Wednesday, June 10, 2020

কনস্টান্টিনোপল জয়কে ‘আগ্রাসন’ বলল মিসরের দারুল ইফতা

সাজ্জাদ আকবার:

নবিজির ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়নকারী মহান সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের ইস্তাম্বুল বিজয়কে ‘উসমানি আগ্রাসন’ বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছে মিশরের ‘দারুল ইফতা’। দারুল ইফতার অফিসিয়াল পেজ থেকে করা এ মন্তব্যে বলা হয়েছে, পনেরো শতকের খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করে কনস্টান্টিনোপল দুর্গ বিজয় ছিল উসমানি তুর্কিদের ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে’র অংশ।

দারুল ইফতার এ মন্তব্যের পর পুরো আরবজাহানে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে। সবাই বলছে, সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের ইস্তাম্বুল বিজয় ছিল সরাসরি নবিজির ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে সম্পৃক্ত। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে নবিজি বলেছেন, ‘অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল বিজয় করা হবে। যে সেনাপতি এ দূর্গ জয় করবে, সে কত না উত্তম সেনাপতি। এবং যে বাহিনী জয় করবে তারা কত না উত্তম বাহিনী।’

সুতরাং নবিজি যে দূর্গ জয়ের ব্যাপারে মুসলিমদের উৎসাহিত করে গেছেন, সে দূর্গজয়কে ‘আগ্রাসন’ বলা সরাসরি নবীজির হাদীসের ওপর আঘাত। অনেকে বলছেন, উসমানি সুলতানদের পক্ষ থেকে বাইজানটাইনের ক্রুসেডের মোকাবিলা করা যদি আগ্রাসন হয়, তাহলে তো হযরত মুয়াবিয়া রাদি. এর শাসনামলে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাদি. এর বাইজানটাইন অভিযানকেও আগ্রাসন বলতে হবে। নবিজির সুসংবাদের বাহক হবার আশায় তিনি তো সেই সুদূর সিরিয়া থেকে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে অভিযান শুরু করেছিলেন। ইন্তেকালের আগে তিনি অসিয়ত করেছিলেন, তাকে যেন কনস্টান্টিনোপলের কাছে সমাহিত করা হয়। যেন কনস্টান্টিনোপল বিজয় করা মহান সেনাবাহিনীর কাতারে তিনিও থাকতে পারেন। শুধু আবু আইয়ুব আনসারী রা. নন, ইসলামের ইতিহাসে আরও অনেকগুলো অভিযান হয়েছে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে। খেলাফতে বনু উমাইয়া ও খেলাফতে বনু আব্বাসের বহু খলিফা বাহিনী পাঠিয়েছিলেন কনস্টান্টিনোপল জয়ের আশায়।

মিশরের দারুল ইফতার এ মন্তব্য এমন সময় করা হল, যখন একদিকে ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক আয়া সুফিয়াকে পুনরায় মসজিদ পরিণত করার ব্যাপারে তুরস্কের জনসমাজে দাবি উঠেছে। যা নিয়ে গ্রিসের সাথে অনেকটা উত্তেজনা চলছে তুরস্কের। অন্যদিকে লিবিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তুরস্কের সাথে মিশর মুখোমুখি পর্যায়ে চলে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে মিশরের দারুল ইফতার এমন মন্তব্যকে সবাই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলে মনে করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দারুল ইফতার গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এর মাধ্যমে রাজনৈতিক এজেন্ডা হাসিলের চেষ্টা করছে মিসরের সরকার।

তুরস্কের বিখ্যাত সাংবাদিক হামজা তেকিন আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের ইস্তাম্বুল অভিযান যদি আগ্রাসন হয়, তাহলে তো মহান সাহাবী আমর ইবনুল আস রাদি. এর মিশর অভিযানকেও আগ্রাসন বলতে হবে– নাউজুবিল্লাহ। তুর্কী এই সাংবাদিক আরও বলেন, আসলে রাজনৈতিক কারণে প্রায় ছয়শো বছর মুসলিম উম্মাহকে খ্রিস্টীয় ক্রসেডের হাত থেকে রক্ষা করা উসমানি খেলাফত এবং সুলতানদের নিয়ে প্রায়ই বিষোদগার করে আরবদের নির্দিষ্ট একটি মহল। সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও মিশরের শাসকেরা মূলত তুরস্কের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্থানের প্রতি আরব জনগণের আগ্রহ ও অনুরাগকে বীতশ্রদ্ধ করার জন্যই মূলত তারা এরকম প্রচারণা চালিয়ে থাকে। এসবের মাধ্যমে তারা মুসলিম ইতিহাসে তুর্কি জাতির অবিস্মরণীয় গৌরবোজ্জ্বল অবদানকে কলঙ্কিত করে তুর্কিদের থেকে আরবদের বিচ্ছিন্ন করতে চায়।

দারুল ইফতার রুজুনামা

এ যাবৎকালের সমস্ত ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসদের ঐকমত্য অনু্যায়ী সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের হাতে কনস্টান্টিনোপলের ( ইস্তাম্বুল) বিজয় ছিল নবিজির ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন, যা আল্লাহ সুলতান মুহাম্মদের মাধ্যমে পূর্ণ করেছেন। এমন মোবারক ও পবিত্র বিজয়কে ‘আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে তাই টিকতে পারেনি মিসরের দারুল ইফতা। পরের দিন তারা বক্তব্য পাল্টে বলেছে, সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের হাতে কনস্টান্টিনোপলের বিজয় ছিল মহান বিজয়, যার সুসংবাদ দিয়ে গেছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তবে দারুল ইফতার সেই রুজুনামার শেষের একটি বাক্য পরিষ্কার সাক্ষ্য দেয় যে, ‘দারুল ইফতা’ কী পরিমাণ রাজনৈতিক আগ্রাসনের শিকার। শেষ বাক্যটা ছিল এরকম –’সুলতান মুহাম্মদ ছিলেন একজন মহান সুফী ও মুজাহিদ সুলতান। যার কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের সাথে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কোন সম্পর্ক নেই।’

দারুল ইফতার আরও কিছু কারনামা

গেলো রমজানে ‘আল ইখতিয়ার’ নামে একটি ধারাবাহিক টেলিভিশন সিরিয়াল চালু হয় মিসরে। সিরিয়ালটিতে মিসরের উপর সেনাবাহিনীর অবদানকে দেখানো হয়েছে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত এ সিরিয়ালটির একটি অংশে ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে সন্ত্রাসী হিসাবে উল্লেখ করা হয়! যা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা শুরু হয় নেটিজেনদের মধ্যে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, এসব কিছুর পরও মিসরের দারুল ইফতা এ সিরিয়ালটি দেখার ব্যাপারে সরাসরি উৎসাহ দেখিয়েছে। টুইটারে করা একটি পোস্টে তারা বলেছে, ‘শালীনতা বজায় রেখে উন্নত রুচি ও সভ্যতার চর্চা হয় এমন চিত্রকলা দেখার ব্যাপারে ইসলাম নিষেধ করে না। যেমনটা আল ইখতিয়ার সিরিজে দেখা যায়।’ এর আগে তুরস্কের বিখ্যাত হিস্ট্রিক্যাল ফিকশন সিরিজ ‘দিরিলিস আরতুরুল’ দেখা হারাম হওয়ার ফতোয়া দিয়েছিল একই দারুল ইফতা।

এসব নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার যে ঝড় উঠেছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায়, আস্থার সঙ্কটে ভুগছে তথাকথিত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। নেটিজেনদের একটি অংশ দারুল ইফতার নাম বদলে এর নতুন নাম রেখেছেন — দারুল ওপেরা!

The post কনস্টান্টিনোপল জয়কে ‘আগ্রাসন’ বলল মিসরের দারুল ইফতা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ab%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a6%a3-%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f/

No comments:

Post a Comment