মুজাহিদুল ইসলাম:
ইসলাম যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, খোদাপ্রেমিক মুসলিমরা তখন পবিত্র ভূমি হেজাজের পথে যাত্রা শুরু করে। সেইসব হজ্বের সফরনামা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে স্বতন্ত্র পাঠ হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে। এ লেখায় ভিন্ন দুই যুগের দুই জন মানুষের হেজাজ ভ্রমণের গল্প চিত্রায়িত হবে। তারা হলেন- চৌদ্দ শতাব্দীর মরক্কোর প্রসিদ্ধ পরিব্রাজক ইবনে বতুতা এবং বিংশ শতাব্দীর মিসরের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ লাবীব আল বাতনূনী।
ইবনে বতুতার হেজাজ সফর
পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম হিজরি শতাব্দীতে মরক্কোর আমীর উমারাসহ সকলের মধ্যেই হেজাজ সফরের একটা বিশেষ ট্রেন্ড লক্ষ্য করা যায়। আন্দালুসের মুসলমানদের ওপর ক্রমাগত আগ্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে হজ্বের প্রতি মনোযোগ হ্রাস করে জিহাদের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার ফতোয়া আসার পরেই মূলত ভ্রমণের এ ধারার প্রতি গুরুত্ব হ্রাস পায়।
এই পবিত্র ভূমিতে কত সহস্র মানুষ জিয়ারতে এসেছে! ইতিহাস আমাদের নিকট কেবল কিছু প্রসিদ্ধ মানুষের কথাই পৌঁছে দিয়েছে। তাদেরই একজন ইবনে বতুতা।
তবে শুধু হজ্ব ছাড়াও তখন ইলম অর্জনের জন্য সফর করার বিশেষ ধারাটা বেশ মজবুত ছিলো। ইসলামি গ্রন্থাগারগুলোতে একটি অংশ তাদের দখলেই থাকত। তারা সফরের সময় শায়েখদের থেকে অর্জিত হাদিস ও তাদের শায়েখদের জীবনীও স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষণ করেছেন।
৭২৫ হিজরিতে ইবনে বতুতা হজ্বের উদ্দেশ্যে রাজধানী তানজা ছাড়লেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় সে বছর আর বের হতে পারেননি। বরং একবছর অপেক্ষা করে ৭২৬ হিজরি শামের কাফেলার সাথে দিমাশক হয়ে মদীনা ও মক্কাতে পৌঁছান।
ইবনে বতুতা ৭২৬ হিজরির ২০ জিলকদ জীবনের প্রথম আল্লাহর ঘরে পা রেখেই কাবার প্রেমযন্ত্রণার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য, আমি কাবা দেখলাম! আল্লাহ কাবার মর্যাদাকে আরো সমুন্নত করুন! এ তো নববধু! মহত্বের মঞ্চে মণ্ডিত, সৌন্দর্যর কাজল মেখে কাপড় জড়িয়ে সগৌরবে হাঁটছে, দয়াময়ের প্রতিনিধি দ্বারা বেষ্টিত, পৌঁছে দিবে রিদওয়ান জান্নাতে।’
তাওয়াফে কুদুম ও সাফা-মারওয়ার সায়ী করে বলেন, ‘আল্লাহর বড় কারিশমা, প্রিয় এ দৃশ্যের প্রতি হৃদয় স্বভাবতই উড়ে যায়, তার কোলে আশ্রয় নিতে চায়। এর ভালবাসা হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। যে এখানে আসবে, তার হৃদয়ের সকল তন্ত্রী ছিনতাই হয়ে যাবে। প্রতিটি হৃদয় তোমার থেকে ফিরে গেছে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ও আবারো তোমার জিয়ারতে আসার আকুতি ধারণ করে। খলিল ইব্রাহিমের দোয়ায় তোমার এ মোবারক ভূমি চোখের মণি ও হৃদয়ের শীতলতা। তোমার সাক্ষাতে সফরের ক্লান্তি ও কষ্ট হীন হয়ে যায়। কত দুর্বল মানুষ তোমার জন্য মৃত্যুর সাক্ষাতের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। তোমাকে দেখে তারা আনন্দিত ও বিমোহিত; যেন কখনো কোনো কষ্ট তাদের স্পর্শও করেনি।’
জিলহজ্ব মাসের প্রথম দিন ইবনে বতুতা অদ্ভুত নিয়ম দেখলেন। পবিত্র মাসের আগমনে সকাল-সন্ধ্যা ও প্রতি নামাজের সময় তবলা বাজানো হয়। জিলহজ্বের সপ্তম দিনে জোহরের পর খতীব হজ্বের আলোচনা করেন। অষ্টম দিনে ভোরে ভোরে সকলে মিনার পথে রওনা হয়। এখানে সবসময় মিসর, শাম ও ইরাকের আমীর উমারাদের মধ্যে রাতে আলো প্রজ্বলনের প্রযোগিতা চলতো। তবে সবসময় শামিরাই এগিয়ে থাকতো। নবম দিনে ফজরের পর মিনা থেকে বেরিয়ে আরাফার পথে রওনা হয়।
মক্কার আবহাওয়া রুক্ষ হওয়া সত্বেও খাবার ও ফল-ফলাদির প্রাচু্র্য নিয়ে ইবনে বতুতা বলেন, ‘আমি এমন সব আঙ্গুর, তীন, পীচ, তরমুজ ও খেজুর খেয়েছি, যার তুলনা নেই। তাছাড়া সুস্বাদু গোশতও রয়েছে। আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশীদের ও নিরাপদ এই শহরের জন্য পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সেরা খাদ্য-ভাণ্ডার।’
কুরবানির তৃতীয় দিন কাবার গিলাফ পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘কাবার অভিভাবক বনু শায়বাহ কাবার গিলাফ পরিবর্তন করেন। গিলাফের চতুর্দিকে সাদা অক্ষরে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত লেখা। তৎকালীন মামলুক সুলতান নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাওন নিজেই কাবার গিলাফ পরিবর্তনে তদারকি করতেন। প্রতি বছর হারামের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে তিনি দেশের কাজি, খতিব, ইমামসহ বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তাদের পাঠাতেন।’
হজ্বের সফরে তিনি ইরাকি কাফেলাকে মক্কার দরিদ্রদের দুই হাতে স্বর্ণ দান করতে দেখেন। এমনকি তার দানের ফলে মক্কায় বিভিন্ন কিছুর দান চরমভাবে হ্রাস পায়। হজ্বের সুব্যবস্থার জন্য ইরাকি ও শামি কাফেলায় বিভিক্ত করা হতো। ফিরে যাওয়ার সময় আগে পর্যায়ক্রমে মিসরি, শামি, ইরাকি ও খোরাসি কাফেলা বের হতো।
১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ নভেম্বর হজ্ব সম্পন্ন করে ইবনে বতুতা একাধারে ২৩ বছরের অধিক আল্লাহর দুনিয়া ভ্রমণে থাকেন। প্রাচ্য-প্রাশ্চত্য তার সফরনামার অনুবাদের মাধ্যমে তাকে স্মরণ রেখেছে।
বাতনূনীর হেজাজ সফর
১৯০৯ সালে মিসরের খিদবি শাসক আব্বাস হিলমি হজ্বের সিদ্ধান্ত নেন। হজ্বের সফরে সামরিক-বেসামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নেন। মিসরের ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণচারী মুহাম্মাদ লাবীব আল বাতনূনীকে এ সফরনামা লেখার দায়িত্ব দেন। তার লেখা হেজাজ-সফরে তৎকালীন মিসরের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা-বাণীসহ ছাপা হয়। মিসরের জ্ঞানী-গুণী মহলে তা ব্যাপক সমাদৃত হয়।
তিনি তার হজ্বের সফরনামায় ইতিহাস, সামাজিক অবস্থা ও হজের ফিকহি দিক তুলে ধরেন। আলাদাভাবে সফরে বাদশাহর মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা, মক্কাবাসীদের অবস্থা, তৎকালীন উসমানি সালতানাতের অধীন হেজাজের শরীফি শাসনসহ সেখানে বিভিন্ন পুরাকীর্তির বর্ণনা দেন।
১৯০৯ সালের ১১ ডিসেম্বর কায়রো থেকে ট্রেনে করে সুইস খাল। সেখান থেকে খিদবি তরীতে মিসরের মিকাত রাবেগে। ইহরাম বেঁধে লঞ্চযোগে জেদ্দা। উসমানি সালতানাতের অধীন শরীফ বংশ তখন হেজাজ শাসন করছে।
বাতনূনী বলেন, ‘হজ্বের মৌসুমে জেদ্দায় রাতদিন কোলাহলপূর্ণ থাকে। জেদ্দা বন্দরে পৌঁছলেই বিভিন্ন এজেন্সীর লোক তাদের ব্যক্তিদের নাম ধরে ডাকতে থাকে। তারা সেখানে গিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে।’
জেদ্দায় নেমে বিশ্রামের জন্য এক দুই দিন থেকে ঘোড়া বা গাধায় করে মক্কায় যেতে হয়। কারণ, তখন গাড়ি-ঘোড়া ছিলো না।
১৪ ডিসেম্বর খিদবি আব্বাস হিলমি মক্কায় পৌঁছলে মক্কার শাসক শরীফ, গণ্যমান্যব্যক্তিসহ উসমানি সালতানাতের উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা স্বাগত জানান। স্বাগতানুষ্ঠানের পরেই খিদবি হারামে প্রবেশ করে তাওয়াফ করেন।
বাতনূনী হারামের জুমার নামাজের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘যখন খতিব মিম্বারে উঠেন, তার সাথে মিম্বারের নীচের ধাপে একজন রক্ষীও উঠেন। খতিবদের যেকোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা হতে রক্ষার জন্য অনেক আগে হতেই এমন চলে আসছে। খুতবার পর কাবার নিচে খতিব নামাজ পড়ান।’
বাতনূনী তৎকালীন মক্কার ট্রেলিগ্রাফ ও ডাকের দূরাবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ট্রেলিগ্রাফের ব্যবস্থা একদম বাজে। অধিকাংশ স্যিগনাল পৌঁছায় না। এটা তো হজ্বের সময় প্রচুর ব্যবহারের কারণে হয়েছে। ডাকের জন্য জেদ্দা হতে মক্কা পর্যন্ত উটের মাধ্যমে চিঠি আনা-নেওয়া করা হতো। এবং নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতো। কিন্তু এ চিঠিগুলো কখনো বাচ্চারা, কখনো খোদ যার নামে চিঠি আসে তারাই সংগ্রহ করে। অনেক সময়ই প্রাপক পেত না।
হজ্বের মৌসুমে প্রাচীন কাল হতেই মক্কায় বিভিন্ন ধরনের আতর, তসবীহ, জায়নামাজ, হিন্দুস্তানি-শামি রেশমের কাপড় বিক্রি করা হতো। মক্কার বিভিন্ন বাজারের মধ্যে হারামের উত্তরে শামি বাজারকে অনেকটা তুর্কি বাজারের মতো বলে উল্লেখ করেন। মদিনার রাস্তায় ফিরোজ, ইয়াকুত ও আকিক পাথর খুবই সস্তা মূল্যে ইয়ামানের হাজিরা বিক্রি করতো।’
বাতনূনী আরাফার দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আকার-আকৃতিতে তারা ভিন্ন। কিন্তু তাদের হৃদয়-মনে নেই কোন ভিন্নতা। আসরের নামাজের পর উসামানী সালতানাতের পক্ষ হতে নিযুক্ত মক্কার গভর্নর তার উটনি নিয়ে জাবালে রহমাতে উঠে রাসূল সা. এর পক্ষ হতে খুতবা দেন।
হাজিরা দোয়া ও তালবিয়াহ পড়েন। যখন সূর্যাস্ত হয়, খতিবের পক্ষ হতে উকুফে আরাফার সমাপ্তির নিদর্শন হিসেবে একটি রকেট ছোড়া হয়। বিভিন্ন কাফেলা সঙ্গীত, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-জিকিরের মধ্য দিয়ে ফিরে যায়।
প্রতিবছর উসমানী সুলতান কর্তৃক পাঠানো ফরমান মিনায় পাঠ করা হয়। ফরমানের সাথে বিশেষ পোশাক, মুদ্রা ও জুব্বা দেয়া হতো। ফরমানটির দুই কোণ দুই জন যুবরাজ ধরে রাখতো, আর গভর্নর নিজে তুর্কি ভাষায় পাঠ করতেন। পরে গভর্নরের সচিব তা আরবিতে অনুবাদ করে শোনাতো।
এ বছর ফরমানের মূলকথা ছিলো, ‘আমাদের অভিভাবক সুলতান -আল্লাহ তাকে হেফাজাত করুন- হাজিদের শান্তি-সুস্থতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণ ও নিরাপদ রুটের জন্য করণীয় সবকিছু করার এবং তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশা প্রকাশ করছেন। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ও সামরিক ব্যক্তিদের জন্য সহযোগিতা ও সুচারুভাবে উপযুক্ত ব্যক্তিদের সাদকাহ পৌঁছানোর বিশেষ দৃষ্টি প্রতি জোর দিয়েছেন।’
এভাবেই হিজরি অষ্টম শতাব্দীর প্রথমাংশের ইবনে বতুতা এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশের বাতনূনী হজ্বের দৃশ্যাবলী তুলে ধরেছেন। হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা কোনো কিছুই পরিবর্তন হয়নি, আর হবেও না। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। আর যুগে যুগে তার পরিবর্তন হতেই থাকবে।
The post হেজাজের রিহলাহ : ইবনে বতুতা ও বাতনূনীর চোখে হজ্বের সফর appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b9%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b9-%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%a4-2/
No comments:
Post a Comment