মুনশী নাঈম:
শুধু অনলাইন বা অনলাইন টিভির জন্য তৈরি ও প্রকাশিত ধারাবাহিকের নাম ওয়েব সিরিজ। নব্বই দশকে আমেরিকায় এর জন্ম। তবে বাংলাদেশে ওয়েব সিরিজের যাত্রা ২০১৭ সালে। ওই বছর ঈদুল ফিতরে টিভির পাশাপাশি ইউটিউব চ্যানেলে একাধিক ধারাবাহিক নাটক প্রকাশ পায়। ওয়েব সিরিজগুলোয় অপ্রাসঙ্গিক ও অহেতুক যৌনতার সুড়সুড়ি, অশালীন সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি, মাদক গ্রহণের দৃশ্যবলীর কারণে শুরু থেকেই সমালোচনার মুখে পড়ে। বিষয়বস্তু বা শিল্পগুণের বদলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ দৃশ্যের বন্দুকে সস্তা ও দ্রুত জনপ্রিয়তা বা বিপুল ভিউয়ার বা সাবস্ক্রাইবার শিকারের চেষ্টায় নাটকগুলোয় খুব দৃষ্টিকটুভাবে পরিলক্ষিত হয়। আর সেই চেষ্টায় এখন যোগ হয়েছে পর্নোগ্রাফি। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া কিছু ওয়েব সিরিজে এমনই দৃশ্য দেখা গেছে। দেশীয় নাটকে এমন পর্নো দৃশ্যের সংযোজন সম্ভবত এই-ই প্রথম।
দু’ দফায় দেশীয় ওয়েব প্ল্যাটফর্মে ‘অশ্লীল কনটেন্ট’ প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রায় দুশো নির্মাতা, অভিনেতা এবং বিনোদন ব্যক্তিত্ব। ওয়েব কন্টেন্ট নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির আবেদনও জানিয়েছেন তারা। একই অভিযোগের প্রেক্ষিতে রোববার (১৪ জুন) ওয়েব ভিত্তিক মিডিয়া সার্ভিস প্লাটফর্মগুলোতে প্রকাশ করা দেশীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী অনুপোযোগী কন্টেন্ট সরাতে সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বেশ কিছু ওয়েব সিরিজে অশ্লীল দৃশ্য আছে। যা পর্নোগ্রাফি ও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের লংঘন করা হয়েছে।
বাংলাদেশী আইনে অশ্লীলতা প্রসঙ্গ
একদল বলছেন, ওয়েব সিরিজের দৃশ্যগুলো অশ্লীল। নির্মাতারা বলছেন, গল্পের প্রয়োজনে আনা হয়েছে। এটা অশ্লীলতা নয়। এখন প্রশ্ন উঠছে—শ্লীল অশ্লীল নির্ধারিত হবে কিভাবে? সংবিধানে অশালীন বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ আইন, ১৯৬৩ এর একটি জায়গায় অশ্লীলতার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- অশ্লীলতা হচ্ছে তাই, যা সুস্থ ও সাধারণ মানুষের মনে ইন্দ্রিয় ভোগবাসনা ও অন্যায় চিন্তা জাগানোর কারণ হতে পারে এবং নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে তাদের মনকে এমন সব নীতিবিরুদ্ধ কাজে প্রবৃত্ত করতে পারে, যাকে সাধারণভাবে নৈতিকতার পরিপন্থী ভাবা হয় এবং তা জনগণের চারিত্রিক অধঃপতন ও লাম্পট্যের মতো ক্ষতিকর প্রভাব রাখতে পারে (ধারা-২)।
শিল্প-সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল এ দ্বন্দ্বটা তাই অনেকটা বিশ্বজনীন। তা ছাড়া শিল্প বা সাহিত্য শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিচারের সুনির্দিষ্ট কোনো পাল্লাও নেই। এ ক্ষেত্রে ‘হিকলিন টেস্ট’ই (Hicklin Test) বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি। যা অনুভূতিপ্রবণ মনকে কলুষিত করে এবং নৈতিক অধঃপাতে নিয়ে যায়, তাই-ই অশ্লীল। এটাই হচ্ছে, হিকলিন টেস্টের মূল কথা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কেউ অশ্লীল বার্তা প্রেরণ করলে তাকে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ৫ কোটি অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে (ধারা-৬৯)।
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এ বলা হয়েছে, এখানে ‘পর্নোগ্রাফি’ মানে, যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনো অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য; যা চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিক্স বা অন্য কোনো উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যার কোনো শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপরাধের মাত্রানুযায়ী সর্বোচ্চ ২-৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১-২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে (ধারা-২, ৮)।
উপরোক্ত ধারাগুলোর আলোকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া সবকটি ওয়েব সিরিজই অভিযুক্ত।
আলেমগণ কী বলছেন?
লেখক ও অধ্যাপক আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য দেশের নাটক-চলচ্চিত্রে তাদের দেশের সংস্কৃতি-ই ফুটিয়ে তোলা হয়। তাদের জনগণ, সংস্কৃতি লক্ষ্য করেই নির্মাতারা তৈরী করেন বিভিন্ন কন্টেন্ট। তাই ভারতীয় নাটক-চলচ্চিত্রে মূর্তি, মন্দির, পুরোহিত এসবের দৃশ্যায়ন থাকবেই। কিন্তু আমাদের দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে কন্টেন্ট নির্মাণ করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের কৃষ্টি ও কালচারের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই করতে হবে। যে কন্টেন্ট নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না, এ দেশের কৃষ্টি ও কালচারের সাথে যায় না, তা নির্মাণ করা যাবে না। সম্প্রতি কিছু ওয়েব সিরিজে দেশের কৃষ্টি-কালচার, নীতি-নৈতিকতাকে ভেঙেচুরে দেয়া হয়েছে। এতে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় চরম তলানিতে পৌঁছবে। সরকারের উচিত কঠোর হস্তে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা। দেশের বুদ্ধিজীবি মহলেরও উচিত—এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা।’
ইসলাম টাইমসের সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া কিছু ওয়েব সিরিজ নিয়ে পত্র-পত্রিকা এবং গণমাধ্যমে বিতর্ক চলছে। একদল অভিনেতা, পরিচালক দেশীয় ওয়েব সিরিজের রগরগে দৃশ্যায়নকে অশ্লীল বলে বিবৃতি দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আইনি নোটিশও দেয়া হয়েছে। এগুলো কোনোটাই তো ইসলাম সমর্থিত না। বিনোদন ব্যক্তিত্বদের নিকট যেটা শ্লীল, সেটাও ইসলামের নিক্তিতে টিকবে না। তবে আমাদের কথা হলো—বর্তমানে যা শুরু হয়েছে, তা চূড়ান্ত পর্যায়ের অশ্লীল।
এসব অশ্লীল সিরিজের নির্মাতারা যুক্তি দিচ্ছে—এমন তো বিভিন্ন দেশেই হয়। এসব তো ভারতসহ সব দেশেই দেখছে মানুষ। তাদের উত্তরে বলা যায়, দেশীয় কন্টেন্টে দেশের সংস্কৃতির বিরাট একটা প্রভাব থাকে। এখন যারা বাংলাদেশে বসে বিদেশী খারাপ জিনিসের হাতছানিতে পড়ে যাচ্ছে, তারা কিন্তু জানে, সেটা এদেশের না, বাইরের দেশের। কিন্তু তারা যখন দেখবে—দেশেই এসব অশ্লীল কন্টেন্ট নির্মিত হচ্ছে, তাদের ভেতর থেকে পর্দা সরে যাবে। দ্বিধা কেটে যাবে। লজ্জার পরের স্তর দ্বিধা। এই দ্বিধার কারণে মানুষ অনেক পাপ থেকে বেঁচে থাকে। দ্বিধাটা যখন কেটে যাবে, দেশীয় অনলাইন প্লাটফর্মে এসব অশ্লীল কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়বে, তখন তরুণ-তরুণীদের আর দমিয়ে রাখা যাবে না। নৈতিক অবক্ষয় তো ঘটবেই, সঙ্গে বেড়ে যাবে ক্রাইম।
বাংলায় যাকে আমরা চরিত্র বলি, পশ্চিমে সেটা নেই। তবে তাদের মাঝে একটা বোঝাপড়া আছে। স্যাকুলার দৃষ্টিতে যেটা ক্রাইম, সেটা সেখানে কম। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে যখন এসব ছড়িয়ে পড়বে, এখানের দর্শকগণ সামান্য সৌজন্যতাটুকুও দেখাবে না। অনৈতকতার উন্মাদনায় তারা পাগল হয়ে যাবে। তাই এটা বন্ধ করা দরকার। যেসব অভিনেতা ও বিনোদন ব্যক্তিত্বরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তাদের বিলম্বিত ও সর্বশেষ এই বোধদয়ের জন্য তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাই।’
মাওলানা শরীফ মুাহম্মদ আরও বলেন, আরেকটা বিষয় খুবই চিন্তার। আমি নিশ্চিত নই, আমার ধারণা। একই সময়ে মুহুর্মুহু কয়েকটি ওয়েব সিরিজ প্রকাশ হলো, এখানে কাজ করলেন বড় পরিচালক এবং অভিনেতারা। তার মানে এখানে বিরাট অর্থ লগ্নি করা হয়েছে। সিরিজগুলোতে তেমন বিজ্ঞাপনও নেই। তাহলে এত অর্থের জোগান হলো কোত্থেকে? নামী অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা তো মোটা অংকের টাকা ছাড়া এমন রগরগে দৃশ্যে অভিনয় করতে যাবে না। আশঙ্কা হয়—বড় ভয়ংকর একটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সূচনা হলো। এটা তো থামবে না। নিয়ন্ত্রণ না করলে আর ভয়ংকর হয়ে উঠবে।’
অনলাইন কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ কমিটি
বোদ্ধা মহল বলছেন, ‘ওয়েব সিরিজের অরাজকতা বা অশ্লীলতা ঠেকাতে চাইলে, এখানেও এক ধরনের সেন্সরশিপ সিস্টেম রাখা দরকার। এজন্য সংস্কৃতি বা তথ্য মন্ত্রণালয়ে ‘অনলাইন কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ কমিটি’ নামে কমিটি চালু করা যেতে পারে। অনলাইনে কোনো ভিডিও ছাড়ার আগে এ কমিটিতে জমা দিতে হবে। কমিটি সংশ্লিষ্ট ভিডিওতে অশ্লীলতা, মানহানি, ধর্ম অবমাননা, রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কন্টেন্টের বিষয়টা খতিয়ে দেখবে। তাদের অনাপত্তি পেলেই কেবল ভিডিওটি অনলাইনে ছাড়া যাবে।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বিটিআরসিতেও এ ধরনের একটা সেল থাকতে পারে। এছাড়া পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটও নিষয়টি নজরদারি করতে পারে। ইউটিউব কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনক্রমে বাংলাদেশে ইউটিউবের একটা গেটওয়ে খোলা যেতে পারে।
The post ওয়েব সিরিজে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি : কীভাবে নির্ধারিত হবে শ্লীলতার মাপকাঠি? appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%85%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9b%e0%a7%9c/
No comments:
Post a Comment