সুমাইয়া মারজান:
হিজরত ও বিরহের বিষণ্ণ সুর
নবুওয়াতের ১২তম বছর তখন। মুসলমানদের উপর চলছে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার। সেই শুরুর সময়কালের মতো। একই তালে। মুসলমানদের সংখ্যাও অবশ্য কম। ইসলামের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দেওয়া উদাত্ত আহবানে সাড়া দিয়েছেন গুটিকয়েক সৌভাগ্যবান। কাবাচত্বরে দাঁড়িয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে ইনসাফ, সাম্যের ঘোষণা দিয়েছেন তাও হাতেগোনা সে ভাগ্যবানদের ছাড়া তেমন কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। ইসলামের আলো যাদের কপালে চুমু খেয়েছিলো তাদের জীবন সংখ্যাগরিষ্ঠ জালেম সম্প্রদায়ের অত্যাচারে দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে তারা জুলুম, নির্যাতনের শিকার। অধিকার থেকে বঞ্চিত, অপমানিত। বিশেষ করে দুর্বল মুসলমানদের উপর চলতো অত্যাচারীদের চাবুক। খাব্বাব, ইয়াসির, সুমাইয়া, বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের উপর চলা জুলুমের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এভাবে মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করে মুসলমানগণ অতিষ্ঠ হয়ে হিজরত করতে শুরু করেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ইথিওপিয়ায়। সেখানে থেকেও তাদের নানাবিধ চক্রান্তের শিকার হয়ে ফিরে আসতে হলো মক্কায়।
অবশ্য ততদিনে মক্কার বুকে মুসলমানদের এইসব যন্ত্রণাময় দিনও শেষও হয়ে এলো। ইয়াসরিবের কিছু মানুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে গিয়ে সেখানে বসবাস করার আহবান জানালেন। দিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবিদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস। ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেবার ইচ্ছাও ব্যক্ত করলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে। এইসব মর্মে তাদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামে এক গোপন চুক্তি হয়। চুক্তি পাকাপোক্ত করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের গোপনে ইয়াসরিবে হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। মুসলমানরা দু-একজন করে গোপনে হিজরত করতে লাগলেন। সর্বোচ্চ গোপনীয়তার পরেও ব্যাপারটা এককান-দুইকান করে ছড়িয়ে পড়লো সবার মাঝে। মুশরিকরা জেনে গেলো মুসলমানদের এ গোপন যাত্রার কথা। অবশ্য ততদিনে বেশীরভাগ মুসলমানই ছেড়ে গেছেন জুলুমের সে উপত্যকা। তবু মুশরিকরা যাদের পেলো হাতের কাছে তাদেরকে আটকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। নানারকম নির্যাতন করলো তাদের।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও মনে মনে হিজরতের নিয়ত করে রেখেছেন। আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় দিন গুনছেন কেবল।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জন্য নিজের বাড়ির মতোই ছিল। এমন দিন খুবই কম অতিবাহিত হয়েছে যেদিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ওই বাড়িতে যাননি। প্রায়ই রোজ সকাল-বিকাল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যেতেন ওই বাড়িতে।
একদিন দুপুরবেলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে এলেন। নবীজির মুখখানা চাদরে ঢাকা। একে তো ভরদুপুরে এলেন তাও আবার মুখ ঢেকে। কেমন অনভিপ্রেত আগমন যেন! আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তার দুই মেয়ে আয়েশা ও আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে নিয়ে ঘরে বসা ছিলেন। নবীজিকে এভাবে আসতে দেখে তারা অবাক হলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের এমন আগমনের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কোন কারণ রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অনুমতি নিয়ে সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে নির্জনে কথা বলতে চাইলেন। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একটু আগেই আল্লাহর পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাদেশ পেয়েছেন। তারপর সরাসরি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসেছেন। তাই কিছুটা ঘোরের মধ্যে থেকেই বললেন, ঘরে কেউ থাকলে তাদেরকে বাইরে যেতে বলো। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অবস্থা অনুমান করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে অভয় দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক আমার মা-বাবা। এখানে আমার পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কেউ নেই। এরাতো আপনারও পরিবার। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবার স্থির হয়ে বসে বললেন, আমাকে মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যেন এ সুসংবাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। পরবর্তী যে সুসংবাদের অপেক্ষা করছিলেন তিনি তা নবীজির মুখ থেকে শুনতে চেয়ে নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি আপনার সঙ্গী হতে পারবো? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমিও আমার সঙ্গী হবে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির সঙ্গী হবার সৌভাগ্যের খুশিতে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। তার দুচোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু পড়তে লাগলো ঝরঝর করে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা পরে যখন হিজরতের ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন, তখন বলেন মানুষ যে অধিক আনন্দিত হওয়ার কারণে কাঁদতে পারে, আমার পিতা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কান্না দেখে তা আমি সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজিকে জানালেন নবীজির মুখে হিজরতের কথা প্রথম শোনার পর থেকেই তিনি দুটো উট কিনে প্রতিপালন করছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা, আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও তাদের মাতা উম্মে রুমান রাদিয়াল্লাহু আনহা সফরের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন।
এদিকে মক্কার কাফেররাও ওইদিন পরিকল্পনা করলো নবীজিকে হত্যা করার। চারিদিকে তাদের সতর্ক নজরদারি। এ পরিস্থিতিতে পালিয়ে যাওয়া দুস্কর। তাই চললো গভীর চিন্তার পরিকল্পনা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে খবর দিয়ে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে আনলেন নবীজি। তার হাতে সঁপে দিলেন নবীজির কাছে রাখা মক্কাবাসীদের গচ্ছিত আমানত। আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে উটদুটো নিয়ে প্রস্তুত থাকার খবর পাঠানো হলো। বলে দেওয়া হলো তিনদিন পর যেন তিনি উট নিয়ে সাওর পর্বতের পাদদেশে উপস্থিত থাকেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত বিধর্মী হলেও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনিই হিজরতকারী কাফেলাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। সেদিন রাতে মক্কার ধূসর বালুকাময় পথ দুজন অশ্রুসিক্ত, বেদনাক্লিষ্ট দুজন অচেনা গন্তব্যের যাত্রীকে বিদায় জানালো। বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারে নেমে এসেছিলো বিরহবিধুরতার ছায়া। সবার থেকে বেশি কষ্ট হচ্ছিলো ছোট হুমাইরা পাখির। তার মনটা যেন প্রিয়তমের বিচ্ছেদ বেদনায় শরাহত পানকৌড়ির মতো ছটফট করছিলো। তখন থেকেই নবীজির একটু খবর জানার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতেন। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দেওয়া হয়েছিলো গুহায় কাফেলার খাবার পৌঁছে দিতে। তিনি তার ভাই আব্দুল্লাহকে সাথে নিয়ে গুহায় যেতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বাড়িতে বসে অস্থিরচিত্তে সারাদিন অপেক্ষায় থাকতেন একটু খবরের জন্য। রাতে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ফিরে এলে তার কাছ থেকে জেনে নিতেন খবরাখবর। তবুও যেন তার দিলের তড়প কমতো না। পরে অন্যদের কাছে তার ওই সময়ের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তখনকার একেকটা দিন আমার কাছে একেকটা মাস বা একেকটা বছরের চেয়ে দীর্ঘ মনে হতো। এভাবেই একদিন, দুদিন গেলো। তৃতীয়দিন আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এসে জানালেন, কাফেলা গুহা থেকে বেরিয়ে উটে চড়ে মদিনার দিকে রওনা হয়ে গেছেন। শুনে যেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছুটা স্বস্তি পেলেন। মক্কার মুশরিকরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে ধরতে না পেরে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো। তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জীবিত অথবা মৃত হাজির করার জন্য একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করলো। আবু জেহেল গেলো আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ি। জানতে চাইলো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সন্ধান। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা পরিস্কার জবাব দিলেন, আমি জানি না তারা এখন কোথায় আছেন। তার এ জবাবে সন্তুষ্ট হলো না আবু জেহেল। সে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার গালে খুব জোরে চড় মারলো। তখন আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
প্রতীক্ষার দিনগুলো ও দুঃসময়ের অবসান
রাতের আঁধারে মক্কা ছেড়ে যাওয়া কাফেলার মদিনা সফরের তিনমাস হয়ে গেলো। মক্কার বৈরী পরিবেশে রেখে যাওয়া অসহায় পরিবারটির দিন গুজরান হয় প্রতীক্ষার প্রহর গুনে। জীবন নিয়ে আতংক, মুশরিকদের সার্বক্ষণিক নজরদারি, অশ্রাব্য গালাগাল, সবমিলিয়ে যেন দমবন্ধ করা এক আবহাওয়া। পরিবারটি তাই দিন গুনে এই জগদ্দল সময় থেকে মুক্তি পাবার। কিন্তু হায়! এই দিন যেন আর শেষ হয় না। একে একে তিনটি মাস গেলো কেউ এলো না মদিনা থেকে। কোন সংবাদও না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে পথ চেয়ে চেয়ে দিন কাটে তার। এই বুঝি তাদের মুক্তির বার্তা নিয়ে এলো কেউ। গাঢ় বেদনার চাদরে জড়ানো সেইসব দিন!
একদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বসে আছেন ঘরের দাওয়ায়। হঠাৎ দেখেন তাদের ভাই আব্দুল্লাহ পাহাড়ের আড়াল থেকে দৌঁড়ে বাড়ির দিকে আসছেন। মুখে তার আনন্দধ্বনি। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। ব্যাপার কী! কৌতুহলী দু’বোন ছুটে গেলেন আব্দুল্লাহর পানে। আব্দুল্লাহ কী হয়েছে? আব্দুল্লাহ জানালেন একটু আগে দেখে আসা বার্তাবাহী কাফেলার কথা। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, যায়েদ বিন হারিসা, আবু রাফে, আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিত এসেছেন মদিনা থেকে। বার্তাবাহী দূতেরা বাড়িতে এলে জানা গেলো আসল খবর। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে লেখা পুরো পরিবারকে তাদের সাথে মদিনায় যাওয়ার কথা বলেছেন। এ মুক্তির সংবাদ পেয়ে তাদের বাড়ির আনাচকানাচে যেন দোল খেতে লাগলো আনন্দের স্নিগ্ধ হাওয়া। মহানন্দে তারা সব গোছগাছ করে নিলেন। যায়েদ ইবনে হারিসা ও আবু রাফেকে পাঠিয়েছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। তিনি তাদেরকে দুটি উট এবং পাঁচশত দিরহাম দিয়ে তার পরিবারকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারের সাথে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আগেই তো সব গোছগাছ করা ছিলো। তাও যা কিছু প্রস্তুতি নেবার ছিল দু পরিবারের সব তারা অল্প সময়ের ভেতরেই নিয়ে নিলেন। সবই করতে হচ্ছিলো গোপনে। কারণ মক্কার মুশরিকদের পুরো নজরদারি এখন তাদের উপর। যদি ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায় তো জানের নিরাপত্তাও হারাবে তারা। সঙ্গোপনে সব কিছু সারা হয়ে গেলো। এবার রওয়ানা হবার পালা।
আল্লাহর ইচ্ছায় মক্কার কাফেরদের পাহারাদারি ভেদ করে, তাদের অগোচরে দুটি পরিবার একসাথে হিজরতের পথ ধরলো। শঙ্কা আর আনন্দের মিশেল তাদের মনে। দুটোই যেন ক্ষণে ক্ষণে হৃদয়ে ঢেউ তুলে যায়। মন তাই দুলতে থাকে পেন্ডুলামের মতো। ধীরে ধীরে মক্কার সীমানা পার হয়ে এলে শঙ্কার গুমোট ভাব কেটে গেলো। কাফেলার সবার হৃদয়ে বইতে লাগলো প্রশান্তির শীতল হাওয়া। আনন্দের সাথে পথ চলতে লাগলেন তারা। যায়েদ বিন হারিসা ও আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত পথ চলতে চলতে শোনাচ্ছিলেন ইয়াসরিবের কথা। বলছিলেন কিভাবে তা মদিনাতুন্নাবি হয়ে গেছে সে ঘটনা। মদিনার মানুষেরা কিভাবে নবীজিকে ভালোবেসেছেন সেসব কথা শুনে দুই পরিবারের লোকজনের চোখের তারায় দোলা দিচ্ছিলো প্রশান্তির আলো। কাফেলার সবার হৃদয়ে মুক্তির আনন্দ থাকলেও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মনের আনন্দানুভূতিটাই ভিন্ন ছিল। তার খুশি ছিলো দ্বিগুণ। তার কাছে সবচেয়ে বড় ছিল প্রিয়তমের সাথে মিলিত হবার ব্যাপারটা। বিষাদময় কত কত বিরহের প্রহর পার করেছেন নির্ঘুম। তা শুধু তিনিই জানেন। তাই এই সফরের মাধ্যমে বিরহের অবসান হবে ভাবতেই তার মনের করিডোরে গড়াগড়ি খায় অজানা অনুভূতির সোনালী রোদ্দুর। পথ ফুরানোর সাথে সাথে বাড়ে দিলের তড়প। আর কতদূর গেলে পাবো তার দেখা!
পরদিন মীনায় এসে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা হলো কাফেলার। ইসলামের গোড়ার দিকে যারা তার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনিও যাচ্ছেন মদীনায়। তাকে পেয়ে কাফেলার সবার মনের সাহস বেড়ে গেলো।
পথচলার একটা সময়ে এসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বহনকারী উটটি কোন অজ্ঞাত কারণে বিগড়ে যায়। বলা নেই কওয়া নেই দলছুট হয়ে দৌঁড়াতে লাগলো অজানার দিকে। কাফেলার সবাই ভয় পেয়ে গেলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ভয়ে কান্না শুরু করলেন। উম্মে রুমানকে ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুললো। তিনি শঙ্কিত হচ্ছিলেন যদি উটটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ফেলে দেয়! তাহলে তো আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মারাত্মকভাবে আহত হবেন। তিনি অস্থিরচিত্তে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলে উঠলেন, উটের লাগাম ছেড়ে দাও। তার মনে হয়েছিলো লাগাম ছেড়ে দিলে লাগাম নিয়ে উটটি ছুটতে লাগলে হয়তো লাগামটি কোন গাছের সাথে আটকে যাবে। উটটির ছুটাছুটি তাতে বন্ধ হবে। আর সত্যি হলো তা-ই। কাফেলার পুরুষগণ গিয়ে উটটিকে বশে আনলেন তারপর। সবকিছু ঠিকঠাক হলে নতুন করে সফর শুরু হলো। সামনেই দেখা যাচ্ছে লোকালয়ের রেখা। হয়তো তারা পৌঁছে গেছেন এই আনন্দটুকু ভুলিয়ে দিলো কিছুসময় আগে ঘটে যাওয়া আতংকের সেই সময়টাকে।
তথ্যসহায়িকা :
১.সহীহ বুখারী।
২.সীরাতে ইবনে হিশাম।
৩.হিলইয়াতুল আউলিয়া।
৪.তারীখে তাবারি
The post হুমাইরা—দিলরুবায়ে সারওয়ারে কায়েনাত (৩য় পর্ব) appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%b9%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%93%e0%a7%9f-2/
No comments:
Post a Comment