ইফতেখার জামিল:
উপমহাদেশে মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন নানাধারা-উপধারায় বিভক্ত। সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট। তবে কীভাবে হবে সংস্কার ও সমন্বয়, সেই প্রশ্নে এখনো বারবার ঐতিহ্য ও সমকালীনতার প্রসঙ্গের মীমাংসা করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে গোঁড়া ধার্মিকতা, অধার্মিকতা ও আধা-ধার্মিকতার সঙ্কট। এভাবে এই বিভক্তি, অসন্তুষ্টি ও অমীমাংসায় উপমহাদেশে মুসলমানদের ভাগ্য-বিপর্যয়ের সমাধান হচ্ছে না। অনেকে অনেক রকম উদ্যোগ নিচ্ছেন, তবে তাতে সীমাবদ্ধতা কাটছে না। ভাগ, বিভক্তি ও অযোগ্যতা বেড়েই চলছে।
এই জটিলতার একটা বড় কারণ হচ্ছে, মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস ও ক্রমবিকাশের সিলসিলা সম্পর্কে অজ্ঞতা। যারা ঐতিহ্যবাদিতা ধরে রাখতে চাচ্ছেন, তাদের অনেকের কাছে ঐতিহ্যবাদী ধারার প্রকৃতি ও প্রবণতা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে, আবার যারা চাচ্ছেন পরিবর্তন, তাদের অনেকেই জানেন না তারা ঠিক কিসের প্রতিস্থাপন চাচ্ছেন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, উপমহাদেশে মুসলিম শিক্ষাধারার ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে উঠেছে। এই লেখায় আমরা উপনিবেশ-পূর্ব সময়ের প্রধান মুসলিম শিক্ষাধারা তথা দরসে নেজামী নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
চলমান বিবাদ-বিতর্কের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। পশ্চিমা উপনিবেশ মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত করতে চেষ্টা করেছে ও অনেকাংশে সফল হয়েছে। তার অংশ হিসেবে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনের প্রচলন ঘটিয়েছে। তাতে জাতীয় আচার-কালচার, নির্বাহী ও বিচার বিভাগে একচেটিয়াভাবে পশ্চিমা শিক্ষিতদের প্রভাব বিস্তারিত হয়েছে। ব্রিটিশরা চলে গেলেও থেকে গেছে বিভক্তি-বিবাদের বীজ— দরসে নেজামীর সূচনা এই বিভক্তির আগে ; যেখানে ছিল না ঐতিহ্যবাদিতা ও সমকালীনতার বিবাদ, ধার্মিকতা-অধার্মিকতার দ্বন্ধ ও স্থানীয়-আন্তর্জাতিকতার বিতর্ক। এসব কারণে দরসে নেজামীর আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপমহাদেশে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা
প্রখ্যাত গবেষক আব্দুল হাই হাসানী নদভী সুবিন্যস্তভাবে উপমহাদেশে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার ক্রমবিকাশের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে খোরাসান ও মা-ওরাআন নাহার অঞ্চল ধরে, ফলে উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শিক্ষা-সংস্কৃতির বিশেষ প্রভাব পড়েছে। পারস্য-মধ্যএশিয়ার এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই দর্শন ও গ্রীক যুক্তিবিদ্যার বিশেষ প্রভাব ছিল, সেখানে মুসলিম জ্ঞানব্যবস্থা তথা নাহু, উসুলে ফিকাহ, ফিকাহ ও কালামের চর্চা ছিল অনেকটাই অনুকরণনির্ভর।
যদিও খোরাসান ও মা-ওরাআন নাহার অঞ্চলে অনেক বিখ্যাত আলেম জন্মগ্রহণ করেছেন, তবুও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা স্থানীয় ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। যার প্রতিক্রিয়া উপমহাদেশের মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থাতেও পড়েছে। উপমহাদেশ প্রাচ্যের ধর্ম ও দর্শনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সাংস্কৃতিক ও জনমিতিগতভাবেও এখানে বিধর্মীদের প্রভাব আনেক বেশী। তাই মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থাতেও দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ভাববাদ বিশেষ গুরুত্বের স্থান দখল করে রেখেছিল।
উপমহাদেশে সর্বপ্রথম মুলতান অঞ্চল ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে। এখানে অনেক আলেম-ওলামার সমাবেশ ঘটে। বিশেষত গজনবি শাসনামলে এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বিশেষ বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে ঘুরি শাসকরা দিল্লী জয় করলে দিল্লীতে কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়। মোগল আমলের শেষপর্যন্ত দিল্লীই ছিল মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার প্রধানকেন্দ্র। দিল্লী অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার পর জুনপুরে কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়। বিখ্যাত অনেক আলেম জুনপুরে হিজরত করেন। জুনপুরের প্রভাবে লখনৌতে ইলমি চর্চা শুরু হয়। লখনৌ-সংলগ্ন অঞ্চলেই দরসে নেজামীর প্রণেতা মোল্লা নেজামুদ্দিন সহালভী জন্ম ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
এই প্রধান কেন্দ্রগুলো ছাড়াও গুজরাট ও বাংলা অঞ্চলসহ অনেক এলাকায় সাগর ও স্থলযোগে বিপুল সংখ্যক আলেম-ওলামা-সূফী-দরবেশদের আগমন ঘটে। তারা স্থানীয় মুসলিম সুলতান ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে ইসলাম প্রচার ও চর্চার কাজ করেন। অবশ্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এসব অঞ্চল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি বা পারলেও টিকে থাকতে পারেনি।
আব্দুল হাই হাসানী নদভী মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমবিকাশ বিবেচনায় চার ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগে সপ্তম হিজরী শতকের শুরু থেকে নবম হিজরী শতকের শেষপর্যন্ত প্রায় দুইশ বছর। হিজরী নবম শতকের শেষে মুলতান থেকে শায়েখ আবদুল্লাহ উসমানী ও তার সাথী শায়েখ আজিজুল্লাহ দিল্লীতে আসেন ও তৎকালীন দিল্লীর সুলতান সিকান্দার লোদী ( শাসনকাল ১৪৮৯–১৫১৭ ) তাদের প্রতি বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শন করেন, এখান থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় কালপর্ব ; এই সময়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখার চর্চা বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয় কালপর্বেও এই ধারা অব্যাহত থাকে— আকবরের শাসনামলে ( ১৫৫৬-১৬০৬) ইরানি কিছু ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখার চর্চা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আবুল ফজল আল কাযরাবানী, আবুল ফজল হুসাইন ও ফাতহুল্লাহ শীরাযী বাদশা আকবরের নৈকট্য লাভ করেন ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, আকবরের পিতা সম্রাট হুমায়ুন সেনানায়ক শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে ইরানের সাফাবী শাসকদের সাহায্য গ্রহণ করেন ও ইরানি প্রভাবের পথ খুলে দেন। তবে এই তৃতীয় কালপর্বে কিছু ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হিজাযে যান ও হাদিসের চর্চা বিস্তারে চেষ্টা চালান। চতুর্থ কালপর্বে দরসে নেজামী প্রভাব বিস্তার করে।
সাহেলীতে রক্তপাত ও আনসারী পরিবারের ভাগ্যবিপর্যয়
আব্দুল হাই হাসানী নদভীর বরাতে আমরা দেখেছি যে, উপমহাদেশে মুসলিম শিক্ষার ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কালপর্বে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখার চর্চা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এই ধারার পরিবর্তনে ব্যাপক চেষ্টা চালান মোল্লা কুতুবুদ্দিন শহীদ আনসারি। তার পূর্বপুরুষরা ছিল হেরাতের অধিবাসী, সম্মানিত সাহাবী আবু আইয়ুব আনসারীর বংশধর। তিনি ছিলেন বিখ্যাত আলেম, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর তাকে বিশেষ সম্মান করতেন।
মোল্লা কুতুবুদ্দিন আনসারী ছিলেন আকল ও নকল তথা বুদ্ধি ও বর্ণনা উভয় প্রকার জ্ঞানশাখায় দক্ষ। এভাবে একদিকে তিনি যেমন মূলধারার আলেমদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম ছিলেন, পাশাপাশি তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকতা-সর্বস্ব সংস্কৃতিতেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শিক্ষাসমাপ্তি শেষে তিনি কাজি সাদরুদ্দিন ইলাহাবাদীর কাছে তাসাউফ-সুলুকের দীক্ষাও গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি হয়ে উঠেন জাহেরী-বাতেনী শিক্ষার অধিকারী। উপমহাদেশে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
মোল্লা কুতুবুদ্দিনের মেধা, যোগ্যতা ও শিক্ষাদানের দক্ষতা প্রমাণের অংশ হিসেবে বলা যায়, বিখ্যাত আলেম মুহিব্বুল্লাহ বিহারী ছিলেন তার খাস ছাত্র। মুহিব্বুল্লাহ বিহারী উসুলুল ফিকাহ বিষয়ে মুসাল্লামুস সুবুত ও যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে সুল্লামুল উলুমের মতো কিতাব লেখেন। সম্রাট শাহ আলমের আমলে মুহিব্বুল্লাহ বিহারী মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতি নির্বাচিত হন।
১৬৯২ সালের শীতকাল। মার্চ মাসের সাতাশ তারিখ। লখনৌ শহর থেকে সাতাশ মাইল দূরে অবস্থিত সাহেলী এলাকায় বসবাস করতেন মোল্লা কুতুবুদ্দিন আনসারী। এলাকার কিছু উশৃঙ্খল লোকজন আনসারীর বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে হত্যা করে, তার লাইব্রেরীতে লুটতরাজ চালানো হয়—যেখানে ছিল মহামূল্যবান সাতশোর মতো কিতাব। শুরুতে ছোটছেলে চৌদ্দ বছরের মোল্লা নেজামুদ্দিনকে আটক করলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তেষট্টি বছর বয়সে মোল্লা আনসারী শাহাদাত বরণ করেন।
কেন তাকে হত্যা করা হয়, এটি স্পষ্ট নয়। অনেকে মনে করেন, তার পরিবারের সাথে স্থানীয় জমিদারদের পারিবারিক দ্বন্ধ ছিল, সেই দ্বন্ধ থেকেই তাকে শেষ করে দেওয়া হয়। কারো মতে সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের সাথে তার বিশেষ সম্পর্কে অনেকে শংকিত হয়ে পড়েন। তারা ভাবতে থাকেন, নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে মোল্লা আনসারী সম্রাটের মাধ্যমে সাহেলীর সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দিবেন। কারণ যাই হোক, এভাবে স্থানীয় ও বংশীয় বিবাদে আনসারী পরিবার পড়ে যায় মহাবিপর্যয়ে।
বিপর্যয় মোকাবেলা করতে বড় ছেলে মুহাম্মদ সাঈদ পরিবার নিয়ে প্রথমে লখনৌ পলায়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি হায়দ্রাবাদ গিয়ে সম্রাটের কাছে বিপর্যয়ের বিচার দিয়ে আসেন। সম্রাট সাথেসাথে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শুধু ব্যবস্থাগ্রহণেই সীমিত থাকেননি, মোল্লা কুতুবুদ্দিন আনসারীর ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে লখনৌতে বিশেষ বাসস্থান দান করেন—নাম যার ফারাঙ্গী মহল।
ফারাঙ্গী মহল: মোল্লা নেজামুদ্দিন ও দরসে নেজামীর সূচনা
উপমহাদেশের লোকেরা ইউরোপিয়ানদের ফারাঙ্গী বলে ডাকে। মোল্লা আনসারীর পরিবার সম্রাটের পক্ষ থেকে ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ীর রেখে যাওয়া বাড়ি উপহার পান। পরবর্তীতে আনসারী পরিবারের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা ফারাঙ্গী মহল ধারা হিসেবে পরিচিতি পায়। এখান থেকেই মোল্লা কুতুবুদ্দিনের ছোট ছেলে মোল্লা নেজামুদ্দিনের পরিকল্পনা ও পরীক্ষায় দরসে নেজামী বা নেজামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১০৮৮-৮৯ হিজরী মোতাবেক ১৬৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে সাহেলিতে মোল্লা নিজামুদ্দিনের জন্ম। চৌদ্দ বছর বয়সে তার বাবা মারা যান। বাবার মতোই তিনিও ছিলেন আকল ও নকল তথা বুদ্ধি ও বর্ণনা উভয় প্রকার জ্ঞানশাখায় দক্ষ। এভাবে একদিকে তিনি যেমন মূলধারার আলেমদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম ছিলেন, পাশাপাশি তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকতা-সর্বস্ব সংস্কৃতিতেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
জাহেরি শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সূফীসাধক আব্দুর রাজ্জাক বিন আব্দুর রহীম আল হুসাইনীর কাছে আধ্যাত্মিক দীক্ষাগ্রহণ করেন। তাসাউফ তার ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে : তিনি সাধারণ লেবাস-পোশাক পরিধান করতেন। তৎকালীন আলেমরা বিশেষ লম্বা পাগড়ি ও জামা পরিধান করলেও তিনি বিনয়ের অংশ হিসেবে কখনোই আলেমদের প্রচলিত পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করেননি।
মোল্লা নেজামুদ্দিন ছিলেন দক্ষ শিক্ষক। উপমহাদেশে প্রচলিত পাঠ্যক্রমে সংস্কার-সমন্বয়ের কাজ শুরু করেন তার পিতা মোল্লা কুতুবুদ্দিন। মোল্লা নেজামুদ্দিন এই সমন্বয়ের কাজকে পরিমার্জিত রূপ দান করেন। তিনি মুসলিম ঐতিহ্যের হাজার হাজার কিতাব থেকে প্রয়োজনীয় কিতাব বাছাই করতেন ও স্তরভেদে ছাত্রদেরকে পাঠ্যক্রমে উপকৃত করতেন। তিনি নিছক শুধু শিক্ষাবিদই ছিলেন না, একইভাবে তিনি ছিলেন প্রতিভাবান শিক্ষক : উস্তাজুল আসাতিজাহ ; উস্তাজুল হিন্দ। তিনি দরসে নেজামির প্রণেতা।
দরসে নেজামীর লক্ষ্য হচ্ছে, ছাত্রদেরকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলা, যাতে তারা আলেম হতে পারে, প্রশাসনে যোগ দিতে পারে বা লেখক হতে পারে। মোটকথা শিক্ষিত হতে পারে— দরসে নেজামীতে ছিল না ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের ভেদাভেদ, আকল-নকল বা বুদ্ধি ও বর্ণনা বৃত্তিকতার কোন একটির ভারসাম্যহীন প্রাধান্য, জাহেরি বা বাতেনি শাখায় সংকীর্ণ সীমাবদ্ধতা। এভাবে দরসে নেজামী উপমহাদেশে মুসলমানদের একমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠে।
দরসে নেজামী : পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক
দরসে নেজামীতে শিক্ষক ও পাঠ্যক্রমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শিক্ষা একজন শিক্ষকের মাধ্যমেই সম্পাদিত হতে পারে। অর্থাৎ এখানে শুধু তথ্যবিনিময় উদ্দেশ্য নয়, পাশাপাশি একজন জীবন্ত ব্যক্তির মারফত ও সিলসিলায় শিক্ষাগ্রহণ করা জরুরী। শিক্ষকের সিলসিলার শর্তের মধ্যে তাসাউফের মুরুব্বী বা শায়েখের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। তাসাউফের সিলসিলায় যেমন শায়েখ তার মুরিদকে নির্দেশনা দিয়ে পরিচালিত করেন, তেমনিভাবে দরসে নেজামীর মধ্যেও শিক্ষক ছাত্রকে দ্বীনের সমঝদারী শিক্ষা দান করেন।
পাশাপাশি যেহেতু এখানে শুধু পাঠ্যবিষয় উদ্দেশ্য নয়, তাই নির্দিষ্ট কিতাব ও পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা জরুরী। যদিও গত প্রায় সাড়ে তিনশো বছরে দরসে নেজামির মধ্যে অনেক পরিবর্তন-পরিমার্জন এসেছে, তবে এর মূল কাঠামোতে বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। কেননা দরসে নেজামির প্রবক্তাদের মতে শিক্ষার মানে শুধু তথ্য জানা নয়, শিক্ষার মানে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় অংশগ্রহণ— এটা সমবায়ী কাজ। প্রজন্ম পরম্পরায় অভিজ্ঞতা বিনিময় করাই পাঠ্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। নিছক তথ্য-কেন্দ্রিক ধরে নিয়মিত কিতাব পরিবর্তন করলে এই সিলসিলা বাধাগ্রস্থ হতে পারে।
এখানে আমরা আব্দুল হাই হাসানী নদভীর বরাতে দরসে নেজামির পাঠ্যক্রম উল্লেখ করবো—
- ইলমুস সরফ (শব্দ-প্রকরণ) : মীযানুস সরফ, মুনশায়িব, পাঞ্জেগাঞ্জ, যুবদাহ, সরফে মীর, ফুসুলে আকবরী, শাফিয়া।
- ইলমুন নাহু (বাক্য-ব্যাকরণ) : নাহবেমীর, শরহুল মিআহ, হিদায়াতুন নাহু, কাফিয়া, শরহে জামী হালের আলোচনা পর্যন্ত।
- বালাগাত (অলংকারশাস্ত্র) : মুখতাসারুল মাআনি, মুতাওয়াল মা আনা কুলতু পর্যন্ত।
- মানতিক ( যুক্তিবিদ্যা) : সুগরা-কুবরা, ঈসাগুজি, তাহযীব, শরহে তাহযীব, কুতবী, মীর কুতবী, সুল্লামুল উলুম, মীরযাহেদ রেসালাহ, মীরযাহেদ মোল্লাজালাল।
- হিকমত ও ফালসাফা (দর্শন ও তত্ত্বজ্ঞান) : মাইবুযী শরহে হিদায়াতুল হিকমাহ, সদরা, শামসে বাযেগা।
- রিয়াদাত ( গণিত ) : খুলাসাতুল হিসাব বাবুত তাসহীহ, আল মাকালাতুল উলা মিন তাহরীরিল ইকলিদিস, তাশরিহুল আফলাক ওয়াল কুশাজিয়া, শরহে চুগমীনীর প্রথম অধ্যায়।
- ফিকহ : শরহে বেকায়া, হেদায়ার দ্বিতীয় অর্ধেক।
- উসুলে ফিকহ : নুরুল আনোয়ার, আত তালবীহ, মুসাল্লামুস সুবুত।
- ইলমে কালাম : শরহে আকাইদে নাসাফী, শরহুল আকাইদ দাওয়ানী, মীরযাহেদ।
- তাফসীর : তাফসীরে জালালাইন, বায়জাবী বাকারা শেষ পর্যন্ত।
- হাদীস : মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবুল জুমআহ পর্যন্ত।
দরসে নেজামী : শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রমের মৌলিক দৃষ্টিকোণ
দরসে নেজামীর মূল উদ্দেশ্য ছাত্রদের মধ্যে ‘ইসতি’দাদ’ তৈরি করা। ‘ইসতি’দাদ’ অর্থ মৌলিক যোগ্যতা অর্জন ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিগ্রহণ, বিশেষজ্ঞ তৈরি করা এই পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য নয়। পাঠ্যভুক্ত কিতাবগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যাবে, এখানে ভাষা, ব্যাখ্যা, যুক্তি ও দর্শনে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর সর্বত্রই এসব বিষয়ে জোর দেওয়া হত। কেননা তখন শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, কীভাবে ইলমি ভাষা পাঠ করতে হয়, পাঠ্যপুস্তকের জটিলতা সমাধান-হল করতে হয়, যুক্তি-প্রতিযুক্তি দিতে হয়, সেটা শেখানো ; সববিষয়ে পরিপূর্ণ শিক্ষাদান এখানে উদ্দেশ্য নয়।
আগেই যেমন বলেছি, দরসে নেজামীতে শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তক অনেক জরুরী বিষয়। শিক্ষক ছাত্রদেরকে সূফী মুরুব্বীর মতো শিক্ষা দান করেন— অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতা। শিক্ষক শিক্ষা দেন কীভাবে ধর্মীয়-নৈতিক জীবন যাপন করা যায়। পাঠ্যপুস্তকে সেই অভিজ্ঞতা সংরক্ষিত হয়। টিকা-ফুটনোটে সংযুক্ত হয় সংশ্লিষ্ট তর্ক-বিতর্ক। তাই শুধু পাঠ্যপুস্তকের মূলপাঠ নয়, এই টিকা-ফুটনোটগুলোও দরসে নেজামীতে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পাঠ্যপুস্তক শুধু পড়ে যাওয়া হয় না, প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্নে যাচাই ও নিশ্চিত করা হয় আলোচ্য তথ্য।
এখানে বলে রাখা ভালো, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে দরসে নেজামীর বিশেষ কিছু পার্থক্য আছে। আধুনিক ব্যবস্থায় শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তক নিছক সহযোগী ; শিক্ষকরা পড়াশোনায় সমবায়ী অংশগ্রহণকারী নয়, পাঠ্যপুস্তকের মর্যাদাও তথ্য সরবরাহের চেয়ে বেশী কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষাদানের চেষ্টা করা হয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাইরে খুব বেশী যাওয়া হয় না।
দরসে নেজামীর প্রবক্তারা মনে করেন, এতে প্রাথমিক, মৌলিক ও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যাহত হয়। অর্থাৎ সববিষয়ে প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা অর্জিত হয় না, সামগ্রিক জ্ঞানশাখা সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে উচ্চশিক্ষা অর্জন অসম্ভব হয়ে যায়। দরসে নেজামী সমাপ্ত করে কেউ ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি পাবে না। পাশাপাশি কোন বিশেষজ্ঞ উপাধি গ্রহণেরও সুযোগ নেই। তার জন্য বিশেষ শিক্ষাঅর্জন করা জরুরী।
গত সাড়ে তিনশো বছরে দরসে নেজামীর মৌলিক প্রক্রিয়া ও প্রবণতা ঠিক থাকলেও বিপুল পরিবর্তন এসেছে। এখন সিহাহ সিত্তাহ দরসে নেজামির পাঠ্যভুক্ত। ফিকাহের ক্ষেত্রেও আরও বেশকিছু কিতাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গণিত, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার অনেক কিতাব বাদ পড়েছে। কেন, কখন ও কীভাবে এই কিতাবগুলো বাদ পড়েছে, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে সেটা এখানে আলোচ্য নয়। এখানে দু’টি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে।
দরসে নেজামী এখন ‘ধর্মীয়’ শিক্ষাব্যবস্থায় রুপান্তরিত হয়েছে, যেখানে সববিষয়ে মৌলিক যোগ্যতার চেয়ে ধর্মীয় পেশাজীবী তৈরি করা বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখায় একচেটিয়া গুরুত্ব দেবার ফলে প্রতিযোগী হিসেবে দরসে নেজামীর মধ্যে ‘ধর্মীয়’ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হবার চাপ বেড়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দরসে নেজামী ভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখার পাঠ্যপুস্তকগুলো গুরুত্বহীনতায় ধীরে ধীরে যোগ্য শিক্ষক ও গবেষক হারিয়েছে। ফলে পাঠ্যক্রমে এগুলো এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
দরসে নেজামীর সিলসিলা : রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, বৈধতা ও অর্থায়ন সঙ্কট
মোল্লা নেজামুদ্দিনের ছেলেদের মধ্যে আবদুল আলী তার শিক্ষা-প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যান। মাওলানা আবদুল আলী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও বিখ্যাত আলেম। তিনি উপমহাদেশের আলেমদের মহলে বাহরুল উলুম ও মালিকুল ওলামা নামে পরিচিত ছিলেন। অনেকের মতে দরসে নেজামীর ছাত্রদের দক্ষতা নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখাতেই সীমিত, মাওলানা আবদুল আলী এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। তার উসুলে ফিকাহ বিষয়ক বিখ্যাত বই ফাওয়াতেহুর রাহমুত এখনো গবেষকদের মধ্যে সমানভাবে প্রভাবশালী ও প্রাসঙ্গিক।
আবদুল আলী শিক্ষার্জন শুরু করেন একটু বড় হয়ে। পাশাপাশি তিনি তার দূরসম্পর্কের আত্মীয় ও পিতার খাস ছাত্র কামালুদ্দিন ফতেহপুরীর কাছে ফিকাহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। শিক্ষক ফতেহপুরী বিশ্বাস করতেন, তার ছাত্র আবদুল আলী একদিন বিশ্ববিখ্যাত আলেমে পরিণত হবেন। দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে তার তুলনা হবে মোল্লা সদরার সাথে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় আবদুল আলী বিকাশ-প্রচারের সেই সুযোগ পাননি।
প্রথম কয়েক বছর তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত ফারাঙ্গী মহল মাদরাসাতেই পাঠ দান করেন। তার প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শিক্ষাদান ও ঐতিহ্যবাহী কিতাব ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। আমরা আগেই বলেছি, ঐতিহ্যবাদী শিক্ষাধারায় নির্বাচিত ঐতিহ্যবাহী কিতাব ব্যাখ্যা ও শিক্ষাদান প্রধান ও কেন্দ্রীয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিভা, মেধা বা লেখনী শক্তি এখানে মুখ্য নয়। এদিক দিয়ে মাওলানা আবদুল আলী ছিলেন অনেক এগিয়ে।
আবদুল আলী ছিলেন জনপরিসরের সাথে সংযুক্ত। তিনি তার পিতার মতো সরল-সহজ জীবন যাপন করেননি। তিনি ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধী পক্ষের সাথে নিয়মিত বিতর্ক ও পর্যালোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। এক পর্যায়ে লখনৌতে তিনি শিয়া-সুন্নি বিবাদে জড়িয়ে যান। মুহাররমের তাজিয়া মিছিল তার গলিতে চলে আসে। তিনি ছাত্রদের বলেন, তাজিয়া মিছিল যাতে তার গলি থেকে সরে যায়। তার ছাত্ররা মিছিলকারীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে যায়। যার প্রেক্ষিতে শিয়া-সুন্নি সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায়। অনেকের মতে তার পারিবারিক সদস্যরা তাকে বিশেষ সাহায্য করেনি। বিতর্ক-বিবাদ থেকে বাঁচতে আবদুল আলী চিরকালের জন্য ফারাঙ্গী মহল ছেড়ে যান।
আগেই যেমন বলেছি, আবদুল আলী উপমহাদেশের অস্থিরতম সময়ের মানুষ। অষ্টাদশ শতকের শেষাংশে কেটেছে তার জীবনের প্রধান অংশ। মৃত্যু ১৮১০ খৃস্টাব্দে। বলাই বাহুল্য এই সময়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ; ১৭৫৭ খৃস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ ও ১৭৬৪ খৃস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের ভাগ্যে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। বিপর্যয় নেমে আসে মাওলানা আবদুল আলীর জীবনেও। তৎকালীন যুগে মাদরাসাগুলো চলত ট্যাক্সবিহীন ওয়াকফ ভূমির আয়ে ; ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাদরাসার ওয়াকফ ভূমি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে ও ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। একদিকে আয়ের উৎস বন্ধ, আবার সরকারী আয়োজনে ধর্মীয় শিক্ষা : আলেমরা পড়ে যান বিশেষ বিপর্যয়ে।
আবদুল আলী রাজনৈতিকভাবে খুব বেশী সক্রিয় ছিলেন, সেটা বলা যায় না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাকে জমিদার শ্রেণীর সাহায্যগ্রহণ করতে হত—নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। তাতে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও প্রস্তাবনা আরও সীমিত হয়ে আসে। শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তিনি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসন হারিয়ে ফেলেন। বস্তুত মুঘল আমলে আলেমদের ভূমিকা এর থেকে খুব বেশী ব্যতিক্রম ছিল না, তবে মুসলিম শাসনে তারা সমাজ ও প্রশাসনে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে গৃহীত হতেন, তাদের ছাত্ররাই হতেন প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত। অবশ্য মুসলমানদের বিপর্যয়ের মধ্যে ব্রিটিশদের প্রভাব বাড়তে থাকায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রস্তাবনার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
ফারাঙ্গী মহল ছেড়ে মাওলানা আবদুল আলী প্রথমে একশো মাইল দূরবর্তী শাহাজানপুরের নবাব হাফিজুল মূলকের আশ্রয়গ্রহণ করেন। দুই দশক পর হাফিজুল মূলক ক্ষমতাচ্যুত হলে মাওলানাকে নতুন ঠিকানার খুঁজে বের হতে হয়। তিনি এবার যান আরও একশো মাইল দূরে, রামপুরে। নাওয়াব ফায়জুল্লাহ খান তার পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্বগ্রহণ করেন। যেহেতু আবদুল আলী ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক, তাই তার কাছে বিপুল সংখ্যক ছাত্র পড়তে আসে, নবাব ফায়জুল্লাহ খান সীমিত বাজেটে ছাত্রদের ব্যয় সংকুলান অসম্ভব হয়ে উঠে। আবদুল আলীকে আবার নতুন ঠিকানার খুঁজে বের হতে হয়।
বর্ধমানের মুন্সী সদরুদ্দিন মুসাভী বুহার গ্রামে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন ও সেখানে আবদুল আলীকে শিক্ষকতার আমন্ত্রণ জানান। এখানে তিনি কয়েক বছর অবস্থান করেন, তবে একপর্যায়ে মুন্সীর সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। তিনি মাদ্রাজ বা বর্তমান চেন্নাইয়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৭৮০ খৃস্টাব্দ থেকে এখানেই তিনি শেষজীবন কাটান। এখানে তার পৃষ্ঠপোষকতা করেন স্থানীয় নবাব মুহাম্মদ আলী খান ওয়ালা জাহ।
নবাব তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন, তার জন্য নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, এখানে তিনিসহ প্রত্যেকে বিশেষ ভাতা পেতেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা এখানেও তাকে স্থির হতে দেয়নি। ওয়ালা জাহি নবাব পরিবার ব্রিটিশদের কাছে নতি স্বীকার করে। যার প্রতিক্রিয়ায় মাওলানা আবদুল আলীর সাথে ব্রিটিশদের যোগাযোগ গড়ে উঠে, কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, ব্রিটিশরাও তাকে মাসিক সম্মানী ও ভাতা প্রদান করতো। তবে এতে তিনি রাজনৈতিকভাবে আরও বেশী কোণঠাসা ও প্রভাবহীন হয়ে উঠেন।
ব্রিটিশ উপনিবেশ : মাদরাসায়ে রহিমিয়া ও দরসে নেজামীর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক রুপান্তর
মুসলমানরা যখন পড়ে যায় মহাবিপর্যয়ে, তখন আনসারী পরিবার বিশেষ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন। অবশ্য ব্যর্থ হন বললে পরিস্থিতির জটিলতা বুঝে আসে না। আগেই যেমন বলেছি, মুঘল আমলেও আলেমরা সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না, ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক সংস্কার ও মেরুকরণে ভূমিকা রাখলেও দলবদ্ধভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব করেননি। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ব্রিটিশদের বিজয়ে মুসলমানরা নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। আনসারী পরিবার আগের মতো দলবদ্ধ রাজনীতি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাতে তাদের মাধ্যমে ধর্মীয় খেদমত হলেও তারা জনপরিসরে নেতৃত্বের আসন হারান। শাহ ওয়ালিউল্লাহের ধারার প্রভাব বাড়তে থাকে।
আব্দুল হাই হাসানী নদভী যেমন বর্ণনা করেছেন, তৃতীয় কালপর্বে অনেক ব্যক্তিত্ব হেজাযে গমন করেন এবং উপমহাদেশে আরবের ধারার প্রভাব বিস্তার করেন। এর মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখযোগ্য ; শায়েখ মুহাম্মদ বিন তাহের, শায়েখ ইয়াকুব বিন হাসান কাশ্মীরি ও শায়েখ আবদুন নবী গাংগুহী। তবে এই ধারায় সর্বপ্রথম বিশেষ ভূমিকা রাখেন শায়েখ আবদুল হক দেহলবী। তিনি হজ্ব করতে হেজাযে যান ও সেখানে কয়েকবছর অবস্থান করে শিক্ষা অর্জন করেন। এই ধারার আলেমরাও হানাফি ছিলেন, তবে তারা আরব হানাফি মাজহাবের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। যেখানে হাদিসে বিশেষ জোর দেওয়া হত, ফিকাহ ও উসুলে ফিকাহের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী এই ধারায় পরিপূর্ণতা দান করেন।
পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আহমদ সারহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফে সানী ( ১৫৬৩-১৬২৪ খ্রিস্টাব্দ ) বিশেষ প্রভাব রাখতে সক্ষম হন। তিনি সম্রাট আকবরের দ্বীনে ইলাহির বিরুদ্ধে দাঁড়ান। পাশাপাশি স্থানীয় ভাববাদী ধারা ও খোরাসান-মধ্যএশিয়ান দার্শনিক ধারাতেও সংস্কারের আহ্বান জানান ; এভাবে মুঘল সাম্রাজ্যে সংস্কারে আলেম সমাজের ভূমিকা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে। শাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী এই ধারায় আরও এগিয়ে যান— পতনের মুখোমুখি মোঘল সাম্রাজ্য বাঁচাতে তিনি ক) সম্রাটদের সতর্ক করে চিঠি লেখেন। খ) আফগানের শাসক রোহিলা সর্দার আহমদ শাহ আবদালীকে দিল্লীতে নিয়ে আসেন ও দিল্লীকে মারাঠা ও শিখদের হাত থেকে রক্ষা করেন। গ) নিজেই স্বতন্ত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সাইয়েদ আহমদ শহীদ এই আন্দোলনকে সামরিক লড়াইয়ে রুপদান করেন।
ব্রিটিশ উপনিবেশে আনসারী পরিবারের ভূমিকাহীনতায় সামনে চলে আসে দেহলবী ধারা। যার কেন্দ্রে থাকে দিল্লীর মাদরাসায়ে রহিমিয়া, যা প্রতিষ্ঠা করেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবীর পিতা মাওলানা শাহ আবদুর রহীম। এখান থেকেই পরিচালিত হয় শাহ ওয়ালি উল্লাহর সংস্কার আন্দোলন। তার ছেলে শাহ আবদুল আযীয এখান থেকেই সংস্কার ও রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখে ১৮০৬ খৃস্টাব্দে শাহ আবদুল আযীয ঘোষণা করেন, উপমহাদেশ এখন দারুল হারব। মনে রাখা ভালো, ঠিক কাছাকাছি সময়ে আনসারী পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তিত্ব আবদুল আলী ব্রিটিশদের প্রতি নমনীয়তা পোষণ করেন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধারার রাজনৈতিক আন্দোলন আরও এগিয়ে যায়। মূল নেতৃত্বে আসেন শাহওয়ালি উল্লাহর নাতি শাহ ইসমাইল শহীদ ও শাহ সাইয়েদ আহমদ শহীদ। তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনে শিখ ও ইংরেজরা ভীত হয়ে যায়। ১৮৩১ খৃস্টাব্দে বালাকোটে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম বাহ্যিক অর্থে শিখ-ইংরেজ যৌথ ষড়যন্ত্রে পরাজিত হলেও কারবালার হুসাইনী আন্দোলনের মতো শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধারাই উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারায় রুপান্তরিত হয়। উপমহাদেশের কোন মুসলিম ধারার পক্ষেই ওয়ালিউল্লাহি ধারাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
১৮৪৬ খৃস্টাব্দে মাদরাসায়ে রহিমিয়া বন্ধ বা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেও এর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তারিত হয়। আনসারী পরিবারের দরসে নেজামীর সাথে এর মিথস্ক্রিয়া ঘটে। এই মিথস্ক্রিয়া থেকেই ১৮৬৬ খৃস্টাব্দে দারুল উলুম দেওবন্দের জন্ম হয়। দারুল উলুম দেওবন্দ মৌলিকভাবে দরসে নেজামির শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ওয়ালিউল্লাহি ধারার রাজনীতি ও সংস্কার প্রস্তাব অনেকাংশে গ্রহণ করে। এভাবে দরসে নেজামির রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক রুপান্তর ঘটে।
দুই ধারার সমন্বয় : আবদুল হাই লখনবী
উপমহাদেশের মাদরাসা ধারায় প্রতিষ্ঠান ও সিলসিলার চেয়ে ব্যক্তির ভূমিকা অনেক বেশী। এখানে প্রতিষ্ঠান ও সিলসিলার সূচনা হয় ও টিকে থাকে ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। ব্যক্তিগত নেতৃত্ব ও প্রতিভা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আনসারী পরিবারের প্রভাব কমে গেলেও উনিশ শতকের দ্বিতীয় অংশে মোল্লা কুতুবুদ্দিনের বড় ছেলে মুহাম্মদ সাঈদের বংশে একজন বড় আলেমের জন্ম হয়। তার নাম মাওলানা আবদুল হাই লখনবী ( ১৮৪৮-১৮৮৬)।
তিনি দুইবার হিজাযে সফর করেন ও বিখ্যাত আলেম আহমদ যাইনী দাহলান থেকে সনদ অর্জন করেন। এভাবে তিনি সমকালীন হিজাযের আলেম সমাজ ও তাদের কর্মতৎপরতার সাথে পরিচিত হন। আবদুল হাই লখনবী একশোর ওপরে বই লেখেছেন। এর মধ্যে যেমন অনেকগুলো হাদিস ও উলুমে হাদিস সংশ্লিষ্ট বই আছে, তেমনি আছে ফিকাহ সংক্রান্ত বই। ফারাঙ্গী মহল ধারা ও আনসারী পরিবারের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানশাখাগুলোতেও দক্ষতা অর্জন করেন।
আনসারী ও দেহলবী— উভয় ধারা আমাদের ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশ। তারাই আমাদের পূর্বপুরুষ। তারা হানাফি ও কালামি ছিলেন, তবে তাদের মেজাযে কিছু ভিন্নতা ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় উভয় ধারা বৈচিত্র্যপূর্ণ দুই ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দেহলবী ধারা রাজনীতি ও সংস্কার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। পাশাপাশি আনসারী পরিবার ধরে রাখেন শিক্ষাব্যবস্থা। এখনো উপমহাদেশে তাই আনসারী পরিবারের দরসে নেজামীই প্রধান ধর্মীয় শিক্ষা ধারা, আবার দেহলবী রাজনৈতিক ও সংস্কার কার্যক্রমও কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক ধারা। ইতিহাসে এই দুই ধারার যৌথ সমন্বয় ঘটেছে। যার প্রমাণ মেলে মাওলানা আবদুল হাই লখনবীর কর্মধারায়।
সূত্রগ্রন্থ :
১) আস সাকাফাতুল ইসলামিয়াহ ফীল হিন্দ। আব্দুল হাই হাসানি নদভী।
২) নুযহাতুল খাওয়াতের। আব্দুল হাই হাসানি নদভী।
৩) মাকালাতে শিবলী। শিবলী নোমানী।
৪) The ‘Ulama of Farangi Mahall and Islamic Culture in South Asia। Francis Robinson।
৫) তাযকিরায়ে উলামায়ে ফারিঙ্গী মহাল। ইনায়াতুল্লাহ আনসারী।
৬) হিন্দুস্তান কি কদিম ইসলামি দরসগাহে। আবুল হাসানাত নদভী।
৭) What Is a Madrasa?। Ebrahim Moosa।
The post দরসে নেজামী : উপমহাদেশে ধর্মীয় শিক্ষার সিলসিলা appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%a7%e0%a6%b0/
No comments:
Post a Comment