মোঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম :
( পূর্ব প্রকাশের পর ) জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ও মাওলানা মওদূদীর চিন্তার সিলসিলা
জন আকাঙ্ক্ষায় মাওলানা মওদূদীর প্রভাব
জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জামাতের অনুসারীরা যে অভিযোগগুলি আনছে তা হচ্ছে আধুনিকতাবাদী হওয়া, সেকুলারিজমকে গ্রহণ করা, সিয়াসিয়াতকে মুখ্য ভেবে রাজনৈতিক হতাশার কারণে ‘ইসলামচ্যুত’ হওয়া, আলেম-বিদ্বেষ, এবং একাত্তর প্রসঙ্গে পিছুটান। এ সমস্ত বিষয়ের মধ্যে একাত্তর প্রসঙ্গ মাওলানা মওদূদীর সাথে সম্পৃক্ত নয়। সে কারণে এটা নিয়ে এখানে আলোচনার অবকাশও নাই। তবু সংক্ষেপে এইটুকু বলা যেতে পারে যে একাত্তর প্রসঙ্গে জন আকাঙ্ক্ষার যে নীতি, তার সাথে জামাতের ঘোষিত নীতির কোনরুপ পার্থক্য অন্তত এই অধমের চোখে ধরা পরে নাই।
পূর্বেই দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে ছাপা জামাত নেতা সেলিম উদ্দীনের কলামের কথা উল্লেখ করেছিলাম। এই লেখার জন্য সেই লেখা নতুন করে পড়তে গিয়ে একটা লাইনে চোখ আটকে গেল :
“গণতন্ত্র, সাম্য, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মূল মন্ত্রকে সামনে রেখে, যে বুক ভরা আশা নিয়ে দেশের মানুষ একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সচেতন মানুষের মুখে মুখে আজ একটিই প্রশ্ন- সে উদ্দেশ্য পূরণে আমরা কতটুকু সফল হয়েছি?” (Uddin, 2016)
পাঠকদের অনেকেই হয়তো ইতোমধ্যে ধরে ফেলেছেন আমি ঠিক কী বলতে চাচ্ছি। যারা এখনও বুঝতে পারেন নাই, তাদের জন্য জন আকাঙ্ক্ষার প্রতিষ্ঠাকালীন ইশতেহার থেকে কোট করছি-
“বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত মূলনীতি; সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ আমাদের জাতীয় ঐক্যের পাটাতন। মক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রতিশ্রুত বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে জাতীয় জীবনের সকল অর্জন ও ঐক্যের জায়গাগুলো সমন্বিত করে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি প্রস্তুত করা প্রয়োজন” (Daily Manabzamin, 2019)।
আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর প্রদত্ত বক্তব্যে মকবুল ও ডাক্তার শফিকুরও অনুরুপ কথা বলেছেন। কাজেই একাত্তর প্রসঙ্গে জন আকাঙ্ক্ষা আর জামাতের মধ্যে কোন পার্থক্য উভয় দলের ঘোষিত বক্তব্য, লিফলেট, ব্যানার ইত্যাদি কিছুতে পাওয়া যায় নাই। যারা এমন দাবী করেন তারা সম্ভবত বলতে চান একাত্তর প্রসঙ্গে জামাত তাকিয়া করে (তথা মুখে একাত্তরকে স্বীকার করে আর অন্তরে ভিন্ন ব্যাখ্যা লুকিয়ে রাখে)। জনপরিসরে তাকিয়ার অভিযোগকে অগ্রহণযোগ্য বলে আমি মনে করি। তাকিয়ার অভিযোগ যে শুধু ইসলামোফোবিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাই নয়, এমনিতেও কার অন্তরে কী আছে তা শুধুমাত্র আল্লাহ্ই ভাল জানেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটা ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি যে বিচার করার সময় আমরা শুধুমাত্র তার নিরিখেই বিচার করব যা প্রমাণ করা সম্ভব। অন্তরের বিষয় দিয়ে আমরা দুনিয়াবী কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না। সেটার বিচার আল্লাহ্ পাক করবেন।
এরপর বাকি থাকে আধুনিকতা, সেকুলারিজম, রাজনীতিকেই মূল বানানো, এবং আলেম-বিদ্বেষ। আধুনিকতা ও আলেম-বিদ্বেষ প্রসঙ্গে ইতোমধ্যেই বিস্তর আলোচনা করেছি এবং ঐতিহ্যবাদ ও আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে মাওলানা মওদূদীর ভূমিকা পর্যালোচনা করে দেখতে পেয়েছি যে মাওলানা মওদূদী নিজেই আধুনিকতার সন্তান এবং আধুনিকতার চৌহদ্দিতেই তাঁর অবস্থান। কাজেই জন আকাঙ্ক্ষা আধুনিকতার সঙ্কট ধরতে ব্যর্থ এ কথাটা ঠিক ততটাই সত্য, যতটা সত্য এই দাবী যে এর জন্য মাওলানা মওদূদী ও ইসলামপন্থী চিন্তাধারাই দায়ী। একইভাবে আলেমদের পাশ কাটিয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের নেতৃত্বে চলাটাও আমাদের মাওলানা ও মাওলানার দলই শিখিয়েছেন।
সেকুলারিজম নিয়ে জন আকাঙ্ক্ষা যে ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে সেটাও মাওলানা মওদূদী থেকেই উৎসারিত। হাল্লাকের রেফারেন্স দিয়ে আমরা মাওলানা মওদূদীর ‘ইসলামী রাষ্ট্রকল্পে’র স্বপ্ন কেন পূরন হবার নয়, সেটা দেখেছি। আধুনিক রাষ্ট্র কোন নিরপেক্ষ কনসেপ্ট না, যে চাইলাম আর একে ইসলামী বানালাম। তেমনিভাবে, সেকুলারিজমও কোন নিরপেক্ষ ধারণা না যে, চাইলাম আর একে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে ঢেলে সাজালাম। এক্ষেত্রে মাওলানা যে ভুল করেছেন জন আকাঙ্ক্ষাও সেই একই ভুল, একই কারণে, একই পন্থায় করছে। জন আকাঙ্ক্ষা ভাবছে নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে সেকুলারিজম তো ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতেই গঠিত হবে। ইউরোপের সেকুলারিজমের মধ্যে খ্রিষ্টান আচার, বিশ্বাস, ধারণা, প্রথা ও মূল্যবোধ প্রোথিত (Asad, 2013; Zabala, 2005; Mahmood, 2013)। তাহলে বাংলাদেশের সেকুলারিজম কেন ইসলামী লেবাস থেকে মুক্ত হয়ে মূল্যবোধকে নিজের ভেতর ধারণ করে গঠিত হতে পারবে না? অনুরুপ চিন্তা আমরা মাওলানা মওদূদী ও ইসলামপন্থীদের মধ্যেই পাই।
মাওলানা আধুনিক বিজ্ঞানকে ইসলামীকরণ করা সম্ভব মনে করেছেন। ‘যুক্তির নিরিখে ইসলামকে আধুনিকতার উপযোগী করেছেন।’ ইসলামপন্থার জন্মদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ইসলামী বানানোর স্বপ্ন দেখেছেন। মাওলানা মওদূদী তো এটাও মনে করতেন যে, মডার্নিটিরও ইসলাময়ন সম্ভব। একারণে তিনি মডার্নাইজেশন তথা আধুনিকায়নকে হ্যাঁ কিন্তু পশ্চিমায়ন বা ওয়েস্টার্নাইজেশনকে না বলেছেন। পশ্চিমা চিন্তাচেতনাকে ইসলামায়নের এই স্বভাব মওদূদী অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেন বলেও উল্লেখ করেন ইহুদী থেকে মুসলমান হয়ে পাকিস্তানে হিজরত করা আমেরিকান মহিলা মরিয়ম জামিলা (Nasr, 1996)।
প্রতিটা ক্ষেত্রেই মাওলানা যে জিনিসটাকে ইসলামী বানাতে চাচ্ছেন, তার মজ্জাগত পশ্চিমা স্বভাবকে উপেক্ষা করে গেছেন। আমি এখানে বলছি না যে, এধরণের ইসলামায়ন একেবারেই অসম্ভব। এটাও বলছি না যে, এই প্রবণতাটা খারাপ। সম্ভব-অসম্ভব ও ভাল-খারাপের ফয়সালা আমি জ্ঞানের সংশ্লিষ্ট শাখার তাত্ত্বিক ও আলেমদের জন্য তুলে রাখলাম। আমি শুধু এটাই বলছি যে, সবকিছুকে ইসলামায়নের এই যে প্রবণতা (অনেকসময় ইসলামকে উহ্য রেখেই) সেটা তো মাওলানা মওদূদীরই অনবদ্য অবদানসমূহের একটা।
‘জন আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক সাফল্যকে মূল মনে করে। ক্ষমতা না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে এখন পশ্চিমা লিবারেলিজমের অনুগামী হচ্ছে’ – জামাতের পক্ষ থেকে এধরণের অভিযোগ সচেতন পাঠককে যারপরনাই হতচকিত করে বৈ কি। কেননা ঠিক এই অভিযোগই মাওলানা মওদূদী ও জামাতের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ এতদিন করে এসেছেন। মাওলানা তাঁর বিখ্যাত Four Key Concepts of the Quran কেতাবে রাজনীতিকে ইসলামের মূখ্য বিষয় হিসাবে দেখান। এর জবাবে মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী লেখেন Appreciation and Interpretation of Religion in the Modern Age। ইসলামকে রাজনীতির মাধ্যমে দেখার এই সমস্যার মধ্য থেকেই ধর্মীয় বিফলতা থেকে ধর্ম বিমুখতার উৎপত্তি।
জন আকাঙ্ক্ষার জামাতি সমালোচকরা বলা যায় খুব যৌক্তিকভাবেই জন আকাঙ্ক্ষার রাজনীতিকেন্দ্রিকতার রোগ নির্ণয় করতে পেরেছেন। কিন্তু রোগের মূল যে মাওলানা মওদূদী ও জামাতি দর্শন সেটা তারা হয় রাজনৈতিক কৌশলের কারণে চেপে যাচ্ছেন কিংবা তারা সেসম্পর্কে অজ্ঞ। দ্বিতীয়টা হওয়ার সম্ভাবনা কম কেননা যেহেতু তারা রোগটা জানেন তাহলে কোন মানসিকতা থেকে রোগটার উৎপত্তি সেটা তো অজানা থাকার কথা না।
জন আকাঙ্ক্ষা ইসলামপন্থার স্বাভাবিক বিবর্তনের ফল :
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, বিশ্ব ইসলামপন্থার অবিসংবাদিত তাত্ত্বিক গুরু মাওলানা মওদূদী। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন তথা ইসলামপন্থায় জন আকাঙ্ক্ষা প্রবণতা নতুন কিছু না। আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন ও ভালবাসার পাত্র তুরস্কের নয়া ওসমানীয় সুলতান এরদোয়ানও ২০০২ সালে নিজ দেশে জন আকাঙ্ক্ষা ফর্মূলা প্রয়োগ করে কামিয়াবি হাসিল করেছেন। তিউনিশিয়ার ইসলামপন্থী দল এন্নেহদা পুরাটাই বিবর্তিত হয়ে জন আকাঙ্ক্ষার তিউনিশিয়ায় পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের জাভেদ আহমেদ ঘামিদীসহ অনেক জামাত ঘরানার তাত্ত্বিক-বুদ্ধিজীবী একটা পর্যায়ে এসে জন আকাঙ্ক্ষার আদর্শে দীক্ষিত হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থার মাঝে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ সমস্তই কি নিছক বিক্ষিপ্ত ঘটনা নাকি এটা ইসলামপন্থার স্বাভাবিক বিবর্তনের ফসল?
আল্লামা নাসরের গবেষণাগ্রন্থ থেকে আমরা ধারণা পাই যে এটা ইসলামপন্থারই স্বাভাবিক বিবর্তন। খোদ মাওলানা মওদূদীর জীবদ্দশায় ও নেতৃত্বে গণতন্ত্র হারাম থেকে হালাল হয়েছে ইসলামপন্থায়। উপমহাদেশে ইসলামপন্থার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ভারতের জামাতপন্থী বুদ্ধিজীবী ইরফান আহমেদ দেখান যে, প্রতিষ্ঠাকালীন জামাতি মূলনীতির প্রায় কোনটাই বর্তমানে জামাত মেনে চলে না। প্রতিষ্ঠাকালে জামাতের রোকনদের জন্য নিম্নলিখিত জিনিসগুলি নিষিদ্ধ ছিল :
১. সেকুলার আইন প্রণয়নকারী সংসদ
২. আল্লাহর নামে যুদ্ধ না করা সেনাবাহিনী
৩. সেকুলার বিচারব্যবস্থা এবং সুদী ব্যাংক
৪. মুসলমান কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরণের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ও শিক্ষকতা করা
৫. অধর্মীয় সিস্টেমে সব ধরণের চাকরি ও সেবা
১৯৬৭ পর্যন্ত ভারতীয় জামাত ভোট দেওয়াকে হারাম গণ্য করত। ঐ বছর শুধুমাত্র মুসলমান প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যাবে মর্মে জামাতের মজলিশে শূরা নতুন ফতোয়া দেয়। যেই জামাত একসময় গণতন্ত্রকে হারাম মনে করত, সেই জামাত গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে জামাতের মজলিশে শূরা শুধুমাত্র মুসলমান প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার যে শর্ত ছিল সেটাও তুলে নেয়। অর্থাৎ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যে কোন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যাবে।
এভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই জামাতের একমাত্র ও মূল মাকসাদ হয়ে দাঁড়ায়। ওয়েলফার পার্টি অব ইন্ডিয়া গঠনের মাধ্যমে জামাতের এহেন কার্যকলাপ আরও গতি পায়। বিধর্মীরাও জামাতের নেতৃত্বে আসে। বিভিন্ন লিবারেল বিষয় জামাতের এজেন্ডায় স্থান পায়। পাকিস্তানেও একই ঘটনা ঘটে (Ahmed, 2013)। ধীরে ধীরে আর দশটা রাজনৈতিক দলের মত হয়ে যাওয়ায় দফায় দফায় রক্ষণশীলরা জামাত ছেড়ে বেরিয়ে যান। এটা আল্লামা নসরের বইয়েও স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মাওলানা আব্দুর রহীমের উদাহরণ তো আমাদের সামনেই আছে।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ইসলামপন্থা একই গন্তব্য বেঁছে নেয়। সেকুলার কাঠামোকে ব্যবহার করে পাবলিক পরিসরে ইসলামী মূল্যবোধ প্রবেশ করানোর যে জন আকাঙ্ক্ষা ফর্মূলা, তার সফল প্রয়োগ করেন সুলতান এরদোয়ান। সুলতান এরদোয়ানের জন আকাঙ্ক্ষা নীতির তারিফ করে ‘জামাত এপলজেটিক’ পিএইচডি গবেষক লেখেনঃ
“মজার ব্যাপার হচ্ছে অনেকে মনে করেন এরদোয়ানের কোনো ইসলামী এজেন্ডা নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইসলামী আন্দোলনের এমন কর্মীর সাথে কথা বলেছি, যিনি মনে করেন এরদোয়ান পশ্চিমাদের এজেন্ট। একজন মানুষ আসলে কী বিশ্বাস করেন, সেটা অন্তরের ভেতরে ঢুকে বোঝা সম্ভব নয়। বরং মানুষ বাঁচে তার কাজের মধ্য দিয়ে। বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়। আসুন দেখা যাক এরদোয়ানরা গত ১২ বছরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আন্তর্জাতিক ও ব্যক্তিজীবনে কী ধরনের সংস্কার নিয়ে এসেছে। এবং সেই সংস্কারগুলো বিবেচনার সময় আমরা খেয়াল করব একজন নিরেট স্বার্থবাদী মানুষ, যার কোনো ইসলামী এজেন্ডা নেই, তার পক্ষে এই ধরনের কাজ করার কী ধরনের প্রণোদনা (incentive) থাকতে পারে।…
এরদোয়ানের সমালোচকরা অনেকেই মনে করেন ইসলাম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না ঠিকই; কিন্তু পলিসি নির্ধারণের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক পার্টির এক ধরনের রক্ষণশীল ঝোঁক, সামাজিক বিষয়াদিতে সরকারী মদদে নৈতিকতা ছড়ানোর চেষ্টা স্পষ্ট। যেমন ধরা যাক কোনো সিনেমা বা মঞ্চ নাটকে যদি এমন ডায়ালগ থাকে যে, “I want to sleep with you.” খুব সম্ভবত সেই নাটক/সিনেমা তুর্কিতে আর আলোর মুখ দেখবে না। যেসব সরকারী থিয়েটার বা অপেরা হাউজ সরকারী ফান্ড পায় সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখন এরদোয়ানের ‘পরহেজগার জেনারেশনে’র হাতে। কাজেই এর একটা পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে প্রোডাকশনের উপর। গত বছর মদের উপর সরকার কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যেকোনো প্রকারের মদের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং গভীর রাতে এর বেচাবিক্রিও নিষিদ্ধ। এখন আর সব জায়গায় মদ বেচাও যাবে না।
সরকারী একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এসব কাজের কারণ ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, আমরা কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেগুলেশন যথাযথভাবে মেনে চলার চেষ্টা করছি। এখানেও ইসলামী ঝান্ডা না উড়ানোর সচেতন ও কৌশলী ভূমিকা সহজেই চোখে পড়ে। … এক কথায়, তুর্কির রাস্তায় হাঁটলে আপনার চোখে পড়বে অনেক বেশি হিজাব; মসজিদের সংখ্যাও গেছে অনেক বেড়ে। ইসলামী দাওয়াহ আগের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী আর মসজিদে লোক আসছে অনেক বেশি। বিখ্যাত তুর্কি সাংবাদিক মুস্তফা আকিউল বলেন, “আগের দিনে একজন আদর্শ তুর্কি ছিলেন তিনিই যিনি পরহেযগার নন, আর এখন এর ঠিক উলটা। আপনি যদি মদখোর হন, একেপির রাজ্যে আপনার খবর আছে, এখানে আপনার জায়গা খুঁজে নিতে কষ্ট করতে হবে। এই লোকগুলা আসলে ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটার উপরের দিক নিচে আর নিচের দিক উপরে এনে উলটে-পালটে দিচ্ছে।”
এখন শুরুর প্রশ্নে ফিরে যাই, এরদোয়ানের কি আসলে কোনো ইসলামী এজেন্ডা আছে? বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়। … এরদোয়ানদের সাথে যারা আক পার্টি গড়ে তোলায় এগিয়ে এসেছিলেন এদের অনেকেই এসেছিলেন মূলত অর্থনৈতিক দর্শনে মিল থাকার কারণে, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে নয়। এরদোয়ানের পার্টি যে অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করেছিল সেটা ছিল উদারনৈতিক পুঁজিতান্ত্রিক [liberal capitalist] বিকাশের জন্য খুবই উপযোগী। … এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে অসম্ভব মেধাবী, কৌশলী ও দুনিয়াদারীর বুঝওয়ালা একদল অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বের হাতে। … তুর্কির ইউরোপমুখী অভিগমন একদিকে যেমন বহু খারাপ বিষয়ের আমদানি করেছে, অন্যদিকে কিছু ভাল ইন্সটিটিউশন (প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি অর্থে) বয়ে এনেছে। এর একটা হচ্ছে একটা উদারনৈতিক [লিবারেল] স্পেস তৈরি করা। এই স্পেস একটা স্বাস্থ্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ হাজির করেছে।
এই পরিবেশ এক রকমের বুদ্ধিবৃত্তিক সহনশীলতা জন্ম দিয়েছে। কী জানি কেন যেন মনে হয়, বাংলাদেশে একদিকে পশ্চিমাকরণ হচ্ছে আর অন্যের চিন্তা গ্রহণ করা বা নিদেনপক্ষে অন্যের মত শোনার মত সহনশীলতা শূন্যের দিকে যাচ্ছে। এরদোয়ানরা ইইউ’তে তুর্কির একীভূতকরণের যে মুলাটা ঝুলিয়েছিলেন, তা ছিল এই সিভিল স্পেস ব্যবহার করার সুবিধার স্বার্থে। এই এক মুলা ঝুলিয়ে রাজনীতি থেকে সেক্যুলার-মিলিটারি আঁতাতের ‘ডিপ স্টেট’কে একদম ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন।
কেননা ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড দাবি করে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং কিছু অনস্বীকার্য সিভিল রাইটস। মিলিটারি ছিল সেক্ষেত্রে একটা বাঁধা। ইইউ’তে যাওয়ার কথা বলে সেগুলো সহজে দূর করা সম্ভব হয়েছে। জুডিশিয়াল রিফর্মও হয়েছে একই সাথে। এর আগে জুডিশিয়ারির কাজই ছিল অনুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে দেখা, কোথাও সেক্যুলারিজম এতটুকু ‘দূষিত’ হয়ে গেল কিনা। পরে যখন ইইউ তুর্কিকে নিতে অনাগ্রহ দেখালো, ততদিনে রিফর্ম যা হবার হয়ে গেছে এবং সেক্যুলার এলিট ডিপ স্টেট পরিণত হয়েছে এক দন্তনখবিহীন বাঘে” (Nirjhor, 2014)।
পূর্বেই লেখকের পরিচয় উল্লেখ করে না দিলে যে কোন পাঠকের মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে এটা বোধহয় কোন জন আকাঙ্ক্ষাপন্থী লেখকের রচনা। লেখক শুধু সুলতান এরদোয়ানের জন আকাঙ্ক্ষা নীতিরই প্রশংসা করেন নাই, liberal ইন্সটিটিউশনসমূহকে গ্রহণ করার বিষয়টিকেও সাধুবাদ জানিয়েছেন। বাস্তবে জন আকাঙ্ক্ষা উপমহাদেশে ও বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থার যে স্বাভাবিক বিবর্তন সে পথেই হাঁটছে। আইন-আদলতকে একসময় তাগুত মনে করা জামাত আজকে হাজার হাজার আইনজীবী তৈরী করেছে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, এডভোকেট শিশির মনির, এডভোকেট তাজুলরা দীর্ঘদিন জামাতের মুখপাত্র হিসাবে ভূমিকা পালন করেছেন বা করছেন। অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার আযমী সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন তিন দশক ধরে।
অথচ প্রতিষ্ঠাকালে জামাতের চোখে আল্লাহ্র নামে যুদ্ধ না করা সেনাবাহিনী ছিল তাগুতি শক্তি। মানবরচিত আইন বানানোর স্থান সংসদে যাওয়ার জন্য প্রাণান্ত কোশেশ চালিয়ে যাচ্ছে জামাত। জামাতের মূল রিক্রুটমেন্ট পুলও কলেজ-ভার্সিটি। বাংলাদেশ জামাতের সব আমীর ভার্সিটি ডিগ্রীধারী। প্রতিষ্ঠাকালীন প্রত্যেকটা বিধিনিষেধ জামাত ক্রমান্বয়ে তুলে নিয়েছে। সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে নিজেকে অধিক থেকে অধিকতর লিবারেল-মডারেট করেছে। এবং নিজের লিবারেল-মডারেট স্বরুপ নিয়ে যথেষ্ট ফখরও করেছে। তিউনিশিয়াতেও দুই দিন আগেও যেটা জামাত-ঘরানার এন্নাহদার কাছে হারাম ছিল সেটাই এখন কোরান-হাদীসের আলোকেই হালাল হয়ে গেছে (Hamid, 2016)।
পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার তাড়না ইসলামপন্থার মজ্জাগত স্বভাব। সেই স্বভাবই জন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে। তাত্ত্বিকরা জন আকাঙ্ক্ষাকে হয়ত Foucault এর genealogy অথবা Wittgenstein এর family resemblance কনসেপ্ট দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। যেটাই হোক না কেন, এটা জোর দিয়েই বলা যায় মাওলানা মওদূদী যদি এই প্রজন্মের হতেন এবং বাংলাদেশী হতেন, তাহলে উনি নিজেই জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশের মধ্যমণি হতেন।
এমনকি খোদ জন আকাঙ্ক্ষা ধারণাটাও মাওলানা মওদূদীর লেখনী থেকে নেওয়া। মাওলানার বই Islamic Law and Constitution এর রেফারেন্সে আল্লামা নসর লেখেন যে, মাওলানার ইসলামী রাষ্ট্রে রাষ্ট্র শরিয়ত কায়েম করবে না বরং জন আকাঙ্ক্ষা কায়েম করবে। জনগণের উপর আল্লাহ্র আকাঙ্ক্ষা বা শরিয়ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। জনগণ যখন আকাঙ্ক্ষা করবে, তখনই কেবল শরিয়ত কায়েম করা যাবে। এজন্য জনগণকে প্রথমে এমনভাবে প্রস্তুত করে নিতে হবে যেন, জনগনের আকাঙ্ক্ষাই হয় শরিয়ত কায়েম। এমনকি মাওলানা এটাও বলেন যে, সমাজকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামাইজ করার আগে হুদুদ কায়েম করা যাবে না। কাজেই যেসব জামাতি অনুসারী প্রশ্ন করছেন যে ইসলামপন্থা হচ্ছে জন আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে আল্লাহর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা, তারা খুব সম্ভবত ইসলামপন্থার বুনিয়াদী কেতাব ও মাওলানা মওদূদীর শক্তিশালী লেখনী কখনো পড়েই দেখেন নাই।
বস্তুত, ইসলামপন্থার মূল বিষয়ই হচ্ছে জনগনের মধ্যে ইসলামের আকাঙ্ক্ষা তৈরী করে তারপর সেই জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে জন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম করা (Nasr, 2006)। সম্ভবত জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশও চিন্তা করছে নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশের জন আকাঙ্ক্ষা যেহেতু ইসলাম হওয়াই স্বাভাবিক কাজেই জন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অর্থই হচ্ছে ইসলাম কায়েম। এর চেয়ে নিখাঁদ, সহি, টিপিকাল জামাতি-মওদূদীবাদী-ইসলামপন্থী এপ্রোচ আর কী হতে পারে?
উপসংহার
আমি এই লেখায় কোন ভ্যালু জাজমেন্টে যেতে চাই নাই। তবে এটা তো আর অস্বীকার করার সুযোগ নাই প্রতিটা শব্দের পেছনে ভ্যালু জাজমেন্ট লুকিয়ে থাকে। জামাত, জন আকাঙ্ক্ষা, মাওলানা মওদূদী কোনটাকেই ভাল বা খারাপ বলা আমার উদ্দেশ্য না। এটার বিচার করা এই লেখার স্কোপের মধ্যে পড়ে না। আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি জন আকাঙ্ক্ষার যে মনস্তত্ত্ব তার চেয়ে খাঁটি জামাতি মনস্তত্ত্ব আর কিছুই হতে পারে না। বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থার স্বাভাবিক বিবর্তনের যে রীতি, জন আকাঙ্ক্ষা সেই পদাঙ্কই অনুসরণ করেছে। এই মনস্তত্ত্ব মাওলানা মওদূদীর নিজের হাতে গড়া।
এর অর্থ এই না যে জামাতি অনুসারীরা জন আকাঙ্ক্ষাকে ভুল বলার এখতিয়ার রাখে না। অবশ্যই রাখে। কিন্তু যেসব যুক্তিতে জামাত জন আকাঙ্ক্ষাকে ভুল বলছে তার প্রত্যেকটা দোষ জন আকাঙ্ক্ষা জামাতের কাছ থেকেই পেয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে জন আকাঙ্ক্ষা আর জামাত সহোদর নয়, বরং অভিন্ন জিনিস। যেটা জামাত, সেটাই জন আকাঙ্ক্ষা। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশ নিয়ে মাওলানা মওদূদী জামাত থেকে জন আকাঙ্ক্ষা হয়ে যান নাই। উনি সবসময়ই জামাত ছিলেন। সেকুলারিজম গ্রহণ করেও জন আকাঙ্ক্ষা অ-জামাত হয়ে যায় নাই। বরঞ্চ জামাতি মনস্তত্ত্বের প্রভাবেই জন আকাঙ্ক্ষা সেকুলারিজমকে আলিঙ্গন করেছে।
এমনকি মুখে সেকুলারিজমকে স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া বাস্তবে মতাদর্শিক জামাত আর জন আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিন্দুমাত্র তফাতও নাই। আমরা যদি তালাল আসাদ ও হাল্লাকের তত্ত্ব ঠিকভাবে বুঝে থাকি, তাহলে দেখা যাচ্ছে বাস্তবে জামাতও সেকুলার রাজনীতিই করে আসছে এবং এখনও করছে। জামাত যদি জন আকাঙ্ক্ষাকে খারিজ করতে চায়, তাহলে জামাতকে প্রথমে মাওলানা মওদূদী ও বিশ্ব ইসলামপন্থার মূলধারা থেকে বের হয়ে এসে নতুন কিছু উপহার দিতে হবে। নচেত জন আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ে জামাতি শেকায়েত রাজনৈতিক কৌশল ও রেটরিকবাজির চেয়ে বেশী কিছু না। ঠিক যেভাবে জন আকাঙ্ক্ষা যখন বলে তার কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ নাই, সেই দাবীরও কোন তাত্ত্বিক ভিত্তি নাই।
বেল ল্যাবের সাবেক এসিস্ট্যান্ট জাফর ইকবাল যখন বলেন উনি রাজনীতি বোঝেন না, তখন আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ওনার চেয়ে ঝানু রাজনীতিবোদ্ধা আর কেউ নাই। জন আকাঙ্ক্ষার আপাতঃ নিউট্রাল মতাদর্শবিহীন রাজনীতির মূলে আছে ইসলামকে তার লেবাস থেকে পৃথক করে শুধুমাত্র এসেন্স-কে (essence) ইসলামের নাম-গন্ধহীন ‘সেকুলার’ প্রজেক্টের মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার চিরাচরিত ইসলামপন্থী রাজনীতি। যেই রাজনীতি ইউরেশিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ইসলামপন্থী দলগুলি নানান সময়ে করে আসছে।
মিশরে ব্রাদারহুড নতুন দল খুলে এই রাজনীতি করেছে, তিউনিশিয়ার ব্রাদারহুড আস্তই এই রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে, তুরস্কে সুলতান এরদোয়ান সমমনাদের নিয়ে এই রাজনীতি শুরু করেছেন, ভারতেও জামাত মিশরের অনুকরণে এই রাজনীতি করছে, মালয়েশিয়াতে আনোয়ার ইব্রাহীমও এই একই রাজনীতি করেন। এই পর্যায়টাকে মাওলানা মওদূদীর মনস্তত্ত্বের বিবর্তনের সর্বশেষ রুপ হিসাবে দেখতে পারি। মডারেশনের এক পর্যায়ে একটা একটা করে ছাড় দিতে দিতে যখন ইসলামপন্থীরা বুঝতে পারে যে আসলে তারা যতই policy concession করুক না কেন, সেকুলাররা কখনোই ইসলামের নাম-গন্ধওয়ালা কোন কিছুকে মেনে নিবে না তখন তারা ইসলামের নাম-গন্ধটুকুও মুছে ফেলে।
রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে অনেকসময় একই সাথে দুইটা ফ্রন্টই খোলা রাখা হলেও তাতে আদর্শিক বিবর্তনের ধারাটা স্পষ্টই বোঝা যায়। হাসানুল বান্না বা মাওলানা মওদূদী তো প্র্যাগমাটিজমের স্বার্থে দুইটা ফ্রন্ট চালু করেন নাই। তাহলে এখন কেন করতে হচ্ছে? করতে হচ্ছে কারণ ওনারা ভেবেছিলেন সামান্য কিছু ছাড় দিলেই হয়ত সেকুলার কাঠামোতে রাজনীতি করা সম্ভব হবে। কিন্তু ছাড় দিতে দিতে যখন নাম ছাড়া আর ইসলামের কিছুই বিসর্জন দেওয়ার থাকে না, তখন ঐ নামটুকুও কেটে ফেলে লেবেলবিহীন essence-কে ধারণ করার প্রতি মনযোগী হতে হয় ইসলামপন্থীদের। লেবেলবিহীন essence আর লেবেলসহ essence দুইটাই ইসলামপন্থা। লেবেল ছাড়া যেটা সেটা সর্বশেষ মডেলের। অনেকে একে post-Islamism হিসাবে সাব্যস্ত করেন।
তবে যেটাই হোক, এই চিন্তা-চেতনা যে বিংশ শতকে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রবক্তা মাওলানা মওদূদীর চির জাগরুক লেখনী থেকেই উৎসারিত, তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। তত্ত্বীয় ঐতিহ্য তথা discursive tradition এর দিক থেকে জন আকাঙ্ক্ষা ইসলামপন্থার ওপরই নির্ভরশীল। এর মধ্যে যেটুকু লিবারেল বিষয়াদী ও এজেন্ডা আছে, সেটাও স্রেফ একারণেই যে ইসলামপন্থা ঐতিহাসিকভাবে লিবারেল ছিল ও হওয়ার জন্য চেষ্টা করে গেছে। কমিউনিজম ও লিবারেল ক্যাপিটালিজমের দ্বন্দ্বে ইসলামপন্থা লিবারেল ক্যাপিটালিজমের পক্ষে অবস্থান নেয় (Nasr, 1994)। এরপরে ইসলামপন্থার যে ইতিহাস তা ক্রম-মডারেশনেরই ইতিহাস।
জন আকাঙ্ক্ষাকে মডারেট বলার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা হচ্ছে, জামাতের সর্বদা চলমান মডারেশন এবং মজ্জাগত মডার্নিজমকে বৈধতা দেওয়া। সম্প্রতি ফেসবুকে বিভিন্ন বেনামী সূত্রে মডার্নিজম ও জন আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কিছু pseudo-academic লেখা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কৌশলে জামাতের মডার্নিস্ট প্রবণতাকে চেপে যাওয়া হচ্ছে। ওস্তাদ আঞ্জুম তাঁর লেখায় জামাতকে আধুনিকতা ও লিবারেল ক্যাপিটালিজমের সঙ্কট না বোঝার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। জামাতকে বলেছেন ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কবিহীন। কিন্তু এই বেনামী গোষ্ঠী আমাদের বোঝাতে চাচ্ছে যে, এইসমস্ত অভিযোগ আঞ্জুম এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরা জন আকাঙ্ক্ষার প্রতি করেছেন, জামাত ধোয়া তুলসিপাতা।
অথচ বাস্তবে আধুনিকতা থেকে শুরু করে সেকুলারিজমের সঙ্কট না বোঝার যে অভিযোগ বুদ্ধিজীবিদের, সেটা জামাত-ব্রাদারহুড তথা ইসলামপন্থার বিরুদ্ধেই। জন আকাঙ্ক্ষাতে এই সঙ্কট এসেছেও জন আকাঙ্ক্ষার মাওলানা মওদূদীবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে। এটা চেপে যাওয়া মারাত্মক একটা বিকৃতি, যার রাজনৈতিক ফলাফল ভয়াবহ। আজকে জামাত যদি নিজেদের ঐতিহ্যবাদী দাবী করে, তাহলে কালকে জন আকাঙ্ক্ষাও নিজেদের ঐতিহ্যবাদী দাবী করবে। এভাবে জামাত বনাম জন আকাঙ্ক্ষা দ্বন্দ্বে প্রকৃত ঐতিহ্যবাদ হারিয়ে যাবে। অধ্যাপক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, “The smart way to keep people passive and obedient is to strictly limit the spectrum of acceptable opinion, but allow very lively debate within that spectrum’।
জন আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে জামাতি ন্যারেটিভের ফলে ডিবেটের স্পেক্ট্রাম জামাত আর জন আকাঙ্ক্ষায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই বাহাসে দেওবন্দী আলেম-ওলামারা যারা প্রকৃত ঐতিহ্যবাদী তারা অনুপস্থিত। অবস্থা হয়েছে এমন যে আমাদেরকে বেঁছে নিতে হচ্ছে অর্ধনগ্নতা ও নগ্নতার মধ্যে। শালীনতা নামক কোন অপশনই নাই।
অথবা উল্টাভাবে বলতে গেলে বিরানী আর পোলাও এর মধ্যে আমাদেরকে বেঁছে নিতে হচ্ছে। ডাল-ভাতের কোন অপশনই নাই। উম্মিদ রাখি এই লেখার মাধ্যমে ইতিহাসকে নিজের খায়েশমত পালটে দেওয়ার কোশেশ কিছুটা হলেও রুদ্ধ হবে। ঐতিহাসিক সত্যতা রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশে আধুনিকতাবাদ ও ঐতিহ্যবাদের ব্যাপারে জনপরিসরে যে ধারণা সেটা অধিকতর কলুষিত হওয়া বন্ধ হবে।
তথ্যসূত্র
Ahmad, I. (2013). Islam and politics in south asia. In Esposito and Emad El-Din Shahin (Eds.) The Oxford Handbook of Islam and Politics. New York: Oxford University Press
Anjum, O. (2016). Do Islamists have an intellectual deficit? In S. Hamid & W. McCants (Eds.), Rethinking Political Islam. New York: Oxford University Press.
Asad, T. (2013). Free Speech, Blasphemy, and Secular Criticism. In T. Asad, W. Brown, J. Butler, S. Mahmood (Eds.), Is critique seclar? Blasphemy, injury, and free speech. New York: Fordham University Press.
Bowen, J. (2012). A New Anthropology of Islam. New York: Cambridge University Press.
Daily Manabjamin. (2019). Rajnitite Notun Moncher Attoprokash [A new platform in politics reveals itself]. April 28.
Hallaq, W. (2013). The impossible state: islam, politics, and modernity’s moral predicament. New York: Columbia University press.
Hamid, S. (2016) Islamic exceptionalism: how the struggle over islam is reshaping the world. New York: St. Martin’s Press.
Hartung, J. (2013). A System of Life: Mawdūdī and the Ideologisation of Islam. London: Hurst & Co.
Hashmi, T. (2014b). Muslim Brotherhood, Jamaat-e-Islami and global jihad. The Daily Star. Available on https://www.thedailystar.net/muslim-brotherhood-jamaat-e-islami-and-global-jihad-34891 [Consulted on April 14, 2020]
Hashmi, T. (2014b). Muslim Brotherhood, Jamaat-e-Islami and global jihad. The Daily Star. Available on https://www.thedailystar.net/muslim-brotherhood-jamaat-e-islami-and-global-jihad-34991 [Consulted on April 14, 2020]
Lerman, E. (1981). Mawdudi’s Concept of Islam. Middle Eastern Studies, 17(4), 492-509. https://www.jstor.org/stable/4282856 [Consulted on April 14, 2020].
Mahmood, S. (2013). Religious Reason and Secular Affect: An Incommensurable Divide? In T. Asad, W. Brown, J. Butler, S. Mahmood (Eds.), Is critique seclar? Blasphemy, injury, and free speech. New York: Fordham University Press.
Mortimer, E. (1982). Faith and Power: the Politics of Islam. Vintage Books.
Nasr, S. (1994). The vanguard of the Islamic revolution: The Jama’at-Islami of Pakistan. Los Angeles: University of California Press.
Nasr, S. (1996). Maududi and the Making of Islamic Revivalism. New York: Oxford University Press.
Nasr, S. (2006). “Maududi and the Jama`at-e Islami.” In Ali Rehnema (Ed.), Pioneers of Islamic Revival. Updated edition. London: Zed Books.
Nirjhor, N. (2014). Turki public space islam kibhabe fire asche? [How Islam is coming back to Turkish public space]. Centre for Social and Cultural Studies. Available on https://cscsbd.com/930 [Consulted on April 14, 2020]
Parvez, S. (2019). “The Khilafah’s Soldiers in Bengal”: Analysing the Islamic State Jihadists and Their Violence Justification Narratives in Bangladesh. Perspectives on Terrorism, 13(5), 22–38. doi: 10.2307/26798576
Uddin, M. (2016). Jongi o jongibad domone jamate islami otiteo bhumika palon koreche ekhono korche [Jamaat-e-Islami contributed to the fight against terror and terrorism in the past and is stilll contributing now]. Daily Sangram. August 6.
Ushama, T. & Osmani, N. Sayyid Mawdudi’s Contribution towards Islamic Revivalism. IIUC Studies, 93-104. https://ift.tt/2VohtGx
Zabala, S. (2005). “A Religion Without Theists or Atheists.” In S. Zabala (Ed.), The Future of Religion. New York: Columbia University Press.
The post জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ও মাওলানা মওদূদীর চিন্তার সিলসিলা appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%93-2/
No comments:
Post a Comment