Friday, August 7, 2020

ময়মনসিংহে শোকের মাতম, মিনি কক্সবাজারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

রাকিবুল হাসান:

নেত্রকোনার মদনে ইঞ্জিনচালিত নৌকাডুবির ঘটনায় স্বজনহারাদের শোকের মাতম চলছে ময়মনসিংহ সদরের চরাঞ্চল কোনাপাড়া ও চর খরিচা গ্রামে। বুধবার (৫ আগষ্ট) নেত্রকোনার মদনের হাওরে ঘটে যাওয়া এই ট্র্যাজেডিতে কোনাপাড়া গ্রামের একই পরিবারের আট সদস্যসহ প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন। তাদের মধ্যে ১৬ জনই ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের ভবানীপুর, কোনাপাড়া, খরিচা ও গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা। অপর দুজন গৌরীপুর উপজেলার।

নিহতরা হলেন- মাদ্রাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহর মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান (৪৫), তার দুই ছেলে হাফেজ মাহবুবুর রহমান আসিফ (১৫) ও মাহমুদুর রহমান (১২), ভাগ্নে রেজাউল করিম (১৫), ভাতিজা জোবায়ের (২০) ও জোনায়েদ (১৭), ভাতিজি লুবনা (১৩) ও জুলফা (৭), চরখরিচা গ্রামের কৃষক ইসা মিয়া (৪০) ও তার ছেলে শামীম (১০), কোনাপাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক আজাহারুল ইসলাম (৩৮), হামিদুল (৩৫), সাইফুল ইসলাম রতন (৩০) ও জহিরুল ইসলাম (৩৫), চরগোবিন্দপুরের তালেব মেম্বারের ছেলে শহিদুল (৪০) এবং গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে শফিকুর রহমান (৪০) ও তার ছেলে সামাআন (১০), রাকিব (২০)।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার তেলিখালি মাদ্রাসা পরিচালক মাওলানা শফিকুর রহমানের আমন্ত্রণে ৩৮ জনের একটি বহর নিয়ে আনন্দ ভ্রমণে বের হন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের মাদ্রাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ মাদ্রাসার প্রধান মাওলানা মাহফুজুর রহমান। উদ্দেশ্য মিনি কক্সবাজার খ্যাত নেত্রকোনার উচিতপুর হাওর। বুধবার সকাল ৭টার দিকে কোনাপাড়া ও চরখরিচা থেকে তাদের বহনকারী ট্রলারটি রওয়ানা হয়। মদন উপজেলার উচিতপুর পৌঁছে সেখানকার নৌঘাট ছেড়ে যাওয়ার কিছু পরেই হাওরে ডুবে যায় তাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি। খবর পেয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। একে একে উদ্ধার হয় ১৮টি মরদেহ।

লেখক ও শিক্ষক মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহ বলেন, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের ভবানীপুর কোনাপাড়া, খরিচা ও গোবিন্দপুর গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের ছেলে-মেয়ে এখানে গড়ে উঠা কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতি বছরেই মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আনন্দ ভ্রমণে বের হন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও মেতে ওঠেন আনন্দ-উল্লাসে। প্রতিবছরের ন্যায় এবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে নেত্রকোনার মদন উপজেলার মিনি কক্সবাজার খ্যাত উচিতপুর হাওরে ঘুরতে যান মাওলানা মাহফুজুর রহমান। বলতে গেলে তিনি একজন সাংগঠনিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন হাফেজদের সমন্বয়ক। তাই সবাইকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাওয়া।

মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহ আরও বলেন, ‘মূলত ভ্রমণটি ছিল তার পারিবারিক। এখানে তার পরিবারের ৯জন সদস্য ছিল। তার মধ্যে আটজনই মারা গেছেন। পাশের বাড়ির মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা আজাহার আলী ও তার ব্যবসায়ী ভাতিজা জাহিদও এই নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন।’

নৌকাটি কিভাবে ডুবলো

অনেকেই বলছেন, অতিরিক্ত যাত্রী উঠায় এবং প্রচণ্ড ঢেউ ও বাতাসের কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনাটি ঘটে। তবে কোনাপাড়ার এক ট্রলার চালক আরজ আলী ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘অধিকাংশ যাত্রীই ট্রলারের ছাদে ছিলেন। নিচে কমই ছিলেন। ফলে প্রথমবার ঢেউ লাগার কারণে নৌকাটি কাত হয়ে যায়। দ্বিতীয় ঢেউয়ে নৌকাটি উল্টে যায়।’

লেখক ও শিক্ষক মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহ বলেন, ‘তারা যেহেতু চরাঞ্চলের মানুষ, প্রায় সবাই সাতার জানতো। মাওলানা মাহফুজও সাতার জানতেন। কিন্তু দুর্ঘটনায় সেই সাতার কাজে লাগেনি তার।’

শোকের মাতম

শোকের মাতম চলছে নিহতদের পরিবারে। স্বজনহারাদের চিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। যারা নিহত হয়েছেন, তারা অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি।

মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মাওলানা মাহফুজ একজন মধ্যবিত্ত মানুষ। তার দুই ছেলেসহ তিনি নিহত হয়েছেন। তার পরিবারের ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে, তা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। আমি তার বাসায় গিয়েছি। এখন কবর যিয়ারত করতে যাচ্ছি। মাওলানা মাহফুজ ছিলেন এ অঞ্চলে মেয়ে হাফেজা গড়ার কারিগর। তার মাদরাসায় দুই শতাধিক মেয়ে হেফজ সম্পন্ন করেছে। তিনি ছিলেন সামাজিক মানুষ। সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। প্রশাসনের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখতেন। তাকে হারিয়ে তার পরিবার, ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শোকের মাতম চলছে।’

মাওলানা মাহফুজুর রহমানের পাশের বাড়ির মাওলানা আজাহার আলী ও তার ব্যবসায়ী ভাতিজা জাহিদও এই নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন। মাওলানা আজাহার আলীর স্ত্রী মমেনা খাতুন আহাজারি আর বিলাপ করতে করতে বলেন, একমাত্র মেয়েকে হাফেজা বানাতে চেয়েছিলেন। জমি-জিরাত তেমন একটা নেই। আমার স্বামীর মনের আশা কীভাবে পূরণ হবে এটা ভাবতে পারছি না।’

আজহারুল ইসলামের বৃদ্ধ বাবা বাছের উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার ছেলে মদনের তেলিখালি কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতো। মাসে এক-দুইবার ছুটিতে বাড়িতে আসতো। ঈদের ছুটিতে এসে তার ভাতিজা জাহের ও এলাকার মাদ্রাসা শিক্ষকসহ অন্যদের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিল মদনে। পারিবারিক জমি খুব একটা নেই। ছেলের আয়েই তাদের সংসার চলতো। ছেলের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ও নাতির ভরণ পোষণ করা নিয়ে চিন্তিত তিনি।

ময়মনসিংহবাসীর প্রতিক্রিয়া 

ঘটনাটি মেনে নিতে পারছেন না ময়মনসিংহের অধিবাসীরা। তারা দূর থেকে ছুটে আসছেন নিহতদের কবর যিয়ারত করতে। মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহর সঙ্গে যখন কথা হয়, তিনিও আরও কয়েকজনের সঙ্গে কবর যিয়ারত করতে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, ‘ময়মনসিংহের অধিবাসীরা মাওলানা মাহফুজকে দোষারোপ করছেন না। বরং এখানে অনেকটা দোষ নৌঘাট কর্তৃপক্ষেরও। মিনি কক্সবাজার খ্যাত এত বড় একটা পর্যটন এলাকা, কিন্তু সুন্দর কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। লাইফ জ্যাকেট, নিরাপত্তা সাপোর্ট কিছুই নেই। তাই সবাই নিহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। কবর যিয়ারত করতে আসছেন।’

স্থানীয় মাদরাসা ছাত্র আমজাদ ইউনুস বলেন, ‘নিহত ১৮ জনের মধ্যে একই পরিবারের ৮ জন! ভাবতে গেলেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি। এখানে কেউ ছাত্র, কেউ শিক্ষক, কেউ মুহতামিম। এখন আমাদের নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে।’

The post ময়মনসিংহে শোকের মাতম, মিনি কক্সবাজারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a7%9f%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%82%e0%a6%b9%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a8/

No comments:

Post a Comment