আবদুল্লাহ হাশেম :
বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার বড়াইবাড়ি, হিজলামারি, খেওয়ারচরের বিডিআর ক্যাম্পগুলো যেমন দুর্গম, তেমন অনুন্নত। রাত তখন ৩ টা বাজে। নিয়মমাফিক সপ্তাহান্তে ক্ষেতে পানি সেচের কাজ তদারকি করছিলেন লাল মিয়া। হঠাৎ একটু দূরে বেশ নড়াচড়া লক্ষ্য করলেন তিনি। কিন্তু অন্ধকারে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। পাঁচ সাত ভাবতে ভাবতে কখন যে তার ঘাড়ের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে দু’টো ছায়ামূর্তি, টেরও পেলেননা। তাকে ধরে চার্জ করা হলো, ‘য়্যাহাঁ কা বিডিআর ক্যাম্প কিধার হ্যায়, বোল সালে?’ বুদ্ধিমান লাল মিয়ার বুঝতে বাকি রইলো না। তিনিও বুদ্ধি খাটিয়ে ভিন্ন চাল চাললেন। শত শত ছায়ামূর্তি ততক্ষণে বাংলাদেশের ভেতরে অনেকদূর এগিয়ে গেছে।
পাদুয়া লড়াই : ভূমী পুনরুদ্ধার
বড়াইবাড়ি গ্রামে বিএসএফ আক্রমণ করেছিলো আরেক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রতাপপুর সীমান্তে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তরেখার ২শ’ ৫০ গজ ভিতরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। দেশ স্বাধীনের পর অরণ্যবেষ্টিত পাহাড়ি এলাকা পাদুয়ার মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পসহ দু’শ’ ৩০ একর ভূমি বিএসএফ অপদখল করে নেয়। ক্যাম্পের আশেপাশে বাংলাদেশের জনগণের বসবাস রয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যরা এই ক্যাম্প দখলে রেখে আশেপাশের বাংলাদেশীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। সীমান্ত লাইন থেকে অনেক ভিতরে অবস্থিত বিএসএফ-এর এই ক্যাম্পটি প্রত্যাহারে একাধিকবার আলোচনা হয়েছিল।
১৯৯৯ সাল থেকে বিডিআর-এর উপ-মহাপরিচালক ও বিএসএফ-এর আইজি পর্যায়ে প্রতিটি সভায় পাদুয়া গ্রামটি নিয়ে আলোচনা হয়। বিএসএফ পাদুয়া ক্যাম্পের অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে-এ কথা স্বীকার করলেও নানা অজুহাতে ক্যাম্পটি সরিয়ে নিতে গড়িমসি করছিল। এই এলাকাটির কাছাকাছি আরও কয়েকটি অপদখলীয় এলাকা রয়েছে। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সিলেট সীমান্তের লাতু এলাকা থেকে কয়েকজন বিডিআর সদস্যকে বিএসএফ ধরে নিয়ে যায়। এ সময় বিডিআরের মহাপরিচালক ছিলেন মেজর আজিজুর রহমান। বিডিআর এ সময় পাদুয়া দখলে নিতে বিএসএফকে হুশিয়ারি জানিয়েছিল। এই ঘটনাটি ছাড়া পাদুয়ায় বিএসএফের ফাঁড়ি নিয়ে আর কখনও উচ্চবাচ্য হয়নি। সর্বশেষ ঘটনার দু’মাস আগেও বিএসএফকে চিঠি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
এরই প্রেক্ষিতে বিডিআর ১৫ এপ্রিল ২০০১ রাতে পাদুয়া গ্রাম পুনরুদ্ধার করে এবং সেখানে ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। গ্রামটি পুনরুদ্ধারের সময় বিডিআরের শক্ত অবস্থানের কারণে বিএসএফের গোলাগুলি করার সাহস হয়নি। পাশাপাশি পাদুয়া গ্রামটি থেকে ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে সোনাপুর সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকির উল্টোদিকে ভারত একটি পাকা রাস্তা তৈরি করে। সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে জিরো লাইন থেকে ৩০ মিটার দূরে নির্মিত রাস্তাটি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বিডিআর অভিযান চালিয়ে ভারতের অবৈধ রাস্তার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়।
বিএসএফের উন্মত্ত প্রতিশোধের নেশা
প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হয়ে বিএসএফ বড়াইবাড়ি আক্রমণের পরিকল্পনা করে, যেটা ছিলো সিলেটের পদুয়া থেকে ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে কুড়িগ্রাম জেলায় অবস্থিত । তাদের উদ্দেশ্য ছিলো মহেন্দগঞ্জ-কামালপুর পাকা সড়ক নির্মাণ সহজ করা ও বড়াইবাড়ির চার কিলোমিটার অতি উর্বরা জমি ভারতের দখলে আনা। সে লক্ষ্যে ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সেনাঘাঁটি থেকে তিন প্লাটুন ‘ক্যাটস আই কমান্ডো’ ও অতিরিক্ত আরো দুইশো বিএসএফ জওয়ান গোপনে বাংলাদেশের ওপারে এসে অবস্থান নেয়। সাথে প্রস্তুত করে রাখা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা বারুদ। এটা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী। একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত করার হীন চক্রান্ত।
সে রাতে বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে দেশের একাংশ পাহারা দিচ্ছিলেন মাত্র এগারোজন বিডিআর জওয়ান। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তেমন সুব্যবস্থা না থাকায় কমান্ডার নজরুল ইসলাম দিনের বেলায় ভারতীয় হায়েনাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারেননি। তবে তার সতর্কচিত্ত অজানা বিপদের গন্ধ পেয়েছিলো যখন বিকাল পাঁচটায় কোন ধরণের উপলক্ষ ছাড়াই বিএসএফের পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের চিঠি আসে। তা ছিলো মূলত একটি ফাঁদ। তিনি চিঠির কোন সাড়া না দিয়ে সৈন্যদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দিলেন।
২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল রাত তিনটা বাজে তখন। অসংখ্য শহীদের রক্তে কেনা আমাদের পবিত্র ভূমিকে ছিনিয়ে নিতে ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও বিএসএফের যৌথ বাহিনীর প্রায় তিন ব্যাটালিয়ন সদস্য বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপরেই আসে লাল মিয়ার বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকার কথা। বিএসএফ বড়াইবাড়িতে ঢুকলেও সেখানকার বিডিআর ক্যাম্পের অবস্থান নিয়ে একটু দ্বন্ধে ছিলো। লাল মিয়াকে ধরে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিডিআর ক্যাম্প থেকে একটু দূরে ক্যাম্প সাদৃশ্য একটি ঘর দেখিয়ে দিলেন। রাতের অন্ধকারে হানাদার বাহিনী সেটাকেই ক্যাম্প মনে করে ঘিরে ফেলার জন্য তিনদিক থেকে এগুতে শুরু করে।
অন্ধকারে জনযুদ্ধ
ওদিকে লালমিয়া একছুটে বিডিআর ক্যাম্পে এসে হাজির। ঘটনা খুলে বলে আরেক ছুটে গ্রামে গিয়ে পড়লেন। লোকজনকে জাগাতে হবে। দেশ রক্ষা করতে হবে। মাত্র এগারোজন বিডিআর জওয়ানের কাঁধে পুরো দেশের স্বাধীনতার ভার চাপিয়ে আমরা বসে থাকতে পারি না। বিডিআর-জনতার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ রক্ষার সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায় না অনেকদিন হলো। ঘটনা জেনে বড়াইবাড়ি ক্যাম্প থেকে সাথে সাথে ওয়্যারলেসে খবর চলে যায় পার্শ্ববর্তী হিজলমারি ও খেওয়ারচর বিডিআর ক্যাম্পে। কিন্তু তারা আসার আগেই বিএসএফ পুরো ক্যাম্প এলাকাজুড়ে গুলিবৃষ্টি শুরু করে। আক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিডিআরের এগারো জওয়ান প্রথম দশ মিনিট টু শব্দও করেননি। এটা ছিলো বিডিআরের মাইন্ড গেমের অংশ। বিপরীত দিক থেকে কোন সাড়া না পেয়ে বোকা বিএসএফ ভেবে বসে বিডিআর বোধ হয় পালিয়েছে।
অন্ধকারে অসতর্ক হয়ে হানাদার বাহিনীর একটি অংশ আসল বিডিআর ক্যাম্পের কাছে আসতেই একযোগে গর্জে উঠলো বাংলাদেশের চারটি মেশিনগান। মিনিটে ৭০০ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ভয়ংকর আরপিডি সাবমেশিনগানের আঘাতে মুহুর্তেই কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেলো বেশ ক’জন ভারতীয় সৈন্য। এগারোজন বিডিআরের বুদ্ধিমত্তা ও পাল্টা আক্রমণের প্রচন্ডতায় দিশেহারা হয়ে পালাতে শুরু করে দখলদার ভারতের যৌথবাহিনী। তারা ভেবে বসে, পেছন দিক থেকে অসংখ্য বিডিআর তাদের পুরো বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে। তাই প্রাণ বাঁচাতে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ভারতের সীমানার দিকে ছুটতে থাকে।
এ লড়াই চলে ৪২ ঘন্টাব্যাপি। সে বার নগ্ন হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছিল বিডিআর ও বীর জনতা। ১৬ জন সৈন্যের লাশ ফেলে কাপুরুষের ন্যায় পালিয়ে গিয়েছিল বিএসএফ। ৩ জন বীর বিডিআর সৈনিক শাহাদাত বরণ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে। তাঁরা হলেন, ল্যান্স নায়েক ওহিদুজ্জামান, মাহফুজুর রহমান ও আবদুল কাদের। আরো সাতজন বিডিআর সদস্যের পাশাপাশি ছয়জন গ্রামবাসীও আহত হন। গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে অক্ষয় কুমার ও বিমল প্রসাদ নামক দুই বিএসএফ হায়েনা। যুদ্ধের প্রথমদিকে ইন্ডিয়া ১৬ জন সৈন্যের নিহত হবার খবর অস্বীকার করে বলে, আমাদের মাত্র ৩ জন বিএসএফ নিহত হয়েছে। কিন্তু বিডিআর যখন এক এক করে ১৬ জন বিএসএফের মরদেহ হস্তান্তর করে ভারতের কাছে, তখন সত্য স্বীকার করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলোনা।
তাণ্ডব ও অপপ্রচার
তবে পরবর্তীতেও তাদের কারো কারো সত্য ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিলো। কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের ভাষায়, ”২০০১-এর এপ্রিলে মেঘালয়ের পিরদিউয়া ‘অ্যাডভার্স পজেশন’-এ মোতায়েন ১৫ জন বিএসএফ জওয়ানকে বাংলাদেশি ভূখণ্ড বরাইবাড়িতে টেনে নিয়ে গিয়ে নৃশংস অত্যাচারের পরে খুন করা হয়।” কিন্তু ইন্ডিয়ান বর্ডারের ভেতরের প্রত্যক্ষদর্শী হিন্দুরা মিথ্যা বলতে পারেননি। তারা বলেন, প্রথমে বিএসএফই আক্রমণ চালায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ৩০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একসঙ্গে ১৬ জন বিএসএফের মৃত্যু ঘটে। বিবিসি বাংলার আরেক প্রতিবেদনে নিহত বিএসএফ সদস্যের সংখ্যা বলা হয়েছে ১৮ জন। সিপাহী জনতার রক্তে সিঞ্চিত সেই ভূমির দিকে বিএসএফ চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায়নি দীর্ঘদিন। বিএসএফরা যে বেআইনীভাবে বড়াইবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ ভূ-খন্ডে প্রবেশ করেছিল তা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিল না।
পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের চাপে ফ্ল্যাগ মিটিং-এর মাধ্যমে বন্ধ হয় সংঘর্ষ। প্রশমিত হয় উত্তেজনা। কিন্তু ততক্ষণে বিএসএফের তান্ডবে ক্ষতি হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের। ভারতের সাথে বাংলাদেশের গর্ব করার মতো বিষয় খুব কম। নতুন প্রজন্মের জেনে রাখা আবশ্যক যে, বড়াইবাড়ির যুদ্ধ সেই অল্প কয়টার মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে আজো। এটার সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারতো, কিন্তু আমাদের দেশের নোংরা রাজনীতির বলয়ে আটকে যায় আমাদের বহু গর্ব ও সাহসের উপাদান।
The post ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস : যে যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতকে পরাজিত করেছিল appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%90%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a7%9c%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b8-%e0%a6%af-2/
No comments:
Post a Comment