মুজাহিদুল ইসলাম
প্রথমেই রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবে ইবনু তাইমিয়া, ইবনু খালদুন ও সুবকির মতো তিনজন মনীষীকে নির্বাচনের উপযোগিতা উল্লেখ থাকা দরকার। ইবনু তাইমিয়া( মৃত্যু : ৭২৮), ইবনু খালদুন (মৃত্যু : ৮০৬) ও সুবকি (মৃত্যু : ৭৭১), তিনজনই একই শতাব্দীর মানুষ। তবে তাদের চিন্তাধারা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। যথাক্রমে তারা ছিলেন হাম্বলী, মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। ভৌগোলিকভাবেও তারা বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন । খালদুন তিউনিসিয়ার, সুবকি শামের এবং ইবনু তাইমিয়া মিসরের।
সুবকি, ইবনু খালদুন ও ইবনু তাইমিয়া সকলেই তাদের জীবনে ফতোয়া, বিচার ও মন্ত্রণালয়ের মতো বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন। বিজ্ঞমহলে প্রত্যেকে নেতৃত্বদানের যোগ্যতার স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনজনই জীবনের চল্লিশ বছর বয়সে শাসক ও শাসিতের সংশোধনে বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়েছেন।
ইবনুল মুকাফফার মতে সময় অর্থই মানুষ। আর সময়ের নিকৃষ্ট পর্যায় হল যখন একই সাথে শাসক-শাসিতরা নৈতিকতাসহ সকল স্থরে অনিয়মের পরিচয় দেয়। এই তিন ইমামের লেখাজোখা এ কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, তারা কালের চরম অবক্ষয়ের সময়টি পেয়েছিলেন।
তখন চলছিল মামলুক তথা দাসদের শাসন। মিসরকে কেন্দ্র করে তাদের শাসন চলছিল। সমাজের চরম অবনতির সুযোগ গ্রহণ করে অস্ত্র ও শক্তির বলে তখন তারা মিসরের রাজক্ষমতায়। কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন তৎকালীন ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ, ব্যাপকভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কী পদক্ষেপ ও প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন তারা, সেগুলো লেখে গেছেন নিজেদের রচনায়। তাদের প্রস্তাবনার প্রাসঙ্গিকতা এখনো ফুরায়নি। দেখা যাক, কী ছিল তাদের সেই রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাব।
ইবনু তাইমিয়া
তৎকালীন মামলুক শাসকগোষ্ঠীর শাসনতান্ত্রিক বৈধতার বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে ইবনু তাইমিয়া বরং প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে সৎপথে আনার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার ব্রত গ্রহণ নেন। ইবনু তাইমিয়া এর কর্মপন্থায় দেখা যায়, এমন বৃহৎ শক্তি দ্বীন থেকে সরে থাকুক, সেটা তিনি কোনভাবেই চাচ্ছিলেন না। কারণ, যদি প্রশাসন দ্বীন থেকে কিংবা দ্বীন প্রশাসন থেকে আলাদা হয়, তবে মানুষের সবকিছুর সর্বনাশ হবে।
ইবনু তাইমিয়া প্রশাসন তথা সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ, সেনাকমান্ড, বিচারবিভাগ, অর্থমন্ত্রনালয় ও পুলিশসহ বিভিন্ন স্থানের জন্য যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগের বিষয়ে দুইটি আয়াতকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়েছেন।
( আল্লাহ তায়ালা আমানাতকে যথাযথ ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। সূরা নিসা, আয়াত ৫৮ )
এই আয়াতের মাধ্যমে শাসককে প্রশাসনের স্থানগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়ে বলা হচ্ছে বলে মনে করেন ইবনু তাইমিয়া।
অন্যদিকে
( হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, এবং আনুগত্য কর তোমাদের উলুল আমরদের-নেতাদের । সূরা নিসা, আয়াত ৫৯ )
এই আয়াতের মাধ্যমে জনগণের করনীয় বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনা তুলে ধরেন তিনি।
নৈতিকতা ও ক্ষমতার সমন্বয়
কোরআনের আয়াতের ( সূরা কাসাস, আয়াত ২৬ ) আলোকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নৈতিকতা ও ক্ষমতার সমন্বয় জরুরী। কিন্তু সময়ের বাস্তবতায় একই ব্যক্তির মধ্যে উভয় গুণের সমন্বয় কঠিন হয়ে যায়। এখানে মিশ্রিত থাকে ভালোর সাথে মন্দ। তাছাড়া ইবনু তাইমিয়ার সময়ে মামলুকরা অধিকাংশই ছিল নতুন মুসলিম। ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণের মতো সুযোগ তাদের হয়নি। মাকরিযীর মতে অধিকাংশ মামলুক ছিল অনুন্নত এলাকার। মূল্যবোধের কোন বালাই তাদের ছিল না। বরং দৈহিক সক্ষমতার সাথেই ছিল শুধু তাদের পরিচয়। তাই সেনা, অর্থ ও বিচারবিভাগসহ সকল স্থানে সমন্বয়ের জন্য মাপকাঠি তুলে ধরে ইবনু তাইমিয়া।
প্রশাসনে সমন্বয়
যদি সেনাপ্রশাসনে দায়িত্ব দেয়ার জন্য উভয় গুনে গুনান্বিত ব্যক্তি না পাওয়া যায়, বরং হয় পাওয়া যায় শক্তিশালী ব্যক্তি বা শুধু আমানতদার ব্যক্তি। এক্ষেত্রে শক্তিশালী ও সাহসী ব্যক্তির মধ্যে যদি পাপাচারের অভ্যাস থাকে, তবুও তাকে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।
অন্যদিকে অর্থসংক্রান্ত দায়িত্বের ক্ষেত্রে শক্তির বিবেচনা না করে আমানতদার ব্যক্তির নিয়োগকে যথার্থ মনে করেন ইবনু তাইমিয়া। বিচারিক ক্ষেত্রে ইবনু তাইমিয়া শক্তি ও সাহসের মানদন্ডকে বিবেচনায় না রেখে বরং অধিকতর যোগ্যকে পদায়ন করার মতামত দেন।
মূলকথা
ইবনু তাইমিয়া মামলুক রাজশক্তির পেছনের মূল কারিগর সেনাশক্তির ওপর জনগণের চরিত্র সংশোধনের দায়িত্ব তুলে দিতে চেয়েছেন। তিনি তাদেরকে নামাজ ও জিহাদের মতো কাজ আঞ্জাম দিতে বলেন। তাদের উৎসাহিত করে বলেন, সুন্নাত হলো, যুদ্ধে নেতৃত্ব দিবে যারা, তারাই নামাজের ইমামতি করবে, তারাই খুতবা দিবে । ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নামাজ একসময় চারিত্রিক উৎকর্ষতা এনে দিবে।
ব্যক্তির উৎকর্ষতাতেই প্রতিষ্ঠানের উৎকর্ষতা। এভাবেই শাসক ও শাসিতের সংস্কার হবে বলে মনে করেন ইবনু তাইমিয়া। তবে ইবনু তাইমিয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি নিংসন্দেহে তৎকালীন অবস্থার বিবেচনায় গৃহীত হয়েছিল। এমনটিই মনে করেন শায়েখ মুহাম্মাদ আবু যুহরাহ।
ইমাম সুবকি
মামলুক যুগে ইমাম সুবকির রাজনৈতিক প্রস্তাবনার পেছরে রয়েছে একটি প্রশ্ন। একব্যক্তি ব্যক্তি সুবকিকে প্রশ্ন করেন, দুনিয়া আখেরাতের কোন নেয়ামত ছুটে গেলে তা কিভাবে আবার পাওয়া যাবে?’ সুবকি খণ্ডিতভাবে উত্তর না দিয়ে তৎকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থার কথা বিবেচনা করে লিখে ফেলেন একটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ।
এতে বিস্তারিতভাবে ধরে ধরে দেখিয়ে দেন অনিয়ম ও তার প্রতিকারে প্রয়োজনীয় করণীয়। অনেক মামলুক সুলতান প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগেই ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছেন। তিনি বলেন, প্রশাসনিক দায়িত্বের মূল ভিত্তি হচ্ছে সেবা। এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা হয়। এটা উল্লেখ করে তিনি একে একে প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের দায়িত্ব তুলে ধরেন।
শাসকের দায়িত্ব
সুবকি বলেন, “ আল্লাহ যখন আপনাকে সৃষ্টির সেবা করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন, আপনাকে জনগণের দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে । সকল প্রকার প্রবৃত্তি থেকে তাদের রক্ষার দায়িত্ব পালনে সচেতন থাকতে হবে। আপনি যদি মানুষকে যাচ্ছেতাই করতে দেন আর আপনি বাড়ি বসে নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, তাহলে আপনি আপনার প্রতিপালকের দেয়া দায়িত্ব পালন করছেন না। আপনার মালিক বলেনি যে আপনি জনগণের দ্বীনী বিষয়ে খোঁজ না নিয়ে রাতে তাহাজ্জুদ পড়বেন আর দিনে রোজা রাখবেন ।”
মূলত সুবকি তৎকালীন মামলুক শাসকদের জনগণের ওপর অন্যায় অবিচার, তাদের সম্পদ কুক্ষিগত করা ও তাদের নির্যাতনের কথা তুলে ধরে নিন্দা করে বলেন,মামলুক শাসকদের মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, দরিদ্রদের আহারদানসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক আচরণ কোন কাজ দিবে না, যদি তারা জনগণের প্রকৃত হক আদায় ও তাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না করে।
করের অর্থে মসজিদ নির্মান
জনগনের নিকট থেকে জোর করে অর্থ আদায় করে বড় বড় মসজিদ বানিয়ে বাহ্যিক ধর্মানুরাগ প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আল্লাহ এসব কবুল করবেন না। আল্লাহ তায়ালা প্রবিত্র। তিনি প্রবিত্র বস্তু ছাড়া কোন কিছু গ্রহণ করেন না।
সামরিক ও বেসমারিক সম্পর্ক
সামরিক কর্তৃপক্ষের জন্য পৃথক বাজেট নির্ধারণ মন্দ কিছু নয়। তবে তাদেরকে দেশের সকল স্থরে হস্তক্ষেপের সুযোগ দিয়ে ব্যাপক আকারে অর্থ ও স্বর্ণ আলাদাভাবে মজুদের বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। জনগণের থেকে সামরিক কর্তৃপক্ষের আদায় করা অর্থ সেনাকর্তৃপক্ষের নিকট না রেখে সাধারণ মজুদাগারে রাখার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানান। সমকালীন কোন কোন দেশের মতো সামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে দেশের আলাদা এলিট ও অভিজাত শ্রেনীতে রুপান্তরিত হবার প্রবণতাও দেখা যায়। ধর্মীয় ব্যক্তিদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। সামরিক কর্তাদের বেসামরিক মানুষদের আস্থা ও সম্মান অর্জনে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান সুবকি।
আলেমদের করণীয় ও কর্মক্ষেত্র
সুবকি মনে করেন, অন্তত আলেমদের শিক্ষা, ফতওয়া ও জনগণকে পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকতে হবে। ফকীহকে দুনিয়াবী লোভ ও গোত্রতান্ত্রিক মানসিকতা ত্যাগ করতে করতে হবে। মাযহাবী দলাদলীর মাধ্যমে রাজকীয় পদ বাগিয়ে নেওয়ার নিন্দা জানান সুবকি।
ইবনু খালদুন
সমাজবিজ্ঞানী ইবনু খালদুন তো জীবনে তিউনিশিয়া, আন্দালুস, আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ফিরেছেন। দৃঢ়চেতা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিভিন্ন অঞ্চল তাকে ধারণ করতে পারেনি। একসময় তিনি মিসরেও এসেছেন। যদিও এখানে কাটানো সময় তার জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না।
তিনি তার যে বইয়ের জন্য এখন অতিপরিচিত, সেই মুকাদ্দামায়ে ইবনু খালদুন মিসরে আসার আগেই লেখেছেন। মুকাদ্দামায় ‘আসাবিয়্যাহ তত্ত্ব বা গোষ্ঠী সংহতির উপর রাষ্ট্র দর্শনের ভিত্তি দাড় করিয়ে আলোড়ন তৈরী করেছেন।
আসাবিয়্যাহ
একটি জাতি বা রাষ্ট্র গঠিত হয় কিছু মূল্যবোধ ও চেতনার উপর ভিত্তি করে। যেসব মূল্যবোধ ও চেতনার উপর ভিত্তি করে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি জাতি বা রাষ্ট্র গঠন করে তাকেই আসাবিয়্যাহ বলা হয়। সাধারণত রক্তের সম্পর্কের চেতনা ঐক্যবদ্ধ হতে বিশেষ সাহায্য করে।
তার মতে একটি জাতি, রাষ্ট্র বা সভ্যতার উত্থান-পতনের মূল কারণ আসাবিয়্যাহ। আসাবিয়্যাহ-র উপর ভিত্তি করেই একটি জাতি বা রাষ্ট্রের উত্থান হয়, এবং আসাবিয়্যাহ দুর্বল হয়ে পড়লে সেই জাতি বা রাষ্ট্রের পতন হয়।
মুকাদ্দিমায় ইবনু খালদুন বলেন, সভ্যতা তথা একটি জাতির চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া, চালচলন ইত্যাদি একটি রাষ্ট্র থেকেও বড়। মুকাদ্দিমা লেখার সময় ইসলামী সভ্যতার পতন যুগ চলছিল। পতন অতিক্রম করে জাগরণের প্রত্যাশায় খালদুন তার চিন্তা পেশ করেন।
খালুদনের দৃষ্টিতে মামলুক যুগ
তবে মিসরে এসে মামলুক রাজশক্তির অবস্থা বিবেচনা করে তিনি নতুন গ্রন্থ রচনা করেন। নতুন গ্রন্থে মুকাদ্দিমার তত্ত্বের সাথে আরো বেশ কিছু বিষয় সংযোজন করেন। মিসরে এসে মামলুক রাজশক্তির মধ্যে সভ্যতা সংস্কৃতির ঘাটতি দেখেন। দেখতে পান, মামলুকদের আছে শুধু শক্তি। সভ্যতার জন্য যা প্রয়োজন, তার কিছুই তাদের নেই।
মামলুকদের সাংস্কৃতিক সংকটে তুর্কিদের আগমন বার্তা খালদুনের
ইবনু খালদুন ছিলেন মিসরে শরনার্থী অতিথি। কিন্তু রাজশক্তির মধ্যে টিকে থাকার উপযোগিতা দেখতে না পেয়ে তৎকালীন সভ্যতার পথে হাটি হাটি পা করে এগিয়ে যাওয়া তুর্কিদের বিষয়ে বলেন,”আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ, মিসরে মুসলিমদের রক্ষায় তাদের মধ্যে তিনি এই তুর্কদের একটি জামাত রেখেছেন। তারা খুবই সাহায্যকারী”
The post রাজনৈতিক সংস্কার : তাইমিয়া, খালদুন ও সুবকির প্রস্তাবনা appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%88%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a7%9f/
No comments:
Post a Comment