Sunday, April 19, 2020

জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ও মাওলানা মওদূদীর চিন্তার সিলসিলা

মোঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

ভূমিকা :

ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক-মতাদর্শিক তর্কের সাথে পয়লা মোলাকাত। গণতন্ত্র, ইসলাম, আধুনিকতা, সেকুলারিজম ওরফে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, যুক্তি বনাম ওহী, মডারেট-র‍্যাডিকাল ইত্যাদি নানান শব্দের সাথে পরিচয়। টার্মিনোলজি না বলে শব্দ কথাটা এস্তেমাল করলাম এইজন্য যে ঐসময় এই সমস্ত শব্দ মূলত পলিটিকাল রেটরিক হিসাবে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছিল। এইগুলার কোন সুগঠিত সংজ্ঞা ছিল না। সিয়াসী সুবিধার স্বার্থে যখন যেটা সুবিধা সেটা ব্যবহার করা হত। আজকে এসে এই রেটরিকের ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে অনুধাবন করছি। সমাজে রেটরিকের ব্যবহার ধীরে ধীরে কিভাবে পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে সেটার চিন্তা থেকেই আজকের লেখা।

ছোট বেলায় আমি হেফ্জখানায় পড়তাম। শারীরিক নির্যাতনের কারণে হেফ্‌জখানা থেকে আমাকে নিয়ে আসার পর হেফ্জ থেমে গেলেও বাসায় হুজুরের সাহচর্যে আমার কোরান শিক্ষা ও ধীর গতিতে মুখস্থ চলতে থাকে। আমার হুজুর ছিলেন চরমোনাই পীরের অনুসারী। উনি সবসময় জামাত-শিবিরকে বলতেন মডারেট, আপোষকামী। নারী নেতৃত্ব, দাড়ি না রাখা, শার্ট-প্যান্ট পরিধান করা এইগুলাতে ছিল ওনার ওজর-আপত্তি। স্কুলে আমার এক ব্যাচ সিনিয়র এক ভাই ছিলেন যিনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করেন। উনি হিযবুত তাহরিরের সমর্থক ছিলেন বলে কানাঘুষা ছিল। উনি জামাতকে মডারেট ও আপোষকামী বলতেন কারণ জামাত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে মেনে নিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব কার? আল্লাহ্‌র না জনগনের? এইটা ছিল ওনার ও ওনার সমমনা অন্যান্যদের আপত্তি।

কৈশোরের প্রথম দিকে মডারেট বলতে প্রথম আলোর আন্তর্জাতিক পাতায় দেখতাম মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে বোঝানো হচ্ছে। এরপর যখন ইংরেজিতে টুকটাক খবরাবর পড়তে শিখলাম তখন দেখলাম মধ্যপ্রাচ্যের ব্রাদারহুড আর উপমহাদেশের জামাত হচ্ছে ‘মডারেট মুসলিম’ বা ‘মডারেট ইসলামিস্ট’ (Hashmi, 2014a, 2014b)। অন্যদিকে, আজকে আমরা যাদেরকে ঐতিহ্যবাদী হিসাবে চিনি সেই কওমী-দেওবন্দীরা হচ্ছে র‍্যাডিকাল ইসলামিস্ট। মধ্যপ্রাচ্যে এই র‍্যাডিকালরা হচ্ছে সালাফি। ২০১৩ সালের সঙ্কটময় মুহুর্তে যখন বিবেকের তাগিদে সিয়াসী প্রক্রিয়ায় কথিত ‘মডারেট ইসলামিস্ট’দের সমর্থন দেওয়ার দাওয়াত জানাই without any ifs and buts তখন হিযবুত তাহরিরসহ অনেক ইসলামপন্থী গোষ্ঠী আমি ও আমার মত অন্যান্যদের Rand কর্পোরেশনের দালাল, মডারেট ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী মুহুর্তে সত্যের পক্ষালম্বন থেকে বিরত থাকেন।

মধ্যপ্রাচ্যে দায়েশের উত্থানের পর দায়েশ ব্রাদারহুড ও জামাতকে সরাসরি কাফেরদের সহযোগী আখ্যা দিয়ে কতল করার হুকুম জারি করে (Parvez, 2019)। গণতন্ত্রপন্থী মুরতাদ ব্রাদারহুড-জামাতের বিরুদ্ধে দায়েশের ‘জেহাদ’ চলতে থাকে। অন্যদিকে জামাত প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে সন্ত্রাসবিরোধী অনন্ত যুদ্ধে (war on terror)-এ নিজেদের আমেরিকার সহযোগী হিসাবে দাবী করে। ব্রাদারহুড-জামাত উভয়ের বক্তব্য ছিল ইসলামপন্থাকে গণতান্ত্রিক উপায়ে হাজির হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়ে সেকুলার-লিবারেলরা ‘জঙ্গিবাদ’কে উস্‌কে দিচ্ছে। ব্রাদারহুড বারবার পশ্চিমকে মনে করিয়ে দেয় যে সাইয়েদ কুতুবের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের ‘বিরোচিত’ ভূমিকার কথা (Hashmi, 2014a, 2014b)। আমার এখনও মনে পড়ে বাংলাদেশে দায়েশের বাড়বাড়ন্তের মুহুর্তে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে জামাত নেতা সেলিম উদ্দিন খুব ফখরের সাথে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জামাতের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছিলেন (Uddin, 2016)।

আমার কৈশোরের পুরাটা সময় জনপরিসরে র‍্যাডিকাল-মডারেট বিভাজনের এক পাশে দেখে এসেছি ঐতিহ্যবাদী ও ‘জিহাদী’ দলগুলিকে এবং অন্য পাশে ব্রাদারহুড-জামাত জাতীয় দলগুলিকে। ২০১৯ সালে জামাত থেকে বের হয়ে এক দল লোক জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নামক নতুন একটা উদ্যোগ গ্রহণের পর আমার এতদিনের বোঝাপড়া নবায়নের জরুরত দেখা দেয়। জনপরিসরে মডারেট বলতে জন আকাঙ্ক্ষাকে হাজির করা হয় আর জামাতের অনেকেই খুব গর্বভরে নিজেদের ঐতিহ্যবাদী হিসাবে দেখাতে থাকেন। এতদিন যেই জামাতকে চিনে এসেছি মডারেট হিসাবে, যেই জামাত গর্বের সাথে নিজেদের পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপিয়ে নিজেদের মডারেট হিসাবে এলান করেছে তারাই হুট করে হয়ে গেল ঐতিহ্যবাদী। ঐদিকে আপোষকামী, মডারেট, পশ্চিমের পদলেহী, হীনমন্য – বিভিন্ন জামাতি অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হচ্ছে জন আকাঙ্ক্ষা।

সম্প্রতি এধরণের প্রচুর লেখাজোঁকা দিয়ে ফেসবুক সয়লাব হয়েছে যা সচেতন পাঠকমহলের নজরে এসেছে বলেই আমি অনুমান করে নিচ্ছি। জামাতি আক্রমণে জন আকাঙ্ক্ষার দিশেহারা অবস্থা নিয়ে আমার অতটা চিন্তা নাই। বরঞ্চ পাবলিক স্ফিয়ারে র‍্যাডিকাল/ট্র্যাডিশনালিস্ট-মডারেট/মডার্নিস্ট এর যে সংজ্ঞা সেটার এভাবে পরিবর্তন আমাকে শঙ্কিত করে অনেকগুলি কারণে।

প্রথমত, এইভাবে যদি র‍্যাডিকাল/ট্র্যাডিশনালিস্ট সম্পর্কে আম আদমীর যে কনসেপশন তা যদি শিফ্‌ট হতে থাকে তাহলে একদিন দেখা যাবে জন আকাঙ্ক্ষা নিজেদের র‍্যাডিকাল-ট্র্যাডিশনালিস্ট বলবে আর জন আকাঙ্ক্ষা থেকে আরও ‘প্রগতিশীল’ যে দলটা বের হবে তাদেরকে বলা হবে মডারেট। আজকে যেটা মডারেট কালকে সেটা র‍্যাডিকাল। কালকের মডারেট পরশুর র‍্যাডিকাল। পশ্চিমের পুরো দাসত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এভাবেই মডারেট-র‍্যাডিকাল বিভাজন এগুতে থাকবে এবং ধীরে ধীরে সমাজ পশ্চিমায়িত হতে থাকবে।

একটা সময় ছিল মেয়েদেরকে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে না পাঠানোকে বলা হত মৌলবাদ। আমাদের মায়েদের সময় বোরখা পরে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে যাওয়াকে ঠাওরানো হয়েছে মৌলবাদ। আজকে নেটিভ ইনফরম্যান্টরা হিজাব পরিহিতা শিক্ষার্থীর পার্সেন্টেজ দিয়ে বাংলাদেশে মৌলবাদের প্রভাব মাপছেন। সামনে হয়ত মেয়েদেরকে কাপড় পরতে বলাকেই মৌলবাদী আচরণ মনে করা হবে। কিংবা মেয়েকে মেয়ে বলাটাও মৌলবাদী আচরণ সাব্যস্ত করা হবে। এলজিবিটিকিউ+ আন্দোলনের এই যুগে ইতোমধ্যেই সেই কোশেশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কাজেই, র‍্যাডিকাল-মডারেট বা ঐতিহ্যবাদী-আধুনিকতাবাদীর যে বিভাজন তা আমাদের স্পষ্ট করে জানা-বোঝা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, এখানে একটা ঐতিহাসিক সত্যতার দায়ও আছে। জামাত-শিবিরের ডেরায় ডেরায় ‘ইংরেজী শিক্ষাকে হারাম ফতোয়া দেওয়া মূর্খ মোল্লা-মৌলভীদের হাত থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের হেফাজত করার পবিত্র মিশন’-এর সবক দিয়ে রিক্রুটমেন্ট চলে। ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি যে জামাতি অবজ্ঞা ও অবহেলা তারই ‘বর্ধিত রুপ’ আজকের জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে যেই ইসলামপন্থা আধুনিক রাজনীতিবিদ তৈরী করেছে ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের আমীর বানিয়েছে তারা কিভাবে জন আকাঙ্ক্ষাকে মডার্নিস্ট বা মডারেট বলে? এটা তো এম্পিরিকালি ভ্যারিফায়েবল যে মিশরের মুরসি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের শফিকুর – যুগে যুগে ইসলামপন্থার প্রায় সব নেতা আধুনিক কাঠামো এবং অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞানে শিক্ষিত।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চারজন জামাতের আমীর হয়েছেন : অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা নিজামী, মকবুল আহমাদ এবং ডাক্তার শফিকুর। এঁনাদের প্রত্যেকেরই উচ্চ শিক্ষা পশ্চিমা শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে হয়েছে (শুধুমাত্র মাওলানা নিজামী ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল ডিগ্রী নেন)। জন আকাঙ্ক্ষার জন্ম যার বা যাদের ঔরসে তারা আজ পিতৃত্বের দায় নিবেন না সেটা কিভাবে হয়? এই দুই কনসার্ন থেকেই আমার আজকে লেখতে বসা।

জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ-এর উত্থানের মূল অবদান যে মাওলানা মওদূদীর তা আমরা দুইভাবে প্রমাণ করতে পারি। প্রথমত, সরাসরি মাওলানা মওদূদীর লেখা, কথা, ও মেথডলজি কিভাবে জন আকাঙ্ক্ষার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে সেটা নিয়ে আলোচনা করে। দ্বিতীয়ত, যদি আমরা ধরি যে বাংলাদেশী জামাতসহ বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন তথা ইসলামপন্থার গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক গুরু হচ্ছেন মাওলানা মওদূদী তাহলে ইসলামপন্থার সঙ্কটের ভেতর দিয়ে কিভাবে বিশ্বে জন আকাঙ্ক্ষা অনুরুপ চিন্তার জন্ম হয় সেটা বোঝার মাধ্যমেও আমরা জন আকাঙ্ক্ষায় মাওলানা মওদূদীর অবদান বুঝতে পারব। আমি দুইভাবেই দেখানোর চেষ্টা করব যে মাওলানা মওদূদীর কালোত্তীর্ণ চিন্তাধারারই বর্তমান রুপ জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ।

মাওলানা মওদূদী ও জামাত যে ‘আধুনিকতার প্রোডাক্ট’ এবং আধুনিকতার চৌহদ্দির মধ্যেই তাদের কার্যক্রম, সেটা প্রথমে স্পষ্ট করার পর আমি দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখাবো জন আকাঙ্ক্ষা কিভাবে মাওলানা মওদূদীর এই চিন্তাগুলি কিছু সরাসরি মাওলানার কাছ থেকে ও কিছু জামাতের হাত ঘুরে পেয়েছে। এতে করে জন আকাঙ্ক্ষার পিতৃপরিচয়ের সঙ্কটও যেমন দূর হবে, তেমনি জন আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে যা কিছু কল্যাণকর তার সওয়াব মাওলানা ও জামাত নেতৃবৃন্দের খাতায় সদকায়ে জারিয়া হিসাবে যোগ হবে ইন শা আল্লাহ।

আধুনিকতা ও ইসলামপন্থার প্রাণপুরুষ মাওলানা মওদূদী ও জামাতে ইসলামী

ইসলামী আন্দোলন বা ইসলামপন্থা শুনলে আমাদের সর্বাগ্রে যার কথা মনে হওয়া উচিত তিনি হচ্ছেন মাওলানা মওদূদী। ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করা এই মহান তাত্ত্বিকই ইসলামপন্থা বলতে আমরা যা বুঝি সেটার কারিগর। ওনার তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই ভারতীয় উপমহাদেশের জামাতে ইসলামী এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুড চালিত। ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্না ছিলেন কর্মীমননের মানুষ। উনি কথা কম কাজ বেশী নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। একারণে ব্রাদারহুডের তাত্ত্বিক ভিত্তির জায়গায় যে দূর্বলতা ছিল তা দূর করেন মাওলানা মওদূদী। পরবর্তীতে শহীদ সাইয়েদ কুতুব মাওলানা মওদূদীর জায়গায় ভাগ বসানোর চেষ্টা করলেও মূলধারার ইসলামপন্থা বলতে যা বোঝায় তা মূলত মাওলানা মওদূদীরই ব্রেইনচাইল্ড (Anzum, 2016)। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে উগ্রবাদের অভিযোগে সাইয়েদ কুতুবকে ব্রাদারহুড ত্যাজ্য ঘোষণা করে। অতএব, এটা বলাই যায় যে তাত্ত্বিক পীর হিসাবে ইসলামপন্থায় মাওলানা মওদূদী আহাদ ও লা-শরিক।

তো কী ও কেমন ছিল মাওলানার তত্ত্ব? মাওলানার সবচেয়ে নিকৃষ্ট শত্রুও মাওলানাকে ঐতিহ্যবাদী বা ট্র্যাডিশনালিস্ট গালি দেবে না। মাওলানা মওদূদী ও জামাত গবেষক করে আল্লামা সাইয়েদ ওয়ালী রেজা নসর এ প্রসঙ্গে বলেনঃ “ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর [মাওলানার] ব্যাখ্যা শুরু হয় ট্রাডিশনাল ইসলাম এবং এর শতাব্দী প্রাচীন প্রতিষ্ঠানসমূহকে পরিত্যাজ্য ঘোষণার মাধ্যমে। তিনি [মাওলানা] দাবী করেন যে ইসলাম কোনভাবেই দ্বীন বা সভ্যতা হিসাবে সফল হতে পারবে না যদি না মুসলমানরা তমুদ্দুন এবং ঐতিহ্যের জিঞ্জির ছিঁড়ে নবীজির সহি ধর্মকে পুনর্গঠিত করে ক্ষমতা লাভ না করে। দ্বীন বা সভ্যতা হিসাবে সফল হওয়াকেই তিনি ইসলামের মনযিল এবং নাজেল হওয়ার কারণ হিসাবে দেখান। সিয়াসাতকে [মাওলানা] ইসলামী বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঘোষণা করেন। এবং মুসলমানদের সিয়াসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গঠিতব্য ‘ইসলামী রাষ্ট্র’কে [মাওলানা] মুসলমানদের যেসমস্ত মুশকিলের সামনা করতে হচ্ছে তার আসান হিসাবে দেখেন” (Nasr, 1987, p. 7)।

মাওলানা ইসলামকে ধর্ম থেকে আইডিয়োলজিতে রুপান্তরিত করেন। ইসলাম থেকে শুরু হয় ইসলামপন্থা বা Islamism। এ প্রসঙ্গে আল্লামা নসর বলেন, “মওদূদীর হাতে ইসলামের আইডিয়োলজিতে রুপান্তরিত হওয়া সম্পূর্ণ হয়” (Nasr, 1987, p. 7)। মাওলানার তত্ত্ব কোনভাবেই ট্র্যাডিশনাল ইসলামের উপর ভিত্তি করে ছিল না। তিনি আধুনিক আইডিয়া, ভ্যালুজ, মেকানিজম, পন্থা ইত্যাদিকে গ্রহণ করেন এবং ইসলামের মধ্যে সেগুলিকে গাঁথেন। তিনি ইসলামের ট্র্যাডিশনাল কনসেপ্টসমূহকে মডার্নাইজ করতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, পশ্চিমের সাথে বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে মাওলানার বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। অনেকেই এটাকে ইসলামপন্থার প্রতিক্রিয়াশীল স্বভাব হিসাবে চিহ্নিত করেন। ‘বিপ্লব,’ ‘ভ্যানগার্ড,’ ‘আদর্শ,’ ‘গণতান্ত্রিক খেলাফত,’ ‘ধর্মীয় গণতন্ত্র’ ইত্যাদি বিভিন্ন টার্মের মাধ্যমে মাওলানা মওদুদীর আধুনিক মননের পরিচয় পাওয়া যায় (Nasr, 1987)।

ওস্তাদ ওয়াইমির আঞ্জুমও জামাত-ব্রাদারহুড ঘরানার ইসলামপন্থীদের আধুনিকতাবাদীতা-র (modernism) সমালোচনা করে বলেন যে ঐতিহাসিক ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে এই ইসলামপন্থীদের সম্পর্ক খুবই পলকা। এরা সিলেক্টিভলি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইসলামী ট্রাডিশন থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করে। কিন্তু ঐতিহ্য দ্বারা নিজেরা পরিবর্তীত হওয়ার বদলে জামাতিরা ঐতিহ্যকে রিফর্ম ও ট্রান্সফর্ম করে ফেলে (Anzum, 2016, p. 306)।

আমাদের একটু স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার মডার্নিটি বা আধুনিকতা বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি। আমি এখানে মোটাদাগে আধুনিকতা বলতে ঐ জীবনদর্শনকে বোঝাচ্ছি যার মূলে আছে রাষ্ট্র এবং প্রত্যেকটা কাজের পেছনে যুক্তি (reason) খোঁজার প্রবণতা। আধুনিকতার এই সংজ্ঞা দিয়ে দেখলে মাওলানা মওদূদী ও জামাত পুরোদস্তুর আধুনিক। মাওলানা মওদূদী ও জামাত যে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ কায়েম করতে চান সেটাও একটা আধুনিক ধারণা। এই ধারণার সমস্যা নিয়ে ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর বইয়ে বিস্তারিত লিখেছেন (Hallaq, 2013)। আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই ইসলামী রাষ্ট্র তৈরীর যে স্বপ্ন মাওলানা মওদূদী ও বিশ্বব্যাপী জামাতিরা লালন করে তার সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে হাল্লাক বলেন যে, আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র কোন নিরপেক্ষ বিষয় না যে চাইলেই এটাকে ইসলামী বানানো যাবে; বরং আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনগতভাবেই অনৈসলামিক। আধুনিক বিজ্ঞানের ওপরও মাওলানার অগাধ আস্থা ছিল। তিনি মনে করতেন আধুনিক বিজ্ঞান একটা নিউট্রাল বিষয় যেটা ইসলামী বা পশ্চিমা যেকোনটাই হতে পারে (Nasr, 1996)।

এমনকি মাওলানার লেখার মধ্যে বিজ্ঞান দ্বারা ইসলামকে সত্যায়নের বিজ্ঞানবাদী মনোভাবও দেখা যায় (Lerman, 1981)। Hartung (2013) তাঁর বইয়ে দেখান যে মাওলানা মওদূদী মডার্নিটির চোখ (prism of modernity) দিয়ে দুনিয়াকে দেখতেন। শুধু তাই নয়, ইসলামের বিভিন্ন বিষয় তিনি ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’র মাধ্যমে প্রমাণ করতেন। ইসলামকে একটা system আকারে দেখানোর মধ্যেও মাওলানার ওপর বিজ্ঞানের প্রভাব লক্ষ করা যায় (Bowen, 2012)। ইসলামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাদী প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে আলেম-ওলামার প্রতি মাওলানার ক্ষোভও ছিল লক্ষণীয়। আলেম-ওলামারা আধুনিক বিষয়াদি সম্পর্কে অজ্ঞ; একারণে মাওলানা তাদের তিরষ্কার করেছেন। এমনকি উম্মতের অভিভাবক এবং হাকিম হিসাবে ওলামাগনের যে ট্রাডিশনাল ভূমিকা তাকেও মাওলানা অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন (Nasr, 1996)। মাওলানা মনে করতেন আম আদমী একসময় নিজেই কোরান-হাদীস বুঝে পড়তে শিখবে এবং তখন আর আলেম-ওলামাদের কোন দরকারই হবে না। ফিক্‌হের জগতে ওলামাগনের যে বিশাল অবদান মাওলানা সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে কোরান-সুন্নাহ ও খেলাফায়ে রাশেদার যুগের আলোকে নতুন করে ইসলামকে সাজানোর কথা বলেছেন (Mortimer, 1982)।

ইসলামপন্থার সবচেয়ে বড় আবেদনই হচ্ছে ইসলামপন্থা ওয়াদা করে যে এটা আধুনিক যুগের সঙ্কট মোকাবিলায় উম্মতকে পথ দেখাবে। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া (IIUM) এর দুইজন মাওলানার গুনমুগ্ধ গবেষক মাওলানা মওদূদীর অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে স্পষ্টাক্ষরে লেখেন যে আধুনিক মানুষের মুশকিলের হাল খুঁজে বের করতে হলে মাওলানার দ্বারস্থ হয়ে প্রয়োজন। ইসলামকে আধুনিকতার আলোকে নতুন করে বোঝার যে তাড়না মাওলানার ছিল তাও গবেষকদ্বয় উল্লেখ করেন (Ushama & Usmani, 2006)।

এতদসত্ত্বেও যারা মাওলানা মওদূদী ও জামাতের ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রজেক্টকে ঐতিহ্যবাদী মনে করেন তাদের হয় বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা ও পড়াশোনার অভাব রয়েছে, নয়তো তারা স্বেচ্ছায় ও জ্ঞাতসারে জামাতকে ট্রাডিশনালিস্ট সাব্যস্ত করে ধীরে ধীরে জনপরিসরে ট্র্যাডিশনালিস্ট-মডার্নিস্ট ন্যারেটিভ তা পশ্চিমের পক্ষে শিফ্‌ট করতে চাচ্ছেন। আজকে জামাত ট্র্যাডিশনালিস্ট, কালকে জন আকাঙ্ক্ষা ট্র্যাডিশনালিস্ট। এভাবে একদিন হয়ত বারাক ওবামার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হবে ট্র্যাডিশনালিস্ট। তার পরের দিন হয়ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা হবে ট্র্যাডিশনালিস্ট। মাওলানা এবং জামাত-ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলিকে আধুনিকতা-বিরোধী, ঐতিহ্যবাদী বলাটা একদিকে যেমন মিথ্যাচার, তেমনি অপরদিকে আধুনিকতার ইসলামায়নের জেহাদে নিজের সমগ্র মেধা ও শ্রম কোরবান করা এক মহান জ্ঞানসাধকের প্রতিও মারাত্মক অন্যায়।

( চলবে ) 

তথ্যসূত্র

Ahmad, I. (2013). Islam and politics in south asia. In Esposito and Emad El-Din Shahin (Eds.) The Oxford Handbook of Islam and Politics. New York: Oxford University Press 

Anjum, O. (2016). Do Islamists have an intellectual deficit? In S. Hamid & W. McCants (Eds.), Rethinking Political Islam. New York: Oxford University Press.

Asad, T. (2013). Free Speech, Blasphemy, and Secular Criticism. In T. Asad, W. Brown, J. Butler, S. Mahmood (Eds.), Is critique secular? Blasphemy, injury, and free speech. New York: Fordham University Press.

Bowen, J. (2012). A New Anthropology of Islam. New York: Cambridge University Press.

Daily Manabjamin. (2019). Rajnitite Notun Moncher Attoprokash [A new platform in politics reveals itself]. April 28.

Hallaq, W. (2013). The impossible state: Islam, politics, and modernity’s moral predicament. New York: Columbia University press.

Hamid, S. (2016) Islamic exceptionalism: how the struggle over Islam is reshaping the world. New York: St. Martin’s Press.

Hartung, J. (2013). A System of Life: Mawdūdī and the Ideologisation of Islam. London: Hurst & Co.

Hashmi, T. (2014b). Muslim Brotherhood, Jamaat-e-Islami and global jihad. The Daily Star. Available on https://www.thedailystar.net/muslim-brotherhood-jamaat-e-islami-and-global-jihad-34891 [Consulted on April 14, 2020]

Hashmi, T. (2014b). Muslim Brotherhood, Jamaat-e-Islami and global jihad. The Daily Star. Available on https://www.thedailystar.net/muslim-brotherhood-jamaat-e-islami-and-global-jihad-34991 [Consulted on April 14, 2020]

Lerman, E. (1981). Mawdudi’s Concept of Islam. Middle Eastern Studies, 17(4), 492-509. https://www.jstor.org/stable/4282856 [Consulted on April 14, 2020].

Mahmood, S. (2013). Religious Reason and Secular Affect: An Incommensurable Divide? In T. Asad, W. Brown, J. Butler, S. Mahmood (Eds.), Is critique seclar? Blasphemy, injury, and free speech. New York: Fordham University Press.

Mortimer, E. (1982). Faith and Power: the Politics of Islam. Vintage Books.

Nasr, S. (1994). The vanguard of the Islamic revolution: The Jama’at-Islami of Pakistan. Los Angeles: University of California Press.

Nasr, S. (1996). Maududi and the Making of Islamic Revivalism. New York: Oxford University Press.

Nasr, S. (2006). “Maududi and the Jama`at-e Islami.” In Ali Rehnema (Ed.), Pioneers of Islamic Revival. Updated edition. London: Zed Books.

Nirjhor, N. (2014). Turki public space islam kibhabe fire asche? [How Islam is coming back to Turkish public space]. Centre for Social and Cultural Studies. Available on https://cscsbd.com/930 [Consulted on April 14, 2020]

Parvez, S. (2019). “The Khilafah’s Soldiers in Bengal”: Analysing the Islamic State Jihadists and Their Violence Justification Narratives in Bangladesh. Perspectives on Terrorism, 13(5), 22–38. doi: 10.2307/26798576

Uddin, M. (2016). Jongi o jongibad domone jamate islami otiteo bhumika palon koreche ekhono korche [Jamaat-e-Islami contributed to the fight against terror and terrorism in the past and is stilll contributing now]. Daily Sangram. August 6.

Ushama, T. & Osmani, N. Sayyid Mawdudi’s Contribution towards Islamic Revivalism. IIUC Studies, 93-104. https://ift.tt/2VohtGx 

Zabala, S. (2005). “A Religion Without Theists or Atheists.” In S. Zabala (Ed.), The Future of Religion. New York: Columbia University Press.

The post জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ও মাওলানা মওদূদীর চিন্তার সিলসিলা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%93/

No comments:

Post a Comment