Friday, August 14, 2020

কলকাতা গণহত্যা : যেভাবে দেখেছেন সৈয়দ আলী আহসান

রাকিবুল হাসান:

১৯৪০-এর দশকে ভারতের গণপরিষদের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ছিল মুসলিম লীগ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন ভারতীয় নেতৃবর্গের হাতে ব্রিটিশ ভারতের শাসনভার তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখে। এই প্রস্তাবে একটি নতুন ভারত অধিরাজ্য ও তার সরকার গঠনেরও প্রস্তাব জানানো হয়। এর অব্যবহিত পরে, একটি বিকল্প প্রস্তাবে হিন্দুপ্রধান ভারত ও মুসলমানপ্রধান পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কংগ্রেস বিকল্প প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। এই প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে এবং একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট একটি সাধারণ ধর্মঘটের (হরতাল) ডাক দেয়। এই প্রতিবাদ আন্দোলন থেকেই কলকাতায় এক ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক গণহত্যার জন্ম হয়। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শহরে চার হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান ও এক লক্ষ বাসিন্দা গৃহহারা হন।

কলকাতা দাঙ্গার সময় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র কলকাতা কেন্দ্রে কাজ করতেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক, জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান। কলকাতায় থেকে তিনি দেখেছেন অস্থির সময়ের দৃশ্য। পরে তিনি তার আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছেন কলকাতা গণহত্যার মর্মান্তিক বর্ণনা। এই লেখার প্রতিপাদ্য সৈয়দ আলী আহসানের কলমে কলকাতা গণহত্যার বেদনাদায়ক চিত্রায়ন।

গণহত্যার আগের দিন (১৫ আগস্ট)

মুসলিম লীগ ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করে। শান্তিপূর্ণভাবে এই দিনটিকে পালন করার জন্য সবাইকে আহ্বান জানায়। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা এই ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে বলে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনিও দিনটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য বলে দিলেন। মি. সোহরাওয়ার্দী ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন। এতে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা আরো ক্ষেপে গেল।

১৫ আগস্ট থমথমে অবস্থা। ১৬ অগাস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে সভা হবে। সব এলাকা থেকে শোভাযাত্রা করে জনসাধারণ আসবে। ১৬ আগস্ট ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ পুরোপুরি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মিটিংয়ে বলা হয়েছে, যারা গারস্টিন প্লেসের নিকট থাকে, তারাই শুধু ট্রান্সমিশন পরিচালনার জন্য ১৫ তারিখ রাত থেকেই অফিসে অবস্থান করবে।

অফিসের স্মৃতিচারণ করে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘মিটিং শেষে নৃপেনদা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, তুমি আজ রাতেই কলকাতার বাইরে চলে যাও। কাল খুব গোলমাল হবে শুনেছি। তিনি সুস্পষ্টভাবেই আমাকে বললেন যে, কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় হিন্দুরা সংঘবদ্ধ হচ্ছে। এবং এর ফলে একটি প্রচণ্ড হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাঁধবে, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। রেডিও অফিসের আরও অনেক হিন্দু কর্মচারীর কথাবার্তায় আমি আভাস পেলাম যে, পরের দিন অর্থাৎ ১৬ তারিখে মুসলমানরা যখন মিছিল করে মনুমেন্টের কাছে যাবে, সে সময় অরক্ষিত মুসলিমগৃহ হিন্দুরা আক্রমণ করবে। রেডিওর জয়নুল আবেদীনকে এসব কথা বলতে তিনি খুব চিন্তিত হলেন।’

রেডিও থেকে বাসায় ফিরলেন সৈয়দ আলী আহসান। কিন্তু তার ভেতর একটা ভয় ঢুকে গেছে। তিনি লিখেছেন, ‘সন্ধ্যার সময় আমি চিন্তিতভাবে তালতলার মেসে ফিরে গেলাম। একটু পর ফররুখ এল, মতিউল এলো, তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করলাম। ফররুখ আমার ভয়ের কথা হেসেই উড়িয়ে দিলো। সে বললো, হিন্দুরা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। ফররুখ ১৬ আগস্ট উপলক্ষে একটি কবিতা লিখেছিল—’লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’। কবিতাটি আবেগবহুল ও উদ্দীপনাময়। পরেরদিন কবিতাটি আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল মাওলানা আকরম খাঁর নামে।’

১৬ তারিখ ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে এটা মুসলমানরা টের না পেলেও তার নীলনকশা আগেই তৈরী করে রেখেছিল হিন্দুরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘এর জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।’

দাঙ্গার দিন (১৬ আগস্ট)

১৬ আগস্ট সকালবেলা শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন সৈয়দ আলী আহসান। চলে এলেন হাওড়ার বাউরিয়ায়, শ্বশুরবাড়িতে। পথে আসতে আসতে দেখে এলেন মুসলমানদের মিছিল। তিনি লিখেছেন, ‘ওয়েলেসলীর রাস্তায় ট্রাম নেই। ধর্মতলার সকল দোকানপাট বন্ধ। হাওড়ার ব্রীজে প্রথম একদল মুসলমানকে মিছিল করে শহরের দিকে আসতে দেখা গেলো। আমার বিশ্বাস ছিল, মিছিল বেরুনোর পরই গোলযোগ আরম্ভ হবে। তার আগে নয়। সুতরাং মিছিল বেরুনোর আগেই আমাকে বাউরিয়ায় পৌঁছতে হবে। পথে কোনো যানবাহন পাইনি। তাই হেঁটে যেতে হয়েছে। সে সময় আমি খুব হাঁটতে পারতাম। বাউরিয়ায় আমাকে দেখে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি খুবই আশ্বস্ত হলেন। পরেরদিন কলকাতায় কী হবে, তা নিয়ে সকলেই চিন্তিত ছিলেন।’

এদিন মুসলিমরা যখন মিছিল নিয়ে প্রতিবাদ সভায় যায়, সেই সুযোগে কলকাতা শহরে মুসলিমগৃহে নৃশংস তাণ্ডব চালায় হিন্দুরা। নদীতে ভেসে যায় লাশ, রাস্তায় পড়ে থাকে লাশ। সৈয়দ আলী আহসান এই মর্মন্তুদ দৃশ্যের বর্ণনায় বলেছেন—’অনেক রাতে বাউরিশস থানায় খবর এল যে গঙ্গা নদী দিয়ে অনেক মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে। রাত তিনটে কি চারটের দিকে আমার শ্বশুর এ খবর পেয়ে পুলিশ সঙ্গে নিয়ে গঙ্গার ঘাটে গেলেন। আমিও তার সঙ্গে গেলাম। তখন আকাশে আলো দেখা দিয়েছে। বাউরিয়ার প্রধান রাস্তাটা গঙ্গার তীরে। সেখানে দাঁড়িয়ে গঙ্গার স্রোতের দিকে তাকিয়ে শুধু দরিদ্র মুসলমানদের মৃতদেহ দেখতে পেলাম। শংকিত ও বিক্ষুব্ধ চিত্তে ঘরে ফিরে এলাম। মুসলমানরা যখন মিছিল করে প্রতিবাদ সভায় গেলো, সেই সুযোগে কলকাতা শহরে যে তাণ্ডবলীলা আরম্ভ হলো তা ভারতের ইতিহাসে এক কলংক।

অরক্ষিত মুসলিম গৃহগুলো হিন্দুদের আক্রমণে ধ্বংস হলো। এবং মুসলিম গণহত্যার যে নরাধম যজ্ঞ আরম্ভ হলো তার মতো ঘৃণ্য ও পাশবিক ঘটনা ভারতের ইতিহাসে ঘটেছে কিনা সন্দেহ। কলকাতায় এই বিভৎস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অগ্নিদাহন, নারীহরণ এবং নারী ধর্ষণও ছিল।’

এ দাঙ্গার জন্য কলকাতার মুসলিমরা কাকে দায়ী করে? সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘ভারতের বড়লাট লড ওয়েভেল কলকাতার দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা যখন দেখতে এসেছিলেন, তখন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার লোকেরা ওয়েভেলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলো। একজন করেছিলো, এ দাঙ্গার জন্য দায়ী কে? আর সবাই সমস্বরে উত্তর করেছিল, লর্ড ওয়েভেল।’

সাংস্কৃতিক চিন্তার বিপর্যয়

সৈয়দ আলী আহসান স্বীকার করেছেন, কলকাতা মহাযজ্ঞ তার সাংস্কৃতিক চিন্তার মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তিনি লিখেছেন, ‘শৈশবে পিতার মুখে শুনতাম প্রত্যেক শিশু ইসলামের মধ্যে জন্মগ্রহণ করে। ক্রমশ সে যখন বড় হয়, তখন তার পরিমণ্ডল তাকে লালন করে তার পরিবর্তন ঘটায়। সুতরাং ইসলামের শান্তি এবং মানবতার মধ্যে জন্মগ্রহণ করলেও বড় হয়ে সে হয়তো হিন্দু হয়, বৌদ্ধ হয় বা খৃস্টান হয়। বাবা বলতেন, যদিও মানুষের সামাজিক এবং ধর্মীয় পরিবর্তন হয়, তবুও সে জন্মসূত্রের অধিকার হারায় না। আমি বাবার জীবনযাপন-পদ্ধতির মধ্যে কখনও ভেদবুদ্ধির স্বীকৃতি দেখিনি। হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান নির্বিশেষে সকলকে তিনি একই পর্যায়ভুক্ত করে দেখতেন। তার বন্ধুদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। কলকাতার এই মহাযজ্ঞ আমাদের জীবনে বিরাট ভেদবুদ্ধির জন্ম দিলো।’

দাঙ্গার সময়ে মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের বিদ্বেষ কতটা প্রকট ছিল, তাও ফুটিয়ে তুলেছেন সৈয়দ আলী আহসান। তিনি লিখেছেন, ‘কলকাতার পরপরই বিহারে ভয়াবহ দাঙ্গা হলো। বিহারের পর নোয়াখালির দাঙ্গার সংবাদ পেলাম। মাখনলাল বন্দোপাধ্যায় নামে এক ভদ্রলোক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তার বাড়ি নোয়াখালি। নোয়াখালি দাঙ্গার বিস্তারিত বিবরণ তিনি আমাকে দিলেন। তিনি বললেন, ‘জানেন আলী সাহেব, নোয়াখালিতে মুসলমানরা হিন্দুদের গোমাংস খাইয়েছে এবং মুসলমান বানিয়েছে।’ আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কিন্তু হত্যা তো করেনি?’ তিনি বললেন, হত্যা করলে তো ভালোই হতো। ধর্মের জন্য প্রাণ যেতো। কিন্তু এতো চরম সর্বনাশ।’ আমি তখন বুঝলাম ইসলামের প্রতি হিন্দুদের বিদ্বেষ কত প্রচণ্ড।’

মাতাল সেই সময়ে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনটা খুব মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। যার ফলে জায়গায় জায়গায় দাঙ্গা হচ্ছিল। সৈয়দ আলী আহসানের মতে, ১৯৪৬ সালেই সর্বদেশে যে বিপুল পরিবর্তন এলো, সে পরিবর্তনের পটভূমিতে অবস্থান করে কেউ নিজেকে নিরপেক্ষ বলে দাবি করার সাহস করতো না। বিচ্ছিন্ন হওয়াকেই আমরা সকল বিরোধ নিষ্পত্তির সমাধান হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। সেসময় আত্মরক্ষা এবং স্বার্থরক্ষার জন্য মুসলমানদের চেষ্টা করতে হয়েছিল।

The post কলকাতা গণহত্যা : যেভাবে দেখেছেন সৈয়দ আলী আহসান appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a6%b2%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%97%e0%a6%a3%e0%a6%b9%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be-%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87/

No comments:

Post a Comment