মূল: আলী সাল্লাবি
ভাষান্তর: রাকিবুল হাসান
ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হলো হজ্ব। দশম হিজরিতে হজ্ব ফরজ হয়। যার ওপর হজ্ব ফরজ, উত্তম হলো দেরী না করে সময়মতো হজ্ব আদায় করে নেয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً
‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহর হজ্ব করা সেসব মানুষের জন্য কর্তব্য, যারা (শারীরিক এবং আর্থিকভাবে) সেখানে যেতে সমর্থ।’ (সূরা আলে ইমরান:৯৭)
রাসূল সা. জীবনে একবারই হজ্ব করেছেন। দশম হিজরিতে। এই হজ্বকে বলা হয় ‘হাজ্জাতুল বিদা’ ‘হাজ্জাতুল ইসলাম’ ‘হাজ্জাতুল বালাগ’। এই হজ্বে রাসূল সা. সবাইকে বিদায় জানিয়েছেন। হজ্বের হুকুম-আহকামগুলো কাজে এবং কর্মে করে দেখিয়েছেন। হজ্বের আহকাম বর্ণনার মাধ্যমেই পূর্ণ হয়ে যায় ইসলাম। তিনি যখন হজ্বের আহকাম বর্ণনা করলেন, খুলে খুলে বুঝিয়ে দিলেন সব, আরাফার পাহাড়ে তার ওপর আল্লাহ তায়ালা নাজিল করলেন—
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا
‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়েদা:৩)
আয়াতটি নাজিল হবার পর সাহাবায়ে কেরাম কান্না শুরু করলেন। তারাও বুঝতে পারলেন, রাসূল সা. এর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসছে। যারা কান্না করছিলেন আয়াত শুনে, তাদের মধ্যে অন্যতম হজরত ওমর রাদি.। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, ‘পূর্ণতার পরই ক্ষতি আসে।’
বিদায় হজ্বে রাসূল সা. এর সঙ্গে লক্ষাধিক সাহাবি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
কিভাবে রাসূল সা. হজ্ব করেছেন?
রাসূল সা. যখন হজ্বের সংকল্প করলেন, সবাইকে জানিয়ে দিলেন, ‘আমি হজ্বে যাব। আমার সঙ্গে হজ্ব করার জন্য তোমরা প্রস্তুত হও।’ আগুনের ফুলকির মতো চারদিকে এই আহ্বান ছড়িয়ে পড়লো। মাদীনার আশপাশের সবাই এসে উপস্থিত হলো। পথ থেকেও এই হজ্ব কাফেলায় যুক্ত হলো অসংখ্য মানুষ। রাসূল সা. এর ডানে মানুষ, বামে মানুষ। যতদূর চোখ যায়, কেবল মানুষের স্রোত বয়ে চলছে। হজ্ব কাফেলা মদীনা থেকে বের হলো শনিবার যোহরের পর। যিলকদ মাস শেষ হতে তখনো পাঁচদিন বাকি।
কাফেলা বের হবার পূর্বে রাসূল সা. সাহাবিদের উদ্দেশ্যে একটি খুতবা দিলেন। খুতবায় তিনি ইহরাম পরিধান, ইহরামের ওয়াজিব এবং সুন্নতগুলো বিশদভাবে বলে দিলেন। কাফেলা চলতে শুরু করলে তিনি উচ্চকিত কণ্ঠে বলতে লাগলেন—
«لبيك اللَّهُمَّ لبيك، لبَّيك لا شريك لك لبيك، إنَّ الحمد، والنِّعمة لك، والملك، لا شريك لك»
তার সঙ্গে বলতে গিয়ে তালবিয়ার বাক্যটি কেউ কিছু শব্দ কমিয়ে বললো, কেউ বাড়িয়ে বললো। কিন্তু তিনি কাউকে নিষেধ করেননি। সম্মতি দিয়েছেন। কাফেলা চলছে, তালবিয়ার ধ্বনি মুখরিত হচ্ছে।
চলতে চলতে রাসূল সা. আরাজে এসে অবস্থান করলেন। তারপর চলতে চলতে পেরিয়ে গেলেন আবওয়া, আসফান উপত্যকা। ‘যি তাওয়া’য় এসে যখন পৌঁছলেন, তখন শনিবারের দিন পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। জিলহজ্বের চার তারিখ। রোববার রাতটি তিনি এখানেই কাটালেন। ফজর নামাজ পড়ে দিনের গোসল সারলেন। তারপর উঁচুভূমি দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন।
মক্কায় এসে রাসূল সা. মসজিদে হারামে প্রবেশ করলেন। তখন মধ্যাহ্ন। তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন। এরপর তিনি তার ডান দিকে চললেন। তিন চক্করে রমল করতে করতে হাজরে আসওয়াদের কাছে আসলেন। আর চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন। এরপর মাকামে ইবরাহীমে পৌঁছে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন—
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلّىً وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِي لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ
‘এবং স্মরণ কর যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপদস্থল করলাম এবং বললাম, মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ কর এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে বলেছিলাম, আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু ও সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে।’ (সূরা বাকারা:১২৫)
এরপর তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তার ও বায়তুল্লাহর মাঝখানে রেখে দু’রাকাআত সালাত আদায় করলেন। এ দু’রাকাত সালাতে তিনি সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাস পড়লেন।
তারপর তিনি দরজা দিয়ে বের হয়ে সাফা পাহাড়ে গেলেন। সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি এসে পাঠ করলেন:
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا وَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ اللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ
‘নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। অতএব যে ব্যক্তি এই গৃহের হজ্ব ও ওমরা করে, এ দুটিতে তাওয়াফ করা দোষণীয় নয়; এবং কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে আল্লাহ সমাদরকারী সর্বজ্ঞাত।’ (সূরা বাকারা:১৫৮)
আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, তিনিও তা দিয়ে শুরু করলেন। অর্থাৎ তিনি সাফা পাহাড়ে উঠতে শুরু করলেন। কাবাঘর দেখা যায় এমন উঁচুতে উঠলেন। তারপর তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ববাদ, বড়ত্ব ও প্রশংসার ঘোষণা দিয়ে বললেন,
«لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد، وهو على كلِّ شيءٍ قدير، لا إله إلا الله وحده، أنجز وعده، ونصر عبده، وهزم الأحزاب وحده»
‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তার কোন শরীক নেই। রাজত্ব তারই। প্রশংসাও তার। আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তার কোন শরীক নেই। তিনি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন।’
তারপর এর মাঝে তিনি দু‘আ করলেন এবং এরূপ তিনবার পাঠ করলেন। এরপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে হেঁটে অগ্রসর হলেন। যখন তিনি বাতনুল-ওয়াদিতে পদার্পণ করলেন, তখন তিনি দৌড়াতে লাগলেন। যখন তিনি ‘উপত্যকার অপর প্রান্তে’ এসে গেলেন, তখন তিনি স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলেন। মারওয়ায় এসে তিনি তাতে আরোহন করলেন এবং বায়তুল্লাহর দিকে তাকালেন। অতপর সাফা পাহাড়ে যা করেছিলেন মারওয়া পাহাড়েও তাই করলেন।
মারওয়া পাহাড়ে শেষ চক্করকালে তিনি বললেন, হে লোকসকল! ‘আমি পরে যা বুঝেছি তা যদি আগে বুঝতে পারতাম, তাহলে হাদি বা কুরবানির পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং হজ্বকে উমরায় পরিণত করতাম। তোমাদের মধ্যে যার সাথে হাদি বা পশু নেই সে যেন হালাল হয়ে যায় এবং এটাকে উমরায় পরিণত করে।’
তখন সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জু‘শুম রা. দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের এই উমরায় রূপান্তর করে তামাত্তু করা কি শুধু এ বছরের জন্য নাকি সব সময়ের জন্য? তখন রাসূল সা. দু’হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে বললেন, ‘হজ্বের ভেতরে উমরা কিয়ামত দিন পর্যন্ত প্রবিষ্ট হয়েছে। না, বরং তা সবসময়ের জন্য, না, বরং তা সবসময়ের জন্য।’ বাক্যটি দুবার বললেন।
রাসূল সা. মক্কায় চারদিন অবস্থান করলেন—রোববার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার। বৃহস্পতিবার দিন মধ্যাহ্নে তিনি তার সফরসঙ্গী মুসলিমদের নিয়ে মিনার দিকে রওয়ানা হলেন। মিনায় পৌঁছে যাত্রাবিরতি দিলেন। সেখানেই জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং ফজর নামাজ আদায় করলেন। ফজর নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি নামিরা নামক স্থানে তার জন্য পশমের তাবু টানানোর নির্দেশ দিলেন।
এরপর রাসূল সা. রওয়ানা হলেন। কুরাইশদের এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, তিনি মাশআরে হারাম (অর্থাৎ) মুযদালিফাতেই অবস্থান করবেন এবং সেখানেই তাঁর অবস্থানস্থল হবে। কেননা কুরাইশরা জাহেলি যুগে এরকম করত। কিন্তু রাসুল সা. মাশআরে হারাম অতিক্রম করে আরাফায় উপনীত হলেন এবং নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাঁবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন। অতপর যখন সূর্য হেলে পড়ল, তখন তিনি কসওয়া নামক উটনিটি আনতে বললেন এবং তাতে সওয়ার হয়ে উপত্যকার মধ্যে এসে থামলেন।
এখানেই তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দানের গুরুত্বপূর্ণ সেই খুতবা দিলেন। খুতবায় তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য সম্মানিত। যেমন তোমাদের এই শহর, তোমাদের এই মাস, তোমাদের এই দিন সম্মানিত। জেনে রাখো! নিশ্চয় জাহিলিয়াতের প্রত্যেকটি বিষয় আমার এই দুই পায়ের তলে রাখা হল। জাহিলি যুগের যাবতীয় রক্তের দাবি রহিত করা হল। আমাদের রক্তের দাবিসমূহের মধ্যে প্রথম রক্তের দাবি যা রহিত করা হল, তা ইবন রবিআ ইবনুল-হারিসের রক্তের দাবি। সে সাদ গোত্রে দুধ পানরত অবস্থায় ছিল। হুযাইল গোত্র তাকে হত্যা করেছিল। জাহেলি যুগের সুদ রহিত করা হল। সর্বপ্রথম যে সুদের দাবি রহিত করছি তা হল আববাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ। তার পুরোটাই রহিত করা হল। আর তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে আল্লাহর বাণী দ্বারা হালাল করে নিয়েছ। নিশ্চয় তোমাদের ব্যাপারে তাদের ওপর দায়িত্ব হচ্ছে, তারা যেন তোমাদের বিছানাসমূহকে এমন কোন ব্যক্তি দ্বারা পদদলিত না করে যাকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা তা করে, তবে তোমরা তাদেরকে মৃদুভাবে প্রহার কর। আর তাদের ব্যাপারে তোমাদের উপর দায়িত্ব হচ্ছে, উত্তম পন্থায় তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা। আমি তোমাদের মধ্যে এমন এক বিষয় রেখে যাচ্ছি, যা তোমরা আঁকড়ে ধরলে আর কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো, আল্লাহর কিতাব। আমার ব্যাপারে যখন তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে ?’
তারা সমস্বরে বলল, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় আপনি আপনার রবের বাণীসমূহ পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, অর্পিত দায়িত্ব আদায় করেছেন, উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন।’
তারপর তিনি তার শাহাদাত আঙ্গুল আকাশের দিকে তুলে মানুষের দিকে ইশারা করে বললেন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন।’
এরপর বেলাল রা. একবার আযান দিলেন। ইকামত দিলেন। রাসূল সা. সবাইকে নিয়ে যোহরের সালাত আদায় করলেন। বেলাল রা. পুনরায় ইকামত দিলেন। রাসূল সা. আসরের সালাতও আদায় করলেন। তিনি উভয় সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করেননি। অতপর রাসূল সা. ‘কাসওয়া’ নামক উটনির পিঠে আরোহন করে উকুফের স্থানে এলেন। তার উটনি কসওয়ার পেট পাথরের দিকে ফিরিয়ে রাখলেন। যারা পায়ে হেঁটে তার সাথে এসেছিলেন, তিনি তাদের সকলকে তার সামনে রাখলেন এবং কিবলামুখী হলেন। সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই উকুফ করলেন। এমনিভাবে পশ্চিম আকাশের হলুদ আভা ফিকে হয়ে গেল এমনকি লালিমাও দূর হয়ে গেল।
হজরত আবুল হাসান আলী নাদাবি রহ. লিখেছেন, ‘নামাজ পড়া শেষ করে রাসূল সা. সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়ায়-কান্নায় মশগুল ছিলেন। দোয়ায় তিনি বুক পর্যন্ত হাত উঠালেন, যেভাবে একজন মিসকিন খাবার প্রার্থনা করে। দোয়ায় তিনি বলছিলেন—হে আল্লাহ, আপনি আমাকে শুনতে পান, আমার অবস্থান দেখতে পান। আপনি আমার যাবতীয় গোপন এবং প্রকাশ্য বিষয় জানেন; আপনার কাছে আমার কিছুই গোপন নেই। আমি নিতান্তই দরিদ্র, অনুগ্রহ এবং সাহায্য প্রার্থনাকারী। আমি স্বীকার করছি আমার গুনাহ; আপনার কাছে মিনতি করছি নিঃস্বের মতো; আপনার সামনে লুটিয়ে পড়ছি লাঞ্চিত পাপীর মতো। আপনাকে ডাকছি ভয়-কম্পিত দুর্বলের মতো। যে তার মস্তক আপনার সামনে নুইয়ে দিয়েছে; আপনার ভয়ে তার চোখ ছলছল করছে, তার দেহ মিইয়ে যাচ্ছে, লাঞ্ছনায় ডুবে যাচ্ছে। হে আল্লাহ, আপনার করুণা থেকে আমাকে বঞ্চিত করে হতভাগ্য করে দিয়েন না। আমার প্রতি দয়া করুন, রহমতের দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন। হে দাতাদের সেরা, হে মহান দানশীল!’
আরাফার ময়দানেই অবতীর্ণ হয় এই আয়াত—
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا
‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়েদা:৩)
সূর্য যখন ডুবে গেলো, রাসূল সা. উসামা ইবনে যায়েদকে তার উটনির পেছনে বসিয়ে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হলেন। কাসওয়া নামক উটনির লাগাম এমন শক্তভাবে টেনে ধরলেন, উটনির মাথা তার হাওদার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, ‘হে লোকসকল! শান্ত হও, শান্ত হও!’
পুরো পথে তিনি তালবিয়া পড়লেন। একবারের জন্যও থামলেন না। এভাবে তিনি মুযদালিফায় এলেন। তারপর এক আযান ও দুই ইকামতসহ মাগরিব ও ইশার সালাত একসাথে আদায় করলেন এবং এ দুই সালাতের মাঝখানে তিনি কোন তাসবীহ বা নফল সালাত আদায় করলেন না। এরপর রাসূল সা. শুয়ে পড়লেন। যখন সুবহে সাদেক উদিত হলো, আওয়াল ওয়াক্তেই ফজরের সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি কাসওয়ায় আরোহন করে মাশআরে হারামে এলেন। কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তাঁর মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদের ঘোষণা দিলেন। পূর্ব আকাশ পূর্ণ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে উকুফ করলেন।
সূর্য উঠার পূর্বেই তিনি মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হলেন। ফযল ইবন আব্বাস রাদি.কে বসালেন নিজের উটনির পেছনে। ইবনে আব্বাস রাদি.কে আদেশ করলেন জামরায় নিক্ষেপের জন্য সাতটি কঙ্কর কুড়িয়ে নিতে। পুরো পথ তিনি তালবিয়া পাঠ করলেন। চলতে চলতে বাতনে মুহাসসারে পৌঁছলে উটের গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন। কারণ এই উপত্যকায় আবরাহার হস্তিবাহিনী আজাবের মুখোমুখি হয়েছিল। মিনায় পৌঁছে তিনি বড় জামরার নিকট এলেন। সূর্যোদয়ের পর বড় জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন। এরপর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দিলেন।
মিনায় রাসূল সা. এর খুতবা
এরপর মিনায় পৌঁছে রাসূল সা. গুরুত্বপূর্ণ একটি খুতবা দিলেন। এই খুতবায় তিনি কুরবানির দিনের সম্মান, আহকাম, আল্লাহ তায়লার নিকট এর মর্যাদা, সমস্ত শহরের ওপর মক্কার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কথা বললেন। তিনি আদেশ দিলেন আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী যে নেতৃত্ব দিবে, তার কথা শুনো। মানো। আমার মৃত্যুর পর তোমরা কাফের হয়ে যেও না। একজন আরেকজনের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ো না।
হাদীসে খুতবার বর্ণনা এভাবে এসেছে— রাসূল সা. বললেন, সম্মানের দিক থেকে কোন মাসটি সবচে বড়? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সা. চুপ করে রইলেন। আমরা ভাবলাম তিনি বুঝি অন্য একটা মাসের নাম বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, জিলহজ্ব নয়? আমরা বললাম, অবশ্যই। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, সম্মানের দিক থেকে কোন দেশ সবচে বড়? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সা. চুপ করে রইলেন। আমরা ভাবলাম তিনি বুঝি অন্য একটা দেশের নাম বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, এই হারামের দেশ নয়? আমরা বললাম, অবশ্যই। তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য সম্মানিত। যেমন তোমাদের এই শহর, তোমাদের এই মাস, তোমাদের এই দিন সম্মানিত। এই সম্মান বহাল থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। আমি কি আল্লাহ তায়ালার সব বাণী পৌঁছে দিতে পেরেছি? তারা বললো, হ্যা। পেরেছেন। রাসূল সা. বললেন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন। আজকে যারা উপস্থিত, তোমরা অনুপস্থিতদের নিকট বাণীগুলো পৌঁছে দিবে। কখনো শ্রবণকারী থেকে যার কাছে পৌঁছানো হয়, সে বেশি বুদ্ধিমান হয়। আমার মৃত্যুর পর তোমরা কাফের হয়ে যেয়ো না। একজন আরেকজনের গর্দান উড়িয়ে দিয়ো না।’
এরপর তিনি পশু যবেহের স্থানে গেলেন। নিজ হাতে তেষট্টিটি ‘উট’ যবেহ করলেন। অবশিষ্টগুলো যবেহ করার দায়িত্ব দিলেন হজরত আলী রা.কে। যবাই সম্পন্ন হলে রাসূল সা. মাথা মুণ্ডন করে দিতে বললেন। তার মাথা মুণ্ডন করে চুলগুলো সবার মাঝে বিলিয়ে দেয়া হলো। তারপর রাসূল সা. বাহনে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ গেলেন এবং বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করলেন। সাহাবীগণও তাওয়াফ করলেন। যোহর সালাত আদায় করলেন মক্কায়। তারপর আবদুল মুত্তালিব বংশের কাছে এলেন, তারা মযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! বালতি ভর্তি করে পানি তুলে তা হাজীদেরকে পান করাও। তোমাদের কাছ থেকে পানি পান করানোর দায়িত্ব কেড়ে নেয়ার ভয় না থাকলে আমিও নিজ হাতে তোমাদের সাথে বালতি ভরে পানি তুলে তা পান করাতাম।’ তারা তাকে বালতি ভরে পানি দিলেন, তিনি তা পান করলেন।
রাসূল সা. এ দিনই মিনায় ফিরে এলেন। এখানেই রাত্রি যাপন করলেন। সকালবেলা সূর্য যখন ঢলে গেলো, হেঁটে হেঁটে জামরার নিকট গেলেন। প্রথম, মধ্যম এবং শেষ জামরায় একে একে কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন। মিনায় রাসূল সা. দুটি খুতবা দিয়েছেন। এক—কুরবানির প্রথম দিন। দুই—কুরবানির দ্বিতীয় দিন। এই দ্বিতীয় দিন যে খুতবা দিয়েছেন, তা মূলত আরাফার ময়দানে দেয়া খুতবার পুনরাবৃত্তি। মুসলমানদের জন্য বিষয়গুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। কুরাবানির তৃতীয় দিন রাসূল সা. জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করে মক্কায় ফিরে আসেন। রাতে সেহরির সময় বিদায়ি তাওয়াফ করে মদীনার দিকে রওয়ানা হন।
জিলহজ্বের ১৮ তারিখ, বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে রাসূল সা. ‘গাদিরে খুম্ম’ নামক এলাকায় সাহাবিদের উদ্দেশ্যে একটি খুতবা প্রদান করেন। এই খুতবায় তিনি বলেন, ‘হে লোকসকল! নিশ্চয়ই আমি একজন মানুষ। অচিরেই আল্লাহর নিকট থেকে (মৃত্যুর) দূত আসবে এবং আমি তার ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মধ্যে দুটি মহান বিষয় রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হল আল্লাহর কিতাব (কুরআন), যাতে রয়েছে হেদায়াত এবং নুর। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো।’ তিনি আল্লাহর কিতাবের উপর গুরুত্বারূপ করলেন এবং উৎসাহ প্রদান করলেন। এরপর বললেন- ‘এবং (দ্বিতীয়টি হল) আমার আহলে বায়েত। আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বায়েতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বায়েতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বায়েতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।’
যুল হুলায়ফায় পৌঁছে রাসূল সা. রাত্রি যাপন করলেন। এরপর চলতে চলতে যখন মদীনা দেখা গেলো, তিনবার তাকবির দিলেন। এবং বললেন,
«لا إله إلا الله وحدَه، لا شريك له، له الملك، وله الحمد، وهو على كلِّ شيء قديرٌ، آيبون، تائبون، عابدون، ساجدون، لربِّنا حامدون، صدق الله وعده، ونصر عبده، وهزم الأحزاب وحدَه»
The post ‘আমার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো’ : নবীজির শেষ হজ্ব appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b9%e0%a6%a3-%e0%a6%95%e0%a6%b0/
No comments:
Post a Comment