Friday, August 13, 2021

বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্য

মাহতাব জামিল:

কারবালা-কেন্দ্রিক শোকগাঁথার অপর নাম মর্সিয়া সাহিত্য। আরবি ‘মর্সিয়া’ শব্দের অর্থ শোক। শোকবিষয়ক রচনাকে মর্সিয়া সাহিত্য বলা হয়। মোগল শাসনামলের (১৫৭৫-১৭৫৭ খ্রি.) আগেই বাংলা সাহিত্যে মর্সিয়ার উদ্ভব হলেও মোগল শাসনামলে তা ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে। বিশিষ্ট মর্সিয়া সাহিত্য গবেষক ড. গোলাম সাকলায়েন মোগল শাসনামলকে বাংলা মর্সিয়া সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম মর্সিয়া কাব্য ধরা হয় ‘জয়নবের চৌতিশা’ (১৫৪৫ খ্রি.)। এ কাব্যের লেখক শেখ ফয়জুল্লাহ। এ কাব্যে শেখ ফয়জুল্লাহ ইমাম হোসেনের নির্মম শাহাদতবরণ ও কারবালার করুণ কাহিনী চিত্রিত করেছেন। তারই পথ ধরে কারবালার ঐতিহাসিক বিয়োগান্ত করুণ কাহিনী অবলম্বনে চট্টগ্রামের অধিবাসী কবি দৌলত উজির বহরম খান জঙ্গনামা রচনা করেছেন। ফারসি ‘জঙ্গ’ শব্দের অর্থ যুদ্ধ, আর ‘জঙ্গনামা’ শব্দের অর্থ তদ্বিষয়ক গ্রন্থ বা রচনা। বিশেষত হযরত মুহম্মাদ সা. ও তাঁর স্বজনদের যুদ্ধই এ শ্রেণীর কাব্যের মূল বিষয়। বাংলায় ইংরেজ শাসনামলে কারবালার মর্মান্তিক যুদ্ধকাহিনী নিয়ে ‘জঙ্গনামা’ (১৭৯৪ খ্রি.) নামে মর্সিয়া রচনা করেছেন ফকির গরীবুল্লাহও।

তার কয়েকটি চরণ:

‘হোসেন বলেন বিবি কান্দিও না আর
আমা বাদে ভালো হবে তোমা সবাকার
শহর বানু বলে কি যে হবে আর
না রাখিলে মোর বংশ এজিদে কুফ্ফার
আপনি চলিলা ফের করিতে লড়াই
কুফরে সুপিয়া যাও কি হবে ভালাই
এমাম বলেন বিবি না কান্দিও আর
রদ না হইবে কভু কলম আল্লার
ঘিরিয়া রাখিল কুফার পানি বন্ধ করে
পানি পানি করে যত সব গেলো মরে
তোমরা মরিছ সবে পানির লাগিয়া
মেরাও জিও পানি বিনে যায় নেকালিয়া
আজ কাল-ই পানি বিনে মরিব নিশ্চয়
লড়িয়া মরিলে নাম রবে দুনিয়ায়।’

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মর্সিয়া কাব্য মক্তুল হোসেন। এ কাব্যের রচয়িতা চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার জোবরা গ্রামের অধিবাসী মুহম্মদ খান (১৫৮০-১৬২০ খ্রি.)। এ কাব্যটি ফারসি কাব্য মক্তুল হোসেন এর ভাবানুবাদ হলেও এতে কবির নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও কল্পনার প্রাধান্য আছে। কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন নির্মমভাবে শহীদ হলে কী করুণ অবস্থা হয়েছিল কবি কল্পনায় তা বর্ণিত হয়েছে এভাবে:

স্বর্গমর্ত্য পাতালে উঠিল হাহাকার।
কান্দন্ত ফিরিস্তা সব গগন মাঝার ॥
বিলাপন্ত যতেক গন্ধর্ব বিদ্যাধর।
অর্শিকুর্সি লওহ আদি কাঁপে থরথর ॥
অষ্ট স্বর্গবাসী যত করন্ত বিলাপ।
এ সপ্ত আকাশ হৈল লোহিত বরণ।
কম্পমান সূর্য দেখি হোসেন নিধন।
ক্ষীণ হৈল নিশাপতি আমীরের শোকে ॥
মঙ্গল অরুণ বর্ণ রক্ত মাখি মুখে।
বুধে বুদ্ধি হারাইল গুরুএড়ে জ্ঞান ॥
শুনি কালা বস্ত্র পিন্ধে পাই অপমান।
জোহরা নত্র কান্দে তেজি নাট গীত।
ফাতেমা জোহরা কান্দে শোকে বিষাদিত।
সমুদ্রে উঠিল ঢেউ পরশ আকাশ।
কম্পিত পর্বত ছাড়ে সঘন নিঃশ্বাস ॥

কারবালার কাহিনী অবলম্বনে খ্রিষ্টীয় ১৭ শতকের শেষ দিকে ‘কাসেমের লড়াই’ রচনা করেছেন শেখ শেরবাজ চৌধুরী। এ কাব্যের মূল বিষয়বস্তু কাশেম ও সখিনার বিবাহ প্রসঙ্গ এবং কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন ও কাশেমের শৌর্য-বীর্য এবং তাঁদের শাহাদত বরণের ঘটনা। ১৮ শতকের কবি জাফর কারবালার মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে রচনা করেন ‘শহীদ-ই-কারবালা ও সখিনার বিলাপ’। ১৮ শতকের প্রধান কবি রংপুরের ঝাড়বিশিলা গ্রামের হেয়াত মামুদ রচনা করেন জঙ্গনামা (১৭২৩ খ্রি.)। বিষ প্রয়োগে হজরত হাসান হত্যার পরিকল্পনা, কারবালার শুষ্ক মরুপ্রান্তরে তৃষ্ণাকাতর ইমাম হোসেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড, হোসেনের পুত্র কাশেম-সখিনার বিবাহ, কাশেম হত্যাকাণ্ড এবং কাশেমের স্ত্রী সখিনার অকাল বৈধব্য ইত্যাদি নির্মম কাহিনী হেয়াত মাহমুদের জঙ্গনামার মূল উপজীব্য। আঠারো শতকের বাংলা মর্সিয়া সাহিত্য ধারার অপর একজন কবি হামিদ। তিনিও মুহম্মদ খান ও হেয়াত মাহমুদের মতো কারবালার ঐতিহাসিক মর্মান্তিক ঘটনা অবলম্বনে রচনা করেন ‘সংগ্রাম হুসন’ (১৭৪০ খ্রি.)।

উনিশ শতকে মুহম্মদ হামিদুল্লাহ খান রচনা করেন ‘ গুলজার-ই-শাহাদৎ’। কবি মীর মনোহার রচনা করেন ‘হানিফার লড়াই’ (১৮৮৬ খ্রি.)। সুনামগঞ্জের ওয়াহেদ আলী রচনা করেন ‘বড় জঙ্গনামা’। এ কাব্যের অনেকাংশে ফকীর গরীবুল্লাহর জঙ্গনামা কাব্যের হুবহু মিল পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার বালিয়া পরগনার আলী রচনা করেন ‘শহীদ-ই-কারবালা’ নামের এক বৃহৎ কাব্যগ্রন্থ। শহীদ-ই-কারবালা নামের অপর এক গ্রন্থ রচনা করেন মুহম্মদ মুনশী। ঢাকা জেলার অধিবাসী মুন্সি তাজউদ্দীন প্রমুখ মর্সিয়া সাহিত্য রচনা করেন। বাংলা মর্সিয়া সাহিত্যের এ ধারা বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বর্তমান ছিল। এ শতকের প্রথম দিকেই সা‘দ আলী ও আব্দুল ওয়াহাব যৌথভাবে রচনা করেন শহীদ-ই-কারবালা। এতে মুহম্মদ মুনশীর শহীদ-ই-কারবালা-এর কাহিনী ও ভাষা নকল করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. গোলাম সাকলায়েন।

ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্য প্রাচীন ধারা থেকে আধুনিক ধারায় রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ গদ্য রীতি শুরু হয়। এ রূপান্তরিত আধুনিক যুগের ধারাতেও মর্সিয়া সাহিত্য রচিত হয়। মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু এ ধারার শ্রেষ্ঠ মর্সিয়া রচনা বলা যায়।

এ ছাড়া আবুল আলী মোহাম্মদ হামিদ আলীর কাসেম বধ কাব্য (১৯০৬ খ্রি.) ও জয়নাল উদ্ধার (১৯০৯ খ্রি.), মোহাম্মদ উদ্দীন আহমদের মোহররম কাব্য (১৯১২ খ্রি.), মোহাম্মদ আব্দুল বারীর কারবালা (১৯১৩ খ্রি.), কবি কাজেম আল কোরাইশী ওরফে কায়কোবাদ রচিত মহরম শরীফ, ফজলুর রহিম চৌধুরীর মহরম চিত্র (১৯১৭ খ্রি.), গোলাম সাকলায়েনের কারবালার কাহিনী, কাজী আমিনুল হকের জঙ্গে কারবালা (১৯৪৫ খ্রি.) মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর কারবালার যুদ্ধ ও নবী বংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭ খ্রি.) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিশ শতকের শেষার্ধে মর্সিয়া কাব্যগ্রন্থ রচিত না হলেও এ সময় কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণে কাজী নজরুল ইসলামসহ আধুনিক সাহিত্যিকরা অনেক কবিতা, গান, প্রবন্ধ রচনা করেছেন।

কবি কায়কোবাদ লিখেন:

‘এই কি কারবালা সেই! এই সেই স্থান!
এই সেই মহামরু হেরিলে যাহারে
অশ্রু ঝরে দু’নয়নে কেঁদে ওঠে প্রাণ
যত কথা মনে পড়ে শিরায় শিরায়
প্রচ- অনল শ্রোত হয় প্রবাহিত
প্রাণের নিভৃত কক্ষে হৃদয় কন্দরে
কি যে এক শোক স্মৃতি হয় উচ্ছ্বসিত
এই কি কারবালা সেই এই কি শ্মশান
যাহার বালুকা রাশি সিন্দুরের মতো-
হয়েছিলো সুরঞ্জিত হোসেন-শোণিতে।’

কবি শাহাদাত হোসেন লিখেন:

‘এই সেই মহররম সেদিনের সেই গম
ভুলেছো কি মুসলিম? দ্বীন তব ইসলাম।’
তিনি আরো লিখেন,
‘রুদ্র দুপুর চলে আফতাব শিরে গলে
ছুটে জ্বালা চৌদিকে ইঙ্গিত মৃত্যুর
কোনখানে নাহি চিন পানি এক বিন্দুর
মরু বালু ঝলকায়
উন্মনা ছুটে চলে বাতাসের হল্কায়
নাই পানি, নাই ছায়া জ্বল জ্বল মরুকায়া
কারবালা প্রান্তর ঝাঁ ঝাঁ করে চৌদিক
শান্তির রেখা নাই সান্ত¡না মৌখিক
হাহাকার! হাহাকার!!
আজ বুঝি দুনিয়ায় জাগিয়াছে মহামার
লাও পানি জান যায় ছাতি কাঁপে পাঞ্জায়
কাতরায় পানি বিনে আজি তারা শাহারায়
কলিজার টুকরা সে সন্তান একপাশে
জবে করা কবুতর ছটফটি মরে হায়
ফাটে শোকে মার প্রাণ দাও পানি ছেলে যায়
দিল বুকে জনকের
ফিরো এলো কোলে শিশু বুকে তীর জহরের…’
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী লিখেন,
‘দুরাত্মা শিমর পাপী সহসা যাইয়া
বসিলেক বক্ষে চাপি নয়ন উন্মীলি
হেরিলা রাজর্ষি বর নির্ম্মম মুরতি
শিমর বসেছে বক্ষে শিরচ্ছেদ তরে
কাতরে কহিলা বীর ‘ওরে রে শিমর
আজী পুণ্য জুম্মাবার মধ্যাহ্ন নামাজ
পরিবার অবসর দে রে কিছুক্ষণ।’

মহররম ও কারবালা নিয়ে নজরুল ইসলামের অনেক কবিতা আছে। তার মধ্যে মহররম একটি। সেখানে তিনি লিখেছেন:

‘ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ
এসেছে এজিদী বিদ্বেষ পূনঃ মোহরমের চাঁদ
এক ধর্ম এক জাতি তবু ক্ষুধিত সর্বনেশে
তখতের লোভে এসেছে এজিদ কমবখতের বেশে
এসেছে সীমার এসছে ‘কুফার’ বিশ্বাসঘাতকতা
ত্যাগের ধর্মে এনেছে লোভের প্রবল নির্মমতা
মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ
কাঁদে আসমান জমিন কাঁদিছে মহররমের চাঁদ
একদিকে মাতা ফাতেমার বীর দুলাল হোসেনী সেনা
আরদিকে যত তখত বিলাসী লোভী এজিদের কেনা
মাঝে বহিতেছে শান্তিপ্রবাহ পূর্ণ ফোরাত নদী
শান্তিবারিতে তৃষাতুর মোরা ওরা থাকে তাহা রোধি
একদিকে নবী পরিবার ওরা কেবলি শান্তিব্রতী
আর একদিকে স্বার্থান্বেষী হিংসুক ক্রোধমতি
এই দুনিয়ার মৃত্তিকা ছিলো তখত যে খলিফার
ভেঙে দিয়েছিলো স্বর্ণসিংহানের যে অধিকার
মদগর্ব্বী ও ভোগী বর্বর এজিদী ধর্ম্মী যত
যুগে যুগে সেই সাম্য ধর্মে করিতে চেয়েছে হত
এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন
আলীর সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান
এই এজিদেও সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায়
হাসান হোসেনে গালি দিতে যেতো মক্কা ও মদিনায়
এরাই আত্ম প্রতিষ্ঠা লোভে মসজিদে মসজিদে
বক্তৃতা দিয়ে জাগাত ঈর্ষা হায় স্বজাতির হৃদে
ঐক্য যে ইসলামের লক্ষ্য এরা তাহা দেয় ভেঙে
ফোরাত নদীর কুল যুগে যুগে রক্তে উঠেছে রেঙে-
এই ভোগীদের জুলুমে। ইহারা এজীদী মুসলমান
এরা ইসলামী সাম্যবাদের করিয়াছে খান খান
এক বিন্দুও প্রেম অমৃত নাই ইহাদের বুকে
শিশু আজগরে তীর হেনে হাসে পিশাচের মত সুখে
সার্বজনিন ভ্রাতৃত্ব ইসলামের সাম্যবাদ
যুগে যুগে এই অসুর সেনারা করিয়াছে বরবাদ।’

নজরুল ইসলামের আরেকটি পঙক্তি দিয়ে শেষ করছি লেখা। তিনি লিখেছেন:

‘মোহররমের চাঁদ এলো ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়
ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়।’

The post বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্য appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af/

No comments:

Post a Comment