জুনায়েদ ইশতিয়াক:
“এই পৃথিবীতে মুসতানসেরিয়ার মত কোন মাদরাসা নেই। আল্লাহ মুসতানসেরিয়া মাদরাসায় দান করেছেন অভূতপূর্ণ চিত্র, বিস্তৃতি, অত্যাধুনিক ভবন, সাজসজ্জা, ফুকাহায়ে কেরামের আধিক্য আর জ্ঞানের বাহার।”— ঐতিহাসিক ইবনে আবরী
চতুর্থ হিজরীতে নিজামুল মুলক তুসীর তত্ত্বাবধানে অনেক মাদরাসা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাঁর পূর্বেও কিছু মাদরাসা তৈরি হয়েছে। সেগুলো ছিল বড় বড় ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে। যেমন, বাইহাকী, ইসফারায়েনী, ইবনে ফাউরাক বাস্তি প্রমুখ। নিজামুল মুলক তুসী অনেকটা এই ধারায়ই চলেছেন। অর্থাৎ ব্যক্তিত্ব ও মাযহাবভিত্তিক মাদরাসা তৈরি করেছেন। কিন্তু তিনি মাদরাসার গঠনের মধ্যে বিস্তৃতি এনেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে সমাজের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন রাষ্ট্রকে। নিজামুল মুলকের পরবর্তী পর্যায়ে মাদরাসা নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানের খুবই গুরুত্ব দেয়া হতো। নির্বাচন করা হতো উৎকৃষ্ট ও নিরাপদ স্থান। তেমনিভাবে জ্ঞান, নৈতিকতা ও উচ্চ দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন আলেমদেরকে নিয়োগ দেয়া হতো মাদরাসাতে।
মাদরাসা নির্মাণের ধারা
লক্ষণীয় বিষয় হল, যখন মাদরাসাগুলোর সূচনা হচ্ছে, তখন চলছিল প্রতাপশালী বিভিন্ন সুলতানদের শাসন, যারা ইসলামী ও আরবী সভ্যতা, সংস্কৃতিকে নতুন যুগের প্রেক্ষাপটে সাজিয়ে নিচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, নিজামুল মুলক, সেলজুক মন্ত্রী মালিকশাহ, সুলতান নুরুদ্দীন মাহমুদ—যিনি তার সাম্রাজ্যের অধীনে শামের সকল মাদরাসাকে পুনর্গঠন করছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে আলেম ও ফকিহগণকে এনে তিনি নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন শিক্ষক সংঘ।
নুরুদ্দিন যখন দামেশকে প্রবেশ করেন, তখন সেখানে প্রায় এগারটির মত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেখতে পান। সবগুলোই ছিল ওয়াকফকৃত জমির উপর নির্মিত। এগুলো কোন রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির অধীনে ছিল না। তার শাসনক্ষমতা শেষ হওয়ার সময় দেখা গেল দামেশকে বাইশটির মতো মাদরাসা তৈরি হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে শিয়া অধ্যুষিত ও শাসনকৃত হালব অঞ্চলে মাদরাসা ছিল তখন মাত্র আটটি।
১০৭৬ ঈ. থেকে নিয়ে ১১৫৪ ঈ. পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, কতটা দ্রুততার সাথে মাদরাসার বৃদ্ধি ও বিস্তৃতি ঘটেছে। নুর উদ্দিন মাহমুদ দামেশকে প্রবেশ করেছিলেন ৫৪৯ হি. সালে। এই শহরের পতন ঘটে মঙ্গোলিয়ান সৈন্যদের হাতে ৬৫৭ হি. সালে। এই এক শতকের মাঝে প্রায় একশত দশটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রায় প্রত্যেক বছর একটি করে মাদরাসা নির্মাণ করা হয়। এর মাধ্যমেই সংস্কৃতি ও সভ্যতাগত দিক থেকে মুসলমানরা অগ্রগতি লাভ করতে থাকে। কারণ তখনকার এক একটি মাদ্রাসাই বর্তমানের শতেক মাদ্রাসার চেয়ে উন্নত ও অগ্রসর ছিল, পড়ালেখা, পাঠদান ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে।
এসব মাদরাসায় শিক্ষা প্রদান করা হতো বিনামূল্যে। শিক্ষক ও ছাত্ররা মাসিক ভাতা ও হাত খরচ পেতেন সরকারিভাবে, কখনো আবার বিভিন্ন সদকা, দান-খয়রাত থেকে। তখন কিতাবের থেকে শিক্ষকের মূল্য ছিল অনেক বেশি। কিতাবের থেকে যতটা উদ্ধৃতি দেয়া হতো, এর চেয়ে বেশি উদ্বৃতি উল্লেখ করা হতো শিক্ষকের পক্ষ থেকে। ছাত্ররা এক শিক্ষক থেকে আরেক শিক্ষকের কাছে এলেম অর্জনের জন্য ঘুরতে ফিরতে থাকতেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য ছাত্ররা বিভিন্ন দূরের অঞ্চলে চলে যেতেন। যেমন মক্কা, বাগদাদ, দেমাশক, কায়রো প্রভৃতি।
ইসলামিক জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তৃতির অন্যতম কারণ হলো আরবি ভাষা। হেজাজের আশেপাশের অনেক অঞ্চলে আরবি ভাষাই প্রচলিত ছিল। এছাড়া জ্ঞানী ব্যক্তিরা সাধারণত আরবি ভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা প্রদান করতেন। এজন্যই ভাষাগত দিক থেকে ছাত্রদের কখনোই সংকটে পড়তে হয়নি।
সেই যুগের নথিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজের মধ্য থেকে যেগুলো ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে, সেগুলো থেকে স্পষ্টত বোঝা যায়, এসব মাদরাসার পরিচালনায় যেসব আলেম ও শায়েখ থাকতেন, তাদের যথেষ্ট মর্যাদা ছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। আর প্রধান শায়খ নির্ধারণ করা হতো সাধারণত ইলমের দিক থেকে অগ্রগণ্যদেরকে। উদাহরণস্বরূপ, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর লেখক ইমাদ উদ্দিন ইস্পাহানির অনুমোদন ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে হানাফী মাযহাবের প্রায় বারোটি মাদরাসার ওপর পরিচালকের দায়িত্ব প্রদান করা হয় আল্লামা আলাউদ্দিন কাসানী হানাফীকে।
সরকারি নথিপত্রের এক জায়গায় তার নামের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে অনেকগুলি লকব। সেখানে আছে, “শাইখ ইমাম আলেম আলাউদ্দিন আবু বকর বিন মাসুদ বিন মুহাম্মদ আল-কাসানি, আল্লাহ তাকে দীর্ঘজীবী করুন। বিস্তৃত জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অকাট্য যুক্তির সমাবেশ ঘটেছে তার মাঝে। তার জ্ঞানের সীমা সাগরের মত বিশাল, বৃষ্টির মতো অনবরত ঝরে পড়ে। এই যুগে মানুষ তার কাছেই এসে ভিড় করে। পৃথিবীতে ফতোয়ার কলম এখন তার হাতে। তিনি অনবরত আপন কথা ও লেখার মাধ্যমে ফিকহকে আমাদের কাছে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি মাযহাবের ভিতরকার ইখতিলাফগুলো উঠিয়ে দিতে চান। তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও উত্তম গুণাবলীর অধিকারী। তিনি নিজে অনবরত যেমনভাবে শিখে যাচ্ছেন, তেমনিভাবে ছাত্রদেরকে প্রদান করছেন ইলমের অমিয় সুধা।” তার ব্যাপারে উল্লেখিত এই সব গুণাবলীর দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, এসব মাদরাসার পরিচালক নিয়োগ দেয়া হতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে। এবং তাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হতো।
এসব মাদরাসার নির্মাতা ও পরিচালকরা শিক্ষকদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বেশ কিছু শর্ত রেখেছিলেন। এসব শর্তে উত্তীর্ণ হলে তবেই তাকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হতো। শর্তগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো—
১. শিক্ষকদের দায়িত্ব নেয়ার জন্য সর্বপ্রথম শর্ত ছিল, একাডেমিক শিক্ষাকাল শেষ করতে হবে।
২. তার এলেম, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পারঙ্গমতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে হবে তার কয়েকজন শিক্ষকের।
৩. তিনি শুধু পাঠদানের জন্যই উৎসর্গিত থাকবেন। এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের সাথে অন্য কোনো বহিরাগত কাজকর্মে জড়াবেন না।
৪. তবে, সে যদি ওয়াকফকৃত সম্পত্তি বা মাদরাসার সরকারি ভাতা থেকে নিজের প্রয়োজনের বেতন নিতে রাজি না হয়, তাহলে তার জন্য অবকাশ রয়েছে, সম্মানজনক কিছু কাজে অংশগ্রহণ করা। যেন তার প্রয়োজন মিটে যায়।
৫. কোন ছাত্রের যদি মেধা কম থাকে, বোধগম্যতার ঘাটতি থাকে, তবুও তার শিক্ষাপ্রদান থেকে তিনি বিরত হবেন না, যদি বুঝতে পারেন তাঁর কোনো না কোনো সম্ভাবনা আছে।
৬. নিয়মিত দরস শেষ করে অথবা পরের দরসের শুরুতে, ছাত্রদেরকে পাঠকৃত বিষয়ে প্রশ্ন করবেন। যেন তাদের বোধগম্যতা মাত্রা বুঝতে পারেন।
৭. যদি দেখেন, তারা উত্তমভাবে দরস আয়ত্ব করেনি, অথবা বুঝতে পারেনি পড়া, তাহলে তাদেরকে দ্বিতীয়বার বুঝিয়ে দিবেন।
এরকম আরো কিছু শর্ত আরোপ করা হতো। এখান থেকে শিক্ষার মান ও অগ্রগতি বুঝে আসে।
এসব মাদরাসার উপর খলিফা ও সুলতানদের অনেক অনুগ্রহ ছিল। তারা প্রায়ই মাদরাসার ভিতরগত পড়ালেখার অবস্থা ও বহিরাগত কাঠামো পরিদর্শন করতে আসতেন। ৫৮০ হি.তে আব্বাসী খলিফা নাসির লি-দীনিল্লাহ বাগদাদের মাদরাসায়ে নিজামিয়া পরিদর্শন করতে আসেন। এসে দেখেন বিভিন্ন ভবনের ভঙ্গুর অবস্থা। তৎক্ষণাৎ তিনি মাদরাসার পুনঃনির্মাণের ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি থেকে খরচ করতে থাকেন মাদরাসা নির্মাণের পেছনে। অনেক শ্রমিককে কাজে লাগিয়ে দেন।
বাগদাদে মাদরাসার মুকুট: মুসতানসেরিয়া
আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদের শেষ দিকে, মঙ্গলিয়ান আক্রমণের প্রায় দুই যুগ আগে—সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতো মাদরাসায়ে মুসতানসেরিয়া। এই মাদরাসা তৈরি করেছেন মুসতানসের বিন জহির (শাসনকাল: ৬২৩ হি. – ৬৪০ হি./ ১২২৬ ই. – ১২৪২ ই.)। এটা ছিল ইসলামী ইতিহাসের সর্বপ্রথম ব্যাপকতর আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। এখানে একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান যেমন ছিল, তেমনিভাবে—নিজামিয়া মাদরাসার মত শুধু শাফেয়ী মাযহাবের নয়—চার মাযহাবের ফিকহের উপরেই শিক্ষা প্রদান করা হতো। এখানে শিক্ষা দেয়া হতো—কুরআন, হাদিস, চার মাযহাবের ফিকহ, আরবি ভাষাতত্ত্ব, গণিতশাস্ত্র, সম্পত্তি বন্টন, প্রাণীর উপকারিতা, চিকিৎসাশাস্ত্র, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, দেহবিদ্যা ইত্যাদি। এর আগে কখনোই এতগুলো জ্ঞানের সমাহার একটি মাদরাসার সীমানায় পরিলক্ষিত হয়নি।
খলিফা মুস্তানসির মাদরাসাটি নির্মাণ করেছেন ৬২৫ হি. থেকে নিয়ে শুরু করে ৬৩১ হি.এর মধ্যবর্তী সময়ে। ফিকহ, চিকিৎসা, কোরআন সংক্রান্ত জ্ঞান ও হাদিস সংক্রান্ত জ্ঞান— প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে চারটি ভবন নির্মাণ করেছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে সায়ী বলেছেন, এর আগে কোন মাদরাসায় প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য আলাদাভাবে ভবন নির্মাণের রীতি ছিল না। সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে হয়তো একই ভবনে দুটির দরস অনুষ্ঠিত হতো অথবা দুটির জন্য আলাদা মাদরাসা নির্মাণ করা হতো। কিন্তু একই মাদরাসার অধীনে চিকিৎসা ও ফিকহের সমন্বয় কখনো দেখা যায়নি। দ্বীনের শিক্ষার জন্য ছিল ধর্মীয় মাদরাসা। আর চিকিৎসা শিক্ষার জন্য ছিল আদুদী বিমারিস্তান, দামেস্কের চিকিৎসালয়, আবু মুজাফফর বাতেকিন প্রতিষ্ঠিত বসরার চিকিৎসালয় প্রভৃতি।
মুসতানসেরিয়া মাদরাসার প্রায় আড়াই শতক পূর্বে মাদরাসাব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু এই মাদরাসার মাধ্যমে মাদরাসার কাঠামোগত দিক নতুন মোড় নেয়। এর কাঠামো ও শিক্ষা পদ্ধতির অনুসরণ করতে থাকে পরবর্তী মাদরাসাগুলো। এর পরবর্তী মাদরাসাগুলোতেও চার মাযহাবের ফিকহ, চিকিৎসা, কোরআন ও হাদিসের বিদ্যা একত্রে শিক্ষাদানকার্য প্রচলিত হয়। এমনকি এই মাদরাসার বাহ্যিক প্রকৌশল শিল্প ও কাঠামো দ্বারাও পরবর্তী মাদরাসাগুলো প্রভাবিত হয়।
এই মাদরাসার নির্মাণ কাঠামো এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন অনেক ঐতিহাসিক। তার মধ্যে অন্যতম ইবনে আবরী (৬৮৫ হি.)। তিনি বলেছেন, “এই পৃথিবীতে মুসতানসেরিয়ার মত কোন মাদরাসা নেই। আল্লাহ মুসতানসেরিয়া মাদরাসায় দান করেছেন অভূতপূর্ণ চিত্র, বিস্তৃতি, অত্যাধুনিক ভবন, সাজসজ্জা, ফুকাহায়ে কেরামের আধিক্য আর জ্ঞানের বাহার। এখানে রয়েছে চারটি মাযহাবের সমন্বয়। প্রত্যেক মাযহাবের উপর ৭৫ জনের মত ফকিহ এ মাদরাসায় অবস্থান করতেন। অর্থাৎ পুরো মাদরাসায় প্রায় তিনশজনের মতো ফকিহ থাকতেন। তারা অবশ্য শিক্ষকতা করতেন না। তারা ছিলেন ছাত্র। আর চার মাযহাবের উপর চারজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হতো। প্রত্যেক ফকিহ ছাত্র ও শিক্ষকের জন্য উন্নত খাবার ও থাকার ব্যবস্থা ছিল। চিকিৎসকদের জন্য আলাদা, এবং ফকিহদের জন্য ভিন্ন গোসল করার ব্যবস্থা ছিল। ছাত্রদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের জন্য একটি স্থান নির্ধারিত ছিল। অন্যদিকে ওষুধ, প্রতিষেধকের জন্য আরেকটি বড় রুম ছিল।”
ইবনে বতুতা মাদরাসা পরিদর্শন করতে এসেছিলেন ৭২৭ হি./ ১৩২৬ হি.তে। তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন এ মাদরাসা সম্পর্কে, সেখান থেকে বোঝা যায়, তখনকার যুগে এই মাদরাসার ভিতরগত কাঠামো অনেক উন্নত ছিল। ইবনে বতুতা বলেছেন, “এখানে রয়েছে চার মাযহাব। প্রত্যেক মাযহাবের জন্য রয়েছে আলাদা ভবন ও ব্যক্তিত্ব। এখানে রয়েছে মসজিদ এবং দরসগাহ। শিক্ষকদের জন্য আছে আরামদায়ক কেদারা। এখানে গাম্ভীর্য ও প্রতাপের সাথে শিক্ষকগণ উপবেশন করেন। তার মাথায় থাকে পাগড়ী। গায়ে কালো জামা। তার ডান পাশে ও বাম পাশে থাকে দুইজন স্টাফ। তিনি যে বাক্যটি বলেন, সেটা তারা জোরে উচ্চারণ করে সারা মজলিসে ছড়িয়ে দেয়।”
ইরাকের খ্রিস্টান ঐতিহাসিক কর্কিস আওয়াদ (১৩২৬ হি – ১৪১৩ হি / ১৯০৮ – ১৯৯২ খ্রি) এই মাদরাসার অভ্যন্তরীণ রুমগুলো নিয়ে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি বলেছেন, “মাদরাসারটি ছিল দ্বিতল বিশিষ্ট। এখানে বড় ছোট মাঝারি মিলিয়ে প্রায় একশটির মত ঘর ছিল। প্রত্যেক তলায় প্রায় চল্লিশটির মত ছোট ঘর ছিল।” তাছাড়া এই মাদরাসার পাশে খলিফা মুসতানসির একটা বাগান নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে ছাত্ররা বিকেলে মাঝে মাঝে ঘোরাঘুরি করতো। খলিফা নিজেও মাঝে মাঝে এখানে আসতেন। বাগানে বসে দূরে থেকে ছাত্রদের পড়ালেখার দৃশ্য অবলোকন করতেন।
এই মাদরাসা ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লব আনয়ন করতে পেরেছিল, যখন মুসলমানরা ক্রমশ পতনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। মঙ্গোলিয়ান সৈন্যরা দাঁড়িয়ে ছিল ইরাকের দরজায়। আর ক্রুসেডাররা অপেক্ষা করছিল সিরিয়ার সাগর সীমান্তে। আসন্ন ক্ষতির কথা চিন্তা করেই খলিফা মুসতানসির তার মৃত্যুর পরও যেন মাদরাসার নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, তাই অনেক জমি ওয়াকফ করে গিয়েছেন। ইমাম যাহাবী এ সম্পর্কে বলেছেন, “তিনি মাদরাসার জন্য যে জমি ওয়াকফ করে গিয়েছিলেন, সেটার মূল্য হবে প্রায় এক মিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রার সমান।” এই ওয়াকফকৃত জমি থেকে প্রত্যেক বছর মাদরাসার জন্য সত্তর হাজার স্বর্ণমূদ্রা আয় হতো। এখান থেকে বোঝা যায়, এই মাদরাসায় শিক্ষার কতটা উন্নতি ও অগ্রগতি হয়েছিল।
কয়েক শতক পর্যন্ত শিক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছে এই মাদরাসা। এই মাদরাসায় যোগ্য ফকিহ ও শিক্ষকদেরকে পাঠদানের কাজে নিযুক্ত করা হতো। সপ্তম এবং অষ্টম—এই দুই শতাব্দীব্যাপী এই মাদরাসায় মাত্র ১২০ আলেমের চেয়ে বেশি শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পরে। শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো কখনোই উদ্দেশ্য ছিল না এ মাদরাসার। তাদেরকেই কেবল নিয়োগ দেয়া হতো, যারা ছিলেন এলমের ক্ষেত্রে আপন যুগের অনন্য ব্যক্তিত্ব। সে যুগে সারাবিশ্বে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে এই মাদরাসার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
The post মাদরাসার ক্রমবিকাশ : নেজামিয়া থেকে মুসতানসেরিয়া appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%be/
No comments:
Post a Comment