Tuesday, December 7, 2021

কবি, কবিতা ও কুরআনের কাব্যানুবাদ: ইসলামের প্রশ্ন কীসে?

মুহিব্বুল্লাহ বিন বাশার:

কুরআন ও হাদিসে কবি ও কবিতার নিন্দা

কবিদের নিয়ে কুরআনে আলোচনা এসেছে সুরা শুয়ারায়৷ আল্লাহ বলছেন, ‘আর কবিগণ—তাদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত মানুষেরা৷’ (সুরা শুয়ারা, ২২৪) কবিতা বিষয়ে রাসুল সা. বলেছেন, ‘কবিতা দিয়ে তোমাদের পেট ভরার চেয়ে পুঁজ দিয়ে পেট ভরা উত্তম!’ (মুসলিম, ২২৫৭) আচ্ছা, তাহলে তো বুঝতে পারছি, কবিরা খুব খারাপ আর কবিতাও খুব মন্দ কিছু! কিন্তু কেন?

শেয়ের বা কবিতা

তাহলে প্রথমে কবিতা নিয়েই একটু জানতে হয়! কুরআনে ‘কবিতা’ বলতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘শেয়ের’ শব্দটি৷ আর ‘শেয়ের’ শব্দটি এসেছে ‘শুয়ুর’ থেকে। অর্থ : অনুভব, উপলব্ধি৷ আর যদি ব্যাবহারিক অর্থ জানতে চাই, ইবনে খালদুনের ভাষায়, ‘শেয়ের হল ছন্দবিশিষ্ট রূপক ও গুণবাচক অলঙ্কৃত বাক্য, যার প্রতিটি শব্দ অভিপ্রেত ও আরবির বিশেষ ধারায় আবদ্ধ৷ সহজ বাংলায়—কবিতা হল ছন্দময় বিন্যাস, যা একজন কবির আবেগউত্থিত অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তাকে প্রকাশ করে৷

কবিতার মূলকথা

মূলকথা হল, কবিতা বা শেয়ের দুইটি বিষয়ের সমষ্টি : ভাব ও ছন্দ; তবে ভাবটাই প্রধান৷ কারণ, শেয়ের নামকরণ হয়েছে অনুভব থেকে; তবে কবিতা সবসময় ছন্দময়। আর ছন্দকাঠামো ভাষা, সময় ও ব্যক্তিভেদে বারবার ভেঙেছে ও গড়েছে৷ রবি ঠাকুর বলেন, ‘তবে ছন্দটাই যে ঐকান্তিকভাবে কাব্য, তা নয়। কাব্যের মূল কথাটা আছে রসে; ছন্দটা এই রসের পরিচয় দেয় তার অনুষঙ্গ হয়ে।’

আর আধুনিক কবিতায় এসে কোনো কোনো ভাষায় কবিতার ছন্দপতন হয়েছে ৷ ধ্রুপদী ছন্দের বাইরে নতুনভাবে যোগ হয়েছে ‘গদ্যছন্দ’৷ অধুনা কবিরা ছন্দের ঝনঝনানির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ব্যক্তিগত বোধ ও কাব্যিক ব্যঞ্জনায় কবিতায় উন্নীত করতে৷

ছন্দ, না ভাব

তাহলে বোঝা গেল, কবিতার মূল তত্ত্ব দাঁড়ায়—ভাব, কল্পনা ও রসে; মোটকথা বিষয়বস্তুতে৷ এ বিবেচনাতেই রাসুলের অন্য একটি হাদিস থেকে জানা যায়, একবার তাকে শেয়ের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘শেয়ের সাধারণ কথার মতোই। ভালো হলে ভালো৷ মন্দ হলে মন্দ৷’ (আল আদাবুল মুফরাদ, ৮৬৫)
তাই শেয়ের বা কবিতা সত্তাগত ভাবে মন্দ না৷ কবি বলতেই পথভ্রষ্ট না৷ কুরআন ও হাদিসের ভাষ্যগুলোতে প্রকৃতঅর্থে বিশেষ দলগোষ্ঠীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে৷ কারণ, একটি হাদিসে রাসুল বলেন, ‘নিশ্চয়ই কিছু কবিতা আছে প্রজ্ঞাপূর্ণ৷’ (সাহিহ বুখারি ৬১৪৫)

নিন্দার কারণ

আমরা দেখতে পাই, কুরআন ভ্রান্ত কবিদের নিন্দাবাদ করে তার কারণও বর্ণনা করেছে—‘তুমি কি দেখ না, তারা প্রতিটি উপত্যকায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘোরাফেরা করে? আর তারা সেসবই বলে, যা তারা করে না৷’ (সুরা শুয়ারা ২২৫-২২৬) বোঝা যাচ্ছে, ‘অবাস্তব কথা বলা’ ও ‘উদ্ভ্রান্ত ঘোরাফেরা করা’ কবিদেরকে নিন্দাবাদের প্রধান কারণ৷

ঈমানদার কবির কথা ভিন্ন

পাশাপাশি কুরআনে ঈমানদার কবিদের এই নিন্দাবাদ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রেখে বলা হয়েছে—‘তবে তাদের কথা ভিন্ন—যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎকর্ম করেছে এবং আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ রেখেছে, নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ নিয়েছে। জালেমরা শীঘ্রই জানবে, তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়!’ (সুরা শুয়ারা, ২২৭)

কবিতায় যা নিষিদ্ধ

তাহলে একথা তো নিশ্চিন্তে নিশ্চিত হয়ে বলা যায়, ছন্দোবদ্ধ বাক্যের ব্যাপারে ইসলামের কোনো রকম সংঘাত নেই৷ সংঘাত কেবল বাস্তবতাবিমুখ অসম্ভব কথকতা, বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যাপূর্ণ গল্প সাজানো এবং কল্পনাপ্রসূত কথা বলার সাথে৷ আর যেসব কবি এই দোষে দুষ্ট তাদেরকে কুরআন উদ্ভ্রান্ত বলে ঘোষণা করেছে এবং হাদিসে সেই শেয়ের থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে৷

আর মিথ্যা, অনুমান ও অবাস্তব কথায় বিভ্রান্ত করা ইসলামে বরাবরই নিষিদ্ধ—চাই সেই কথা ছন্দ ও সুর দিয়ে বলা হোক কিংবা গদ্যের সাধারণ ভঙ্গিমায় বলা হোক৷, অথবা পত্রে ও লিখিত বলা হোক; এটাই শরিয়তের সীমারেখা৷ এটাকে উপেক্ষা করা কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয়৷

কবিতা ও রাসুল

তবে রাসুলকে কবিতা থেকে দূরে রাখা হয়েছে কেন! তা ভিন্ন কারণে৷ আল্লাহ বলছেন, ‘আর আমি তাকে শেয়ের শিখাইনি আর এটা তার জন্য উচিত হবে না৷ কারণ, এটা কেবল উপদেশবাণী স্পষ্ট কুরআন৷’ (সুরা ইয়াসিন, ৬৯)

রাসুল ছিলেন উম্মি তথা পড়ালেখা জানতেন না৷ তিনি বলতেন আল্লাহর ওহির কথা৷ কিন্তু তারপরও কাফেররা বলত, এসব তুমি বানিয়ে বানিয়ে বলছ৷ আর যদি তিনি শেয়ের পারতেন, তাহলে তো কাফেরা আরও বেশি জোর দিয়ে বলত—‘কোনো সন্দেহ নেই, এটা তোমার বানানো’ অথবা বলত—‘এর কিছু অংশ তোমার বানানো’৷ প্রকৃত বিষয় হল, আল্লাহ তায়ালা ওহির হেফাজত ও তা পাকাপোক্ত করার জন্যই রাসুলকে শেয়ের শেখাননি৷ আর আল্লাহ যদি রাসুলকে শেয়ের শেখাতেন, তাহলে তা ভালো করেই শেখাতেন! তিনি বেশ অলঙ্কারপূর্ণ কবিতা রচনা করতেন৷ তখন মানুষের জন্য বোঝা মুশকিল হত—কোনটা তার শেয়ের আর কোনটা আল্লাহর ওহি!

কুরআন কবিতা নয়

আর কুরআনও কবিতার অনুরূপ নয়৷ কুরআনের তাল-লয়-মাত্রা কোনো কবিতার সাথে মেলে না৷ কুরআনের ছন্দ-অনুপ্রাস অনন্য—না গদ্য, না পদ্য, না গীত, পুঁথি কিংবা গজল; সব কিছু থেকে আলাদা৷ একদম ভিন্ন, যেন কেউ কবিতার ছন্দ দিয়ে কুরআনকে মাপতে না পারে৷

কুরআন অনুবাদ

পরের কথা কুরআনের অনুবাদ নিয়ে! নানা বিতর্ক থাকলেও শেষ কথা এই, কুরআনের অর্থের অনুবাদ করা বৈধ৷ সেটা যেকোনো ভাষায়৷ আর প্রতিটি ভাষা পদ্য ও গদ্যে বিভক্ত৷ গদ্যসাহিত্যে কুরআনের অর্থের অনুবাদ বৈধ হলেও অনেকে দাবি করেন, পদ্যসাহিত্যে অনুবাদ বৈধ নয়৷ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, কুরআন শেয়েরের নিন্দা করেছে, আবার সেই নিন্দিত সাহিত্যে কুরআন ভাবানুবাদ করা হবে! অনেকে বলেন, কুরআন কাব্য নয় যে, কাব্যানুবাদ হবে! তবে তো কুরআন ঠিক গদ্যও নয়; তবে কি তা আমরা গদ্যেও ভাবান্তরই করছি না? তবে কব্যের কী দোষ? তাহলে কি আমরা ছন্দকেই দোষ দিচ্ছি কেবল? অথচ কুরআন তো অনুপম ছন্দময়৷ তবে কি আমরা কাব্য আর ছন্দ—দু-ইকে গুলিয়ে ফেলছি?

কুরআনের বিষয়

কুরআন কোথাও কবি ও কবিতাকে ছন্দের জন্য মন্দ বলেনি৷ বলেছে, ভাব ও বিষয়বস্তুর জন্য৷ আর কুরআনের কাব্যানুবাদে ভাব মন্দ হওয়ার সুযোগ নেই৷ কারণ, এর ভাব তো পবিত্র কুরআনের৷ এতে যুক্ত হচ্ছে কেবল ছন্দময় বা পদ্যনির্ভর সাহিত্যশ্লিষ্ট অনুবাদ৷ অতএব বুঝতে পারি, কুরআনের ভাব ঠিক রেখে ছন্দময় সাহিত্য-অনুবাদ করতে কোনো বাধা নেই৷ কারণ, কুরআনের নিন্দাবাদ কবিতার বিষময় ভাবে, ছন্দে নয়!

কাব্য ও ছন্দ

তবে অনেকের প্রশ্ন, যেখানে ভাব নির্মাণের সুযোগ নেই, সেটা কাব্য বা কবিতা হয় কী করে? এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো, কবিতার অনুবাদও তো হয়—এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়; সেখানে ভাষান্তরকারী সাধারণত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিন ভাষার ‘কবিতা’কেই তো বাংলায় রূপ দেন এবং নতুন ভাবের কিছু সেখানে থাকে না৷ অথচ ভাবটি বাংলায় রূপদানকারীর না হয়েও তো সেটাকে আমরা বলি অনুবাদ-কবিতা! তাই, যা কাব্যানুবাদ তা মূলত ছন্দানুবাদই; আর সে অবস্থায় একে ‘কাব্যনুবাদ’ বলা দোষের কেন?
শেষ কথা

তবে হ্যাঁ, কাব্য বা পদ্যের কোনো সীমাবদ্ধতা যদি কুরআনের অর্থের অনুবাদ করতে ব্যর্থ হয়, সেটা সাহিত্যিকের অপারগতা কিংবা সাহিত্যধারার দুর্বলতা; ছন্দ ও পদ্যের দোষ নয়৷ তাই যে ধারা ও সাহিত্যে কিংবা যার সাধ্যে পূর্ণ মান ঠিক রেখে কুরআনের ছন্দিত রূপান্তর সম্ভব নয়, তার জন্য তা অবশ্যই বর্জনীয়৷ তবে মূলগতভাবে কাব্যিক ছন্দে কুরআন বোধগম্য করে অনুবাদে নিষেধাজ্ঞার গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ নেই৷

The post কবি, কবিতা ও কুরআনের কাব্যানুবাদ: ইসলামের প্রশ্ন কীসে? appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%93-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af/

No comments:

Post a Comment