Monday, May 11, 2020

ব্যক্তিবিশেষের ত্রুটি: আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বন্ধ হোক ট্রল

আবু হানিফ সাদী আযহারী:

আজ থেকে ১০৮০ বছর পূর্বে, আরবি ৩৬১ হিজরী সনের ৭ই রমযান শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তৎকালীন ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ লিদ্বীনিল্লাহর নির্দেশে তার সেনাপতি জওহর আস-সিকিল্লি ফাতেমীর তত্বাবধানে মিশরের রাজধানী কায়রোর বুকে আল-আযহার মসজিদটি শিয়া ইসমাইলিইয়া মতবাদ প্রচারের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷

পরবর্তীতে মিশর থেকে ফাতেমীয় খেলাফত উচ্ছেদের পর ৫৮৯ হিজরিতে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তা বন্ধ করে দেন। প্রায় শত বছর বন্ধ থাকার পর ৬৭২ হিজরিতে মামলুক সুলতান বাইবার্সের শাসনামলে সুন্নি আকিদার উপর পুনরায় চালু হয় আযহার মসজিদ। সেই থেকে অদ্যবধি পৃথিবীর মানচিত্রে প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে ওলামায়ে কেরাম কাবাতু্ল ইলম বলে সম্বোধন করেন। এটি কোন ব্যক্তিবিশেষের নির্দিষ্ট মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে বিশ্ব মানচিত্রে জ্ঞানের মশাল ছড়িয়ে আসছে।

বিশেষ করে ৬৫৬ হিজরিতে যখন তাতারীরা মুসলমানদের যুগ যুগ ধরে লালিত সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ও মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র বাগদাদ ও মা ওরাউন নাহার এর শহরগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে মহাশ্মাশানে পরিণত করেছিল, তখন একমাত্র আযহার ও আযহারীরাই মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও ঐতিহ্য রক্ষা করেছিল৷

বর্তমানকালে আযহার আধুনিক বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে মৌলিক তেইশটি অনুষদ ও শতাধিক বিভাগ (যা বিভিন্ন জেলায় পুনরাবৃত্ত হয়ে মোট ৮৯ টি অনুষদ ও ৩৫৯ এর অধিক বিভাগ) পরিচালনা করে। প্রায় ৫ লক্ষ শিক্ষার্থী, ১৫০০০ শিক্ষক ও ১৩ হাজারের অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং হাজার হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে৷ পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ আযহারী ও সুন্নী মুসলমানদের অভিভাবকে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ১০৫ টির অধিক রাষ্ট্রের প্রায় ৪০ হাজার বিদেশী শিক্ষর্থী দ্বীনি ইলম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখছে। আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী স্কলারশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। তেমনি ভাবে যেসকল রাষ্ট্রে ধর্মীয় শিক্ষার অভাব রয়েছে সেখানে আযহারের নিজস্ব অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম চলে আসছে। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও মুসলিম ইস্যুগুলোতে সভা-সেমিনার ও স্মারক প্রকাশ করা সহ সর্বময়ী আযহার তার প্রতিটি কর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে ইসলামের ঝান্ডা বুলন্দ করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আযহারের আকিদার ভিত্তি

আযহারের আকিদার ভিত্তি হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত, যা আল-আশআরি ও আল-মাতুরিদিদের ধর্মতাত্ত্বিক মাযহাবসমূহ ও সুন্নি ইসলামি আইনশাস্ত্রের চারটি মাযহাব (হানাফি, মালেকি, শাফেঈ এবং হাম্বলি) এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক পদ্ধতিতে নীতিগতভাবে তাসাউফ ও আখলাকের চর্চা করে থাকে।

আযহার বিশ্বের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে প্রত্যেক মাযহাবের ছাত্রদেরকে আলাদা আলাদাভাবে তার মাযহাবের ফিকহ ও উসুলুল ফিকহ ঐ মাযহাবের উপর বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হয়৷

আযহারের একটি স্বতন্ত্র ধারাও রয়েছে তা হচ্ছে- ওসাতিয়্যাহ (মধ্যপন্থা), অর্থাৎ কোন বিষয়ে় বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি না করা এবং সমাজের প্রচলিত মাযহাবের বিরোধিতা করে ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে ঐক্যের দিকে আহ্বান করা, ধর্মীয় উগ্রতা পরিহার করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা, তেমনিভাবে সকল মাযহাবের লোকজনের প্রতি সম্মান প্রদান করে প্রত্যেককে স্বাধীন ভাবে স্বীয় মাযহাব পালনে বাধা না দেয়া।

আযহারে লা-মাজহাবীদের কোন স্থান নেই। সেখানে ভর্তি হতে হলে কোন এক মাযহাব মেনেই ভর্তি হতে হয়; অন্যথায় ভর্তি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। এ পর্যন্ত যে কয়জন শায়খুল আযহার অতিবাহিত হয়েছেন প্রত্যেকেই কোন এক মযহাবের অনুসারী ছিলেন। ১০৯০ হিজরীতে শায়খুল আযহারের পদটি সৃষ্টি হওয়ার পর অদ্যাবধি পর্যন্ত ২১ জন শাফেঈী, ১১ জন হানাফী এবং ১১ জন মালেকী মাযহাবের শায়খুল আযহার ছিলেন। বর্তমান শায়খুল আযহারও মালিকী মাযহাবের অনুসারী এবং একজন সূফী সাধক ৷

আবার অনেককেই বলতে শুনেছি যে- আযহার শিয়া মতবাদের প্রতিনিধিত্ব করে; বিষয়টি একেবারেই বাস্তবতা বিবর্জিত। আজহার সবসময়ই শিয়া ও যে কোন বাতিল মতবাদের বিপক্ষে কঠিন পদক্ষেপ রাখে। কোন ছাত্রের যদি শিয়া অথবা কোন চরমপন্থী সংস্থার সাথে যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় তাৎক্ষণিক তাকে আযহার থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারপরও যদি কোন লা-মাযহাবী বা শিয়া প্রতিনিধি নিজেদের পরিচয় গোপন করে সেখানে পড়ে এবং পরবর্তীতে নিজেকে আযহারী বলে দাবী করে নিজস্ব মতবাদের প্রচার করে ও মানুষকে সেই দিকে আহ্বান করে, তার দায় কখনো আযহার বিশ্ববিদ্যালয় নিবেনা, বরং তিনি বিপদগামী আযহারী হিসেবেই বিবেচিত হবেন৷

আযহার সম্পর্কে আরেকটি চরম মিথ্যাচার হল, যা অনেকে বলে বেড়ান, আযহারে নাকি অমুসলিম শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করে, সেইসাথে অমুসলিম অনেক শিক্ষকরা পাঠদান করে থাকে। অত্যন্ত হাস্যকর ও পরিতাপের বিষয় হলো, যেখানে আজহারের প্রতিটি ছাত্র মানেই কিতাবুল্লাহর হাফেজ সেখানে তাদের সম্পর্কে অমুসলিম বলাটা কি তাদের বিবেককে একটুও নাড়া দেয় না? তারা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী শুনেনি “ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনে যাচাই-বাছাই ছাড়া তাই বলে বেড়ায় ?’’ যেখানে একজন শিক্ষক ইলমের প্রচার-প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করে দেন, তাদের ব্যাপারে এমন মন্তব্যকারীদের কি ভাষায় সম্বোধন করব তা আমার জানা নেই।

আযহার নিয়ে অনেকে আরেকটি বিভ্রান্তিকর মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে যে আযহারে নাকি ছেলেমেয়ে এক সাথে ক্লাস করে, অথচ আযহার কখনোই সহশিক্ষায় বিশ্বাসী নয়৷ বরং মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাম্পাস তৈরি করেছে, যাকে “জামিয়াতুল আযহার বানাত” নামে অভিহিত করা হয়। তেমনিভাবে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই আযহার মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুলের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে তাদের নিরাপত্তার সাথে পড়াশোনার গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য যাবতীয় সকল সুব্যবস্থা রয়েছে যা ছেলেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান। তাপরও যারা সঠিক তথ্য না জেনে বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আযহার সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেন তাদেরকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম৷

আযহারে মোট পড়াশোনার স্তর রয়েছে সাতটি :

১. ইবতেদায়ী বা প্রাথমিক ছয় বছর।
২. ই’দাদী বা মাধ্যমিক তিন বছর।
৩. সানাভিয়া বা উচ্চ মাধ্যমিক তিন বছর।
৪. কুল্লিয়া বা অনার্স চার বছর।
৫. দিরাসাত উলিয়া বা মাস্টার্স দুই বছর।
৬. এমফিল গবেষণা ৩ – ৫ বছর।
৭. ডক্টরেট ৩ – ৫ বছর।

অর্থাৎ প্রথম থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়তে আঠার বছর এবং এমফিল ও ডক্টরেট গবেষণার জন্য প্রয়োজন আট ‍-দশ বছর।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল- মিশরীয় একজন ছাত্রের জন্য আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই পুরো কোরআন শরিফ হিফজ করা আবশ্যক, যা প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমাপ্ত হয়৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরে পুনরায় পুরো কোরআন শরীফ মুরাজাআ করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে- সকল মিশরীয় আযহারীই কোরআনের হাফেজ ৷ তবে বিদেশী অনারব ছাত্রদের জন্য পুরো কোরআন শরীফ মুখস্ত করা আবশ্যক না হলেও প্রতিবছর এক পারা মুখস্ত করে লিখিত ও মৌখিক দুভাবেই পরীক্ষা দিতে হয়।

অনেকে ধারণা করেন- আযহারে শুধু ধর্মীয় বিষয়ে পড়ানো হয় বা আযহারে পড়লেই ধর্মীয় বিষয়ে বিজ্ঞ হয়ে যায়, ধারণাটা ঠিক নয়। কেননা সূচনালগ্নে আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ৩টি ধর্মীয় অনুষদ তথা ধর্মতত্ত্ব অনুষদ, শরিয়া অনুষদ ও আরবি ভাষা অনুষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ১৯৬১ সালে আল আযহার একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ফলে বর্তমানে সর্বমোট ২৩ টি অনুষদে শতাধিক বিভাগ নিয়ে বিশ্ব সুন্নী মুসলিমদের জন্য জ্ঞানভান্ডারের মার্কাযে পরিনত হয়েছে৷ তম্মধ্যে ৬ টি অনুষদ, ২১ টি বিভাগ ধর্ম সম্পর্কিত , বাকিগুলো জেনারেল বিভাগ ।

বলাবাহুল্য, আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্র যে অনুষদেই অধ্যয়ন করুক না কেন, যেহেতু তাদের অধীনে পরিচালিত প্রাইমারি,মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোরআন শরীফ মুখস্ত ও ব্যক্তি পর্যায়ের প্রয়োজনীয় সমস্ত ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কুরআন-হাদীস ও ধর্মীয় আবশ্যকীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাই প্রত্যেক আযহারীই ধর্মীয় বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখেন।

ধর্মীয় ছয়টি অনুষদ হল

১. faculty of Islamic jurisprudence and law.
শরিয়া ও আইন অনুষদ।
২. faculty of Islamic theology.
ধর্মতত্ত্ব অনুষদ।
৩. faculty of Arabic language.
আরবি ভাষা অনুষদ।
৪. faculty of Islamic studies and Arabic.
ইসলামি শিক্ষা ও আরবি অনুষদ।
৫. Islamic Call College
ইসলামী দাওয়া অনুষদ।
৬. faculty of Islamic science
ইসলামী বিজ্ঞান অনুষদ।

আমাদের বাংলাদেশী ছাত্ররা সাধারণত এই ছয়টি অনুষদে পড়ার আগ্রহেই সুদূর মিশরে পাড়ি জমান৷ এই ছয় অনুষদের ছাত্ররা তাদের বিভাগ অনুসারে কেউ অনার্স তৃতীয় বর্ষ বা কেউ মাস্টার্সে গিয়ে নিদৃষ্ট বিষয়ে তাখাসসুস করেন। তবে প্রত্যক বিভাগেই বিশেষায়িত বিষয়াবলীর বাইরেও কিছু মৌলিক দ্বীনি বিষয়াবলী রয়েছে যেমন: কোরআন শরিফ হিফজ, হাদীস, তাফসীর, নাহু-ছরফ, ফিকহ-উসুলুল ফিকহ, বালাগাহ ইত্যাদি৷

একজন ছাত্র যখন শরিয়া অনুষদে পড়বে সে ফিকহ সম্পর্কিত সবকিছু খুটিনাটিসহ পড়বে এবং অন্য অনুষদের নাহু সরফ, বালাগাত, হাদীস ও তাফসীর আংশিক পড়বে । তেমনি ভাবে যিনি ধর্মতত্ত্ব অনুষদের হাদীস বিভাগে পড়বেন তিনি হাদিস সম্পর্কিত সবকিছু খুটিনাটিসহ পড়বেন এবং অন্য অনুষদের নাহু -সফর, বালাগাহ, ফিকহ-উসুলুল ফিকহ আংশিক পড়বে৷ একটি কথা স্বরণ রাখতে হবে, যে যে বিষয়ে পড়বেন তিনি সেই বিষয়েই পারদর্শী হয়ে উঠবেন এবং সে বিষয়ে কথা বলার অনুমতি পাবেন। এক বিষয়ে পড়াশোনা করে অন্য বিষয়ে কথা বলার অনুমতি নেই৷

আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশীরা যা পড়ে

প্রথমত বাংলাদেশ থেকে দুধরণের ছাত্র আযহারে পড়তে আসেন। এক. আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করে। দুই. কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাশ করে। বাংলাদেশের আলিয়া হোক বা কওমী হোক, তার সনদপত্র দিয়ে সরাসরি আযহারের অনার্সে ভর্তি হলেও প্রথমে তাকে ভাষা দক্ষতায় উত্তীর্ণ হতে হয়। অথবা কেউ চাইলে মাধ্যমিক স্তর শেষ করেও অনার্সে ভর্তি হতে পারেন। উভয় ক্ষেত্রেই তাকে অনার্স পর্যন্ত পৌঁছতে এক বছর বা কারো ক্ষেত্রে এরচেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।

অনার্স কোর্স চার বছর মেয়াদি। সাধারণত সব মিলিয়ে অনার্স কোর্স সম্পন্ন করতে পাঁচ-ছয় বছর প্রয়োজন হয়৷ অনার্স সম্পন্ন করার পর আবার বিপত্তি ঘটে মাস্টার্সে ভর্তির ক্ষেত্রে। কেননা আযহারে মাস্টার্স কোর্সে মাস্টার্স তামহিদী ও এমফিল গবেষণা একসাথে করতে হয়। শুধু দুই বছরের তামহিদী মাস্টার্স করলে কোন সনদ পাবেনা, বরং সেইসাথে এমফিলও করতে হবে। মাস্টার্সে কৃতকার্য হওয়া অনার্স স্তর থেকেও বেশি কঠিন। এক্ষেত্রে কারো কারো দু বছরের তামহিদী ৩-৫ বছরও লেগে যায়। তারপর ৩-৫ বছর সময় নিয়ে এমফিল গবেষণা, সব মিলিয়ে মাস্টর্সেই এমফিলসহ ৫-৮ বছর সময় লেগে যায়। ফলে শতকর ৯০% ছাত্র এখানেই ঝরে যান বা অনার্সের পর অন্যত্র চলে যান।

এখানে একটা বিষয় ভালভাবে বুঝতে হবে যে, আযহারে কোন বিষয়ে পারদর্শী হওয়া বা মুতাখাসসিস হওয়ার মূল পড়াশোনা শুরু হয় মাস্টার্স থেকে এবং এর জন্য প্রচুর পরিমাণ ধৈর্য্য ও সুদীর্ঘ অধ্যাবসায়ের প্রয়োজন ৷ এখন যিনি আযহারের প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাস ১৮ বছর এবং গবেষণার ৮-১০ বছর, মোট ২৬-২৮ বছর সিলেবাসের পূর্বাপর পড়েননি, মাঝখানে মাত্র ৪/৫ বছর পড়লেন, তারপক্ষে আযহারের মূল শিক্ষা গ্রহণ করা বা কোন বিষয়ে পারদর্শী হওয়া কখনোই সম্ভব নয়৷ এমনকি অনেকের পক্ষে আযহারের মানহাজ অনুধাবন করতে পারাই কষ্টসাধ্য হয়। ফলত অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আযহার থেকে অনার্স কোর্স সম্পন্ন করেও বিভিন্ন কারণে এর মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যান। এখানে আযহারের দোষটা কি? বা আযহার তার দায়ভার কেন নিবে? আপনারাই বা আযহারকে নিয়ে কেন ট্রল করবেন?

কেউ যদি পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন না করেন বা সে যে বিষয়ের মুতাখাসসিস নন ও আযহার তাকে যে বিষয়ে কথা বলার অধিকার দেয়নি, সে বিষয়ে কথা বলেন, তার দায়ভার তার নিজেকেই নিতে হবে, আযহার কখনো নিবেনা৷

আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশীদের ছাত্র সংগঠন

মিসরে অবস্থানরত বাংলাদেশি সকল শিক্ষার্থীদের মাঝে পারস্পরিক ঐক্য ও সম্প্রীতি ধরে রাখার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে তৎকালীন একঝাঁক মেধাবী তরুণদের আপ্রাণ চেষ্টায় দলমত-নির্বিশেষে “বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন”( ইত্তেহাদ) নামের একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু করে। যার মূল মন্ত্রই হচ্ছে, ‘আদর্শ, শিক্ষা, শৃঙ্খলা, ঐক্য, ত্যাগ আর সেবা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ লালন করা, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কার্যকরি ভূমিকা পালন, সুস্থ চিন্তাধারা লালন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করা এবং মধ্যপন্থা অবলম্বনে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশটিতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে নতুন শিক্ষার্থী এলে তাদের ভর্তি, আবাসন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নবীন বরণ ও বিদায়ী ছাত্রদের সম্মাননাসহ নানা আয়োজনে বছরজুড়েই সক্রিয় থাকে সংগঠনটির কর্মকাণ্ড।

তবে এই সংগঠনটি তিনটি অঙ্গসংগঠন নিয়ে গঠিত যা বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী মতাদর্শের চিন্তা ধারা লালন করে থাকে।
১. আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি,এটি কওমী মতাদর্শের ছাত্রভাইদের সংগঠন৷
২. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত, এটি বাংলাদেশী সুন্নী ছাত্রভাইদের সংগঠন৷
৩. আযহার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন৷

মিশর আসার পর একজন ছাত্র স্বাধীন। তখন তিনি তার ইচ্ছামত উক্ত তিন সংগঠনের যেকোন একটির সদস্য হতে পারেন৷ যে যে সংগঠনের সদস্য হোক না কেন, সকলের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সুসম্পর্ক বজায় থাকে। এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদশে বিরল৷ অন্যদিকে এমনও কেউ কেউ রয়েছেন, যারা কোন একটি সংগঠনের সদস্য না হয়েও সতন্ত্র ভাবে ইত্তেহাদের সদস্য হয়ে থাকেন৷ সবকিছু মিলেয়ে বলতে হয় আযহারে মধ্যপন্থার আলোকে দেশের সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সকলেই নিজেকে এক ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যেতে চান৷

পরিশেষে দেশের আলেম-ওলামা ও আপামর জন-সাধারণের কাছে উদাত্ত আহব্বান থাকবে, আসুন আযহারের ইতিহাসটুকু ভালভাবে জানার চেষ্টা করি৷ আযহারের মানহায কি? এর শিক্ষা কারিকুলাম কি? তখনই আপনি জানতে পারবেন প্রকৃত আযহারী কারা। আর আযহারের ট্যাগ লাগিয়ে নিজের বিকৃত মানসিকতার প্রসার ঘটাচ্ছে কারা।

অতএব কোন ব্যক্তির ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে ঢালাওভাবে আযহারকে নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকি এবং সকল আযহারী ভাইদের সমীপে বিনীত অনুরোধ থাকবে, আমরাও আযহারের মানহাযবিরোধী বিতর্কিত বিষয়গুলো পরিহার করি। ব্যক্তিস্বার্থের জন্য আযহারকে কুলষিত না করি৷ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন৷ সঠিক মত ও আদর্শের আলোকে জীবন পরিচালনার তৌফিক দিন৷ আমিন৷

তথ্যসূত্র:

الأزهر جامعا وجامعة
مطالعة الأزهر
أهل السنة و الجماعة
المناهج الأزهرية
دليل معلمة المناهج الأزهرية
كتب التوحيد التي يعتمد عليها الأزهر
الكتب المقررة العقائدية للمعاهد الأزهرية وجامعاتها
مجلات الشهرية الأزهرية
من محاضرات فضيلة الإمام الأكبرشيخ الأزهر أحمد الطيب حفظه الله و رعاه

লেখক:
ত্রৈধ মাস্টার্স, হাদিস, ফিকহ এবং আরবি সাহিত্য।
বর্তমান এমফিল গবেষক আরবি সাহিত্য অনুষদ,
আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় মিশর ৷

The post ব্যক্তিবিশেষের ত্রুটি: আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বন্ধ হোক ট্রল appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%86/

No comments:

Post a Comment