Monday, July 20, 2020

চামড়ার কালেকশন অপছন্দ করতেন হাফেজ্জি হুজুর

মুনশী নাঈম:

কুরবানির চামড়া কালেকশন করা কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য নয়। কিন্তু চামড়া কালেকশন করার প্রতি কওমি মাদরাসার বর্তমান দৌড়ঝাঁপ দেখে ঐতিহ্য বলেই বোধ হয়। মানুষের মনেও এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে—এভাবে পথে পথে ঘুরে কালেকশন করা বুঝি ইসলামের কোন একটি বিধান। দ্বীনি ইলমের চর্চা বাঁচিয়ে রাখতে বুঝি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাজিরা দেয়ার কোন বিকল্প নেই!

কিন্তু বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। প্রয়োজনের খাতিরে চামড়া কালেকশনকে আয়ের খাত হিসেবে নিয়েছিল কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তবে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে চামড়া কালেকশন করাকে আয়ের খাত হিসেবে পছন্দ করেননি অনেক বড় বড় আলেম। তারা এটাকে মাদরাসার শিক্ষক এবং বিশেষ করে তালিবুল ইলমদের জন্য মানহানিকর বলেও বর্ণনা করেছেন।

প্রচলিত পদ্ধতিতে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে চামড়া কালেকশন যারা অপছন্দ করতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.। তিনি বলতেন, ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা জাকাত-ফেতরার টাকা, খাস করে কুরবানির চামড়া সংগ্রহ করার জন্য শহরের অলিতে-গলিতে ঘোরাফেরা করে। এটা দ্বীনের জন্য বড়ই বেইজ্জতির কথা। এতে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতি মানুষের হেয় দৃষ্টি তৈরি হয়, যা ধর্মের জন্য ক্ষতিকর।’ (আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ./ লেখক : নাসীম আরাফাত, পৃষ্ঠা : ১৯)

হাফেজ্জি হুজুর রহ. চামড়া থেকে আয়ের এ খাতটি একেবারেই উপেক্ষা করেননি। প্রচলিত পদ্ধতিকে অপছন্দ করেছেন। মানসম্মত বিকল্প পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষ অসিয়ত থাকল, তারা যেন ছাত্রদের এভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে না পাঠায়। বরং মাদরাসা প্রাঙ্গণে ও শহরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প থাকবে। সেখানে মাদরাসাদরদী জনগণ নিজেদের দায়িত্বে চামড়া পৌঁছাবেন। আল্লাহ পাকের ওপর ভরসা করে মাদরাসা চালান। হেয়তাপূর্ণ কাজ বন্ধ করুন।’ (আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ./ লেখক : নাসীম আরাফাত, পৃষ্ঠা : ১৯)

ছাত্র শিক্ষকদের দিয়ে কালেকশন করানো পছন্দ করতেন না হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর পীর হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রহ.। তিনি বলতেন, ‘আলেমদের চাঁদা কালেকশনের দ্বারা দ্বীনের বড় অসম্মানি হচ্ছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, আলেমরা বুঝি নিজেদের জন্যই এত দৌড়ঝাঁপ করছে। এ জন্য আমার অভিমত হল, আলেমগণ কিছুতেই চাঁদা কালেকশনে যাবেন না; বরং দ্বীনের কোন কাজ করতে হলে সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একত্রিত করে বলে দিবেন, দ্বীনের হেফাজতের জন্য অমুক কাজটি করা দরকার। আপনারাও চিন্তা করে দেখুন এর প্রয়োজন রয়েছে কিনা। যদি আপনাদের দৃষ্টিতেও প্রয়োজনীয় মনে হয় তাহলে সকলে মিলে এ কাজটি আঞ্জাম দেওয়ার ব্যবস্থা করুন… আলেমগণ মূল কাজ করবেন। সম্পদশালীগণ অর্থের যোগান দিবেন। আর যদি সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বলে এ কাজের প্রয়োজন নেই; বরং এটি অনর্থক তাহলে আলেমদের পক্ষে চাঁদা কালেকশনের প্রয়োজন নেই। সে কাজ বন্ধ করে ঘরে বসে থাকবেন। ব্যবসা, চাষাবাদ কিংবা অন্য কোন পেশায় লিপ্ত হোন এবং অবসর সময় যতটুকু সম্ভব দ্বীনের কাজ করুন… আমার মতে আলেমদের দ্বারা চাঁদা কালেকশন করাবেন না। তাদেরকে চাঁদা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করবেন না। এতে তাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা কমে যায়। (আল-ইলমু ওয়াল-উলামা। অনুবাদ : আব্দুল গাফফার শাহপুরী। পৃষ্ঠা : ৩১০-৩১১)

অনেক মাদরাসা চামড়া কালেকশন না করেও দিব্যি চলছে। হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর ছোট জামাতা মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি তার লক্ষ্মীপুরে অবস্থিত মাদরাসার জন্য চামড়া কালেকশন তো দূরের কথা, কোনো কালেকশনই করেন না। তার ভাষ্য অবিকল হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর মতোই। তিনি বলেন, ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা কুরবানির চামড়া সংগ্রহ করার জন্য শহরের অলিতে-গলিতে ঘোরাফেরা করে। এটা দ্বীনের জন্য বড়ই বেইজ্জতির কথা। এতে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতি মানুষের হেয় দৃষ্টি তৈরি হয়, যা ধর্মের জন্য ক্ষতিকর।’

চামড়ার মূল্য ক্রমশ অবনতশীল। চামড়া কালেকশনে যতটুকু শ্রম এবং রিসোর্স ব্যয় করা হয়, ততটুকু উঠে আসছে না। তাই অনেক বিজ্ঞজন পরামর্শ দিচ্ছেন আয়ের বিকল্প কোনো খাত তৈরীর। দারুল উলুম দেওবন্দের উসুলে হাশতেগানায় স্থায়ী আয়ের খাত নাকচ করা হয়েছে। তবুও বর্তমান বিচারে মাদরাসাগুলোর স্থায়ী আয়ের খাত তৈরীর পরামর্শও উঠে আসছে।

The post চামড়ার কালেকশন অপছন্দ করতেন হাফেজ্জি হুজুর appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%b6%e0%a6%a8-%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a6%9b%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6-%e0%a6%95%e0%a6%b0/

No comments:

Post a Comment