মুনশী নাঈম:
সাহিত্য মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতার শিল্পরূপ। জীবনের ঘাটে ঘাটে এই অভিজ্ঞতার জল খেতে খেতে শিল্পরূপ প্রস্ফূটিত হয়। নানা ঘাত প্রতিঘাত সয়ে পোক্ত হয় শিল্পের বয়ান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ অঞ্চলের মানুষের সবচে করুণ, সবচে ট্রাজেডিক অভিজ্ঞতা হলো ১৯৪৭ এর দেশভাগ। নতুন দুটি দেশের গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত পরিবার পারস্পরিক গৃহবিনিময় করে উভয় রাষ্ট্রে বসতি স্থাপন করলেও অধিকাংশ মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হয়। মুখোমুখি হতে হয় নির্মর্ম সময়ের, নির্দয় আঘাতের। এই আঘাতের রক্তক্ষরণ, নির্মম সময়ের দাগ আমাদের বাংলা সাহিত্যেও ছাপ ফেলেছে। গল্প, উপন্যাস এবং কবিতা সবক্ষেত্রে।
বাংলা গল্পে দেশভাগ
এতটুকু বলতে দ্বিধা নেই যে, বাঙালির জীবনে ঘটে যাওয়া এই মহাসংকট অভিজ্ঞতা সাহিত্যে যেভাবে আসা উচিত ছিল সেভাবে আসেনি। কৃষণ চন্দর, সাদাত হাসান মান্টো, খাজা আহমেদ আববাস, ভীষ্ম সাহানী, খুশবন্ত সিংরা যেভাবে উর্দূ এবং হিন্দিতে এই বিপর্যয়ের চিত্র এঁকেছেন, বাংলা সাহিত্যে তাৎক্ষণিকভাবে রচিত কিছু ছোটগল্পে তার প্রতিফলন দেখা গেছে মাত্র।
মনোজ বসুর ‘ইয়াসিন মিঞা’, এস এম বজলুল হকের ‘ভাগ না দিয়ে ভাগানো’, অঞ্জলি দেবীর ‘নবীন আশার খড়গ’, অপূর্ব কুমার মৈত্রের ‘স্বাধীনতার ব্যথা’, নরেন্দ্র দেবের ‘চলচ্চিত্র’, সুমথনাথ ঘোষের ‘উদ্বাস্তু’, হরি নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘পুনশ্চ’, ‘ইতিহাস’ ও ‘লাঠিয়াল’, ঋত্বিক ঘটকের ‘স্ফটিক পাত্র’ ও ‘সড়ক’, ফণীন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের ‘গোপাল উড়ের লেন’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘খতিয়ান’, ‘স্থানে ও স্তানে’, সমরেশ বসুর ‘নিমাইয়ের দেশত্যাগ’, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘গণনায়ক’, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘হেডমাস্টার’ ও ‘পালঙ্ক’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘ঘর’, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘নেহায়েৎ গল্প নয়’, নূর আলীর ‘মোহাজের’, বেগম হাশমত রশীদের ‘ফরিয়াদ’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ছুরি’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শ্বেতকমল’, ‘অধিকার’, প্রতিভা বসুর ‘দুকূল হারা’ ও ‘অপরাহ্ণে’ ইত্যাদি দেশভাগের গল্প। লক্ষ করার বিষয় হলো, অনেকেই এদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত লেখক নন। তারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, কিন্তু পরে সাহিত্যে থিতু হতে পারেননি বলে তাদের নাম বিস্মৃত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তাদের গল্পও হারিয়ে গেছে। এদের অনেকের রচনাই দুষ্প্রাপ্য। আবার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের গরহাজিরা বা সীমিত অংশগ্রহণ লক্ষণীয়।
‘স্মৃতি’ আর ‘নতুন অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন’ এই দুটি মাত্রায় দেশভাগের সাহিত্য বিকশিত। দেশভাগের সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে এই স্মৃতি আর ফেলে আসা যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তরুণ কবি ও সম্পাদক সজল আহমেদ সংকলিত ও সম্পাদিত ‘দুই বাংলার নির্বাচিত গল্পে দেশভাগ’ বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থ। দেশভাগের গল্প নিয়ে এমন বৃহদাকার গল্প সংকলন ইতোপূর্বে বোধহয় আর হয়নি। এখানে স্থান পেয়েছে দুই বাংলার লেখকদের গল্প।
সব গল্পগুলো যে একই চিন্তার উপর ভিত্তি করে লেখা এমন নয়। বরং রাজনৈতিক দর্শনে কোন কোন গল্পে বিরোধ ফুটে উঠেছে। এদের মধ্যে অনেক লেখক এমন, যারা নিজেরাই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তারা তাদের ফেলে আসা স্মৃতি এবং নতুন দেশে নতুন অভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন গল্পে। দেশভাগের লক্ষ্যের দিকে না তাকিয়ে, তারা তাকিয়েছেন মানুষের তখনকার দুর্দশার দিকে। মানবিক সঙ্কটকেই তারা সবচে বড় করে তুলে ধরেছেন।
দেশভাগের এই গল্প সংকলনে অমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘ভিটেমাটির রূপকথা’ ইমদাদুল হক মিলনের ‘দেশভাগের পর’, জাফর তালুকদারের ’পিতৃভূমি’, জীবন সরকারের ‘কোষা’, দেবেশ রায়ের ‘উদ্বাস্তু’, প্রতিভা বসুর ‘দু’ক‚ল হারা’, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘মোজাহের’, মিহির মুখোপাধ্যায়ের ‘বাঙলাদেশ’, মিহির সেনগুপ্তের ‘পিতামহীর স্বদেশযাত্রা’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘ঘর’, সালাম আজাদের ‘সীমান্ত’, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতার দাঙ্গা ও আমি’, সোমেন চন্দের ‘দাঙ্গা’ জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা, জাকির তালকদারের ‘স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ’ প্রফুল্ল রায়ের ‘রাজা যায় রাজা আসে’, বনফুলের ‘দাঙ্গার সময়’, ইসহাক চাখারীর ‘রায়ট’ প্রভৃতি গল্পের নামই যেন দেশভাগের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতবাহী।
এ ছাড়া অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর ‘স্বাক্ষর’, অন্নদানশঙ্কর রায়ের ‘সবার উপর মানুষ সত্য’, অভিজিৎ সেনের ‘কাক’, অসীম সাহার ‘টান’ আতোয়ার রহমানের ‘বুদ্বুদ’, আব্দুল মান্নান সৈয়দের ‘গল্প-১৯৬৪’, আবু ইসহাকের ‘বনমানুষ’, আবু রুশদের ‘হাড়’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ছুরি’ ঋত্বিক ঘটকের ‘স্ফটিকপাত্র’, কৃষণ চন্দরের ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তর ‘যে তোমায় ছাড়ে’, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘পালঙ্ক’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দোসর’, বিমল করের ‘অন্তরে’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্থানে ও স্তানে’, মিন্নাত আলীর ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, মনোজ বসুর ‘দিল্লি অনেক দূর’, রাহাত খানের ‘আমাদের বিষবৃক্ষ’, রমেশচন্দ্র সেনের ‘পথের কাঁটা’, শওকত আলীর ‘রক্তে ও শিশিরে’, শওকত ওসমানের ‘আলিম মুয়াজিজন’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘তোমার উদ্দেশ্যে’, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘গণনায়ক’, সাদত হাসান মান্টোর ‘শরিফান’, সমরেশ বসুর ‘আবাদ’, সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘ইতিহাসের ছেঁড়াপাতা’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নেড়ে’, সলিল চৌধুরীর ‘ড্রেসিং টেবিল’, হরিপদ দত্তর ‘নরকযাত্রা’ হায়াৎ মামুদের ‘অবিনাশের মৃত্যু’, হুমায়ূন আহমেদের ‘জুয়া’, প্রভৃতি গল্পে দেশভাগের পূর্ব ও পরেকার নানাবিধ মানসিক ও মানবিক সংঘাত, সংঘর্ষ, হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছেন লেখকরা।
ইতিহাসের সত্যান্বেষী ও নির্মোহ ধারার বাইরে সাহিত্যের নানা অঙ্গনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের দেশবদলের স্মৃতি, দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের (তখন পূর্ব পাকিস্তান) অভিমুখে পাড়ি দেওয়ার মর্মপীড়াদায়ক কাহিনির মতোই পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দেশান্তরের কিছু বিবরণ এসেছে। পূর্বাঞ্চলে দেশভাগের সাহিত্য বা ঐতিহাসিক গবেষণায় অনেক ক্ষেত্রে তালাশ করে বহুমাত্রিক বিবরণ কমই পাওয়া যাচ্ছে। ট্রেন টু পাকিস্তানের মতো ‘ট্রেন টু কলকাতা’ বা ‘মার্চ টু ঢাকা’ নামে কেউ কিছুই লেখেনি।
তবে একটা কথা সত্য, অনেক গল্পেই পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়া হিন্দুদের পক্ষপাতিত্ব করেছেন একতরফাভাবে। তারা দেখিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে আসা মুসলমানদের থেকে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়া হিন্দুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অথচ এটাও লক্ষ করার বিষয় যে, পূর্ব ভারতের দেশভাগ ও ভিটে থেকে উৎখাত-হওয়া হিন্দু শরণার্থীদের কাহিনি যেমন জটিল মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে-যাওয়া বাঙালি মুসলমানদের গল্প তেমনই জটিলতর। উভয় সম্প্রদায়ই স্বাধীনতার স্বাদ নিয়েছে এবং শরণার্থীও হয়েছে। এক জীবনে আশ্রয়চ্যুত হয়ে নোঙরহীন নৌকোর মতো অনিশ্চিতের পথে চলে নিজস্ব মাটি খোঁজার অভিজ্ঞতা ইতিহাসের কাছে কখনো কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
বাংলা উপন্যাসে দেশভাগ
দেশভাগের পর উপন্যাস পেতে আমাদের ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। জ্যোতির্ময়ী দেবীর ’এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। ওপার বাংলার আরও কয়েকটি উপন্যাস হলো- অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ’নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, শক্তিপদ রাজগুরুর ’মেঘে ঢাকা তারা’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের .’গড় শ্রীখণ্ড’, সমরেশ বসুর ’সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ’পূর্ব-পশ্চিম’।
‘১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ হলে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠল। বাঙালি মুসলমান লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীরা কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলেন। বলা বাহুল্য, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত ধারার উত্তরাধিকারটিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। এবার তাঁদের নবযাত্রা শুরু হলো।’ (বাংলাদেশের ছোটগল্প, ১ম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ১৯৭৯, পৃ. ৬)
দেশভাগ নিয়ে ঢাকায়, সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন কেন্দ্রে অনেকেই উপন্যাস লিখেছেন। কলকাতা থেকে ফিরে সাহিত্যের যে নবযুগের সূচনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ঔপন্যাসিক হলেন – আনোয়ার পাশা, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবুল ফজল, আবু ইসহাক, সত্যেন সেন, রাজিয়া খান, শহীদুল্লাহ কায়সার, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সরদার জয়েনউদ্দীন। এদের উপন্যাসে দেশবিভাগ প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ ও কাহিনীর মৌল বিবেচ্য হয়েছে। পরবর্তী সময়ে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী ও সেলিনা হোসেনের উপন্যাসেও দেশবিভাগের ইতিহাস-অভিঘাত রূপায়িত হয়েছে।
প্রথম দিকের উপন্যাসে দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু সমস্যা, বাস্তুচ্যুতির জন্য বেদনাবোধ, স্মৃতিকাতরতা ও ভয়ার্ত অস্তিত্ব-সংগ্রামের ইতিবৃত্ত লেখকদের উদারনৈতিক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডকুমেন্টারির মতো করে দেশভাগের ঘটনার উপস্থাপন করা হয়েছে। তারপর কালে কালে তার বিস্তৃতি ঘটেছে। সেই ষাটের দশকের লেখক যারা, তারা এই এত বছর পরে এসেও যখন দেশবিভাগ নিয়ে উপন্যাস লিখেন, সেখানেও দেশবিভাগের অনিবার্য অভিঘাত চিত্রিত হয়। এর নিকতম উদাহরণ হলো ২০১০ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘আগুনপাখি’।
পঞ্চাশের মন্বন্তর অর্থাৎ ১৯৪৩ থেকে দেশবিভাগ (১৯৪৭) সময়বৃত্তে ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ উপন্যাসের কাহিনী বিন্যস্ত। আবু ইসহাকের মুখ্য অভিনিবেশ ছিল জয়গুনকেন্দ্রিক নিম্নবর্গের মানুষের জীবনসংগ্রামের বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা। উপন্যাসের সূচনায় আছে মন্বন্তরের প্রসঙ্গ। দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষ স্বপ্ন দেখেছে, দেশ স্বাধীন হলে চালের দাম কমবে। দেশ একদিন স্বাধীন হয়। কিন্তু জয়গুনদের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার হয় সমাধি। তাদের ভিটা থেকে আবার উচ্ছেদ হতে হয়। দেশবিভাগ অসংখ্য মানুষকে উদ্বাস্তু করেছিল। সেই বাস্তবতার পরিবর্তে পাকিস্তান রাষ্ট্রে জয়গুনদের নিরাশ্রয়তার নির্মম আলেখ্য রচিত হয় কাহিনীতে।
আবুল ফজলের ‘রাঙ্গাপ্রভাত’-এ দেশভাগ, পাকিস্তান শাসিত পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও আদর্শগত সংকট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হিন্দু-মুসলিম পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা প্রকাশিত হয়েছে।
রাজিয়া খানের ‘বটতলার উপন্যাস’-এ দেশভাগজনিত সংকট এবং উপমহাদেশের বিশাল ভৌগোলিক পরিসরে চরিত্রপাত্রের জটিল সমস্যার বিন্যাস দেখানো হয়েছে। মঈনের স্বদেশ উন্মূলিত বাস্তবতা দেশভাগজনিত। তার ব্যক্তিজীবনের স্বপ্ন, প্রেম, এমনকি পারিবারিক পরিবেষ্টনীকে বিপর্যস্ত করেছে দেশভাগ। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিময় কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পরও মঈন কলকাতার মেয়ে সুমিতার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেছে। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনাধারায় সেই অনুরাগ শেষ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রের জটিল পরিস্থিতিতে শুভ পরিণতিতে উপনীত হতে পারেনি।
শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ ১৯৩৮ থেকে ১৯৫১ কালপর্বের কাহিনী। দুটি গ্রাম বাকলিয়া ও তালতলী প্রধান হলেও কলকাতা ও ঢাকার পটভূমিও উপন্যাসটির ঘটনাধারায় বিস্তৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধোত্তর কলকাতার দাঙ্গা, দেশবিভাগের পর বাংলাদেশের স্বাধিকার অর্জনের পথপরিক্রমায় এগিয়ে গেছে ‘সংশপ্তক’-এর কাহিনী।
সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘অনেক সূর্যের আশা’ উপন্যাসের কাহিনী পরিব্যাপ্ত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত। কবি রহমতের স্মৃতিকথার মধ্য দিয়ে দেশভাগ ও দেশবিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্মোচিত হয়েছে। স্বপ্নের ভূখণ্ড পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক হায়াত খাঁ টঙ্গী সোনারগাঁ জুট মিলে শ্রমিক ধর্মঘটে অংশগ্রহণকালে পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। অনেক সূর্যের প্রত্যাশায় লালিত ভূখণ্ডের এ বেদনার স্বরূপ নির্দেশের মধ্য দিয়েই উপন্যাসের সূচনা। দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নকল্পনা ও ভাবাবেগ কিভাবে বারবার বিচ্যুত হয়েছে তারই পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা উপন্যাসটির গভীরে প্রোথিত।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’র কাহিনী শেষ হয়েছে ১৯৪৭ সালে এসে। এরপরই দেশভাগ থেকে শুরু হয়েছে ‘সংকর সংকীর্তন’-এর ঘটনা। কলকাতা ও তার আশপাশের পটভূমিতে প্রধান চরিত্র মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের জীবন চিত্রিত হয়েছে এখানে। তবে ফরাজি আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের ভারতবিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত এ উপন্যাসের ঘটনা। ব্রিটিশদের স্বার্থচালিত শোষণ-প্রক্রিয়া ও দ্বিজাতিতত্ত্ব উদ্ভাবনের মনস্তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন ঔপন্যাসিক। মূলত ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ এবং ‘সংকর সংকীর্তন’ এই তিনটি উপন্যাসে একটি পরিবারের যোগসূত্রে বাঙালি মুসলমানের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের আলেখ্য রচনা করেছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন।
সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’ ও তিন খণ্ডের ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’য় দেশভাগের প্রত্যক্ষ অভিঘাতের কথা বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ উপন্যাসে ইলা মিত্রের সংগ্রামী জীবন ও তেভাগা প্রসঙ্গের রূপায়ণে পরোক্ষভাবে দেশভাগের প্রসঙ্গ রেখায়িত।
মূলত ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বিভিন্ন কালানুক্রমিক ঘটনাধারায় আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানসে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদী আদর্শ এবং প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক জীবনবোধের বিকাশ ঘটে। ঔপন্যাসিকরা সেই শ্রেণীর অংশ হিসেবে তাদের কাহিনীধারায় ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মাণ করেন স্বাধিকারের সপক্ষে আমাদের সমাজমানসের বিচিত্র তরঙ্গ। এই এতটুকু ছাড়া বাকিসব নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই উপস্থাপিত হয়েছে।
অথচ এটা খুবই সত্য যে, যে অল্প সময়ের মধ্যে প্রদেশগুলোকে ভাগ করা হলো; সামরিক ও বেসামরিক বিভাগকেও দ্বিধাবিভক্ত করা হলো; এই সময়সীমা পাকিস্তানের জন্য নিদারুণ সমস্যা সৃষ্টি করে। ভারতের মতো উত্তরাধিকারসূত্রে পাকিস্তান কোনো রাজধানী ও সরকার পায়নি। পায়নি এমন আর্থিক সম্পদ, যা দিয়ে দ্রুত প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ফেলা যায়। উপরন্তু কোটি কোটি উচ্ছিন্ন (মুসলমান) শরণার্থীর সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে প্রবেশ এই শিশুরাষ্ট্রের ওপর ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সমূহ বোঝা চাপিয়ে দেয়।
বাংলা কবিতায় দেশভাগ
বাংলা কবিতায় দেশভাগ মানে হাহাকার। ভিটেমাটি হারানোর, আত্মীয় স্বজন হারানোর হাহাকার। হাহাকার ফুটিয়ে তুলে আদতে তারা দেশভাগের সমালোচনা করেছেন। কবিতায় অলঙ্কার থাকে, রহস্য থাকে। তাই সবকিছু খুলে বলা যায় না। কিন্তু যতটুকু যেভাবে বলা যায়, ওটা অন্যকোথাও বলা যায় না। যেমন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ’উদ্বাস্তু’ কবিতায় তিনি একটি পরিবারের সমস্ত শিকড় ছিন্ন করে উদ্বাস্তু হবার জীবন্ত ছবি এঁকেছেন। কবিতার শেষে কবি আমাদের এক নির্মম সত্যের সামনে এনে দাঁড় করান যখন তিনি লেখেন-
আমরা সবাই উদ্বাস্তু —
কেউ উৎখাত ভিটে-মাটি থেকে,
কেউ উৎখাত আদর্শ থেকে।
মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় উদ্বাস্তুদের নিয়ে কবিতা লিখেছেন ‘এস দেখে যাও’। কবিতার ছত্রে ফুটে উঠেছে বাস্তুচ্যুতির আক্ষেপ।
এস দেখে যাও কুটি কুটি সংসার
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ছাড়ানো বে-আব্রু সংসারে
স্বামী নেই, গেল কোথায় তলিয়ে
ভেসে এসে আজ ঠেকেছে কোথায় ও-যে
ছেঁড়া কানিটুকু কোমরজড়ানো আদুরি, ঘরের বউ-
আমার বাঙলা।
’চিঠি’ কবিতায় কবি মণীন্দ্র রায় ফুটিয়ে তুলেছেন এক উদ্বাস্তু বৃদ্ধার ছেড়ে আসা গ্রাম এবং সেখানকার মানুষ-জনের জন্য বৃদ্ধার দুশ্চিন্তা ও মনখারাপের অনুভূতি।
সুশান্ত, তোমার মনে পড়ে
সরলার মাকে, যে এখানে
কাজ করত? হঠাৎ সেদিন
শুনলো যেই বন্যা পাকিস্তানে,
বুড়ি গিয়ে বসল বারান্দায়,
দেখি তার চোখে জল ঝরে।…
প্রথিতযশা কবি শঙ্খ ঘোষ দেশভাগ, জন্মভূমি, ছেড়ে আসা গ্রাম, উদ্বাস্তুজীবনের দুর্ভোগ, শিকড়হীনতার বেদনার কথা বারবার তার কবিতায় তুলে ধরেছেন।
যা কিছু আমার চারপাশে ছিল
ঘাসপাথর
সরীসৃপ
ভাঙা মন্দির
যা কিছু আমার চারপাশে ছিল
নির্বাসন
কথামালা
একলা সূর্যাস্ত
যা কিছু আমার চারপাশে ছিল
ধ্বস্ত
তীরবল্লম
সমস্ত একসঙ্গে কেঁপে ওঠে পশ্চিমমুখে
স্মৃতি যেন দীর্ঘযাত্রী দলদঙ্গল
ভাঙ্গা বাক্স পড়ে থাকে আমগাছের ছায়ায়
এক পা ছেড়ে অন্য পায়ে হঠাৎ সব বাস্তুহীন।
আরেক কবিতায় তিনি লিখেছেন ; আমার মুখে অন্তহীন আত্মলাঞ্ছনার ক্ষত/ আমার বুকে পালানোর পালানোর আরো পালানোর দেশজোড়া স্মৃতি।
পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়া হিন্দুদের নিয়ে ‘বাস্তুত্যাগী’ কবিতা লিখেছেন জসীমউদ্দিন।
দেউলে দেউলে কাঁদিছে দেবতা পূজারীর খোঁজ করি…
ফিরে এসো যারা গাঁ ছেড়ে গেছো, তরুলতিকার বাঁধে,
তোমাদের কতো অতীত দিনের মায়া ও মমতা কাঁদে।
সুপারির বন শূন্যে ছিঁড়িছে দীঘল মাথার কেশ,
নারকেলতরু ঊর্দ্ধে খুঁজিছে তোমাদের উদ্দেশ।…
অতীতে হয়তো কিছু ব্যথা দেছি, পেয়ে বা কিছুটা ব্যথা,
আজকের দিনে ভুলে যাও ভাই, সেসব অতীত কথা!
সুনীলের কবিতায় ফুটে উঠেছে উদ্বাস্তুদের ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। ‘সাঁকোটা দুলছে’ কবিতার শেষ স্তবকটি পড়া যেতে পারে;
সাঁকোটির কথা মনে আছে, আনোয়ার?
এত কিছু গেল, সাঁকোটি এখনো আছে
এপার ওপার স্মৃতিময় একাকার
সাঁকোটা দুলছে, এই আমি তোর কাছে;
’ধাত্রী’ কবিতায় তিনি উদ্বাস্তু সমস্যা জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গকে তার ধাইমার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
শিয়ালদার ফুটপাতে বসে আছেন আমার ধাইমা
দুটো হাত সামনে পেতে রাখা,
ঠোট নড়ে উঠছে মাঝে মাঝে।
যে কেউ ভাববে দিনকানা এক হেঁজিপেঁজি বাহাত্তুরে রিফিউজি বুড়ি।
আঁতুর ঘরে আমার মুমূর্ষু মায়ের কোল থেকে উনি
একদিন আমাকে বুকে তুলে নিয়েছিলেন…
ধাইমা, এ কোন্ পৃথিবী আমাকে দেখালে?
বুড়ি, সর্বনাশিনী, আমাকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছিলি
এই অকল্পনীয় পৃথিবীতে
আমি আর কত কিছু হারাবো?
তারাপদ রায় সেই মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যাচের মতোই আক্ষেপ করে বলেছেন;
শুধু এক মানচিত্র ভাঙাঘরে দেয়ালে নিয়ত
উলঙ্গ রিলিফ ম্যাপ আধাখ্যাপা ড্রয়িং মাস্টার
উপহার দিয়েছিলো রক্তের স্রোতের মতো নদী
দাঁত বের করা হিংস্র অন্ধকার আদিম পাহাড়
কবি বেণু দত্তরায় তাঁর ’ভাঙাবাঙলার কবিতা’য় আক্ষেপ করে স্মৃতিচারণ করেছেন;
দেশভাগের এতবছর পরে ইছাক-কাকুকে মনে পড়ে
বাবা তো কবেই গেছেন ইছাক-কাকুও কি আর আছে
পা-চালানো সেলাই-কলটার কথা খুব মনে পড়তে থাকে
(ইছাক-কাকু)
ঠাকুর্দা বলেছিলেন দ্যাখ দ্যাখ ওটা পানকৌড়ি
অনেকদিন পড়ে আজ আবার পানকৌড়িকে দেখলাম
দেশভাগ হয়ে গিয়েছে কবেই তো। মাঝখানটুকু কাঁটাতারের
বেড়া পানকৌড়ি খবর রাখে না
(পানকৌড়ি)
উপসংহার
একথা অনস্বীকার্য যে সমকালের প্রত্যাশায় অতীত অধ্যয়নের এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। তাই এক-ই বিষয় নিয়ে দুই কালের দুই মানুষের মধ্যে মতানৈক্য ঘটে। দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক তৈরী হয়। দেশবিভাগের পরপর বাংলা সাহিত্যে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে দেশভাগ, এখন আমরা সেভাবে ভাবতে না-ও পারি। এত বছরের অভিজ্ঞতায় আমাদের সামনে আসতে পারে নতুন সমীকরণ। নতুন সেই সমীকরণ তুলে ধরিনি আমি। শুধু কেবল দেশবিভাগ কিভাবে চিত্রায়িত হয়েছে বাংলা সাহিত্যে, তার উপর হালকা আলোকপাত করলাম। এই যা।
The post বাংলা সাহিত্যে দেশবিভাগ : যেভাবে চিত্রায়িত হয়েছে appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%97-2/
No comments:
Post a Comment