Friday, March 20, 2020

ইমাম আবু ইউসুফ : শাসকের সাথে নিরাপদ সম্পর্ক

আবদুল্লাহিল বাকি

(১১৩-১৮২হি./ ৭৩১-৭৯৮ঈ.)

১. 

একদিকে রাজনৈতিক শাসক, অন্যদিকে ধর্মীয় আলেম দুজনেই জাতির কর্ণধার একজন পার্থিব আর আরেকজন ধর্মীয় বিষয়াবলির কিন্তু যার দায়িত্ব পার্থিব দিকটা সংরক্ষণের সে ধর্ম থেকে বেনিয়াজ থাকতে পারে না আর যে জাতির ধর্মীয় দিক সামলাবে সেও দুনিয়া থেকে নির্মুখাপেক্ষিতার ঘোষণা দিতে পারে না পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুসম্বন্ধই এক্ষেত্রে একটি জাতির জন্য সোনায় সোহাগা কিন্তু ইসলামী ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, এটা হয়ে উঠেনি অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য শাসক আলেমকে সরকারী চাকুরির বিভিন্ন পদ দিতে চেয়েছে ফলে আলেম আপন ইলম ও জ্ঞানের আমানত রক্ষার খাতিরে সেই নওকরী পদ গ্রহণ করে নিজের ও জাতির লাঞ্ছনা ডেকে আনেননি কখনো আবার শাসকের স্বদিচ্ছা ছিল কিন্তু আলেম সেক্ষেত্রে নিজের স্বাধীনতা, আখেরাতের জবাবদিহিতা ইত্যাদির কথা চিন্তা করে বিরত থেকেছেন 

খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যিনি প্রজাদের শাসক ছিলেন, তিনিই ছিলেন ইলম, ফিকহ, হিকমাত ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে সমাজের অন্য সবার চেয়ে অগ্রগণ্য এজন্য তখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মাঝে বিরোধের কোন উপলক্ষ্য তৈরি হয়নি শাসকের সাথে আলেমের যেসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া লাগে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল– কাযা বা ইসলামী আইনে বিচার ও মজলিসুশ শুরা ( সংসদ) মজলিসুশ শুরার প্রচলন যেহেতু নবী সা.এর যুগ থেকেই প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়ে আসছে, তাই তার মাধ্যমে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও আলেমগণেরও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রবেশের আবশ্যকীয়তা ছিল কিন্তু কাযার ক্ষেত্রে ভিন্নতা ছিল ইসলামে কাযা মূলত খলিফার অধিকার এজন্যই আবু বকর সিদ্দীক রা. কাযার দায়িত্ব খলিফার অধিনেই রেখেছিলেন কিন্তু দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনীন উমর রা. এক্ষেত্রে যুগের প্রয়োজনে সংস্কার সাধন করেন ইসলামী ভূখণ্ডের বিস্তৃতি ও মুসলমানদের ক্রমবর্ধমানতার দরুণ তিনি খলিফার দায়িত্ব থেকে পৃথক করে ফেললেন কাযার দায়িত্ব তখন তিনি বেঁছে বেঁছে যোগ্য আলেমগণকে নিয়োগ দিতে থাকেন বিচারক পদে মদিনায় বিচারক বানালেন আবুদ দারদা রা.কে, কুফায় শুরাইহ বিন আবিল আসকে, বসরায় আবু মূসা আশআরীকে, মিসরে কায়স বিন আসকে, ফিলিস্তিন ও শামে পাঠালেন উবাদা বিন সামেতকে 

এখান থেকেই শাসক ও আলেমের মাঝে রাষ্ট্রীয় বিষয়াদিতে সম্পর্কের সূচনা হয় সম্পর্কটা কখনো ছিল ইতিবাচক কখনো বা আবার নেতিবাচক খেলাফত ও কাযার পৃথকিকরণের ক্ষেত্রে শুরুতে যে কারণ ছিল, তার সাথে যুক্ত হয় পরবর্তীকালে– ধর্মীয় বিষয়াবলিতে শাসকের জ্ঞানের অভাব বা ইলমচর্চাকারি কোন নির্দিষ্ট দল বা ফেরকার প্রতি অন্যায় পক্ষপাতমূলক সম্পর্ক, যার কারণে ধর্মীয় বিচারক হয়তো বাধ্য ছিল শাসকের মর্জি-মতলব মোতাবেক চলতে নয়তো বিচারকের পদে ইস্তফা দিতে 

বিচারকের পদে চাকুরি করার বিভিন্ন অসুবিধার কথা চিন্তা করে বড় বড় আলেমগণ দেখা যায় বিচারক-পদ গ্রহণ করতেই অস্বীকৃতি জানাতেন এর ফলে তাদের নিজেদের আখেরাত নিশ্চিত হলেও সাধারণ জনগণ অযোগ্য নেতৃত্বের পক্ষপাতমূলক বিচারালয়ে নাকানি-চুবানি খাচ্ছিলো ফলে সামগ্রিক সংকট উত্তরোত্তর বেড়েই চলছিল বিচারক-পদ গ্রহণ করতে, ইসলামী ইতিহাসে সর্বপ্রথম অস্বীকৃতি জানায় মুত্তাকি ও অতি সাবধান সাহাবী হজরত ইবনে উমর রা. তার অনুসরণে উমাইয়া ও আব্বাসী যুগে একটা সাধারণ নিয়ম হয়ে উঠলো বিচারক-পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি উমাইয়া যুগের যেসকল বরেণ্য ও মান্য আলেমগণ অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবদুল্লাহ বিন উতবা বিন মাসুদ আল-হুযালি, মুসআব বিন রাফে’, হাফ বিন হারেস আল-ইয়ামেনী, মাকহুল, হায়াত বিন শুরাইহ, আবদুর রহমান বিন উমর আওযায়ী প্রমুখ

শামের শ্রেষ্ঠ ফকিহ মাকহুল রহ.কে (১১৩ হি) যখন বিচারক-পদ গ্রহণ করতে অনুরোধ জানানো হয়, তখন তিনি বলেন, ‘বিচারক-পদ গ্রহণের চেয়ে আমার গলা কেটে ফেলা আমার জন্য উত্তম’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমার গলা কাটা আর বিচারক-পদ গ্রহণ– এদুয়ের মাঝে যেকোন একটা গ্রহণের ইচ্ছাধিকার দেয়া হলে আমি প্রথমটাই গ্রহণ করতাম

আর আব্বাসী যুগে যে বরেণ্য আলেমগণ বিচারক-পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সুফিয়ান ছাওরি, ইবনে সুরাইজ, মুসা বিন সুলাইমান আল-জুযজানী, আবদুল মালেক বিন আবদুল আযিয, আবদুল্লাহ বিন ওয়াহাব মিসরী, আবদুল্লাহ বিন ফররুখ ফারেসী, মুগিরা বিন আবদির রহমান আল-মাখযুমী, ওয়াকি বিন জাররাহ, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক প্রমুখ আর আবু হানিফা রহ. ছিলেন এ দুই খেলাফতেরই বিচারক-পদ অস্বীকারকারী 

ইমাম আবু হানিফা– যার অনুসারী এখনকার বিশ্বে সবচে’ বেশি, তাকে বিচার-পদ নিয়ে যে নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, একাধারে উমাইয়া ও আব্বাসী খেলাফত থেকে, তা এক কথায় অবর্ণনীয় মারওয়ান বিন মুহাম্মদের পক্ষ থেকে  ইরাকে গভর্নর-পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিল ইয়াজিদ বিন হুবাইরা সে আবু হানিফা রহ.কে কাজির পদ গ্রহণ করতে বলেছিল, কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি এজন্য তার উপর অত্যাচার করা হয় গভর্নর কেন তাকেই পদ গ্রহণ করার আদেশ দিয়েছিলেন– এর কারণ সম্পর্কে বলা হয়, ১২২ হি.তে কুফায় যায়েদ বিন আলি বনু উমাইয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন ফলে তাকে হত্যা করা হয় সে সময় আবু হানিফার মুখ থেকে এমন কিছু অস্পষ্ট কথা বের হয়ে গিয়েছিল, তা যায়েদ বিন আলির প্রশংসা প্রকাশ করে এরই পরিপ্রেক্ষিতে আবু হানিফা বনু উমাইয়ার কতটা সমর্থক, এটা পরীক্ষা করার জন্য গভর্নর এই পথ বেঁছে নেয় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে, যখন আবদুল্লাহ বিন মুআবিয়া বিন জাফর ১২৭ হি. সালে বনু উমাইয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল কিন্তু এবার শুধু বিচারক-পদ গ্রহণ না করার কারণে অত্যাচার করেননি এর আরেকটা কারণ ছিল খলিফার দৃষ্টিতে, বনু উমাইয়ার প্রতি বিদ্বেষ বনু উমাইয়ার হাত থেকে যখন খেলাফতের নেতৃত্ব চলে আসলো বনু আব্বাসের কতৃত্বে, তখনও এই জবরদস্তিমূলক পলিসির মোটেও পরিবর্তন ঘটেনি আব্বাসীদের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ ও তার পরে খলিফা আবু জাফর মানসূর একই আচরণ করেছে এই যুগশ্রেষ্ঠ মহান ইমামের সাথে আবু জাফর মনসূর যখন আবু হানিফা রহ.কে বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করার আদেশ দিয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন যে ব্যক্তি প্রকৃতই আল্লাহকে ভয় করে তাকে ছাড়া কাউকেই এই গূঢ় দায়িত্ব অর্পণ করবেন না আর আমার বিচার তো স্বাভাবিক অবস্থায়ই নিরাপদ নয়, রাগের হালতে কিভাবে আমার বিচার সঠিক হবে আপনি যদি আমাকে এখতেয়ার দেন, বিচার-পদ গ্রহণ করার অথবা ফুরাতের জলে ডুবে মরতে, তাহলে আমি ‍দ্বিতীয়টাই গ্রহণ করবো

তারা যে এই কাজির পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তার পেছনে কিছু কারণ সক্রিয় ছিল উমাইয়া যুগের একটা বিশেষ কারণ ছিল রাজনৈতিক অর্থাৎ কিছু আলেমের অস্তিত্ব তখন ছিল, যারা উমাইয়দের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন অথবা সমর্থক ছিলেন অনেকের ক্ষেত্রে আবার দেখা যায়, তারা রাজনৈতিকভাবে কোন দলে স্বক্রিয় ছিলেন না কিন্তু উমাইয়াদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও পদক্ষেপ তাদের মনঃপূত ছিল না আব্বাসী যুগেও এ কারণটার অস্তিত্ব ছিল, তবে এ কারণটাই প্রধান ভূমিকা পালন করেনি 

এছাড়াও আরো কারণ ছিল, কাযার দায়িত্বের গুরুতরতা সম্পর্কে নবীজির যত উক্তি বর্ণিত হয়েছে, তাও এক্ষেত্রে অনেক অতিসাবধান আলেমগণকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল দুনিয়া ও পদের প্রতি অতি বিমুখতা, ইলমের মধ্যে নিমগ্নতা, কাজার মধ্যে খলিফাদের দখলদারিত্বের ভয়, আলেম ও শাসকের মাঝে রাজনৈতিক মতভিন্নতা ইত্যাদিও এক্ষেত্রে ইন্ধন যুগিয়েছে 

এ সব মিথ্যে ভয় থেকে বেরিয়ে এসে সর্বপ্রথম সাহসিকতার সাথে, বরেণ্য আলেমদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ কাজির পদ গ্রহণ করতে স্বীকৃতি জানালেন ইমাম আবু ইউসুফ রা. এক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাসে তিনি অগ্রগণ্যতার স্বাক্ষর রাখলেন তিনি হলেন মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম কাজির কুজাত বা প্রধান বিচারক 

২. 

আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইব্রাহিম আল-আনসারী ছিলেন একাধারে সিকাহ হাদিসশাস্ত্রবিদ, হানাফী মাযহাবের অধীন মুজতাহিদ ফকিহ, অর্থনীতিবিদ ও খেলাফতের উচ্চ আদালতের বিচারপতি তিনি ১১৩হি. মোতাবেক ৭৩১ঈ.তে কুফায় জন্মগ্রহণ করেছেন, অত্যন্ত ছোট্ট ও হতদরিদ্র পরিবারে তার বাবার একটা দুর্বল ছোটখাটো দোকান ছিল ইলম শিক্ষা করার মত সামর্থ তার ছিল না তিনি বলেছেন, ‘পরিবারের আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও আমি পড়া-লেখা শুরু করলাম কিন্তু আমার বাবা একদিন আমাকে বলল, ‘বাবা ! তুমি আবু হানিফার পথে পা বাড়িয়ো না; কারণ আমরা অভাবগ্রস্থ’ তখন আমি বাবার কথাকেই শিরোধার্য হিসেবে মেনে নিলাম কিন্তু আবু হানিফা দরসে অনুপস্থিত দেখতে পেয়ে আমাকে একশ দিরহাম দিয়ে বলল, ‘পড়ালেখা চালিয়ে যাও দরস যেন বাদ না যায় সামনে থেকে এ অর্থ শেষ হয়ে গেলে আমাকে আবার জানাবে’ কিছুদিন পর পর আবু হানিফা একশ দিরহাম করে দিত এভাবেই চলছিল আমার শিক্ষা’ আবু ইউসুফ রহ.এর পিতা যখন ইন্তিকাল করলেন তখন থেকে বাঁধা আসতে লাগলো তার মার পক্ষ থেকে। তার মা তাকে আবু হানিফার দরসে যেতে নিষেধ করে দিলেন। এবং তাঁতের কাজে লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু কাজ ফাঁকি দিয়ে তিনি আস্তে করে চলে আসতেন আবু হানিফার দরসে। কিন্তু মা এসে পিছন থেকে তাকে হাত ধরে শাসাতে শাসাতে নিয়ে যেতেন। আবু হানিফা এটা কয়েকবার দেখার পর তার মাকে বললেন, ‘তার খাবার নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। সে আমার এখানে থাকবে ও আমার সাথে বাদামের তেল দিয়ে বানানো ফালুদা খাবে। আর আপনাকেও প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠিয়ে দিব, চিন্তা করবেন না। এই ঘটনার কথা আবু ইউসুফ পরে স্মরণ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘হারুনুর রশিদের সাথে একবার খেতে বসলাম। খাবার সামনে আনা হলে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কি? আমিরুল মুমিনীন বললেন, এটা অতি উন্নত খাবার। বাদামের তেল দিয়ে বানানো ফালুদা।’ তখন আমি হেসে ফেললাম। তিনি বললেন, ‘হাসলেন যে?’ আমি পূর্বের ঘটনা বলতে চাচ্ছিলাম না। খলিফার পীড়াপীড়িতে বললাম আবু হানিফা রহ.এর ব্যপারটা। তখন খলিফা বললেন, ‘আল্লাহর কসম ! ইলম দীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই উপকারী। আবু হানিফা রহ.কে আল্লাহ রহম করুন। মানুষ যা বাহ্যিক চোখে দেখতে পায় না, তা তিনি আকলের চোখে দেখতে পেতেন।’

তলহা বিন মুহাম্মদ বিন জাফর বলেন, আবু ইউসুফ রহ. ছিলেন জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ, সম্মানিত। তিনি তার যুগের সবচে বড় জ্ঞানী ছিলেন। তিনিই হানাফী মাজহাবের উপর সর্বপ্রথম উসুলের কিতাব রচনা করেন। এবং আবু হানিফার উপর লেখালেখি করেন।’ আম্মার বিন আবি মালিক বলেন, আবু হানিফা রহ.এর শাগরেদদের মধ্যে আবু ইউসুফের মত ব্যক্তিত্ব পাওয়া যাবে না। যদি আবু ইউসুফ না থাকতো তাহলে আবু হানিফা ও মুহাম্মদ বিন আবি লায়লা এতটা আলোচনায় উঠে আসতেন না। আবু ইউসুফই তাদের জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করে ছড়িয়ে দিয়েছেন।’ আবু হানিফা রহ.এর আরেক প্রসিদ্ধ ছাত্র মুহাম্মদ বিন হাসান বলেছেন, ‘আবু হানিফার সময়ে একবার আবু ইউসুফ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে গেল। যাতে মৃত্যুর আশংকা প্রবল ছিল। আমরা আবু হানিফার সাথে তাকে দেখতে গেলাম। আবু হানিফা তাকে দেখে বের হয়ে বললেন, ‘আল্লাহ না করুন! সে যদি মারা যায় তাহলে বর্তমান দুনিয়ার সবচে’ জ্ঞানী লোককে আমরা হারাবো।’ হিলাল বিন ইয়াহিয়া বলেন, তাফসির, হাদিস, আরবের প্রাচীন ইতিহাস ও যুদ্ধবিগ্রহের বিবরণ তার মুখস্থ ছিল। যদিও তার প্রসিদ্ধি ঘটেছে ফিকহে, কিন্তু অন্যান্য শাস্ত্রে তার ফিকহের থেকে বেশি জ্ঞান ছিল।’

হানাফী মাজহাবের মধ্যে সবচে’ বেশি হাদিসাশ্রয়ী ফকিহ ছিলেন আবু ইউসুফ রহ.। যুক্তিনির্ভরতার অভিযোগ অনেকের ক্ষেত্রে থাকলেও আবু ইউসুফের ক্ষেত্রে এরকম কোন অভিযোগ নেই। আর ইমাম যুফার রহ. ছিলেন হানাফী মাজহাবের সবচে’ বেশি কিয়াসাশ্রয়ী। আবু হানিফা রহ.এর দরসে এক মাসআলা নিয়ে একবার বিতর্ক উঠলো। এক পক্ষে ছিলেন আবু ইউসুফ রহ. আর আরেক পক্ষে ছিলেন ইমাম যুফার। আবু ইউসুফ রহ. যে ‍প্রমাণ দিচ্ছিলেন তা খণ্ডন করে দিচ্ছিলেন যুফার, যুফার যে যুক্তি দিচ্ছিলেন, তা আবার খণ্ডন করে দিচ্ছিলেন আবু ইউসুফ। এভাবে যোহরের আগ পর্যন্ত চলতে থাকলো। আজানের সময় আবু হানিফা রহ. বললেন, যুফার ! আবু ইউসুফ যে ভূখণ্ডে আছে, সে ভূখণ্ড জয় করা তোমার পক্ষে অসম্ভব।’ বিজয়ের ফায়সালা করলেন আবু ইউসুফের পক্ষে। 

৩.

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। মতভিন্নতার কারণে তিনি আবু হানিফার দরস থেকে বেড়িয়ে এসে নিজের মত দরসগাহ খুলেছিলেন একবার। কিন্তু আবু হানিফার চাতুর্যে তিনি আবার অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসেন। শিক্ষকতার কিছুদিন পরই তিনি মাহদীর আমলে কাজি নিযুক্ত হন। এবং এরপরের খলিফা হাদির সময়েও তিনি কাজি ছিলেন। এটা একদল ঐতিহাসিকের মত। কিন্তু আরেকটা মত হলো, তিনি হারুনুর রশিদের যুগের আগে কাজি ছিলেন না। হারুনুর রশিদের যুগেই তিনি কাজির পদ পেয়েছিলেন। পরবর্তী ঐতিহাসিকগণ এই দুই বর্ণনার মাঝে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে বলেছেন, আবু ইউসুফ মূলত কাজির কাজ শুরু করেছিলেন মাহদীর যুগেই। কিন্তু আঞ্চলিক কাজি ছিলেন। আর হারুনুর রশিদের যুগে এসে তিনি খেলাফতের প্রধান কাজি নিযুক্ত হন। 

তিনি কেন তার পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করলেন না সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে? এ ব্যাপারে প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক নয়। এমনকি তার যুগের কতক আহলে হাদিস তাকে সমালোচনা করেছিলেন যুক্তি-প্রাধাণ্যতা ও সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে। কিন্তু তার সামনে ছিল ঐসকল হাদিস যা শাসকের আনুগত্যের ব্যাপারে কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করে, যদি ক্ষেত্রটা গুনাহের না হয়। সুতরাং সামান্য মতভিন্নতা বা শাসকের পাপের কারণে তাকে আনুগত্যের সীমানার বাইরে ফেলে দেওয়া তার কাছে, ইসলামের মৌলিকত্বের সাথে সাযুশ্যপূর্ণ মনে হয়নি। আর কেন তিনি কাজার পদ গ্রহণ করলেন, হাদিসে এ দায়িত্বের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী থাকার পরও? এ প্রশ্নটাও উঠতে পারে। আমরা দেখতে পাই, হাদিসের অর্থকে আপন সীমারেখার বাইরে প্রয়োগ করার ইচ্ছা জাগেনি তার। হাদিস শুধু সতর্ক করার জন্য কথাটা বলেছে। নবীজি এটা চাননি যে, এ বাণীর মাধ্যমে এ দায়িত্ব পালনের দরজা রুদ্ধ হয়ে যাবে। যদি আজিমতের আধিক্যের কারণে কাজার পদই আলেমগণ ত্যাগ করে দেয়, তাহলে ইসলামী আইন অনুযায়ী ফায়সালা কে করবে? তিনি এজন্য ব্যাক্তিগত স্বার্থের উপর সামষ্টিক উপকার ও স্বার্থের দিকটা প্রাধান্য দিয়েছেন। 

কাজির পদ লাভের পর তিনি খলিফার হাতের পুতুল বনে যাননি। হকের ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন। খোদ খলিফাদের ব্যাপারেও তিনি বিচারের ক্ষেত্রে ছাড় দেননি। এই পৃথিবীতে আল্লাহর নবীর শাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে খলিফাকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করেই তিনি খলিফার হক বিচার করেছেন। এক্ষেত্রে খলিফা হাদীর সাথে তার একটা সুন্দর ঘটনা আছে। ইয়াহিয়া বিন আবদুস সামেত বর্ণনা করেছেন, ‘আমিরুল মুমিনীন হাদির ব্যাপারে কেউ একজন তার বাগানের মালিকানার বিষয়ে বিচার নিয়ে আসলো। এটা যে হাদির মালিকানায়– বাহ্যিকভাবে এর দলিল শক্তিশালী হলেও, আসলে এটা তার ছিল না। এটা বুঝতে পেরেছিলেন আবু ইউসুফ। হাদি আবু ইউসুফকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি ফায়সালা দিবেন’ তখন আবু ইউসুফ রহ. চালাকি করে বললেন, ‘আপনার প্রতিপক্ষ আমাকে অনুরোধ করেছে, যেন আমি আপনার কাছ থেকে এ বিষয়ে কসম গ্রহণ করি যে, আপনার সাক্ষ্যদাতারা সত্য বিষয়ের উপর সাক্ষ্য দিচ্ছে।’ আর আবু ইউসুফ রহ. জানতেন, খলিফা মিথ্যা কসম করতে পারবেন না। তখন খলিফা বলল, ‘আপনি কি সেটাকে দরকারি মনে করেন।’ আবু ইউসুফ বললেন, ‘ইবনে আবি লাইলা সেটাকে দরকারী মনে করেন।’ তখন খলিফা বললেন, ‘বাগান তাকে দিয়ে দিন।’ 

খলিফাগণ সাধারণত কিছুটা ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয় হয়ে থাকেন। এ বিষয়টা আবু ইউসুফ বুঝতেন। সেটা যাতে কখনো হারাম পথে না হয়, সেজন্য তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। তার নিজের মুখেই একটা ঘটনা শোনা যাক। তিনি বলেছেন, ‘এক রাতে আমি বিছানায় ঘুমাতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় দরোজায় ঢক ঢক। লুঙ্গি ধরে ঘর থেকে বেরুলাম। দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে হারছামা বিন আয়ুন। আমি সালাম দিলাম। সে বলল, ‘আমিরুল মুমিনিন আপনাকে জরুরী পরিস্থিতিতে তলব করেছেন।’ আমি ভয় পেলাম খুব। এ অসময়ে ডাকার কারণ বুঝতে পারলাম না।’ এর মধ্যে দেরি হচ্ছে দেখে মাসরুরও চলে আসলো আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে। আমি বললাম, ‘দাঁড়ান ! আমি একটু মাথায় পানি ঢেলে নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নেই।’ এরপর আমি নতুন জামা পরলাম, গায়ে আতর মাখলাম। এরপর আমিরুল মুমিনিনের কাছে গেলাম। দেখলাম, তিনি চিন্তিতভাবে পদচারণা করছেন। তার ডান পাশে বসে আছে ঈসা বিন জাফর। আমি সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন। আমিরুল মুমিনিন বললেন, আমি মনে হয় আপনাকে একটু ভয় পাইয়ে দিয়েছি। আমি বললাম, ‘জি।’ আমাকে তিনি বসতে বললেন। বসে আমার ভয় কমলো। আমিরুল মুমিনিন বললেন, আপনাকে ডেকেছি, কারণ, আমার সামনে যে বসে আছে, ঈসা বিন জাফর, তার কাছে একটা দাসি আছে। আমি তার কাছে তা হাদিয়া চেয়েছি। সে বলেছে, দিবে না। কিনতে চেয়েছি, সে সেটাতেও রাজি হয়নি। আল্লাহর কসম, সে যদি ঐ দাসি আমার কাছে বিক্রি না করে, তাহলে আমি তাকে হত্যা করব।’ আমি ঈসা বিন জাফরের দিকে ফিরে বললাম, কেন তুমি আমিরুল মুমিনিনের আদেশ মানছো না।’ তখন সে বলল, ‘আমি আগে একটা হলফ করেছিলাম, আমি যদি এই দাসিকে দান করি বা বিক্রি করি তাহলে আমার স্ত্রী তালাক, আমার সব দাস দাসী আজাদ আর আমার সব মাল সদকা। এখন আমি কি করি, বলুন !’ আমার দিকে চেয়ে রশিদ বলল, এ থেকে বাঁচার কোন উপায় আছে?’ আমি বললাম, আছে। সে আপনাকে দাসির অর্ধেক অংশ দান করবে আর অর্ধেক অংশ বিক্রি করবে। তাতে তার পরিপূর্ণ বিক্রিও হবে না, দানও হবে না। ঈসা বলল, এটা কি জায়েজ হবে।’ আমি বললাম, জি।’ সে তখন অর্ধেক আমিরুল মুমিনিনকে হাদিয়া দিলো। আর অর্ধেক বিক্রি করলো এক লক্ষ দিনার মূল্যে।” এভাবেই ফিকহের গভীর জ্ঞানের আলোকে তিনি খলিফাদেরকে ইসলাম অনুযায়ী কাজ করতে সহযোগিতা করেছেন। 

আবু ইউসুফ রহ. কাজিল কুজাত হবার পর থেকে খেলাফতের অধীনে অঞ্চলগুলোর কাজি তিনিই নিয়োগ দিতেন। তিনি একটা সংস্কার সাধন করেছিলেন তখন। আলেম ও সাধারণ মানুষদের মাঝে পোশাকের কোন ফারাক ছিলো না আগে। তিনি কাজি ও আলেমদের জন্য পৃথক পোশাক নির্ধারণ করে দেন, যাতে তাদের আলাদাভাবে চেনা যায়। লম্বা টুপি, কালো পাগড়ি আর তায়লসান চাদর।  

৪.

 আবু ইউসুফ রহ. বেশ কিছু কিতাব রচনা করেছেন। হাদিস শাস্ত্রে তার রয়েছে মূল্যবান গ্রন্থ ‘আল-আছার’ যাতে হানাফী মাজহাবের মাসআলাগুলোর সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। আরেকটি কিতাব, যা আবু হানিফা ও ইবনে আবি লায়লাকে স্মরণীয় করে রাখবে, তা হল তার রচিত ‘ইখতিলাফু আবি হানিফা ওয়া ইবনে আবি লায়লা’ । ইমাম আওযায়ী রহ.এর সীরাতের উপর খণ্ডনে লিখেছেন ‘আর রাদ্দু আলা সিয়ারিল আওযায়ী’ । তার সবচে’ মূল্যবান ও প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ হচ্ছে ‘আল-খারাজ’, যাকে আধুনিক যুগে এসে ইসলামী অর্থনীতির ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গ্রন্থটা আবু ইউসুফ রহ. লিখেছিলেন খলিফা হারুনুর রশিদের অনুরোধে। এই গ্রন্থটা উৎসর্গও করেছেন তাকে। এই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি হারুনুর রশিদকে উপদেশ দিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এমনকি জাহান্নামের আগুন থেকেও সতর্ক করেছেন। প্রজাদের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণতার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি সেখানে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘ইচ্ছানুযায়ী আদেশ ও ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকুন। দুনিয়ার উপর আখেরাতকে প্রাধান্য দিন। কারণ, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাত চিরস্থায়ী। হকের ক্ষেত্রে আপনি আপন পরের মাঝে বিভেদ করবেন না। সবাইকে সমঅধিকার প্রদান করুন। আল্লাহর ব্যাপারে আপনি কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবেন না। আপনি পাপাচার থেকে বেঁচে থাকুন। কারণ, এটাই তাকওয়া।’

যে আলেম শাসকের সামনে এমন সুস্পষ্টভাষী, নিরাপোষকারী হতে পারে তাকেই মানায় শাসকের সাথে বন্ধুত্ব করা। শাসকের চাটুকারিতা করার মানুষের অভাব নেই। শাসকের বিরোধিতা করার মানুষও অহরহ। কিন্তু শাসকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে তাকে সৎপথে পরিচালিত করার মানুষের খুবই অভাব। এই শূণ্যস্থানটিই পূরণ করতে চেয়েছেন ইমাম আবু ইউসুফ রহ.। মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে তাকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।  

৫. 

ঊনসত্তর বছর বয়সে আবু ইউসুফ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার এক ছাত্র ইব্রাহিম বিন জাররাহ তার সাথে দেখা করতে যান একদিন। তাকে বেহুঁশ অবস্থায় দেখতে পান। গিয়ে দেখেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তার হুঁশ ফিরলে তিনি বললেন, ইব্রাহিম ! শোন, একটা মাসআলা নিয়ে আলাপ করা যাক।

— আপনার এই অবস্থায়?

— অসুবিধা নেই। জ্ঞানের চর্চা হয়তো আমাদেরকে নাজাত দিবে। আচ্ছা, বলো তো, হজ্জের সময় দাঁড়িয়ে প্রস্তর নিক্ষেপ করলে সওয়াব বেশি নাকি বাহনে চড়ে করলে?

— বাহনে চড়ে করলে।

— ভুল হয়েছে।

— তাহলে দাঁড়িয়ে করলে।

— এবারও ভুল হয়েছে। 

— আপনিই বলুন তাহলে।

— যে রামিতে (প্রস্তর নিক্ষেপ) দোয়া পড়তে হয়, তা দাঁড়িয়ে করা উত্তম, আর যে রামিতে দোয়া নেই তা বাহনে চড়ে করলে ভালো।

তার ছাত্র ইব্রাহিম দরোজার কাছে পৌঁছতেই আবু ইউসুফের গড়গড়ার আওয়াজ শুনতে পান। একটু পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৮২ হি. মোতাবেক ৭৯৮ ঈসায়ী। বাগদাদের উত্তর দিকে কাজেমিয়া শহরে, যেখানে বর্তমানে মূসা কাজেম ও মুহাম্মদ জাওয়াদের কবর অবস্থিত, সেখানে তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে ইমাম কাজেমের মাজারের পাশে তার নামে একটা মসজিদ ও মাজার আছে। আল্লাহ তাকে রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন। 

তথ্যসূত্র:

১.  আবুল আব্বাস শামসুদ্দিন আহমাদ ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ’য়ান ওয়া আবনাউ আবনাইয যামান, প্রকাশ: দারে সাদের, বৈরুত 

২. আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-আনসারী, আল-খারাজ, প্রকাশ: আল-মাতবাআতুস সালাফিয়্যাহ, কায়রো ১৩৮২ হি.

৩. ড. মুহাম্মদ আয-যুহাইলী, তারিখুল কাযা ফিল ইসলাম, প্রকাশ: দারুল ফিকর, বৈরুত ১৯৯৫ ঈ.

৪. মুহাম্মদ যাহেদ কাওসারী, হুসনুত তাকাযী ফি সীরাতি আবি ইউসুফ আল-কাজি, প্রকাশ: দারুল আনওয়ার, মিসর ১৯৪৭ ঈ.

 

The post ইমাম আবু ইউসুফ : শাসকের সাথে নিরাপদ সম্পর্ক appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%87%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%81-%e0%a6%87%e0%a6%89%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ab-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a5/

No comments:

Post a Comment