মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী :
ইসলামী শরীআহ’র অন্তর্নিহিত মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘মানবতার সার্বিক কল্যাণ সাধন এবং যাবতীয় অকল্যাণ থেকে সমগ্র মানবতাকে রক্ষা করা।’ ইসলামী শরীআহ শাসক ও শাসিত, ধনী ও গরীব, শিক্ষিত ও মুর্খ, দুর্বল ও শক্তিশালী এবং বংশ, বর্ণ, ভাষা, জাতি ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষ এবং শুধুই মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য নাযিল হয়েছে। এমন কল্যাণ যা দুনিয়ায়ও তাকে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও প্রশান্ত রাখবে এবং আখিরাতেও বিভিন্ন নাজ-নিয়ামতে ভরে দিবে।
কুরআন ও সুন্নাহর বিভিন্ন স্থানে শরীআহ’র মাকাসেদ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। পরে উলামায়ে কিরাম তাতে গবেষণা ও অনুসন্ধান করে ব্যাখ্যা করেন যে, এসব বিধিবিধানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো, ‘বান্দার কল্যাণ সাধন ও অকল্যাণ থেকে তাদের রক্ষা করা।’
এ প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন-
ولا خلاف بين العقلاء أن شرائع الأنبياء قصد بها مصالح الخلق الدينية والدنيوية
`বুদ্ধিবিবেচনাসম্পন্ন ব্যক্তিগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই যে, নবী-রাসূলগণের আনীত শরীআহ’র উদ্দেশ্য হচ্ছে, সৃষ্টির ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ সাধন করা।’ –তাফসীরে কুরতুবী, খ.২, পৃ.৬।
ইমাম আশ-শাতিবী রহ. বলেন-
أن الشريعة الإسلامية ما وضعت إلا لتحقيق جلب المصالح للناس ودرء المفاسد
`ইসলামী শরীআহ প্রবর্তনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো- ইহ ও পরকালে মানুষের কল্যাণ সাধন করা এবং অকল্যাণ নির্মূল করা।’ –আল-ই’তিসাম, খ.২, পৃ.৩৭।
ইমাম ইযযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম রহ. বলেন-
إن الشريعة كلها مصالح، إما تدرأ المفاسد أو تجلب مصالح.
`ইসলামী শরীআহ’র পুরোটাই কল্যাণ; সেটা অকল্যাণ ও ক্ষতি নির্মূল করার মাধ্যমে অর্জিত হোক কিংবা কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে অর্জিত হোক।’ –কাওয়ায়েদুল আহকাম ফী মাসালিহিল আনাম, খ.১, পৃ.৯।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন,
إن الشريعة جاءت بتحصيل المصالح وتكميلها، وتعطيل المفاسد وتقليلها
`শরীআহ এসেছে কল্যাণ অর্জন ও তার পূণর্তা দান এবং অকল্য্যাণ নির্মূল ও হ্রাস করার জন্য।’ –মিনহাজুস সুন্নাহ, খ.২, পৃ.১৩১।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,
إن الشريعة مبناها وأساسها على الحكم، ومصالح العباد في المعاش والمعاد، وهي عدل كلها ورحمة كلها ومصالح كلها وحكمة كلها، فكل مسألة خرجت من العدل إلى الجور، وعن الرحمة إلى ضدها، وعن المصلحة إلى المفسدة، وعن الحكمة إلى العبث، فليست من الشريعة وإن أدخلت فيها التأويل، فالشريعة عدل الله بين عباده ورحمته بين خلقه
`মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের নিশ্চয়তা প্রদানে ইসলামী শরীআহ’র বিধি-বিধান প্রণীত। ইসলামী শরীআহ’র বিধি-বিধানের পুরোটাই আদল-ইনসাফের মাপকাঠি, পুরোটাই মানব জাতির জন্য রহমত, পুরোটাই মানব কল্যাণে নিবেদিত এবং পুরোটাই প্রজ্ঞাপূর্ণ। সুতরাং যদি কোনো বিধান ইনসাফের পরিবর্তে অবিচার প্রতিষ্ঠা করে, রহমতের পরিবর্তে নিষ্ঠুরতার দিকে আহ্বান করে, কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ বয়ে আনে, প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজের পরিবর্তে অনর্থক ব্যস্ততায় লিপ্ত করে, তাহলে উক্ত বিধান অবশ্যই ইসলামী শরীআহ’র অন্তর্ভূক্ত নয়, যদিও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাপেক্ষে তা ইসলামী শরীআহ’র অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সুতরাং ইসলামী শরীআহ সৃষ্টির মাঝে ইনসাফ ও রহমত বাস্তবায়নের জন্য নাযিল হয়েছে।’ (ই’লামুল মূকিয়ীন, খ.৩, পৃ.১১)।
ইমাম বায়যাবী রহ. বলেন-
إن الاستقراء دل علي أن الله سبحانه شرع أحكامه لمصالح العباد..
`গবেষণা ও অনুসন্ধান এ কথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা শরীআহ’র বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছেন বান্দার কল্যাণের জন্য।’ –মিনহাজুস সুন্নাহ, খ. ২, পৃ. ১৩১।
এই আলোচনা থেকে জানা যায় যে, শরীআহ’র মূল লক্ষ্য হলো- ‘মানুষের কল্যাণ সাধন ও অকল্যাণ অপসারণ করা।’
এরপর শরীআহ’র সকল দলীল-প্রমাণ ও হুকুম-আহকাম অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, মানুষের কল্যাণ তিন স্তরের; জরুরিয়াত (সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি), হাজিয়াত (প্রয়োজনীয় বিষয়াদি) ও তাহসীনিয়াত (শোভাবর্ধনকারী বিষয়াদি)।
এরপর জরুরিয়াত তথা মানব জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ আবার পাঁচটি : দীনের হেফাযত, জীবনের হেফাযত, বিবেক-বুদ্ধির হেফাযত, বংশধারার হেফাযত এবং সম্পদের হেফাযত। অতএব সহজেই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এ পাঁচটি বিষয়ের হেফাজত ও সংরক্ষণই ইসলামী শরীআহ’র মৌলিক মাকাসেদ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।
শরীআহ’র এই মাকাসেদের আলোকেই শরীআহ’র আহকামের স্তর বিন্যস্ত হয়। কিছু আহকাম বেশি জরুরী, কিছু আহকাম কম জরুরী এবং কিছু আহকাম ঐচ্ছিক। মাকাসেদুশ শরীআহ’র আলোকেই এই বিন্যাস হয়। মাকাসেদের আলোকেই কিছু আহকামের মধ্যে পরিবর্তন আনা হয় এবং মাকাসিদের দৃষ্টিকোণ থেকেই কিছু আহকাম সর্বদা এক রকম ও সর্বাবস্থায় অপরিবর্তনীয় থাকে। মাকাসেদের পূর্ণতার জন্যই আহকামের সাথে শর্তসমূহ যুক্ত করা হয় এবং মাকাসেদের ভিত্তিতেই কোনো কোনো অবস্থায় আহকাম থেকে শর্তসমূহ সরিয়ে নেয়া হয়। মাকাসেদের কারণেই কিছু আহকামে রুখসত ও ছাড়া দেয়া হয় এবং মাকাসেদই মানুষকে নফসের গোলামী থেকে রক্ষা করে আল্লাহর দাসত্বের সাথে সংযুক্ত করে দেয়।
ইসলামী শরীআহ’র উপরোক্ত মৌলিক পাঁচটি উদ্দেশ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো- ‘মানুষের জীবনের হেফাযত’। মানব জীবন হেফাযতের জন্য ইসলাম খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। জীবনের সুরক্ষা এবং জীবনকে সকল ক্ষতি ও বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য ইসলামী শরীআহ প্রণয়ন করেছে বহু আহকাম এবং প্রদান করেছে অনেক বিধি-বিধান। যেগুলো সার্বজনীন, সুবিস্তৃত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। শরীআহ’র এসব আহকাম ও বিধি-বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কি পরিমাণ সার্বজনীনতা, প্রশস্ততা, সর্বাঙ্গীনতা ও প্রজ্ঞার সাথে শরীআহ মানব জীবন হেফাজতের ব্যবস্থা করেছে। মানুষের জীবন হেফাজতের জন্য ইসলামী শরীআহ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো-
০১. মানব জীবন হেফাজতের জন্য ইসলামী শরীআহ জীবনের মৌলিক প্রয়োজনসমূহ নিশ্চিত করেছে। যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা। এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজন। মানব জীবনে হেফাজতের উদ্দেশ্যেই শরীআহ মানুষের এসব প্রয়োজনসমূহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
০২. মানব জীবন হেফাজতের জন্য আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য হালাল হারামের বিধান দান করেছেন এবং মানুষকে তা মেনে চলতে বাধ্য করেছেন। কুরআনের ভাষায় হালাল বস্তুসমূহকে ‘তাইয়্যিবাত’ (পবিত্র) এবং হারাম জিনিসসমূহকে ‘খাবায়েছ’ (নাপাক) বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَـٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَـٰئِثَ
‘তিনি তাদের জন্য ‘তাইয়্যিবাত’ (পবিত্র জিনিসমূহ)-কে হালাল করেছেন এবং ‘খাবায়েছ’ (নাপাক জিনিসসমূহ)-কে হারাম করেছেন।’ –সূরা আল-আ’রাফ:১৫৭।
০৩. খাদ্যাভাবে মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে জীবনের হেফাজতের জন্য শরীআহ হারাম বস্তু ভক্ষণের অনুমতি দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَنِ اضْطُرَّ فِى مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
`অতএব কেউ পাপাচারে প্ররোচিত না হয়ে অসহনীয় ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে (এবং নিষিদ্ধ জিনিস পানাহার করলে) নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ –সূরা আল-মায়িদা:০৩।
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلاَ عَادٍ فَلاَۤ إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
`কিন্তু যে ব্যক্তি অনন্যোপায় অথচ সীমালঙ্ঘনকারী নয় (সে নিষিদ্ধ জিনিস খেলে) তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।’ –সূরা আল-বাকারা:১৭৩।
০৪. মানব জীবন হেফাজতের জন্য ইসলামী শরীআহ মানব হত্যা নিষিদ্ধ করেছে। এ প্রসঙ্গে ইসলাম স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, মানুষের জীবন সম্মানীয় বস্তু এবং তা অন্যায়ভাবে হত্যা করা যমীনে সবচেয়ে বড় জুলুম। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِناً مُّتَعَمِّداً فَجَزَآؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِداً فِيهَا
`আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে হত্যা করলো তার শাস্তি জাহান্নাম। সে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা।’ –সূরা আন-নিসা:৯৩।
অন্যত্র বলেন-
وَلاَ تَقْتُلُواْ النَّفْسَ الَّتِى حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالحَقِّ
`যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করো না।’ –সূরা বনী ইসরাইল:৩৩।
অন্যত্র বলেন-
وَلاَ تَقْتُلُوۤاْ أَوْلَـٰدَكُمْ مِّنْ إمْلَـٰقٍ
`দারিদ্র্যজনিত কারণে তোমরা নিজেদের সন্তানদের হত্যা করো না।’ –সূরা আল-আনআ’ম:১৫১।
অন্যত্র বলেন-
وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِى حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ
`তারা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না যা আল্লাহ হারাম করেছেন।’ –সূরা আল-ফুরকান:৬৮-৬৯।
অন্যত্র বলেন-
وَلاَ تُلْقُواْ بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
`তোমরা স্বহস্তে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ -সূরা আল-বাকারা : ১৯৫।
অন্যত্র বলেন-
وَلاَ تَقْتُلُوۤاْ أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيماً
`তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ -সূরা আন-নিসা:২৯।
রাসূলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছেন,
إنَّ دِمَاءَكُمْ وَأمْوَالَكُمْ وَأعْرَاضَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِيْ بَلَدِكُمْ هَذَا فِيْ شَهْرِكُمْ هَذَا، وَسَتَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ وَيَسْئَلُكُمْ عَنْ أعْمَالِكُمْ.
`আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর যেমন সম্মানীয়, তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও ইজ্জত তেমনি সম্মানীয়। অচিরেই তোমরা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাত করবে এবং তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসবাদ করবেন।’ -সহীহ বুখারী।
০৫. মানব জীবন হেফাজতের জন্য শরীআহ’র আরেকটি বিধান হলো, ইসলামী শরীআহ মানুষের জীবনের উপর হামলা ও হত্যার প্রতি উদ্বুদ্ধকারী সকল উপায়-উপকরণ ও বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ করেছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,
مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا
`যে আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করলো সে আমাদের দলভূক্ত নয়।’ -সহীহ বুখারী।
আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনের হেফাযতের জন্য পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে মানুষকে হত্যা, হামলা ও হামলার প্রতি উদ্বুদ্ধকারী সকল উপায়-উপকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।
০৬. মানব জীবন রক্ষার জন্য শরীআহ অত্যন্ত ফলপ্রসূ, ইনসাফ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আইন প্রণয়ন করেছে, যার চেয়ে সর্বাঙ্গীন, সার্বজনীন ও উপকারী উদ্দেশ্য আর কোনো আইন হতে পারে না। তা হলো,যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করবে তার শাস্তি হলো তাকেও কিসাসের আওতায় হত্যা করা হবে। মানব জীবন হেফাযতের জন্যই ইসলামী শরীআহ কিসাসের বিধান দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَوٰةٌ يٰأُولِي الأَلْبَـٰبِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
`হে বুদ্ধি-বিবেকসম্পন্ন লোকেরা! তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে রয়েছে জীবন। আশা করা যায় তোমরা (এই বিধানের বিরুদ্ধাচরণ থেকে) সাবধান হবে।’ – সূরা আল-বাকারা, ১৭৯।
হুদুদ প্রতিষ্ঠা ও কিসাস বাস্তবায়ন মানবতার জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি। বর্তমান বিশ্বে হুদুদ ও কিসাস না থাকার কারণে কি পরিমাণ মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে আর সোনালী যুগে হুদুদ ও কিসাস প্রতিষ্ঠিত থাকার ফলে কি পরিমাণ প্রাণহানির ঘটনা ছিলো, তার চিত্র তুলনা করলেই হুদুদ ও কিসাসের বাস্তবতা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠবে। অল্প কিছু অপরাধীর উপর হুদুদ ও কিসাস বাস্তবায়ন করলেই সমাজে অপরাধ ও প্রাণহানির ঘটনা শূন্যের কোঠায় চলে আসতে বাধ্য।
০৭. মানব জীবন রক্ষা সংক্রান্ত ইসলামের আরো একটি বিধান হলো, কোনো মানুষ আত্মহত্যা করতে পারবে না। আত্মহত্যা করা হারাম। চাই সে যতই বিপদ, দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানীতে থাকুক না কেন। ইসলামী বিধানের অধীনে আল্লাহর সত্তার নিকট রহমতের আশাবাদী হওয়া, প্রত্যেক কল্যাণ ও অকল্যাণের সময় আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং সর্বাবস্থায় তাঁর কাছেই সবকিছুর প্রত্যাশা করা ও প্রার্থনা করা। এতে সে বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের সময় ইচ্ছাশক্তি লাভ করবে এবং আত্মহত্যার চিন্তা থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও ইসলাম আত্মহত্যাকে কঠোরভাবে হারাম আখ্যা দিয়েছে।
০৮. জীবন রক্ষা সংক্রান্ত শরীআহ’র আরো একটি হুকুম হলো, অসুস্থ ব্যক্তি যতই কঠিন রোগে আক্রান্ত হোক না কেন এবং তার যতই কষ্ট হোক না কেন, তার উপর দয়া করার নামে তাকে কোনো ঔষধ বা অন্য কিছুর মাধ্যমে মৃত্যুর ঘুম ঘুমিয়ে দেয়া জায়েয নয়। কারণ জীবন থেকে নিরাশ কত রোগী শেষ পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমে ভালো হয়েছে। ইসলাম কোনোভাবেই মানব জীবনের অন্যায় বিনষ্টের অনুমতি দেয় না। এটা বর্তমান যুগে একটি জীবন্ত প্রশ্ন।
যেখানে আজ বিভিন্ন ধরনের রোগের আধিক্য, মানুষের মধ্যে সহমর্মিতার অভাব এবং বস্তুপূজার পরিবেশে ওইসব রোগ-বালা থেকে মানুষ নিষ্কৃতি চায়, যা চিকিৎসা সত্ত্বেও ভালো হচ্ছে না। কিন্তু ইসলামের স্পষ্ট জবাব, সুস্থতা ও রোগ সব আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি জীবন থেকে নিরাশ রোগীদেরও সুস্থ করে দেন। তাছাড়া রোগীর সেবাযত্নও একটি স্বতন্ত্র ইবাদত ও সওয়াবে কাজ। এজন্য এ ধরনের রোগীর জীবন নষ্ট করা তাদের উপর দয়া করা নয়, বরং স্পষ্ট জুলুম ও জীবন হত্যা।
০৯. মানব জীবন হেফাজতের আরেকটি বিধান হলো, নিজের ও অন্যের ক্ষতির হয় এমন কাজ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন.
لا ضرر ولا ضرار في الإسلام
`ইসলাম নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হওয়াকে সমর্থন করে না।’ — সুনানে ইবনে মাজাহ।
১০. মানব জীবন রক্ষা সংক্রান্ত শরীআহ’র আরেকটি বিধান হলো, রুখসত ও তাখফীফ। অর্থাৎ মানব জীবন রক্ষার জন্য ইসলামী শরীআহ মানব জীবনে সহজতা বিধান, কঠোরতা বিলোপ, অসুবিধা দূর করা ও কষ্ট লাঘব করার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিধি-বিধানে রুখসত ও ছাড় দিয়েছেন। এটা শরীআহ’র এমন সাধারণ উদ্দেশ্য, যা শরীআহ’র সকল বিধি-বিধানে পরিলক্ষিত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلاَ يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
`আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তা চান না।’ -সূরা আল-বাকারা : ১৮৫।
يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنْكُمْ وَخُلِقَ الإِنسَـٰنُ ضَعِيفا
`আল্লাহ তোমাদের দায়িত্বভার হালকা করতে চান এবং মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল।’ -সূরা আন-নিসা : ২৮।
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكمْ فِى الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
`ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনোরূপ সংকীর্ণতা বা কঠোরতা আরোপ করেননি।’-সূরা আন-হাজ্জ:৭৮।
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَـٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ
`আল্লাহ তোমাদের কষ্টে নিক্ষেপ করতে চান না, তবে তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের উপর তাঁর নিয়ামতরাজী পরিপূর্ণ করতে চান।’ -সূরা আল-মায়িদা:৬।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,
إن الدين يسر
`নিশ্চয় দীন পালন সহজ।’
এসব আয়াতের সারকথা হলো, মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলা, কঠোরতা বিলোপ করা, অসুবিধা দূর করা এবং কষ্ট লাঘব করা। আল্লাহ তাআলা মানব জীবন হেফাজতের উদ্দেশ্যে তাঁর বিধি-বিধানে কিভাবে সহজতার বিধান করেছেন, কঠোরতা বিলোপ করেছেন, এবং অসুবিধা দূর করেছেন তা সফর, ওজর, অসুস্থতা ইত্যাদি বিভিন্ন কষ্টকর অবস্থার বিধি-বিধান পালনে আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলীর দিকে দৃষ্টি দিলেই সহজেই অনুমিত হয়। যেমন সফরের সময় নামাযে কসর করা, দুই নামায একত্রে পড়া, জামাতে উপস্থিত না হওয়া, জুমআ না পড়া, রমজানের রোজা না রাখা, তালাক, খুলা, কসমের কাফফারা ইত্যাদি।
এসব বিধান দেয়া হয়েছে মূলত মানব জীবন হেফাজতের উদ্দেশ্যে মানব জীবনকে সহজ করা ও অসুবিধা দূর করার জন্য। সুতরাং বুঝা যায়, জরুরিয়াত স্তরের বিধি-বিধান হেফাজতের জন্য জরুরিয়াত স্তরের না এমন বিধি-বিধানে ছাড় দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এখানে নামায জরুরিয়াত স্তরের বিধান হলেও জামাত জরুরিয়াত স্তরের বিধান নয়, কিন্তু মানব জীবন হেফাযত জরুরিয়াত স্তরের বিধান। তাই জীবন রক্ষার জন্য জামাত ও জুমআয় ছাড় দেয়ার সুযোগ রয়েছে।
সারকথা হলো- মানব জীবন ইসলামের নিকট অত্যন্ত সম্মানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই তাকে শরীআহ’র জরুরিয়াত তথা অত্যাবশ্যকীয় বিষয়াবলীর অন্তর্ভূক্ত করে পাঁচ মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অন্যতম আখ্যা দেয়া হয়েছে।
লেখক :
পরিচালক
শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট
আমীর, পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ
The post মানুষের জীবন রক্ষা ও মাকাসেদে শরীয়া appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%93-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be/
No comments:
Post a Comment