মুসান্না মেহবুব:
স্বাধীনতার সময় থেকে নিয়ে এ অবধি—গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে জন্মের হার কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে বাংলাদেশি নারীরা যেখানে গড়ে ছয়টিরও বেশি সন্তান জন্ম দিতেন, বর্তমানে সেই গড় দাঁড়িয়েছে দুইটি বা তার সামান্য কিছু বেশিতে। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে, তখন এর জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। অন্যদিকে পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৬ কোটি। ৪৯ বছর পর জাতিসংঘের সর্বশেষ ডাটা, ২০ জুলাই ২০২০ অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৭ লাখ সত্তর হাজার ৭৭০ জন। পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২২ কোটি ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬২ জন।
মূলত জনসংখ্যায় পাকিস্তান থেকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮২ সালেও জনসংখ্যায় বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে ছিল পাকিস্তান। সে বছর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩৯ লাপ ৩২ হাজার। জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩৪ লাখ ৩২ হাজার। কিন্তু ১৯৮৩ সালে পেছনে পড়ে যায় বাংলাদেশ। ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটা’র একটি চার্ট থেকে প্রতীয়মান।
Bangla 1978 7,54,50000…. .PAK 1978 7,31,97000
Bangla 1979 7,75,29000….. PAK 1979 7,55,61000
Bangla 1980 7,96,39000….. PAK 1980 7,80,54000
Bangla 1981 81768000……. PAK 1981 8,06,8,0000
Bangla 1982 83932000…… .PAK 1982 8,34,32000
Bangla 1983 86142000… ….PAK 1983 8,62,86000
Bangla 1984 88417000… ….PAK 1984 8,92,14000
এখনো পাকিস্তান থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০১৯ এর ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটা’র একটি চার্ট দেখে নেই।
Bangla 2015 156256000… PAK 2015 199427008
Bangla 2016 157976992… PAK 2016 203631008
Bangla 2017 159684992… PAK 2017 207906000
Bangla 2018 161376992… PAK 2018 212228000
Bangla 2019 163046000… PAK 2019 216564992
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মহার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে স্বাধীনতার সময়ে যেখানে মাত্র ৮ শতাংশ দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের মাথায় সেই হার এখন দাঁড়িয়েছে ৬৩ শতাংশে। স্বাধীনতার সময়ে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী গড়ে ছয়টির বেশি সন্তান জন্ম দিতেন। বর্তমানে সেই গড় দাঁড়িয়েছে ২টি বা তার সামান্য কিছু বেশিতে। অর্থাৎ তখন প্রজনন হার ছিল ৬ দশমিক চার, আর বর্তমানে ২ দশমিক শূন্য ৫।
জন্মহারে কেন এই বিপর্যয় নামল এবং এর পরিণতি কী হতে পারে এ ব্যাপারে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে আলাপ হয়েছিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সার্জন ডা. শামসুল আরেফিন শক্তির সঙ্গে।
বিপর্যয়ের কারণ
ডা. আরেফিন বলেন, শিশু জন্মের হার কমার পেছনে প্রধানত দুটো কারণ প্রণিধানযোগ্য। এক. পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ব্যাপক প্রচারণা ও নানা ধর্মী উদ্যোগ। দুই. নারীর ‘কথিত ক্ষমতায়ন’।
তিনি বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে কাজ হচ্ছে অনেক আগ থেকে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মীরা একদম অজপাড়া গাঁয়ের নারী, যাঁরা স্বামীকে মাঠের কাজে সাহায্য করেন, সেই লেবেলের নারীদের পর্যন্ত জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা পৌঁছে দিয়েছেন। এবং তাদেরকে নানাভাবে মোটিভেট করছেন এক বা দুই সন্তানের বেশি না নেওয়ার জন্য। এ ছাড়া আমাদের যে হেলথ সেক্টর আছে, এখানকার কাজও কিন্তু বিশাল, প্রচুর কর্মী এ ব্যাপারে কাজ করছেন। সরকারিভাবে তৃণমূল পর্যায়ে কম মূল্যে, ক্ষেত্র বিশেষে বিনামূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, কনডম ইত্যাদি বিতরণ করা হচ্ছে। এক বা দুই সন্তান গ্রহণের পর স্থায়ীভাবে বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতির ব্যাপারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সরকারিভাবে বিনামূল্যে এই কাজটি করে দেওয়া হচ্ছে। এসব পদ্ধতি গ্রহণের জন্য সাধারণ শ্রেণির মানুষকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে সরকারিভাবেই। মোটকথা তৃণমূল পর্যায়ে পাকাপাকিভাবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কাজগুলো পৌঁছে যাবার কারণে প্রতিটা দম্পতিই এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে ব্যাপকভাবে আগ্রহী হচ্ছে।
ডা. শামসুল আরেফিন বলেন, একসময় মনে করা হতো, অশিক্ষার কারণে বোধহয় মানুষ সন্তান বেশি নিচ্ছে। কিন্তু সেই ধারণা এখন পাল্টে গেছে। আমাদের কাছে যে রিপোর্টগুলো আসে, দেখা যায়, দিনমজুর, ভ্যানচালক কিংবা অজপাড়া গ্রামের কৃষক—তাঁরাও এখন একটা বা দুটো সন্তানের বেশি নিচ্ছেন না।
জন্মহার কমার দ্বিতীয় যে কারণটি, নারীর কথিত ক্ষমতায়ন, এ বিষয়ে ডা. শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশে নারীরা মোটামুটি ব্যাপকভাবে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছেন। চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে তাঁদের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ছে। দিনদিন বহির্মুখী হচ্ছেন নারীরা। ফলে নিজেদের কর্মব্যস্ততার জন্য অধিক সন্তানকে বোঝা মনে করছেন অনেকেই৷ তাই একটা বা দুটো সন্তান গ্রহণেই ব্যাপকভাবে সীমাবদ্ধ থাকছেন তাঁরা।
জন্মনিয়ন্ত্রণের পরিণতি কী হতে পারে
জন্মের হার কমে যাওয়ার ফলে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে জানতে চাইলে ডা. শামসুল আরেফিন বলেন, জন্মের হার কমে যাওয়ার পরিণতি কিন্তু বেশ আশঙ্কাজনক। যেটা বর্তমানে জাপানে দেখা যাচ্ছে। জাপানে অতিমাত্রায় জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে এখন দেশটিতে তরুণ এবং যুবকদের সংখ্যা কমে এসেছে। বয়স্ক লোকের সংখ্যাই সেখানে বেশি। জাপান কিন্তু এই সমস্যার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণনীতি বিষয়ে বেশ জোরালোভাবে ভাবছে। একটা রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিই তো হচ্ছে যুবক এবং তরুণেরা। সেখানে যুবকের সংখ্যা যদি কমে যায়, তাহলে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিতে অনিবার্যভাবে ধ্বস নামবে।
ডা. আরেফিন বলেন, আমাদের দেশের পপুলেশন অনেক বেশি হবার কারণে এখনই অবশ্য এই সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে না, তবে যেভাবে জন্মের হার কমছে, এভাবে যদি চলতে থাকে, অদূর ভবিষ্যতে, আজ থেকে ২০-৩০ বছর পর, অনিবার্যভাবে সমস্যাটা আমাদের ফেস করতে হবে।
এ ছাড়া নারী-পুরুষের ভারসাম্যতায় কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, অর্থাৎ জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে পুরুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বা মেয়ের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেড়ে যাওয়া—এ ধরনের কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না জানতে চাইলে ডা. শামসুল আরেফিন বলেন, বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা এম্নিতেই এখন কম। সন্তান গর্ভে আসার পর মেয়ে হবে জানতে পারলে, এমন অনেকে আছেন, ভ্রুণ নষ্ট করে ফেলেন। মেয়ে সন্তানের প্রতি অনীহার ফলে এই জিনিসটা করা হয়। ফলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা আমাদের দেশে কম। জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে এই কমতি আরও ব্যাপকতা লাভ করতে পারে। কারণ, যারা এক সন্তান গ্রহণের ইচ্ছে রাখেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই চাইবেন, সন্তানটি ছেলে হোক। মেয়ে ভ্রুণ এ কারণেও নষ্ট করা হয় বেশিরভাগ। ফলে নারী-পুরুষের ভারসাম্যতাও একটা সময় প্রকট হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এটা অবশ্যি এখনই হবে না, আরও ২০-৩০ বছর হয়তো যাবে।
ডা. শামসুল আরেফিন বলেন, ওলামায়ে কেরাম যেহেতু এদেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক দিকগুলো দেখেন এবং তাঁদের সঙ্গে বড় রকমের একটা যোগাযোগ আছে, জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপকতা রোধে তাঁরা সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি।
তিনি বলেন, যতটা জানি, জন্মনিয়ন্ত্রণের কিছু দিক আছে ইসলাম-অনুমোদিত, আর কিছু দিক নিষিদ্ধ, তো কোন দিক নিষিদ্ধ আর কোন দিকের অনুমোদন ইসলামে আছে, এ ব্যাপারে আধুনিক সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে ওলামায়ে কেরামের বিস্তারিত একটি ফতোয়া আসা আমি জরুরি মনে করছি। এই ফতোয়ার আলোকে সাধারণ মানুষজনের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রসঙ্গত, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সেক্যুলারদের আবিস্কৃত এবং ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটা বিষয়৷ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে কম সন্তান গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু ইসলাম সাময়িক জরুরত কিংবা অসুস্থতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণে বাধা না দিলেও সাধারণভাবে অধিক সন্তান গ্রহণে উৎসাহ দেয়। আবু দাউদ ও সহিহ ইবনে হিব্বানের হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি একজন সম্ভ্রান্ত বংশের ধনী নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু তার সন্তান হয় না। আমি কি তাকে বিয়ে করব?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি দ্বিতীয়বার এলো, নবিজি দ্বিতীয়বারেও নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার আসল, তৃতীয়বারেও তাকে নিষেধ করলেন। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা অধিক ভালোবাসাপরায়ণ ও অধিক সন্তান জন্মদানকারিনী নারীকে বিয়ে করো। কেননা, অবশ্যই আমি তোমাদের আধিক্য নিয়ে (কেয়ামত দিবসে) অন্যান্য উম্মতের সাথে গর্ব করব। উক্ত হাদিসের ভাষ্য স্পষ্ট। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম অধিক সন্তান গ্রহণের ব্যাপারে সরাসরি উদ্বুদ্ধ করেছেন।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি একদিকে যেমন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, অপরদিকে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। চীনসহ বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে তারা নতুনভাবে চিন্তা করছে। এই পদ্ধতির প্রভাব যেভাবে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষ যে হারে এটাকে গ্রহণ করছে, তা কমানো না গেলে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা খুব নিকটেই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
The post জনসংখ্যায় যেভাবে পাকিস্তান থেকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%96%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
No comments:
Post a Comment