Sunday, November 6, 2022

খাদ্যে ঝুঁকি বাড়ছে : হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছেন আলেমরা

রাকিবুল হাসান নাঈম:

ভেজাল খাদ্যের কারণে মানুষের দেহে ক্যান্সার, কিডনিসহ বড় বড় জটিল রোগগুলো এখন দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ প্রণীত হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় খাদ্যপণ্য উৎপাদক ও বিক্রেতারা জনস্বাস্থ্য ও আইনগত শাস্তির কোনো তোয়াক্কা করছে না। ফলে খাদ্যে ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

পয়লা নভেম্বর এক সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকও বলেছেন, ভেজাল খাদ্যে ছেয়ে গেছে বাজার। হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকান ও হাটবাজারে ভেজাল খাবার বিক্রি হচ্ছে। এতে নানা রোগব্যাধি যেমন বাড়ছে, বিপরীতে ওষুধের ব্যবসাও বেড়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ জীবন দিতে হলে এই ভেজাল কারবারিদের এখনই থামিয়ে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ প্রেক্ষিতে দেশের আলেম সমাজ হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়নে জোর দিয়ে বলছেন, ভেজালের বিপরীতে খাদ্যে হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়ন করলে ঝুঁকি কমবে। মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের দেশে স্বভাবতই হালাল খাবারের ব্যবস্থাপনাই সর্বত্র। তবে এক্ষেত্রে হালাল স্ট্যান্ডার্ড বাস্তবায়ন করলে খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বাড়বে।

আলেমরা যা বলছেন

এ বিষয়ে কথা হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ডেপুটি-ডিরেক্টর ড. আবু সালেহ পাটোয়ারীর সঙ্গে। হালাল স্টান্ডার্ড মানে কি জানতে চাইলে তিনি ফাতেহকে বলেন, ‘ফুড সেফটি ও নিউট্রিশনের পূর্ণ সমন্বয় হলো হালাল ব্র্যান্ড, যেখানে শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোন কিছু থাকবে না। এখানে ইসলামিক সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামিক দেশগুলোর মানদন্ড মেনে সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে আসছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। যেখানে ইসলামিক রীতিনীতি মেনে পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সংরক্ষণ, পরিবহনসহ ভোক্তার কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সকল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। মান যাচাইয়ের প্রয়োজনে বিএসটিআই, ওষুধ প্রশাসনের লোকজনও থাকেন হালাল সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে। পণ্য তৈরিতে কোনো প্রকার হারাম ও ক্ষতিকর উপদান না থাকলেই ফাউন্ডেশন এই সনদ প্রদান করে।

তিনি বলেন, ভেজাল রোধে সবচে উত্তম একটি মাধ্যম হতে পারে হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়ন। কারণ, স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো পণ্য উপাদান না থাকা, ইসলামে নিষিদ্ধ এমন কোন উপাদান যুক্ত না করে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনই হালাল খাদ্যের মূল বিষয়।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে হালাল পণ্য শারীরিক ও মানসিক স্বস্তির বিষয় মনে করেন হালাল সনদ প্রদানের সঙ্গে জড়িত মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ। বাংলাদেশ বিমানের খাদ্যসেবা (কেটারিং) দিচ্ছে যে প্রতিষ্ঠান, ২০১৫ সাল থেকে সে প্রতিষ্ঠানের হালাল সনদ দিচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, খাবার তো সঠিক প্রক্রিয়াতেই তৈরী হয়। তবে হালাল সনদ থাকলে মনে স্বস্তি লাগে যে, ভাল একটা জিনিস খাচ্ছি। তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না হলেও প্রাকৃতিক ও জীবনের প্রয়োজনেও হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়ন করা জরুরী।

হালাল খাদ্যের ধারণা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইসলামে হালাল পণ্য প্রস্তুত ও খাওয়ার নির্দেশনা মেনে পুষ্টিমানসম্পন্ন পণ্য প্রস্তুতই হালালের মূল ধারণা। দেশজুড়ে যদি হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয় এবং তা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তদারকি করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন আমাদের অংশগ্রহণ বাড়বে, তেমনি দেশের মানুষও সুস্থ থাকবে। খাদ্যে নিরাপত্তা তৈরী হবে।

যারা হালাল সনদ দিচ্ছে

এতদিন শুধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল সনদ প্রদান করলেও গেল বছর থেকে হালাল পণ্যের সনদ দিচ্ছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। বিএসটিআই আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে মিলে কাজ করতো। বিএসটিআই বাজারজাতের অনুমোদন দিলেই কেবল ফাউন্ডেশন পণ্যটিকে হালাল সনদের বিবেচনায় আনতো। গেলো বছর নিজেরাই হালাল সনদ প্রদানের উইং খুলে বিএসটিআই। ইতোমধ্যে বিএসটিআই তিন পর্বে হালাল সনদ দিয়েছে।

বিএসটিআইয়ের হালাল সার্টিফিকেট বোর্ডে ১৪ কমিটির সদস্য রয়েছেন। এরমধ্যে খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি অধিদপ্তর, পানি সম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা রয়েছেন। শরিয়া দিকটি দেখার জন্য রয়েছেন দুজন শরিয়া এডভাইজর।

বর্তমানে মোট পাঁচ জাতীয় পণ্যে হালাল সনদ দিচ্ছে বিএসটিআই। পণ্যগুলো হলো: ১. খাদ্যপণ্য ও পক্রিয়াজাত পণ্য। ২. প্রাণীসম্পদ। এরমধ্যে মাংসজাতীয় জিনিসগুলো রয়েছে। ৩. মৎসজাতীয় পণ্য। ৪. প্রক্রিয়াজাত পঁচনশীল পণ্য। ৫. প্রসাধনী ও ফার্মাসিউটিক্যাল জাতীয় পণ্য।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪০টি কোম্পানি হালাল পণ্যের সনদ নিয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য পণ্য উৎপাদন ও বিপননের সঙ্গে জড়িত কোম্পানির সংখ্যা একশোর বেশি। এসব কোম্পানির উৎপাদিত হালাল ব্র্যান্ডের পণ্য রয়েছে প্রায় ৭০০টি।

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের বিচারক মো. তাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য ভোক্তার অধিকার বলে গণ্য হয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ নিরাপদ খাদ্যকে ভোক্তার অধিকার হিসেবে নেয় এবং এর ব্যত্যয় সেসব দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচিত হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয় এবং নিরাপদ খাদ্যের জন্য যখন মানুষ দিশেহারা তখন খাদ্যে ভেজাল রোধ সংক্রান্ত সব আইন ও অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে ‘দ্য পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯’- রহিত করে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ প্রণীত হয়। এতে রয়েছে ৯০টি ধারা, ১৩ টি অধ্যায়, ৩৩ টি খাদ্য ভেজাল ও খাদ্য সংক্রান্ত বিষয়ক সংজ্ঞা।

জরিমানা ও শাস্তির বিধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবননাশক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা ভারী ধাতু বা বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত কোনো খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন, আমদানি, প্রস্তুত, মজুদ, বিতরণ, বিক্রয় বা বিক্রয়ের অপচেষ্টা করলে অনূর্ধ্ব সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। পুনরায় একই অপরাধ করলে সাত বছর থেকে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লাখ টাকা জরিমানা।

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ আইনদ্বয়ে যেসব কাজ করার বিষয়ে বিধিনিষেধ অথবা যেসব কাজ অপরাধ গণ্য করা হয়েছে তা সব নাগরিককে জানতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এই বিচারক।

The post খাদ্যে ঝুঁকি বাড়ছে : হালাল স্টান্ডার্ড বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছেন আলেমরা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%9d%e0%a7%81%e0%a6%81%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be/

কী হবে মালয়েশিয়ার আগামী নির্বাচনে?

মুনশী নাঈম:

আগামী ১৯ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে আবারও অংশ নিচ্ছেন দেশটির প্রায় শতবর্ষীয় প্রবীণ রাজনীতিবিদ মাহাথির মোহাম্মদ। শনিবার, ৫ নভেম্বর নিজের প্রার্থীতা দাখিল করেছেন তিনি। লংকাউইয়ের হলিডে দ্বীপে নিজের সংসদীয় আসন রক্ষায় তিনি লড়বেন।

এর আগে, দু’বার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি। প্রথমবার ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। দ্বিতীয়বার ২০১৮ সালে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে সরাতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। এক সময়ের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ইব্রাহিমের সহায়তায় নির্বাচনে জিতে আবারও দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন মাহাথির। তবে, নানান রাজনৈতিক ইস্যুতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতেই পদত্যাগ করেন তিনি। দেশটির ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সেই রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে গেল অক্টোবরের ১০ তারিখ দেশটির জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুব। ফলে আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ১০ মাস আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটিতে।

মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক দল

মালয়েশিয়ায় ৬৯টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। এ দলগুলো আবার ৫ টি প্রধান ব্লকে বিভক্ত।

১. ন্যাশনাল ফ্রন্ট অ্যালায়েন্স: এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতায় থাকা জোট। এতে তিনটি প্রধান দল রয়েছে—ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন, মালয়েশিয়ান চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং মালয়েশিয়ান ভারতীয় কংগ্রেস। ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বেশিরভাগ সময় ধরে মালয়েশিয়া শাসন করেছে ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) নেতৃত্বাধীন বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) বা ন্যাশনাল ফ্রন্ট। কিন্তু সম্প্রতি জোট সরকারের নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে জনমনে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয় তাতে শেষ পর্যন্ত তাদের পতন ঘটে।

২. পাকাতান হারাপান (পিএইচ) বা অ্যালায়ান্স অব হোপ: এটি আনোয়ার ইব্রাহিম ১৯৯৮ সালে ক্ষমতা থেকে প্রস্থান করার পর তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের একটি সম্প্রসারণ। এতে ৩টি প্রধান দল রয়েছে: পিপলস জাস্টিস পার্টি, ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন (জাতিগত চীনাদের দ্বারা অধ্যুষিত), এবং ন্যাশনাল ট্রাস্ট পার্টি।

৩. ন্যাশনাল কন্ট্রাক্ট অ্যালায়েন্স: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের নেতৃত্বে এই জোট। এতে রয়েছে মালয় ইউনিটি পার্টি (পার্সাতু), মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি এবং ছোট ছোট বিভিন্ন দল।

৪. দ্য ন্যাশনাল ওয়ারিয়র অ্যালায়েন্স: এটি মাহাথির মোহাম্মদের নিজের হাতে গড়া রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অরগানাইজেশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট।এতে বেশ কয়েকটি ছোট দল এবং বেসরকারী সংস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

৫. সাবাহ ও সারওয়াক নিয়ে গঠিত বর্ণিও মালয়েশিয়া: দেশের পূর্বাঞ্চলের ‘সারওয়াক’ এবং ‘সাবাহ’ রাজ্যের দলগুলি রয়েছে এ জোটে। এ জোট গত বছর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সংসদে দুটি রাজ্যের মোট আসন ৫৬ টি, যা ২৫% এর সমান। মোট আসন ২২২টি।

উল্লেখযোগ্য প্রার্থী

মালয়েশিয়ার এবারের নির্বাচন বেশ জটিল এক সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে। কারা প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সম্ভাবনা। দেখা যাচ্ছে জনমত জরিপ।

ন্যাশনাল ফ্রন্ট জোটের নেতা জাহিদ হামিদি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুব সহ জোটের নেতৃত্বদানকারী “আমনো” দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা সীমিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হননি। এমনিতেই জাহিদ হামিদির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দুর্নীতির মামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রচেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতার মধ্যে বিরোধপূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে তার অসন্তোষের বারবার প্রকাশকে ঘিরে বিভিন্ন সন্দেহ উত্থাপিত হয়েছে। পক্ষান্তরে কোনো দুর্নীতির ফাইলে নাম না থাকায় গত কয়েক মাসে ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাসানের চাহিদা ও সম্ভাবনা বেড়েছে। মালয়েশিয়ার ইতিহাসে এটিই প্রথম যে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না।

অন্যদিকে আরও একবার জয় নিশ্চিত করতে চাইছে রাজনৈতিক সংস্কারবাদীদের নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন জোট পাকাতান হারাপান (পিএইচ) বা অ্যালায়ান্স অব হোপ। হোপ অ্যালায়েন্স পরবর্তী সরকারের প্রধানের জন্য আনোয়ার ইব্রাহিমকে মনোনীত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইব্রাহিম আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তার বিজয় সহজ হবে না। মালয়েশিয়ার সমাজের বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি বৃত্তে জয়লাভের অর্থ হল বিভিন্ন মালয়েশিয়ার জাতিগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এজন্য তাকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হবে।

ন্যাশনাল কন্ট্রাক্ট অ্যালায়েন্সের নেতা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন ক্ষমতায় ফিরে আসার আশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। দ্য ন্যাশনাল ওয়ারিয়র অ্যালায়েন্সের নেতা হিসেবে লড়বেন মাহাথির মুহাম্মদ।

অন্যদিকে মালয়েশিয়ার দু’টি অংশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের মতো আসন হলো উপদ্বীপ মালয়েশিয়ায়। বাকিটা সাবাহ ও সারওয়াক নিয়ে গঠিত বর্ণিও মালয়েশিয়ায়। দেশটির দুই অংশের রাজনীতির ধারার মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। বর্নিও মালয়েশিয়ায় দেশটির মূল অংশের বড় দলগুলোর প্রভাব একবারে কম। কয়েক দশক ধরে সারওয়াকে সরকার গঠন করে আসছে স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট। সাবাহতে একসময় আমনুর শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও সেখানে এখন শক্ত অবস্থানে চলে এসেছে স্থানীয় দলগুলো। বর্নিও মালয়েশিয়ায় যে এক-তৃতীয়াংশের মতো আসন রয়েছে তাতে যারা প্রাধান্য বিস্তার করবে তারা ফেডারেল সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জরিপে পিছিয়ে মাহাথির

মালয়েশিয়ায় জনমত জরিপের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মনে করা হয় মারদেকা ফাউন্ডেশনকে। মারদেকা সংসদ ভেঙে দেয়ার পর ১৯ থেকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। এ ধরনের ব্যাপকভিত্তিক সমীক্ষা এ পর্যন্ত আর কোনো প্রতিষ্ঠান এবারের নির্বাচন নিয়ে করেনি।

এ সমীক্ষা অনুসারে ১৫তম সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দের দিক থেকে আমনুর নেতৃত্বাধীন বারিসান ন্যাশনালকে (বিএন) তার প্রতিদ্বন্দ্বী পাকাতান হারাপান (পিএইচ) পেছনে ফেলেছে। মারদেকা সেন্টারের পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা পিএইচকে এবং ২৪ শতাংশ বিএনকে পছন্দ করেছেন। তারপরে রয়েছে বারাসাতু ও পাসের সমন্বয়ে গঠিত পেরিকাটান ন্যাশনালের (পিএন) স্থান, যার প্রতি সমর্থন রয়েছে ১৩ শতাংশের। তবে এখানে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যারা তাদের পছন্দের কথা জানাননি তাদের সংখ্যা ৩১ শতাংশ। আর ৪ শতাংশ কোনো ধরনের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। চূড়ান্তভাবে এ ৩৫ শতাংশের মতো ভোটার পুরো ভোটকে প্রভাবিত করবেন বলে মনে হয়। এর বাইরে দুই শতাংশ বলেছেন, তারা ডা: মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন গেরাকান তানাহ এয়ার (জিটিএ) বা অন্য কোন দলকে ভোট দেবেন।

আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফলের বিষয়ে মন্তব্য করে মারদেকা সেন্টার বলেছে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জোটের উপস্থিতি রয়েছে এবার। আর সেই সাথে সম্ভাব্য ভোটের হারের বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে এ মুহূর্তে অনুমান করা কঠিন। এ মুহূর্তে, বিএন-এর জন্য মালয় ভোটারদের সমর্থন প্রত্যাশিত স্তরের চেয়ে কম হওয়ায় এটা ধারণা করা যায় যে, কোনো জোটই এককভাবে মালয়েশিয়ায় ক্ষমতায় আসতে পারবে না। অন্য এক বা একাধিক দল বা জোটের সাথে সরকার গঠনে কোয়ালিশন করতে হবে।

মালয়েশিয়ার শাসনব্যবস্থা

মালয়েশিয়ায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা কয়েম। সেখানে চলে ব্রিটিশ ব্যবস্থার মতো একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। সংসদীয় অধিবেশনের সময়কাল ৫ বছর। সংসদ দুটি কক্ষে বিভক্ত: প্রতিনিধি পরিষদ, যার সদস্য সংখ্যা ২২২ জন। সেনেট, যার সদস্য সংখ্যা ৭০ জন। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন রাজা।

গত জুলাইয়ে, সংসদ একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করেছে। তাতে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের পরে সদস্যারা তাদের দল পরিবর্তন করতে পারবে না। কারণ এভাব দল পরিবর্তনের কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে গঠিত তিনটি সরকারের মধ্যে দুটির পতন ঘটে।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ২২২টি সংসদীয় আসনে মোট ৯৪৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৯ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ করা ভোটার তালিকা অনুযায়ী, যা জিই ১৫-এ ব্যবহার করা হবে। ২১,১৭৩,৬৩৮ জন ভোটার রয়েছে, যার মধ্যে ২০,৯০৫,৩৬৬ সাধারণ ভোটার, ১৪৬,৭৩৭ সামরিক কর্মী এবং তাদের স্ত্রী, ১১৮,৭৯৪ জন পুলিশ কর্মী, সাধারণ অপারেশন এবং তাদের ৪ জন সাধারণ ভোটার রয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

The post কী হবে মালয়েশিয়ার আগামী নির্বাচনে? appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a7%80-%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%ae/

প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী

ফাতেহ ডেস্ক:

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, গত পরীক্ষায় আমরা দেখেছিলাম বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি। প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে আমরা অভিনব কৌশল গ্রহণ ও কঠোর মনিটরিং করছি। এরপরও কেউ যদি গুজব ছড়ানো বা প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রোববার (৬ নভেম্বর) সরকারি বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

দীপু মনি বলেন, কেন্দ্র ঘুরে দেখলাম বাইরে অভিভাবকদের অনেক ভিড়। যারা আগে এসেছেন তারা সন্তানকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তাদের ভিড়ের কারণে বাকি পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে সমস্যা হচ্ছে।

অভিভাবকদের অনুরোধ করে তিনি বলেন, সন্তানকে পৌঁছে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যেন তারা কেন্দ্র ত্যাগ করেন। তাহলে কোনো পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে আসতে সমস্যা হবে না।

কোচিং সেন্টার বন্ধের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোচিং বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে। একই কোচিং সেন্টারে অনেক ধরনের কোচিং চলে। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা বোর্ডের পক্ষে একা বন্ধ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে দীপু মনি বলেন, কোচিংয়ের প্রয়োজন আছে। স্কুল-কলেজগুলোতে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস করে। সবার প্রতি শিক্ষকদের আলাদা নজর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে নতুন যে শিক্ষাক্রম, তাতে কোচিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না বলে আশা করি।

আগামী বছরের পরীক্ষা এগিয়ে আনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এবার আমরা চেষ্টা করেছিলাম জুলাই-আগস্টে পরীক্ষা নিয়ে আসতে। কিন্তু বন্যার কারণে তা হয়নি। এরপরের বছর আরও এগিয়ে আনার চেষ্টা করব। আর আগামীতে যদি কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তাহলে সে বোর্ডের পরীক্ষা সাময়িক বন্ধ রেখে অন্যগুলোর নেওয়া হবে।

The post প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a6%b2%e0%a7%87/

Saturday, November 5, 2022

‘সদর সাহেব’ : বাংলাদেশে থানবির প্রতিনিধি

সুমাইয়া মারজান:

কিছু মানুষ সময়ে জন্ম নেন না কেবল, সময় হয়ে থাকেন ইতিহাসের পাতা জুড়ে। সম্ভাবনাময় বীজ থেকে যাদের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে পরিণত হন এক বিশাল মহীরুহে। সময়কে বদলে দিতে কালের হাওয়ায় থাকে সে মহীরুহের আধিপত্য। দিকভ্রান্ত উম্মাহর জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকেন যুগের পর যুগ। শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এমনই এক সময়ের নাম। উজ্জ্বলতম আলোকবর্তিকার নাম।

সময়টা ১৮৯৬ সাল। জানুয়ারির ২১ তারিখে বৃহত্তর ফরিদপুরের অন্তর্গত গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা গ্রামে তার জন্ম। কাকতালীয়ভাবে বা বলা যায় কুদরতের কোন এক অপার মহিমায় তার পিতার নাম আব্দুল্লাহ, মায়ের নাম আমেনা।
ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে আমরা দেখতে পাই তার পূর্ব পুরুষেরা আরব থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য এই দেশে আগমন করেন। হিজরি সাতশো সনে তারা এই দেশে আগমন করেন। বসতি গড়েন ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ার গওহরডাঙ্গায়। তার প্রপিতামহ ইংরেজ বিরোধী বালাকোট আন্দোলনে শরিক হয়ে ‘গাজী’ উপাধিতে ভূষিত হন।
শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এর জীবনগল্পের পরতে পরতে রয়েছে বিস্ময় মহাবিস্ময়। কিভাবে গওহরডাঙ্গার মতো অজপাড়াগাঁয়ের একটি ছেলে পরবর্তী সময়ে ইসলামি রেঁনেসার অগ্রদূত হলেন? এ এক আশ্চর্য ও সংগ্রামের ব্যাপারই বটে!

এমন এক সময় থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন যখন অজপাড়াগাঁয়ে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া তো দূরের কথা প্রাথমিক বা সাধারণ শিক্ষা অর্জন করাটাও প্রায় বিরল ব্যাপার ছিলো। কিন্তু যার জীবনের আকাশে চমকাচ্ছে সত্যের সূর্য, যার নামের অর্থও এটাই, সে তো অদম্য, দুর্বার হবেই।

তার পিতা ছিলেন সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। ছিলেন শিক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন। তিনি শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন। তাই বালক শামসুল হককে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করার জন্য পাঠালেন পাটগাতি গ্রামের এক হিন্দু পণ্ডিতের কাছে। সেখান থেকে এসে টুঙ্গিপাড়া স্কুল ও বরিশাল সুটিয়াকাঠি স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।

কৈশোর থেকেই শামসুল হক রহ. একজন আদর্শ ছাত্রের সদগুণাবলীতে বৈশিষ্ট্যময় ছিলেন। তার চারিত্রিক সনদ দিতে বাধ্য ছিলেন তার স্কুলের মুসলিম, হিন্দু সকল শিক্ষকগণ। তারা শামসুল হক রহ.-এর ব্যাপারে বলতেন, শামসুল হকের হাতে পরীক্ষার আগেই পরীক্ষার সকল প্রশ্নপত্র নির্দ্বিধায় ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসে তুলে দেওয়া যায়।

তিনি আর দশটা বালকের মতো অস্থির ও শিশুসুলভ স্বভাবের ছিলেন না। কৈশোরের দিনগুলোতেও ছিলেন না লাগামহীন । তার মধ্যে ছিল নম্রতা, বিনয়, চিন্তাশীলতা ও লাজুকতার মতো মহৎগুণগুলো । বেশি কথা বলতেন না। প্রায় সময়ই একাকী বসে কী যেন ভাবতেন। সত্যের অনুসন্ধানে তার হৃদয় সবসময়ই উদগ্রীব থাকতো।

প্রাথমিক শিক্ষার স্তর কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করার পর তার পিতা তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে বাঘুড়িয়া হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালে নিজের ক্লাসসহ পুরো স্কুলে তিনি প্রথমস্থান অধিকার করেন। তারপর তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৯ সালে পিতার অনুরোধেই কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ইচ্ছে ছিল পরীক্ষায় ফেল করবেন। তাহলে আর তাকে এখানে ভর্তি হতে হবে না। এই সুযোগে আরবি পড়বেন। তাই, তিন ঘণ্টার পরীক্ষা একঘণ্টায় দিয়ে বের হয়ে এলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো পাঁচ বিষয়ে লেটারসহ এক নম্বর স্থান অধিকার করেছেন।

এদিকে শৈশব থেকেই তার ইচ্ছা ছিলো ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন। জীবনকে বিলিয়ে দিবেন ইলমের তরে। কিন্তু পরিবারের কারণে তা সম্ভবপর হচ্ছিলো না।

তাই তিনি স্কুলে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আরবি শেখতেন। সেই সময় তিনি নিজ আগ্রহে উর্দু ও ফার্সি শেখার শুরু করেন। নওয়াবপাড়া স্কুলে পড়াকালীন সময়ে আরবির প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েন। তিনি নিজেই বলেন নওয়াবপাড়া পড়াকালীন আমার ভিতরে কুরআন হাদিস বুঝার ইচ্ছাটা প্রবল আকার ধারণ করে। যার ফলে আমি স্কুলের পড়ালেখা বাদ দিয়ে আরবি পড়া শুরু করে। কলকাতা আলিয়ায় পড়াকালীন তার দেখা হয় বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ ‘আসাহহুস সিয়ার’-এর লেখক মাওলানা আবদুর রউফ দানাপুরী রহ. এর সাথে। তিনি তারপর থেকে দানাপুরীর কাছেই আরবি পড়া শুরু করেন। কলকাতায় থাকাকালেই একদিন হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. সেখানে সফরে এলে তিনি তার সাথে সাক্ষাত করেন। তখন থানভী রহ. এর কাছে তার আদ্যোপান্ত খুলে বলেন। সব শুনে থানভী রহ. অনেক দুঃখ পান মনে এবং তার জন্য মন খুলে দোয়া করেন। পরবর্তী জীবনে ফরিদপুরী রহ. নিজেই বর্ণনা করেন, ‘থানভী রহ. এর সাথে সাক্ষাত লাভ করার পর ইলম অর্জনের আগ্রহ এতোই বেড়ে যেতে যে, তা আর দমন করে রাখতে পারতাম না। তাই কুরআন হাতে জঙ্গলে চলে যেতাম। সেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে অঝোরে কাঁদতাম। দোয়া করতাম কেবল। একটা সময়ে এসে তার এই দোয়া কবুল হয়েছিলো । ১৯২০ সালের দিকে ভারতবর্ষে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়। প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি কলকাতা থেকে থানভী রহ.-এর দরবারে উপস্থিত হন। এখানে বেশকিছু দিন অবস্থান করে থানভী রহ.-এর কাছে আধ্যাত্মিকতার তালিম গ্রহণ করেন। অতপর নিজের শায়েখ ও মুর্শিদ থানভী রহ.-এর পরামর্শে মাজাহিরুল উলুমে সাহারানপুরে ভর্তি হয়ে যান। গভীর মনোযোগের সাথে চার বছর লেখাপড়া করেন। অতপর দেওবন্দে চলে যান। দেওবন্দেও চার বছর পড়ালেখা করেন। তিনি সেখান থেকে হাদিস, ফিকাহ, তাফসির, মানতেক, নাহু-সরফসহ সব বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

দারুল উলুম দেওবন্দের পড়াশুনা শেষ করে ১৯২৮ সালে দেশে ফেরার পর থেকে আমৃত্যু সারা বাংলার আনাচে কানাচে ইলমে দ্বীন হাসিলের কেন্দ্র হিসেবে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। লালবাগ জামেয়া কুরআনিয়া, হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড়কাটারা,ফরিদাবাদ জামিয়া, দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা প্রভৃতি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজও তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করছে। নিজেও তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাদীস, তাফসীর, ফিক্‌হ, আকাইদ প্রভৃতি শিক্ষা দিয়েছেন হাজার হাজার ছাত্রকে। গড়ে তুলেছেন আব্দুল হাই পাহাড়পুরী ও আল্লামা আজীজুল হক রহ.এর মতো ছাত্রদের। তবে দেশে ফেরার পর সর্বপ্রথম ফরিদপুরী রহ. নিজের ওস্তাদ শাইখুল হাদিস মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.-এর নির্দেশক্রমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদরাসায় সদরুল মুদাররিসিন পদে নিযুক্ত হন। সে সময় তার সহকর্মী হিসেবে ছিলেন ফখরে বাঙাল মাওলানা তাজুল ইসলাম, পীরজি হুজুর মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব ও হাফেজ্জী হুজুর মাওলানা মুহাম্মাদল্লাহ রহ.। সেখান থেকেই তিনি সদর সাহেব নামে পরিচিতি লাভ করেন। আমৃত্যু এই নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন।

সাধারণ জনগণের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞান প্রচার-প্রসারের জন্য তিনি ব্যাপক ভাবে সভা-সমিতি, ওয়াজ-নসিহত ও আত্মার সংশোধনের মহান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন নিরলসভাবে। আর তা করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও দ্বীনি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছেন।

দ্বীনি ইলম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী মাধ্যম হল লেখালেখি । এর দ্বারা সুশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই ঘরে বসে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করতে পারে। শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.এর যুগে বাংলা ভাষায় খাঁটি ও প্রয়োজনীয় দ্বীনি কিতাবাদি ছিল না বললেই চলে।
তখনকার যুগে মীর মশাররফ হোসেন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ইয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, এস. ওয়াজেদ আলী, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখ বাংলা ভাষায় ইসলামী ভাবধারা ও চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটালেও তার কোনটাই ইসলামের ব্যবহারিক দিক সম্পর্কিত ছিল না। ছিল না আমল-আখলাক, মাসআলা-মাসাইল ও আত্মশুদ্ধির দিক নির্দেশনামূলক কোনকিছু। বরং তাদের লেখা সাহিত্যিক মানোত্তীর্ণ তথা উচ্চাঙ্গের সাহিত্য সম্বলিত হওয়ায় তা স্বল্প শিক্ষিত সাধারণ জনগণের জন্য সহজবোধ্য ছিল না। বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান ও দ্বীনদার জনগণ এ অভাব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে আসছিল যুগ যুগ ধরে। সময় যেন অপেক্ষাই করে আসছিলো এমন এক মহামনীষীর যিনি তাদের এ অভাব দূর করে সহজ থেকে সহজতরভাবে দ্বীনের অমিয় সুধা পান করিয়ে ধন্য করবেন।

অবশেষে মহান আল্লাহর মেহেরবানীতে তাদের এ অভাব দূরীকরণে এগিয়ে এলেন এক যোগ্যব্যক্তি। যিনি মুজাহিদে আ’যম হযরত সদর সাহেব রহ.। অনুবাদ ও মৌলিক লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষায় তিনি ইসলামকে তুলে ধরলেন পূর্ণাঙ্গরূপে। ঈমান ও ইসলামের পরিচয়, ইসলামের ব্যবহারিক ও আত্মশুদ্ধি সম্পর্কিত বিষয়াদির বিস্তারিত বিবরণ তিনি তার রুহানি উস্তাদ মুজাদ্দিদে যামান হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর উর্দু রচনাবলী অনুবাদ করে বাংলা ভাষা-ভাষীদের খেদমতে পেশ করলেন। বেহেশতী জেওর, তালীমুদ্দীন, ফুরূউল ঈমান, হায়াতুল মোছলেমীন, ক্বসদুসসাবীল, মোনাজাতে মকবুল প্রভৃতি গ্রন্থ তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য, যা পড়ে দ্বীন সম্পর্কে একজন নিরেট গন্ডমূর্খও পর্যাপ্ত ধারণা লাভ করতে পারে এবং এই অনুযায়ী আমল করে দুনিয়া ও আখেরাত সফলতা লাভ করতে পারে।

মুসলিম উম্মাহর হেদায়াতের পথ নির্দেশক মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম সহজভাবে বুঝার জন্য তিনি রচনা করেছেন সাড়ে ষোল হাজার পৃষ্ঠা সম্বলিত অমর তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে হাক্কানী’ যা তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি।

এছাড়াও ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পথ নির্দেশক বহু কিতাব তিনি রচনা করেছেন। প্রায় দুইশত গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করে এবং অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে তিনি একদিকে যেমন বাংলা ভাষী মুসলমানদেরকে ইলমে দ্বীন শিক্ষা করার পথকে সুগম করেছেন তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ। এত প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষায় তিনি লিখেছেন যে, সামান্য শিক্ষিত লোকেরও তার লেখা বুঝতে মোটেও বেগ পেতে হয় না।
তার লেখা বইগুলো মুসলিম সমাজে এতই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যার তুলনা বিরল। আজও বাংলার নিভৃত পল্লীতেও তার অনূদিত বেহেশতী জেওর ও অন্যান্য বই আলো বিলিয়ে যাচ্ছে।

এমন বিরলপ্রজ মনীষী ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। তার ও তার শিষ্যদের অনুসৃত পথ ধরেই বাংলাদেশের আলেম সমাজের অনেকেই লেখালেখির ময়দানে বিচরণ করা শুরু করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে তার বিশাল কর্মযজ্ঞ ও মূল্যবান রচনাসম্ভারের যথাযথ মূল্যায়ন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

The post ‘সদর সাহেব’ : বাংলাদেশে থানবির প্রতিনিধি appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a6%a6%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%a5%e0%a6%be/

Thursday, November 3, 2022

সামর্থ্য থাকলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বেতন বাড়ানো উচিত: উবায়দুর রহমান খান নদভী

  • দেশবরেণ্য আলেমে-দীন ও সংসদ সদস্য মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.) -এর বড় ছেলে মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী। তিনি একাধারে একজন বিদগ্ধ আলেম, দার্শনিক বক্তা, সমাজকর্মী, শিক্ষক, খতিব এবং সাংবাদিক। দৈনিক ইনকিলাবের স্বর্ণযুগ থেকেই যুক্ত রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি ইনকিলাবের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। সেই সাথে নিযুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের মহাপরিচালক হিসেবে। কওমি মাদরাসা বিষয়ক কিছু প্রশ্ন নিয়ে তার কাছে উপস্থিত হয়েছিল ফাতেহ। তিনি ফাতেহকে সবগুলোর প্রশ্নেরই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। সাক্ষাৎকারটি ফাতেহের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও গ্রন্থনা রাকিবুল হাসান। সঙ্গে ছিলেন ইখলাস আল ফাহিম এবং মুবিব শেখ।

ফাতেহ: ‘শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছে মাদরাসা ফারেগীনরা’ এই শিরোনামে ফাতেহের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তরুণ আলেম এবং নবীন শিক্ষকরা শিক্ষকতায় আগ্রহ হারানোর পেছনে কিছু অভিযোগ করেছেন। আপনি কি ভাবছেন? আসলেই এটা ফ্যাক্ট কিনা?

নদভী: কথাটা অনেকাংশেই সত্য। তবে শিক্ষকতা একটা মহান পেশা, এখানে সবাই টিকতে পারে না। অনেক ধৈর্যের দরকার হয়। এখানে টাকা পয়সাও তেমন পাওয়া যায় না। যারা টিকে থাকে, ত্যাগ দিয়েই টিকে থাকে। আর পেশা বদলানোর এই রীতিটা সবখানেই আছে। কেবল যে মাদরাসার শিক্ষকতায়, এমন না।

শিক্ষকতায় আগ্রহ হারানোর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে অনেকে বেতন স্বল্পতার অভিযোগ করছেন। আমার মতামত হলো, যে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা নেই, তারা ছাত্রদেরকেই খাওয়াতে পারে না, তারা কিভাবে বেতন বাড়াবে? তবে এটা ঠিক, যাদের সামর্থ আছে, তাদের বেতন বাড়ানো উচিত।

ফাতেহ: অর্ধশতাধিক তরুণ আলেম মুহতামিমকর্তৃক শিক্ষকদের অবমূল্যায়নকেও কারণ হিসেবে দেখছেন।

নদভী: যে মুহতামিম এটা করবেন, এটা তার চরিত্রগত সমস্যা। ইসলামে ইসলাহের বয়ান ও দিকনের্দেশনা আছে। সেটা মানতে হবে। আমরা বলি, যে মুহতামিম শরিয়তের সীমা অতিক্রম করে শিক্ষকদের উপর অন্যায় করবে, সেটা অন্যায়। শরিয়তের সীমায় থাকতে হবে।

ফাতেহ: শিক্ষকদের বড় একটা অংশের অভিযোগ হলো, শিক্ষকরা ছুটি কম পাবার কারণে শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ব্যাপারে বেফাক কী করতে পারে?

নদভী: শিক্ষাঙ্গনে তো ছুটি কমই থাকবে। তবে ছুটি নিয়ে যদি কারও কোনো অভিযোগ থাক, সে বেফাক বরাবর লিখিতভাবে জানাতে পারে। যদি বাস্তবসম্মত অভিযোগ হয়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিব।

ফাতেহ: মাদরাসার ফারেগিনরা মাদরাসায় শিক্ষকতার বদলে অন্য পেশা গ্রহণ করে নিচ্ছে, ব্যাপারটা পুরাটাই যে নেতিবাচক এমন নয়। বরং, অনেকে বলছেন, বিষয়টা ইতিবাচক। মাদরাসার ছাত্রদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে।

নদভী: এটা কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য। শুধু এক পেশায় থাকবে না। অন্য পেশাতেও কাজ করবে। আমাদের আকবিররা মাদরাসায় পড়ানোর পাশাপাশি অন্য কাজও করেছেন। সুতরাং এটাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

ফাতেহ: তাকমিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য ফযিলত (মেশকাত) ও সানাবিয়াতে (শরহেবেকায়া) উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আলোচনায় উঠে এসেছে মাদানি নেসাবের প্রসঙ্গটি। কারণ বেফাকের পাঠ্যক্রম এবং মাদানি নেসাবের পাঠ্যক্রম আলাদা। বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাতে একটা সময় অংশগ্রহণ করতো না মাদানি নেসাবের শিক্ষার্থীরা। এখনও করে না অনেক মাদরাসা। বেফাকও শিথিল ছিল। তাকমিল পরীক্ষায় বসতে লাগতো না আগের কোনো কেন্দ্রীয় পরীক্ষার সার্টিফিকেট। ফলে মাদানি নেসাব সমাপ্ত করে এসেও তাকমিল পরীক্ষায় বসতে পারতো শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এখন বেফাক কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলো বাধ্যতামূলক করায় জটিলতা তৈরী হয়েছে। এই জটিলতা নিরসনে মাদানি নেসাবের সঙ্গে কোনো সংলাপে বসেনি বেফাক।

নদভী: মাদানি নেসাবের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ আমাদের আছে।

ফাতেহ: দেশে বিদেশে সার্টিফিকেট কার্যকর বিষয়ে কিছু জানতে চাই।

নদভী: এখন বেফাক কেবল মেশকাত পর্যন্ত সার্টিফিকেট কার্যকর করতে পারবে। কারণ তাকমিল এখন হাইয়াতুল উলয়ায়। তাকমিলের ব্যাপারটা তারা দেখবে।

ফাতেহ: বাংলাদেশি ছাত্ররা দেওবন্দ মাদরাসায় যেতে পারছে না কোলাবরেশনের অভাবে। বিষয়টা নিয়ে কী ভাবছেন?

নদভী: বিষয়টি নিয়ে আগেও চেষ্টা হয়েছে, এখনও হবে। যারা আগে চেষ্টা করছে, দেওবন্দের সঙ্গে যাদের যোগাযোগ আছে, তারা চেষ্টা করলে আমরা সাহায্য করবো।

ফাতেহ: আপনারা মুরুব্বী। আপনারা উদ্যোগ না নিলে কারা উদ্যোগ নিবে।

নদভী: আমরা উদ্যোগ নিব।

ফাতেহ: বেফাকের অধীনে আগে জাতীয় ফিকাহ বোর্ড নামে একটি বোর্ড ছিল। দেশের বড় বড় মুফতিরা সেখানে ছিলেন। কিন্তু সেটা এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেন বন্ধ করা হলো?

নদভী: আসলে ওই বোর্ডের অভিজ্ঞতা তেমন ভালো ছিল না। মুফতিদের মতামত আলাদা হয়ে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের মধ্যে একজনকে মান্য করে সবাই চলবে,. সেটা হয় না। তাই অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো সরকার যদি এটার উদ্যোগ নেয়, তাহলে সহজেই হবে। কারণ, সরকার উদ্যোগ নিলে সবাই সেখানে আসে। তবে পরিচালনা থাকবে আলেমদের হাতে। আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাববো।

ফাতেহ: বেফাকের অধীনে অধিকাংশ হেফজখানা। সম্প্রতি হেফজখানায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বিভিন্ন কারণে। বিষয়টি নিয়ে কী পরিকল্পনা আপনাদের।

নদভী: আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। হেফজখানাগুলোকে আমরা বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি। যেমন বয়সভেদে ছাত্রদের ভাগ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের রুম বিন্যস্ত করা, সিসি ক্যামেরা লাগানো ইত্যাদি। আরও পরামর্শ দিব।

ফাতেহ: ফাতেহের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইসলামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের চাহিদা বাড়ছে। ধর্মীয় শিক্ষায় নতুন এই উদ্যোগকে কিভাবে দেখছেন?

নদভী: বিষয়টি ইতিবাচক। বাংলাদেশে কওমি মাদরাসায় আসে ৩ শতাংশ । বাকি ৯৭ শতাংশ কিন্তু বাইরে আছে। তাদেরকে ইসলামি শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। সে হিসেবে, ইংলিশ মিডিয়াম ও বাংলা মিডিয়াম চালু করা দরকার।

ফাতেহ: আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য শুকরিয়া।

নদভি: আপনাদেরকেও শুকরিয়া।

The post সামর্থ্য থাকলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বেতন বাড়ানো উচিত: উবায়দুর রহমান খান নদভী appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be-%e0%a6%95/

Wednesday, November 2, 2022

একদিনে রেকর্ড ১০৯৪ ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে, চারজনের মৃত্যু

ফাতেহ ডেস্ক:

দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক হাজার ৯৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এটাই একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড। এর আগে গত ২৩ অক্টোবর দেশে একদিনে এক হাজার ৩৪ ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হন। এ নিয়ে সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গুরোগী সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৩ হাজার ৭৫০ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বুধবার (২ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৯৪ জনের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৬০০ জন এবং ঢাকার বাইরে ৪৯৪ জন। এ নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ভর্তি থাকা ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫০ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৪০ হাজার ১০১ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৩৬ হাজার ১৯৯ জন।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৫২ জনের।

২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। একই বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১০৫ জন।

The post একদিনে রেকর্ড ১০৯৪ ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে, চারজনের মৃত্যু appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a1-%e0%a7%a7%e0%a7%a6%e0%a7%af%e0%a7%aa-%e0%a6%a1%e0%a7%87%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97/

Tuesday, November 1, 2022

শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছে মাদরাসা ‘ফারেগীনরা’

রাকিবুল হাসান নাঈম:

বিভিন্ন কারণে কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে মাদারাসা পড়ুয়া ফারেগিনরা। বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবসহ নানা কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে দিন দিন অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। কেউ পড়াশোনা শেষ করে, কেউ দু’এক বছর শিক্ষকতা করেই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে শিক্ষকতার মতো এই মহান পেশা থেকে। তরুণ আলেম এবং নবীন মাদরাসা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তারা বলছেন, বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধার মানবিক সুরাহা না হলে তারা আর শিক্ষকতায় ফিরবেন না। সুরাহা হলে শিক্ষকতায় ফেরার ইচ্ছে তাদের আছে।

বেতন স্বল্পতার অভিযোগ

কথা হয় রাজধানী যাত্রবাড়ি এক মাদরাসার শিক্ষক মুফতি শোয়াইব মুমিনের সঙ্গে। তিনি ফাতেহকে নবীনদের অনাগ্রহী হয়ে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন। এরমধ্যে প্রথমেই রয়েছে বেতন স্বল্পতা। তিনি বলেন, ‘মাদরাসায় বেতন একদম কম। অল্প সময়ের ভেতর বৃদ্ধির কোন সম্ভাবনাও থাকে না। এতটাই কম যে, নিজে চলাই কঠিন হয়ে যায়। ফ্যামেলি চালানোর কথা বাদই দিলাম। বেতন কম হলেও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি শিক্ষকদেরকে অন্যান্য কাজ করার সুযোগ দিতেন, তাহলেও হতো। কিন্তু সে সুযোগও দেন না। মাদরাসার কাজই এত চাপিয়ে রাখেন, মনে হয়, বেতন দশ হাজার হলেও তার থেকে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ৫০ হাজার টাকার খেদমত আদায় করে নিতে চান। ফলে নবীনরা দিনদিন অনাগ্রহী হয়ে উঠছে মাদরাসায় শিক্ষকতার প্রতি।

কুমিল্লার এক মাদরাসার শিক্ষক আবু দারদা ফাতেহকে বলেন, সমস্যা দুদিকের আছে। এক. যারা চব্বিশ ঘন্টার রুটিনে অভ্যস্ত না, তাদের জন্য মাদরাসায় উস্তাদ হিসেবে ঢুকে ধরাবাঁধা এক জীবনযাত্রা য়চলাটা মুশকিল হয়ে যায়। ক্লাসের বাহিরে প্রাতিষ্ঠানিক দায়দায়িত্বকে চাপ মনে করতে থাকে৷ সেইসাথে মেহনত হিসেবে বেতন কম হয়। নবীন হিসেবে কাজের মূল্যায়ন সেভাবে কর্তৃপক্ষরা করতে চায় না। এতে করে একজন নতুন শিক্ষক তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সে তখন স্বাধীন কাজ চায়। হয় নিজে প্রতিষ্ঠান দেয় নতুবা যেখানে তার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে সেখানে চলে যায়৷

প্রায় অর্ধশত আলেম এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন এই বেতন স্বল্পতার সংকটের কথা। বর্তমান মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এই বেতনে চলাটা একপ্রকার কঠিনই বলা চলে। ফাতেহের ২৮ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী বলেছিলেন, যাদের সামর্থ্য আছে বেতন বাড়ানোর, তাদের বেতন বাড়ানো উচিত। বর্তমান যে বাজারের অবস্থা, তা কঠিন। মুহতামিমদের তা লক্ষ্য করা দরকার।

মুহতামিমকর্তৃক শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন

মুহতামিমকর্তৃক শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের অভিযোগও করেছেন অনেকে। মাদরাসাশিক্ষক খালিদ সাইফুল্লাহ ফাতেহকে বলেন, আমার খেদমতের সূচনা কোন এক মাদ্রাসার কিতাব বিভাগে। বেশ কয়েকমাস ওই মাদ্রাসায় খেদমতে নিয়োজিত ছিলাম। তা’লীমী মুরব্বীর পরামর্শক্রমে অনেকগুলো কারণ সামনে আসায় মাদ্রাসায় ইস্তফা দিয়ে চলে আসি। এরমধ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো, মুহতামিম সাহেবের কমিটি পুজা। নিজের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য অন্যান্য উস্তাদদের সাথে অমানুষের মতো আচরণ করে। কমটি পুজা করতে গিয়ে নিজের অধিনস্ত উস্তাদদেরকে না চেনার মত আচরণ করে। মাস শেষে শিক্ষকদের বেতন না দিলেও নিজের বেতন প্রতি মাসে ঠিকই নিয়ে নিয়েছে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ভরা বৈঠকে শিক্ষককে টুুপির জন্য অপমান করারও ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে। তিনি আরও বলেন, আমাকে ওই মাদ্রাসার হেদায়াতুন্নাহু জামাতের নেগরানীর জিম্মাদারি দেয়া হয়েছিলো। আমি প্রতিদিন ছাত্রদের কাছে যেতাম। তাদের হাল্পুরসি করতাম। কিতাবাদির পড়া-শোনার খোঁজ নিতাম। ছাত্ররাও তাদের না বুঝা জায়গাগুলো দেখিয়ে বুঝে নিতো। আমার কিতাব ছাড়াও অন্যান্য উস্তাদদের কিতাবগুলোও বুঝে নিতো। এটা মুহতামিম, নাজেমে তালিমাত, দারূল ইক্বামা সবাই এটাকে এতোটা অপছন্দ করতো যে, বলতো প্রতিদিন ছাত্রদের কাছে কি? ফলে ছাত্র গড়ার মানসিকতাই চলে যায়।

কুমিল্লা দারুত তাহজিব মাদরাসার শিক্ষাসচিব মাওলানা জহির তানভির বলেন, আগ্রহ হারানোর পেছনে কারণ হলো, মাসিক হাদিয়া, সম্মানি, বা বেতন পরিশ্রম অনুযায়ী কম হচ্ছে এই যুগে। তা ছাড়া সার্বক্ষণিক বাধ্যতামূলক দায়িত্ব চাপানো, অন্য কোন কাজের সুযোগ না দেওয়া। পাশাপাশি অনেক পরিচালকের অসৌজন্যমূলক আচরণ তো আছেই।

কথা হয় দাতব্য সংস্থা পিসব এবং আলোকিত মক্তবের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইমরান হুসাইন হাবিবির সঙ্গে। তিনি ফাতেহেক জানান, ‘পরিচালকদের অমানুষিক আচরণের কারণে অনেকেই মাদরাসায় শিক্ষকতা করতে চান না। তাদের আচরণের কারণে নিজেকে গোলাম মনে হয়, খাদেম না। পরিচালকরা মনে করেন, স্ত্রী-সন্তান কেবল তাদেরই আছে, আর কারও নেই। তাই স্ত্রী-সন্তানকে শিক্ষকরা একটু গুরুত্ব দিলে মুহতামিমরা শুরু করেন ভিন্ন আচরণ। এগুলো না কমালে অনাগ্রহ বাড়তেই থাকবে।

সাময়িক ছুটি কম

মাদরাসা শিক্ষকদের কমন অভিযোগ হলো, সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতেও ছুটি না পাওয়া। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন না শিক্ষকরা। মাদরাসায় শিক্ষকতার প্রতি অনাগ্রহের বাড় কারণ এটাও।

মুফতি জহির তানভির বলেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাধ্যতামূলক আবাসিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় শিক্ষকদের উপর। ঠিকমতো ছুটি পাওয়া যায় না। এমনকি বিভিন্ন সমস্যায়ও সুবিধা/ছুটি দেওয়া হয় না।

মুফতি শোয়াইব মুমিন বলেন, ছুটি কম মাদরাসাতে। এমনকি শুক্রবারও ছুটি নেই। শিক্ষকদের বাসা নিয়ে থাকতে দেয়া হয় না। অন্য কোন ইনকামে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি ইমামতি করারও সুযোগ দেয় না। সাত আটটা করে ঘণ্টা দেওয়ার পরেও আবার সারাদিন এটা সেটা দায়িত্ব দিয়ে রাখে।

কথা হয় তরুণ আলেম মাওলানা আরিফ খান সাদের সঙ্গে। তিনি এখন দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকাতে সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি ফাতেহকে বলেন, নববী জীবনধারায় যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, বর্তমান আবাসিক মাদরাসায় সেটা অনুপস্থিত। এখানে ঘর-সংসার ছেড়ে ২৪ ঘন্টার বদ্ধ রুটিনে একটি স্থবির অবস্থায় বাধ্যশ্রম দিতে হয়। আগের যুগে যেমন ‘রিহলাহ’ ছিল, এখন সেটা নেই। মাসে বা সপ্তাহে একদিনের ছুটিতে কী হয়, জানজটপূর্ণ শহরে? আরেকটা কথা হচ্ছে, আগেকার জীবন যাপন অর্থের ওপর এতটা নির্ভরশীল ছিল না, বর্তমান পুঁজিবাদি সমাজে যার নির্ভরতা অনেক বেশি। এসব কারণে শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

শিক্ষকতার মানসিকতা গড়ে না ওঠা

ছাত্রকাল থেকেই শিক্ষকতার মানসিকতা গড়ে না ওঠাকেও কেউ কেউ দায়ি করছেন শিক্ষকতায় আগ্রহ কমার পেছনে। তারা বলছেন, শিক্ষকতা করার জন্য আলাদা যোগ্যতা এবং মানসিকতা লাগে। নয়ত কওমিধারায় শিক্ষক হিসেবে টিকে থাকা কঠিন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকার মাদানি নেসাবের একজন শিক্ষক মাওলানা ওলিউর রহমান ফাতেহকে বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পড়াশোনাকালীন সময়ে শিক্ষকতার মানসিকতা গড়ে না ওঠা। ফাস্ট্রেশন, হাহাকার গোটা সমাজেই এখন ছড়িয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ নিত্যনতুন চাকচিক্যের খবর রাখে। আগের শিক্ষকরা শিক্ষকতাটাকে যেভাবে মহান পেশা হিসেবে ছাত্রদের সামনে পেশ করতেন নতুন শিক্ষকরা সেই কাজটা করেন না। নিজের কষ্টের জীবনের বর্ণনা বিভিষিকাময় আকারে পেশ করে ছাত্রদের অগ্রীম সতর্ক করে রাখেন। ফলে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিক্ষকতা কখনই বন্ধ থাকবে না। তবে এই যে শিক্ষকতার প্রতি সমাজে একটা অনীহা তৈরি হচ্ছে এটার একটা ভয়ঙ্কর রকম মন্দ দিক আছে। মেধাবী চঞ্চল যারা নিজ উদ্যোগে কিছু করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে তারা শিক্ষকতা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকবে। ফলে একটা অযোগ্য শিক্ষকশ্রেণি তৈরি হবে। যার ফলাফল খুবই ভয়ঙ্কর।

মাওলানা সাদ মুশফিক ফাতেহকে বলেন, শিক্ষকতায় আগ্রহ হারানোর পেছনে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের যেমন দোষ আছে, তেমনি কমতি আছে ফারেগিনদেরও। যারা মাদরাসায় ভালো রেজাল্ট নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে, তাদের সবাই ভালো শিক্ষক হবে, এমন কোনো কথা নেই। অনেকে ভালো ছাত্র ছিল, কিন্তু ছাত্র পড়ানো এবং ছাত্র গড়ায় সে অযোগ্য হতেও পারে। তখন কিন্তু তার শিক্ষকতায় মন বসবে না। সে শিক্ষকতা থেকে দূরে সরবেই।

আছে ইতিবাচক দিকও

কথা হয় মেরুল বাড্ডার এক মাদরাসার শিক্ষক মুফতি আবু সাঈদের সঙ্গে। তিনি বিষয়টিকে দেখছেন ইতিবাচকভাবেই। তিনি ফাতেহকে বলেন, শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছে, ব্যাপারটা এভাবে দেখা উচিৎ নয়। বরং বিষয়টা এভাবে ভাবা উচিৎ যে, মাদরাসা ফারেগীনরা এখন তাদের কর্মক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত দেখতে চায়। তারা মাদরাসার খেদমতের পাশাপাশি অন্য অঙ্গনেও যেতে চায়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো মাদরাসার পাশাপাশি অন্য অঙ্গনে যাওয়ার মতো সুযোগ অবারিত হয়নি। সেজন্য ফারেগীনরা হতাশ হচ্ছেন।

আমার দেখা মতে, যারা মাদরাসার বাইরে কাজ করছেন, তাদের হৃদয়েও মাদরাসায় খেদমত করার আগ্রহ আছে। তবে তারা অন্য কাজের পাশাপাশি মাদরাসায় পড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন না বিধায় পড়াতে পারছেন না।

সমাধান হিসেবে তার পরামর্শ হলো, সেজন্য এখন আমাদের অঙ্গনে ২৪ ঘণ্টা মাদরাসায় ধরে রাখার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলে একদিকে বেতন কম হলেও যোগ্য কিছু শিক্ষাবিদ পাওয়া যাবে, পাশাপাশি অন্য অঙ্গনে আলেমদের পদচারণায় মাদরাসার সীমানার বাইরের মানুষজনও যোগ্য আলেমদের সাথে মেশার ও উপকৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। মেধাবী তরুণরা যেহেতু মাদরাসার পাশাপাশি অন্য অঙ্গনেও যেতে আগ্রহী, আমি মনে করি, তাদেরকে অন্য অঙ্গনে যাওয়ার সুযোগ দেয়া উচিৎ। এতে দেশ ও দশের কল্যাণ।

বেতন স্বল্পতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণদের অনেকে বেতনের কমতি বা পরিচালকদের অসৌজন্যতাকে এর জন্য দায়ি করেন। তবে আমার অভিজ্ঞতা হলো, এ ধরনের অসৌজন্যতা অন্যান্য জায়গায়ও আছে। বলতে গেলে কোথাও কোথাও মাদরাসা মহলের চেয়েও বেশি। তবে আমাদের সমস্যা হলো, মাদরাসাকে আমরা কল্পনা করি, এখানে কোনো ধরনের অসঙ্গতিই উচিৎ নয়। আর অন্য অঙ্গনে গেলে মনে করি, না, এ ধরনের আচরণ কিছু হলে হতেও পারে।আমার মনে হয়, অন্য অঙ্গনে আমাদের তরুণরা যে মনোভাব নিয়ে ঢোকেন, সেটা যদি মাদরাসা অঙ্গনেও পোষণ করেন, তবে এ ধরনের অভিযোগ আর থাকবে না।

লেখক ও শিক্ষক হাসান আজিজ ফাতেহকে বলেন, আমার মুহতামিম ভাগ্য এখনও পর্যন্ত ভালোই বলতে হবে। শুরুদিকে ছিলাম ভাইয়ের মাদরাসায়। এখন অন্য প্রতিষ্ঠানে এলেও আলহামদুলিল্লাহ কখনও ইহতিমামের পক্ষ থেকে অযাচিত চাপ অনুভব করিনি। যদিও ছাত্রদের পেছনে বেশি বেশি সময় দেওয়া, তাদের আরও ভালো করে গড়ে তোলার জন্য উপদেশ-অনুরোধ থাকেই, এটা তো মুহতামিম-মাত্রই করবেন, স্বাভাবিক, কিন্তু আমার কাছে কখনও অযাচিত চাপ মনে হয়নি। তাই এ ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নেই।

বেতন নিয়ে আমার অতিরিক্ত কোনো চাওয়া নেই। যদি নির্ধারিত বেতন যথাসময়ে হাতে পেয়ে যাই আমি সম্ভবত নির্দ্বিধায় একটি শিক্ষক জীবন পাড় করে দিতে পারব। এখন শিক্ষকতার ছেড়ে যদি ভিন্ন কর্মক্ষেত্র খুঁজতে যাই তাহলে সেখানেও তো বেশি টাকা আয় করা যায় না। বিকল্প খুঁজতে গিয়ে আমি সফল হতে পারিনি। শিক্ষকতাই আমার কাছে উত্তম মনে হয়।

The post শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছে মাদরাসা ‘ফারেগীনরা’ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%95%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b9-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a7%87/