Saturday, April 10, 2021

তাহাদের গড়িমসি

 রাকিবুল হাসান:

আমার বাসা থেকে বেরিয়ে গলিটা পেরুলেই বিরাট একটা কবরস্থান। একনামে সবাই চিনে—সিদ্ধিরগঞ্জ কবরস্থান। রাস্তা সংলগ্ন হওয়ায় তার তিনদিকে দোকানপাট, দর্জির দোকান। একদিকে মসজিদ। এই মসজিদের ইমাম সাহেবকে দেখে আমার হাসি পায়। হাসির কারণটা অদ্ভুত—তিনি তারাবির সুরে জুমার খুতবা পড়েন। অথচ পড়বেন খুতবার মতো গাম্ভীর্য নিয়ে, তেজস্বীw মনোভাব নিয়ে। কিন্তু তারাবির সুরে খুতবা পড়লে খুতবাকে কুরআন মনে হয়। গত জুমায় একজন আমাকে জিজ্ঞেস-ই করে ফেললো, ‘হুজুরের কুরআন তেলাওয়াতটা বুঝেন?’ খুতবার মাঝে কথা বলা গর্হিত কাজ হলেও সেদিন খুতবার সময় আমাকে কথা বলতে হলো। তাকে বুঝাতে হলো এটা খুতবা, মানে বক্তৃতা; এটা কুরআন না।

আমি মাদরাসায় পড়িনি। বিয়ের পর বউয়ের ইচ্ছেতে মাদরাসাছাত্রের মতো পাজামা-পাঞ্জাবি পড়ে জুমা আদায় করতে যাই। অনেকেই আমাকে মাওলানা ভেবে পেছন সরে এসে সামনের কাতারে জায়গা দেয়। মাঝেমধ্যে প্রশ্নের মুখোমুখি পড়ে যাই। মাসআলা জিজ্ঞেস করে লেকজন। আমার তখন বাধ্য হয়ে বলতে হয়—আমি মাওলানা নই। সাধারণ একজন লোক। পাঞ্জাবি পড়লেই কেউ মাওলানা হয় না। আমি ভাবি—মাওলানা হওয়া এত সহজ না। প্রতিদিন কত সমস্যা নিয়ে মানুষ তাদের কাছে যায়। তারা পড়াশোনা করে তার সমাধান দেন। একটা টাকাও নেন না। আর আমি একজন সাংবাদিক। সামান্য একটা নিউজ করতে হলেও টাকা নেই। মাওলানা তার কর্তব্য পালন করছেন বিনা পয়সায়। আর আমরা টাকা নিয়েও কর্তব্য পালন করছি না। এই সমাজে কার অবদান বেশি?

সকাল দশটায় বের হবার কথা থাকলেও আজ অফিসের জন্য বেরিয়েছি সকাল এগারোটায়। দেরীর কারণটা উহ্যই থাকুক। গলির মাথার দোকানে হিন্দি গান বাজছে। আমি দোকানিকে বললাম, ‘ভাই, দুই গজ দূরে কবরস্থান।’
দোকানি চোখ বড় করে বললো, ‘তো?’
আমি বললাম, ‘হিন্দি গান না বাজালে হয় না?’
দোকানি বিরক্তির সুরে বললো, ‘আপনি যেখানে যাইতেছিলেন, যান। যার যার কাজ সে করেন।’

সামান্য একজন দোকানির কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে, বাসে ঝুলতে ঝুলতে অফিসে এলাম দুপুর একটায়। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস লাগছে। সহকর্মীর সর্দি-জ্বর, তবুও অফিসে এসেছে। তার অনুমতি নিয়ে পাখার গতি বাড়িয়ে দিলাম। রতন সাহেব চা দিয়ে গেলেন। তার চা কয়েকটি রোগের কাজ করে। মাথাব্যথা, মাথাভার, অবসাদ, বিষণ্নতা। আমি দুষ্টুমি করে তাকে বলি, ‘প্যারাসিটেমলেও তত গুণ নেই, যতটা আপনার চায়ে আছে।’ রতন সাহেব হাসেন। ছোটবেলায় ভুলে ফেলে দেয়া তার দাঁতের ফোঁকরটা দেখা যায়।

আমি একটি দৈনিকে কাজ করি। রিপোর্টিং বিভাগে। দশটা টু পাঁচটা অফিস। রিপোর্ট তৈরি শেষ করতে না পারলে এর বাইরেও কাজ করতে হয়। যেমন গতকাল ফতোয়া আন্দোলন বিষয়ক একটা রিপোর্ট করতে গিয়ে বেশ সময় গেলো। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীকেই পেলাম মাগরিবের পর। তখন আমার অফিস শেষ। কিন্তু তখন তার কাছে না গেলে রিপোর্ট তৈরি হতো না। তাই যেতে হলো। এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেমন হুট করে কোথাও আগুন লেগে গেলো। সম্পাদক ফোন করে বলে দিলেন, খোঁজ নাও তো কী হলো।

সম্পাদক সাহেব আমাকে ডাকলেন। আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। তার মুখাবয়ব পড়ার চেষ্টা করলাম। সম্পাদক ডাকলেই মনের ভেতর কু ডাক শুরু হয়ে যায়। এর কোনো সমাধান আমি আজো পাইনি। সম্পাদক বললেন, ‘তসলিম, এটা কী রিপোর্ট করলে?’
আমি চট করে বললাম, ‘কোনো সমস্যা হয়েছে স্যার?’
সম্পাদক গলা শুকিয়ে বললেন, ‘এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করি না।’
আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম, ‘কোন বক্তব্য?’
সম্পাদক বললেন, ‘ওই যে ফতোয়াবিরোধী রায়ের আপিল কোর্টেই তুলতে দিচ্ছে না বিএনপি।’
আমি বললাম, ‘স্যার, এটা আমার কথা না। বিএনপির শরীকদল ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীর কথা।’
সম্পাদক বললেন, ‘তিনি ঠিক বলেননি। ফতোয়াবিরোধী রায় দিয়েছে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে। এর দায় এবং ফতোয়াবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধ আন্দোলনে ছয় শহীদের দায় তাদের কাঁধে। বিএনপি এর বিচার করবে না কেন? বরং খোঁজ নিয়ে দেখো—হুজুররা আপিলই করছে না।’
আমি বললাম, ‘তারা আপিল করেছেন। কিন্তু বিএনপি আপিলটি কোর্টেই তুলতে দিচ্ছে না। মুফতি ফজলুল হক আমিনী এবং খেলাফত মজলিসের আমির শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক দুজন বারবার ব্যারিস্টার মওদুদের কাছে যাচ্ছেন। কাজ হচ্ছে না।’
সম্পাদক বললেন, ‘ তারা প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছেন এসব নিয়ে?’
আমি বললাম, ‘এখনো দেয়নি। সরকারে থেকে তো সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না। তবে তথ্যটা যেহেতু আমরা পেয়েছি, ছাপতে পারি।’
সম্পাদক বললেন, ‘সরকারি দলে থেকে লোকদের মুখ যেমন বাঁধা থাকে, তেমনি বাঁধা থাকে মিডিয়ার মুখ। রিপোর্টটি আমরা ছাপতে পারবো না।’

মুখ ভোঁতা করে সম্পাদকের রুম থেকে বের হয়ে এলাম। পথে সত্য বলা যায় না, মিডিয়ায় সত্য বলা যায় না। ডেস্কে বসে রইলাম ঝিম মেরে। টিভিতে খালেদা জিয়া ভাষণ দিচ্ছেন—মিডিয়ার স্বাধীনতা আমাদের চেয়ে বেশি কেউ দেয়নি।

দুপুরে খাবার সময় ফোনের ওপ্রান্ত থেকে নিলীমা জিজ্ঞেস করলো, ‘গলা শুনে মনে হচ্ছে মন খারাপ।’
আমি বললাম, ‘কিছুটা।’
মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস না করে সে বললো, ‘কপালে উমমমমম।’
আমি বললাম, ‘মন ভালো হয়ে গেছে। তবে একটা প্রশ্ন।’
নিলীমা উৎসাহী হয়ে বললো, ‘কী?’
আমি বললাম, ‘আমার যখন মন খারাপ হয়, মন খারাপের কারণ তেমন জিজ্ঞেস করো না। কেন?’
নিলীমা হেসে বললো, ‘মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করলে মন খারাপটা বাড়ে। ওই কারণটাকে আমরা হাজারো যুক্তি দিয়ে মিথ্যা প্রমাণ করতে গিয়ে আসলে নিজের মনেই কারণটা খোদাই করে ফেলি। শ্রাবণের প্রবল বর্ষণও ওই কারণটাকে আর মুছতে পারে না। তাই জিজ্ঞেস করি না।’
আমি বললাম, ‘জিজ্ঞেস করার মুরোদ নেই তাই বলো। আমাকে কাব্য করে ভুলাতে পারবে না।’

নিলীমা হাসলো। আমার মনে হলো—তার হাসি তরল জল হয়ে আমার শিরায় শিরায় ঢুকে যাচ্ছে। আমার মন খারাপ ডুবে যাচ্ছে সুখের তলায়। ভুলে গেলাম দোকানির প্রত্যাখ্যান, সম্পাদকের ধমক, বাসে ঝুলে থাকার কষ্ট। আমার সত্তাজুড়ে থৈ থৈ করছে নিলীমা। এমন একটি মেয়ে পাশে থাকলে আর যা হোক, মন খারাপ থাকা অসম্ভব।

 

The post তাহাদের গড়িমসি appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a7%9c%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a6%bf/

No comments:

Post a Comment