Friday, June 25, 2021

শেষের কবিতা ও অয়ং ভয়ং রবীন্দ্রনাথং

মওলবি আশরাফ:

মোকদ্দমা 

বিবাদী দেবেন্দ্রনাথ-পুত্র রবীন্দ্রনাথের নামে বিদেশি সাহিত্য থেকে চুরি ও নকলের দায়ে ‘পাঠকের আদালতে’ দায়ের করা মোকদ্দমায় আমরা দুই ধরনের বিচারক পাই : একদল রবীন্দ্রনাথকে ‘চোর, কপিবাজ, লেখকই না’ ইত্যাদি বিশেষণের বিষমাখা খঞ্জর দিয়ে তীব্র আক্রমণ করে, আর অপর দল কেবল স্বীকার করে নেন রবীন্দ্রনাথ চুরি করেছেন। তৃতীয় আরেক দল (বিচারক না বলে উকিল বললেই বেশি খাপসই হবে) যারা প্রথম দলের ওপর ড্রামাটিক সুরে ‘অবজেকশন ইয়োর অনার’ বলবে, তাদের সন্ধান এখনতক প্রবন্ধকার পাননি, তাই তিনি দীর্ঘদিনের লাল গাউন ফেলে নিজেই কালো গাউন পরে দরবারে হাজির হয়েছেন। ইয়োর অনার, আমার মত ও অমত প্রকাশে আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি।

প্রথমেই স্বীকার নিচ্ছি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আজকের দিন পর্যন্ত চর্চা ও বাকবিতণ্ডা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের দৈন্যতাকেই বারবার সামনে এনে হাজির করে। সলিমুল্লাহ খান যখন বলেন রবীন্দ্রনাথকে তিনি আক্রমণ করেন এইজন্য যে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে শক্তিশালী কাউকে তার নজরে পড়ে না, আর নিজের শক্তিমত্তার পরীক্ষা তো আরেকজন শক্তিশালীর সাথে দৈতযুদ্ধেই হয়— আমরা তখন দ্বিমত পোষণ করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথকে বলা যায় রাঘব বোয়াল, তার সামনে কোনো পুটিমাছই টিকে থাকেনি, তার নানামুখী শক্তিমত্তা এত বেশি যে, ‘রবীন্দ্রনাথ কে’ এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এক শব্দে দিতে পারি না, কেননা শিল্প-সাহিত্যের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিক নেই যেখানে তিনি হাত দেননি। যেখানে আর সব শিল্পীদের শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব প্রথম যৌবনেই ফুরিয়ে যায়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ যত বুড়ো হয়েছেন তাঁর শিল্পত্বের রোশনাই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। জীবদ্দশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে অভিজাতকূল শ্রীমতী নারীরূপে উপস্থাপন তো করেছিলেনই, মৃত্যুর পরেও রেখে গেছেন বৃহস্পতিতুল্য প্রভাববলয়। এটা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক বৈ অন্য কিছু নয়। মৃত্যুর আশি বছর পরেও তার চেয়ে মহান কারুর সময়কে প্রতিনিধিত্ব না করাই প্রমাণ করে আমরা এক জায়গায় আটকে আছি, থেমে আছে ঘড়ির কাঁটা প্রায় এক শতক ধরে, আমাদের প্রগতিশীলতার পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন রয়নি। একথার সাথে সুর মিলিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও, শেষের কবিতায় তিনি বলেন, ‘কবিমাত্রের উচিত পাঁচ-বছর মেয়াদে কবিত্ব করা…

ভালো লাগার এভোল্যুশন আছে। পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে, সে মরে গেছে। একটু ঠেলা মারলেই তার নিজের কাছে প্রমাণ হবে যে, সেন্টিমেন্টাল আত্মীয়েরা তার অন্ত্যেষ্টি-সৎকার করতে বিলম্ব করেছিল, বোধ করি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীকে চিরকাল ফাঁকি দেবার মতলবে।’

রবীন্দ্রনাথ একই সাথে সব্যসাচী আবার ছিলেন খুব উর্বর ও প্রভাবশালী। অনেক বাদীর ক্ষোভের পেছনে এই কারণটি থাকতে পারে। তারা হরেক পদ্ধতিতে হরহামেশাই চান রবীন্দ্র-বলয় ডিঙাতে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আরো মহান বানাতে এর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি, কিন্তু তাই বলে রবীন্দ্রনাথকে ইনকার করে রবীন্দ্র-বলয় ডিঙানোর জরুরত নেই। তারপরও বাদীপক্ষের অভিযোগ আমরা শুনব, নাহলে কোনো ফয়সালায় পৌঁছা সম্ভব হবে না ইয়োর অনার।

বলা হয় রবীন্দ্রনাথ একসময় ‘দ্বিতীয় চ্যাটার্টন’ হবার ‘চেষ্টায় প্রবৃত্ত’ হয়েছিলেন। রাসেল রায়হান লিখেন : টমাস চ্যাটার্টন ছিলেন জনৈক ইংরেজ কবি। এই ভদ্রলোক প্রাচীন গ্রিক কবিদের নকল করে কবিতা লিখতেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করলেও তার সময়ে বেশ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। চ্যাটার্টনের এই নকল করার ঘটনাটা রবীন্দ্রনাথকে খুব স্পর্শ করল। তিনি তখন মৈথিলী ভাষার কিছু প্রাচীন কবিতা-টবিতা আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন। প্রাচীন কবিদের লেখা পড়তে পড়তে হঠাৎ দু–একটি ‘কাব্যরত্ন’ চোখে পড়ে, সে আবিষ্কারে তিনি অন্ধকারে মাণিক্য তুলে আনার আনন্দ পান। চ্যাটার্টনের গল্প শুনে হঠাৎ বালক রবীন্দ্রনাথের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। এক বর্ষার দুপুরে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে ওই মৈথিলী কবিতার অনুকরণে লিখে ফেলেন কয়েক লাইন কবিতা। নিজের কৃতিত্বে তখন দারুণ খুশি তিনি। কয়েক দিনের মধ্যেই লেখা হতে থাকল আরও কয়েকটি। এবার লেখকেরও তো একটা নাম দিতে হয়। তাই নিজেই নাম ঠিক করলেন—ভানুসিংহ। পরবর্তীতে এই কবিতার সংকলনই হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’

কৈশোরের ব্যাপারস্যাপার সহনীয় চোখে দেখা যায়, কিন্তু বাঙালির গর্ব নোবেল পদক পাওয়া যেই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে, গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমা The song offerings-এর বিভিন্ন কবিতায় বাইবেলের Songs of Solomon-এর মধ্যে খুল্লামখোল্লা মিল পান, মিল পান বেশ কিছু খ্রিষ্টীয় গানেও, তখন রবীন্দ্রমোল্লাদের মুখের বাত্তি ডিম হয়ে যায়, বলার কোনো কথাই পান না।

এছাড়াও ‘চিত্রা’ কাব্যের ‘এবার ফিরাও মোরে’ এবং ‘মানসী’ কাব্যের ‘বধূ’ কবিতা দুটির ভাব ও কাঠামো ইংরেজ কবি শেলি ও ওঅর্ড্‌স্‌ওঅর্থের কবিতার নকল বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এডগার এলান পো ও ন্যাথানিয়েল হর্থনের গল্পের মিল রয়েছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গল্পে। এরমধ্যে ‘রবিবার’ গল্পটি এলান পো’র ‘দ্য এথিস্ট’ গল্পের হুবহু কপি।

তবে একথা এড়িয়ে যাবার জো নেই যে, বাদীপক্ষের কারো কারো মোকদ্দমায় হিংসার হলদে অনল নিশ্চিতরূপে ছিল, নয়তো কালীপ্রসন্ন বিদ্যাবিশারদ তার ‘মিঠেকড়াতে’ এভাবে লিখতে পারতেন না— “রবীন্দ্রনাথ মোটেই লিখতে জানতেন না, স্রেফ টাকার জোরে ওর লেখার আদর হয়। পাঁচকড়ি বাবু একথাও বহুবার স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রায় যাবতীয় সৃষ্টিই নকল। বিদেশ থেকে ঋণ স্বীকার না করে অপহরণ।”
মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম লিখেন, “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেসব কবিতা লিখেছেন তার অধিকাংশই অন্য কবির কবিতা থেকে চুরি করে লিখেছেন।”

জবানবন্দি 

তো আমি আজকের সভায় বিচারকের সামনে উপস্থাপন করব রবীন্দ্রনাথের কাব্যধর্মী উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’। কারো কাছে উপন্যাসটি যেমন ‘নেহাৎ মামুলি একটি গল্প শব্দবিন্যাসের জোরে জমানা উতরে গেছে’ মনে হয়, আবার কারো জবানে ‘ক্লাসিক, মনস্তাত্ত্বিক, কালজয়ী, অনন্য শিল্পকর্ম’ বিশেষণে আদৃত। বাংলাভাষীদের সাহিত্যচর্চার সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি আখড়ায় যুক্ত হওয়ার সময় ভাইভাবোর্ডে ‘শেষের কবিতা’ থেকে প্রশ্ন করা হয়, তারা মনে করেন ‘এখন পর্যন্ত যিনি শেষের কবিতা পড়েননি, বাংলাসাহিত্যের দরজার চৌকাঠে তার পা পড়েনি।’ তো আসল কথা হলো— এমন সুপ্রসিদ্ধ একটি উপন্যাসে খোদ রবীন্দ্রনাথই অমিত রায় চরিত্রের মুখ দিয়ে দিয়েছেন তার চুরির জবানবন্দি!

ঘটনা অনেকটা এমন : অমিত রায় খুবই ব্যতিক্রমী এক চরিত্র। একদিন ওদের বালিগঞ্জের এক সাহিত্যসভায় রবি ঠাকুরের কবিতা ছিল আলোচনার বিষয়। অমিতের জীবনে এই সে প্রথম সভাপতি হতে রাজি হয়েছিল… একজন সেকেলেগোছের অতি ভালোমানুষ ছিল বক্তা রবি ঠাকুরের কবিতা যে কবিতাই এইটে প্রমাণ করলেন। দুই-একজন কলেজের অধ্যাপক ছাড়া অধিকাংশ সভ্যই স্বীকার করলে, প্রমাণটা একরকম সন্তোষজনক। সভাপতির আলোচনার পালা এলে অমিত রায় রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করে নানা কথার ফাঁকে একথাও বলেন—
‘… রবি ঠাকুরের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড়ো নালিশ এই যে, বুড়ো ওঅর্ড্‌স্‌ওঅর্থের নকল করে ভদ্রলোক অতি অন্যায়রকম বেঁচে আছে।’

একদম সরল স্বীকারোক্তি। তবু সওয়াল ওঠে, একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক চুরি করে নকল করে কেবল স্বীকারোক্তি দিলেই কি বেকসুর খালাস?

এই সওয়ালের জবাব দেওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে সাহিত্যে ও শিল্পে চুরি বা নকল অনৈতিক কিনা। বুড়ো সক্রেটিসকে কি যদি আবার আদালতে হাজির করি, তিনি প্লেটোর মুখ দিয়ে বলবেন, ‘যথাযথ শাসিত একটি রাষ্ট্রে কবি ও শিল্পীদের প্রবেশকে নিষিদ্ধ করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।’ কী কারণে কবি ও শিল্পীদের ওপর এমন দয়ামায়াহীন রায়, যদি এই প্রশ্ন করি, প্লেটোর মুখ দিয়ে সক্রেটিস তখন বলবেন, ‘উত্তমত্ব এবং মন্দত্বের প্রশ্ন যখন আসে, তখন অনুকৃত-জিনিস অনুকরণকারী সৃষ্টি করে, তার ব্যাপারে তার যেমন কোনো ধারণা থাকে না, তেমন সত্য অভিমতও থাকে না।…
কবি যখন সৃষ্টি করে, তা কি ভালো, না মন্দ, তা না জেনেই কবিতা রচনা করে যেতে থাকে : আর যে অনুকৃতি তিনি সৃষ্টি করেন, তা হয় নাদান আমজনতার রুচিতুষ্টিকারী জিনিস।… কেননা অনুকরণ সবসময় সত্য থেকে দুই কদম দূরে অবস্থিত।’ (প্লেটোর রিপাবলিক, দশম পুস্তক, অনুবাদ : আমিনুল ইসলাম ভুইয়া)

এই বক্তব্য যুগ যুগ মানুষদের ভাবিয়েছে, ক্রিটিকেরা আলোচনা-সমালোচনা করেছে, অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়েছে যে, একজন শিল্পীর কাজ নয় আদর্শের জন্য কবিতা লেখা, তবে তারা চাইলে পারে কবিতায় শিল্পে কোনো আদর্শকে উপস্থাপন করতে, কিন্তু সৃষ্টির ব্যাপারে তারা স্বাধীন। একজন কবি যখন শব্দ দিয়ে কিছু আঁকেন, একজন চিত্রশিল্পী যখন তার ক্যানভাসে কবিতা বুনন করেন, তখন তারা নির্মাণ করেন আপন গতিপথ, আপন ধর্ম।
একজন শিল্পীর শিল্পচেতনা জন্ম নেয় প্রকৃতি কিংবা সামাজিক বাস্তবতা কেন্দ্র করেই, কিন্তু শিল্পীর জন্য জরুরি নয় সামাজিক-রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণ করা।

শিল্পী কোনো নীতি-নৈতিকতার প্রচারক বা নবী নয়। শিল্পী যদি নিরাবরণ শরীরকে পবিত্রতার প্রতীকী বানায়, তবে তা-ই সই। কারণ শিল্পী স্রেফ সৌন্দর্যের পূজারী, আর সত্যকেই কেবল সুন্দর হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, মিথ্যাও সুন্দর হতে পারে। মিথ্যাও মানুষকে তৃপ্ত করতে পারে, আবার তৈরি করতে সত্যকে গ্রহণ করার নতুন যৌক্তিকতা।মিথ্যা না থাকলে সত্য সত্যই-বা হবে কি করে

তাছাড়া নীতিনির্ধারকের ছাঁকনিতে ঢালার আগে যেকোনো জিনিসই সত্য কিংবা মিথ্যা হওয়ার গুণসম্পন্ন থাকে। এখন যদি আইন করা হয় কোনো মিথ্যা সৌন্দর্য সৃষ্টি করা যাবে না, তাহলে গোটা সৃষ্টিশীলতার পথই রুদ্ধ হয়ে যাবে, যা কিছুতেই উচিৎ নয়। কোনটা উত্তম কোনটা মন্দ, কোনটা গ্রহণীয় কোনটা অগ্রহণযোগ্য— সেটা নাহয় নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র বা ধর্ম। কিন্তু শিল্প চিরকাল স্বাধীন। এবং শিল্পের ওপর এই বিধিনিষেধ আরোপ করাও সম্ভব নয়।

একটু আবেগী হয়ে প্লেটো-সক্রেটিসে চলে গেলেও আমাদের মাথার ওপরে কিন্তু এখনও এই প্রশ্ন ঝুলছে— ‘শিল্পে চুরি বা নকল কি জায়েজ?’

ইতোমধ্যে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, ‘কবি বা শিল্পী প্রচলিত নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হন না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেন নয়া নয়া নীতি।’ শিল্পে ও সাহিত্যে চুরি বিষয়ে তাদের নীতি হলো এটি বিনাপ্রশ্নে জায়েজ!

কেন এই নীতি? কারণ এই অমীয় বাণী : ‘এন কোল খাদাশ তাখাত হাশামেশ’— সূর্যের নীচে নতুন কিছুই ঘটে না। (אֵין כָּל חָדָשׁ תַּחַת הַשָּׁמֶשׁ‎ —Hebrew bible, Old testament, Ecclesiastes, 1:9)

আরেকটু পষ্ট করে বলি, একই সূর্যের নীচে নতুন কিছু যদি ঘটে তাহলে শিল্পের জন্ম তো এভাবেই হবে যে, শিল্পী এখান থেকে একটু নিবে ওখান থেকে একটু নিবে তারপর সবগুলোর মিশ্রণ ঘটিয়ে সৃষ্টি করবে নতুন এক কিছু।

Art is a Mutation— শিল্প জিনিসটা হলো রূপান্তর। ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার মতো রূপ বদলে বদলে একে শক্তিশালী হতে হয়। যত বেশি হোস্ট ধরতে পারবে আর শুষে নিতে পারবে শক্তি, ততই সে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে। এই জন্যই আহমদ ছফা ব্রাত্য রাইসুকে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই যে বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে তালি দেওয়ার ক্ষমতা এটাই মানুষকে বড় করে।’

সাহিত্যে চুরি বা নকলকে বলা হয় প্রভাব। জর্মন কবি গ্যোয়েটে যেমন বলেন, “সাহিত্যে তালি মারা একটা আর্ট। একে (স্থূল অর্থে) চুরি বলা ঠিক না। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল এখানে খাটাতে হয়।”

ইংরেজিতে এর জন্য আলাদা টার্ম আছে, Plagiarism —এর অর্থ সাহিত্য ভাবনা চুরি বা অপহরণ। বাংলায় এর প্রতিশব্দ বানানো হয়েছে : কুম্ভীলকবৃত্তি। (বাদীপক্ষের রসকষহীন যেসব মনোবিজ্ঞানী লেখা চুরিকে মেন্টাল ডিজঅর্ডার অভিহিত করেছেন, তারা এর নাম দিয়েছেন— স্কাপিসট্রি।)

প্রভাব বিষয়ে বিভিন্ন লেখকদের টুকরো টুকরো অনেক কথা আছে। যেমন :
অস্কার ওয়াইল্ড বলেন, “অপরের ধারণা যুক্ত করে চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠা লেখকের অধিকারের মধ্যে পড়ে।”
আমেরিকান নাট্যকার উইলসন মিজনার বলেন, “একজনের লেখা বা ভাবনা অনুকরণ যদি দূষণীয় হয়, তবে দুজন বা ততোধিক লেখকের ধারণা বা ভাবনার অনুসরণ কী করে গবেষণার স্বীকৃতি পেতে পারে? তাহলে তো আর গবেষকদের ভাতই নেই। গবেষণা মাত্রই চুরি।”
তবে প্রভাব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক মঁসিয়ে অঁদ্রে জিদ থেকে। তিনি তার ‘সাহিত্যে প্রভাব’ প্রবন্ধে লিখেন ‘এমন কিছু কল্যাণকর প্রভাব আছে, যা সাধারণের চোখে ভালো মনে হয় না। অথচ প্রভাবকে চূড়ান্তভাবে ভালো বা মন্দ কোনোটাই বলা উচিত নয়। কারণ প্রভাবের যাচাই হয় যিনি প্রভাবিত হন তাঁর ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতায়।’
অঁদ্রে জিদ আরও বলেন,
‘প্রভাবকে ভয় করে যাঁরা দূরে সরে থাকেন তাঁরা আত্মার দৈন্যকেই তুলে ধরেন। তাঁদের মাঝে নতুন কিছু খোঁজা বৃথা। কেননা নতুন কিছু অর্জনের প্রয়াস তাঁদের মাঝে নেই।’…
‘মহৎ ব্যক্তিরা হৃদয়ের সকল আকুতি দিয়ে প্রভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ মহৎ সৃষ্টির সম্ভাবনার প্রতীক্ষায় এঁরা নববধূর মতোই কম্পিত-বক্ষ। হৃদয়ের বিপুল সম্ভারকে এঁরা নিশ্চিতরূপে জানেন’…
(সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক তিনটি ফরাসি প্রবন্ধ, অনুবাদক : মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ)

ইয়োর অনার, হয়তো খেয়াল করেছেন যে, শিল্প ও সাহিত্যে চুরির বৈধতা দিতে গিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব আমিও চুরি করে জোড়াতালি লাগিয়ে উপস্থাপন করছি। পাবলো পিকাসো কতই-না চমৎকার বলেছেন, ‘ভালো শিল্পীরা নকল করেন আর মহান শিল্পীরা করেন চুরি!’

ফয়সালা 
রবীন্দ্রনাথ বিদেশি সাহিত্য থেকে যে চুরি করেছিলেন এতে তো কোনো সন্দেহ নাই, তবে আমি মনে করি তার মনোজগৎ সবচেয়ে বেশি ঋদ্ধ হয়েছিল ফারসি সাহিত্য থেকে। গীতাঞ্জলিকে যারা বলেন বাইবেলপ্রভাবিত, আদতে তারা ফারসি সাহিত্যের খবর রাখেন না। আমি তো বরং গীতাঞ্জলির ছত্রে ছত্রে ফারসি সাহিত্য আর পারসিক সুফিবাদ খুঁজে পাই।
ইয়োর অনার, গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমার প্রথম কবিতায় যখন পড়ি :
❝আমারে তুমি অশেষ করেছ।
এমনি লীলা তব।
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ
জীবন নব নব।
কত যে গিরি কত যে নদী-তীরে
বেড়ালে বহি ছােটো এ বাঁশিটিরে,
কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
কাহারে তাহা কব॥❞
গুরুদেবের মানবাত্মার সাথে বাঁশির উপমা আমাকে মনে করিয়ে দেয় মওলানা জালালুদ্দিন রুমির মসনবির প্রথম দ্বিপদী :
❝লো বাঁশরি, শোন আমার কথা—
প্রিয়’র বিরহে আমার যত যাতনা❞
রুমিও সেখানে আত্মাকে বাঁশঝাড় থেকে বিচ্ছিন্ন বাঁশির সাথে তুলনা করেছিলেন। অসম্ভব নয় রবীন্দ্রনাথ মওলানা রুমি থেকে ‘ভাবচুরি’ করেছিলেন।
খোদ রবীন্দ্রনাথ যখন পারস্য সফরে যান, তখন জনৈক পারস্যবাসীকে বলেন, ‘…আপনাদের পূর্বতন সুফীসাধক কবি ও রূপকার যারা আমি তাদেরই আপন, এসেছি আধুনিক কালের ভাষা নিয়ে; তাই আমাকে স্বীকার করা আপনাদের পক্ষে কঠিন হবে না।’ (পারস্য যাত্রী, পৃ. ৪১)
কবি হাফিজের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এইভাবে, “এই সমাধির পাশে বসে আমার মনের মধ্যে একটা চমক এসে পৌঁছল, এখানকার এই বসন্তপ্রভাতে সূর্যের আলোতে দূরকালের বসন্তদিন থেকে কবির হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত। মনে হলো আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রূকুটি। তাদের বচনজালে আমাকে বাঁধতে পারেনি; আমি পলাতক, ছুটি নিয়েছি অবাধপ্রবাহিত আনন্দের হাওয়ায়। নিশ্চিত মনে হলো, আজ কত-শত বৎসর পরে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।”(পারস্য যাত্রী, পৃ. ৪৩)
ফারসি সাহিত্যে বা সুফিবাদে লাইলি-মজনুর উপস্থিতি খুব বেশি রকম পাওয়া যায়। এই লাইলি হলো পরমাত্মার রূপক আর মজনু মানবাত্মার। মানবাত্মার মাঝে সবসময় ছটফটানি থাকে পরমাত্মার সাথে মিলনের, এটাই বিভিন্ন রূপকল্পে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে প্রতিটি গল্পই বিয়োগান্তক। মানে, মজনু কখনোই লাইলিকে পায় না, এমনকি অনেক সময় মনে হয় মজনু চায়ও না লাইলির সাথে তার মিলন হোক, সে এরকম ছটফটানি নিয়েই অনিঃশেষ সময়কাল থাকতে চায়।
এই লাইলি-মজনুই বৈষ্ণব পদাবলিতে গিয়ে হয়ে যায় কৃষ্ণ আর রাধা। রবীন্দ্রনাথ দু’হাত ভরে ভরে এই দুইখান থেকে প্রভাব গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু …
একটা গল্প শুনেছি বাবার মুখে। এক গ্রাম্য লোকের দুই মেয়ে ছিল। বড় মেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারেননি, তাই পাশের গ্রামের অশিক্ষিত তবে সহজসরল একজন ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেন। আর ছোট মেয়ে ছিল বুদ্ধিমতি ও মেধাবী, তাই তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে বিয়ে দেন পণ্ডিতবাড়িতে, জামাইবাবু কিনা সংস্কৃত ভাষার মাস্টার। গ্রাম্য লোকটি ছোট জামাই নিয়ে খুব গর্ব করতেন, সবসময় তার কথা হাঁটেবাজারে বলে বেড়াতেন, আর ওদিকে অশিক্ষিত বলে বড় জামাই নিয়ে লজ্জিত ছিলেন। বড় জামাইকে তাই বলে দিয়েছিলেন ছোট জামাইয়ের উপস্থিতিতে কখনো যেন শ্বশুরবাড়ি না আসে, দুইজনের মধ্যে কখনো যেন সাক্ষাৎ না হয়। ঘটনাক্রমে একদিন বড় জামাই শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এয়েছেন, গ্রাম্য লোকটি জানালা দিয়ে দেখলেন বাড়ির দিকে ছোট জামাইও ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে। বড় জামাইকে বললেন, ‘ছোট জামাই আসছে, আমার মানসম্মান নষ্ট কোরো না, সাত-তাড়াতাড়ি খাটের নীচে লুকাও’। তো যথা আজ্ঞা। এদিকে ছোট জামাই এলেন, বসলেন, আয়েশ করে খাওয়াদাওয়া করলেন, আর ওদিকে খাটের নীচে বড় জামাই রাগে ক্ষোভে আর বিরক্তিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে। গ্রাম্য লোকটি এবার ছোট জামাইকে বললেন, ‘জামাইবাবু, তুমি তো সংস্কৃত জানো, আমাদের গীতা থেকে কিছু শ্লোক শোনাবে?’ জামাই শ্লোক পাঠ করছিলেন, ওদিকে খাটের নীচ থেকে বড় জামাইয়ের মনে হলো— ‘আরে এ তো বাংলার মতোই, শুরুতে অয়ং ভয়ং বলে আর শব্দের শেষে অনুস্বার যোগ করে। এই-ই পারাতে যদি সম্মান হয়, এ তো আমিও পারব!’ তারপর বড় জামাই সাথে সাথে খাটের তল থেকে বের হয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
‘অয়ং ভয়ং যদিং সংস্কৃতং হয়ং, বড় জামাইং কেনং খাটের তলে রয়ং!’
ইয়োর অনার, নিশ্চয় মনে প্রশ্ন জেগেছে এই গল্পের শানেনজুল কী, আবার শিরোনামের সাথে দেখি মিলও আছে, তাহলে এতক্ষণ কী নিয়ে বললেন আর এক্ষণ কী নিয়ে বলবেন?
শান্ত হোন জনাব। স্বীকার করি আমি ভণিতা অতিমাত্রায় দীর্ঘায়িত করে ফেলেছি, কিন্তু আপনিও সম্ভবত ওই অংশ মিস করে এসেছেন যেখানে আমি বলেছি ‘লাল গাউন ফেলে কালো গাউন পরে দরবারে হাজির হয়েছি।’ পুরানো অভ্যাস ছাড়া সহজ নয়, তো এসব সহ্য করতেই হবে জনাব। চলুন, আলোচনা আরও লম্বা না করে আসল কথায় যাই। ক্রমে ক্রমে সব জট খোলা হবে, আস্থা রাখুন কালো গাউনে!
উপরের গল্পে যেমন আমরা দেখেছি শুধুমাত্র অনুস্বার যোগ করেই বাংলাকে সংস্কৃত বানানো যায় না, তেমনি প্রভাবকে গ্রহণ করে যথাতথা লাগালেই হয় না, তাকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে লাগানোতেই শ্রেষ্ঠত্ব সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠিক এখানটাতেই ভুল করে বসেছেন। প্রভাবকে রূপান্তর করতে গিয়ে তিনি যে ভুলটি করেছেন আমি মনে করি, বলতেই হয় এটি সাধারণ ভুল নয়, তিনি মানবাত্মা-পরমাত্মার প্রেমের রূপককে সাধারণ নর-নারীর প্রেমে ব্যবহার করেছেন। রক্তমাংসের প্রেমকে বানিয়ে তুলেছেন বায়বীয় প্রেম। এটা খুব সাধারণ বিষয় হতো, যদি-না রবীন্দ্রনাথ মজবুত প্রভাববলয় নির্মাণ করতেন এবং তা শতবর্ষী প্রবীণ হতো।
আমরা শেষের কবিতায় যদি চোখ বুলাই, দেখতে পাব তার সমাপ্তিতে অমিত রায় লাবণ্যের পরিবর্তে কেতকীকে বিয়ে করছেন, আর লাবণ্য করছেন শোভনলালকে। অমিত সেখানে যুক্তি দিচ্ছেন : ‘কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই; কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি; সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।’
স্পষ্টতই মনে হচ্ছে এই প্রেম ঠিক নর-নারীর প্রেম নয়। নর-নারীর প্রেম একটি সুনিশ্চিত সমাপ্তি চায়, এই প্রেম কেবল মানসিক নয়, শারীরিকও। অবশ্য প্রেমের ক্ষেত্রে আমরা মানসকে প্রাধান্য দিই, তাই বলে শরীর অস্বীকার করি না। আর মনোবিজ্ঞানও এটাই বলে, শরীরকে কেন্দ্র করেই জন্ম নেয় নর-নারীর প্রেম।
আমরা যদি শেষের কবিতাকে সুফিবাদী চোখে দেখি, খুবই চমৎকার ও একটি উমদা ব্যাখ্যা পাই।
❝একদিন আমার সমস্ত ডানা মেলে পেয়েছিলুম আমার ওড়ার আকাশ; আজ আমি পেয়েছি আমার ছোট্টো বাসা, ডানা গুটিয়ে বসেছি। কিন্তু আমার আকাশও রইল।❞ —এই বাক্যটি সামনে নিয়ে আমরা এগোই।
ইয়োর অনার, অমিত রায়কে যদি আপনি ধরে নিন মজনু, আর লাবণ্য লাইলি। অমিত মানবাত্মার রূপক আর লাবণ্য পরমাত্মার। অমিতর পরমাত্মার প্রতি উৎসাহ আছে, ঠিক আগ্রহ নাই। কিন্তু একদিন হলো কী, সুফি জুনায়েদ বাগদাদির মতো অ্যাক্সিডেন্টলি পরমাত্মার দর্শন পেয়ে গেলেন অমিত, অতঃপর পরমাত্মার সাথে পূর্ণমিলনের খেয়াল তার মনে জাগরূক হলো। ঠিক করলেন সব ছেড়েছুড়ে ইমাম আল গাজালির মতো পরমাত্মার মিলনে ধ্যান করবেন। কিন্তু মানবীয় নিয়মকানুন থেকে তিনি বের হতে পারছিলেন না। জগৎ-সংসারের মায়ায় সে যে জড়িয়ে পড়েছিল বহুবছর আগে, তার পিছুটান ছিল। কেতকী হলো এখানে জগৎ-সংসারের রূপক। আর শোভনলাল হলো ফেরেশতা বা সংসারবিরাগীর রূপক, যে অমিতর মতো পরিপূর্ণ নয়। শোভনলাল কি শেষতক পরমাত্মার সাথে মিলনের সৌভাগ্য পেয়েছিল, না অমিত তথা সংসারী মানবাত্মা পেয়েছিল— এই প্রশ্ন হয়ে রবে চিরকালের অমীমাংসিত রহস্য!
সাধারণ একটি প্রেমের উপন্যাস হয়ে গেল অধ্যাত্মবাদী একটি উপন্যাস। ফরিদুদ্দিন আত্তারের ‘মানতিকুত তয়েরে’ যেমন পাখপাখালির জবানে আধাত্মিকতা শিখি, বাংলায় তেমনই শিখব রবীন্দ্রনাথ থেকে, অমিত-লাবণ্যের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু আমার মনে হয় না এই ব্যাখ্যা খুব সহজে কেউ স্বীকার করে নিবে। না নিলেই কি গীতাঞ্জলি আর শেষের কবিতা একই রকম প্রেম প্রকাশ করবে? কোথায় মানবীপ্রেম আর কোথায় ঈশ্বরপ্রেম। রবীন্দ্রনাথের এই দুটোর মধ্যে তফাৎ না তৈরিই আমি মনে করি সবচেয়ে বড় ভুল। রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মকে যদি বড় কোনো ক্ষতি করে থাকে, তাহলে এই দিকটাতেই করেছে।
ইয়োর অনার, আপনার মনে হতে পারে তিলকে তাল বানিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনা তা নয়। পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করে বলি : আমাদের মস্তিষ্ক এভাবে কাজ করে যে, আপনি একটি শব্দের সাথে যেই অনুভূতি যোগ করবেন, মস্তিষ্ক ওটাকেই সংরক্ষণ করে রাখবে। তেঁতুলের সাথে যদি টক শব্দ যোগ করেন, তেঁতুল শব্দ শোনামাত্র টকটক অনুভূতি আপনার মনে জেগে উঠবে। তেমনই নারীপ্রেম বলে যদি আপনি বুঝেন ত্যাগ, কেবল ‘গোপনে বিরহডোরে বাঁধা’, তাহলে যেকোনো প্রেমের সাথেই ত্যাগ শব্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যাবে। অথচ প্রেম একটি শক্তি। প্রেম মানুষকে কাবু করে না, বরং যুদ্ধংদেহী করে তুলে, প্রেমের জন্য চায় উল্টো পুরো দুনিয়াকে মুখ ভেংচিয়ে ত্যাগ করতে,— এক্ষেত্রে শুধুমাত্র আলাদা ঈশ্বরপ্রেম, সেখানেই কেবল ত্যাগ মহিমাময়, আর কোথাও নয়।
ইয়োর অনার, আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গানের অংশ উপস্থাপন করব, পাশাপাশি উপস্থাপন করব উর্দু কবি মুজতার খয়রাবাদির একটি কবিতা, বিষয়টি আপনিই পরখ করবেন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেন,
❝যদি আর কারে ভালোবাসো, যদি আর নাহি ফিরে আসো, তবে তাই হোক আমি যত দুখ পাই গো…❞
এখানে কবি প্রেমাস্পদকে পুরাপুরি মুক্ত করে সবধরনের ত্যাগ স্বীকার করে নিচ্ছেন। অপরদিকে মুজতার খয়রাবাদি লিখছেন,
❝তোমায় চাইব আবার তোমার অন্য প্রার্থীকেও মেনে নিব? আমার মন আমায় ফেরৎ দাও, এমন ঝগড়া হতেই পারে না!❞
কী শক্তিশালী প্রেম। এখন পাঠক যখন প্রেমের এই শক্তিমত্তা দেখে অভ্যস্ত হবে, তখন শুধু নারীপ্রেম নয়, জগতের সব প্রেমেই একই ফর্মুলা কাজে লাগাবে। সে হয়ে উঠবে সাহসী ও নাছোড়বান্দা। অথচ রবীন্দ্রনাথ নারীপ্রেমের ক্ষেত্রেই আমাদের ম্যানিপুলেট করেছেন ঋষিত্বে, তার গান শুনে আমরা উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও খুঁজে পাই না। ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে ঠিক এই কারণেই তরুণ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেন, ‘রবীন্দ্রনাথের যে প্রবণতা তাঁর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছিল তা হলো, ঋষিত্বের প্রতি তাঁর দুরপনেয় লোভ।’
শুধু প্রভাবের ছোট্ট একটি ভুল ব্যবহার আমাদের পরিণত করেছে দুর্বল ও ভীরু জাতিতে। চিন্তা করে দেখুন, প্রভাব কী ভয়ানক জিনিস।
আমরা আবার মঁসিয়ে অঁদ্রে জিদের প্রবন্ধে ফিরি। তিনি বলছেন, ‘মহৎ ব্যক্তিরা যে বিপুল ভাবধারাকে তুলে ধরেন, অন্য দশজন তাকে সত্য বলে গ্রহণ করেন। সে ভাবধারাকে গ্রহণের মধ্যে থাকে এক নীরব ও অচেতন নতিস্বীকার।’
রবীন্দ্রনথের প্রতি এই অচেতন নতিস্বীকারই আমাদের প্রেমকে আটকে দিয়েছে ত্যাগে। আর ত্যাগের প্রতি যে ‘মহত্তর’ গুণ আমরা আরোপ করছি, সেটা সে অচেতনতারই ফল। এবং ঠিক এটিই আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে একশ বছর, পরিণত করেছে বন্ধ্যায়। আমরা এখন নতুনকে ভয় পাই।
সোজা কথায়, রবীন্দ্রনাথ একজন ভালো প্রভাব গ্রহণকারী ছিলেন, কিন্তু প্রভাব সৃষ্টির বেলায় ভালো থাকেননি, এর জন্য অতি অবশ্যই তিনি দায়ী নন, তিনি তার কাজ করে গেছেন স্রেফ, আমরাই বরং তার মধ্যে অন্ধভাবে আটকে থেকে সৃজনশীলতার পথে সীসা ঢালা প্রাচীর নির্মাণ করে বসেছি।
শিল্প সবসময় নতুনত্ব চায়, আর নতুনত্ব মিউট্যান্ট হয় পুরাতন থেকেই। শিল্পের ক্ষেত্রে নতুনত্ব পেতে হলে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে পুরাতন থেকে প্রভাব গ্রহণ করেছিলেন, যেভাবে তিনি একই সাথে গ্রহণ করেছিলেন ফারসি সংস্কৃত মৈথিলী জর্মন ও ইংরেজি সাহিত্য থেকে, আমরা যদি ঠিক তা-ই করি, সারাবিশ্বের সব সাহিত্য থেকে উদার মনে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে নিশ্চয় ভাঙতে পারব শক্ত রবীন্দ্র-বলয়। এবং এর প্রয়োজন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধশীল করার জন্যেই। তবে কিছুতেই রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব অস্বীকার করে নয়, এমনকি আমরা এই বলয় ভাঙতে সহায়তা নিব খোদ রবীন্দ্রনাথ থেকেই। ইয়োর অনার, শেষের কবিতায় অমিতর জবানে তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রথম পদক্ষেপ কী হবে—
‘ওঁ (রবীন্দ্রনাথ) যদি মানে মানে নিজেই সরে না পড়ে, আমাদের কর্তব্য ওঁর সভা ছেড়ে দল বেঁধে উঠে আসা!’

The post শেষের কবিতা ও অয়ং ভয়ং রবীন্দ্রনাথং appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%93-%e0%a6%85%e0%a7%9f%e0%a6%82-%e0%a6%ad%e0%a7%9f%e0%a6%82-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8/

আগুনখেয়া (১ম পর্ব)

ইবরাহীম জামিল:

মহিত শেখ এতো জোরে মায়া বলে চিৎকার করে উঠেছিল যে, সামনে যে পাহাড়ের চূড়াটা দেখা যায় ওই পাহাড়ের বাসিন্দারা পর্যন্ত চমকে গিয়েছিলো। ডাক দিয়ে মহিত শেখ অনেক্ষণ কান পেতে রইল। আওয়াজ একটা ফিরে এলো বটে, কিন্তু সেটা তার নিজেরই চিৎকারের প্রতিধ্বনি। মায়ার কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। মহিত শেখ নিচের দিকে তাকালো, অনেক নিচে ছোট ছোট পাহাড়ের পিঠে দুধের সরের মতো জমে থাকা মেঘ দেখা যায়, সেখানে মায়ার কোনো চিহ্ন নেই।

সেই ভোর সকাল হতে মহিত শেখ মায়া মায়া বলে চেচাচ্ছে। পাড়ার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে একবার বলতে এসেছিলো, মহিত মিয়া! ওই রকম হাম্বা হাম্বা করছো কেনো? গরু বুঝি কারো হারিয়ে থাকে না?
মহিত চোখ গরম করে বলেছে, গাই তোদের না আমার? ওই গাইয়ে আমার সংসার চলে। তোমরা আমার সমস্যা বুঝবে না।
কেউ টিপ্পনি কেটে বলল, কেন, ধর্ম আরেকটা পাল্টালেই তো হয়! মহিত শেখ হাতের লাঠি হাতে তেড়ে যেতেই সবাই পড়িমরি করে ছুটে পালালো। বুড়োকে না রাগালেই ভালো। বয়সকালে তার নাকি খুনোখুনির স্বভাব ছিলো।

দুপুর যখন গড়াচ্ছে মহিত শেখ তখন সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল। পাহাড় বেয়ে নিচের ওই গ্রামটাতে নামবে সে। নিচের লোকগুলো বড্ড ত্যাদড়। মাঝে মাঝে এটা ওটা চুরি করে নিয়ে যায়। সেবার রমেশের শুকরের গোয়ালে হানা দিয়েছিলো নিচের পাড়ার কারবারির ছোট ছেলেটা। নাম গদাই না কী যেন। নিচে নেমে গদাইটাকে যদি পায় তবে একটা গোলমাল সে বাধাবে। গায়ের চামড়া বুড়িয়ে গেছে বলে শেষ হয়ে গেছে নাকি, যার ইচ্ছা গরু চুরি করে নিয়ে যাবে?
পাহাড় বেয়ে নামার সময় মহিত শেখের চোখে পানি এসে গেলো। একেবারে ছেলেবেলায়, সে যে কতকাল আগে মহিত শেখ ঠিক বলতে পারবে না। একদিন তার দাদুর কাঁধে চড়ে এই পাহাড়ে উঠেছিলো। সাথে তার মা, তার দাদীমণি, তাদের প্রিয় দুটো শুকর ছানা। সবই ছিলো। কোনো এক লোকালয়, এই পার্বত্য চট্টগ্রামেরই কোনো এক পাহাড়ী অঞ্চল ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে তারা এখানে এসে উঠেছিল। তারপর কত কত বছর কেটে গেছে! দাদা বিগত হয়েছেন, দাদীমণিও দেহত্যাগ করেছেন, সে শুকর ছানা দুটোর নাতিপুতিতে ভরে গেছে এই পাহাড়ী অঞ্চলটা। শুধু একটি পরিবার থেকে এই পাহাড়ের চূড়াটি হয়ে উঠেছে একটি লোকালয়।

লোকালয়টির নাম আগুনখেয়া। আগুনখেয়ার সবচেয়ে প্রাচীণ নাগরিক এখন মহিত শেখ। দাদা পাহাড় আবাদ করায় মহিত শেখই এখানকার বর্তমান কারবারি। সমস্যা হল, মহিত শেখের স্বভাবে খানিকটা পাগলাটে ভাব আছে। যে কারণে কেউ তাকে কারবারির যোগ্য মর্যাদাটা দেয় না। অবশ্য মর্যাদা অমর্যাদা মহিত শেখ বোঝে না। বুঝলে কবেই একটা হৈ চৈ বেধে যেতো!

মহিত শেখের একটা ছেলে হয়েছিল। বিরাট তাগড়া জোয়ান। নাম কঙ্কা। কঙ্কাবতি। আগুনখেয়ার বাসিন্দারা ভেবেছিল, এবার একটা যোগ্য কারবারি পাওয়া যাবে। শুধু বুড়োটা গেলেই হয়। কিন্তু বুড়োটা গেল না। গেল তার তাগড়া জোয়ান ছেলেটা।
পাহাড়ের আদি সংঘাতের মতো আগুনখেয়ায়ও একদিন দুঃখ এসেছিলো। দূরের রাফা পাহাড়ের খাদ্য উর্বরতা কমে গেলে এবং পানির একমাত্র ঝরণাটি শুকিয়ে গেলে ওখানকার বাসিন্দারা এই পাহাড়ে হানা দিয়েছিল। সবগুলো মারমা। জাত হিংস্র। সেদিন সন্ধ্যায় ঢাক সানাই বাজিয়ে যুদ্ধ শুরু হল। ঢাল সড়কির অসম যুদ্ধ। এমন যুদ্ধের মুখে কখনো যেন না পড়তে হয় সে জন্যই মহিতের দাদা এই দুর্গম পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু এক প্রজন্ম যেতে না যেতেই মানুষের প্রয়োজনের হাত এই পাহাড়ের চূড়ায় এসে ঠেকেছে।

মহিত শেখ জানতো, কঙ্কা রগচটা ছেলে। আগুনখেয়ার যুবকদেরকে ডাক দিলে সবাই হৈ হৈ করে লড়াইয়ে নেমে পড়বে, কিন্তু এর পরিণাম ভালো হবে না। কারণ মহিত জানে, আগুনখেয়ার মানুষ ঝগড়াটা পারলেও যুদ্ধটা পারে না। মহিত লম্বা দম নিল, পাহাড়ের তাজা বাতাসের সাথে খানিকটা সাহস যেন বুকে জড়ো করতে চাইল। কঙ্কার কাছে গিয়ে বলল: কঙ্কা! চল পালিয়ে যাই!
– কোথায় পালাবো?
– মিতিঙ্গা পাহাড়ে
– সেখানে ওরা হানা দিলে?
– অন্য কোথাও যাবো
– সেই অন্য কোথাও দস্যুরা যখন আক্রমন করবে তখন আমাদের সন্তানেরা কোথায় যাবে? তোমরা তো রাফা পাহাড় ছেড়ে এই পাহাড়ে এসেছিলে।
মহিত শেখ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। চিতাবাঘের মতো জ¦লছে কঙ্কার চোখ। মহিত বুঝে ফেললো, এই ছেলেকে ঠেকানো যাবে না। অস্পূট স্বরে তবু বলল, লড়াই ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনে।

কঙ্কা বল্লম হাতে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। ওর যাওয়ার পথের দিকে শংকিত চোখে তাকিয়ে রইল মহিত শেখ। তার মনে অচেনা কী যেন কুহু কুহু ডাকছে। বুকের ফাঁকা জায়গায় এখন আর সাহস নেই, শুধু ভয় আর ভয়।

কঙ্কাবতী আগুনখেয়ার যুবকদেরকে নিয়ে মারমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দাদার ভিটে রক্ষা করতে হবে। এক প্রহর না যেতেই ওদের তিন তিনটে লাশ পড়ে গেল। রাত্রির পাহাড়ী আঁধার নেমে আসার আগেই কঙ্কারা ওদেরকে হটাতে সক্ষম হল। শুধু লড়াইয়ের শেষ মুহূর্তে, শত্রুরা যখন পাহাড় বেয়ে নেমে যাচ্ছে তখন, সন্ধ্যার আবছায়া আঁধারে কঙ্কার ঊঁরুতে একটি মল্ল এসে বিঁধল। সাতদিন বিছানায় শুয়ে কাটা শুকরের মতো চেঁচাতে চেঁচাতে আটদিনের মাথায় কঙ্কা মরে গেল। কঙ্কা যেদিন দ্বি-প্রহরে মারা গেল সেদিন গভীর রাতে কঙ্কার বউ সৌদা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। কঙ্কার পুত্র।

সন্তানের মায়া সৌদাকে টানতে পারেনি। স্বামীর শোক তাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছিল। পুত্র জন্মের তিন পক্ষ পর সৌদা পাগলী আগুনখেয়া পাহাড়ের কোনো এক গিরিপথ ধরে হেঁটে চলে গেছে। আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। কঙ্কার পুত্র মানুষ হয়েছে মহিতের কাছে। তাকে মানুষ করতেই মহিতকে বেছে নিতে হয়েছে অদ্ভূত এক পেশা। পেশাটার কথা মনে আসতেই মহিত হেসে ফেলল। এখনো সে পাহাড় বেয়ে নামছে। পেশিতে আগের মত জোর নেই। পাহাড় বেয়ে উঠতে নামতে ঘন্টা দুই লেগে যায়। জোয়ানকালে এই পাহাড় বেয়ে কতবার তরতর করে উঠেছে আর তরতর করে নেমেছে! এখন বারবার জিরোতে হয়।

মহিত যখন পাহাড়ের আধাআধি নেমে এলো তখনই পাহাড়ের পশ্চিম দিক থেকে মায়ার ডাক শোনা গেল। তার থেকে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ হাত উপরে। মহিত কপালের শিরা চেপে ধরে বসে পড়ল। এমন একটা আশংকা তার মনে কয়েকবার উঁকি দিয়ে গেছে। গাইটা যদি পশ্চিম দিকে পড়ে থাকে তবে তাকে টেনে তোলার সাধ্য কারো নেই। এই পাহাড়টা পূব থেকে সরলরেখায় উপরে উঠতে উঠতে মহিতের ঘরের পিছনে এসে থেমেছে। তারপর ধীরে ধীরে সোজা সামনের দিকে না গিয়ে হুড়ুশ করে খাড়াভাবে নেমে গেছে উনিশ শো ফুট নিচে। পশ্চিমের এই খাড়া পাশটার গায়ে ঝোঁপঝাড় জন্মে বুনো জঙ্গল হয়ে গেছে। ওখানে নেমে কেউ গাছ কাটতে পারে না বলে কোনো কোনো গাছ বৃক্ষ ছাড়িয়ে মহিরূহে রূপ নিয়েছে। গাইটা বোধহয় পশ্চিম থেকে পা পিছলে পড়ে কোনো একটা গাছের ডালে বা শিকড়ে আটকে গেছে।

মহিতের পাহাড়ের উপরে ফিরে আসতে বিকেল পড়ে এলো। এর মধ্যে মায়া কয়েকবার ডেকে উঠেছে। মহিত বাড়ির কাছে আসতেই কঙ্কার ছেলে ছড়া কাটতে কাটতে দাদার কাছে ছুটে এলো:

“ডারামায় থায়াচুমু হালাপ বারা অবারোই
হালাপ বারা অথায়ৈ…. ”

মহিত শেখ কপাল কুঁচকালো। ছড়াটা বড়দের। এই পুচকেটাকে কে যে এগুলো শেখায়! সে কটমট চোখে একবার নাতীর দিকে তাকিয়ে কয়েক লাফে পাহাড়ের পশ্চিম কোণে ছুটে এলো। ছোটখাট একটা ভীড় জমেছে এখানে। মায়ার ডাক শুনে সবাই গাইটাকে দেখতে এসেছে। মহিত সবাইকে সরিয়ে খাদের কিনারে এসে দাঁড়ালো, অনেক নিচে তারই সমবয়সী যে রাবার গাছটা পাহাড়ের পিঠ ফুঁড়ে একান্ত অনিচ্ছায় বেড়ে উঠেছে তার গোড়ায় আটকে গেছে মায়া। মাথা উঁচু করে গাইটা বারবার উপরের দিকে তাকাতে চাচ্ছে, পারছে না। মাথাটা শরীরের তুলনায় নিচে পড়েছে।

মহিত শেখ কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে জটলা থেকে বেরিয়ে এলো। কেউ কিছু বলেনি। সবাই ওর দিকে সমবেদনার চোখে তাকিয়েছে। তবু মহিত শেখ যেন স্পষ্ট শুনতে পেলো, ওরা বলাবলি করছে, ‘মহিত শেখের ধর্ম পাল্টানোর উৎসব হবে রে! সবাই থেকো গো!

রাতে মহিতের ঘুম হলো না। বারবার গাইটা ডেকে উঠে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দিচ্ছে। যতবার গাইটা ডেকে উঠছে মহিত শেখ শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ছে। তার পুত্র কঙ্কাও মৃত্যুর আগে এরকম চিৎকার করেছে। শঙ্কু ওঝা এসে আদা ঝাড়া পাদা ঝাড়া দিয়ে গিয়েছিল। কোনো কাজ হয়নি। শঙ্কুর ঝাড় ফুঁকে অবশ্য কখনোই খুব একটা কাজ হয় না। তবু এই পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য ওই প্রথম এবং শেষ ভরসা।
গাইটা আবারও ডেকে উঠলো। মহিত শেখও আবার বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। এভাবে ডাকতে ডাকতে গাইটা এক সময় মারা যাবে। কঙ্কাবতির মতো। সে কিছুই করতে পারবে না। অসহায়ের মতো মহিত শেখ পাশে শোয়া সেবাগীর দিকে তাকাল। কঙ্কার পাঁচ বছরের পুত্র। বাঁশের দেয়ালের ফাঁক গলে জোছনা এসে সেবাগীর গায়ে ডোরা-কাটা দাগ এঁকে দিয়েছে। মহিত শেখ উঠে জানালার পাল্লা উঠিয়ে দিতেই একগাদা জোছনা হুড়মুড় করে ঢুকে সেবাগীর পুরো শরীর দখল করে নিল।

জানালার ওই পাশে বিরাট আকাশ। থৈ থৈ নীল দরিয়া। আকাশের কোথাও এক ফোঁটা মেঘ নেই। মেঘেরা আরো নিচে। রাত্রীর সাথে পাল্লা দিয়ে ওরা সমগ্র পাহাড়টাকে সাদা চাদরে ঢেকে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোর সকালে পশ্চিমের খাঁদটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে, আশপাশের সবগুলো পাহাড় মেঘ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছে।

ভোরের আলো ফোটার আগে মহিত শেখের ঘুম ভেঙ্গে গেল। এখন শীতকাল নয়, তবু রাতের শেষে বেশ জাঁকিয়ে শীত নামে। সেবাগীর সাথে ভাগাভাগি করে গায়ে দেয়া চাদরের পুরোটুকু ওর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে মহিত ঘর থেকে বের হয়ে এল। মাঝরাত থেকে গাইটা আর ডাকছে না। মহিত শেখ পশ্চিমের খাদটার পাশে এসে দাঁড়াল। সকাল হবে বলে জোছনার আলো কেটে গেছে। আবার রাত শেষ হয়নি বলে প্রভাতের আলোটিও ফোটেনি। দুই আলোর মাঝখানের অদ্ভূত এক অন্ধকার পুরো পাহাড়টাকে ঘীরে রেখেছে।

মায়া যেখানে পড়েছে ওখানে এখন গুহার আঁধার। ওদিকে তাকালে একটা অন্ধাকর শুধু পাক খেয়ে চোখের উপর ঘুরতে থাকে। তবে পশ্চিমের আকাশে লাল একটা নদী ভেসে উঠেছে। পাহাড়ের নিচ থেকে উদীয়মান সূর্য্যটা আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়ায় পাহাড়ের আকাশে একটা আলোর নদী তৈরী হয়েছে। এই নদীটা অদ্ভূত! মহিত শেখ আগেও লক্ষ্য করেছে, সে যদি ভাবে নদীতে একটা সাম্পান ভাসছে, সেই সাম্পানে বৈঠা হাতে একটামাত্র মানুষ বসে আছে তাহলে দেখা যায় সত্যি সত্যি সেই নদীতে আবছায়া একটা সাম্পান ভাসছে। সেই সাম্পানে আরো অস্পষ্ট একটা মানুষ বসে আছে । যদি ভাবে দুইটা, তবে দুইটা দেখা যায়, যদি ভাবে তিনটা তবে তিনটা সাম্পান ভেসে ওঠে। যদি ভাবে অগণিত সাম্পান ভাসছে তাহলে দেখা যায় লাল রেখাটার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত সাম্পানে সাম্পানে ভরে গেছে। এটা কেন হয়? স্রেফ মনের কল্পনা?

হঠাৎ হিসহিস একটা আওয়াজ শুনে মহিত শেখ পায়ের দিকে তাকিয়ে ‘মাগো রে!’ বলে লাফ দিয়ে তিন হাত পিছিয়ে এল। একটা চন্দ্রবোড়া সাপ নারকোলের খোলের মতো ফনা তুলে হিসহিস করছে। মহিত শেখ আস্তে করে সরে এল। ভাগ্যিস বাঁ-হাতে শঙ্কু ওঝার দেয়া মাদুলিটা ছিল। নইলে আজ এখানেই ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেত। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের মাদুলিটা কচলাতে কচলাতে মহিত শেখ ঘরে এসে ঢুকল। ভেতরে সেবাগী নেই। ঘরটা খাঁ খাঁ করছে।

একটু একটু করে ভোরের আলো ফুটছে। সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর- যা হোক একটা ধরতে হবে। আজ গাই নেই। মানে দুধও নেই। ঘরে চাল ফুরিয়েছে গত পরশু। একটু বেলা হলে কোন শিকারই ধরা যাবে না। ওদিকে শেবাগীটাকেও খুঁজতে হবে। ছেলেটা যা জ্বালাতন করে!।

মহিত শেখ মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ওঠে, এইসব করে বেড়ানো কি মদ্দ লোকের কাজ? কাজ করবে মেয়েরা। পুরুষরা বসে গুড়গুড় করে হুক্কা টানবে। অথচ মুহিত শেখের নিস্তার নেই। পুচকেটার পিছনেই খেটে মরতে হচ্ছে। রাগ বেশী হলে নাতিকে মা-বাপ তুলে গালিগালাজ করে বসে বুড়ো কারবারি। পরক্ষণে মায়া লাগে। মনে হয়, এই শিশুটিই তো তাঁর সব। তার বংশের একমাত্র উত্তরপুরুষ। আগুনখেয়ার ভবিষ্যৎ কারবারি। ও আছে বলেই এই বুড়ো বয়সেও মহিত শেখের হাতড়ে পাতড়ে বেঁচে থাকা। ছলচাতুরির বেসাতি খুলে বসা।

মহিত শেখের অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে যায়, সেই যে একবার সংসারে খাদ্যের অভাব নেমেছিলো, মুলি বাঁশের গোড়া সেদ্ধ সেবাগী খেতে পারছিলো না, দুইদিন পাহাড়ী বনে ঘুরে ঘুরেও মহিত শেখ একটি বন্য জন্তু শিকার করতে পারলো না, সেবার ত্রাণকর্তা হয়ে এক ইংরেজ সাহেব এসেছিলেন। সাথে তার বাঙ্গালী বন্ধু। ওরা বলেছিলো, মহিত শেখ খৃস্টান হলে ওর আর কোন অভাব থাকবে না। সে অফুরান সুখের সন্ধান পাবে।

মহিতের অবশ্য সুখের প্রয়োজন ছিলো না। সে তার পাওনা জীবন পার করে এসেছে। এখন কাজ শুধু প্রাচীন বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকা। কিন্তু এই শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়েই সে ঘুনে ধরা কাঠের মতো ধ্বসে পড়লো। ওরা অবশ্য বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলো। কিন্তু টাকাগুলো ফুরিয়ে যাওয়ার পর ওদের টিকিটিও আর দেখা যায়নি। ওরা নিশ্চিত হয়ে গেছে, এই পাহাড়ের কারবারি এখন খৃস্টান। ওর খোঁজ নিলেও খৃস্টান, না নিলেও খৃস্টান। সুতরাং ওরা আর মহিত শেখকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি। মহিতও দিনে দিনে বুঝে গেছে, এই পাহাড়ে, পাহাড়ঘেরা ঝোপজঙ্গলে কিছু মানুষ আসে। মুঁঠিভরা যাদের অর্থকড়ি। অর্থ দিয়ে ওরা ধর্ম কেনে। কেনাবেচা শেষ হলে হাহা করে কেঁদেও ওদেরকে খুঁজে পাওয়া যায় না।।

মহিত শেখ সব বুঝে গেছে। পাহাড়ের আদিম অভাব তাকে বেঁচে থাকার পন্থা বাতলে দিয়েছে। সে এখন ধর্মের বেসাতি খুলে বসেছে। নতুন কোনো ‘খদ্দের’ এলেই মহিত শেখের কাছে ধরে আনা হয়। মহিত শেখও পাড়ার লোকজন নিয়ে ধর্মান্তর উৎসবে বসে যায়। আগুনখেয়ায় চাপা একটা উৎসব উৎসব আমেজ ওঠে। শুধু মহিত শেখ ও তার শাগরেদদের চোখ থেকে অবিরল অশ্রু ঝরতে থাকে। যিনি টাকা নিয়ে এসেছেন তিনি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখেন, একজন অশীতিপর বৃদ্ধ ও তার সঙ্গীদের বিগত জীবনের সকল পাপ চোখের জলে ধুয়ে যাচ্ছে। লোকালয়ের মানুষগুলোও মহিত শেখদেরকে ঘিরে এমন একটা ভাব করতে থাকে- যেন তাদের চোখ বলছে, শেষ জীবনে বুড়োর কি মতিভ্রম হলো?, বাপ দাদার পাহাড়ী ধর্ম এভাবে কি কেউ ছুড়ে ফেলে?।

টাকাওয়ালা পাহাড়ীদের চোখে ঘৃণা দেখে আশ্বস্ত হয়- হ্যা, বাপ দাদার ধর্ম ত্যাগ করছে বৃদ্ধ মহিত শেখ। কোনো ফাঁকি নেই। এরপর অনেক নাটক শেষে আগন্তুক তার টাকার বান্ডিলে হাত দেয়। সবটা নয়, কয়েকটা মাত্র চকচকে নোট মহিত শেখদের দিকে বাড়িয়ে ধরে সে উঠে পড়ে। তার বাণিজ্য শেষ। লোকটা দৃষ্টির আড়াল হতেই মহিত শেখদেরকে ঘিরে থাকা জটলা থেকে আওয়াজ ওঠে, ব্যাটা হাড় কেপ্পন!।
কেউ বলে, ওকে উল্টো টাকা দেয়া উচিৎ ছিলো। যেই কলিজা, পুরো মুলিবাঁশের খোড়ল!। তৃতীয় কেউ বলে ওঠে, তোরা কেউ ক্যাঙের পেছন থেকে ভাঙা কলসিটা নিয়ে আয়। ওর বড্ড প্রয়োজন।

বলার ধরণে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। এরপর অবশ্যি মহিত শেখ তড়িঘড়ি উঠে পড়তে চায় কিন্তু আগুনখেয়ার বাসিন্দারা চেপে ধরে, ‘ও হবে না মহিত শেখ! শুকর একটা মারতেই হবে।’

মহিত শেখ আঁৎকে ওঠে, তা কি করে হয়!। মোটে এই ক’টা টাকা। শুকর মারতে গেলেই তো উড়ে যাবে!। পাহাড়ের বাসিন্দারা নিরস্ত হয়না। যে নাটকের মাধ্যমে মহিত শেখ এতগুলো টাকা বাগালো সেই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে না হলেও পার্শ্ব চরিত্রে তারা ছিলো। সুতরাং তারা ঠকবে কেন?

সেই রাতে আগুনখেয়া পাহাড়ের গায়ে মশাল জ্বলতে দেখা যায়। একটি ঢোলক সুরেলা আওয়াজে পাহাড়ী অঞ্চলটাকে উচ্চকিত করে রাখে। প্রজ্জ্বলিত মশালকে ঘিরে পাহাড়ীদের আদিম নৃত্য চলে আর পাহাড়ের এক কোনায় একটি শীর্ণকায় ডেকচিতে শুকরের মাংস টগবগ করে ফুটতে থাকে। ডেকচিকে ঘিরে চাতকের চোখে তাকিয়ে থাকে অনেকগুলো ক্ষুধার্ত মানুষ । ভেতরে মাংসের টগবগ আওয়াজ তাদের কাছে ঢোলের আওয়াজের চেয়ে সুরেলা মনে হয়। ডেকচির ভেতর গোশতের লাফিয়ে ওঠা তাদেরকে পাহাড়ী ললনাদের উদ্দাম নৃত্যের চেয়ে বেশী আনন্দ দেয় । ক্ষুধা এদের পাঁজরের সাথে মিশে থাকা পাপ।

আগুনখেয়ার আশপাশের বাসিন্দারা এই পাহাড়ে প্রায়ই উৎসবের মশাল জ্বলতে দেখে। ওরা ক্ষুণাক্ষরেও বুঝতে পারে না, এখানকার বাসিন্দারা যে তাদের ক্ষুধা মিটাবার একটা পন্থা বের করে নিয়েছে।

মহিত শেখ পানির ঘড়া আর অগ্রভাগ সুঁচালো একটা ট্যাটা হাতে বের হলো। সেবাগীকে খুঁজতে হবে। খুঁজতে খুঁজতে যদি কোন শিকার পাওয়া যায় সেটাও ধরতে হবে। ছেলেটা কোথায় যেতে পারে? আগুনখেয়ার উত্তরে পাহাড়ী ঝরণা। প্রাকৃতিক কাজ ওদিকেই সারতে হয়। মহিত শেখ শেবাগীকে খুঁজতে ওদিকেই হাঁটা ধরলো।
ঝরণাটা শুকিয়ে তেনা হয়ে গেছে। ওদিকে তাকালেই মন খারাপ হয়ে যায়। মহিত শেখরা প্রথম যখন এখানে এসেছিলো তখন অনেক দূর থেকে মেঘের গর্জনের মতো ঝর্ণার ডাক শোনা যেত। এই ডাক শুনেই তো মহিতের দাদা এ পাহাড়ে বাসা বেঁধেছিলো। এখন ছাগলের পেশাবের মতো টিপটিপ করে পানি পড়ে। ওদিকে তাকালে মহিতের নাক মুখ কুঁচকে আসে।

মুখ কুঁচকাতে কুঁচকাতে মহিত শেখ শেবাগীকে দেখতে পেলো, দিগম্বর সেবাগী প্রাকৃতিক কাজ সারতে বসছে আর হোৎকা একটা শুকর ওর পেছনে এসে ঘোৎ ঘোৎ করছে। ও উঠে গিয়ে একটু দূরে সরে বসছে, শুকরটাও পিছনে পিছনে গিয়ে মুখ দিচ্ছে। মহিত শেখ চেঁচিয়ে উঠলো, কতবার না বলেছি, শুকরকে ভয় পাবিনে। শুকরকে কি ভয় পেতে আছে?। শেবাগী মিনমিন স্বরে বললো, ‘কিন্তু আমার যে ভয় করে।’

মহিত শেখ ট্যাটা উঁচু করে ধরে ধৈ ধৈ করে তেড়ে গেলেও শুকরটার মধ্যে কোন চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেলো না। সে দুলকি চালে হেঁটে হেঁটে ঝরণার পিছন দিকে চলে গেলো।

মহিত শেখ বলল, ঘর থেকে বেরিয়েছিস কেন? যদি সাপবিছুতে কামড় দিত?
– আমি তো তোমাকে কত ডাকলাম, তুমি সাড়া দিলে না!
– বেরিয়েছিস, ভয় করেনি?
– করেছে তো, অনেক ভয় করেছে। কিন্তু ঘর নষ্ট করলে তো তুমি মারবে!
মহিত শেখের মায়া হল, নিজের উপর রাগও হল। এতো রাতে সাপের দৌড়ানি খেতে কেন পশ্চিমে যেতে হয়েছিল? ছেলেটা কত কষ্ট পেয়েছে! আবার তার মায়ার কথা মনে পড়ল। এবার সত্যিই তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।

পাহাড়ের এই পাশটা বেশ খানিক উঁচু। সেই উঁচু থেকেই ঝর্ণার পানি পড়ে। বেশীর ভাগ পানিই পাহাড়ের পিছন দিক দিয়ে নিচে নেমে যায়। এ পাশে আসে সামান্য কিছু পানি। সেই পানি দিয়েই আগুনখেয়ার বাসিন্দাদের নাওয়া খাওয়া চলে।
নাতিকে সামলে ঘড়া ভরে পানি নিলো মহিত শেখ। ফেরার সময় ঢাঁসা একটা ইঁদুর মহিত শেখের পাশ কেটে পালিয়ে যাচ্ছিলো। ঘড়াটা সেবাগীর হাতে দিয়ে সারা আগুনখেয়া ধাবড়ে বুড়ো মহিত ঝর্ণার কাছেই খপ করে ইঁদুরটাকে ধরে ফেললো।
পূবের বাঁশবনে কঁচি কঁচি বাঁশের কোরোলি হাড়ি চাপা দিয়ে রাখা ছিলো। ইঁদুরের লেজ ঝুলিয়ে ধরে মহিত শেখ বাঁশঝাড়ে এলো। একটা হাড়ি সরাতেই মহিত শেখের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। মুথাটা ফুলকপির মতো ফুলে পুরো হাড়ি ভরে গেছে। মহিত শেখ হাড়িটা নতুন গজিয়ে ওঠা আরেকটা মহ্ইয়ের উপর চেপে রেখে আগেরটা কেটে নিয়ে এলো। আজ চমৎকার একটা রান্না হবে। সিদ্ধ বাঁশের মুলির সাথে আস্ত একটা ইঁদুর, সেবাগীর আনন্দের কথা ভেবে মহিত শেখের সকাল থেকে মন খারাপ ভাবটা চলে গেলো।

হাড়ির ঢাকনাটা উঁচু করতেই একদলা গরম ভাপ মহিত শেখের চোখে মুখে আঁচড় কেটে গেলো। বুড়ো চামড়ায় তাপ সয় না। মহিত শেখ দুই হাত মুখের সামনে ধরে হাতে ফুঁ দিয়ে মুখের আঁচ ঠান্ডা করতে লাগলো। তখনই কারো প্রলম্বিত ছায়া হাড়ি-চুলো অতিক্রম করে মুখের উপর এসে থামলে মহিত শেখ চোখ তুলে তাকালো। তাকিয়েই চমকে উঠলো। মহিত শেখের বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। যেন দূর পাহাড়ে বলি হওয়া কোন শুকর বুকের ভেতর চিৎকার করে উঠেছে। এমন তো হওয়ার কথা নয়, যে একবার যায় সে আর ফিরে আসে না। এই লোকটি ফিরে এসেছে। এর মানে কি?, একে একে সবাই ফিরে আসবে?। এসে হাত বাড়িয়ে বলবে, ফিরিয়ে দাও!। মহিত শেখের বুকের ভেতর অচেনা এক কামার হাতুড়ি পেটা করতে শুরু করলো।

পাকস্থলীতে জমে থাকা পানি যেন নিমেষেই শুকিয়ে গেছে। মহিত শেখ ঘামছে। আগন্তুক লোকটি মহিত শেখের কপালের দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে। এ হাসি কি প্রশ্রয়ের? নাকি লোকটা কিছু জানে না? অভিনেতা মহিত শেখ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। হাঁড়ির ঢাকনা হাঁড়ির উপর ছুড়ে ফেলে চটাস করে দাঁড়িয়ে খটাস করে লোকটাকে একটা আদাব দিলো। বিগলিত মুখে জিজ্ঞাসা করলো, ভাইজান কেমন আছেন? মহিত শেখ জানে, সে উত্তর দেবে না, মাথা নাড়বে। সে বাংলা জানে না। তিন বছর আগে মায়া নামের বাছুরটাকে সেই উপহার দিয়ে গিয়েছিলো। ইংরেজ লোকটি মহিত শেখের ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে স্পষ্ট বাংলায় বললো, ভাল আছি, তুমি কেমন আছো মহিত মিয়া?
বাপরে! তিন বছরে লোকটা বাংলা শিখে ফেললো নাকি? মহিত শেখ মনে মনে লোকটাকে আরেকটা আদাব দিলো।
– ভাল আছি, চলুন ঘরে গিয়ে বসি।
– বাংলাভাষী ইংরেজ লোকটি আকর্ণ হেসে বললো, ঘরে তো বসবো কিন্তু তুমি মুহ্ই রাঁধছো কেন?

মহিত নিজের চেহারার উপর জলভারনত আষাড়ের মেঘ নিয়ে এলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, চালের ঘটি যার শুন্য থাকে, বাঁশের মুলি তার শেষ ভরসা। দার্শনিকের মতো কথা বলতে পেরে মহিতের মন ফুরফুর করছে, চোখে যদিও অশ্রু। ইংরেজ সাহেবের মধ্যে কোন ভাবান্তর নেই। কথাটা বোধহয় তার হৃদপিণ্ডে টোকা দিতে পারেনি। মাত্র বাংলা শিখেছে, দার্শনিক কথাবার্তায় এখনো বোধহয় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। লোকটা সোজা চোখে মহিতের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমাকে যে গাইটা দিয়ে গিয়েছিলাম তার দুধ বেচেই তো অবস্থা পাল্টে যাবার কথা। তোমার দেখছি আগের চেয়ে করুণদশা হয়েছে। গাইটা করেছো কী?

মহিত শেখ ভীষণ চটে গেছে- ‘গাই না, বাছুর। বাছুরে দুধ হয় নারে হাম্বা। অনেক পথ পাড়ি দেবার পরেই একটা গাইয়ের ওলানে দুধ আসে। কথাটা মহিত শেখ মনে মনে বললো।

মুখে দারুণ বিগলিত ভাব দেখালো, চলুন মশায়, আপনাকে দেখিয়ে আনি!

আগুনখেয়ার পশ্চিমের খাদটার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা দু’জন । ইংরেজ সাহেব দেখলো, অনেক নিচে হাত-পা ছড়িয়ে একটা সাদা গাই গাছের গুড়িতে ঝুলে আছে। বাতাসে মড়া গন্ধ। বুদ্ধিমান সাহেব গন্ধ শুকেই ঘটনা বুঝে ফেললেন। তার চোখ এখন মায়ার মতোই মায়াবী হয়ে উঠেছে। মহিতের পিঠে হাত রেখে বললো, তোমাদের জীবনতো অনেক কষ্টের, তাই নারে কারবারী? মহিত শেখ এতোক্ষণ ধরে এমন একটি সময়ের অপেক্ষাই করছিলো। ইংরেজ ব্যাটা তাহলে ঘাড় পেতেছে! মহিত শেখ লোকটির হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে ঘরের দাওয়ায় নিয়ে তুললো। এক ঘট পানি নিয়ে তার পা ধুইয়ে দিতে দিতে বাম হাতের উল্টো পিঠে ভেজা চোখ মুছলো।

অভিনয় ভাল হচ্ছে। মনে মনে মহিত শেখ বেজায় খুশী। লোকটাকে খাটে বসিয়ে মাথা মোছার গামছা দিয়ে তার পা মুছিয়ে দিতে দিতে মহিত শেখ রাজ্যের দুঃখের কথা বলতে লাগলো। চোখ তার উত্তরের ঝর্ণার মতোই ছলছল করছে। ভেজা চোখেই জলের ফোটার সাথে নড়তে নড়তে দৃশ্যটি মহিত শেখের চোখে স্থির হলো। পরীর মতো একটি মেয়ে খরগোসের মতো লাফাতে লাফাতে উঠোন পেরিয়ে এদিকে আসছে। মাথা ভরা সোনালী চুল আরবী ঘোড়ার কেশরের মতো কাধের উপর দুলছে। মেয়েটির পিছু পিছু সেবাগী ছুটছে।

খানিক দূরে আরেকজন অপরিচিত লোক আসছে। ঠিক অপরিচিত না, গতবার ইংরেজ লোকটিকে যে নিয়ে এসেছিলো, এ সেই লোক। মহিত শেখের পলকহারা দৃষ্টি অনুসরণ করে ইংরেজ লোকটি উঠোনের দিকে তাকালো। মেয়েটিকে দেখেই ইংরেজ সাহেব আদুরে গলায় ডাকলো, কাম হেয়া মামুনি!

মেয়েটি খরগোশের মতো দুলতে দুলতে এসে বাবার কোলে বসল। শেবাগীও ছুটতে ছুটতে এসে ইংরেজ সাহেবের পাশে বসে মেয়েটির হাত ধরে টানতে লাগলো, নিজের পাশে বসাবে। মহিত শেখের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, এতো বড় স্পর্ধার কী পরিণাম হতে পারে? মহিত শেখ নাতিকে কষে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দেয়ার আগেই ইংরেজ লোকটি বলল, হেলেন! এখানে বসো!

আঙুল দিয়ে শেবাগীর পাশের জায়গাটি দেখিয়ে দিল। হেলেন পাশে বসতেই সেবাগী তার মোমের মতো ফর্সা হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো।
‘হতচ্ছাড়া পাজি! বয়স হয়নি বলে এখনো নেংটি পরা ধরিসনি, ওদিকে তলে তলে পেকে কাঁঠাল হয়ে গেছিস!- মনে মনে মহিত শেখ বেশ রেগে গেছে।
মহিত শেখের অবস্থা বুঝতে পেরে ইংরেজ লোকটি বললো, ধনী গরিব, বা পাহাড়ী ও ইউরোপিয়ান বড় কথা নয়, আমরা সবাই মানুষ। মানুষ বলেই ওদের বন্ধুত্ব হতে পারে। মহিত শেখ বাঁশের পাটাতনে বসে ছিলো। সাহেবের কথা শুনে মনে হলো, পাটাতন ভেঙ্গে নিচে পড়ে যাবে। ধনী গরিব সবাই মানুষ, ভাল কথা। তাই বলে ছেলেতে মেয়েতে বন্ধুত্ব হয় নাকি? মহিত শেখ বাপের জন্মে শোনেনি।

খালি গায়ে কাদামাখা কালো চামড়ার সেবাগীকে নীল ফ্রক পরা মেয়েটির পাশে একেবারে বুনো ভাল্লুকের ছানার মতো লাগছে। ভাল্লুক-ছানাটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে মহিত শেখের বুক গর্বে ফুলে উঠলো। সেবাগীকে কাদামাটি মাখা ভাল্লুক মনে হলেও, ওর বুকের ছাতি জানান দিচ্ছে ওটা বাপের মতই চওড়া হবে। ওর নাক খাড়া পাহাড়ের মতো উন্নত, আঙুলের গিঁটগুলো তল্লা বাশেঁর গিঁটের চেয়ে মজবুত। মহিত শেখ কল্পনায় যেন ভবিষ্যৎ কঙ্কাবতিকে দেখতে পেলো। এ কঙ্কাবতি মৃত কঙ্কাবতির চেয়ে অনেক বেশী সৌর্য-বীর্যের অধিকারী, অনেক বেশী টগবগে জোয়ান।

মহিত শেখের চোখে কল্পনার প্রজাপতি পাখা মেলেছে। সে আগুনখেয়ার কারবারী বীর সেবাগীর পাশে ষোড়শী মারিয়াকে দেখতে পেলো- সামনের ওই খাটটিতেই, হাত ধরে বসা।

মহিত শেখের ঘোরলাগা চোখের দিকে তাকিয়ে ইংরেজ সাহেব বলে উঠলো, ওদের দিকে তাকিয়ে কী দেখছো মহিত?

মহিত শেখ কেঁপে উঠে বাস্তবে ফিরে এলো, না মানে… ইয়ে মানে…।

মহিত শেখের কথা জড়িয়ে গেছে। সে ভাবছে। কী দুঃসাহসী, কী নিষিদ্ধ কল্পনাই না সে করতে শুরু করেছে! মহিত শেখকে থেমে যেতে দেখে ইংরেজ সাহেবের ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো অচেনা হাসি জেগে উঠল।

The post আগুনখেয়া (১ম পর্ব) appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a7%a7%e0%a6%ae-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac/

হুমাইরা—দিলরুবায়ে সারওয়ারে কায়েনাত( ৪র্থ পর্ব)

সুমাইয়া মারজান:

মিলনের আনন্দঘন প্রহর

ভয়, শঙ্কা আর প্রতীক্ষার প্রহরগুলো কাটিয়ে কাফেলা একটা সময়ে এসে দেখা পেলো লোকালয়ের। আনন্দে সবার মন নেচে উঠলো । এইবার বুঝি ফুরোলো পথ। খানিক বাদেই হয়তো পাবো কাঙ্খিত মানবের দেখা। কষ্টের মেঘগুলো মন থেকে সরে যাচ্ছে একটু একটু করে। কাফেলার সবার চেহারায় দেখা দিচ্ছে স্বস্তির সুন্দর আভাস। বাতাসে দুলতে থাকা কোবা পল্লির খেজুর গাছের শাখাগুলোর রেখা তাদের জন্য নিয়ে এলো আনন্দের বার্তা। আর আনবেই না কেন! এদিকে সন্তানসম্ভবা আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সময়ও কাছাকাছি। প্রসব বেদনার লক্ষণগুলো ফুটতে শুরু করেছে তার আপাদমস্তকে। কোবা পল্লিতে পৌঁছার পর তা সহ্যসীমার বাইরে চলে গেলে কাফেলা সেখানে যাত্রাবিরতি করলো। ঠিক সেখানেই যেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছুদিন আগে যাত্রাবিরতি করেছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর তনয়া আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার পরিচয় শুনে লোকজন যত্নআত্তির সর্বোচ্চটুকু দিতে চেষ্টা করলো। কোবা পল্লির সবচেয়ে অভিজ্ঞ দাইমার হাতে সঁপে দেওয়া হলো আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে। উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় সময় পার করতে লাগলেন কাফেলার বাকি সদস্যরা। বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। কাফেলার নতুন সদস্য জানান দিলেন তার আগমনী বার্তার। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাতি এসেছেন দুনিয়ায়। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার কোল আলোকিত করে এসেছে এক পুত্রসন্তান । কোবা পল্লিতে উৎকণ্ঠায় থাকা কাফেলার সবাই খুশি হয়ে সাদর সম্ভাষণের সাথে বরণ করে নিলেন এ নতুন সদস্যকে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জীবনে এ বরকতময় শিশু নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করলো। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা খালা হয়ে গেলেন। এ আনন্দে তার মন ভরে উঠলো। ভাগ্নেকে কী করে আদর করবেন! কতটুকু আদর করলে তার নিজের মন তৃপ্ত হবে! ভেবে পান না যেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিঃসন্তান থাকায় পরবর্তীতে এই আদরের ভাগ্নের নামানুসারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার উপনাম রেখেছিলেন।

পুনরায় যাত্রা করে কোবা পল্লি ছেড়ে যখন কাফেলা মদীনায় পৌঁছলো, মদীনার সবাই এলেন তাদের দেখতে। এ কাফেলার সম্মান, গুরুত্বটাই অন্যরকম। এখানে রয়েছেন সকলের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও নবীজির ঘনিষ্ঠজন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবার। মুহাজিরদের কাছে এ কাফেলা অন্য আরেকটি কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। কাফেলার নতুন সদস্যটিই সে কারণ। অন্যসবার আগমন ছাপিয়ে তার আগমনীতে সবার মন নেচে উঠেছে আনন্দে। তাই তাকে হৃদয়ের উষ্ণ ও শুদ্ধতম ভালোবাসা দিয়ে ডালি সাজিয়ে বরণ করলেন সকল মুহাজিরগণ।

এ পবিত্রতম শিশু সদস্য মুহাজিরদের জন্য নিয়ে এসেছিলো এক বরকতময় অধ্যায়। কারণ মক্কা ছেড়ে আসার পর মুহাজিরদের কারোর কোন সন্তান জন্ম হচ্ছিলো না। এ কারণে অনেক ইহুদি ও মুনাফিকরা বলাবলি করছিলো মুসলমানদের মদিনায় আগমন করাটা অশুভ লক্ষণ। তখন আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সন্তান জন্ম দেওয়াটা তাদের এইসব কথাবার্তাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সন্তানের জন্মের খবর শুনে খুবই খুশি হলেন। কাফেলা মদীনায় আগমন করার পরে পবিত্রতম নবজাতককে নবীজির কোলে দেওয়া হলে নবীজি তার নাম রাখেন আব্দুল্লাহ। আসমা ও যুবায়েরের সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবার এলেন মদিনায়। নবীজি তার পরিবারের জন্য মসজিদে নববীর কাছেই একটা ছোট ঘর বানিয়ে রেখেছিলেন। ফাতিমা, উম্মে কুলসুম এবং সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহুম এ ঘরটিতে এসে ওঠেন। আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তখন পর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উঠিয়ে আনেননি। তাই তিনি তার বাবা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘরেই থাকতে শুরু করেন।

মদিনায় মহামারীর প্রকোপ

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হিজরতের তিনমাস পার হয়ে গেছে। মক্কা ছেড়ে মদিনায় এসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনার জীবন সবেমাত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ভালোমতো থিতুও হননি মদিনায়। এর ভেতরেই দেখা দিলো নতুন এক সমস্যা। মদিনার আবহাওয়া ছিলো মক্কার চেয়ে ভিন্ন। এখানকার পরিবেশ মুহাজিরদের সাথে ঠিকঠাক খাপ খায়নি। তাই আগমনের কিছুদিন পরে মুহাজির সাহাবাগণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অপরিচিত এক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন তারা। জ্বর আসে প্রায় অনেকেরই। জ্বর দীর্ঘমেয়াদি জ্বরের রূপ নেয়। মহামারীর আকার ধারণ করে। কাবু করে ফেলে সাহাবাগণকে। মুহাজির পল্লীতে নেমে আসে দুঃখের ছায়া। আবু বকর রাদিয়াল্লাহুও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু বাড়িতে গিয়ে দেখেন তার পিতা প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত। তার সাথে অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছেন আমের ইবনে ফুহাইরা ও বেলাল ইবনে রাবাহ। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছেন তারা।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা পিতাকে দেখে আঁৎকে উঠেন যেন। চোখ বুজে মৃতের মতো শুকনো পাতার মতো মিইয়ে যাওয়া পিতাকে যেন তিনি কিছুতেই চিনতে পারেন না। এ কী হাল হলো আমার পিতার! তার দুচোখ ছাপিয়ে অশ্রুর বড় বড় ফোঁটা পড়তে লাগলো গাল বেয়ে। কাছে গিয়ে বললেন, আব্বা, এখন কেমন আছেন? কীরকম অনুভব করছেন?

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার এ প্রশ্ন শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জোর করে চোখ মেললেন যেন। তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তার মনে হলো একটি নূর উদ্ভাসিত হয়েছে। মেয়ের কণ্ঠকে মনে হলো, দূরাগত কোন শান্তির ধ্বনি। অনেকটা অবচেতনমনে আবৃত্তি করলেন,

প্রতিটি মানুষ ভোরে স্বজনদের মাঝে জেগে উঠে
হায়! মৃত্যু তো জুতার ফিতার চেয়েও নিকটতম।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু কিছুই বুঝতে পারলেন না। পিতার এই অবস্থা দেখে মারাত্মকভাবে আহত হলেন। কান্না করতে লাগলেন। তারপর ব্যথিত মনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাকে ঘরের অবস্থার কথা জানালেন। কারণ নবীজি সকল সমস্যার সমাধানই করে থাকেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজিকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তারা তো মারাত্মক জ্বরে ভুগছেন এবং নিজেরা নিজেদের সাথে অচেতনভাবে কথা বলছেন।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এমনিতেই এই মহামারী নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। প্রিয়তমা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কান্নাভেজা মুখ দেখে তার কষ্ট দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করলেন। দোয়া করলেন তাদের বিরুদ্ধে, যারা মুসলমানদের এই যন্ত্রণাময় অবস্থার জন্য দায়ী। বললেন, হে আল্লাহ! আমি উতবা ইবনে রাবিআ, শাইবা ইবনে রাবিআ, এবং উমাইয়া ইবনে খালফকে তোমার হাতে ন্যস্ত করছি। তারা আমাদেরকে আমাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করেছে এবং এমন জায়গায় আসতে বাধ্য করেছে যেখানে আমাদের উপর ছড়িয়ে পড়েছে অজ্ঞাত রোগ। তুমি তাদের সমুচিত শাস্তি দাও।

তারপর তিনি ফিরে মুসলমানদের জন্য দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! মদিনাকে আমাদের কাছে মক্কার মতো বা তারচেয়েও বেশি প্রিয় করে দাও। এ শহরকে স্বাস্থ্যকর করে দাও, প্রাচুর্য ভরপুর করে দাও। মদিনায় ছড়িয়ে পড়া এ মহামারিকে জুহফার দিকে নিয়ে যাও।

সে রাতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন, এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী—যার মাথার চুল উশকোখুশকো—সে মদিনা থেকে বের হয়ে জুহফার পথ ধরেছে। নবীজি বুঝতে পারলেন, এ স্বপ্ন তার দোয়া কবুল হওয়ার আলামত। এরপর থেকে মুহাজিররা আর এরকম জ্বরে আক্রান্ত হননি বা মদিনার আবহাওয়ার কোন প্রতিকূলতার জন্য অন্য কোন রোগেও ভুগেননি। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও অন্যান্য সাহাবিরা সুস্থ হয়ে গেলেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মদিনায় আসার পর অসুস্থ হয়ে গেলেন। তিনি খুবই দুর্বল হয়ে পড়লেন। ছোট শরীরে দীর্ঘ সফর ও মদীনার ভিন্ন পরিবেশ সবমিলিয়ে ধকল কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। তার শরীরের ওজন কমে গেলো। মাথার চুল পড়ে মাথা প্রায় খালি হয়ে গেলো। মা উম্মে রুমানের দুশ্চিন্তার অন্ত রইলো না। তিনি মেয়ের সুস্থতার জন্য সব রকমের তদবিরই করতে লাগলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু চিন্তায় পড়ে গেলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মনও দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। প্রিয়তমার অসুস্থতা তাকে ভাবিয়ে তুললো। তিনি রোজ এসে স্ত্রীকে দেখে যেতেন। উম্মে রুমানের সকল তদবিরই যেন ব্যর্থ হতে লাগলো। শেষে প্রতিবেশী এক আনসার মহিলা পরামর্শ দিলো খেজুর ও শসা একসঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে। উম্মে রুমান তা-ই করলেন। তার কয়েকদিন পর থেকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার শরীর ভালো হতে লাগলো। মায়ের বিশেষ যত্নে তার শরীরের ওজনও কিছুটা বাড়লো।

রুখসতের আয়োজন

এ সময়ে মসজিদে নববী নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ হয়েছে। জিবরাইল আলায়হিস সালাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আয়েশা আপনার স্ত্রী। আপনি তাকে ঘরে তুলুন। তার কয়েকদিন পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজিকে এসে সেই এক বিষয়ক প্রশ্নই করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি আপনার স্ত্রীকে ঘরে তুলে নিচ্ছেন না কেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন, সাদাক। অর্থাৎ আমি মোহরের ব্যাপার নিয়ে ভাবছি। কারণ মোহর পরিশোধের সামর্থ্য আমার এই সময়ে নেই। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জাগতিক সামর্থের মূল্য দিয়ে নবীজিকে মাপলেন না। নবীজির অপারগতা শোনার সাথে সাথে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সামনে ৫০০ দিরহাম পেশ করলেন। নবীজি আনন্দিত হয়ে তা গ্রহণ করলেন ও দেরি না করে তা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মনে পড়লো তার বেশকিছু কাজ বাকি। তিনি মসজিদে নববীর কাছে তার বাড়ি নির্মাণের কাজে হাত দিলেন এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য মসজিদে নববীর লাগোয়া একটি ছোট ঘরও তৈরি করেন। ঘরটি এত ছোট যে, সেখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দাঁড়ালে তার মাথা প্রায় ছাদে ঠেকে যেতো। আবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ঘরের মেঝেতে বিশ্রামের জন্য ঘুমালে তাতে আর কোন জায়গা খালি থাকতো না। দুনিয়াবি বাস্তবতার দিক থেকে যদিও ঘরটি ছিল নিতান্তই ছোট এবং জাঁকজমকহীন তবু সেখান থেকে সবসময়ই বিচ্ছুরিত হতো আধ্যাত্মিকতার আলো। যা পুরো দুনিয়াকে আলোকিত ও ঈমান, হেদায়াতের সাজে সজ্জিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

হিজরতের পরে আটমাস পার হওয়ার পর এলো সেই কাঙ্খিত দিন। বধূবেশে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের গৃহে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার যাত্রা করার দিন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অবশ্য এসবের কিছুই বুঝেন না। তিনি চলে গেছেন সখীদের নিয়ে খেলাধুলো করতে । উম্মে রুমান খুঁজতে গিয়ে দেখেন বাড়ির পাশে বাবলা গাছের ডালে রশি দিয়ে দোলনার ব্যবস্থা করেছেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা । সে দোলনায় মনের আনন্দে দোল খাচ্ছেন তিনি। উম্মে রুমান মনে মনে ভাবলেন, কী চপলা মেয়ে আমার ! আজকে যে তার স্বামীগৃহে যাত্রা করার দিন। আজকের দিনেও তার খেলার বিরতি নেই! এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গিয়ে হাতে ধরে মেয়েকে নিয়ে এলেন তিনি। তারপর ধুলোমাখা হাতমুখ ধুইয়ে মেয়েকে পরিপাটি করে ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরের ভেতর ঢুকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চমকে গেলেন কিছুটা। বেশ লোকজন আজ তাদের ঘরে। একটা হাসিখুশি, আনন্দঘন পরিবেশ। ব্যাপার কী! এদিকে আনসারি মহিলারাও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ঘরে ঢুকতে দেখে একসাথে সম্ভাষণের সুর ধরে বলে উঠলেন, তোমার আগমন কল্যাণময় হোক। তোমার আগমন হোক শুভ। তোমার আগমন বরকতে ভরপুর হোক।

একে তো আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তার উপর ঘরে ঢুকে এমন আচমকা সম্ভাষণ পেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন যেন। কেন সবাই তাকে এমন সম্ভাষণ জানাচ্ছে? ঘরজুড়ে আজ কিসের আয়োজন? মনে মনে কেবলই তার প্রশ্ন খুঁজতে লাগলেন আবু বকর তনয়া আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা।

তথ্যসহায়িকা :

১.সহীহ বুখারী।
২.সহীহ মুসলিম।
৩.তাবাকাতে ইবনে সাদ।
৪.মুসনাদে আহমাদ।

The post হুমাইরা—দিলরুবায়ে সারওয়ারে কায়েনাত( ৪র্থ পর্ব) appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b9%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%93%e0%a7%9f-3/

আব্দুল মুত্তালিব

মুহাম্মদ মাসুম মুনতাসির:

দরজায় কড়া নাড়লেন হাশিম। হাশিম মক্কার কুরাইশ গোত্রপতি। তার সুনাম সর্বত্র। দুহাতে মানুষকে দান করেন। অনাহারীর জন্য সবসময় তার দুয়ার থাকে উন্মুক্ত।
গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য শেষে আজই তিনি সিরিয়া থেকে ফিরলেন। ক্লান্তিতে পথচলা দুষ্কর। তাই ইয়াসরিবের বনু নাজ্জারের সরদার বন্ধুবর আমরের গৃহে এসে থামলেন বিশ্রামের জন্য। প্রতিবারই সিরিয়ায় আসা-যাওয়ার পথে বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে আসেন হাশিম। আমরও ইয়েমেন সফরে গেলে হাশিমের বাড়ি হয়েই যান।
আবারও নক করলেন হাশিম। না, এত দেরি তো কখনও হয় না- আনমনে বিড়বিড় করতে লাগলেন তিনি।

দরজায় প্রথম টোকা পড়তেই দৌড়ে এসেছিল সালমা। কিন্তু দোটানায় পড়ে গেছে সে, লোকটাকে কেমন চেনা চেনা লাগছে; আবার অচেনা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে উশখুশ করছে সে, খুলবে কি খুলবে না। যাক, খুলে দেখি কী বলে? এই ভেবে দরজা খুললো সে।

খট করে দরজা খোলার শব্দ হলো। ফিরে তাকালেন হাশিম। আচমকা চেহারায় জড়ো হওয়া একরাশ বিরক্তি হাওয়ায় উড়ে গেল। অসম্ভব এক ভালোলাগা হাশিমের হৃদয়ে নৃত্য তুললো। কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করলো দুজনের মাঝে। নৈঃশব্দ ভেঙে সালমা-ই প্রথম বলে উঠল, ভিতরে এসে বসুন! হাশিম পা বাড়াতেই সালমার দৌড়ে ভিতরে চলে গেলো। তার নুপুরের রিনিঝিনি শব্দে সারাঘর নেচে উঠলো।

একটু হেলান দিয়ে বসতেই দুচোখে ঘুম চলে এলো হাশিমের। বাইরে পায়ের আওয়াজ শুনে আবার শান্তির একপশলা ঘুম উবে গেল। দরজায় এসে দাঁড়ালো সে।
– আরে বন্ধু যে, আজই ফিরলে না কি? হাশিমকে দেখে বললেন আমর।
– হ্যাঁ বন্ধু, তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি!
– তো বন্ধু এবার ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন হলো?
– ভালোই বন্ধু, ওসব কথা পরে বলা যাবে।
– আচ্ছা তাহলে তুমি কিছু খেয়ে একটু ঘুমাও, আমরা পরে কথা বলি।
দুজনের কথা শেষ হতেই সালমা এসে দুয়ারে দাঁড়ালো।
– এই তো মা খাবার নিয়ে এসে গেছে। এসো মা, এসো! বন্ধুর সামনে এনে রাখো, কত দূর সফর করে এসেছে।
লাজরাঙা ঠোঁটে মুচকি হেসে হাশিমের সামনে খাবারগুলো রেখে আবার ভিতরে চলে গেল সালমা।
হাশিম খেতে লাগলেন। এদিকে তার হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হলো। বিষয়টা তিনি চেষ্টা করেও মন থেকে সরাতে পারছেন না। নাছোড় চিন্তাটা বারবার ডুব দেয়া হাঁসের মতো মাথা জাগিয়ে তুলছে। না, আর অপেক্ষা করা যায় না, বন্ধুকে বলেই দেখি বিষয়টা- মনে মনে স্থির করলেন তিনি।
বসা থেকে উঠতে যাচ্ছিল আমর। হাশিম বললো, কোথায় যাচ্ছো বন্ধু? তোমার সাথে একটু আলাপ আছে!
– তুমি খেয়ে নাও, পরেই না হয় বলো!
– না , আমি এখনই বলতে চাই!
– আচ্ছা বলো , কী বলবে?
– আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই!
– সত্যি বলছো?
সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালেন হাশিম।
– সে তো ভালো কথা! আমার মেয়ে মক্কার রানী হবে এরচে সৌভাগ্যের আর কী আছে?

সে রাতেই বিয়ে হয়ে যায় হাশিম আর সালমার। পরদিন সকালে নববধূকে নিয়ে হাশিম ফিরে আসেন মক্কায়। এরপর বেশ ক’মাস কেটে যায়…

দুই.

শীতকালীন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আবারো শামে যাত্রা করলেন হাশিম। পথিমধ্যে ইয়াসরিবে সালমাকে বাবার বাড়িতে রেখে এসেছেন। সালমা এখন সন্তানসম্ভবা।
যাবার বেলায় কতো করে বলেছিলো- এবার না হয় নাই গেলে, নতুন মেহমান আসছে কিছুদিন বাদে!
‘সোনামানিক আসতে আরও মাসখানেক, ততদিনে আমি ফিরে আসব আবার তোমার কাছে!’ এতোটুকু বললেই চলে এসেছিল হাশিম। এখন সে সিরিয়ার বেশ কাছাকাছি।

ওদিকে সালমা চিলেকোঠার জানালা খুলে তাকিয়ে আছেন বিরান বালুচরে। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল। দূর থেকে মনে হলো, কোন ঘোড়সওয়ার এদিকেই আসছেন। হ্যাঁ তাইতো, তিনি তো বেশ কাছে চলে এসেছেন এবং খুব দ্রুত ছুটছেন। তবে কি হাশিম ফিরে আসছে নাকি কোন দুঃসংবাদ? সালমার মনে এক অজানা আতঙ্ক দানা বেঁধে উঠল। তার কপালের ভাঁজে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ফুটে উঠল।

আগন্তুক এসে বাড়ির আঙ্গিনায় ঘোড়া থামালেন। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলেন সালমা। একসাথে দু’ধাপ করে নামতে গিয়ে হোচট খেয়ে পড়লেন। ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলেন। একজন পরিচারিকা এসে তাকে তুললেন, বেগম সাহেবা, আপনি প্রসূতি সে কথা ভুলে যাবেন না, আপনার কোন ক্ষতি হলে?
সালমা বললেন, না না, আমি ঠিক আছি। তুমি আগন্তুককে ডেকে পাঠাও!

একজন মাঝবয়েসী লোক ঘরে ঢুকলো। গাঁয়ে ঢিলেঢালা পোষাক। ডান হাতে ধরা ছোট্ট একটা চিরকুট। সালমা বললেন, কোন সংবাদ নিয়ে এসেছেন বুঝি?
– হ্যাঁ, এই চিরকুটটা!
– কী আছে ওটাতে, দেখি!
লোকটার হাতে কাগজটা নিলেন সালমা। হাতের মুঠোয় রেখে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন। খুলবেন কিনা মনস্থির করতে পারছেন না। আস্তে আস্তে তিনি পাপড়ি মেললেন। চোখের সামনে কাগজটি ধরলেন। লেখাটা দেখার সাথে সাথে এক চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন তিনি।

তিন.

বিকেলের রোদ ঝিমিয়ে এসেছে। চিলেকোঠার জানালায় এসে দাঁড়ালেন সালমা। কয়েকটা খেজুরডাল এসে জানালা ছুঁয়েছে। দক্ষিণে আজওয়া খেজুরগাছে একটা নীল পাখি এসে বসেছে। কেমন যেন করুণ সুরে ডেকেই যাচ্ছে। পাখির ডাকে বিকালের সুনসান নীরবতা শব্দমুখর হয়ে উঠছে। শিশু শায়বা তখনও ঘুমে। ওর বয়স মাত্র দুদিন। কপালের কাছে দু-তিনটে সাদা চুল ঝুলে আছে, তাই আদর করে সালমা ওর নাম রেখেছে শায়বা (শুভ্র কেশগুচ্ছ)।

ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ নিষ্পলক ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন সালমা। ছেলেটা দেখতে একেবারে বাবার মতো হয়েছে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ওর মুখ দেখেই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, এই ভেবে শক্তি সঞ্চয় করলেন তিনি। হাশিম যে এভাবে সন্তানের মুখ না-দেখেই চিরবিদায় নিবে সালমার মনের দেয়াল ডিঙিয়েও আসেনি কোনদিন এমন কোন চিন্তা। সালমা মনে মনে ভাবলেন- শায়বা বড় হলে, ওকে নিয়ে একদিন ফিলিস্তিনের গাজায় যাব- হাশিমের কবর যিয়ারতে।

চার.

জনতার ভিড় ঠেলে সাত বছর বয়সী এক বালক এসে মাঠে দাঁড়ালো। মায়াবি চেহারা আর কপালের সামনে ঝুলতে থাকা একগুচ্ছ সাদা চুলে ওকে অপরূপ লাগছে। উৎসুক দর্শকদের দৃষ্টি তখন ওর দিকে। সবার দৃষ্টিতে এক অপূর্ব মুগ্ধতা। অনেকে ফিসফিস করে বলছে, এতটুকুন ছেলে তীর ছুড়বে, পারবে তো?

আয়োজকদের একজনকে সামনে আসতে দেখা গেল। তিনি বালকটির হাত উঁচু করে ধরে বললেন, এ হচ্ছে ইয়াসরিবের সরদার আমরের একমাত্র দৌহিত্র। আজকের প্রতিযোগিতায় ও সর্বকনিষ্ঠ প্রতিযোগী। দেখা যাক তীর খেলায় ও কেমন পারদর্শিতা দেখায়।

জনতার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। একপা দুপা করে বালকটির তূণীরের কাছে এলো। নানা রঙের তীর থেকে সাদা একটি তীর উঠিয়ে লক্ষ্যে তাক করলো। দুপা এগিয়ে নিশানা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারলো। জনতার মাঝে মুহুর্মুহু ধ্বনি উঠলো- মারহাবা! মারহাবা! সাবাস বালক সাবাস!

মক্কার এক কাফেলা এ পথেই সিরিয়া থেকে মক্কা ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ছেলেদের হৈ-হুল্লোড় ও আনন্দ-উৎসব দেখে কিছুক্ষণ যাত্রাবিরতি দিলেন। কাফেলার আমির কী ভেবে যেন সামনে এগিয়ে গিয়ে বালকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কী?
বালকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত উর্ধ্বে তুলে বলল, হাশিম বিন আবদে মানাফের পুত্র শায়বা।
উত্তর শুনে দেরি না করে ঘোড়া নিয়ে মক্কা অভিমুখে ছুটলেন লোকটি।

পাঁচ.

হাশিমের মৃত্যুর পর তারই সহোদর ভাই মুত্তালিব মক্কার সর্দার হন। ভাইয়ের সব দায়-দায়িত্ব নিজেই কাঁধে তুলে নেন। অন্যান্য গোত্রের সরদারদের সাথে পরামর্শ করে মক্কার বিভিন্ন আশয়-বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। আজও তেমনি একটি পরামর্শ-সভার জন্য অন্যান্য গোত্রপতিদের নিয়ে তিনি কাবার চত্বরেই বসা ছিলেন। হঠাৎ ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শুনে ফিরে তাকালেন, আরে বনু হারিসের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী যে! কেমন আছেন? সিরিয়া থেকে কবে ফিরলেন? আগন্তুককে দেখে বলে উঠলেন মুত্তালিব।
– সেসব কথা পরেও বলা যাবে, আমি আপনাকে একটা বিষয় জানানোর জন্য বাজপাখির গতিতে ছুটে এসেছি।
– কী সেই বিষয়, যা জানানোর জন্য আপনি এত মরিয়া হয়ে উঠেছেন?
– সিরিয়া থেকে আসার পথে আমি কজন বালককে তীর খেলতে দেখেছি, তাদের মধ্যে হাশিমপুত্র শায়বাও ছিল। আমার কাছে তাকে মদিনায় রাখা ভালো মনে হয়নি, তাই আপনাকে জানাতে এসেছি!
– আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আপনার উটটি দিতে রাজি হলে, আমি এখনই মদিনায় যেতে চাই!

বেলা শেষে লাল আবির ছড়িয়ে অস্তাচলে ফিরছে সূর্য। একটু একটু করে পৃথিবীকে ঘিরে নিচ্ছে আঁধার। বাড়ির উঠানে বন্ধুদের সাথে বল খেলছিল শায়বা। খেলতে খেলতে একসময় বলটি বেশ দূরে চলে যায়। শায়বা বল কুড়িয়ে আনতে দৌড়ে যায়। মাটি থেকে বল তুলে মাথা উঁচু করতেই একজন অশ্বারোহীকে দেখতে পায়। আগন্তুকের চোখে চোখ পড়ে শায়বার। আগন্তুক বুঝতে পারেন, এই তার ভাই হাশিমের পুত্র শায়বা। তবুও অপরিচিতের মতো শায়বাকে পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন, তোমার নাম কী খোকা?
– আমি মক্কার সরদার হাশিমের পুত্র শায়বা!
– আমি তোমার মায়ের সাথে দেখা করতে চাই!
– মায়ের সাথে কথা বলবেন? মা তো ওই ঘরেই আছেন, চলুন!

– আমি হাশিমের ভাই মুত্তালিব। ঘরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিলেন আগন্তুক।
– কেমন আছেন? আপনার আগমন শুভ হোক!
– জি ভালো আছি। আমি শায়বাকে মক্কায় নিয়ে যেতে চাই, যদি আপনার অনুমতি হয়!
-না না, অনুমতির কী আছে? আপনি ওকে নিয়ে যেতে পারেন!

পরদিন ভরদুপুর। কাবার চত্বরে তখন অনেক মানুষের ঢল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়ে বসেছে গল্পের আসর। কোথাও হচ্ছে কবিতা প্রহর। কেউবা খেলা দেখিয়ে দর্শককে মাতিয়ে তুলছেন। এসময় শায়বাকে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন মুত্তালিব। তার পিছনে অপরিচিত বালককে দেখে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, উটের পিছনে কে বসা?

শায়বার গায়ের পোশাকটি ছিল ধুলোমলিন, তাই মুত্তালিব সঠিক বিষয়টা বলতে কিছুটা সঙ্কোচ বোধ করলেন। তিনি বললেন, ও আমার গোলাম!
পরে তিনি শায়বাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তখন তার স্ত্রী খাদিজা বিনতে সাঈদও একই প্রশ্ন করলেন, তোমার সাথে এ বালকটি কে? কীইবা তার পরিচয়?
তিনি বললেন, এ আমার গোলাম।
এরপর তিনি শায়বাকে সুন্দর একজোড়া পোশাক পরিয়ে আবদে মানাফ গোত্রের মজলিসে মক্কার উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি তাদেরকে পুরো ঘটনা খুলে বললেন এবং শায়বাকে ভাতিজা বলে পরিচয় দিলেন।

কিন্তু প্রথম যেহেতু তিনি শায়বাকে তার গোলাম বলে পরিচয় দিয়েছিলেন, আর আরবে গোলামকে ‘আবদ’ বলা হয়। এজন্যই আরবের সবাই শায়বাকে আব্দুল মুত্তালিব বা মুত্তালিবের গোলাম বলে ডাকতেন। এটাই ছিল শায়বার আব্দুল মুত্তালিব হয়ে ওঠার গল্প। পরবর্তীতে এই আব্দুল মুত্তালিবই হয়ে ওঠেন কুরাইশের অবিসংবাদিত নেতা।

The post আব্দুল মুত্তালিব appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ac/

Thursday, June 24, 2021

নাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় নিহত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এত সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু এবং বয়স পাঁচ বছরের নিচে।

নাইজেরিয়ায় সহিংসতা ও এর প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) করা জরিপের প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সহিংসতায় যে প্রাণহানি ঘটেছে তা ধারণার চেয়েও ১০ গুণ বেশি।

জাতিসংঘ জানায়, সহিংসতায় নিহত সাড়ে তিন লাখের মধ্যে প্রায় তিন লাখ ২৪ হাজারই ছোট শিশু। অর্থাৎ নিহত প্রতি ১০ জনের নয় জনই ছোট শিশু। প্রতিদিন গড়ে সেখানে ১৭০ জন করে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। সহিংসতায় প্রায় তিন লাখ ১৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন পরোক্ষ কারণে।

সহিংসতার কারণে দেশটিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। এতে করে কৃষি উৎপাদন ও বাণিজ্য কমেছে। খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা যারা কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়ণ ও সুপেয় পানির অভাবে ভুগছে। তাদের মধ্যে শিশুরা বেশি ভুক্তভোগী। আরও এক দশক সহিংসতা চললে এই সংখ্যা আরও ১৫ লাখ ছাড়াবে।

কেবল উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়াতেই এক কোটি ৩১ লাখ মানুষ সহিংসতায় আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৮৭ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

The post নাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় নিহত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a7%a7%e0%a7%a8-%e0%a6%ac%e0%a6%9b%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%82/

দেশে একদিনে করোনা শনাক্ত ৬০৫৮, মৃত্যু ৮১

ফাতেহ ডেস্ক:

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে পুরুষ ৫৫ ও নারী ২৬ জন। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬২, বেসরকারি হাসপাতালে ১৪ এবং বাসায় ১০ জন মারা যান। এ নিয়ে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩ হাজার ৮৬৮ জনে।

একই সময়ে নতুন করে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন আরও ছয় হাজার ৫৮ জন। এ নিয়ে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল আট লাখ ৭২ হাজার ৯৩৫ জনে।

এর আগে বুধবার (২৩ জুন) ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৮৫ জনের মৃত্যু এবং ৫ হাজার ৭২ জন নতুন রোগী শনাক্তের তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। গতকাল নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারি ও বেসরকারি ৫৫৪টি ল্যাবরেটরিতে ৩০ হাজার ৯৯৪টি নমুনা সংগ্রহ ও ৩০ হাজার ৩৯১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে নতুন করে ছয় হাজার ৫৮ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়। এ নিয়ে মোট নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৬টি।

২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার হিসাবে শনাক্তের হার ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শনাক্তের মোট হার ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

The post দেশে একদিনে করোনা শনাক্ত ৬০৫৮, মৃত্যু ৮১ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4/

পণ্য ডেলিভারির পর টাকা পাবে ইভ্যালির মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান

ফাতেহ ডেস্ক:

ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে ক্রেতাদের কাছে পণ্য ডেলিভারির পরই টাকা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের এসব লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মহাপরিচালক, ডাব্লিউটিও সেল) হাফিজুর রহমান।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) দুপুরে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা’ বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি এসওপি সার্ভিস ডেভেলপ করা হবে। যাতে পণ্য ডেলিভারির আগে পেমেন্ট নেয়া না হয়। ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ড যাদের আছে, তারা পেমেন্ট কন্ট্রোল করবে।’

অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান বলেন, ‘পেমেন্ট দেয়ার পর পণ্য ডেলিভারি হলে তারা যদি মেসেজ পায়, তারপর সেই পেমেন্ট কনফার্ম করবে। এটাই মোটামুটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগগিরই এসওপি ডেভেলপ করা হবে। ইমিডিয়েট বিষয় হলো- পেমেন্ট সিস্টেম কন্ট্রোল করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে।’

ক্রেতাদের পণ্য কেনা নিয়ে কোনো বার্তা আছে কি-না প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘ক্রেতাদের সতর্ক থাকতে হবে। যারা অস্বাভাবিক অফার দেয়, তারা সন্দেহজনক আচরণ করতে পারে। তারপরও আমরা আশা করি- তারা যেন অনলাইনে কার্ড বা বিকাশ-নগদের মতো সিস্টেমে পেমেন্ট করে, তাহলে পেমেন্ট কন্ট্রোল করা যাবে। এর বাইরে ভিন্ন পন্থায় যদি তারা অ্যাডভান্স দিয়ে দেয়, তাহলে কিন্তু সমস্যা হতে পারে।’

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও ডাক টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিনিধি, রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বিটিআরসির প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রতিনিধি, ই-ক্যাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন।

The post পণ্য ডেলিভারির পর টাকা পাবে ইভ্যালির মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%aa%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a1%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0-%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%be/