Friday, October 15, 2021

ছায়া এবং অবয়ব

সালমান সাদিক:

১.
পাহাড়-পর্বত আর গিরিপথে ঘেরা এই এলাকাকে পাখির চোখে মনে হবে কোন সুন্দর মুখের বড় বড় পাকাব্রণ। উঁচুউঁচু পাহাড়ের মাঝের গিরিপথগুলোতে বছরের বেশিরভাগ সময় কুয়াশা জমে থাকে। সকালের আলো যেমন দেরীতে ফোটে তেমনি খুব আগে আগেই আঁধার নেমে আসে। দুইপাশের পাথুরে দেয়ালের ছায়ায় গিরিপথগুলো রহস্যময় দেখায়। আবার এলোমেলো গজিয়ে ওঠা গাছগুলো তাতে এক অপার্থিব ভৌতিক ছোঁয়া দেয়।

এই দুর্গম এলাকাতে মানুষের বসবাস কম। এখানে সজীবতা আছে। কিন্তু সেই সজীবতা সামান্য আবরণমাত্র।রুক্ষবন্ধুর ভূমি শুধু নরম চাদরে নিজেকে আড়াল করেছে। এখানে মানুষ বুকভরে শ্বাস নেয় বটে।কিন্তু তার পায়ের তলা সজীবকোমল সবুজকে ভেদ করে একটা সময় রুক্ষকঠিন প্রস্তরের স্পর্শ পায়। পায়ের পাতার চামড়া তাই ধীরেধীরে শক্ত ও খসখসে হয়ে যায়।

কুয়াশার খাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা রহস্য কখনো সবটুকু উন্মোচিত হয়না। মানুষ রহস্য উন্মোচন করতে চায়। চেষ্টা করে। কিন্তু তার চেষ্টা কখনো টপকে যেতে পারে না রহস্যকে। কারণ তাকে বুঝানো হয়েছে এবং দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। রহস্যের পেছনে চলতে চলতে রহস্য পাওয়াটাই স্রেফ অর্জন নয়, তা দেখিয়ে দেওয়া যায় না। আসলে রহস্যের পরে আর কিছু তো নেই।

চারিদিকে যখন আঁধার নামে তখন সেই আঁধারের কোল বেয়ে নেমে আসা জোনাক ক্ষুদ্রক্ষুদ্র আলোর কলি ফোটায়। সেই আলো শুধু চারপাশের আঁধারকেই গাঢ় করে না বরং সেই আলোতে ভ্রান্ত হয়ে কোন সুগভীর গহ্বরে পতিত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

ভোরের আলো ফুটতে থাকে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়। তারপর সেই আলোর প্লাবন চুইয়ে চুইয়ে গিরিপথগুলোকে আলোকিত করে।ছায়ারা রূপ নেয় ছায়ায়। অবয়বগুলো লুকোয় তখন অদৃশ্য কোন চাদরের ভাঁজে। কুয়াশার ঝাঁপসা পরিবেশে তারা উদাম গায়ে বেরহয়।সন্ধ্যার কুয়াশায় খুঁজতে থাকাঅবয়বগুলো জোনাকের সন্ধান দেয়। আর সেই জোনাকের আলোর ধোকায় খাঁদে পড়ে কঙ্কাল হয় বহুপ্রাণী।

ভোরের কুয়াশাতে অবয়ব আকৃতি নেয় ধীরেধীরে শক্ত আর বাস্তব কোন প্রাণে। আমাদেরকে দেখিয়ে দেওয়া রহস্য আমরা ভোরের কুয়াশাতে পাই না। আমরা চাই শেষ-না-হওয়ার হস্য। যা আমরা জন্মের পর থেকে দেখে আসি এবং যা আমাদেরকে বুঝানো হয়ে থাকে।

২.

তার কাজ সকাল-সন্ধ্যা ছায়া আর অবয়ব নিয়ে কাজ করা।ছায়া আর অবয়বের চিত্র আঁকবে বলে সারাদিন গিরিপথে ঘোরা ছাড়া আরকিছু করতে দেখি না। সকালের লম্বাটে ছায়ার ধীরেধীরে ছোট হয়ে আসা দেখতে দেখতে সূর্য মধ্যগগনে সাঁতরে আসে। তারপর ছায়াগুলো হেলে পড়তে পড়তে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে যায়। সে এসবকিছুই তার ধূসর রঙে গোলা পানিতে সাদা কাগজে তুলির ছোপে আঁকে।

রাতের আড্ডা যখন জমে ওঠে, যখন কামরা উত্তাপ-করা আগুনে কেউ নতুন কাঠ ফেলে আর তাচড়চড় করে পুড়তে থাকে তখন তার কণ্ঠের ক্ষীণ আওয়াজ সবার কানকে খাড়া করে তোলে। বাইরে বাতাসের কোন পাল দিক ভুলে দুই পাহাড়ের ফাঁকে হারিয়ে নাকি কান্নার রোল তোলে। তার কথা সে সময় হাওয়ার খোঁজে বেরোয়। আর সামান্য যা অবশিষ্ট থাকে, তা আমরা ভাগ করে নিতে চেষ্টা করি।

রাত গভীর হচ্ছিলো। আড্ডার সঙ্গীরা ঢুলছিলো। সে তখন তার গল্প শুরু করলো। আধো ঘুম আধো জাগরণে আমরা দু’ একজন শুনছিলাম।

‘কয়েকদিন ধরেই সূর্যটা যখন বড় পাহাড়টার ওপাশে লুকোতে শুরু করে তখন অবয়বটা বেরহয়। আমি প্রথম প্রথম গাছের গুঁড়ি ভেবে মাথা ঘামাইনি। কিন্তু আমি সে সময় যেখানেই থাকিনা কেন, অবয়বটাকে দেখতে পেতাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, অবয়বটার আসল চেহারা আমাকে দেখতে হবে। এরপরে দেখামাত্রই আমি তাকে অনুসরণ করতে থাকি। সন্ধ্যার কুয়াশারাতের আঁধারে ঢাকা পড়ে।অবয়বটা ধীরেধীরে ছায়ামূর্তির আকার নেয়। আমি নাছোড়বান্দা। আজ তার স্বরূপ দেখেই ছাড়বো।

এটুকু বলে সে থামলো।

আমিই শুধু শুনছি। বাকিরা ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে। আগুনের পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা বুড়োটা নাক ডাকাচ্ছে।শ্লেষ্মা জমে থাকায় আওয়াজ বাধা পাচ্ছে। শ্বাসের সাথে সাথে একদলা হলুদ শ্লেষ্মা নাকের আগায় আসে। তারপর শ্বাসের টানে আবার নাকের ছিদ্রে ঢুকে যায়। ঘড়ঘড়ে বিশ্রী সে শব্দ বাতাসের প্রচণ্ড প্রবাহে আঙটাভাঙা একটা জানালা কপাটের সাথে বাড়ি খাওয়ার আওয়াজে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।ঠান্ডা বাতাস গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে। উঠে গিয়ে জানালাটা বাঁধলাম পরিত্যক্ত এক টুকরো কাপড় দিয়ে। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে কেউ কেউ একটু উহ আহকরলো। আবার ঠান্ডা হয়ে গেলো। পাশের হুকোতে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে আবার শুরু করলো।

তো ধীরেধীরে রাতের আঁধার গাঢ় হলো। চাঁদও মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। ছায়ামূর্তিকে তখন দেখা যাচ্ছিলো না। আমি তখন পদশব্দ অনুসরণ করছিলাম। এভাবে কতক্ষণ হেঁটেছিলাম মনে নেই। একসময় দিগন্তে ফরসারেখা ফুটলো। এরপর সূর্য তার প্রথম কিরণ ফেললো।সেই কিরণে সামনে পথের ব্যপ্তি দেখে ছুট লাগালাম। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য দেয়াল আমাকে আর এগুতে দিলো না। ছায়ামূর্তিটা দিব্যি সেই দেয়াল ভেদ করেও পাশে দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে হারিয়ে গেলো।

হঠাৎ পায়ের আওয়াজে সচকিত হলাম। আশপাশে তাকালাম আওয়াজের উৎস তালাশে। আস্তে আস্তে আমার দৃষ্টির সামনে দেয়ালের ওপাশে একটি অবয়ব মানবাকৃতি নিচ্ছে। একসময় সে আমার সামনে এলো। দেয়ালের বাধার কারণে আমি তাকে ছুঁতে পারছিলামনা। তাই প্রচণ্ড কৌতূহল চাপতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলাম, কে তুমি? সে উত্তর করলো, আমি তুমিই!’

৩.

কামরার সকলে তখন ঘুমে অচেতন। আমার কানে তার কথাগুলো অস্পষ্ট হতে হতে এক সময় একদম থেমে গেলো।

হঠাৎ মাথার ভিতর কে যেন বলে উঠলো, তুমি কে? আমি অজান্তেই বললাম, আমি তুমিই! সে আশ্চর্য হয়ে স্বগতোক্তি করলো, তাহলে একলা কেন তুমিই জানো, ‘তুমি আমিই!’

তার কথায় হা হা করে হেসে উঠলাম। পাহাড়ের দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে উর্ধ্বগামী সে আওয়াজে ঘুমন্ত পাখিরা জেগে উঠলো। তাদের মিষ্টি আর কর্কশ ডাকে অদৃশ্য দেয়ালটা ভেঙে পড়লো।

আমি তার দিকে হাত বাড়ালাম। এই সময় আমার ঘুম ভেঙে গেলো।

সে তখন গল্পের শেষ বাক্যটি বলছিলো, আমি তার দিকে হাত বাড়ালাম। তাকে ছুঁতে যাবো এমন সময় হঠাৎ সে মিলিয়ে গেলো!

The post ছায়া এবং অবয়ব appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%ac%e0%a6%82-%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a7%9f%e0%a6%ac/

No comments:

Post a Comment