Friday, June 12, 2020

মুসলিম লিপিকলার ঐতিহ্য সন্ধানে

মাহদি হাসান:

মুসলিমদের নানা প্রসিদ্ধ ও প্রশংসনীয় শিল্পকলার মধ্যে নিঃসন্দেহে সর্বাধিক পরিমার্জিত ও সুষমামণ্ডিত হচ্ছে হস্তলিপিকলা তথা ক্যালিগ্রাফি। অনেকের কাছে অজ্ঞাত হলেও ইসলামী সংস্কৃতির উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে লিপিকলার ভূমিকা সর্বজনবিদিত। ‘ঈমান ভিত্তিক জীবনদর্শন’ এই স্লোগানকেন্দ্রিক শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় লিপিকলা ছিল মুসলমানদের প্রাকৃতিক সম্পদ। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও এই লিপি শিল্প বহু জনপদে, ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতিতে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রচলিত হয়েছে। এভাবে চলতে চলতে এর শৈল্পিক রীতি বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির সংস্পর্শ ও সান্নিধ্যে এসে ইসলামের অতুলনীয় আদর্শ প্রচার ও সম্প্রসারণে মহিমান্বিত উদাহরণ স্থাপনে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী শিল্পকলার অসংখ্য সৃজনশীল বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ ইসলামী লিপিকলা ইসলামের স্থাপত্য ও কারুশিল্পে অকৃত্রিম অবদান রাখার পাশাপাশি বিশ্ব শিল্পরীতিতেও অসামান্য অবদান রেখেছে।

ইসলাম ধর্মে মানুষ বা প্রাণী চিত্রাংকন ও মূর্তি অংকন রোধকল্পে মুসলমানদের মাঝে লিপিকলার বিপুল গুরুত্ব লাভ করে।  লিপিকলার ব্যবহারের কথা পবিত্র কুরআনেও বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী: পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন… পড় তোমার পরম দয়াল প্রভুর নামে যিনি কলমের ব্যবহার শিখিয়েছেন, আর শিখিয়েছেন ওই জ্ঞান যা ছিল মানুষের অজানা। [সূরা আলাকঃ১-৩] এছাড়া হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর কথায় হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে খুবই উদ্দীপনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘সুন্দর হস্তাক্ষর সত্যকে স্বচ্ছ করে তুলে।’

একথা অনস্বীকার্য যে,  ক্যালিগ্রাফি অর্থাৎ হস্তলিপি শিল্প একটি আকর্ষণীয় ও চমৎকার শিল্প মাধ্যম। ইসলামী শিল্পকলায় লিপিকলা একটি পবিত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। আরবি ভাষায় আল কুরআনের অনুলিপি প্রণয়নের মধ্য দিয়েই ইসলামী লিপিকলার আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে আরবি ও ফারসি উভয় ভাষাতেই লিপিকলার প্রচলন রয়েছে। সর্বপ্রথম ব্যাপকভাবে আরবরাই উপলব্ধি করে যে, হস্তলিখন পদ্ধতিকে শিল্পকলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তাই তারা সে লক্ষ্যে বেশ জোরেশোরে কাজ শুরু করে। যা ইতোপূর্বে অন্য কোনো জাতি করে দেখাতে সক্ষম হয়নি। অপরদিকে পারস্যবাসীদের মধ্যে লিপিশিল্পের যে বিভিন্ন পদ্ধতি এবং রীতি-কৌশল ছিল সেটিও ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। যা অন্য কোন জাতির মাঝে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।

লিপিকলার সামাজিক মর্যাদা

এবার লিপিকলার সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে লিপিকলা কখনোই কোনো তুচ্ছ বিষয় ছিল না, যা বর্তমানে ব্যাপক হারে পরিলক্ষিত হয়। বরং তৎকালীন আরব ও পারস্যে লিপিকলা হীরা-জহরত ও মণি-মুক্তো অপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান ও মর্যাদাজনক বিষয় ছিল। ফলে অন্যান্য শিল্পের জৌলুস হস্তলিপিকলার সামনে ম্লান হয়ে যায় এবং সেগুলো অপেক্ষা হস্তলিপিকলাই অধিকতর শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়।

এ শিল্প এমন এক জাদুকরী সম্মোহনী শক্তির অধিকারী ছিল যে, প্রসিদ্ধ ও উচ্চমানের লিপিকারদের কথা বাদই দেয়া যাক; অতি নগণ্য লিপিকাররা পর্যন্ত রাজা-বাদশাহ, আমির-উমারাদের থেকে শুরু করে কুলি-মজুর পর্যন্ত সকল স্তরের অনুরাগীকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করে রাখত। তখনকার লিপিকারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা হতো। একজন সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ লিপিকার সামাজিক জীবনে জনগণের শ্রদ্ধার পাত্র তো ছিলেনই, তদুপরি রাজাগণ তাদের রাজ্যে এ ধরণের লিপিকারদের বসবাসে সীমাহীন গর্ববোধ করতেন।

ইসলামি লিপিকলার বিভিন্ন রীতিসমূহ

ইসলামী লিপিকলার সূচনালগ্ন থেকে বিভিন্ন লিপিশৈলী বা রীতির উদ্ভব হয় এবং সেগুলো ব্যাপক প্রসার ও পরিচিতি লাভ করে। এমন অগণিত লিপিশৈলীর মধ্য হতে প্রসিদ্ধ ও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: কুফী, নাসখ, নাসতালিক, সুলস, গুবার,  গুলজার, রায়হান এবং তুঘরা প্রভৃতি। এসব লিপিকলা আরবে তো বটেই বরং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে। এমনকি আফ্রিকা মহাদেশব্যাপীও সেগুলো সমাদৃত হয়।

আরবি লিপিকলার বিভিন্ন অলঙ্কারিক রীতি ইউরোপিয়ানদের নিকট অলংকরণ হিসেবে এতই জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠে যে,  মারসিয়ার খৃস্ট রাজা ওফফা (৭৫৭-৭৬৯ খৃ:) তার মুদ্রায় কুফী রীতিতে মুসলমানদের কালিমা খোদিত করেন।  এছাড়া নবম শতাব্দীতে খোদিত একটি আইরিশ ক্রুশও এর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যার মধ্যভাগে কুফী রীতিতে বিসমিল্লাহ শব্দটি রয়েছে। কোনো তাৎপর্য উপলব্ধি না করে লিপিকলার অলঙ্করণে অভিভূত হয়েই কারিগরেরা স্বাভাবিকভাবে এ লিপিকলার অনুকরণ করেছে। অন্যথায় এ কথা একেবারেই অবিশ্বাস্য যে, কোনো খৃস্টান রাজার মুদ্রা অথবা পবিত্র প্রতীকে জ্ঞাতসারে মুসলমানদের কালিমা অথবা বিসমিল্লাহ সম্বলিত লিপিমালা খোদিত করা হবে। এছাড়া পাদুয়ার এরেনা গির্জায় ‘লেজারুসের পুনরুত্থান’ নামক এক ইতালীয় চিত্রকর্মে যিশুখৃস্টের ডান কাঁধের একটি ফিতা কুফী রীতি অনুসারে অলংকৃত। ফ্রা এঞ্জেলিকো এবং ফ্রা লিপ্পো আরবী লিপিকলার প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল ছিলেন। (তাদের ভাষায়) শুধু কুমারী মেরীর আস্তিন ও পোশাকের বর্ডারের এ ধরনের অলংকারিক লিপিমালাই নয় বরং ‘মুসলিম শিল্পকলা’ থেকে আহরিত অন্যান্য অলংকারিক মোটিভ ইউরোপের অসংখ্য স্থাপত্য ও কারুশিল্পে ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষত, স্পেনে হস্তলিপি শিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করে। তাদের স্থাপত্য সমূহে অলংকরণ শিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন হচ্ছে আল-হামরা প্রাসাদ। ধ্বংসাবস্থায়ও তা পৃথিবীতে একটি অতুলনীয় শিল্পকর্ম।

উপরোক্ত আলোচনা হতে ইউরোপব্যাপী আরবী লিপিকলার রীতিসমূহের জনপ্রিয়তা সহজেই বুঝে আসে । আল-হামরা প্রাসাদে অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য, জটিল খোদাইকাজ এবং অতি উচ্চমানের মোজাইকের সঙ্গে মনোরম ও আকর্ষণীয় কুফী ও অন্যান্য লিপিরীতির সংমিশ্রণে অলংকরণের অভিনব মনোহর ও চিত্তাকর্ষক রূপ এই জনপ্রিয়তারই পরিচায়ক।

কুফী রীতি

এবার আসা যাক কুফী রীতি’ সংক্রান্ত আলোচনায়। আরবী লিপিকলার নানা প্রসিদ্ধ ও সুপ্রতিষ্ঠিত রীতিসমূহের মতে অন্যতম রীতি বলে ধারণা করা হয় কুফী রীতিকে । কুফী হচ্ছে কোণাকৃতি আরবী লিপিমালা। এটি ১৭ হিজরি মোতাবেক ৬৩৮ খৃস্টাব্দে কুফা নগরী প্রতিষ্ঠার প্রায় এক শতাব্দী পূর্বেই উদ্ভাবিত হয়েছিল। তবে এর কুফী নামকরণের কারণ বিশুদ্ধভাবে জানা যায় না। কালের ক্রমবিকাশের ধারায় সর্ব প্রথম কুফা নগরীতেই সরকারীভাবে এ ধরণের লিপিকলা ব্যবহৃত হয়। সরকারীভাবে প্রচলিত হওয়ার পর এই লিপিশৈলী অম্লান মর্যাদায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠে। এই লিপিরীতি বিশেষ করে ধর্মীয় গ্রন্থ অনুলিপি তৈরিতে বেশী ব্যবহৃত হতো। যতদিন এই লিপিশৈলীর প্রচলন ছিল ততদিন এর মূল বৈশিষ্ট্য অব্যাহত ছিল।

কুফী রীতি আরবী লিপিমালার সর্বপ্রাচীন লিপিশৈলী । বিশেষত এটিকে বক্রকার এবং স্তুতিলিপি নাবাতীয় লিপিকলা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। যা খৃস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে ব্যবহৃত ফিনিসিয়দের দ্বারা উদ্ভাবিত। এই লিপিমালার নাম ছিল হিময়ারী । ইসলামপূর্ব যুগে হিময়ার শহরে এই লিপির প্রচলন থাকায় এর নাম হয়েছে ‘হিময়ারী’। ‘কুফী’ লিখন রীতি হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে সর্বাপেক্ষা কোণাকৃতি লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে লিখনশৈলী বক্রাকার হতে থাকে।

কুফী রীতি হতে আরও বিভিন্ন উপরীতির উদ্ভব হয়েছে। যেমন- ইলমে নাহুর সংকলক আবুল আসওয়াদ দুয়াইলী রহ. এর প্রসিদ্ধ অনুসারী কুতবা কুফী লিপির চারটি রীতি আবিষ্কার করেন। তিনি ছিলেন প্রথিতযশা, বিজ্ঞ ও সুদক্ষ লিপিশিল্পী। এছাড়া আল জালী’ নামে এক ধরনের কুফী রীতির উদ্ভব হয়। যা রাজকীয় চিঠিপত্র এবং শিলালিপিতে ব্যবহৃত হত। ‘সাজ্জালাত’ ছিল দলীল দস্তাবেজে ব্যবহৃত কুফী রীতি। ‘সালাসীন’ লিপিরীতি সরকারী কর্মচারীদের নিকট লিখিত সরকারী পত্রাদিতে ব্যবহৃত হত। মিফতাহ’ ছিল ‘সালাসীন’ লিপিরীতি এবং এস্ট্রনজেলো (Estrangelo) লিপিমালার মিশ্রণ। মহিলাদেরকে লিখিত লিপিশৈলীর নাম ছিল ‘হারাম’। তাছাড়া কুরআন শরীফের অনুলিপি প্রণয়নে পৃথক কুফী রীতি ব্যবহৃত হত।

প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ খলীল ইবনে আহমেদ রহ:(১৭০ হি.) এবং আলী ইবনে কুসাই এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কুফী লিপিশৈলী উৎকর্ষতার চরম শিখরে পৌছায়। তারা এ লিপিশৈলীর যে উন্নয়ন সাধন করেন তা আজও পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। কুসাই খলিফা মামুনুর রশীদের শিক্ষক ছিলেন। মামুন শুধুমাত্র লিপিকলার একজন প্রবল অনুরাগীই ছিলেন না, এমনকি তিনি তার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হস্তলিপি শিল্পের অসংখ্য অপূর্ব নিদর্শন সংগ্রহ করেন।

কুতবার পর এ রীতিতে তার পরের যুগে খালিদই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ লিপিকার। এ ছাড়া বিখ্যাত লিপিকার ইবনে মাকলা (৩৩৮ হি.) কুফী লিখনরীতির চরম সাধন করেন। তিনি আব্বাসীয় খলীফা আল কাহির বিল্লাহর দরবারের প্রসিদ্ধ লিপিকার ছিলেন। কুফী লিপিশৈলীর প্রতি জনসাধারণের আকর্ষণ অনেকাংশে কমে যাবার পরও ইবনে মাকলা কর্তৃক আবিষ্কৃত পাঁচটি প্রধান লিপিরীতি অব্যাহত থাকে। এছাড়া ককেশীয় নামক এক ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী কুফী রীতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ৪৭১ হিজরীতে আল রশীদ বিন মুহাম্মদ বিন আবু বকরের মসজিদে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপিতে। তবে কুফী রীতি ইউরোপব্যাপী আলংকারিক রীতি হিসেবেই সমাদৃত হয়েছে।

image.png

 

কুফী লিপিকলা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

নাসখ রীতি

তিন শতাব্দী ধরে মুসলিম জগতের একচেটিয়া লিপিরীতি হিসেবে দুর্দান্ত প্রতাপের সাথে রাজত্ব করার পর কুফীর প্রচলন থেমে আসে। এরপর প্রায় দুই শতাব্দি ধরে কেবলমাত্র আলংকারিক মোটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হবার পর কুফী বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত কুফী অর্থাৎ কৌণিক আরবী লিপিরীতির পাশাপাশি বক্রাকার রীতির প্রচলন অব্যাহত ছিল এবং পরবর্তীতে এটি রাষ্ট্রীয় লিপিরীতি হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় বক্রাকার লিপিশৈলীর নাম ‘নাসখ’ । কুফী রীতির বিপরীতে ‘নাসখ’ লিপিশিল্প চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। এ লিপির সাথে স্বরচিহ্ন, হরকত ও বিরাম চিহ্নের সংযোজন এই লিপিশৈলীর কুফী রীতি অপেক্ষা অধিক সৌন্দর্যের পরিচয় দান করে । নাসখ লিপিরীতি মুসলিম লিপিকলার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক ও রেনেসাঁ যুগের সূচনা করে। নাসখ লিপিশৈলীর প্রবর্তনের ফলে আরবী বর্ণমালার লিপিকৌশলের যে সুপ্ত সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র ছিল তার দ্বার উন্মোচিত হয়। এসময়ই লিপিকারেরা কুফী রীতির আলংকারিক কৌশলের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া তাদের লিপিকলার প্রকৃত বিন্যাসের দিকে নিষ্ঠাবান হওয়ার কথা উপলব্ধি করেন এবং মূল আরবী হরফের বিকৃতি থেকে তারা নিজেদেরকে সরিয়ে নেন।

নাসখ রীতি কুফী এবং নাসতালিক লিপিমালার মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। ‘নাসখ’ রীতিতে কোণাকৃতি কুফী লিপিমালার খানিকটা প্রতিফলন দৃষ্টিগোচর হয় । প্রসিদ্ধি লাভ করার পর নাসখ রীতি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। আগলাবিয়া (৮০০-৯০৯) সাম্রাজ্যের রাজধানী কায়রোয়ান থেকে ‘মাগরিবী’ নামক নাসখ লিপিরীতির একটি উপরীতি প্রবর্তিত হয়। তবে কায়রোয়ানী লিপিশৈলী নামেই এটি অধিক সমাদৃত হয়েছে। এই কায়রোয়ান শহর তৎকালীন সভ্য আফ্রিকার শিক্ষা-সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল। আর এখান থেকেই নাসখ রীতি পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমূহ বিশেষত: স্পেনে প্রসিদ্ধি ও বিস্তার লাভ করে। এর রেশ ধরেই স্পেনে ‘আন্দালুসী’ নামে নাসখের একটি উপরীতি প্রচলন হয় । কর্ডোভা শহরে এটির অধিক প্রচলন থাকায় এটি কর্ডোভীয়’ রীতি নামেও পরিচিত। এটি কায়রোয়ানী রীতির তুলনায় অধিক বক্রাকার।

আলজেরীয় নামেও নাসখের একটি উপরীতি রয়েছে। তবে মরক্কোর ফেজ শহরে ‘ফাসী’ নামে এর চেয়ে অধিকতর বক্রাকার রীতির উদ্ভব হয়। এ ছাড়া মধ্য আফ্রিকার টিম্বাকতু শহরে ‘সুদানী’ নামে এক লিপিশৈলীর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি এ লিপিরীতি ভারতবর্ষ পর্যন্তও বিস্তৃত হয়। যার প্রমাণ মেলে ১৩০১ সালে বিহারে সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের আমলের স্থাপত্য শিল্পে এই অসাধারণ ‘নাসখ’ লিপিশৈলীর উপস্থিতির মাধ্যমে।

image.png

 

নাসখ লিপিকলা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

নাসতালিক রীতি

কুফী এবং নাসখ রীতির পর আরবী লিপিকলার ইতিহাসে যে রীতির নামটি সোনার হরফে লিখিত রয়েছে সেটি হচ্ছে ‘নাসতালিক’ লিপিশৈলী । পূর্বের কোণাকৃতি কুফী ও বক্রাকার নাসখ লিপিশৈলী আরবদের দ্বারা উদ্ভাবিত হলেও গোলাকৃতি নাসতালিক রীতি পারস্যবাসীদের আবিষ্কার। আরবদের দ্বারা পারস্য বিজয়ের বহু পূর্ব হতেই প্রচলিত পাহলভী লিপি দীর্ঘকাল ধরে লিখিত হওয়ার কারণে এর সমান্তরাল রেখাকৃতি সম্ভবপর হয়েছিল। ‘নাসতালিক লিপি’ বহু আগে আবিষ্কৃত হলেও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে গিয়ে এ লিপির মাধ্যমে গ্রন্থাবলীর লিপিবদ্ধকরণ শুরু হয়। এই লিপিতেই সর্বপ্রথম ফার্সী কাব্যগ্রন্থ লিখিত হয়। নাসখ রীতির মাধ্যমে পবিত্র কুরআন ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাবলীর লিপিকরণ আর দুই পংক্তির মধ্যভাগে এবং পৃষ্ঠার প্রান্তদেশে নাসতালিক এর ব্যবহারের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, লিপিকলার ক্রমবিকাশের প্রথম স্তর হতেই নাসতালিক পারস্যবাসীদের মাঝে অধিক। জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ রীতির কোন উপরীতি সম্পর্কে জানা যায় না।

image.png

নাসতালিক লিপিকলা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

অন্যান্য লিপিরীতি সমূহ

আরবী লিপিকলার রীতিসমূহের মধ্য হতে আলোচ্য তিনটি রীতিই হচ্ছে প্রধান রীতি। এগুলো ব্যতীত অপরাপর রীতিসমূহ মূলত এগুলোর আলংকারিক রীতি । যেমন : ‘সুলুস’ হচ্ছে নাসখ লিপিকলার আলংকারিক প্রকরণ। তবে এর সাথে নাসখের পার্থক্য হচ্ছে এই যে, নাসখের তুলনায় সুলসের লম্বালম্বি দণ্ড এবং বক্রাকার রেখার অনুপাত তিনগুণ বড়। ‘সুলুস’ লিখন পদ্ধতিতে নাসখ রীতিতে যে খাড়াদণ্ড ও বক্ররেখা সুপ্ত হয়ে রয়েছে তা প্রকাশ পেয়েছে।

image.png

সুলস লিপিকলা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

‘খত্তুর রুকা’ হচ্ছে ইসলামী লিপিকলার আলংকারিক লিপিশৈলীগুলোর মধ্যে সুষমামণ্ডিত লিপিকলা । নিঃসন্দেহে সুলস অপেক্ষা রুকা অধিকতর আলংকারিক রীতির পরিচায়ক। এর রেখাগুলো ভঙ্গিতে চলমান সাপের মত অথবা স্রোতবাহী তরঙ্গের মত সাবলীল ছন্দে প্রসারিত।

image.png

খত্তুর রুকা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

তবে মনে করা হয় যে, ‘তাউকী’ হচ্ছে নাসখ লিপিশৈলীর অন্যতম আলংকারিক রূপ। যতদূর মনে হয় রিকা ও তাউকী এক ধরণের লিপিশৈলী নয়, বরং তাউকী লিপিশৈলীর সাথে সুলস লিপিশৈলীর সাদৃশ্য রয়েছে।

image.png

তাউকি লিপিকলা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

‘জুলফই আরুশ’ নামে এক ধরনের আশ্চর্য লিপিমালা রয়েছে। যখন বক্রাকার রেখাগুলো শেষপ্রান্তে কুণ্ডলাকৃতি ধারণ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত হয় এবং খাড়া দণ্ডগুলাে নাতিদীর্ঘ ও সূচাগ্র হয়ে প্রস্থে ক্ষীণ পরিসর গ্রহণ করে তখন তাকে ‘জুলফই আরুশ’ অর্থাৎ নববধূর কুণ্ডলাকৃতি বেণী বলা হয়। মূলত এটি নাসতালিকের একটি আলংকারিক রীতি।

অপর একটি লিপিরীতির নাম হচ্ছে ‘রায়হানী। সুলসের সাথে সূচাগ্রে দণ্ডায়মান রেখার সাথে সাদৃশ্য থাকলেও রায়হানী লিপিশৈলীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে সুলসের সাথে রায়হানী লিপিশৈলীর পার্থক্য নির্ণয় করা হয় বক্রাকার ও খাড়া রেখাগুলাের অনুপাতে । গুলজার ও তাউসকে নিশ্চিতরূপে লিখনশৈলী বলা যায় না । কারণ, এগুলো অন্যান্য লিপিশৈলীর আলংকারিক রূপ, এগুলোতে প্রচলিত ভঙ্গিমায় কলমের আচঁড়ে প্রথম অক্ষরের একটি পরিলেখ সৃষ্টি করা হয় এবং পরবর্তিতে আলংকারিক রেখা চিত্র অথবা ফুল বা জীবজন্তু যেমন- মাছ অথবা ময়ূর অলংকৃত হয়। ‘লারজা’ও কোনো ভিন্ন প্রকারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লিপিশৈলী নয়, অন্যান্য আলংকারিক রীতির মতো এটিও অলংকরণ পদ্ধতিতে লিখিত একটি কৌশল মাত্র। লারজা লিপিশৈলীর অক্ষরগুলো দেখে মনে হবে যে এগুলো বাঁকানো পল্লব । এধরনের লিখন পদ্ধতিতে লিপিকরণের সময় উত্তেজিতভাবে কম্পমান হাতে কলম ব্যবহার করা ছাড়া অপর কোন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় না।

‘মানসুর’ নামে যে লিপিশৈলীর প্রচলন রয়েছে তা খুবই অদ্ভুত ধরণের। এই রীতিতে মনে হবে কোনো রিবন বা ফিতাকে জড়িয়ে অক্ষরগুলো লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই লিখনরীতিতে অক্ষরগুলো শেষ প্রান্তে ফাঁসের মতো দেখা যায়। ‘মুহাক্কীক’ও একটি আলংকারিক রীতি। অপরাপর আলংকারিক লিখনরীতির মতো লিপিকলার ইতিহাসে এটি খুবই বিরল এবং এটি বৈপরীত্ব ও অভিনবত্ব প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। আরবী লিপিমালার অন্যতম আলংকারিক লিপিশৈলী হচ্ছে ‘বিহার’। যদিও অন্যান্য রীতির মত এ লিপিমালায় অলংকরণের প্রয়োগ খুবই কম। তবে আরবী লিপিমালার সর্বাপেক্ষা চাতুর্যপূর্ণ কৌশল হচ্ছে ‘তুঘরা’ । কুরআন শরীফের একটি আয়াত অথবা সূরাকে এ রীতিতে এমনভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় যে, তা কোন প্রাণীর যেমন— পাখি, বাঘ অথবা অন্য কোনো প্রাণীর আকৃতিতে আঁকা বলে মনে হবে।

উপরোক্ত রীতিগুলো ছাড়াও বিভিন্ন গ্রন্থাবলীতে আরও অনেক লিপিশৈলীর উল্লেখ রয়েছে। যেমন: গুবার, সাফীয়া, হিলানী, লিপিরীতি এগুলো অন্যান্য লিপিরীতির মতো এতটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়।

image.png

তুঘরা লিপিকলা (ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

ভারতবর্ষে ইসলামী লিপিকলার বিস্তৃতি

আলোচ্য মুসলিম লিপিকলার এই বিভিন্ন রীতিসমূহের আদি নিবাস আরব ও পারস্য হলেও যুগের ব্যবধানে এ লিপি সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছে অনেক দূর পর্যন্ত। মুসলিম লিপিকলার সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা মন কেড়েছিল ভারতবাসীরও। এ অঞ্চলে এই লিপি সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল দ্বিতীয় মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের হাত ধরে। তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা ও শিল্পরসিক। সমর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সাম্রাজ্য হারিয়ে তিনি পারস্যে কাটিয়েছিলেন কুড়িটি বছর। সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার হয়ে গেলে পারস্য হতে ফেরার পথে তিনি তাব্রিজ নগরী হতে মীর সাঈদ আলী ও খাজা আব্দুস সামাদ শিরাজী নামক খ্যাতিমান লিপিশিল্পীকে দিল্লিতে নিয়ে আসেন। তারা তৎকালীন স্থাপত্যসমূহে তাদের শৈল্পিক সৌকর্যের প্রয়োগ ঘটান। তার পরের মোঘল সম্রাটগণও ছিলেন শিল্পানুরাগী। বাদশাহ জাহাঙ্গীর নিজেই ছিলেন শিল্পী ও শিল্প সমালোচক। এই মোঘল সম্রাটগণ ছিলেন লিপিকলার মহান পৃষ্ঠপোষক। তাদের মধ্যে বাদশাহ জাহাঙ্গীর, আওরঙ্গজেবের মত অনেকেই নিপুণ লিপিকার ছিলেন। তবে এও শোনা যায়, প্রথম মোঘল সম্রাট বাবরও একজন দক্ষ লিপিকার ছিলেন। তিনি ১৫০৪ খৃষ্টাব্দে খত্তে বাবুরী’ বা ‘বাবরী লিপি’ নামে এক প্রকার হস্তলিপি প্রচলন করেন। ঐতিহাসিক বাদায়ুনীর মতে, তিনি নিজ হাতে লিখিত এক জিলদ কুরআন শরীফ নকল করে মক্কা শরীফে পাঠান। এ সময়ে ভারতবর্ষে বহু দক্ষ লিপিকারদের আবির্ভাব ঘটে। যারা তদের শৈল্পিক নান্দনিকতার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে মুসলিম লিপিকলার চরম উন্নতি সাধন করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মীর মুহাম্মদ হুমায়ুন গোলাম আলী খান, হাফিজ ইবরাহীম, হাফেজ বরকতুল্লাহ, মীর আবুল হাযাম, মীর জয়নুল আবেদীন, মীর মাহদী হাসান এবং খাজা গোলাম নকশবন্দী খান প্রমুখ। যারা সম্রাট আকবরের শাসনামলে খ্যাতি লাভ করেছিলেন । এ ছাড়া অন্যান্য মোঘল সম্রাটদের সময়েও আরও অনেক লিপিকারগণ খ্যাতিমান হয়ে উঠেন।

তৎকালে ভারতবর্ষের মুসলিম কৃষ্টিধারায় লিপিবিদ্যার স্থান ছিল অতি উচ্চে। বিভিন্ন মুসলিম রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় লিপিকলা ছিল পাঠ্যসূচীর একটি অপরিহার্য অঙ্গ। কালাতিক্রমে মোঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও মুসলিম লিপি সভ্যতা একের পর এক অঞ্চলে তার অস্তিত্বের জানান দিতে থাকে। মোঘল সাম্রাজ্য ভাঙ্গনের পর বহু বিখ্যাত আলিম ও গুণী কবি লাখনৌতে চলে যান। তখন সেটি সর্বপ্রকার শিল্প সাহিত্যের কৃষ্টিকেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লীর কুতুব মিনার, কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ এবং প্রাচীন স্থাপত্যসমূহের ধ্বংসাবশেষ হতে মুসলিম হস্তলিপির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।

তবে বাংলাদেশে লিপিশিল্পের উন্নয়নে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের রয়েছে গৌরবময় অবদান। তাদের হাত ধরেই এ অঞ্চলে মুসলিম লিপিকলার উত্থান হয়। তখন এই লিপিকলা স্মৃতিসৌধ বা যাদুঘরের দেয়াল,  মসজিদ, মাদরাসা এবং সমাধি সৌধের মধ্যে লিপিবদ্ধ ছিল। তবে দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এসব ক্যালিগ্রাফি দীর্ঘায়ু লাভ করতে পারেনি। এক সময়ের বাংলাদেশের অংশ বিহারের বারি দরগায় প্রাচীন হস্তলিপির সন্ধান পাওয়া যায়। ১২৪৯ খৃ. এর দিকে পশ্চিম দিনাজপুরের একটি মসজিদে মুসলিম ক্যালিগ্রাফির সন্ধান পাওয়া যায়। ১৩০১ সালে বিহারের সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের আমলে অসাধারণ ‘নাসখ’ লিপিশৈলীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

এ ছাড়া আরও কিছু ক্যালিগ্রাফি ১৩১৩ সালে সুলতান ফিরোজ শাহের সময়কালেই ত্রিবেনীর জাফর খানের সমাধি সৌধের উত্তর দিকের দেয়ালে পাওয়া যায়। যা তুঘরা লিপিরীতির উৎকৃষ্ট রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৩৭৪-৭৬ সালে পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদে অংকিত লিপিশিল্পকে বাংলার আরবী ক্যালিগ্রাফীর ল্যান্ডমার্ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৪৩ সালে ইলিয়াস হোসেন শাহী বংশের ২য় সুলতান নাসির উদ্দীন মাহমুদ শাহের সময়ে বালিয়াঘাটায় অত্যন্ত মনোরম ক্যালিগ্রাফীর একটি প্লেট পাওয়া যায়। এরপর নানা সুলতানের সময়ে এই লিপিশিল্পের ধারা অব্যাহত থাকে। সর্বশেষ নবাব সিরাজ উদ্দৌলার সময়ে এই লিপিশিল্প নব জীবন লাভ করে।

লিপিকারদের সামাজিক মর্যাদা

লিপিকলার বিভিন্ন রীতিসমূহ আলোচনার পর মুসলিম সমাজে লিপিকারদের কিরূপ মর্যাদা ছিল সে সম্মন্ধে কিছুটা আলোকপাত করা যায় । আব্বাসীয় শাসনামলে কাগজের প্রচলন হওয়ার পর এবং জনগণের মধ্যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটলে কেবল শিক্ষা ব্যবস্থারই আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়নি, বরং পাণ্ডুলিপি প্রণয়নে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়। মুসলিম বিশ্বে তখন ‘ওয়ারকা’ নামে এক ধরণের পেশা প্রচলিত ছিল । এই পেশায় নিয়োজিত লোকেরা পাণ্ডুলিপির অনুলিপি প্রণয়ন, পুস্তক বাঁধাই এবং পুস্তক বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদেরকে বলা হতো ওয়াররাক। সকল প্রকার জ্ঞানী, গুনী এবং গবেষকের মধ্যে ‘ওয়ারকা’ একটি মর্যাদাসম্পন্ন পেশা ছিল ।

পাণ্ডুলিপির দ্রুত অনুলিপি প্রণয়নের অস্বাভাবিক চাহিদার ফলে এক শ্রেণীর দক্ষ লিপিকারের সৃষ্টি হয়, যারা সুন্দর হস্তলিপি এবং দ্রুত লিখন রীতির নৈপূণ্য প্রদর্শন করতেন। গুণী ব্যক্তিগণ এবং সরকারী কর্মচারীরা তাদের সচিব এবং দ্রুতলেখক হিসেবে নিযুক্ত করতেন। সে যুগে পুস্তক প্রকাশনা একটি আকর্ষণীয় সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন ঘটনা ছিল । লিপিকারের পেশা লাভজনক হওয়ায় আলেমগণ এবং গবেষকরা এই পেশা সাদরে গ্রহণ করতেন । বিক্রয়যোগ্য গ্রন্থাবলীর অনুলিপি প্রণয়ন করে তারা তখন দৈনিক তিন থেকে চার টাকা উপার্জন করতেন। যা বর্তমান মুদ্রা বাজারে হয়ত অনেক টাকাই হবে। তাদেরকে গ্রন্থাগারে অনুলিপি প্রস্তুতকারক হিসেবে নিয়োগ করা হতো এবং তারা নিয়মিত বেতন ভোগ করতেন । লিপিকারদের সামাজিক মর্যাদা ছিল খুবই সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তাদেরকে শিক্ষক হিসেবেও নিয়োজিত করা হতো। দুঃখজনক হলেও পরবর্তী সময়ে এসে লিপিকারদের এই সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অক্ষত থাকেনি। তাদের অনেকেই দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে লিপিকলা ছেড়ে দেন।

তবে আজকের এই সমৃদ্ধির যুগে হস্তলিপিকারদের প্রসার নেই বললেই চলে। তার বিপরীতে এই যুগে ডিজিটাল কম্পিউটার গ্রাফিক্স-এর কদর দিন দিন বেড়েই চলছে। বইয়ের প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠার প্রান্তদেশে নানা ধরনের অলংকার ও ডিজাইন করা হচ্ছে কম্পিউটার গ্রাফিক্স-এর মাধ্যমেই। যেমনটি দেখা যেত, পূর্ববর্তী বিভিন্ন লিপিশৈলীর আলংকারিক রীতিসমূহে। এমন কি এ যুগে হস্তলিপির কাজ শুধু ক্লাসের নােট, হাতের কাজ এবং পরীক্ষার হলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন বই ও পত্রিকার কাজ করা হচ্ছে কম্পিউটারে টাইপিং ও গ্রাফিক্সের মাধ্যমেই। ফলে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিন দিন বেড়েই চলছে।

সূত্র: মুসলিম লিপিকলা-এম জিয়াউদ্দিন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

The post মুসলিম লিপিকলার ঐতিহ্য সন্ধানে appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ae-%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%90%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b9%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%b8/

No comments:

Post a Comment