আবদুল্লাহিল বাকি:
প্রাককথন
ভারতের হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত আজাদী আন্দোলন সময়ের এক দীর্ঘ পরিসর দখল করে আছে। শুরু হয়েছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। পূর্ণতা লাভ করেছে ১৯৪৭ সালে হিন্দুস্তানের ভূমি থেকে পরিপূর্ণরূপে ইংরেজদের বিতারণের মাধ্যমে।
ভারতভূমিতে বাণিজ্যের জন্য প্রথম আগমন করে ইংরেজরা সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলে। তার দরবার থেকে ইংরেজরা সুরাটে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি পায় ১৬০৮ সলে। অন্যান্য অঞ্চলেও ধীরে ধীরে শুরু হয় তাদের পদচারণা। বাংলায় ইংরেজ আগমন শুরু হয় তাদের ১৬৫৮ সালে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রতিনিধি জেমস হার্ট তখন ঢাকায় প্রবেশ করে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ দিল্লির বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িশার দেওয়ানী লাভ করে। নবাবের অস্তিত্ব কেবল থাকে নামমাত্র। তখন পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে যে শাসন ব্যবস্থা শুরু হয়, সেটা দ্বৈত-শাসন নামে পরিচিত ছিল। নবাবের হাতে থাকে নিছক নামমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব। অন্যদিকে কোম্পানি পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের। এর মাধ্যমে বাংলার নবাবরা আসলে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। আর রাজস্ব আদায়ের নামে চলে ইংরেজদের অবাধ লুণ্ঠন আর জনগনের উপর অত্যাচার।
দীর্ঘ একশত বছর লাগাতার তারা হিন্দু মুসলমানের উপর জুলুম করতে থাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে। রাজনৈতিকাভাবে গভর্নর জেনারেল ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুর, ভগৎ, উদয়পুর, করাউলী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে। অর্থনৈতিকভাবে ভারতের বহুজাতিক শিল্প ধ্বংস করে ফেলা হয়। রাজস্ব নীতির নামে ভেঙে ফেলা হয় দরিদ্র কৃষকদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। লাখেরাজ সম্পত্তি করা হয় বাজেয়াপ্ত। বিপুল পরিমাণ অর্থ, সোনা রূপাসহ মূল্যবান সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করা হয়। নতুন চাকরি আইনের ফলে বহুলোক বেকার কর্মহীন হয়ে যায়। ব্যাপকভাবে পুরো ভারতবর্ষ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল হিন্দুরা ইংরেজদের প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠার কারণ ছিল- সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ, হিন্দু বিধবাদের পুনরায় বিবাহ, সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করা ইত্যাদি। হিন্দু সম্প্রদায়ের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, সমুদ্র পাড়ি দিলে ধর্ম নষ্ট হয়। অন্যদিকে মুসলমানরা ধর্মীয়ভাবে ইংরেজদের প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠে ইংরেজি শিক্ষা, খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের ধর্মপ্রচার, পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নতুন আইন ইত্যাদির কারণে।
ধর্মীয়ভাবে হিন্দু মুসলমানের ক্রোধের একটি বড় কারণ ছিল সৈন্যদের জন্য ‘এনফিল্ড’ নামক রাইফেলের প্রচলন। এই রাইফেলের টোটা দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে প্রবেশ করাতে হত। অথচ এর টোটায় মিশ্রিত ছিল গরু ও শূকরের চর্বি। দুই ধর্মের সৈন্যরাই ধর্মের কথা ভেবে বিদ্রোহী হয়ে উঠে।
এই জুলুমের প্রেক্ষাপটে পলাশী যুদ্ধের একশ বছর পর ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে প্রধানত সিপাহীদের নেতৃত্বে যে ব্যাপক সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তাকেই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা হয়। বিদ্রোহের আগুন প্রথম জ্বলে উঠে পশ্চিম বঙ্গের ব্যারাকপুরে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ বন্দুকের গুলি ছুড়ে বিদ্রোহের সূচনা করেন মঙ্গলপান্ডে নামক এক সিপাহী।
দ্রুত এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে মিরাট, কানপুর, পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বিহার, বাংলাসহ ভারতের প্রায় সর্বত্র। বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতবর্ষের বাদশা বলে ঘোষণা করে। ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং সিপাহী জনতার এই বিদ্রোহ নিষ্ঠুর হাতে নস্যাৎ করে দেয়। এই সংগ্রামের সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগ যুদ্ধে শহীদ হন। আর যারা বেঁচে ছিলেন, তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ যুদ্ধে মারা যান। বিভিন্ন কারণে এই সংগ্রাম ব্যর্থ হয়। তবে এই বিদ্রোহের আগুন মানুষের রক্তে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। সাময়িক ব্যর্থতার পরও এই বিপ্লব দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠে। সাথে সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দীর্ঘ এক শতাব্দির শাসনের অবসান হয় এখানে। শাসনভার গ্রহণ করে এরপর ব্রিটিশ রাজ ও পার্লামেন্ট।
ভারতবাসীর আন্দোলন এখানেই থেমে থাকেনি। বিস্তৃত হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীতে। আগে যেখানে আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল তুলনামূলক কম শিক্ষিতদের মাঝে, সেখানে শিক্ষিত ও মেধাবী ব্যক্তিত্বরা ধীরে ধীরে আজাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। সেই একই উদ্দেশ্যে, কমরেড মুজাফফর আহমদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। এভাবেই জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সচেতন বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মাঝে বিস্তৃতি লাভ করে আজাদী আন্দোলনের চেতনা। তবে রাজনৈতিকভাবে তারা স্বতন্ত্র শক্তি হয়ে উঠতে চাইলেও, ইউরোপীয় চেতনা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। ফলে সাধারণ জনগণের বিপুল শক্তি তাদের পক্ষে যোগ দেয়নি।
এরচেয়েও শক্তিশালী ইংরেজ-বিরোধী ধারা সামনে আসে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে। হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম হিসেবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আন্দোলন দুটি ছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপক ও জাতীয় ভিত্তিক গণ-আন্দোলন। হিন্দু মুসলমানের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।
১৯৪২ সালে ক্রিপস মিশন প্রস্তাব সব মহল প্রত্যাখ্যান করলে সমগ্র ভারতব্যাপী তীব্র গণঅসন্তোষ দেখা দেয়। উপমহাদেশের বাইরে এ সময় পৃথিবীব্যাপী চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ। আশংকা দেখা দেয়, জার্মানির মিত্র জাপান ভারত আক্রমণ করে বসতে পারে, ব্রিটিশ সরকারের উপস্থিতির কারণে। এই ভাবনা থেকে গান্ধী ইংরেজদেরকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলে। শুরু হয় কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। গান্ধীর ডাকে জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়ে এই আন্দোলনে। কিন্তু ইংরেজরা কোনভাবেই ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিল না। তাই আন্দোলনকে দমিয়ে দেবার জন্য কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, যেমন গান্ধী, আবুল কালাম আজাদ, জওহারলাল নেহরুসহ অনেককে গ্রেফতার করা হয়।
এই আন্দোলনের পরপর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ মানুষকে দিশেহারা করে তোলে। তাছাড়া দেশব্যাপী মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সব মিলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে জনগণের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। তখন সশস্ত্র যুদ্ধে ইংরেজদের পরাজিত করার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। তার সহযোগী ছিলেন রাসবিহারী বসু। কিন্তু ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তার সশস্ত্র অভিযান ব্যর্থ হয়। কিন্তু তার অভিযান থেকে ভারতীয় স্বাধীনতাকামীদের মধ্যে প্রবল আত্মবিশ্বাস ও সাহসের সঞ্চার হয়। এজন্যই ১৯৪৬ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নৌ বিদ্রোহ দেখা দেয়।
ব্রিটিশরা ভারতীয়দেরকে যেভাবে আয়ত্তে রাখতে চেয়েছিল, সেটা তাদের সামনে অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়। তাই ইংল্যান্ডের নতুন প্রধানমন্ত্রী এ্যাটলি ১৯৪৬ সালে ভারতে সাধারণ নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেন। তার পরের বছর ফেব্রুয়ারী মাসে ঘোষণা করেন তিনি যে, ১৯৪৮ সালের জুন মাসের আগেই ভারতীয়দের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
১৯৪৮ সালের ১৮ জুলাই ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ প্রণয়ন করা হয়। যার ভিত্তিতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারতবর্ষে। আজাদী আন্দোলন সফল হয়।
আজাদী আন্দোলনে হিন্দু প্রবক্তাগণ
হিন্দু ও মুসলমান সম্মিলিতভাবে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা ও প্রতিরোধে শামিল হয়েছিল। কারণ, উভয়ের জন্যই এটা যেমন ধর্মীয় সমস্যা ছিল, তেমনিভাবে ছিল জাতীয় সমস্যা। অনেক হিন্দু জমিদারের দরুণ যদিও ইংরেজদের ভিত শক্ত হয়েছে, কিন্তু হিন্দু সমাজের ভেতরও অনেক সমাজ সংস্কারক ও আজাদী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিবর্গও ছিলেন। যেমন, চন্দ্রশেখর আজাদ, রামপ্রসাদ বিসমিল, রাসবিহারী বসু, সুভাষচন্দ্র বসু, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন দাশ, লালা হর দয়াল, মোহনদাস করমচন্দ গান্ধী, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, যশোবন্ত রাও হোল্কার, হেমু কালানি, কুমার স্বামী কামরাজ নাদার, লক্ষ্মীবাঈ, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সরোজিনী নাইডু, জওহরলাল নেহেরু, বিপিনচন্দ্র পাল, মঙ্গল পাণ্ডে, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, রাজেন্দ্র প্রসাদ, লালা লাজপত রায়, বিধানচন্দ্র রায়, দয়ানন্দ সরস্বতী, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ভগৎ সিং, শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মা, পুলিনবিহারী দাস, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখ। তারা ভারতবর্ষের আজাদী আন্দোলনে কী অবদান রেখে গিয়েছেন, বা আজাদী আন্দোলন সম্পর্কে কী বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো উল্লেখ করা দুষ্কর। তাই এখানে কয়েকজনের কথাই উল্লেখ করা হচ্ছে।
রামপ্রসাদ বিসমিল: তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন শাহজাহানপুর, যুক্ত প্রদেশে ১৮৯৭ সালে। ভারতের আজাদী আন্দোলনের ইতিহাসে সম্মানের সাথে তার নাম উঠে আসে। বিপ্লবী সংগঠন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান এসোসিয়েশনের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। উর্দু ও হিন্দিতে তিনি ভাল কবিতা লিখতে পারতেন। তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ লিখেছিলেন। সবকটিই বাজেয়াপ্ত হয় ইংরেজ সরকারের তরফ থেকে। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে কাকোরি বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং এটির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা শুরু করে। এই মামলার বিচারে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ী, ঠাকুর রৌশন সিং, আসফাকউল্লা খানের ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭ সালে গোরখপুর জেলে ফাঁসি দেওয়া হয়। মাত্র তিরিশ বছর বয়সে তিনি ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ উৎসর্গ করেন।
তিনি মৃত্যুবরণ করলেও বেঁচে ছিল তার একটি অনবদ্য উর্দু গান ‘সারফারোশি কি তামান্না আব হামারে দিল মে হে দেখ না হে জোর কিতনা বাজো হে কাতিল মে হে’। এই গানটি লিখিত হওয়ার পর থেকে মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল এর সুর। অনেক বিপ্লবী ফাঁসির মঞ্চে এই গান গেয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছে। গানটার সরল তর্জমা হতে পারে এমন, যদিও মূল ভাষার আবেদন তাতে হারিয়ে যায়,
আত্মত্যাগের চেতনা (ইচ্ছা) এখন আমার হৃদয়ে (প্রজ্জলিত)
আজ দেখবো ঐ খুনিদের বাহু কি পরিমাণ শক্তি রাখে
কেনো আজ মুখে আর কোন কথা নেই?
এখানে যাকেই দেখি সে চুপচাপ বসে আছে!!
হে জাতি-ও-জন্মভূমির উদ্দেশ্যে শহীদ-ভাইয়েরা, তোমাদের কাছে আমার আত্মসমর্পণ
তোমাদের সাহসের আলোচনা এখনো শত্রুর শিবিরে হয়,
আত্মত্যাগের চেতনা আজ আমার হৃদয়ে (প্রজ্জলিত)
সময় হোক হে আসমান, তোকে-ও তখন জানিয়ে দেব
এখন কি আর বলব আমার হৃদয়ে কি লুকানো আছে
আত্মত্যাগের তাড়না আজ সবাইকে এখানে টেনে এনেছে
(দেশ)প্রেমিকদের আজ জলসা বসেছে মৃত্যুর মেহফিলে
আত্মত্যাগের চেতনা আজ আমাদের হৃদয়ে (প্রজ্জলিত)
হাতিয়ার হাতে নিয়ে দুশমন দাগের ঐপারে অপেক্ষারত
সীনা বাড়িয়ে দিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি এইপাশে
রক্তে আজ হোলি খেলব যদি দেশ বিপদে পড়ে
আত্মত্যাগের চেতনা আজ আমার হৃদয়ে (প্রজ্জলিত)
আবেগের উন্মাদনায় উত্তোলিত যেই হাত তা তলোয়ারে কাটা পড়েনা
যেই শির একবার সোজা হয়ে যায়, কোন হুমকি ঐ তাকে নোয়াতে পারেনা
চেতনার ঐ অংগার আজ বাড়তে বাড়তে আগুনে পরিণত হবে
আত্মত্যাগের চেতনা আজ আমার হৃদয়ে
আমরাতো মাথায় কাফন বেধেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম
হাতের মুঠিতে প্রাণ নিয়ে আজ এগিয়ে যাই
জীবন যেনো বা মৃত্যুর মেহফিলে এক মেহমান
আত্মত্যাগের চেতনা আজ আমাদের হৃদয়ে (প্রজ্জলিত)
বধ্যভূমিতে দাড়িয়ে খুনেরা আওয়াজ দিচ্ছে
”তোমাদের কারো মাঝে কি দেশের জন্য শহীদ হওয়ার ইচ্ছা আছে”?
(আজ) হৃদয়ে তুফানের উন্মাদনা, আর শিরায় শিরায় বিপ্লবের ডাক
গন্তব্যের কি ঐ সাহস আছে যে আমাদের থেকে দূরে সরে থাকবে?
আত্মত্যাগরে চেতনায় আজ হৃদয় (প্রজ্জলিত)
ঐ শরীর কিসের শরীর যদি রক্তে না থাকে উন্মাদ-আবেগ
তুফানের সাথে সে কি লড়বে যে সৈকত-ভেড়া নৌকায় বসে আছে
চুপ দাড়িয়ে আছে, নীরব আজ আমার সব স্বদেশী ভাইয়েরা।
কিছু না করলেও কিছু বল অন্তত জাতি যে আমার আজ বিপদগ্রস্ত
আত্মত্যাগের চেতনা আাজ আমার হৃদয়ে প্রজ্জলিত
(আজ) দেখব ঐ খুনেদের বাহু কি পরিমাণ শক্তি ধরে
সুভাষচন্দ্র বসু: তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চিরস্মরণীয় নাম। নেতাজি নামেই তিনি অধিক পরিচিত। পরপর দুবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু গান্ধীর সাথে আদর্শগত সংঘাত, কংগ্রেসের পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনার কারণে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। তিনি মনে করতেন, গান্ধীর অহিংসানীতি ভারতের আজাদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এই কারণেই তিনি বেছে নেন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। প্রতিষ্ঠা করেন ফরওয়ার্ড ব্লক নামে এক রাজনৈতিক দল। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের পূর্ণ ও সত্বর স্বাধীনতার দাবী জানাতে থাকেন। ব্রিটিশ কতৃপক্ষ তাকে প্রায় এগারবার কারারুদ্ধ করেছিল।
সুভাষচন্দ্র বসু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তৃতার মাধ্যমে আজাদী আন্দোলনের আগুন মানুষের রক্তে রক্তে জ্বালিয়ে দেন। ১৯৪৪ সালের ৪ জুলাই বার্মাতে এক র্যালিতে তিনি বলেছিলেন, ‘তুম মুঝে খুন দো, ম্যায় তুমহে আজাদি দুঙ্গা’ (তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব)। এছাড়াও তার অনেক প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে বিপ্লব ও আজাদী সংগ্রাম সম্পর্কে। তিনি বলেছিলেন, ‘ভারত ডাকছে। রক্ত ডাক দিয়েছে রক্তকে। উঠে দাঁড়াও আমাদের নষ্ট করার মতো সময় নেই। অস্ত্র তোলো!..যদি ভগবান চান , তাহলে আমরা শহীদের মৃত্যু বরণ করব।’
আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যখন দাঁড়াব, আজাদহিন্দ ফৌজকে গ্র্যানাইটের দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে হবে। আমরা যখন মার্চ করব তখন আজাদহিন্দ ফৌজকে স্টিমরোলার হতে হবে।’ আদর্শ ও চিন্তার অবিনশ্বরতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘কোনও একটা চিন্তার জন্য একজন মৃত্যুবরণ করতেই পারেন। কিন্তু সেই চিন্তার মৃত্যু হয় না। সেই চিন্তা একজনের মৃত্যুর পর হাজার জনের মধ্যে ছড়িয়ে যায়।’
‘দিল্লী চলো’ নামে তার একটি বক্তৃতা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়। সেটা ছিল ৯ই জুলাই, ১৯৪৪ সালে দেয়া একটি বেতার বক্তৃতা। সেখানে তিনি বলেছিলেন, “একমাত্র প্রশ্ন এই, আজাদ-হিন্দ-ফৌজ জাপানের সশস্ত্ৰ বাহিনীর সাহায্যে এবং স্বদেশস্থিত স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের সহায়তায় ভারতে বৃটিশ-শক্তির উচ্ছেদ করতে পারবে কিনা৷ আমার উত্তর-“হাঁ, পারবে।” আমি নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তববাদীর মতোই কথা বলছি। আমি, ভারতে বৃটিশদের শক্তি জানি। দেশে ভারতীয় জনগণের যে শক্তি আছে, তাও আমি জানি। ইন্দোব্রহ্ম-সীমান্তে এবং ভারতের অভ্যন্তরে মণিপুর ও আসাম অঞ্চলে ইঙ্গ-মার্কিন সৈন্যদের শক্তি আমি দেখেছি। গত ফেব্রুয়ারী থেকে এই অভিযানে যেসব যুদ্ধবন্দী আমাদের পক্ষে এসেছে তাদের আমি দেখেছি এবং তাদের সঙ্গে কথাও বলেছি। আমাদের যে সব সহকৰ্ম্মী এবং চর বৰ্ত্তমানে ভারতের অভ্যন্তরে কাজ করছেন, তঁদের কাছ থেকে ও বিবরণ পেয়েছি। এই সব থেকে নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরেছি, আমরা বিদেশের অধীনতাপাশ থেকে ভারতকে মুক্ত করতে পারব। কিন্তু সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠোর হবে। ভারতের মাটিতে সাম্রাজ্যরক্ষার শেষ চেষ্টায় বৃটিশরা প্ৰাণপণে যুদ্ধ করবে। এ যুদ্ধে এপৰ্যন্ত তারা সেরূপ যুদ্ধ করেনি। কিন্তু আমরা যেরূপ সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করব বৃটিশের বেতনভোগী সেনাদল সেরূপ যুদ্ধ করতে পারবে না-বা করবে না। তাছাড়া আমাদের মনে মনে এই প্রেরণা আছে, আমরা ন্যায়ের জন্যে, সত্যের জন্যে এবং আমাদের জন্ম-স্বত্ব স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছি। আমরা যখন স্বাধীনতার পূর্ণ-মূল্য দিতে প্ৰস্তুত এবং আমাদের যখন সমরোপযোগী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবাহিনী আছে, তখন পৃথিবীর কোন শক্তিই আমাদের বিজয়ের পথে রাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। এবার ভারতবর্ষ মুক্ত হবেই। এই আমাদের অনমনীয় দৃঢ় সংস্কল্প। ঈশ্বরের ইচ্ছাও তাই।”
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী: তার কথা আজাদী আন্দোলনের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। দীর্ঘকাল তিনি ভারতের আজাদী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তবে তার পন্থা ছিল অনেকটা শান্তিপূর্ণ। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক নেতা; সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া ইংরেজ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তিনি অবলম্বন করেছিলেন অহিংসানীতি। এই অহিংসানীতি সম্পর্কে আপন আত্মজীবনীতে তিনি বলেছিলেন, ‘যখন আমি হতাশ হই, আমি স্মরণ করি সমগ্র ইতিহাসেই সত্য ও ভালবাসার জয় হয়েছে। দুঃশাসক-হত্যাকারীদের কখনো অপরাজেয় মনে হলেও শেষ সবসময়ই তাদের পতন ঘটে মনে রাখবেন সর্বদাই।’ তার এই নীতিকে সুভাষচন্দ্রের মত অনেক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বই আজাদী আন্দোলনের জন্য ফলপ্রসূ মনে করেননি।
১৯৪২ সালে ৯ আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (Quit India Movement) গান্ধীর কণ্ঠ পাল্টে যায়। ৮ আগস্ট গোয়ালিয়ার ট্যাঙ্ক ময়দানে তিনি জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন, ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে।’ তিনি সেখানে আরো বলেছিলেন, ‘আমি অবিলম্বে স্বাধীনতা চাই। এমনকি এই রাত্রির মধ্যেই, উষালগ্নের আগেই যদি তা সম্ভব হয়। আমরা লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করবো। আর এ হবে আমাদের জীবনে শেষ লড়াই।’
আজাদী আন্দোলনে মুসলিম প্রবক্তাগণ
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ক্ষমতা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ঘটনা আকস্মিক ছিল না। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। চকিত হয়ে উঠল সবাই। যারা ঘুমিয়ে ছিল তারা জেগে উঠল, যারা বসে ছিল তারা দাঁড়িয়ে গেল। বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ক্রমে ক্রমেই জমে উঠছিল।
এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ তুললেন বিখ্যাত ধর্মীয় আলিম ও দার্শনিক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী। মুসলমানদের হাত থেকে যেহেতু ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কাজেই আঘাতটা মুসলমানদের মনেই বেশি করে বাজবে, এটা স্বাভাবিক। আর এই বিরোধিতা তাত্ত্বিক রূপ লাভ করেছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধর্মীয় মতামতের মধ্য দিয়ে। তিনি স্পষ্টই রায় দিলেন, ‘ইসলাম ধর্মীয় বিধান ও রাজনৈতিক ক্ষমতা, এই দুই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। কাজেই এই পরাধীন পরিবেশে ইসলাম কখনই সজীবতা ও স্ফূর্তি লাভ করতে পারে না।’
তার এই সূত্রটির যুক্তিযুক্ত রূপায়ন ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে তার শিষ্য প্রশিষ্যবর্গ বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম শুরু হয়। তারই সুপুত্র আবদুল আজিজ হিন্দুস্তানকে দারুল হারব ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরো জোরদার করে তোলেন। তার প্রেরণায়ই জেগে উঠেন সৈয়দ আহমাদ বেরেলভী। এখান থেকেই শুরু হয় মুসলমানদের সংগ্রাম, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে। ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনে মুসলমানরা সাড়া দিয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন যোগ্য উলামা ও শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ। যেমন, ফজলে হক খায়রাবাদী, মাওলানা কাসেম নানুতবী, রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী, শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, মৌলভী বরকতুল্লাহ, ওবাইদুল্লাহ দিন্ধী, রহমত আলী জাকারিয়া, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা মুহাম্মদ আলী, ড. সাইফুদ্দিন কিচলু, মুখতার আহমদ আনসারী, হাসরত মোহানী, মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানী, হাবিবুর রহমান লুধিয়ানী প্রমুখ। এখানে তাদের কয়েকজনের ভূমিকা তুলে ধরছি।
মাওলানা শাহ আবদুল আজিজ রহ.: তিনি (১৭৪৬ – ১৮২৪) ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের বিজ্ঞ পণ্ডিত এবং উনবিংশ শতাব্দির একজন মুজাদ্দিদ। তিনি ফতওয়ায়ে আজিজীতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, “এখানে (ভারতে) অবাধে খৃষ্টান অফিসারদের শাসন চলছে, আর তাদের শাসন চলার অর্থই হল, তারা দেশরক্ষা, জননিয়ন্ত্রণ বিধি, রাজস্ব, খেরাজ, ট্যাক্স, ওশর, ব্যবসায়পণ্য, চোর-ডাকাত-দমনবিধি, মকদ্দমার বিচার, অপরাধমূলক সাজা প্রকৃতিতে (যেমন- সিভিল, ফৌজ, পুলিশ বিভাগ, দীওয়ানী ও ফৌজদারী, কাস্টমস ডিউটি ইত্যাদিতে) নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। এ সকল ব্যাপারে ভারতীয়দের কোনই অধিকার নেই। অবশ্য এটা ঠিক যে, জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ, আজান, গরু জবাই- এসব ক্ষেত্রে ইসলামের কতিপয় বিধানে তারা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে না। কিন্তু এগুলো তো হচ্ছে শাখা-প্রশাখা; কিন্তু উল্লিখিত বিষয়সমূহ এবং স্বাধীনতার মূল (যেমন- মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার) তার প্রত্যেকটিই ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং পদদলিত করা হয়েছে। মসজিদসমূহ বেপরোয়াভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, জনগণের নাগরিক স্বাধীনতা খতম করে দেয়া হয়েছে। এমন কি মুসলমান হোক কি হিন্দু, পাসপোর্ট ও পারমিট ব্যতীত কাউকে শহরে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। সাধারণ প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদেরকে শহরে আসা-যাওয়ার অনুমতি দানও দেশের স্বার্থে কিংবা জনগনের নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে না দিয়ে নিজেদের স্বার্থেই দেওয়া হচ্ছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেমন সুজাউল মুলক, বেলায়েতী বেগম প্রমুখ ইংরেজদের অনুমতি ছাড়া বাইর থেকে প্রবেশ করতে পারছেন না। দিল্লী থেকে কলকাতা পর্যন্ত তাদেরই আমলদারী চলছে। অবশ্য হায়দ্রাবাদ; লক্ষ্ণৌ ও রামপুরের শাসনকর্তাগণ ইংরেজদের আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ায় সরাসরি নাছারাদের আইন সেখানে চালু নেই। কিন্তু এতেও গোটা দেশের উপরই দারুল হরবেরই হুকুম বর্তায়।”
ফজলে হক খায়রাবাদী: তিনি (১৭৯৭ – ১৮৬১) ছিলেন একাধারে দার্শনিক, যুক্তিবিদ, ধর্মতাত্ত্বিক, কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি জেহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমেই তিনি আজাদী আন্দোলনের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর ফতোয়ার অভিযোগে আন্দামান দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয় তাকে। সে দ্বীপে তাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তার এক হৃদয় বিদারক বর্ণনা এবং উপমহাদেশে ইংরেজদের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সাথে থাকা কাপনের কাপড়ে কয়লা দিয়ে তিনি এক কিতাব লিখেছিলেন। অবশেষে সারা দুনিয়াব্যাপী বিশ্বখ্যাত এ জ্ঞান সাধকের কারা নির্যাতনের প্রতিবাদ ও আল্লামা খায়রাবাদী (রাহঃ)-এর জ্ঞান-প্রতিভার প্রতি আকৃষ্ট উর্ধ্বতন এক ইংরেজ কর্মকর্তার জোর তদবিরে কয়েক বছর পর তাকে বৃটেনের প্রিভি কাউন্সিল মুক্তির নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়। এ মুক্তির নির্দেশনামা নিয়ে খায়রাবাদীর ছেলে যখন আন্দামানে গিয়ে উপস্থিত হলেন, দেখলেন আন্দামানবাসীরা একটি জানাজার নামাজে মিলিত হচ্ছেন। উক্ত জানাজায় শরীক হয়ে জানতে পারলেন এটা তার পিতা বিশ্বখ্যাত জ্ঞান সাধক আল্লামা খায়রাবাদী’র জানাজা। অবশেষে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা অবতারণার পর পিতার কাফনে লিখিত কিতাবখানি নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল তাকে। আল্লামা ফজলে হক খায়রাবাদী’র শত শত কিতাবের মধ্যে এটিও একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব, যাতে ব্রিটিশ শাসনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। গ্রন্থটি পরবর্তীতে ‘আস-সাওরাতুল হিন্দিয়াহ’ নামে প্রকাশিত হয়। আরবি থেকে বিভিন্ন ভাষায় এটি অনূদিত হয়।
বিপ্লবের পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে সেখানে তিনি বলেছিলেন, “১৮৫৮ সালের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর হতে সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেশের প্রতিটি সমৃদ্ধিশালী জনপদ উজাড় হয়ে গিয়েছে, মানুষের উপর নেমে এসেছে সীমাহীন দুঃখ-কষ্টের অনন্ত অভিশাপ। সেই ঘটনার উত্তরফল হিসাবে এই দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের ভাগ্যাকাশে এসে জমা হয়েছে দুশ্চিন্তার মেঘ। আর সেই মেঘ হতে একের পর এক বিপদের বজ্ররাশি পতিত হচ্ছে সেই নিরীহ দেশবাসীরই মাথায়। তারই দরুন দেশের যারা শাসক ছিলেন তারা আজ পথের ফকীর, আমীর আজ কাঙ্গাল, বাদশাহ গোলাম ও জনসাধারণ পরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে।
এই দেশের ভাগ্যে দুঃখের এই কাহিনী শুরু হয়েছে হিংসুক বিধর্মী নাসারাদের এক গভীর কু-মতলবের পরিণতি হিসাবে। তারা এই দেশের শহর-বন্দর, মাঠ-ময়দান সবকিছু দখল করার পরও এই দেশবাসীর প্রতি সীমাহীন বিদ্বেষে ফেটে পড়তে থাকে। এই দেশের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান লোকদেরকে এক এক করে এমন দুর্দশার মধ্যে পতিত করতে শুরু করে, যাতে কুশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ একটু প্রতিবাদ জানাবার জন্য মাথা তুলবার মতও আর কেউ অবশিষ্ট না থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা এই দেশের ছোট-বড়, আমীর-ফকীর এবং শহর ও পল্লীর সকল লোককেই খৃস্টধর্মে দীক্ষিত করে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চিরস্থায়ী করার এক হীন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এদের ধারণা ছিল যে, এই দেশের নিরীহ অধিবাসীদেরকে এই ষড়যন্ত্রজাল হতে রক্ষা করার জন্য কেউই এগিয়ে আসবে না। সুতরাং সরলভাবে তাদের সেই ষড়যন্ত্রের জালে ধরা দেওয়ার পরিবর্তে কেউই অবাধ্যতা প্রকাশ করতে সাহসই করবে না। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের খাতিরে এই দেশের সকল ধর্মাবলম্বীকে খৃষ্টধর্মের মাধ্যমে একটা মাত্র অনুগত জাতিতে পরিণত করাই ছিল তাদের শেষ লক্ষ্য। তারা খুব ভালভাবেই এই কথা অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছিল যে, এই দেশবাসীর ধর্মীয় বোধ এবং এই নতুন শাসক শ্রেণীর ধর্মীয় বোধের মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান, তা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহিত সংঘর্ষ অনিবার্য করে তুলবে এবং অবশেষে সে সংঘর্ষ বিপ্লবাত্মক সংগ্রামে পরিণত হবে। এটা উপলব্ধি করে শাসকশ্রেণী সর্বপ্রকার ধর্মীয় চেতনার বিলুপ্তি-সাধন করার জন্য নানা প্রকার জঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার এবং শিশুশিক্ষার নামে সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষা ও তামান্দুন শিক্ষাদানের জন্য অসংখ্য মিশনারী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। আর সঙ্গে সঙ্গে এই দেশের প্রাচীন মক্তব, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য বিদ্যালয়গুলি ধ্বংস করার কার্যে প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে।”
শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান: তিনি (১৮৫১ – ১৯২০) একজন সর্বজনমান্য আলেম ছিলেন যেমন, তেমনিভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার ত্যাগ ও কুরবানীর কারণে কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটি তাকে ‘শাইখুল হিন্দ’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯০৯ সালে মাহমুদুল হাসান তার একনিষ্ঠ শিষ্য স্বাধীনচেতা আলেম মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধিকে ডেকে এনে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রাক্তন ছাত্রদের সমন্বয়ে জমিয়তুল আনসার নামক এক সংগঠন গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। শিক্ষকের নির্দেশে সিন্ধি তাঁর ১৯ বছরের শিক্ষকতা, জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার জীবন ছেড়ে জমিয়তুল আনসারের সেক্রেটারি রূপে নিয়োজিত হন। এই সংগঠনকে নিয়ে মাহমুদুল হাসান এর একটি সুদূরপ্রসারি কর্মসূচি ছিল। তা হল দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্রদেরকে নিয়ে একটি মুজাহিদ বাহিনী গড়ে তোলা এবং ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এছাড়া মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি রহ. রেশমি রুমাল আন্দোলনের জন্যও বিখ্যাত। রেশমি রুমাল আন্দোলনের দরুণ তাকে যেতে হয়েছিল মাল্টার নির্বাসনে। সেখানে তাকে প্রচন্ড শাস্তি ও যন্ত্রণা দেয়া হত। গরম রড তার কোমরে লাগিয়ে বলা তারা বলত, ‘মাহমুদুল হাসান! ব্রিটিশদের পক্ষে একটা ফতোয়া দিয়ে দাও।’ কিন্তু তিনি এ নির্মম অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে প্রায়শই জ্ঞান হারাতেন। জ্ঞান ফিরে পেলে দীপ্ত কণ্ঠে বলতেন, ‘ব্রিটিশরা শোন! আমি হলাম বিলাল রা.এর উত্তরসূরি। আমার শরীরের চামড়া গলে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু আমি কখনোই ব্রিটিশদের পক্ষে ফতোয়া দেব না।’
১৯২০ সালের অক্টোবর ১৯, ২০, ২১ তারিখে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে আবুল কালাম আজাদও ছিলেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি। এখানে তিনি একটা ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করেছিলেন; যাতে ভারতে ভবিষ্যতের ইসলামপন্থীদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। এখানে তিনি বলেছিলেন, “ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ইংরেজ, যাদের সাথে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করা ফরজ। ইংরেজ সরকারী যত পদ, সদস্যতা, অধ্যাপনা, কাউন্সিল, চাকুরি.. সব ছেড়ে দিতে হবে, সম্পর্ক ছিন্ন করার লক্ষ্যে। ব্রিটিশদেরকে বাণিজ্যিকভাবে বয়কট করা উচিত। ইংরেজ আদালতে কোনো মামলা দায়ের করা যাবে না।”
এই অধিবেশনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া হারাম ঘোষণা করা হয়। ফতোয়া প্রকাশের ক্ষেত্রে ৫০০ জন আলেমের সাক্ষর নেওয়া হয়। ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে এই ফতোয়া বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। ফতোয়ার দরুণ হুসাইন আহমাদ মাদানী, মুহাম্মদ আলি জাওহার সহ অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়।
মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী: তিনি আন্দোলনে যোগ দান করেন ১৯১৬ সালে। ১৯২০ সাল পর্যন্ত শাইখুল হিন্দের একান্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ঐ বছর শাইখুল হিন্দ ইন্তেকাল করেন। পরে আন্দোলনের প্রধান দায়িত্ব অর্পিত হয় তার হাতে। তিনি ১৯১৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত মোট ৩১ বছর স্বাধীনতার সংগ্রাম করেন। এর মধ্যে ৩১ বছর তিনি মাঠে ময়দানে সক্রিয় আন্দোলনের সুযোগ পান। জমিয়তে উলামা, জাতীয় কংগ্রেস ও খেলাফতের বহু মিটিং, সভা ও সম্মেলনে বক্তৃতা দেন। ঐ সকল বক্তৃতা পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তার ‘নকশে হায়াত’ গ্রন্থ আজাদী আন্দোলনের ইতিহাস সংক্রান্ত অন্যতম উপাত্ত গ্রন্থ। এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করা মুসলমানদের ধর্মীয় কর্তব্য। কেননা জাগতিক সুষ্ঠু জীবন যাপনের জন্য যেমন দেশের স্বাধীনতা জরুরী, তেমনিভাবে আল্লাহ কতৃক প্রদত্ব ধর্মীয় বিধি-বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে পালনের জন্যও স্বাধীনতা আবশ্যক।’
আরেকটি বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘ইসলাম কোন ধরণের জুলুম সমর্থন করে না। বরং জুলুমের প্রতিবাদ করা ও জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার শিক্ষা দেয়। কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া কিংবা নির্যাতিত অবস্থায় পরাধীন জীবন যাপনে পরিতুষ্ট হয়ে থাকাও ইসলাম পছন্দ করে না।’
আজাদী আন্দোলনকে তিনি ‘আল-জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ হিসেবে মনে করতেন। এক চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন, ‘আমি সংগ্রামের এ কঠিন অঙ্গনে পার্থিব কোন লোভে অবতীর্ণ হইনি। এ আন্দোলনকে আমি ‘কাফিরের বিরুদ্ধে পবিত্র জিহাদ’ বলে বিশ্বাস করি। দ্বীন ও শরীয়তের স্বার্থে একটি পবিত্র সংগ্রাম বিবেচনা করেই আমি অন্তর্ভূক্ত হয়েছি।’
এভাবেই তাদের আত্মত্যাগ, কোরবানী, জেল-জুলুম সহ্য করার মধ্য দিয়েই আজাদী আন্দোলন সফল হয়েছে। স্বাধীনতার সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে পরাধীন জাতির মুখ। ইতিহাস কখনোই তাদের এই ত্যাগ, প্রচেষ্টাকে ভুলতে পারবে না। অমর হয়ে থাকবেন তারা মানুষের অন্তরে ও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণোজ্জল ভাষ্কর্যের মতো…
তথ্যসূত্র:
১. কোকা আন্তোনভা, গ্রিগোরি বোনগার্দ লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি, ভারতবর্ষের ইতিহাস, অনুবাদ: মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন শর্মা, প্রকাশ: প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮২ ই.
২. কার্ল মার্কস, ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা-যুদ্ধ ১৮৫৭-১৮৫৯ (রচনাসংকলন)
৩. হায়দার আলী চৌধুরী, পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ, প্রকাশ: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, জুন ১৯৮৭ ই.
৪. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (পাঠ্যপুস্তক)
৫. সুভাষচন্দ্র বসু, দিল্লী চলো
৬. ফয়সাল আহমাদ নদভী, তাহরিকে আজাদী মে উলামা কা কারদার, প্রকাশ: মাজলিসে তাহকীকাত ওয়া নাশরিয়াতে ইসলাম
৭. সুলাইমান মানসুরপুরী, তাহরীকে আজাদী হিন্দ মে মুসলিম উলামা ও আওয়াম কা কারদার, প্রকাশ: কুতুব খানায়ে নাঈমিয়া দেওবন্দ, জুন ২০০৪ ই.
৮. মাওলানা ফযলে হক খায়রাবাদী, আযাদী আন্দোলন ১৮৫৭, (মুহিউদ্দিন খান অনূদিত), প্রকাশ: মদীনা পাবলিকেশান্স, ঢাকা
৯. সত্যেন সেন, বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা, প্রকাশ: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, পুরানা পল্টন, ফেব্রুয়ারী ১৯৮৬
১০. জুলফিকার আহমদ কিসমতী, আজাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা
The post আজাদী আন্দোলন : ‘প্রবক্তাদের ভাষ্যে’ appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%be/
No comments:
Post a Comment