মুজিব হাসান:
আমাদের হাওর এলাকায় বর্ষাকাল শুরু হয় সময়ের একটু আগে, জষ্টি মাসের মাঝামাঝিতে। কোনো বছর বর্ষা আসে ঠিক সময়ে—আষাঢ় মাসে, আবার কোনো বছর এসে যায় সময়ের অনেক আগে—বোশেখ মাসের মাঝামাঝি এবং শেষের দিকে। তা যেভাবেই আসুক, বর্ষার মরসুমটি কিন্তু হাওর এলাকার জনজীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। কারণ শুকনা আর বর্ষা—হাওরের ঋতু হিসেবে এই দুটিকেই ধরা হয়। শুকনা মরসুমে দিগন্তবিসারী ফসলি মাঠের দোলায়িত সবুজের সঙ্গে হাওরবাসীর সম্পর্ক বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ। অন্যদিকে বর্ষার সময়টায় জলের কাছে জীবনকে ইজারা দিয়েও উত্তাল হাওরের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেতে হয় সংগ্রাম।
বর্ষাকালকে এলাকার ভাষায় আমরা বলি ‘হাইন্নে মাস’ (পানির মাস)। আমার ফেলে আসা জলশৈশবের পুরোটা জুড়ে আছে এই ‘হাইন্নে মাসে’র স্মৃতি। হাওরের মাঝখানে দ্বীপের মতো ভাসমান যে গ্রামটিতে আমার জন্ম, এই গ্রামের ধরন ছিল লম্বা একটা পাড়ার মতো; এক পাড়ায় এক গ্রাম—যেনবা চিলতে করে কাটা একফালি পাকা পেঁপে, যার পেটের আঁশের সঙ্গে লেগে আছে একরাশ ঘনকালো বিচি; এরকমই সারি সারি টিনের ঘর, হলুদ গম্বুজের মতো খড়ের পালুই, বাড়ির সামনে দুয়েকটা আকাশমুখী নারকেল গাছ, লাউ, কুমড়া ও শিমের মাচান, বাড়ির পেছনে বিচিকলার ঝোঁপ, ঢোলকলমির ঝাড় আর উঠানের কোণে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, বরই প্রভৃতি দেশীয় ফলদ গাছের সমাহার নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রাম শিকুলবাঁক। এই গ্রামকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে আমার জলশৈশবের স্মৃতিপুরাণ।
তখন বোশেখের ধানমাড়াই শেষ। খোলায় পড়ে আছে তুষের স্তূপ আর খড়ের পালুই। গেরস্তের গোলায় উঠে গেছে সোনার ফসল; সারাবছরের খোরাকি মজুদ। ধানকাম থেকে আজাড় হয়ে দুয়েকদিনের জিরানো, তারপরই খড়ের পালুই (আমরা বলি ‘খেড়ের লাছি বা ‘বনের পুঞ্জি’) তোলা নিয়ে বাড়ি বাড়ি শুরু হতো উৎসবের আমেজ। বিশাল আয়োজনে মেহমানদারি হতো। আলুভাজি, মিষ্টি কুমড়ার সবজি, আলু বা কাঁঠাল বিচি সহযোগে রাজহাঁসের মাংস, পাতলা ডাল, গরু বা মহিষের দুধ ও সাগুদানা দিয়ে তৈরি পায়েস (আমরা বলি শাশ্নি)—গেরস্তের ‘পুঞ্জি তোলা’য় নিমন্ত্রিত, রবাহূত সবাই খেতে পারত এই খাবার। এরপর দিনপাঁচেকের জিরানো, ততদিনে ফসলহীন ন্যাড়া মাঠের দিগন্তরেখায় দেখা মিলত বর্ষার আবাহনী ঝলক। ভাসান পানির জোয়ারে ‘ধনু’ গাঙ ফুলেফেঁপে উঠত। সেই পানি ‘আগলপা’ বিল ছাপিয়ে ন্যাড়াবনে আচ্ছন্ন ধানখেত ডুবিয়ে ভিটেমাটি গ্রাস করার বুভুক্ষা নিয়ে এগিয়ে আসত গ্রামের দিকে। তখনই শুরু হতো ‘ঘায়েল বান্ধার দিন’—আসন্ন বর্ষার মুকাবিলা প্রস্তুতি, ষাণ্মাসিক সংগ্রামের বূহ্য রচনা।
উত্তাল হাওরের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের থাবা আর ভাসান পানির স্রোতের ধাক্কা থেকে ভিটেমাটিকে আগলে রাখার যে বন্দোবস্ত, হাওরের ভাষায় একেই বলে ‘ঘায়েল’। সাধারণত জষ্টি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হতো ঘায়েল বান্ধার দিন। ভাসান পানির স্রোত প্রচণ্ড বুভুক্ষা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত খোলায়। তখনই নড়ে উঠত গেরস্তদের টনক। জায়জিরানো ঝেড়ে ফেলে সবাই কর্মোদ্দমী হয়ে উঠত। দলে দলে ডিঙিনাওয়ের বহর নিয়ে যাত্রা করত ‘রাংসাবনে’র দিকে। গ্রাম থেকে অনেক দূরে, আগলপা বিল পেরিয়ে হাওরের মাঝখানে সারি সারি হিজল, করচ, বরুন গাছ আর নলখাগড়া, ছাইল্যা প্রভৃতি জলজ উদ্ভিদের ঝোপঝাড় নিয়ে বিশাল জায়গা জুড়ে সেই বন—গ্রামের দিকে সম্পৃক্ত করে আমরা ডাকি ‘শিমুলবাগের জঙলা’। ওই জঙলা থেকেই সংগ্রহ করা হতো ঘায়েল বান্ধার জলজ উপাদান ছাইল্যা আর বাঁশ কেনার জন্য যেতে হতো চৌগাংগার বাজারে।
জলশৈশবের এক উচ্ছলিত সকালে, আমরা নয়াপানিতে দাপাদাপি করে গোসল করায় মত্ত, দেখতে পেতাম সারি সারি ডিঙিনাওয়ের বহর রাংচাবনের দিকে হাল ধরেছে। নিজেদের বাপ-দাদা ও কাকা-ভাইদের দেখতে পেতাম ওই নৌকাগুলোতে—রাংচাবনে যাবে তারা। দেখে আবদেরে মন নিয়ে এগিয়ে যেতাম। নৌকায় উঠে গোঁ ধরে বসতাম, আমরাও সাথে যাব। বড়রা মানা করতেন, লোভ দেখাতেন : বকের ছানা, শালিকের ছানা, বালিহাঁসের ডিম এনে দেবেন। এই লোভে কেউ নিবৃত্ত হতাম, ফিরে যেতাম গোসলে; কেউ জিদ জিইয়ে বসে থাকতাম, আমি যাবই। বড়রা তখন ধাতানি দিতেন, ডরভয় দেখাতেন। এতকিছুর পরও যে বড়দের সাথে যেতে পারত, ও হতো সবচেয়ে ভাগ্যবান। নৌকার গলুইয়ে বসে আমাদের দিকে মুখ করে ও বিজয়ের হাসি হাসত। আমরা বোকার মতো ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থাকতাম আর ঈর্ষায় জ্বলতাম। মনে মনে ভাবতাম, ইশরে, ও জঙলায় গিয়ে কত মজাই না করবে! কত কত বক আর শালিকের ছানার পেছনে ছুট দেবে, বালিহাঁসের বাসা থেকে ডিম হাতড়াবে, তাজা খাগড়া চিবিয়ে রস খাবে; আমরা ওসবের কিচ্ছুটি করতে পারব না। এসব ভেবে একটু মনখারাপের মতো করে ফিরে যেতাম দাপাদাপির গোসলে। ডুবসাঁতার দিয়ে জলসেলাই খেলা খেলতে খেলতে মুহূর্তের মধ্যেই ভুলে যেতাম ওই মনোবেদনা।
পড়ন্ত বিকেলে নৌকাবোঝাই ছাইল্যা আর নলখগড়ার আঁটি নিয়ে ফিরে আসতেন তারা। আমরা খুশিতে ডগোমগো হয়ে তাদের বেড় দিয়ে দাঁড়াতাম। নৌকায় উঠে সবার আগে খোঁজ নিতাম—বক বা শালিখের ছানা এনেছে কি-না, বালিহাঁসের ডিম কই? ছোট কাকাকেই এই জিজ্ঞাসাটা করতাম বেশি। ছোট কাকা ভাতের বাসনের ভেতর থেকে দুটো ডিম আমার হাতে দিতেন। তখন হয়তো পাশের নৌকার কেউ একটি বকের ছানা বা শালিকের ছানা হাতে নিয়ে আনন্দে আটকানা হয়ে বাড়ির দিকে ছুট দিয়েছে। দেখে আমার একটু মনখারাপের মতো হতো। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ছোট কাকা সান্ত্বনা দিতেন, কয়েকদিন পরে আবার যাবেন, তখন একটি শালিকের ছানা, ছোট কাকার ভাষায় ‘শারর বাইচ্চে’—এনে দেবেন। এই সান্ত্বনাটুকুতেই পুলকিত হয়ে উঠত আমার বালকমন। হাসি হাসি মুখ করে দাদার কাছে এগিয়ে যেতাম। দাদা নৌকার গলুইয়ে নলের আঁটি নিয়ে বসেছিলেন। চাটি বানানোর জন্য এগুলো এনেছেন। কাছে যেতেই আমার হাতে দুটো খাগড়া ধরিয়ে দিতেন। কাকার দেওয়া ডিম আর দাদার দেওয়া খাগড়া নিয়ে খুশি মনে আমিও ছুট দিতাম বাড়ির দিকে।
ততদিনে ভাসান পানি স্রোত খোলা ডুবিয়ে বসতবাড়ির নামায় চলে এসেছে। জলহাওয়াময় এক সকালে শুরু হতো ঘায়েল বান্ধার কাজ। প্রথমে ভিটেমাটির নিচ থেকে লম্বালম্বিভাবে বাঁশ পুঁতা হতো, তারপর আড়াআড়ি বাঁশ ফেলে এর ফাঁকে ফাঁকে ঘন করে ঠেসে দেওয়া হতো ছাইল্যার আঁটি। স্রোতে ভাসা কচুরিপানা আর হাবিজাবি জলজ উদ্ভিদ জোগাড় করে ফেলা হতো সবার ওপরে। হয়ে যেত ঘায়েল—হাওরবাসীর বর্ষা মুকাবিলার শক্তিশালী প্রাচীর। এভাবেই শুরু হতো হাওরবাসীর ষাণ্মাসিক জলমহালের জীবন; যে জীবন পাখা মেলে হাওরের ঢেউ ছুঁয়ে উড়ে যায়, ডুবসাঁতার দিয়ে জলসেলাই খেলে—ক্ষণে ক্ষণে জাগিয়ে তুলে আশা ও আশঙ্কা ছোট কাকার ভাষায় ‘শারর বাইচ্চে’—এনে দেবেন। এই সান্ত্বনাটুকুতেই পুলকিত হয়ে উঠত আমার বালকমন। হাসি হাসি মুখ করে দাদার কাছে এগিয়ে যেতাম। দাদা নৌকার গলুইয়ে নলের আঁটি নিয়ে বসেছিলেন। চাটি বানানোর জন্য এগুলো এনেছেন। কাছে যেতেই আমার হাতে দুটো খাগড়া ধরিয়ে দিতেন। কাকার দেওয়া ডিম আর দাদার দেওয়া খাগড়া নিয়ে খুশি মনে আমিও ছুট দিতাম বাড়ির দিকে।
ততদিনে ভাসান পানি স্রোত খোলা ডুবিয়ে বসতবাড়ির নামায় চলে এসেছে। জলহাওয়াময় এক সকালে শুরু হতো ঘায়েল বান্ধার কাজ। প্রথমে ভিটেমাটির নিচ থেকে লম্বালম্বিভাবে বাঁশ পুঁতা হতো, তারপর আড়াআড়ি বাঁশ ফেলে এর ফাঁকে ফাঁকে ঘন করে ঠেসে দেওয়া হতো ছাইল্যার আঁটি। স্রোতে ভাসা কচুরিপানা আর হাবিজাবি জলজ উদ্ভিদ জোগাড় করে ফেলা হতো সবার ওপরে। হয়ে যেত ঘায়েল—হাওরবাসীর বর্ষা মুকাবিলার শক্তিশালী প্রাচীর। এভাবেই শুরু হতো হাওরবাসীর ষাণ্মাসিক জলমহালের জীবন; যে জীবন পাখা মেলে হাওরের ঢেউ ছুঁয়ে উড়ে যায়, ডুবসাঁতার দিয়ে জলসেলাই খেলে—ক্ষণে ক্ষণে জাগিয়ে তুলে আশা ও আশঙ্কা।
The post যে জীবন জলমহালের appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0/
No comments:
Post a Comment