আবু সাঈদ:
প্রাচ্যের অধিপতি তখন সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি। ক্রুসেডারদের তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। পুনরুদ্ধার করেন বাইতুল মাকদিসসহ অন্যান্য পূণ্যভূমি। মানচিত্রের বিস্তৃতি তখন চীন থেকে আন্দালুস। ককেশাস থেকে গভীর আফ্রিকা। পুরো সালতানাতকে তিনি ঢেলে সাজান। জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। স্থাপত্যশিল্পে রাখেন অনন্যতার স্বাক্ষর। সভ্যতা-সংস্কৃতিতেও তার জুড়ি নেই। প্রাচ্যের প্রতি তাই মুগ্ধতা সবার। তবে পাশ্চাত্যের মুসলমানদের মুগ্ধতা যেন একটু বেশিই। ধর্মের এত বড় বিজয়ে কার মন হিল্লোলিত না হবে! প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে জুবায়ের তাই অত্যন্ত আগ্ৰহ নিয়ে প্রাচ্য সফর করেন। ভালোলাগার গল্পগুলো আয়েশ করে লেখেন স্ববিস্তারে। সে দিনলিপিগুলোর গ্ৰন্থিত রূপই আজকের রিহলায়ে ইবনে জুবায়ের।
সময়টা ছিলো ৫৮৭ হিজরির ৩০ শাওয়াল। ইবনে জুবায়ের সাবতা বন্দর থেকে রওনা হন। সঙ্গে ছিলো রোমীয় মুসলিম বণীক দল। জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাল উড়ায়। অনুকূল বাতাসে ভেসে চলে পূর্বের দিকে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন দ্বীপে যাত্রা বিরতি। আবার এগিয়ে চলা। বেশ ভালোই কাটছিলো দিনকাল। হঠাৎ একদিন প্রবল ঝড় উঠে দরিয়ায়। তরঙ্গমালা মাতাল হাতে জাহাজ দোলাতে শুরু করে। উপরে তমসাচ্ছন্ন আকাশ। নিচে উত্তাল জলরাশি। সামনে দিকচিহ্নহীন সমুদ্রের চোখ রাঙানি। নাবিকের পক্ষে পাল নিয়ন্ত্রণই কঠিন হয়ে পড়ে। অসম্ভব হয়ে পড়ে দিক নিয়ন্ত্রণও। নাবিকদল তাকদিরের উপরই নিজেদের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেয়। জাহাজ চলতে শুরু করে লক্ষ্যহীন। সবার মাঝে অদমিত এক ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। নিশ্চিত মৃত্যুজ্ঞানে সবাই আল্লাহমুখী হয়। কালেমার ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে চারিদিক। এভাবে জাহাজ চলতে থাকে। উৎকন্ঠার প্রহর গুনতে থাকে যাত্রীদল। এক ভেঙ্গে পড়া নাবিক পাটাতনে দাঁড়িয়ে অজানা শঙ্কায় বিমর্ষিত। ভর দুপুরে এই সান্ধ্য পরিস্থিতি! গন্তব্যে যাওয়ার উপায় কি! সাঁঝ আর কত দেরী! ক্ষণিকবাদে তার চোখে পড়ে দূর দিগন্তে তারাদের ঝিলিমিলি। সন্ধ্যা নেমেছে তবে। বেঁচে থাকার পরম আহ্লাদে আল্লাহু আকবারে নাবিক ফেটে পড়ে। লুটিয়ে পড়ে সেজদায়। গন্তব্য নির্ধারণে তারাদের প্রয়োজন সুবিদিত। তারা দেখে নাবিকদল গন্তব্যে ফেরায় জাহাজের পাল। ওদিকে ঝড়ের গতিও কমে যায়। ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে সব। অতপর পরম আনন্দে সবাই সেজদাতুশ শুকর আদায় করে। ইবনে জুবায়ের আবেগ কাতর হয়ে লেখেন, সেদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমতের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়েই কেবল আমাদের রক্ষা করেছেন। বিপদের এ চরম মূহূর্তে তিনি ছাড়া কেই বা রক্ষা করার ছিলেন আমাদের! ফা লিল্লাহিল হামদ।
অনুকূল বাতাসে জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলতে থাকে। উপরে তারা ঝলমলে আকাশ। সমুদ্রে আচ্ছন্ন অন্ধকার। বড় বড় ঢেউয়ের অসাধারণ ছন্দ। প্রকৃতি বড় প্রেমময় হয়ে ওঠেছে। যেন গেল বেলার ছন্দপতনেরই প্রতিবিধান। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সবাই স্থিরচিত্তে সমর্পিত হয় বিছানায়। সুখনিদ্রায় কেটে যায় পুরোটা রাত। ঘুমের মধুময় আবর্তে ক্লান্তি-ক্লেশ সব দূরীভূত হয়। নতুন করে শুরু হয় অপেক্ষার আরেকটি দিন। মাস ঘনিয়ে এলেও কাছে আসে না তীর। ভাবালুতায় দৃষ্টি ঘোলা হয়ে আসে।
দূর আকাশে রাঙা হয়ে ওঠেছে সূর্য। সূর্যকে আরো রাঙা করে তোলে দূর দিগন্তে ক্ষুদ্রকায় ভেসে উঠা ইস্কান্দারিয়ার সুদৃশ্য মিনার। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে মিনারের পূর্ণ অবয়ব। সবার চেহারায় অপার্থিব দ্যুতি খেলে যায়। অমলিন আনন্দে নেচে ওঠে দেহমন। ইস্কান্দারিয়ার এই মিনার ১৩০ কি.মি. দূর থেকেই দেখা যায়। গন্তব্যের নিকটবর্তী হতে পেরে সবাই আল্লাহর শোকর আদায় করে। নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর মিনতি জানায়।
প্রাচ্য সফরের শুরুতেই ইবনে জুবায়ের ইস্কান্দারিয়া সফর করেন। প্রাচ্যের রাণী খ্যাত এই নগরী তাকে দারুণ মুগ্ধ করে। তার প্রশস্ত সড়ক, সুউচ্চ ভবন, নানান সৌধ তাকে প্রীত করে। আহ্লাদিত করে স্থানীয়দের আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ। শহরটি প্রাণোচ্ছল নীলনদের তীরঘেঁষে দাঁড়িয়ে। উত্তাল ঊর্মিমালা ক্ষণে ক্ষণে আছড়ে পড়ে তার পাদদেশে। সৃষ্টি করে অসাধারণ ছন্দ। প্রবাহিত করে স্নিগ্ধ হিল্লোল। পর্যটকরা এখানে এসে প্রাণ জুড়ায়। অবগাহন করে নদসৌন্দর্যে। শহর-লয় রোধে তাতে কংক্রিটের গভীর বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে আইয়ুবী সালতানাত। ঢেলে দেয় আইয়ুবী স্থাপত্যের সকল সৌকুমার্য। ফলে সৌন্দর্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। বৃদ্ধি পায় পর্যটকদের আকর্ষণ। নদসৌন্দর্য আর স্থাপত্য সৌকুমার্য প্রেমীদের ভীড়ে বছরের প্রায় পুরোটা সময়জুড়ে তা প্রাণবন্ত থাকে।
ইবনে জুবায়ের বলেন, সবকিছু ছাপিয়ে ইস্কান্দারিয়ার যে সৌন্দর্য সবচে হৃদয়কাড়া, তা ইসকান্দারিয়ার বিখ্যাত মিনারের দৃশ্য। এটা সপ্তাশ্চর্যের পর্যায়ভুক্ত। বিশালকায় এ মিনারটি ফারুস দ্বীপের তীরঘেঁষে অবস্থিত। শামুকাকৃতির অভিনব স্থাপত্যের এক সুদৃশ্য ভবনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। চারতলা বিশিষ্ট ভবনটির নিচ তলায় আছে ছোট ছোট অনেক কুঠির। তিনশ’ সৈনিক তাতে অবস্থান নিতে পারে। দ্বিতীয় তলা লম্বা হয়ে তৃতীয় তলায় পৌঁছে গেছে। এটা অনেকটা গোলাকৃতির। এর উপরের তলায় রয়েছে মিনার। মিনারে একটি আশ্চর্য প্রকৃতির আয়না আছে। মধ্য সাগরের জাহাজও তাতে ভেসে ওঠে। তিনদিক সাগরে বেষ্টিত এ নগরে বসেই সমুদ্রে শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া রাত্রিবেলায়ও মিনারটি দিনের মতো আলোকিত রাখা হয়। যাতে কালোর ছড়াছড়ির সুযোগ কেউ না নিতে পারে। ঐতিহাসিকগণ আজও
অবাক বিস্ময় প্রকাশ করেন এই আশ্চর্যতম শিল্পে। কিন্তু তার রহস্য উদঘাটনে আজো সমর্থ হননি।
এই মিনারের উপর তলায় একটি মসজিদ আছে। সেখানে নামাজ পড়ার প্রতি মানুষের তীব্র আগ্ৰহ। যে সেখানে নামাজ পড়তে পারে, নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে করে। ইবনে জুবায়ের বলেন, আমরাও মনের মাধুরী মিশিয়ে সেখানে দুই রাকাত সালাত আদায় করতে পেরেছি। ফা লিল্লাহিল হামদ।
কালের এই অবাক বিস্ময় ৭০২ হিজরীতে মামলুক সুলতান নাসির ইবনে কালাউনের শাসনামলে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এর উপরই গড়ে ওঠে আজকের বিখ্যাত কায়েতবাই দুর্গ। মামলুক সুলতান আশরাফ আবু নাসের তা নির্মাণ করেন। কালের সাক্ষী হয়ে আজো তা স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
ইবনে জুবায়ের বলেন, ধার্মিকতার দিক দিয়েও ইস্কান্দারিয়া অনেক এগিয়ে। মানুষজন ধর্মের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাশীল। তাদের চলাফেরা, আচার-আচরণে ধর্মীয় আভিজাত্য প্রকাশ পায়। শহরটিতে অনেক মাদ্রাসা রয়েছে। এসবের ব্যবস্থাপনাও খুব সুন্দর। মাদ্রাসায় বিভিন্ন বিষয়ের শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞগণ আছেন। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে আসে। নিজ পছন্দের বিষয়ে দীক্ষা গ্রহণ করে। তাদের নাওয়া-খাওয়া সালতানাতের পক্ষ থেকেই বন্দোবস্ত হয়। তাদের জন্য রয়েছে আলাদা হাসপাতাল। সবসময় অভিজ্ঞ চিকিৎসগণ উপস্থিত থাকেন। তাদের অধ্যয়নের জন্য রয়েছে বিশাল কিতাবকানন। সবসময় অধ্যয়নের অবারিত সুযোগ। রয়েছে নগর জীবনের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও।
ইবনে জুবায়ের বলেন, ইস্কান্দারিয়া শহরে প্রচুর পরিমাণে মসজিদ রয়েছে। প্রতিটি মসজিদেই রয়েছে স্থাপত্য শিল্পের অভিজাত ঢঙ। মসজিদের প্রাচুর্যে শহরটি মসজিদ নগরী হিসেবেই খ্যাত। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় বার হাজার মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি মসজিদে রয়েছে একাধিক ইমাম। প্রত্যেকের বেতন ভাতা সালতানাতের পক্ষ থেকেই আদায় করা হয়। একেকজন ইমামকে আইয়ুবীয় পাঁচ দিনার(বর্তমানের ১২০০ ডলার) করে সম্মানী দেওয়া হয়। অবস্থাভেদে কাউকে আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মসজিদের ইমামকে সর্বোচ্চ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়।
ইবনে জুবায়ের আন্দালুসের সন্তান। সেখানে মানুষজন রাতের পরিবেশে কর্মব্যস্ততা রাখে না। রাত গভীর হলে ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যায়। রাতের কর্মব্যস্ততা তাই তাকে অবাক করে। এজন্য ইস্কান্দারিয়ার রাতের কর্মব্যস্ততাকে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। বলেন, এদেশের মানুষ রাতকেও দিনের মতো কর্মচঞ্চল করে রাখে।
The post পর্যটক ইবনে জুবাইরের বয়ানে ইস্কান্দারিয়ার ঐতিহ্য appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%95-%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%9f%e0%a6%be/
No comments:
Post a Comment