Friday, August 14, 2020

‘ফিরে দেখা দেশবিভাগ’ : শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষ্যে

মাহবুব ওয়াসেল:

ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। খুব কাছ থেকে দেখেছেন ভারত-ভাগের সময়টাকে। তার দেখার বিস্তারিত বর্ণনা তিনি দিয়ে গেছেন তার লেখায়। দেশভাগ নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষ্য কেমন ছিল, তাই তুলে ধরবো এই লেখায়।

ক্যাবিনেট মিশন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪০’র দশকের মাঝামাঝি ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ভারতবর্ষে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। সেটির নাম ছিল ক্রিপস মিশন। যুদ্ধের পর ক্লিমেন্ট অ্যাটলি যখন লেবার পার্টির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি ১৯৪৬ সালের ১৫ই মার্চ ভারতবর্ষে ক্যাবিনেট মিশন পাঠানোর ঘোষণা দেন। সে ক্যাবিনেট মিশনে তিনজন মন্ত্রী থাকবেন; তাঁরা ভারতবর্ষে এসে বিভিন্ন দলের সাথে পরামর্শ করে ভারতবর্ষকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীনতা দেয়া যায়, সে চেষ্টা করবেন। কিন্তু তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কথায় মুসলমানদের পাকিস্তান দাবির কথা তো উল্লেখ নাই-ই, বরং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দাবিকে তিনি কটাক্ষ করেছিলেন। মি: অ্যাটলি বলেছিলেন, Mr. Atlee declares that minorities cannot be allowed to impede the progress of mejorities. মি: অ্যাটলির বক্তব্য নিয়ে কংগ্রেস সন্তোষ প্রকাশ করলেও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সে বক্তৃতার তীব্র সমালোচনা করেন।

ক্যাবিনেট মিশন ২৩শে মার্চ ভারতবর্ষে এসে পৌঁছাল। তাঁরা ভারতবর্ষে এসে যেসব বিবৃতি দিয়েছিল, সেগুলো মুসলমানদের বিচলিত করে তোলে। তখন শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুসলিম লীগের তরুণ রাজনৈতিক নেতারা দলবল নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে যেতেন। শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আমরা দলবল বেঁধে শহীদ সাহেবের কাছে যেতাম, তাকে জিজ্ঞেস করতাম কী হবে? শহীদ সাহেব শান্তভাবে উত্তর দিতেন ‘ভয়ের কোন কারণ নাই, পাকিস্তান দাবী ওদের মানতেই হবে।’

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন

হঠাৎই ১৯৪৬ সালের ৭, ৮, ৯ই এপ্রিল মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দিল্লিতে সমগ্র ভারতবর্ষের মুসলিম লীগ-পন্থী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন ডাকেন। তখন সমগ্র ভারতবর্ষে ১১টি প্রদেশ ছিল। এরমধ্যে চারটি ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। এই চারটির মধ্যে একমাত্র বাংলায় এককভাবে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করেছিল।

শেখ মুজিবুর রহমান সহ ১০-১৫ জন ছাত্রকর্মী বাংলা থেকে সে কনভেনশনে যোগ দেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেন,

‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আহবানে দিল্লি যাওয়ার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করতে বললেন। ট্রেনের নাম দেয়া হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল’। কলকাতার হাওড়া থেকে ছাড়বে সে ট্রেন। ১০-১৫ জন ছাত্রকর্মী বাংলা থেকে সে কনভেনশনে যোগ দিব। এ ব্যাপারে শহীদ সাহেবের অনুমতি পেলাম। পুরো ট্রেনটিকে মুসলিম লীগের পতাকা ও ফুল দিয়ে সাজানো হলো। ‘নারায়ে তকবির’, ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ জিন্দাবাদ’, ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ’ ধ্বনির মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিল।

কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশনে হাজার-হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দেখার জন্য। তারা ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ’ এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দিতে থাকে। এজন্য প্রায় আট ঘণ্টা দেরিতে ট্রেনটি দিল্লি পৌঁছাল। জিন্নাহ সাহেব কনভেনশন বন্ধ করে রেখেছেন আমাদের জন্য। আমরা বাংলায় স্লোগান দিতে দিতে সভায় উপস্থিত হলাম। সমস্ত সদস্য জায়গা থেকে উঠে আমাদের সম্বর্ধনা জানালো। জিন্নাহ সাহেব বক্তৃতা করলেন। সমস্ত সভা নীরবে তার বক্তৃতা শুনলো। মনে হচ্ছিল সকলের মনে একই কথা। পাকিস্তান কায়েম করতে হবে।’

‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’

মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্রিটিশ সরকার ও ক্যাবিনেট মিশনকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতবর্ষের ১০ কোটি মুসলমান পাকিস্তান দাবি আদায় করতে বদ্ধপরিকর। তাই তিনি ঘোষণা করলেন, ১৯৪৬ সালের ১৬ই অগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ পালন করা হবে। দিনটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য তিনি বিবৃতিও দিয়েছিলেন। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা এই ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে বলে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান দিনটির স্মৃতিচারণ করে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ’আমাদের ডাক পড়লো দিনটি সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য। হাশিম সাহেব আমাদের নিয়ে সভা করলেন। আমাদের বললেন, তোমাদের মহল্লায় যেতে হবে, হিন্দু মহল্লায়ও তোমরা যাবে। তোমরা বলবে, ‘আমাদের এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আসুন আমরা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দিনটা পালন করি।’ আমরা গাড়িতে মাইক লাগিয়ে বের হয়ে পড়লাম। হিন্দু মহল্লায় ও মুসলমান মহল্লার সামনে প্রোপাগান্ডা শুরু করলাম। অন্য কোন কথা নাই, ‘পাকিস্তান’ আমাদের দাবী। এই দাবী হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে।’ ফরোয়ার্ড ব্লকের কিছু নেতা মুসলিম লীগের অপিসে এসে এই দিনটা যেন হিন্দু মুসলিম এক হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা যায়, তার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রপাগান্ডার কাছে তারা টিকতে পারলো না। হিন্দু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিলো এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।’

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। দিনটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য তিনিও বলে দিলেন। মি. সোহরাওয়ার্দী ১৬ই অগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন। এতে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা আরো ক্ষেপে গেল।

১৬ই অগস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে সভা হবে। সব এলাকা থেকে শোভাযাত্রা করে জনসাধারণ আসবে। কলকাতার মুসলমান ছাত্ররা ইসলামিয়া কলেজে সকাল দশটায় জড়ো হবার কথা। শেখ মুজিবুর রহমানকে ভার দেয়া হলো ইসলামিয়া কলেজে থাকতে এবং সকাল সাতটায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করতে। সকালে তিনি ও নূরউদ্দিন সাইকেলে করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে সেখানে পতাকা উত্তোলন করলেন। কিন্তু কেউ তাদের বাধা দিল না। এরপর তাঁরা আবার ইসলামিয়া কলেজে ফিরে আসেন।

কলেজে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরেই তাঁরা দেখেন, কয়েকজন ছাত্র রক্তাক্ত দেহে ইসলামিয়া কলেজে এসে পৌঁছেছে। কারও পিঠে ছুরির আঘাত, কারো মাথা ফেটে গেছে। একজন ছাত্র এসে বললো, দলবেঁধে আসলে হিন্দুরা আক্রমণ করছে না, তবে একজন দুজন করে পেলেই আক্রমণ করছে। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য শেখ মুজিবুর রহমান মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। আর এই অবস্থায় বিভিন্ন জায়গা থেকে মুসলমানদের উপর হিন্দুদের আক্রমণের খবর আসছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির দৃশ্য তুলে ধরে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে খবর এলো, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। … আমরা চল্লিশ পঞ্চাশ জন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভালো ছিল না। দেখি শতশত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করছে। মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তাঁর পিছে ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি তলোয়ার হাতে।…পাশেই মুসলমানদের কয়েকটা দোকান ছিল। কয়েক জন লোক কিছু লাঠি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াল। আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ দিতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে অনেক লোক জমা হয়ে গেল। হিন্দুরা আমাদের সামনা-সামনি এসে পড়েছে। বাধা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ইঁট পাটকেল যে যা পেল তাই নিয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করে গেল। আমরা সব মিলে দেড়শত লোকের বেশি হব না। কে যেন পিছন থেকে এসে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের কয়েকখানা লাঠি দিল। এর পূর্বে শুধু ইঁট দিয়ে মারামারি চলছিল। এর মধ্যে একটা বিরাট শোভাযাত্রা এসে পৌঁছাল। এদের কয়েক জায়গায় বাধা দিয়েছে, রুখতে পারে নাই। তাদের সকলের হাতেই লাঠি। এরা এসে আমাদের সাথে যোগদান করল। কয়েক মিনিটের জন্য হিন্দুরা ফিরে গেল, আমরাও ফিরে গেলাম।’

কলকাতার এই দাঙ্গার জন্য মুসলমানরা মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তাই তারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বেশি। শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গেছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এইভাবে মারতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়।…কলকাতার দাঙ্গা বন্ধ না হতেই আবার দাঙ্গা শুরু হলো নোয়াখালীতে। মুসলমানরা সেখানে হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করলো এবং আগুন ধরিয়ে দিল। ঢাকায় তো দাঙ্গা লেগেই আছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বিহারে শুরু হলো ভয়াবহ দাঙ্গা। বিহার প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় ‘মুসলমানদের উপর প্ল্যান করে’ আক্রমণ হয়েছিল।’

মুসলিম লীগের সরকারে যোগদান

১৯৪৬ সালের শেষদিকে ভারতের রাজনীতিতে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব মুসলিম লীগ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কংগ্রেস প্রথমে গ্রহণ করে পরে পিছিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসকে নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে বড়লাট লর্ড ওয়েভেল ঘোষণা করেন। কিন্তু লর্ড ওয়েভেল মুসলিম লীগের সঙ্গে ভাল ব্যবহার না করায় মুসলিম লীগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগদান থেকে বিরত থাকে। ওয়েভেল বলেছিলেন, মুসলিম লীগের জন্য ৫টা মন্ত্রীত্বের পদ খালি থাকলো। চাইলে যেকোনো সময় তারা যোগ দিতে পারবে। সরকারে যোগ না দেয়ায় বিপাকে পড়ে মুসলিম লীগ। একসময় জিন্নাহ-ওয়েভেল আলোচনা করে সরকারে যোগদান করতে রাজি হয়। অক্টোবরের শেষদিকে মুসলিম লীগ সরকারে যোগদান করে।

শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগ যদি কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদান না করতো, তবে কংগ্রেস কিছুতেই পাকিস্তান দাবি মানতে চাইতো না।’

ভারত ভাগের ফর্মুলা

১৯৪৭ সালের জুন মাসে ভারতবর্ষ ভাগ করার ঘোষণা এলো। ভারতবর্ষ ভাগের ফর্মুলা নিয়ে শেখ মুজিব বেশ হতাশ হয়েছিলেন। তিনি তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘কংগ্রেস ভারত ভাগ করতে রাজি হয়েছে এই জন্য যে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। কলকাতা ও তার আশপাশের জেলাগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে। মাওলানা আকরম খাঁ এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতারা এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা নাও পেতে পারি। কলকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করলো। আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ মেনে নিয়েছে এ ভাগের ফর্মুলা? বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না।’

শেখ মুজিব সহ এই অঞ্চলের নেতাদের ধারণা ছিল সমগ্র বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে। কিন্তু তারা দেখতে পেলেন আসামের মাত্র একটি জেলা, যেটি বর্তমানে সিলেট, পাকিস্তানের আওতায় আসবে যদি তারা সেটা গণভোটে জিততে পারে। হতাশার এই সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণ শংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাঁদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা যায় কি-না? বাংলাদেশের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা একটা ফর্মুলা ঠিক করেন।

শেখ মুজিবের বর্ণনা অনুযায়ী, ঐ ফর্মুলায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ হবে স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। ঐ গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্তান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে। গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে সেটি নির্ধারিত হবার বিষয়টি ফর্মুলায় উল্লেখ করা হয়েছিল। এ ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু গান্ধীর সাথে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করতে যান। এ ফর্মুলা নিয়ে মি. জিন্নাহর কোন আপত্তি ছিল না, যদি কংগ্রেস রাজি হয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছিল, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোন ফর্মুলা মানতে পারবে না।

ঐ ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু কংগ্রেস নেতাদের সাথে দেখা করতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফেরত এসেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী ও পণ্ডিত নেহরু কোন কিছুই না বলে শরৎ বসুকে সরদার প্যাটেলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন, ‘শরৎ বাবু পাগলামি ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।’

ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও কলকাতা হাতছাড়া

কলকাতা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ না হওয়ার পেছনে তখনকার মুসলিম লীগ নেতৃত্বের একটি অংশকে দায়ী করেন শেখ মুজিব। তার মতে, পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে সাথেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন, সোহরাওয়ার্দীকে সরিয়ে খাজা নাজিমউদ্দিনকে ক্ষমতায় বসানোর এক ধরণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল দিল্লিতে। কারণ উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, বাংলাদেশ ভাগ হলেও আমরা যতটুকু পাই, তাতেই সিন্ধু, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের মিলিত লোকসংখ্যার চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা বেশী। সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ রাজনৈতিক জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও কর্মক্ষমতা অনেককেই বিচলিত করে তুলেছিল। কারণ, ভবিষ্যতে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন এবং বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারও থাকবে না। আবার জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীকে ভালোবাসেন। তাই তাকে আঘাত করা দরকার।’

এক পর্যায়ে খাজা নাজিমুদ্দিন নেতা নির্বাচিত হলেন। নেতা হয়ে তিনি মুসলিম লীগ বা অন্য কারো সাথে পরামর্শ না করেই ঘোষণা করেন যে ঢাকা রাজধানী হবে। মি. নাজিমুদ্দিন দলবলসহ তখন ঢাকায় চলে আসেন। মি. নাজিমুদ্দিনের ঢাকায় চলে আসার সাথে সাথে কলকাতার উপর থেকে পাকিস্তানের দাবি আর থাকল না। তার চলে আসাটাই সব শেষ করে দিল।

শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, এদিকে লর্ড মাউন্ডব্যাটেন চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েছিলেন কলকাতা নিয়ে কী করবেন? ‘মিশন উইথ মাউন্ডব্যাটেন’ পড়লে দেখা যাবে ইংরেজরা তখনো ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে, না হিন্দুস্তানে থাকবে। আর যদি কোন উপায় না থাকে তবে একে ‘ফ্রি শহর’ করা যায় কি-না? কারণ, কলকাতার হিন্দু মুসলমান লড়বার জন্য প্রস্তুত। যে কোন সময় দাঙ্গাহাঙ্গামা ভীষণ রূপ নিতে পারে। কলকাতা হিন্দুস্তানে পড়লেও শিয়ালদহ স্টেশন পর্যন্ত পাকিস্তানে আসার সম্ভাবনা ছিল। হিন্দুরা কলকাতা পাবার জন্য আরো অনেক কিছু ছেড়ে দিতে বাধ্য হত।’

কিন্তু নাজিমুদ্দিনের ঢাকায় চলে আসায় যখন গোলমালের কোন সম্ভাবনা থাকল না, তখন লর্ড মাউন্টব্যাটেন সে সুযোগে যশোর জেলায় সংখ্যাগুরু মুসলমান অধ্যুষিত বনগাঁ জংশন অঞ্চল কেটে দিলেন। নদীয়ায় মুসলমান বেশি ছিল। কিন্তু তারপরেও কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট জংশন ভারতকে দেয়া হলো। মুর্শিদাবাদে মুসলমান বেশি হলেও সেটা ভারতের অংশে দেয়া হলো। মালদহ জেলায় মুসলমান ও হিন্দু সমান হওয়ায় তার আধা অংশ কেটে দেয়া হলো। দিনাজপুরে মুসলমান বেশি ছিল। বালুরঘাট মহকুমা কেটে দেয়া হলো, যাতে জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং ভারতের অংশ হয়।

শেখ মুজিব মনে করেন, এ জায়গাগুলো কিছুতেই পাকিস্তানে না এসে পারতো না।

দেশভাগ নিয়ে নিজের আশা ভঙ্গের বেদনার কথা লিখেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি লিখেছেন, ‘যে কলকাতা পূর্ব বাংলার টাকায় গড়ে উঠেছিল, সেই কলকাতা আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলাম। কেন্দ্রীয় লীগের কিছু কিছু লোক কলকাতা ভারতে চলে যাক এটা চেয়েছিল বলে আমার মনে হয়। অথবা পূর্বেই গোপনে রাজী হয়ে গিয়েছিলেন।…সোহরাওয়ার্দী নেতা হলে তাদের অসুবিধা হত, তাই তারা পিছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল করতে চাইল। কলকাতা পাকিস্তানে থাকলে পাকিস্তানের রাজধানী কলকাতায় করতে বাধ্য হত, কারণ পূর্ব বাংলার লোকেরা দাবী করত পাকিস্তানের জনসংখ্যায়ও তারা বেশী, আর শহর হিসেবে তদানীন্তন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শহর কলকাতা।’

সূত্র: এ লেখার সব তথ্য অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে নেয়া হয়েছে।

The post ‘ফিরে দেখা দেশবিভাগ’ : শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষ্যে appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%97-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%96-%e0%a6%ae%e0%a7%81/

No comments:

Post a Comment