রাকিবুল হাসান:
কুরআন এবং হাদীস—দুটোই ইলম অর্জন, পঠন-পাঠন এবং ইলমের প্রচারের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ইলম প্রচার না করে বাক্সে বন্দী করে রাখার ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন রাসূল সা.। তিনি বলেছেন, ‘কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে, জানা সত্ত্বেও যদি সে বিষয়টি লুকিয়ে রাখে, কেয়ামতের দিন তার গলায় আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে।’
রাসূল সা. পঠন-পাঠনের গুরুত্ব কতটুকু দিতেন, তা বুঝে আসে বদর যুদ্ধে কাফের বন্দীদের সঙ্গে তার আচরণ দেখে। কাফের বন্দীর মুক্তিপন আদায়ে তিনি গ্রহণ করেছিলেন অভিনব এক পদ্ধতি। একেকজন বন্দীর মুক্তিপন তিনি নির্ধারণ করেছিলেন—দশজন মুসলিম শিশুকে লেখাপড়া শেখানো। এই শেখানোটা কেবল প্রাথমিক ধারণা দেয়া নয়। বরং তিনি বলেছেন, একজন বন্দী যদি দশজন শিশুকে লেখাপড়া শেখায়, এবং এই শিশুরাও লেখাপড়া ভালোভাবে শিখে ফেলে, তাহলে শেখানোটা মুক্তিপন হিসেবে বিবেচিত হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মসজিদের ভূমিকা
মক্কায় মুসলিমদের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো হজরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম রাদি. এর ঘর। এই শিক্ষাকেন্দ্রের নাম—’দারুল আরকাম।’ হিজরতের পর মুসলিম শিক্ষাকেন্দ্রের ধরণ একটু বদলে গেলো। কারণ তখন তাদের রাষ্ট্র হয়েছে। রাষ্ট্র মুসলমানদের স্বার্থ, কল্যান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরী হচ্ছে। ইসলামি রাষ্ট্রের বহুমুখি তৎপরতায় দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তখন আবির্ভূত হলো মসজিদ।
শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে মসজিদ ব্যবহার সম্পর্কে একটি হাদীস থেকে জানতে পারি। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদি. বলেন, একদিন রাসূল সা. হুজরা থেকে বেরিয়ে মসজিদে এলেন। দেখলেন দুটো হালকা; এক হালকায় কুরআনের তেলাওয়াত হচ্ছে, যিকির করা হচ্ছে। দ্বিতীয় হালকায় কুরআনের পঠন-পাঠন হচ্ছে। রাসূল সা. বললেন, দুটো হালকা-ই কল্যানের কাজে নিয়োজিত। এরা কুরআন পড়ছে এবং যিকির করছে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে চাইলে দিতেও পারেন, আবার না-ও দিতে পারেন। আর এরা কুরআন শিখছে এবং শেখাচ্ছে; আল্লাহ তায়ালা আমাকে পাঠিয়েছেন শিক্ষক হিসেবে।’
মুসলমানদের একমাত্র সম্মিলিত সম্পত্তি হলো—মসজিদ। তাই যুগে যুগে মুসলিমরা মসজিদকে ব্যবহার করেছে তাদের জনস্বার্থে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন থেকে মসজিদেই পরিচালনা করেছে বিচারকার্য, শিক্ষা কার্যক্রম। কারণ শিক্ষা সবসময়ই ছিলো সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ব্যক্তি উদ্যোগে সবাই শিক্ষাগ্রহণ করতো। শিক্ষকের ব্যয়ভার বহন করতো মুসলিম সমাজ। তিনি যে স্তরের শিক্ষকই হোন না কেন। পঞ্চম হিজরি শতাব্দির মধ্যভাগ পর্যন্ত রাষ্ট্র কোনো শিক্ষকের বেতন দিয়েছে—আমরা শুনতে পাইনি। রাষ্ট্র শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেনি, এমনকি খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও নয়।
মসজিদের ইলমি মজলিসে বসার বয়স
দশোর্ধ্ব বয়সের ছেলেদেরকেই মসজিকেন্দ্রিক ইলমি মজলিসে বসার সুযোগ দেয়া হতো। কারণ এই বয়সের কম হলে তারা মসজিদের পবিত্রতার প্রতি অতটা যত্নবান হয়ে উঠতো না। শৈশবে একেজনের শিক্ষাটা শুরু হতো একেক প্রতিষ্ঠানে। কেউ ভর্তি হতো নির্দিষ্ট গ্রামের মকতবে, কেউ কোনো শিক্ষকের বাড়িতে অথবা ইসলমি শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে। ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর একটি উক্তি থেকেও বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘আমি যখন ইমাম মালেক রহ. এর নিকট মুয়াত্তা পড়ার জন্য এলাম, তখন আমার বয়স ১২। তিনি আমাকে তখনও ছোট মনে করেছিলেন।’ বারো বছর বয়সের মধ্যেই শাফেয়ি রহ. কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছিলেন। তার সঙ্গে বিভিন্ন কিতাবও পড়েছিলেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, ‘আমি সতেরো বছর বয়সে হাদীস পড়েছি।’ কুরআন হিফজ, নাহু, আরবিতে পোক্ততা অর্জনের পর এই বয়সটিই হাদীস অর্জনের উপযুক্ত বয়স। প্রসিদ্ধ নাহুবিদ আলেম আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে যায়েদ বলেছেন, ‘আমি দুইশ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেছি। আরবি শিখতে শুরু করেছি দুইশ ষোল হিজরিতে। ইমাম ফাররা রহ.কে পড়তে শুরু করি ১৮ বছর বয়সে। পঁচিশ বছর বয়সে আমি ফাররা রহ. এর প্রত্যেকটি মাসআলা মুখস্থ সম্পন্ন করেছি।’
এ থেকে প্রতীয়মান হয়—মসজিদের ইলমি মজলিসে ছাত্রদের বসার বয়স বারো থেকে বিশের মধ্যে থাকতো। তবে নির্দিষ্ট বয়সের কম হলেও প্রতিভা এবং মেধার জোরে অনেক অল্প বয়সীরাও বসার সুযোগ পেতো। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মজলিসে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন ছোট বয়সেই। তবে উল্টোটাও হতো। অনেকে বড় হয়েও ইলম শিখতে শুরু করতো। যেমন ইমাম কাসাঈ রহ. নাহু শিখেছিলেন বড় হয়ে।
মকতব : শিশুশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র
শিশুদের শিক্ষা দেয়া শুরু হতো তাদের মুখে বোল ফোটলেই। তারা কথা শিখতো ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’ বলে। তাদের বয়স যখন ছয় বছর হতো, তাদেরকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হতো প্রাথমিক মকতবে। এই মকতব বসতো মসজিদে কিংবা কোনো খোলামেলা জায়গায়। এখানে পড়ানো হতো বিনামূল্যে। তবে বিনামূল্যের মকতবগুলোতে অধিকহারে আসতো নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা। যারা উচ্চবিত্ত পরিবারের, তাদের ছেলেদের জন্য ঘরে রাখা হতো বিশেষ শিক্ষক।
প্রাথমিক ক্লাসে শিশুদেরকে হাতের লেখা, কুরআন পাঠ এবং নাহুর প্রারম্ভিক বিষয়গুলো শেখানো হতো। এগুলো শিখে ফেললে এরপর তারা কবিতা এবং হাদীস শুনতো। তাদের কেউ কেউ বিশেষ বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করতো। দ্বীনি বিষয়, ভাষা-সাহিত্য কিংবা ইলমি কোনো বিষয়ে। কেউ কেউ একাধিক বিষয়েও পাণ্ডিত্য অর্জন করতো। এভাবে তাদের জন্য উন্মুক্ত হতো উচ্চশিক্ষার পথ।
মুহাদ্দিস এবং ফকিহগণ শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি এবং মানদণ্ড ধরতেন—কুরআন শিক্ষাকে। কোনো ইলমি মজলিসে বসার প্রধান শর্ত ছিলো কুরআন পড়তে পারা। আওযায়ি রহ. তার দরসে কোনো কিশোরকে দেখতে পেলে জিজ্ঞেস করলেন, হে ছেলে, তুমি কুরআন পড়তে পারো? যদি সে ‘হা’ বলতো, তিনি তার পরীক্ষা নিতেন। যদি দেখতেন কুরআন পড়তে পারে না, তাকে বলতেন, আগে কুরআন শেখো। তারপর ইলম শিখতে এসো।
মকতবে কে কতদিন পড়বে, তা নির্ভর করতো শিশুর মেধা এবং যোগ্যতার উপর। যে যত তাড়াতাড়ি পরবর্তী স্তরে যাবার জন্য যোগ্য হতো, তত তাড়াতাড়ি মকতব থেকে ইলমি মজলিসে গিয়ে যোগ দিতো। তবে বইপত্র থেকে জানা যায়, শিশুরা যখন বালেগ হবার বয়সে পৌঁছে যেতো, তারা মকতব ত্যাগ করতো। এই বয়সটা বারো থেকে পনেরো বছরের মধ্যবর্তী বয়স।
মকতবে সপ্তাহে সাড়ে পাঁচদিন পূর্ণাঙ্গ পড়ানো হতো। শনিবার, রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার এবং বৃহস্পতিবারের সকাল। অর্থাৎ বৃহস্পতিবারে অর্ধেক বেলা পড়ানো হতো। শুক্রবার দেয়া হতো অবকাশ যাপনের জন্য। এছাড়াও ঈদুল ফিতরের সময় তিনদিন, ঈদুল আজহার সময় পাঁচদিন এবং দরকারি আনুষঙ্গিক ছুটি দেয়া হতো।
মকতবের উন্নয়ন ও বিকাশ
মানুষ যখন তাদের বাচ্চাদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে শুরু করে, রাষ্ট্রও যখন জনসাধারণের শিক্ষা বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠে, তখন মকতবের ব্যবস্থাপনা আরও বিকশিত এবং সংগঠিত হয়। উমাইয়া আমল থেকে মকতবের শিক্ষক দু’ভাগে বিভক্ত ছিলেন। এক—সাধারণ মকতবের শিক্ষক। তারা মধ্যবিত্ত এবং কৃষ্ণাঙ্গদের শিক্ষায় গুরুত্ব দিতেন। দুই—উচ্চবিত্ত, আমির-উমারা এবং ধনাঢ্য পরিবারের ছেলেদের শিক্ষক। এই শিক্ষকদের বলা হতো ‘মুআদ্দিব’। তারা বাচ্চাদেরকে বয়স অনুযায়ী শিক্ষা দিতেন। বাচ্চাদের মনোজগত এবং আখলাক উন্নত করার প্রতি জোর দিতেন।
চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর পূর্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো না। ছিল কেবল এই মকতবগুলোই। ছাত্ররা পড়াশুনা করতো আমির-উমারা এবং দানশীলদের বৃত্তিতে। যে আলিম বিশিষ্ট পদাধিকারী ফকিহ হতেন না, তিনি জীবিকা নির্বাহের টাকা পেতেন না। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে অনুলিপির কাজ করতে হতো। চতুর্থ শতাব্দীর বড় একজন দার্শনিক ছিলেন আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে আদ্দি। তিনি অনুলিপি করার কাজ করতেন। তিনি তাফসিরে তাবারি নিজ হাতে অনুলিপি করেছিলেন দু’বার। প্রতিদিন তিনি একশ পৃষ্ঠা অনুলিপি করতেন।
মকতব থেকে দারুল উলুম
চতুর্থ হিজরি শতাব্দির সূচনালগ্ন থেকেই মকতব থেকে দারুল উলুমের যাত্রা শুরু হয়। পরিভাষায় দারুল উলুম বলা হয়—ছাত্রদের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি স্থান, যেখানে ছাত্ররা শিক্ষার্জন করে। প্রাথমিকভাবে ছোট ছোট ঘরে শুরু হয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম। পরে তা বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু শুরু হওয়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ছোট ঘরগুলোই আজকের বড় বড় মাদরাসার সূচনাপর্ব।
আবুল কাসেম জাফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হামদান মুসিলি শাফেয়ি (মৃ:৩২৩হি/৯৩৫ খৃ) মসুলে একটি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ছাত্রদের চাহিদা অনুযায়ী সব বিষয়ের কিতাবই তিনি সেখানে রেখেছিলেন। যার ইচ্ছে, সেই ঢুকতে পারতো। কাউকে বাধা দেয়া হতো না। ইবনে হামদান সেখানে বসতেন। তার সামনে মানুষ জড়ো হতো। তিনি তাদেরকে নিজের কবিতা এবং অন্যদের কবিতা লেখাতেন। তারপর চিত্তাকর্ষক ঘটনা, ফিকহের কিছু অংশ লেখাতেন।
আযদুদ দাওলা আল বুওয়াইহির সহচর আবু আলী ইবনে সাওওয়ার কাতিব (মৃ:৩৭২হি/৯৮২খৃ) আরব সাগরের তীরে রামাহুরমুজ শহরে একটি ‘দারে কুতুব’ তথা পুস্তক ঘর বানিয়েছিলেন। তিনি বসরায়ও একটি ‘দারে কুতুব’ গড়ে তুলেছিলেন। যারা এখানে পড়াশুনা এবং অনুলিপি করার প্রয়োজনে আসতো, তিনি তাদেরকে সংগঠিত করেছিলেন। এখানে একজন বৃদ্ধ শায়খ মু’তাজিলাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইলমুল কালাম পড়াতেন।
৩৮৩ হিজরিতে বনি বুওয়াইহের মন্ত্রী আবু নসর সাবুর বিন আরদশির একটি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পশ্চিম বাগদাদের কারখ এলাকায়। তিনি যত কিতাব কিনেছিলেন এবং সংগ্রহ করেছিলেন, তা সব এনে এখানে তুলেছিলেন। উৎকৃষ্ট অনুলিপিকারদের হাতে করা কুরআনের একশটি অনুলিপি ছিল এই দারুল উলুমে। এছাড়াও আরও চৌদ্দশ পাণ্ডুলিপি ছিলো, যেগুলো অধিকাংশই লিখিত হয়েছিল পাণ্ডুলিপির মালিকদের হাতে। প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের মালিকাধীন কিতাবও ছিল এখানে।
দারুল উলুমের প্রচলন সত্ত্বেও মকতবের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। এখনো শিশুদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মকতবই প্রধান অবলম্বন। এখনো ইয়ামান, মৌরিতানিয়াসহ আরবের বিভিন্ন দেশে আগের মতোই সচল রয়েছে মকতব। বাংলাদেশেও শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান ও প্রাথমিক কেন্দ্র মকতব। মকতব থেকেই শুরু হয় ধর্মীয় শিক্ষার প্রথম পাঠ। এই পাঠ চুকিয়ে কেউ প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসায় ভর্তি হয়, কেউ ভর্তি হয় স্কুল-কলেজে। যে যেখানেই যাক, মকতবের শিক্ষা প্রোথিত থাকে তার অস্তিত্বের গভীরে।
The post মাদরাসা ব্যবস্থার সূচনা : মক্তব থেকে দারুল উলুম appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%82%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be/
No comments:
Post a Comment