Friday, June 11, 2021

যে জীবন কৃতজ্ঞতার

রাকিবুল হাসান:

‘অমন কইরা তাকায় আছিস ক্যান?’
‘নতুন জায়গা তো। তাই খারাপ লাগতেছে।’
‘আসল কথা সেটা না। আসল কথা হলো তোরে ভয় দেখাইছে পুরাতন ছাত্ররা। বলছে—৬ নং হুজুর খুব মারে। পিটায়া পাছা ব্যথা কইরা ফালায়। তাই না?’
‘জ্বি।’
‘তুই হেফজ শুনাইতে আইছিস। ঠিক কইরা শুনাইতে পারলে, মারমু ক্যান? আমার কি হাত পিলপিলায়? পড়াশুনা মন দিয়া করবি, জামাই আদর পাবি। পড়াশুনায় চুরি করবি, চোরের মতো মাইর খাবি।’

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদরাসা দারুল উলুম মাদানীনগরের হেফজখানায় ভর্তি হয়েছি দু’দিন হয়েছে। হেফজখানায় শিক্ষক ১৫ জন। নতুন ছাত্রদের লটারীর মাধ্যমে ভাগ করে দেয়া হবে ১৫ জন শিক্ষকের কাছে। এ দুদিন থেকেছি হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ সাহেবের কাছে। তিনি ৫ নং হুজুর হিসেবে পরিচিত। খেজাব দেয়া দাড়ি, মাথায় পাচকল্লি টুপি, গায়ে গোল পাঞ্জাবি। গ্রুপ ভাগের আগে নতুন ছাত্রদের নিয়ে তিনি নানান কথা বলেন, নানান স্বপ্ন দেখান। আমাদের ভয়কাতর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এতদিন সুখে ছিলা। গ্রামে ছিলা। এখন আসছো শহরের মাদরাসায়। কষ্ট হবে, একা একা লাগবে। মন বলবে—’আগিলা রে আগিলা, কত বালা আছিলা’। কিন্তু মনকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।’

মাগরিবের পর বসেছে লটারীর আসর। আমিও গুটিসুটি হয়ে বসে আছি আসরের এক কোণায়। ভাবছি—লটারীতে যেন কার ভাগে পড়ি। ঢাকার শিক্ষকদের দেখলেই কেমন ভয় ভয় লাগে। ভাবনার মধ্যেই লটারিতে আমার শিক্ষকের নাম উঠলো— ‘৬ নং হুজুর’। পুরাতন এক ছাত্র চোখ বড় বড় করে বললো, ‘খাইসে!’
আমি বললাম, ‘কী?’
সে বললো, ‘সাবধানে থাইকো। জিন্নাত হুজুর। কেচকি মাইর চিনো? কেচকি মাইর দিবো।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘জিন্নাত হুজুরটা কে?’
সে বললো, ‘এই যে ৬ নং হুজুর। মাওলানা নুরুল ইসলাম সাহেব। তাকে ভোলার হুজুরও বলে। বাড়ি বরিশালের ভোলা। থাকেন ঢাকায়। ভোলাতে তেমন একটা যান না। মাঝে মাঝে ভোলার স্মৃতিচারণ করেন।’
আমি বললাম, ‘তাকে জিন্নাত বলে কেন? জ্বিন-টিন পালেন নাকি!’
ছেলেটি বললো, ‘আরে নাহ। প্রতি শুক্রবার তিনি হেফজখানার সব ছাত্রদের গল্প শোনান। তার গল্পজুড়ে থাকে জিনের কথা। জিনজগতের কথা। তাই তাকে সবাই জিন্নাত হুজুর বলে।’

আমার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ছিলো—আমি পারবো। কিন্তু জানি হেফজের কোন বিশ্বাস নেই। পড়া শুনাতে গিয়ে কখন কোন লাইন ভুলে যাবো, নিশ্চয়তা নেই৷ তখনই যদি শুরু হয় কেচকি মাইর, খবর আছে। নতুন জায়গা, নতুন ছাত্র। ইতস্ততা এবং ভয় দুটোই জাপটে ধরেছে। গ্রাম থেকে এসেছি। চেহারা সুরতে গোবেচারা ভাব। সেই ভাব দেখে সবাই মনে করছে আমি মাইর খাবো, প্রচুর মাইর খাবো। ৬ নং হুজুর দু’একটা কথা বলে ভয়টা দূর করে দিলেন। হুজুরের চোখে যেন আমি খুঁজে পেলাম আমার সবচে নিরাপদ আশ্রয়। ভালোবাসার সবচে পবিত্রতম ছোঁয়া।

হুজুর বললেন, ‘প্রতিদিন কয় পৃষ্ঠা করে শুনাতে পারবি?’
‘এক পারা।’
‘পারবি?’
‘জ্বি।’
‘তোর সাহস আছে। কাল থেকে পড়া শুনানো শুরু কর।’
‘ইনশাআল্লাহ!’

আমি এক পারা দৈনিক শুনাবো শুনে পুরাতন ছাত্ররা চোখ কপালে তুললো। গ্রাম থেকে এসে কী বাহাদুরী! কেচকি মাইর খাওয়ার খুব শখ মনে হয়। ৬ নং গ্রুপে যেসব নতুন হাফেজরা এসেছে, তারা অধিকাংশই আধা পারা শোনাবে। তারাও শঙ্কিত—আমি একপারা শোনাতে পারব কিনা। আমি তখন লিকলিকে এক বালক। বাতাসের ধাক্কায় পড়ে যাবার মতো পাতলা। মাথায় পাচকল্লি টুপি। গায়ে কাটা পাঞ্জাবি। কোমরে কায়তনে ঝোলানো ট্রাঙ্কের চাবি। হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর খাদেমুল কুরআন হাফেজিয়া মাদরাসায় হেফজ শেষ করে একবছর শুনিয়েছি। ইয়াদ আরও পোক্ত করতে মাদানীনগর ভর্তি হওয়া। যখন মাত্র তিন পারা হেফজ করেছি, তখনই মাদানীনগর ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। আমার এক মামা মাওলানা শামসুল হক ছিলেন সন্দ্বীপের পীর সাহেব মাওলানা ইদ্রিস সন্দ্বীপী রহ.-এর মুরিদ। তিনি খুব চাইতেন আমি যেন তার পীর সাহেবের মাদ্রাসায় পড়ি। শহরের মাদরাসায় পড়ার আমারও শখ ছিল। কিন্তু তখন গ্রামের শিক্ষকগণ শহরে আসার অনুমতি দেননি। তাই আসা হয়নি।

কেচকি মাইর খাওয়ার যে ভয় ছিলো তা কেটে গেছে। আজ দশ বারো দিনে একবারও বেতের স্পর্শ লাগেনি আমার গায়ে। একদিন পর পর হুজুরের মোবাইলে মা ফোন করেন। স্ক্রিনে মায়ের নম্বরটা দেখলেই হুজুর আমাকে ডাকেন। আমি হুজুরের সামনে বসেই কথা বলি। একদিন হুজুর বললেন, ‘বারান্দায় গিয়ে কথা বল। মায়ের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে না পারলে ভালো লাগে না। মায়ের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হলে আমাকে বলবি। আমি ফোন দিয়ে দিবো।’

বই-পত্রিকা পড়ার অভ্যাসটা আমার পুরোনো। প্রতি মাসে মামা ‘আদর্শ নারী’ ‘জাগো মুজাহিদ’ ‘মদীনা’ পত্রিকাগুলো কিনতেন। মামা বোধহয় গ্রাহকও ছিলেন। পত্রিকা বাড়ি এলে আমিও পড়ে ফেলতাম। স্কুলের হোমওয়ার্কের ফাঁকে ফাঁকে। বই পড়তাম ঠিক। কিন্তু লেখবার ইচ্ছে কখনোই জাগেনি। শুধু আমার ছোট মামা আমাকে বলতেন, ‘আদর্শ নারীর সবুজ কুঁড়ির মতো তোকেও লিখতে হবে।’
আমি নাক সিঁটকে বলতাম, ‘আপনিই লিখেন।’
মামা আর কথা বাড়াতেন না। ইতি টেনে বলতেন, ‘আচ্ছা। হেফজ শেষ কর। তারপর দেখা যাবে।’

এখন এই মাদানীনগরে এসে দেখি ৬ নং হুজুর পড়েন ‘আল কাউসার’। হুজুরের বইয়ের রেকে মুফিজুল ইসলামের হৃদয় গলে সিরিজের কয়েকটি বই। বইগুলো দেখে আমার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। একদিন বিকেলে হুজুর যখন নেই, দুরুদুরু বুকে একটি বই নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। তারপর থেকে প্রতিদিন। অচেনা এই মাদরাসায় আমার পরম বন্ধু হয়ে উঠলো হৃদয় গলে সিরিজ। খুব বেশী সময় থাকতো না আসরের পর। মাগরীবের ২০ মিনিট আগে বসতে হতো দোয়ার আমলে। যতটুকু সময় পেতাম, পড়তাম। সম্মোহিত হয়ে পড়তাম।

৬ নং গ্রুপে আমার সঙ্গে যারা নতুন এসেছে হেফজ শুনাতে, তারা সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড়। বিকেলে তারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্গ আকাশ দেখতো। হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি গুনতো। মুজাহিদ ভাই বলতেন, ‘দিনে গুণি গাড়ি, রাতে গুণি তারা।’ ওইসব আমার ভালো লাগতো না। আমার ভালো লাগতো হুজুরের বই চুরি করে পড়া।

এই বারো-তেরো দিনে বেতের স্পর্শ না পেলেও শরীরে এলো প্রবল জ্বর। যেন আমার ভেতর-বাহির পুড়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো টকটকে লাল। খেতে পারছি না, পড়াও শোনাতে পারছি না। একদিন বিকেলে হুজুর থেকে পাস নিয়ে বাইরে গেলাম। মাদরাসার গেইটের সামনেই একটা ফার্মেসি। ছেলে বয়সের একজন ফার্মাসিস্ট এখানে বসে। গায়ের জ্বর মেপে তিনি একগাদা ওষুদ ধরিয়ে দিলেন৷। এতগুলো ওষুধ দেখে মনে হলো—জ্বর বোধহয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। মাদরাসায় ফেরার পর ৬ নং হুজুর কপালে হাত দিয়ে বললেন, ‘ওষুধ আনছোস?’
আমি পকেট থেকে একগাদা ওষুধ বের করে দেখালাম। হুজুর এতপদের ওষুধ দেখেই বললেন, ‘মোশাররফ থেকে ওষুধ আনছোস?’
‘মোশাররফ চিনি না। গেটের সামনের দোকান থেকে আনছি।’
‘তার নামই মোশাররফ। তার থেকে ওষুধ আনবি না। এই একটা ওষুধ রেখে বাকি ওষুধ ফিরিয়ে দিয়ে আসবি। এত ওষুধ লাগে না।’

ওষুধগুলো ফিরিয়ে দিতে আমার লজ্জা লাগছিলো। বাইরে গিয়ে দোকানের সামনে বারকয়েক উকি দিয়ে চলে এলাম৷ ওষুধ রইলো পকেটে। এসে হুজুরকে বললাম, ‘ওষুধ দিয়ে এসেছি।’ তীব্র জ্বরে আমার ভেতর তখন হাহাকার। খাওয়া মুখে রুচে না। সকালের নাস্তায় বনরুটি লাগে ঘাসের মতো। একা একা দুলতে দুলতে ওযুখানায় যাই। টিপকল ছেড়ে বসে মাথা নীচু করে পানি দেই। পানির ছিটা এসে গায়ে লাগলে জ্বরতপ্ত গা ছ্যাৎ করে উঠে। আমার তখন বাড়ির কথা, মায়ের কথা মনে পড়ে। বাড়ি থাকলে মা বিছানায় শুইয়ে দিতেন লম্বা করে। তারপর আস্তে আস্তে মাথায় পানি ঢালতেন৷ ওই পানির চেয়ে তখন আরাধ্য হয়ে উঠতো মায়ের কোমল হাতের পরশ। যে পরশে জ্বর কেটে যায়, ঘোর কেটে যায়। এখানে মায়ের হাতের পরশ নেই। ৬ নং হুজুর বাবার মতো দেখেন, আদর করেন। বাবার আদরে মায়ের আদর পাওয়া যায় না। সবকিছু কেমন নির্দয় মনে হয়।

সায়েদাবাদ ফুপুরা থাকেন। ফুপাত ভাই এসে আমাকে বাসায় নিয়ে গেলো। রক্ত পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, টাইফয়েড। জীবনের এই প্রথম টায়ফয়েডে আক্রান্ত হলাম। প্রচণ্ড জ্বর, সঙ্গে প্রবল কাঁপুনি। যখন কাঁপুনি উঠে, দুজন মিলেও কাঁপুনি থামিয়ে রাখা যায় না। টানা বিশদিন ঢাকায় চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। দু’দিন পরপর হুজুর ফোন করেন। খবর নেন। একবারও পড়ার কথা বলেন না। ফোন করেই বলেন, ‘পূর্ণ সুস্থ হ। তারপর আসবি।’

দেড়মাস পর যেদিন মাদরাসায় ফিরলাম, হুজুর বললেন, ‘আজ দুপুরে তুই আমার সঙ্গে খাবার খাবি।’
আমি লজ্জায় লাল হয়ে বললাম, ‘জ্বি।’
হুজুর বললেন, ‘তুই নেই। রেকের বইগুলোয় ধূলো জমেছে। প্রতিদিন বিকেলে বইগুলো মুছে রাখিস।’
ধরা খেয়ে যাওয়া অপরাধীর মতো ভঙ্গিতে মাথা নীচু করে বললাম, ‘জ্বি।’

দেখলাম রেকে নতুন কয়েকটি বই। আমি মোছার বাহানায় বইগুলো পড়ার নৈতিক অনুমতি পেয়ে গেলাম। বিকেলবেলায় বইগুলো পড়তে হুজুর না করেননি। কারণ বইগুলো পড়েও আমার পড়া শুনানোর কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। দিন যত যায়, হুজুরের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ে। মায়া বাড়ে। আমি অবাক হতে থাকি তাঁর ভালোবাসায়। আমি তখনো জানি না—আরো মমতা নিয়ে হুজুর আমার সামনের দিনগুলো রঙিন করে দেয়ার অপেক্ষায় আছেন। অদ্ভুত এক জগতের সঙ্গে পরিচিত হবো। হুজুর পরিচয় করিয়ে দিবেন। যে জগতে আমি কখনো পা রাখিনি।

দুপুরে পড়া শুনাতে গেছি হুজুরের কাছে। কোন পারা মনে নেই। দেখলাম—হুজুর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন। কারো চোখ দেখবার মতো হয়—এই অনুভবটুকু তখনো হয়নি। পড়া শুনানো শেষ হলে হুজুর বললেন, ‘তোর চোখ লাল কেন?’
আমি বললাম, ‘খেয়াল করিনি।’
‘চোখ জ্বলে?’
‘জ্বি না।’
‘পানি পড়ে?’
‘জ্বি না। তবে দূরের জিনিস একটু কম দেখি। সারাক্ষণ কোরআন শরীফের দিকে তাকিয়ে থাকি—এজন্যই বোধহয় এমন হয়।’
‘তোর চোখে সমস্যা আছে।’

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম হুজুরের দিকে। কিছু বলবো ইতস্তত লাগছে। মাসিক খরচ দিতে যেখানে হিমশিম খেতে হয় মামার, সেখানে ডাক্তার দেখানোর টাকা পাবে কই? ডাক্তারের কাছে গেলেই চশমা দিবে। চশমা আমি পড়তে পারবো না। হুজুর আমাকে আরকিছু না বলে ফোন দিলেন ছোট মামাকে। বললেন, ‘রাকিবের চোখ লাল হয়ে থাকে। কিছুদিন পর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার বন্ধ। ডাক্তার দেখাবেন।’

মাসিক বেতন বকেয়া পড়ায় আমার দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার প্রবেশপত্র আসেনি। হুজুর সুপারিশ লিখে দিলেন প্রবেশপত্র যেন দেয়া হয়। হিসাবরক্ষক কামাল সাহেব সেই সুপারিশপত্র না দেখেই ঝুড়িতে ফেলে দিলেন। আমার তখন মনে হয়েছিলো আমাকেই বুঝি ফেলে দেয়া হয়েছে ডাস্টবিনে। চোখের কোণায় জল চলে এলো। কেউ দেখে ফেলে, তাই তড়িৎ গতিতে মুছে ফেললাম। নীচ থেকে সিঁড়ি ভেঙে আর তিনতলায় উঠতে ইচ্ছে করছিলো না। মন চাচ্ছিলো ফেরারী হয়ে যাই। কিছু করার নেই। আবার হুজুরের কাছে এলাম। হুজুর বললেন, ‘পড় তুই। আমি দেখছি।’

হুজুর নিজে গিয়ে প্রবেশপত্র এনে দিলেন। আমি পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষার বন্ধে মামা আমাকে চোখের ডাক্তার দেখালেন। আমার অনুরোধ উপেক্ষা করে ডাক্তার লিখে দিলেন—চশমা পড়তে হবে। তারপর থেকে চশমা পড়ছি। অস্পষ্ট কিছু দেখি হুজুর চাননি। তিনি চেয়েছেন, যা দেখি আলোর মতো যেন দেখি। চশমায় দেখা পৃথিবীতে আমি নতুন করে হাঁটতে শুরু করলাম।

দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় হলাম। আমার এই দ্বিতীয় হওয়া ৬ নং হুজুরের জন্য ছিলো চমক। সুর ভালো না, স্টাইল ভালো না—তবুও কেমন করে দ্বিতীয় হয়ে গেলাম! দ্বিতীয় হয়েছিলাম দুজন—আমি এবং আবরারুল হক। আবরার সুর, স্টাইল, ইয়াদ সবদিক দিয়ে এগিয়ে। ক’দিন আগেই এক প্রতিযোগিতা থেকে চল্লিশ হাজার টাকা বাগিয়ে এনেছে। তার সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় হয়ে আমি যেন আরও লজ্জায় পড়ে গেলাম।

মাদানীনগর মাদরাসায় হেফজখানার দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা সবচে কঠিন পরীক্ষা। এমন অভিনব পরীক্ষা আমি কোথাও দেখিনি। হাফেজ ছাত্রদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা নেন কিতাব বিভাগের উসতাদ মুহাদ্দিস মাওলানা আমজাদ হুসাইন। তাঁর বাড়ি রংপুর বলে আমরা ডাকি রংপুর হুজুর। প্রথম দেখলেই ভয় ধরে যায়। চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালে কলজে শুকিয়ে যায়। তার পরীক্ষা নেয়ার কোনো নিয়ম ছিলো না। তিনি ইচ্ছেমতো প্রশ্ন করতেন—অমুক আয়াত কয়বার আছে কুরআনে, অমুক জায়গা থেকে পড়ো, কখনো পৃষ্ঠার শেষ আয়াত, কখনো আয়াতে মুতাশাবিহাত, কখনো একটি শব্দ, দুটি শব্দ। প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাতেন আটকাতে, মূলত দেখতেন বাজিয়ে। প্রথমে তিনি তিনটা প্রশ্ন করতেন। তিন প্রশ্নের কোনটায় আটকে গেলে ওই তিন প্রশ্নেই পরীক্ষা শেষ। প্রথম এই তিন প্রশ্ন হয় সাধারণ। এই তিন প্রশ্নে উতরে গেলে শুরু করেন কঠিন প্যাচালো প্রশ্ন। যতক্ষণ আটকানে না যায়।

পরীক্ষা দেবার জন্য রুমে ঢুকার আগে কয়েকবার বুকে থুতু দিলাম। কে যেন বললো, সূরা নূন পড়লে প্রশ্ন সহজ হয়, তা-ও পড়লাম। কিন্তু রুমে ঢুকে তার চশমার ফাঁক দিয়ে তাকানো দেখে অর্ধেক কুপোকাত হয়ে গেলাম। তিন প্রশ্ন নির্ভুল ও নিঃসংকোচে উতরে যাবার পর শুরু হলো খেলা।

‘এখানেই হেফজ শেষ করেছো?’
‘জ্বি না। গ্রামে। খাদেমুল কোরআন হাফেজিয়া মাদরাসায়।’
‘…এই আয়াত কতবার আছে কোরআন শরীফে?’
‘তিনবার।’
‘…এই শব্দটা যত জায়গায় আছে কোরআন শরীফে, তত জায়গা থেকে আধাপৃষ্ঠা করে পড়ো।’
এইভাবে উত্তরের পর উত্তর। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। দশ নাম্বার প্রশ্ন করলেন হুজুর, ‘…এই ছোট্ট আয়াতটি কতবার এবং কোন কোন জায়গায় আছে?’
আমি একটু ইতস্তত করে উত্তর দিলাম, ‘আমার জানামতে দুইবার।’
‘তুমি নিশ্চিত?’
আমি দ্বিধায় হাসলাম, ‘মনে হচ্ছে দুইবার।’
হুজুরও মুচকি হেসে বললেন, ‘যাও।’

এই সন্দেহটুকুর কারণে পরীক্ষা শেষ। আর একটি প্রশ্নও করলেন না হুজুর। আসলে কোরআনে আয়াতটি দু’বার দু’জায়গায়ই আছে। আমি নিশ্চিত করে তা বলতে পারি নি।

দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পুরষ্কার বিতরণের পর একদিন ৬ নং হুজুর ডেকে বললেন, ‘শরীর তো শুকিয়ে কাঠ। দুধ-ডিম খেতে হবে প্রতিদিন। সামনে বেফাক পরীক্ষা।’
আমি মিটিমিটি হাসলাম। আমার জীবনের চরমতম ক্রাইসিস চলছে তখন। একটাকা খরচ করতে গেলে ভাবতে হয় দশবার। আমি খাবো দুধ ডিম!
আমি বলে দিলাম, ‘দুধ খাই না আমি।’
হুজুর বললেন, ‘খেতে হবে। আমি ঠিক করে দিচ্ছি। ১ নং গ্রুপ থেকে প্রতিদিন দুধ এনে খাবি।’
আমি আর হুজুরের কথা ফেলতে পারলাম না। বললাম, ‘জ্বি।’
হুজুর বললেন, ‘প্রতিদিন বিকেলে মশক করবি আবরারুল হকের কাছে। আমি বলে দিবো।’
আমি বললাম, ‘জ্বি।’
হুজুর বললেন, ‘টাকার চিন্তা তুই করিস কেন? তুই শুধু পড়বি।’

হুজুর ছোট মামাকে বলে রোজ দুধের ব্যবস্থা করে দিলেন। শুরু করলাম মশক। সমস্যা হলো—১ নং গ্রপে দুধ আনতে যেতে লজ্জা করতো। কারণ ওই গ্রুপের প্রায় ছাত্র শহুরে, মেধাবী, ধনী। কোথায় কী বোকামি করে ফেলি। গ্রাম থেকে এসেছি বলে আমার মধ্যে একটা হীনমন্যতা কাজ করতো। একদিন দুধ আনিনি। পরদিন ১ নং হুজুর মাওলানা হামিদুল হক সাহেব ডেকে বললেন, ‘গতকাল রাতে দুধ খাসনি কেন?’
মাথা নুইয়ে বললাম, ‘এমনিতেই।’
হুজুর বললেন, ‘আর কোনদিন যেন এমন না হয়।’

দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পর আমার কাছে হুজুরের প্রত্যাশা বেড়ে গেছে। এখন প্রতিটি মাসিক পরীক্ষায় শুধু ভালো রেজাল্ট নয়, পুরষ্কার পেতে হয়। এবারের মাসিক পরীক্ষায় একটু ঝামেলা করে ফেলেছি।

মাসিক পরীক্ষায় মুখে কেউ প্রশ্ন করতো না। দু’জন কি তিনজন হুজুর বসা থাকতেন। তাদের সামনে থাকতো একটি পাত্র। ঐ পাত্রে কোরআনের আয়াত, আয়াতাংশ লিখিত চিরকুট। টোকেনের মতো চিরকুট নিতে হতো। ভাগ্যে যা আছে। তাই কোন হুজুরকে দোষ দেয়া যেতো না যে তিনি কঠিন প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্ন তো নিজ হাতেই আমি তুলেছি!

এবারের মাসিক পরীক্ষায় পুরষ্কার পাইনি। হুজুর ডেকে নিয়ে মাইর দিলেন। কেচকি মাইর। সুস্বাদু এবং ঝাল। ঝালের চোটে জিভ দিয়ে উস উস শব্দ করতে লাগলাম।

এদিকে শেষ হয়ে আসছে আমার হেফজখানার দিন৷ কদিন পরই বেফাক পরীক্ষা। এখনো বোর্ডিংয়ের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। জীবনের চারদিকে এত অন্ধকার জড়ো হয়েছিলো, টাকা পরিশোধ সম্ভব হয়ে উঠছিলো না। এমদাদি খাবারের জন্যও পরামর্শ করা হয়েছিল। হুজুর বলেছিলেন, হেফজখানার ছাত্রদের এমদাদি খাবার দেয়া হয় না। একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মন খারাপ নিয়ে আকাশ দেখি। মনে হয়, এই ঢাকা শহরের মাদরাসায় টিকে থাকা আমার জন্য সম্ভব না। বছর শেষে টাকা পরিশোধ ছাড়া প্রবেশপত্র কোনভাবেই দিবে না। প্রচণ্ড মন খারাপ। লজ্জায় কুঁচকে কুঁচকে যাচ্ছিলাম। সবার হাতে প্রবেশপত্র, আমার হাত খালি।

উদ্ধার করলেন হুজুর। হুজুর নিজের বেতনের টাকা বন্ধক রেখে আমার বেফাক পরীক্ষার প্রবেশপত্র এনে দিলেন। হিসাবরক্ষক বললেন, ‘এই ছাত্র টাকা না দিয়ে গেলে আপনার বেতন থেকে কাটা হবে।’ হুজুর এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। আমাকেও চাপ দেননি। রাজি হয়ে গেলেন। তখন আমার কৃতজ্ঞতার ভাষা জানা ছিলো না, এখনো নেই। এসব ভালোবাসার দাম দেয়া যায় না। পৃথিবীতে সব কিনতে পাওয়া যায়, ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় না।

বেফাক পরীক্ষা হলো। মাদরাসা ছুটির দিন মামা এসে বোর্ডিংয়ের টাকা পরিশোধ করলেন। আমাকে বললেন, ‘এখন মাদানী নেসাবে পড়বি?’ আমি মাদানী নেসাব তখন চিনি না। বললাম, ‘হুজুরকে জিজ্ঞেস করুন।’ হুজুর বললেন, ‘রমজানে হেফজখানার উদ্যোগে হাফেজ ছাত্রদের স্পেশাল কোচিং হবে। উর্দু দুই ক্লাস পড়িয়ে দেয়া হবে দেড় মাসে। রমজানের পর সরাসরি ফার্সিখানায় চলে যাবি। ১২ বছর লাগবে না, ১০ বছরেই মাওলানা হয়ে যাবি।’ আমি তখন এসবের কিছুই বুঝি না৷ অবিশ্বাস্য মনে হলো—দুই বছরের পড়া দেড় মাসে কিভাবে সম্ভব? হুজুর ছোট মামার সঙ্গে কথা বলে আমাকে কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

কোচিং হতো হেফজখানায়। কোচিংয়ে পড়াতেন মাওলানা আমজাদ হুসাইন( রংপুর হুজুর), মুফতি হাবিবুর রহমান (ঝালকাঠির হুজুর), মাওলানা বজলুর রহমান (ভোলার হুজুর), স্যার আবু জ্বর সাহেব। তাদের সঙ্গে ছিলেন মাওলানা আবু মুসআব উসমান এবং মাওলানা উযায়ের সাহেব। আবু মুসআব উসমান সাহেব সে বছরই মাদানীনগর দাওরা শেষ করেছেন৷ বেফাক পরীক্ষায় হয়েছেন দ্বিতীয়। কোচিংয়ের শুরুতে একদিন এসে তিনি হাঁক ছাড়লেন, ‘রাকিবুল হাসান কে?’ আমি হাত তুললাম। তিনি বললেন, ‘বেফাকে তুমি দ্বিতীয় হয়েছো। রেজাল্ট দেখে এলাম।’

বেফাকে এমন রেজাল্ট আসবে, কখনও ভাবিনি। রেজাল্টের খবর শুনে ৬ নং হুজুরের চোখে যে আনন্দ দেখেছি—বিশ্বাস করুন, তার বর্ণনা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম। হুজুরের চোখ ছলছল করছিলো। আমি তখন অনুভব করেছিলাম, চোখেও মানুষের এত মমতা, এত সুন্দর জল, এত চমকিত শিহরণ লুকিয়ে থাকে! আর্থিক সঙ্কট বারবার হারিয়ে দিতে চেয়েছে। হুজুর জিতিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষকদের কি এজন্যই আমরা মা-বাবা বলে থাকি? এভাবে জিতিয়ে দেন বলেই? অদ্ভুত এই পৃথিবী। কাউকে এমনিতেই বাবা ডাকতে ইচ্ছে হয়। কাউকে হাজার জোর করলেও বাবা ডাকতে ইচ্ছে হয় না।

আজ আমার হেফজখানার শেষদিন। বিশাল অনুষ্ঠানে আমাদের মাথায় পাগড়ি এবং হাতে এক জিলদ কুরআন তুলে দিয়েছেন কাকরাইলের মুরুব্বি মাওলানা যুবায়ের সাহেব। সমাপ্তি ঘটলো জীবনের একটি অধ্যায়ের। এবার বিদায়ের পালা। কোরআন এবং একটি পাগড়ি নিয়ে যখন ৬ নং হুজুরের সামনে দাঁড়ালাম, দেখলাম হুজুরের চোখ ছলছলে। খাটে হেলান দিয়ে দু’হাত দুদিকে প্রসারিত করে আনমনে বসে আছেন। আমি বসে আলতো করে ডাকলাম, ‘হুজুর!’
আমার মাথাটাকে কাছে টেনে নিয়ে হুজুর বললেন, ‘এখন কিতাবখানায় পড়বি। বড় মাওলানা হবি। আমাকে ভুলে যাবি?’
আমি ডান হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বললাম, ‘জ্বি না। দোয়া চাই।’

হুজুর টেনে বুকের সঙ্গে লাগালেন আমার মাথা। আমার মনে হলো বিশাল এক আকাশে আমি মাথা রেখেছি। অনুভবের হাজার নীলে ভরে যাচ্ছে বুক। রক্তে ছড়িয়ে পড়ছে শুভ্র মেঘের শীতলতা। তুলোর মতো উড়ে যাচ্ছে সব তুচ্ছতা। তৈরী হচ্ছে সাহসের বিশাল বিশাল মিনার।

হুজুর বললেন, ‘প্রতিবছর বিদায়ের দিন এলে এই বুকে কত মেঘ জমে জানিস?’

আমার কোন উত্তর নেই। তখন বুক ঠেলে উঠে আসছে কান্না। আমি বলছিলাম মনে মনে—হেফজখানার শিক্ষক হবো না। পড়াতে পড়াতে মায়া জন্মে যাবে। তারপর বিদায়ের ক্ষণ এলে কিছু প্রিয় মুখ বিদায় দিতে গিয়ে বুক থেতলে যাবে। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে।

হুজুর আমার চোখের জল তাঁর হাত দিয়ে মুছে দিলেন, ‘তুই কাঁদছিস কেন?’
আমি বললাম, ‘জানি না।’
হুজুর বললেন, ‘অকারণে কেউ কখনো কাঁদে না। কেউ যখন কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে ‘জানি না’, মনে করবি প্রিয় কারো জন্য কান্না করছে। প্রিয় মানুষের জন্য কান্না করলে মানুষ কারণ বলতে চায় না। মনের গভীরে না বলা কারণটা পরম মমতায় পুষে রাখতে চায়। এতেই আনন্দ।’

The post যে জীবন কৃতজ্ঞতার appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0/

No comments:

Post a Comment