Saturday, April 10, 2021

৩১ মার্চ

আহমাদ সাব্বির :

প্রতিদিন আমরা খাটো থেকে আরও খাটো হচ্ছি।
প্রতিদিন আরশোলার সংখ্যা বাড়ছে।
দেয়ালে শ্যাওলা পড়ছে প্রতিদিন।
ক্যালেন্ডার খসে পড়ছে।
নখ বাড়ছে ভয়াবহভাবে।
দাঁত ক্রমেই তীক্ষ্ণ হয়ে পড়ছে।
পায়ের নখ এখন ক্রমেই নেকড়ের নখরের মতো হয়ে উঠছে।
–সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ (১৯৩৩-৯৮)

এক

শাহরিয়ার একটা লাল রঙের ডায়েরি রাখতো। মাহফুজ ভাই যখন খুঁটে খুঁটে তার প্রতিটি ব্যবহার্য সিএনজিতে তুলছেন: শাহরিয়ারের বিছানা পত্র, পারটেক্স বোর্ডের সেল্ফ, ঘন নীল রঙের প্লাস্টিক হ্যাঙার, শাহরিয়ারের বই পত্তর, ছোট্ট কাঠের টেবিল, আমি তখন এক ফাঁকে চট করে তার লাল ডায়েরিটা সরিয়ে রাখি। মনে পড়ে—আমাকে সে নিয়মিত প্ররোচিত করতো ডায়েরি লিখার জন্য। আমি কখনও গা করিনি। ভাবতাম—ডায়েরি লেখা তো লেখক কিংবা লেখক-পরিচয়-প্রত্যাশী লোকেদের কর্ম। আমার মতোন আটপৌরে সাদামাটা যাপিত জীবন যাদের রোজকার খাতার পৃষ্ঠায় কী আর লিখে রাখবে তারা? কী আর লিখে রাখবার মতোন থাকতে পারে তাদের? কখনও ভাবিনি—আমিও শাহরিয়ারের মতোই টকটকে লাল মলাটের কোনো ডায়েরি কিনব! অতঃপর তার ঘন ঘিয়ে রঙা পৃষ্ঠা জুড়ে সাজিয়ে যাবো হরফের পর হরফ। কোনো মৃত্যুই কি তবে সাদামাটা আটপৌরে জীবনকে বদলে দেয়!

মাহফুজ ভাই শাহরিয়ারের স্মৃতি সমস্ত নিয়ে চলে গেলে আমি রুমে ফিরে শাহরিয়ারের ডায়েরিটা খুলে বসি। আমি বিস্মৃত হই না—দুই রাত পরই আমার পরীক্ষা। বিগত দিনগুলোর অযাচিত হাঙ্গামার তোড়ে ভেসে গেছে পরীক্ষার তাবৎ প্রস্তুতি। এও বিস্মৃত হই না যে, পরীক্ষাটি আমার জীবদ্দশার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। পরিবার ও আমার প্রতিষ্ঠানের সবার নজর আমার দিকে। কিছু একটা সম্মানজনক অবস্থান পেতেই হবে আমাকে পরীক্ষার পরিণতিতে। সবার সম্মান যেন ঝুলে আছে আমারই কর্মের রশিতে। কিন্তু সেই সাথে আমি ভুলে থাকতে পারি না—শাহরিয়ারের মুখখানা। ভুলে থাকতে পারি না—আরও আরও কিশোর-তরুণের রক্তাপ্লুত স্কেচ। কোনো ভয়-শঙ্কা-চোখ রাঙানি বহু মানুষকে, অসংখ্য তারুণ্যকে তাদের বিপ্লব ভুলিয়ে দিতে পারেনি—এটাই বা আমি ভুলে থাকি কেমন করে‍! অতঃপর এই আমি সব ভুলে ডুবে থাকি শাহরিয়ারের লাল টকটকে ডায়েরির মুক্তোর মতোন হরফের অরণ্যে।

দুই

”বিপ্লব বলে-কয়ে আসে না। সে হঠাৎই দুয়ারে এসে দাঁড়ায়। তারপর করাঘাত করে বলে—খোলো, আমি এসেছি।”

ডায়েরির কয়েক পাতা ওল্টাতেই বাক্যটি পেয়ে যাই। উদ্ধৃত চিহ্নের ব্যবহারে শাহরিয়ার উক্তিটি, হ্যাঁ, উক্তিই আমি বলবো, লিখে রেখেছে। গোটা এক পৃষ্ঠায় কেবল এই একটিই বাক্য। উদ্ধৃত চিহ্ন দেখে ভ্রম হয়—এ বুঝি অন্য কারুর কথা। শাহরিয়ার সংরক্ষণের আশায় টুকে রেখেছে। কিন্তু আমি জানি—এ ছিল তার এক কৌশল। নিজেরই কথা সে অনেকখানে লিখে রাখতো উদ্ধৃতি চিহ্নের আশ্রয়ে। এসব ক্ষেত্রে শাহরিয়ারের মধ্যে কেমন একটা ঘর পালানো ছেলে মানুষি ভাব লক্ষ্য করতাম। অনেকের বইয়ের শুরুতে, কারুর বা খাতার মলাটে স্বরচিত পংক্তি টুকে রাখতো শাহরিয়ার; না, ছদ্মনামেও নয়। অমনই, ইনভারটেড কমার মধ্যিখানে। আমার মনে পড়ে—একবার আমাকে একটা বই উপহার দিয়েছিলো শাহরিয়ার ‘তাহাদের পদচিহ্ন ধরে’ নামে। যদিও বইটির এক পৃষ্ঠাও উল্টে দেখার সুযোগ হয়নি আমার। আমার ক্যরিয়ার-স্বপ্ন আমাকে অবকাশ দেয়নি কখনও মুহূর্তেরও জন্য পাঠ্যবই থেকে মুখ তুলে আশপাশের অন্য কোনো বইয়ের পাতায় ‘ঠোঁট ডুবাবার’। তবে প্রচ্ছদ উল্টে দেখে নিয়েছিলাম শাহরিয়ারের লিখিত শুভেচ্ছা বার্তাখানা। এমনই এক উদ্ধৃত চিহ্নের মাঝখানে গোটা গোটা সবুজ হরফে শাহরিয়ার লিখেছিলো “তারাদের মৃত্যু নেই”। হঠাৎই প্রশ্ন ভাসে মনে—শাহরিয়ার কি তারাদের দলভুক্ত কেউ!

তিন

একটা ভিনদেশী শকুন, যার চঞ্চুতে কেবল রক্তের দাগ, সে আমাদের শান্তিপুর গ্রামে আসতে চাইছে। এটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে! অলুক্ষণে শকুনের ছায়া পড়বে আমার গ্রামের মাটিতে, তার ডানার গন্ধ মিশে যাবে শান্তিপুরের জলো-হাওয়ায়—তা কী করে হতে দেয়া যায়!

এটা একটা গল্প কিংবা গল্পের শুরু বোধহয়। শাহরিয়ার তার গল্প উপন্যাসের প্লটও অনেক সময় প্রাথমিকভাবে লিখে রাখতো তার এই লাল ডায়েরিতে। এমন সব গল্প কখনও তাকে লিখে উঠতে দেখলে ভীষণ ভয়ে পেয়ে বসতো আমাকে। ও বিন্দুমাত্র ঘাবড়াতো না। উৎকণ্ঠা বলতে কিছু ছিলো না তার স্বভাবে। আমার নিষেধ শুনে সে হো হো হাসির হল্লা ছুটাতো কেবল।

মৃত্য নাকি ভীষণ ভয়ঙ্কর! সেই মৃত্যুর মুখোমুখী হলো যখন তখন একটি বারের জন্যও কি কেঁপে উঠেছিলো শাহরিয়ারের ভেতর-বাহির! নাকি অমনই হাসি মুখ করে সে বলে উঠতে পেরেছিলো—মৃত্য, তোমাকে জানাই অভিবাদন!

চার

ডায়েরিতে টুকে রাখা শাহরিয়ারের আরেকটি উদ্ধৃতি আপনাদের পড়ে শোনাই—

“রাজার হাতে ছুরি। তিনি বলেন—তোমাকে খুন করবো। তার চোখ হিংস্র, মুখে ক্রুদ্ধতা।
রাজার হাতে ছুরি। তিনি বলেন—তোমাকে খুন করবো। তার চোখ স্বাভাবিক। মুখে মৃদু হাসি।
কোন ভঙ্গিটা বেশি ভয়াবহ?”

উদ্ধৃতিটা শেষ হয়েছে একটা প্রশ্ন দিয়ে। এবং লক্ষ্য করি—প্রশ্নটা আমার চেনা মনে হতে থাকে। আগে শুনেছি—এমন বোধ হয়।

আমি শাহরিয়ারের উদ্ধৃত কথাটার দিকে আরেকবার চোখ বুলাই। আর তখনই অকস্মাৎ আমার মনে পড়ে যায় যে, প্রশ্ন সমেত এ সম্পূর্ণ বক্তব্যটি আমার চেনা। জনৈক বিখ্যাত লেখকের কোনো এক গল্প থেকে টুকলিফাই করা। গল্পটি শাহরিয়ার পড়ে শুনিয়েছিলো আমাকে। এবং প্রশ্নটিও। তবে মনে নেই কী উত্তর দিয়েছিলাম সেদিন এই প্রশ্নের কিংবা আদৌ কোনো জবাব দিয়েছিলাম কিনা! ওর এমন সব উদ্ভট প্রশ্ন সাবধানে এড়িয়ে যাওয়া ছিলো আমার স্বভাব। হয়তোবা সেদিনও এড়িয়ে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ে—সেই বক্তব্যটিই টুকে রেখেছে শাহরিয়ার। খুব যত্ন করে। তবে এও খেয়াল করি যে, কথাটা ঈষৎ পরিবর্তিত। শাহরিয়ার এমন করতো। বিশেষত তার প্রিয় লেখকের বেশ কিছু বাক্য সে খানিক পরিবর্তন করে নিজের করে নিত। বলতো—সাহিত্যে নাকি এসব চলে। একজন লেখক কিংবা কবির কলম থেকে উদ্গত যে বাক্য কিংবা পংক্তিমালা তা একবার জন্মাবার পর নাকি আর কারুর মালিকানাধীন থাকে না। তখন তা সবার এজমালি।

সাহিত্যের এসব ব্যাপার-স্যাপার আমার মাথায় ধরে না। তার চেয়ে বরং প্রশ্নটার দিকে তাকানো যাক: রাজার কোন ভঙ্গিটা বেশি ভয়াবহ?

উত্তর নিয়ে ভাববার পূর্বে শাহরিয়ার নির্দেশিত এই রাজাকে নিয়েই ভাবিত হয়ে পড়ি আজ। আমার মনে হতে থাকে—কবির পংক্তির মতো এই রাজা সবার এজমালি নয়। শাহরিয়ার কিংবা শাহরিয়ার-প্রতীম কারুর জন্যে তারা নয়৷ আমার অবাক লাগে—একজন রাজা, সে কবির পংক্তির মতোও অতোটা এজমালি হতে পারে না! কেন পারে না!

পাঁচ

আরেকখানে শাহরিয়ার লিখেছে—
আব্বার সাথে আজ কথা বললাম। তার স্বর কেমন অস্পষ্ট শোনাচ্ছিলো। এবার বাড়ি থেকে ফিরবার সময় দেখেছিলাম—তার পুরোনো জীর্ণ মোবাইল ফোনটা আরও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। খসে পড়ছে মোবাইলের গা থেকে তার ফ্যাকাসে আস্তর। মাইক্রোফোনের যে ফুটো তা ভরে উঠেছে জমাটবাঁধা ধুলোর স্তুপে। ইয়ারফোনও বোধহয় বিকল-প্রায়। যখনই আব্বাকে মোবাইলে পাবার চেষ্টা করি অধিকাংশ সময়ই বন্ধ পাই। ব্যাটারির আয়ুও হয়তোবা আব্বার মতোই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আব্বাকে একটা নতুন মোবাইল কিনে দিতে পারলে বেশ হতো!

আমি জানি—শাহরিয়ার তার টিউশানির টাকা বাঁচিয়ে চলছিলো নতুন একটা মোবাইল সেট কিনবে বলে। এবং মৃত্যুর দিন দুয়েক আগে নাসিমকে সাথে করে ঝকঝকে একটা ফোন কিনেও এনেছিলো সে তার আব্বার জন্য। নকিয়া ১০৬। বয়স্কদের জন্য আলাদা করে বানানো। ফোনটা কিনতে পেরে তার সে কি উচ্ছ্বাস! এই প্রথম আব্বাকে সে কিছু দিচ্ছে! বারবার আমাকে ও তার কাছের অন্য বন্ধুদের বলছিলো সে কথা। ছেলে তার উপার্জন থেকে যখন বাবাকে কিছু দিতে পারে সে আনন্দ কেমন হয় তা আমি দেখে নিয়েছিলাম শাহরিয়ারের উচ্ছ্বসিত চোখের জানালা দিয়ে। কিন্তু সে আনন্দ আব্বার চোখে চোখ রেখে দেখে যাওয়া হলো না কেবল শাহরিয়ারের।

ছয়

শাহরিয়ার বলতো—প্রতিদিন আমরা খাটো থেকে আরও খাটো হয়ে চলেছি। এতোটাই খাটো, ক্ষমতাবান কারুর বুকের সমানে রাখতে পারি না আমাদের বুক। চোখের সমানে স্থির করে উঠতে পারি না আমাদের চোখ। চোখ তুলে তাদের কারুর দিকে চাইলে মনে হয় যেনবা আসমান-পানে মুখ করে চেয়ে আছি। খাটো হতে হতে খোসা ছাড়ানো বাদামের মতোন ছোট হয়ে এসেছে আমাদের পাজর-বদ্ধ ফুসফুস। কেন যেন আজ অনুভব হচ্ছে শাহরিয়ার ঠিক বলতো৷ বুকের দেয়ালে আমাদের এতটাই শ্যাওলা জমেছে যে, বন্ধুর মৃত্যুর বৃত্তান্ত একান্ত ডায়েরির পাতায় লিখে উঠবো বলে বসেও শেষমেষ আর সাহসে কুলোয় না। ক্ষণে ক্ষণে মনে হয়—এক জোড়া শীতল চোখ নিঃশ্বাস ফেলছে আমার কাঁধের ওপর। আর কার ভয়ে যেন ইরেজার নিয়ে বসছি বারেবার, পেন্সিলে আঁকা বিপ্লব-গাঁথা নিজ হাতেই ফের মিটিয়ে দেবার জন্যে।

বছর সাতেক আগেকার অন্ধকার এক রাতে পঙ্গু হওয়া শাহরিয়ারের আব্বা হুইল চেয়ারে বসে মৃত ছেলের কিনে দেয়া নকিয়া ১০৬ বুকে চেপে বলছিলেন—তার ছেলে মরেনি। নক্ষত্রের মৃত্যু নেই। মাঝেমধ্যে কালো কালো মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে যায় কেবল। প্রবল দমকা হাওয়ার তোড়ে সরে যায় যখন সেই কালো মেঘ নক্ষত্রেরা ফের হেসে ওঠে আপন প্রোজ্জ্বলতায়। শাহরিয়ারের পঙ্গু আব্বা যখন এইসব কথা বলছিলেন, বিশেষত ওই নক্ষত্র, মেঘ আর ঝড়ের কথা—কেমন কাব্যিক শোনাচ্ছিলো। পুত্রহারা পিতার ছন্দোবদ্ধ প্রলাপের বেশি সেগুলোকে আর কিছুই মনে হয়নি আমার। তখন তেমন মনে না হলেও এখন এই ডায়েরি লিখতে বসে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে—শাহরিয়ার মরেনি। আসহাবে কাহাফের সাত যুবকের মতোন কোনো গুহাভ্যন্তরে ঘুমিয়ে আছে সে কতিপয় যুবক পরিবেষ্টিত হয়ে। তিন, চার, পাঁচ শতক কিংবা তারও অধিককাল পর ফিরে আসবে তারা এক নতুন পৃথিবীতে।

ততদিনে লাল ডায়েরির পাতায় পাতায় আমাকেই, আমাদেরকেই লিখে যেতে হবে অনাগত সেই নতুন পৃথিবীর ভবিতব্য।

The post ৩১ মার্চ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a7%a9%e0%a7%a7-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9a/

No comments:

Post a Comment