ষে রাশিয়া ও ইরানের হস্তক্ষেপে বিদ্রোহীদের থেকে যখন বিভিন্ন শহর হাতছাড়া হচ্ছিল, সিরীয় সংকট-সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ তুরস্ক তার জাতীয় নিরাপত্তা, শরণার্থীদের চাপ সামলানো ও সিরীয় জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ত্রিদেশীয় চুক্তি করেন। চুক্তির অংশ হিসেবে সিরিয়া ও তুরস্কের সীমাঞ্চল ইদলিবকে ডি-এসক্লেশন জোন বলে অভিহিত করা হয়। বিরোধীদের থেকে বিশেষত রাশিয়ার দৃষ্টিতে চরমপন্থী গোষ্ঠীর থেকে ভারী অস্ত্র প্রত্যাহারের দায়িত্ব দেয়া হয় তুরস্ককে। তুরস্ক চুক্তি অনুসারে ইদলিবে সেনা অবস্থান গড়ে তোলে। এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
রাশিয়ার অবস্থান পরিবর্তনের নেপথ্য কারণ
সম্প্রতি তুরস্কের আচরণে ইদলিবের চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরী হয়। তারা চুক্তির অংশ ভঙ্গ করে দিমাশকের সাথে ইদলিবের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আংশের নিয়ন্ত্রন গ্রহন করে। আবার আমেরিকার সাথে তুরস্ক অনেকটা লিয়াজোর মাধ্যমে ‘অপারেশন পিস স্প্রেং’ পরিচালনা করায় রাশিয়া তার প্রভাব ক্ষুন্নের লক্ষণ দেখতে পায়। এর সাথে যুক্ত হয় লিবিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থিত সরকারের ঐকমত্যের সরকারকে তুরস্কের সমর্থন । সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোসহ অস্ত্র বিক্রির মতো বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে তুরস্ক। এবং ভূমধ্য সাগরে গ্যাস উত্তেলনে লিবিয়ার সাথে চুক্তি করেন এরদোগান।
অন্যদিকে রাশিয়া অঘোষিতভাবে লিবিয়ার বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা হাফতারকে ভাড়াটে রুশ সেনা ফাগনারের মাধ্যমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। তুরস্কের বিরুদ্ধে বিভিন্ন চুক্তি ও সোচিচুক্তির আলোকে দায়িত্ব পালনের অক্ষমতার অভিযোগের সুর উঠাতে থাকে। তবে তুরস্কও রাশিয়ার বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ আনে।
রাশিয়া ও তুরস্ক কারো পক্ষে ছাড় দেয়া সম্ভব হচ্ছে না কেন?
- তুরস্ক ইতোমধ্যেই ৪ মিলিয়নের বেশি সিরিয়ান শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে, আরো ১ মিলিয়ন আশ্রয়ের জন্য রওনা হয়েছে। ইদলিব রক্ষা করতে না পারলে এর সাথে আরো ২ মিলিয়ন সিরিয়ান যুক্ত হবে, যা তুর্কীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশে পৌছে যাবে। গত সিটি নির্বাচণে শরণার্থী ইস্যুতে এরদোগানকে বেশ চাপে পড়তে হয়েছিল।
- অনির্দিষ্ট কাল শরণার্থীদের বহন করা খুবই কঠিন হবে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শরণার্থীদের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। ইতোমেধ্যে শরণার্থীর চাপ বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা আগামীতে এরদোগানের ক্ষমতার পথ রুদ্ধ করবে বলে আশংকা আছে।
- তুরস্ক জাত্যাভিমানী জাতি। তুর্কি সরকারের ভাগিদার জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান ইদলিবের পরিবর্তে দিমাশকে হামলার দাবি জানিয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হুমকি দিয়ে বলেছেন, আমরা রাশিয়ার সাথে ১৬ বার যুদ্ধ করেছি, আবার লড়াই করবো। সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুল রাশিয়ার বিমানপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ সংগ্রহের সমালোচনা করেছেন। কোন তুর্কি সরকার যুদ্ধে হেরে ক্ষমতায় টিকতে পেরেছে, তুরস্কের ইতিহাসে এমন নজীর নেই। তাই এটা তুরস্কের বর্তমান শাসক দলের জন্য অত্যন্ত জরুরী বিষয়।
- তুরস্ক যদি ইদলিব ছেড়ে দেয়, তবে তার বরং ক্ষতিই হবে। তুরস্ক অনেক আর্টিলারি, সেনা, সমরজান, আর ক্ষেপনাস্ত্র ইদলিবের আউটপোস্ট গুলোতে মোতায়েন করেছে। কারণ ইদলিবের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে না রাখতে পারলে সিরিয়ায় তুরস্ক কর্তৃক মুক্ত অঞ্চলে বিদ্রোহীদের হটিয়ে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার চেষ্টা করবে বাশার। তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নকামী কুর্দিরাও তুরস্কের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাড়াবে। আবার রাশিয়া তুরস্ককে লিবিয়া থেকে বের করে দিতে সক্ষম হবে সহজেই। এটাও তুরস্কের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি।
- লাটাকিয়ার নৌস্থাপনা রাশিয়ার একমাত্র উষ্ণ পানির কেন্দ্র। যা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাটাকিয়া থেকে ইদলিবের দূরত্ব খুব বেশি না। তাই ইদলিব আসাদের নিয়ন্ত্রণে আসা রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক খারাপ হলে তুরস্ক পূর্ব মেডেটেরিনিয়ানের সাথে হাত মিলিয়ে গ্যাস ট্রান্সফারের চিত্র বদলে দিলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
- এরদোয়ান ইদলিব-আলেপ্পোতে হেরে গেলে আঞ্চলিক স্তরে এটা ইরান-আসাদের মহাবিজয় হবে, সাথে ইমারাত-ইজরায়েলেরও, যদিও তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ পুরিপুরি ভিন্ন।
তুরস্কের করণীয়
- আসলে পাশ্চাত্য এরদোগানের পতন দেখতে আগ্রহী। তারা তুরস্কের জন্য দৃশ্যমান কিছু করছে না। তবে তুরস্ক ইতোমধ্যে শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়ে ইউরোপের ঘুম ভাঙ্গাতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিন্দা জানাচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানিসহ আলাদাভাবে ন্যাটো রাশিয়া ও সিরিয়াকে আক্রমন বন্ধ করতে বলেছে।
- আবার ন্যাটোকে ইরান বিরোধী মুলা দেখিয়ে তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্ত-জুড়ে একটি সুন্নী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাতে পারে। যে-পথ দিয়ে সহজেই তারা ইরাকের শিয়া ও সিরিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতিকে প্রটেস্ট করতে পারবে।
এরদোগান ও পুতিনের সর্বশেষ অবস্থান
তুরস্ক ২৭ ফেব্রুয়ারী থেকে গত পহেলা মার্চ পর্যন্ত আসাদ ও তার মিত্র বাহিনীর ২২১১ জন সেনাকে হত্যা করেছে বলে দাবী করেছে। একটি ড্রোন, ৮ টি হেলিকেপ্টার, ১০৩ টি ট্যাংক, ১০ টি হাউটজার এবং ৩ টি বিমানপ্রতিরক্ষা ধংস করার কথা জানিয়েছে।
এরদোগান আজ সোমবার জানায়, বাশারের বিরুদ্ধে যা হয়েছে, তা সূচনামাত্র। আমরা শান্তির জন্য চেষ্টা করছি। অন্যদিকে পুতিন বলছে, আমি কারো সাথে যুদ্ধ করতে চাই না। পাঁচ তারিখ জার ও সুলতানের বৈঠকই নির্ধারণ করবে ইদলিবের পরিণতি।
ইরান-রাশিয়া-তুরস্ক আবার সমঝোতার টেবিলে বসতে চাচ্ছে, পুতিন-এরদোয়ান বৈঠকের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ইতোমেধ্যে ক্রেমলিন বলেছে, তুর্কি ও রুশ প্রেসিডেন্টের আলোচনা বেশ কঠিন হবে।
The post সিরিয়ায় সর্বাত্মক যুদ্ধের আশংকা appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%95-%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%87/
No comments:
Post a Comment