Thursday, November 17, 2022

মুনাজাতে হাজার হাজার মানুষের ‘আমিন’ ধ্বনি : সমাপ্ত হলো সিলেটের ঐতিহাসিক ইজতেমা

ফাতেহ ডেস্ক:

আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর ৭৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুদিন ব্যাপী আজিমুশ্বান ইজতেমা ২০২২ সম্পন্ন হয়েছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ রোডস্থ পারাইচকে কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালে অনুষ্ঠিত এ ইজতেমায় অর্ধ লক্ষাধিক মুসল্লীর সমাগম ঘটে। ১৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বাদ ফজর থেকে শুরু হওয়া এ ইজতেমা ১৮ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০ ঘটিকায় আমীরে আঞ্জুমান হযরত মুফতি মুহাম্মদ রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভীর আখেরী মুনাজাতের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। দুদিন ব্যাপী এ ইজতেমায় ইসলামী জীবনযাপন অনুসরণ ও আত্মশুদ্ধি অর্জন বিষয়ে বয়ান পেশ করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শতাধিক ওলামা-মাশায়েখ ও বুদ্ধিজীবীগণ। বহির্বিশ্বের একাধিক ইসলামিক স্কলারও এতে অংশগ্রহণ করেন।

ইজতেমা থেকে দেশ ও জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তব্যে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর আমীর হযরত মুফতি মুহাম্মদ রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী বলেন, আজিমুশ্বান ইজতেমা থেকে আমরা দেশের সর্বস্তরের মুসলিম জনতাকে এই আহŸান জানাচ্ছি যে, নিজের ও নিজের পরিবারের ঈমান-আমলের পরিশুদ্ধির জন্য ঘরে ঘরে আপনারা তালীম তথা দ্বীনি শিক্ষার চর্চা চালু করুন। মসজিদে, কর্মক্ষেত্রে, আবাসস্থলে—দ্বীনি তালীমের চর্চা জারি থাকলে মুসলমানদের ঈমান-আমল সংরক্ষিত থাকবে। কেউ তাঁদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।

আমীরে আঞ্জুমান বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এ অঞ্চলের প্রাচীনতম একটি অরাজনৈতিক দ্বীনি সংগঠন। সাধারণ মানুষকে দ্বীন-ঈমানের তালীম দেওয়া এবং তাঁদের মধ্যে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দৃঢ় করে তোলাই এ সংগঠনের প্রধানতম কর্মসূচি।

ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ৭৭ বছরের পুরনো এ সংগঠনের সঙ্গে প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে মুফতি মুহাম্মদ রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম কারো ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়, কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানোর এজেন্ডাও এ সংগঠনের নেই। এ সংগঠন দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষকে এক আল্লাহর দাওয়াত প্রদান এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে উদ্বুদ্ধ করার কাজেই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকে।

দেশের সর্বস্তরের মুসলিম জনতার প্রতি আহŸান জানিয়ে তিনি বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। দেশের প্রতিটা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠনের শাখা কমিটি গঠনের কাজ চলমান। আল্লাহর ওলীদের বরকতমÐিত এ সংগঠনের বিস্তার প্রচারে আপনাদের সকলের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন।

আখেরী মুনাজাতে তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে হৃদয়ভেজানো দুআ করেন।

দুদিন ব্যাপী বিশাল এ ইজতেমায় উপস্থাপনা করেন আঞ্জুমানের যুগ্ম মহাসচিব হাফিয মাওলানা শেখ সা‘দ আহমদ আমীন বর্ণভী, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা জাবের আল হুদা চৌধুরী, প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা শাব্বীর আহমদ ফতেহপুরী। ইজতেমা ১৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বাদ ফজর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও ১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার থেকেই ইজতেমাস্থলে মুসল্লিয়ানে কেরামের সমাগম ঘটতে থাকে। ফলে ১৫ ও ১৬ নভেম্বরও ধাপে ধাপে সিলেটের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখগণ তাঁদের উদ্দেশে ধর্মীয় দিকনির্দেশনামূলক বয়ান পেশ করেন।

১৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বাদ ফজর আমীরে আঞ্জুমানের উদ্বোধনী বয়ানের মাধ্যমে ইজতেমার আনুষ্ঠানিক সূচনা হবার পর থেকে পরদিন শুক্রবার সকাল ১০ ঘটিকার আখেরী মুনাজাত পর্যন্ত মোট সাতটি অধিবেশনে দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় শতাধিক ওলামা-মাশায়েখ বয়ান পেশ করেন। সাত অধিবেশনে ধাপে ধাপে সভাপতিত্ব করেন সিলেট বিভাগের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখ।

বয়ান করেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ (ভারত)-এর বর্তমান মহাসচিব আল্লামা সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদানী, ভারতের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ শাহি মুরাদাবাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল আল্লামা সাইয়্যিদ আশহাদ রশিদী, মাওলানা আব্দুল আউয়াল নারায়ণগঞ্জ, মাওলানা আব্দুর রহমান হাফিজ্জী মোমেনশাহী, মাওলানা আব্দুল মালিক পীর সাহেব ভোলা, মাওলানা আকরাম আলী পীর সাহেব বাহাদুরপুর, মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররামের খতীব মুফতি রুহুল আমীন, ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন চট্টগ্রাম, ড. মুশতাক আহমদ ঢাকা, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা উবায়দুর রহমান বরিশাল, মাওলানা আবদুল মতীন বিন হুসাইন পীর সাহেব ঢালকানগর, মাওলানা ইসমাঈল নুরপুরী নরসিংদী, মাওলানা নূরুল ইসলাম খান সুনামগঞ্জী, মাওলানা হামিদ জহিরী ঢাকা, মাওলানা মুশতাক আহমদ খুলনা, মাওলানা মুশতাকুন নবী কাসিমী, মাওলানা নুরুল হুদা ফয়জী বরিশাল, চট্টগ্রাম পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযাহ, হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, মাওলানা আলী আকবর কাসিমী ঢাকা, মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ ঢাকা, মাওলানা আহমদ মায়মূন ঢাকা, মাওলানা আহমদ আলী কাসিমী, ড. শহীদুল্লাহ উজানী, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান পীর সাহেব দেওনা, মাওলানা শামসুদ্দীন কাসিমী জামালপুর, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী ঢাকা, মাওলানা মুহাম্মদ আলী সিরাজগঞ্জ, মাওলানা ইমাম হুসাইন সিরাজগঞ্জ, মুফতি ফয়জুল্লাহ ঢাকা, মাওলানা আব্দুল বাসিত খান সিরাজগঞ্জ, মুফতি আবুল বাশার নুমানী ঢাকা, মুফতি জসিম উদ্দীন ঢাকা, মাওলানা জুবায়ের আহমদ ঢাকা। এ ছাড়াও শীর্ষস্থানীয় আরও অনেক উলামায়ে কেরাম বক্তব্য রাখেন।

আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর তরফে বয়ান পেশ করেনÑ নায়বে আমীর মাওলানা সাঈদুর রহমান বর্ণভী, নায়বে আমীর মাওলানা ওলীউর রহমান বর্ণভী, নায়বে আমীর মাওলানা আবদাল হোসেন খান, নায়বে আমীর মাওলানা শেখ আহমদ আফজল বর্ণভী, মহাসচিব মাওলানা অধ্যাপক আব্দুস সবুরসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলবৃন্দ।

শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, সিলেট ৩ আসনের সাংসদ জনাব হাবিবুর রহমান, গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জনাব আমিনুল ইসলাম রাবেল, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি অধ্যাপক জাকির হোসেন, রাজনগর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আহমদ বিলাল, নাজাত ইসলামী মারকাযের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মাওলানা শেখ ছালেহ আহমদ হামিদী-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

উল্লেখ্য, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার খ্যাতিমান বুযুর্গ খলীফায়ে মাদানী কুতবে দাওরান হযরত লুৎফুর রহমান বর্ণভী (পীর সাহেব বরুণা) সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার পর থেকে প্রায় ৯ দশক ধরে ইসলাহী এ সংগঠন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশে মানবতার কল্যাণ, মুসলমানদের দ্বীন-ঈমানের সংরক্ষণ ও মানবিক মূল্যবোধের উজ্জীবনে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

The post মুনাজাতে হাজার হাজার মানুষের ‘আমিন’ ধ্বনি : সমাপ্ত হলো সিলেটের ঐতিহাসিক ইজতেমা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/

আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম : সিলেটে ইসলাম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র

রাকিবুল হাসান নাঈম:

সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে মানবতার কল্যাণে, দ্বীন-ঈমানের লালন ও সংরক্ষণে এবং মানবিক মূল্যবোধের উজ্জীবনে কাজ করে যাচ্ছে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনের ৭৭বছর পূর্তি উপলক্ষে সিলেটে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ইজতেমা। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে ইজতেমার ময়দানে। মানুষের আগ্রহ, উপস্থিতি এবং সরব প্রচারণা দেখেই বুঝা যায়, সিলেটে ইসলাম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র এখন এটি। সংশ্লিষ্টগণ বলছেন, ভারত স্বাধীনতার আগ থেকেই দ্বীন-ঈমানের লালন ও সংরক্ষণে এবং মানবিক মূল্যবোধের উজ্জীবনে কাজ করছে এই সংগঠন। যুগে যুগে এই সংগঠনের কাজে যুক্ত হয়েছেন মহান ব্যক্তিরা।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ১৯৪৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নীপুরুষ শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর প্রিয় ছাত্র ও খলীফা হযরত শায়খ মাওলানা লুৎফুর রহমান বরুণী। তৎকালীন সমাজের মানুষকে অনৈক্য, অনৈতিকতা এবং ইসলামবিরোধী কাজ থেকে দূরে রাখার মানসেই তিনি এই সংগঠন তৈরী করেন। তবে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা আরম্ভ হয় ১৯৫৪ সালে। তখন সিলেট ও উত্তর বঙ্গের ৮টি জেলায় কাজ করার দায়িত্ব নেন শায়খ বর্ণভী রহ.। ঢাকা বিভাগে কাজ করার দায়িত্ব নেন হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী রহ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে কাজ করার দায়িত্ব নেন ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.। তখন বিভাগ ছিল তিনটি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী। শায়খ বর্ণভী ছিলেন মধ্যবয়সী তরুণ আলেম এবং ফখরে বাঙ্গাল ও ফরিদপুরী রহ. ছিলেন প্রবীণ আলেম। স্বাধীনতার আগে সংগঠনের নাম ছিল আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম পাকিস্তান। স্বাধীনতার পর নামকরণ করা হয় আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামে।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ বর্ণভী রহ. ১৯৭৭ সালের ১৭ মে ইন্তেকাল করার পর তার বড় ছেলে আল্লামা শায়খ খলীলুর রহমান হামিদী বর্ণভীকে সংগঠনের আমীর নিযুক্ত করা হয়। তিনি দীর্ঘকাল আঞ্জুমানের হাল ধরে ছিলেন এবং এর সমস্ত কার্যক্রমের সামগ্রিক দেখভাল করেছিলেন। ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর তার ইন্তেকালের পর দায়িত্ব গ্রহণ করেন সংগঠনটির বর্তমান আমীর রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী। সংগঠনের মূল কেন্দ্র জামিয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম হামিদনগর বরুণায় অবস্থিত।

প্রধান লক্ষ্য ইসলাহ ও হিদায়াতের বার্তা দেয়া

সাত দশকের বেশি সময় ধরে কোনো ইসলাহি সংগঠনের কাজ করে যাওয়ার নজির খুব বেশি নেই বাংলাদেশে। বর্ণভি সিলসিলা যেভাবে কাজ করছে দীর্ঘ সময় ধরে, তারা কখনও কালের প্রেক্ষাপট থেকে হারিয়ে যায়নি। জনমানুষের মাঝে তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে বিভিন্ন সময়। দীর্ঘসময়ের এই যাত্রাকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন, জানতে চাইলাম সংগঠনের বর্তমান আমির মুফতি মুহাম্মদ রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভীর কাছে। ফাতেহকে তিনি বলেন, এবার ৭৭বছর পূর্তি হলো সংগঠনের। আজ থেকে ৭৭ বছর পূর্বে আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ. তাঁর শায়খ ও মুরশিদ শায়খুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.-এর নির্দেশনা, হাকীমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর অনুমোদন এবং সমকালের বুযুর্গ উলামায়ে কেরামের সমর্থনের ভিত্তিতে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর কল্যাণে বহু মানুষ হিদায়াতের দিশা পেয়েছেন, বহু মানুষ ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির খোরাক গ্রহণ করেছেন, বহু মানুষ জরুরিয়াতে দ্বীন শিখেছেন। আল্লাহ তাআলার বিশেষ ফযল ও করম এবং বুযুর্গানে দ্বীনের দুআ ও কর্মতৎপরতার ফলেই আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম এ সফলতা অর্জন করতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ যাবৎকাল পর্যন্ত আঞ্জুমানের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বহু বুযুর্গানে দ্বীন, আওলিয়ায়ে কেরাম ও মুখলিস ব্যক্তিবর্গ নিজেদের সময় ও শ্রমকে অকাতরে কুরবানী করে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, দ্বীনবিমুখ মানুষকে দ্বীনের ওপর তুলে আনা, সাধারণ মুসলিমদেরকে জরুরিয়াতে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া এবং সামগ্রিকভাবে জনসাধারণের মধ্যে ইসলাহ ও হিদায়াতের বার্তা পৌঁছে দেওয়াই আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল। আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল—মতভেদ আর দলাদলি পায়ের নিচে ফেলে দিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দৃঢ় করে তোলা। আমার আব্বাজান আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন আঞ্জুমানের কাজ শুরু করেন, সে-সময়ে আব্বাজানকে কারী তাইয়্যেব সাহেব ২২ পৃষ্ঠা কলেবরের একটি চিঠি লিখেছিলেন। দীর্ঘ চিঠির এক পর্যায়ে তিনি হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম ইয়ে এক ইলহামী প্রোগ্রাম হ্যায়।’

মাসিক হেফাজতে ইসলাম

আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মুখপত্র মাসিক হেফাজতে ইসলাম। এটি জামিয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম হামিদনগর বরুণা থেকে প্রকাশিত হয়। লুৎফুর রহমান বণর্ভী ১৯৭৩ সালে এই পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করেন। পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন আবদুর রহব ইসামতি, পরবর্তীতে আবদুল গফুর মোমেনশাহী। প্রথমে পত্রিকাটি হাতে লিখে প্রকাশ করা হত। এভাবে কিছুকাল চলার পর পাঠক ও গ্রাহকদের আগ্রহে হুসাইন আহমদ মাদানির নামানুসারে ‘মাদানি প্রেস’ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ প্রেস থেকে পত্রিকাটি দীর্ঘদিন নিয়মিত চলার পর দিন দিন পাঠক চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অতঃপর পত্রিকাটি ১৯৮৩ সালের জুন মাস থেকে আবদুস সালাম চৌধুরী ও পরবর্তীকালে আবদাল হোসেন খানের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এভাবে দীর্ঘদিন চলার পর মাঝখানে অনিয়মিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ভক্তদের বিশেষ সহযোগিতায় মার্চ ২০০৪ সাল থেকে এটি মাসিক হিসেবে প্রকাশ হতে শুরু করে।

অঞ্জুমানের ইসলাহি কাজ কাগজের পাতায় মানুষের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম মাধ্যম এই পত্রিকাটি। পত্রিকাটিতে কয়েক দশকজুড়ে কাজ করেছেন মাওলানা আবদাল হোসেন খান। কখনও সামলেছেন প্রেসের কাজ, কখনও সার্কুলেশনের কাজ, কখনও আবার সামলেছেন সম্পাদনার কাজ। বর্তমানে সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসাবে পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত আছেন। পরিচয় দিয়ে পত্রিকার প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি ফাতেহকে বলেন, তখন কাঠের ফর্মা দিয়ে প্রচ্ছদ বানানো হতো। প্রচ্ছদে গম্বুজ এবং মিনার থাকতো। ছাপা হতো লেটার হরফে। পত্রিকা প্রকাশ হলে শায়খ বর্ণভী রহ.-এর আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ‍উঠতো। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমি পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়িত্ব নেই। সম্পাদক হিসেবে সার্কের সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে ভারত-পাকিস্তান সফর করি। তখন পত্রিকায় আমি মুসলিম বিশ্বের সংবাদ ফলাও করে প্রচারের পাশাপাশি দেশের অনিয়মও দুর্নীতির কথা তুলে আনতে শুরু করি পত্রিকায়। এত অনেকবার প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়ি। তখন পত্রিকাটি সুশীলদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। মাদানী প্রেসে তখন ডাকসাইটে সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও আড্ডায় অংশ নিতো। ২০০৪ সালে যখন নতুন করে ছাপা শুরু হয় পত্রিকার, তখনও আমাকেই সম্পাদক রাখা হয়।

মাঝখানে গত দশকে কয়েক বছরের জন্য পত্রিকাটি অনিয়মিত হয়ে যায়। আঞ্জুমানের বর্তমান আমীর মুফতি মুহাম্মদ রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী দায়িত্বপ্রাপ্তির পর মাসিক হেফাজতে ইসলামকে আবার নতুন করে নতুন আঙ্গিকে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২০২১-এর জানুয়ারি থেকে পত্রিকাটি আবারও নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।

জনমানসে পত্রিকার প্রভাব কেমন এবং এর প্রকাশে সংগঠনের উদ্দেশ্য কী জানতে চাইলে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হামমাদ রাগিব বলেন, পত্রিকার মাধ্যমে জনমানুষের কাছাকাছি যাওয়া যায়। অঞ্জুমানের জন্মই হয়েছিল জনমানুষের কাছাকাছি গিয়ে তাদেরকে ইসলাহের বার্তা দেয়া। মাসিক হেফাজতে ইসলামের লক্ষ্যও এটাই। মানুষ পত্রিকাটি পড়ছে, সঠিক কিছু জানছে। ধরা যায়, আমাদের পাঠকদের কাছে প্রতি মাসে আমরা বার্তা নিয়ে হাজির হই। চলমান ইস্যুর ইসলামি সমাধান, বিশ্নেষণ, খানকার তরবিয়তি কথা, কুরআন-হাদিসের আলাপ, ধর্মীয় ফিকশন-উপন্যাস-সহ আরও বিভিন্ন কিছু থাকে এ পত্রিকায়। নারীদের জন্য আছে অন্দরমহল নামে স্বতন্ত্র বিভাগ, নবীন লেখকদের জন্য আছে ‘গুলমজলিশ’। বর্তমানে পত্রিকার কাটতি অনেক ভালো। আরও ভালো হবে আশা করি। আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ পত্রিকা করে মূলত সেবার অংশ হিসেবে।

আঞ্জুমানের বর্তমান কার্যক্রম

কথা হয় আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের নায়বে নাযিমে আ’লা (যুগ্ম মহাসচিব) শেখ সা‘দ আহমদ আমীন বর্ণভীর সঙ্গে। তার কাছে জানতে চাই আঞ্জুমানের বর্তমান কর্যক্রম সম্পর্কে। ফাতেহকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম জনসাধারণের ধর্মীয় জীবনের উন্নতির লক্ষ্যে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বিগত ৭৭ বছর যাবৎ অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে থেকে বহুমুখী তৎপরতা চালিয়ে আসছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো—পল্লি বাংলার গ্রামে-গ্রামে প্রয়োজনীয় দ্বীনী ইলম হাসিলের ব্যবস্থা করা। মসজিদভিত্তিক তালিমের ধারা চালু করা। এ ছাড়া আঞ্জুমানের রয়েছে স্বতন্ত্র প্রকাশনা বিভাগ। সাধারণ মানুষের উপকার বিবেচনায় নেসাবভিত্তিক গ্রন্থ প্রণয়ন-সহ আঞ্জুমান-কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রকাশনার কাজও চলমান। ইতিমধ্যে ‘নূরুল উলুম’ নামে সাধারণ মানুষের মশকের উপযোগী একটি রিসালাহ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া আঞ্জুমান প্রকাশিত সবগুলো বইকেও নতুনরূপে সাজিয়ে-গুছিয়ে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।

শেখ সা‘দ আহমদ আমীন বর্ণভী মিশন সম্পর্কে আরও বলেন, আমাদের আরেকটি মিশন হলো তরবিয়ত ও তাযকিয়া। পরিশুদ্ধ জাতিগঠনে আত্মশুদ্ধির সহীহ তরীকা অবলম্বনে ইসলাহী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা। এর অধীনে মৌলিক দুটি কর্মধারা রয়েছে—ক. ইউনিয়ন ভিত্তিক চিল্লা খ. মাসিক শবগুজারী। আমাদের আরেকটি মিশন হলো, খেদমতে খালক বা মানবসেবা। আঞ্জুমান আর্থিক সামর্থানুসারে আর্ত-মানবতার সেবা করে। পাশাপাশি আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার তথা সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাও আমাদের অন্যতম একটি মিশন। যেমন দ্বীন-ধর্ম পালনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, ইসলামের অবমাননা ও প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে বেয়াদবি ও কটূক্তি তথা মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত এলে এর প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া এবং সময়োপযোগী কর্মসূচি গ্রহণ করা, ইসলাম বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ইত্যাদি।

মাসিক পত্রিকা হেফাজতে ইসলামের নির্বাহী সম্পাদক পদেও আছেন শেখ সা‘দ আহমদ আমীন বর্ণভী। পত্রিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকাশনা বিভাগে আঞ্জুমানের সবচেয়ে বড় অর্জন ‘হেফাজতে ইসলাম পত্রিকা’। আজ থেকে ৪৮ বছর আগে স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে দেশে যখন হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া সকল পত্রিকা বন্ধ ছিল, হেফাজতে ইসলাম পত্রিকা সেই সময়ে সরকারি অনুমোদন লাভ করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে আমার আব্বাজান হযরত শায়খে বর্ণভী রহমতুল্লাহি আলাইহির ইতিবাচক ভূমিকা থাকার কারণে এবং তাঁর অরাজনৈতিক কর্মপ্রক্রিয়া ও আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সম্যক ওয়াকিবহাল থাকার ফলে সেই সময়ে হেফাজতে ইসলাম পত্রিকা সরকারি অনুমোদন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। তার পর থেকে কয়েকবারের বিরতিসহ দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে পত্রিকাটি চালু আছে। আলহামদুলিল্লাহ, মানুষের ইসলাহ হিদায়াত ও আত্মশুদ্ধির পাথেয় হিসাবে পত্রিকাটি এখন মাসিক পত্রিকা আকারে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।’

The post আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম : সিলেটে ইসলাম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%86%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae-2/

Wednesday, November 16, 2022

আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের দুই দিনব্যাপী ইজতেমা শুরু

ফাতেহ ডেস্ক:

সিলেটে ‘আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র ৭৭বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী ইজতেমা শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর) ফজরের নামাজের পর থেকে ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ১ম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা সাইদুর রহমান বর্ণভী। উদ্বোধনী বয়ান পেশ করেন সংগঠনের আমির মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী।

১৯ নভেম্বর বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সমাবেশ এর আগের দুই দিন ১৭ ও ১৮ নভেম্বর ইজতেমার আয়োজন নিয়ে আয়োজক কমিটিও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে মতানক্যের সৃষ্টি হয়। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইজেতেমা পেছানোর আহ্বান জানালে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ নেতারা ও হেফাজতের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ইজতেমা চলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মুসল্লি সকাল থেকে ইজতেমাস্থলে অবস্থান করছেন। কয়েক হাজার মুসল্লি আলোচকদের বয়ান শুনছেন। সকাল থেকেই আরও দলে দলে আসছেন মুসল্লিরা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ—কমিশনার (অতিরিক্ত দায়িত্ব—মিডিয়া) সুদ্বীপ দাস বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় আয়োজকদের সঙ্গে সভা হয়েছে। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ইজতেমা চলবে বলে সিদ্ধান্ত হয় এবং আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তা জোরদারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে এসএমপি পুলিশের সদস্যরা।

The post আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের দুই দিনব্যাপী ইজতেমা শুরু appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%86%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87/

পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি: মুসলিমবান্ধব পাঠ্যক্রম দাবি মাদরাসা শিক্ষকদের

রাকিবুল হাসান নাঈম:

২০২৩ সালে শুরু হতে যাওয়া নতুন কারিকুলামের পাঠ্যপুস্তক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকরা। তারা বলছেন, ওইসব পাঠ্যপুস্তকে সন্নিবেশিত অধিকাংশ ছবি, শব্দ, বাক্য, তথ্য-উপাত্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মর্মাহত এবং তাদের সস্তানদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা নিয়ে শংকিত করে তুলেছে। তাই তারা এসব বই মাদরাসায় পড়াতে পারবেন না। মাদরাসার জন্য আলাদা পাঠ্যসূচি নির্ধারণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

চলতি মাসের ১৬ নভেম্বর কুরআন-সুন্নাহ ও মুসলিম ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে মাদরাসার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নসহ ১৩টি দাবি জানিয়ে মানববন্ধ করেছে মাদরাসা শিক্ষকদের সর্ববৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সবগুলো জেলায় মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং ওলামা-মাশায়েখ এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। একইসাথে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৩ দফা দাবি সম্বলিত স্মারকলিপিও প্রদান করেন তারা।

জানা গেছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছর ৬২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এনসিটিবির ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির ৯টি বই (বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, গণিত, শিল্প সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, জীবন জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিজ্ঞান) পরীক্ষামূলকভাবে পাঠদান করা হয়। ২০২৩ সাল থেকে ওই বইগুলো সমস্ত স্কুল ও মাদরাসার বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে এনসিটিবি। শিক্ষকরা বলছেন, এই পাঠ্যপুস্তক মাদরাসা শিক্ষার জাতীয় লক্ষ-উদ্দেশ্য (জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এ বর্ণিত) এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট উপেক্ষা করে রচিত হয়েছে।

কী আছে পাঠ্যপুস্তকে?

শিক্ষকরা বলছেন, এসব পাঠ্যপুস্তকে সন্নিবেশিত অধিকাংশ ছবি, চিত্র, শব্দ, বাক্য, তথ্য ও উপাত্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মর্মাহত এবং তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা নিয়ে সঙ্কিত করে তুলবে। যেমন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ৯টি বইয়ের মধ্যে কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইত, মুসলিম মনীষী, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিকদের বাণী, উদ্ধৃতি, নীতি-নৈতিকতা সৃষ্টিকারী কোন বিষয় স্থান পায়নি। উপরন্ত আপত্তিজনক বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন বিজ্ঞান বইয়ে ১১ জন উলঙ্গ নারী-পুরুষের ছবি দিয়ে তাদের লজ্জাস্থানের পরিচয় দেয়া হয়েছে। ৯টি বইয়ে শতশত মেয়ের বেপর্দা ছবি ছাপানো হয়েছে। হিন্দু মহিলার শাঁখা পরা ছবি রয়েছে। ইংরেজি বইয়ে কুকুর ও নেকড়ে বাঘের ২৪টি ছবি ছাপানো হয়েছে, যা ইউরোপীয় সংস্কৃতির অংশ বিশেষ।

তারা আরও বলছেন, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ডারউইনের বিবর্তনবাদ (মানুষ সৃষ্টি হয়েছে বানর থেকে), দেব-দেবীর নগ্ন ও অর্ধনগ্ন ছবি এবং দেবতাদের পরিচয় দেয়া হয়েছে। জীবন জীবিকা বইয়ে ইশপের গল্প, প্রণাম, গানশোনা, নাচ, বাঁশি, হারমোনিয়াম, তবলা, গিটার ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাশ্চাত্য ও মূর্তিপূজার সংস্কৃতি চর্চার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও দূর্গাপুজা, গীতাঞ্জলী, কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বইগুলোতে মানুষের যেসব নাম ব্যবহৃত হয়েছে, একটি মুসলিম দেশে তা সত্যিই আপত্তিকর। যেমন: আনিকা, লিটল, রাড, প্লাবন, রতন, দীপক, নন্দিনী, এন্তি, মিসেল, মনিকা চাকমা, ডেবিট, প্রিয়াঙ্কা, মন্দিরা ইত্যাদি। সামগ্রিক বিবেচনায় ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে পাশ্চাত্য, দেব-দেবীর বিশ্বাস ও তাদের আরাধনার শিক্ষা-সংস্কৃতির আদলে তৈরি বইগুলো স্কুলের জন্যও উপযোগি নয়।

এ প্রসঙ্গে জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহানগর সাধারণ সম্পাদক ড. মাওলানা ঈসমাইল নোমানী ফাতেহকে বলেন, মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে বাংলাদেশের হাজার বছর ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী বহু জিনিস আছে। এমনকিছু নগ্ন ও অশ্লিল ছবি সেখানে সংযুক্ত করা হয়েছে যা বাংলাদেশের কৃষ্টি-কালচার বিরোধী। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারও এই দর্শন ও চিন্তায় বিশ্বাস করেন না। কোন কুচক্রিমহল সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য, নির্বাচনের পূর্বে সরকারকে বিতর্কিত করার জন্য, সুকৌশলে জাতির বৃহত্তর অংশকে মাদরাসা বা দ্বীনি শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞদের অন্ধকারে রেখে হঠাৎ করে এসব বই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেই কুচক্রিমহলের হীন প্রচেষ্টার প্রতিবাদ করছি, প্রতিরোধ করছি।

১৩ দফা দাবি শিক্ষকদের

পাঠ্যপুস্তকের চলমান সংকট নিরসনকল্পে ১৩ দফা দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তারা বলছেন, মাদরাসা শিক্ষার জন্য এ সরকারের প্রণীত ও জাতীয় সংসদে গৃহীত জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০-এ বর্ণিত মাদরাসা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণের উপযোগী স্বতন্ত্র শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই রচনা করতে হবে। আর সে লক্ষ্যেই এনসিটিবি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের বিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ আলেমদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করতে হবে। আর দাবীকৃত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যবই প্রণয়নের পূর্বপর্যন্ত প্রচলিত পঠ্যপুস্তকসমূহ পাঠদান অব্যাহত রাখা হবে।

স্মারকলিপিতে শিক্ষকরা আরও বলেন, সাধারণ শিক্ষায় এসএসসি পরীক্ষা দশটি বিষয়ে ১০০০ নম্বরের অনুষ্ঠিত হবে। মাদরাসা শিক্ষার দাখিল পরীক্ষার জন্য মূল বিষয় ঠিক রেখে সমন্বয় সাধন করে ১০০০ নম্বর নির্ধারণ করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ন্যায় স্বতন্ত্র ও সংযুক্ত ইবতেদায়ী শিক্ষার্থীদেরকে উপবৃত্তি, টিফিনসহ সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে হবে। মহিলা কোটা শিথিল ও সংশোধনপূর্বক যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। আরবি প্রভাষকগণের উচ্চতর পদে আসীন হওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত ২০১৮ সালে প্রণিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসার নীতিমালা শতভাগ বাস্তবায়ন করারও আহ্বান জানান শিক্ষকরা।

পাঠ্যপুস্তক মুসলিমবান্ধব করার দাবি

ঢাকা মহানগরের জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা আবু জাফর মো. ছাদেক হাছান মনে করেন, বর্তমান সরকারের সাফল্য ম্লান করতে এনসিটিবিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কিছু ব্যক্তি মাদরাসা, ইসলাম শিক্ষা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কারিকুলাম তৈরি করেছেন। তিনি ফাতেহকে বলেন, তারা তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারকে বিতর্কিত করতে চায়। অবিলম্বে এদেরকে চিহ্নিত করে অপসারণ করতে হবে এবং মাদরাসার জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষাক্রম তৈরি করতে হবে। যেটা হবে মাদরাসা ও ইসলাম বান্ধব। আমরা একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা উপহার দিতে চাই। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষার সাথে সাধারণ, বিজ্ঞান শিক্ষার সমন্বয় করে একটি নীতি-নৈতিকতা সম্পন্ন আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। আমরা খাটি ওয়ারিসাতুল আম্বিয়া তৈরি করতে পারবো। এদেশে মুসলমান ও ইসলামী আকিদা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

দাবি পূর্ণ না হলে এদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ, পীর-মাশায়েখদের নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি পালন করার কথাও বলেন তিনি।

আলেমরা বলছেন, খুব দ্রুত দেশের বরেণ্য আলেমদের অংশগ্রহণে একটি যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও তদারকি এখন সময়ের দাবি। যুগের চাহিদা পূরণে শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষাক্রম পরিবর্তন, পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। কেবল একটি মুসলিম দেশের পাঠ্যক্রম অমুসলিম দেশের মতো উপাদান দিয়ে ঢেলে সাজানোতে দ্বিমত।

The post পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি: মুসলিমবান্ধব পাঠ্যক্রম দাবি মাদরাসা শিক্ষকদের appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%a8/

Tuesday, November 15, 2022

জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি বাংলাদেশ

ফাতেহ ডেস্ক:

‘ইউক্রেনের ওপর আগ্রাসনের ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার’ শীর্ষক একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। ওই প্রস্তাবে ভোটদান থেকে বিরত ছিল বাংলাদেশসহ ৭৩টি দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সময় সোমবার (১৪ নভেম্বর) এই প্রস্তাব উপস্থাপন ও পাস হয়। সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৯৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় ১৪টি দেশ।

সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে ইউক্রেন। ওই প্রস্তাবে ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য রাশিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনে প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি ও আহতদের জন্য রাশিয়াকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করার কথাও বলা হয়েছে।

প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান, ব্রাজিল, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, নেপাল, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় চীন, বেলারুশ, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ইরান, রাশিয়া ও সিরিয়া।

পাস হওয়া ওই প্রস্তাবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনে হামলার ক্ষতিপূরণ বহন এবং এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট যে কোনো ক্ষয়ক্ষতির দায়িত্বও রাশিয়াকে নিতে হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: দ্য ওয়্যার, টাইমস অব ইন্ডিয়া

The post জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি বাংলাদেশ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%98%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d/

কওমি মহিলা মাদরাসা: শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য-বিপর্যয়ে শঙ্কায় শিক্ষকরা

রাকিবুল হাসান নাইম:

কওমি মহিলা মাদরাসায় ছাত্রীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে শঙ্কায় আছেন শিক্ষকরা। সঠিক আবাসন ব্যবস্থার অভাব এবং ছাত্রীদের অবহেলার কারণে এই শঙ্কা দিনদিন বাড়ছে। শঙ্কা থাকলেও শঙ্কা নিরসনে তেমন উদ্যোগ নিচ্ছেন না মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। মহিলা মাদরাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা বলছেন, এখানে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের যেমন অবহেলা রয়েছে, তেমনি ছাত্রীদেরও অবহেলা রয়েছে। দু পক্ষেরই এ বিষয়ে উদ্যোগের অভাব রয়েছে।

সমস্যা কোথায়?

এ প্রসঙ্গে কথা হয় মাদরাসাতুল মদীনা বগুড়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতী মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি এক মহিলা মাদরাসায় স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনাও করেছেন। তিনি ফাতেহকে বলেন, মহিলা মাদরাসায় স্বাস্থ্য সচেতনতা একদমই কম। প্রথমত, মাদরাসার পক্ষ থেকে ছাত্রীদেরকে কখনও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কথা হয় না। দ্বিতীয়ত, ছাত্রীরা পবিত্রতার আধুনিক পদ্ধতিগুলো জানে না। তৃতীয়ত, মাদরাসা কর্তৃপক্ষেরও কোনো পরিকল্পনা নেই, মেয়েরা তাদের মাসিকের সময় কীভাবে কোথায় থাকবে, পরিচ্ছন্ন হবে। দরকার হলে কোথায় প্যাড পাবে। এসব নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। চতুর্থত, মেয়েদের এই বাড়ন্ত বয়সে পুষ্টির দরকার হয় বেশি। কিন্তু তারা খাবারে সেই পুষ্টি পায় না। মাদরাসাও সরবরাহ করে না। ছাত্রীরা নিজেরাও খায় না। ফলে মাদরাসার ছাত্রীদের বিভিন্ন শারীরীক সমস্যা দেখা দেয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি, ছাত্রীরা তাদের রোগের কথা পরিবারকেও বলে না, ডাক্তারদেরও বলে না। ফলে সমস্যা বাড়তে থাকে।

কথা হয় মুনীরুল ইসলাম আরাবির সঙ্গে। তিনি ফাতেহকে বলেন, আমি বালক মাদরাসার পাশাপাশি বালিকা মাদরাসায়ও কিছুদিন খেদমতে ছিলাম ৷ এসব ব্যাবস্থাপনা খুব কাছ থেকে দেখা এবং বুঝার সুযোগ হয়েছে৷ চান্দিনায় সবচে উন্নতমানের আবাসন ব্যাবস্থা ছিল আমাদের ৷ প্রথম বছর প্রায় দুইশো ছাত্রী ভর্তি হয় ৷ তার কারণ হলো, আমাদের বালক মাদরাসার লেখাপড়া এবং স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যাবস্থার সুনাম ছিল ৷ অনেক অভিভাবককে দেখেছি, মেয়েদের ভর্তি করার পূর্বে তারা প্রতিষ্ঠানের আবাসন ব্যাবস্থা দেখতে আসেন ৷ তাদের কমন একটা অভিযোগ হলো, এর আগে যে মহিলা মাদরাসায় গিয়েছে কোথাও আবাসন ব্যাবস্থা ভালো পায়নি ৷ ফলে অনেক সচেতন অভিভাবক মহিলা মাদরাসা থেকে ফিরে আসেন ৷

তিনি আরও বলেন, মহিলা মাদরাসার সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও লেখাপড়ায় গতি হারাচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় ৷ আমাদের কুমিল্লা চান্দিনা উপজেলায় চারটা দাওরা হাদীস মহিলা মাদরাসার পাশাপাশি প্রায় ৬৫টি মহিলা মাদরাসা আছে ৷ ছেলে মাদরাসা আছে ১১৮-এর অধিক ৷ এগুলো আবার থানা ভিত্তিক মাদরাসা সংগঠনের আওতাভুক্ত ৷ তার বাইরে বেহিসেবি আরো মাদরাসা আছে ৷ হাতেগোনা কয়েকটি স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়া বাকি সবগুলো প্রাইভেট মাদরাসা। অধিকাংশ মাদরাসার আবাসন ব্যাবস্থা খুবই নাজুক ৷ অল্প জায়গায় অধিক ছাত্রী ভর্তি করার ফলে পড়ালেখার পাশাপাশি থাকা-খাওয়া ঘুমেও নানাবিদ সমস্যায় জর্জরিত ৷ আর এসব সমস্যা প্রকটভাবে ফুটে উঠে ঋতু পরিবর্তেনর সাথে সাথে ৷ বিশেষ করে গরমকালে এসব মাদরাসার অবস্থা হয় ভয়াভহ ৷ বিভিন্ন রোগ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পুরো মাদরাসায় ৷

এসবের জন্য তিনি অনেকাংশে দায়ী করেন মাদরাসার পরিচালকদের। তার মতে, এসব সমস্যা দূর করতে কওমি মাদরাসার অভিভাবক বেফাক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে ৷ থানা কিংবা জেলায় জেলায় পরিচালকদের নিয়ে কাউংসিলিংয়ের ব্যাবস্থা করলে কিছুটা হলেও ফলপ্রসূ হবে বলে আমি মনে করি ৷ তবে পরিচালকদের সদিচ্ছা, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, এবং খেদমতে মানসিকতা না থাকলে এসব থেকে উত্তরণ কখনো সম্ভব না ৷

শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি থানার এক মহিলা মাদরসার প্রাক্তন শিক্ষক আবু ইয়সির ফাতেহকে বলেন, মহিলা মাদরসায় খাদ্য সচেতনতা কম। ঢালাও ভাবে বেসিক কয়েকটি খাদ্য সারা বছর খাওয়ানো হয়। যেমন আলু , লাউ, বেগুন, শুটকি, পাংগাস, পল্টি মুরগি, তেলাপিয়া ইত্যাদি। এসব খাদ্যের মধ্যে যেই পুস্টিগুণ রয়েছে, সেগুলো ছাড়া বাকিগুলোর ঘাটতির কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। তা ছাড়া বেশির ভাগ মেয়েদের মধ্যে অপরিস্কার থাকার মানসিকতা প্রবল। আমি যখন মহিলা মাদ্রাসার নাজেমে তালিমাত ছিলাম, এমন কোন দিন ছিল না যেদিন গড়ে ১০ জনকে হাসপাতালে নিতে হয়নি। আমার রুমে ছোট একটা ফার্মেসি দিয়ে রাখার পরেও।

সমস্যা নিরসনে পরামর্শ

মিরপুর ১২ নম্বরস্থ জামিয়া মিল্লিয়া মাদানীয়া আরাবিয়া আজমা মহিলা মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম মুফতি ইমরান কাসেমীর সঙ্গে কথা হয়। তার মাদরাসায় ১২০০ ছাত্রী রয়েছে। এ সমস্যা স্বীকার করে তিনি বলেন, করোনার পর আমার মাদরাসায় একজন ডাক্তার রেখেছিলাম। তিনি সপ্তাহে দুদিন এসে ছাত্রীদের ওষুধ দিতেন, কার কী সমস্যা শুনতেন। এখন আর নেই। করোনার পর থেকে এই সেবাটা বন্ধ। তবে সবসময় তিনি তৎপর আছেন।

তিনি বলেন, মেয়েদের বড় কোনো রোগ না হলে কর্তৃপক্ষের কাছে খবর আসে না। তাই কোনো শিক্ষিকাকে এটার জন্য নিয়োগ করতে হয়। আমি সেটা করেছি। তারা যেন খবর নিয়ে আমাকে জানায়। সব মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট একজন ডাক্তার রাখতে পারেন। সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক চেকাপের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাহলে সমস্যাটা সহজেই ধরা পড়বে। ছাত্রীরাও রোগ নিয়ে বসে থাকবে না।

আবাসন ব্যবস্থার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা ঠিক, অনেক মাদরাসা এখন এত সংকীর্ণ জায়গায় গড়ে উঠে, ছাত্রীদেরকে বড় কোনো স্পেস দেয়া যায় না। তাই চেষ্টা করতে হবে, যতটুকু জায়গা আছে, তা পরিস্কার রাখা। ছাত্রীদেরকে এবং মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে যত্মবান হতে হবে। কারণ মেয়েরা এমনিতেই সংবেদনশীল। পুরুষের মতো অতটা শক্তপোক্ত নয়। তাই তাদেরকে কিভাবে পুষ্টিকর খাবার দেয়া যায়, তার চিন্তাও করতে হবে।

The post কওমি মহিলা মাদরাসা: শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য-বিপর্যয়ে শঙ্কায় শিক্ষকরা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a6%93%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7-2/

Monday, November 14, 2022

মাদক কারবারিদের গুলিতে ডিজিএফআই কর্মকর্তা নিহত

ফাতেহ ডেস্ক:

বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তে মাদক চোরাচালানকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ডিজিএফআই-এর এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এসময় র‌্যাবের আরেক কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। র‌্যাব-ডিজিএফআইয়ে যৌথ অভিযান চলাকালে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাদক চোরাচালানকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে মাদক চোরাচালানকারীদের গুলিতে দায়িত্বরত অবস্থায় ডিজিএফআইয়ের একজন কর্মকর্তা (বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা) দেশের জন্য আত্মত্যাগ করে শহীদ হন। এছাড়া র‌্যাবের এক সদস্য আহত হয়েছেন।

The post মাদক কারবারিদের গুলিতে ডিজিএফআই কর্মকর্তা নিহত appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%95-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%a1/