মুনশী নাঈম:
পুরো বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশেও নাস্তিকতা বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোতে চোখ বুলালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে তরুণদের মাঝে ধর্মদ্রোহী প্রবণতা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ধর্মচর্চা তুলনামূলক বেশিই। কিন্তু তবুও কেন বেগবান হচ্ছে?
আলেম কবি, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুসা আল হাফিজ প্রশ্নটি শুনে অবাক হলেন না। আন্তর্জাতিক কয়েকটি সমীক্ষা তুলে ধরে তিনি বললেন, শুধু বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্বেই বাড়ছে নাস্তিকতা। আরব দুনিয়ায় নাস্তিকতা কখনোই জনপ্রিয় হতে পারেনি। সেখানেও এখন নাস্তিকতা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ২০১৯ এর জুন মাসে সেখানে নাস্তিকতার মাত্রা ও পরিধি নিয়ে আরব ব্যারোমিটার একটি জরিপ করে। আরব- আফ্রিকার দশটি দেশে ২৫ হাজার মানুষের মধ্যে বিবিসি এরাবিক এর উদ্যোগে এ জরিপ হয়।। এতে দেখা যায় নিজেকে ‘ধর্মহীন’ হিসেবে পরিচয় দেন এমন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে আরব বিশ্বে। ২০১৩ সালে যেখানে এ এলাকার ৮% মানুষ নিজেদের ‘ধর্মহীন’ বলে পরিচয় দিতেন, সেখানে ২০১৮-১৯ সালে ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩%। যাদের বয়স ত্রিশের নিচে, তাদের মধ্যে ১৮ শতাংশ নিজেদের ধর্মহীন পরিচয় দিয়েছে। নাস্তিকদের বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে তিউনিসিয়া, আরব আমিরাত ইত্যাদিতে। সবচেয়ে কম হচ্ছে ইয়েমেনে। কিন্তু সেখানেও শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই আগের চেয়ে বেশি গতিতে নাস্তিকতার কাছাকাছি হচ্ছে।
বৈশ্বিক বিচারে নাস্তিকতার বৃদ্ধি একটা বাস্তবতা হয়ে উঠছে। ২০১৬ সালে গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল এর এক জরিপে দেখা যায়, ‘অনেকে দেশে এখন নাস্তিকরাই সংখ্যাগুরু’। দৈনিক আমার দেশ-এ ২০১৬ এর ৩০ জানুয়ারি খবরটি ছাপা হয়েছিলো। ডয়েচে ভেলে জরিপ করে জানিয়েছে, ইউরোপের বহু দেশে এখন নাস্তিকরাই সংখ্যাগুরু। চীনে খোদায় অবিশ্বাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুরনো বিষয়। সেখানে ৬১ শতাংশ মানুষ খোদাকে বিশ্বাস করে না। সুইডেনে এ সংখ্যা সত্তর এর কাছাকাছি। ব্রিটেনে ৫০ শতাংশ এবং জার্মানীতে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। জাপান, স্পেন, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ইত্যাদিতেও এমন লোকেরা সংখ্যায় বেশি, যারা নিজেদের ধর্মহীন মনে করেন।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশে নাস্তিকদের সংখ্যা বাড়লে অবাক হবার কিছু নেই। কারণ নাস্তিকতা ও ধর্মপরিচয় ত্যাগের যে উপাদানগুলো দেখা যায় আরব- আফ্রিকার মুসলিম দেশসমূহ কিংবা বিশ্বের নানা দেশে, সেসব উপাদান বাংলাদেশেও নানাভাবে বিদ্যমান। বিশ্বায়নের যুগে বৈশ্বিক প্রবণতার নানাদিক এবং চিন্তা ও সংস্কৃতির ভালো- মন্দ প্রভাব এখানে প্রবলভাবে ঢুকেছে, ঢুকছে।’
মাওলানা মুসা আল হাফিজের সঙ্গে কথা হচ্ছে গাড়িতে বসে। তিনি খানিকটা অসুস্থ। কিন্তু কথা বলছেন অকপটে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, নাস্তিকতা ও ধর্মপরিচয় ত্যাগের উপাদনগুলো কী কী? প্রথমেই তিনি মিডিয়ার কল্যানে বস্তুবাদী ও ভোগবাদী মানসিকতার বিশাল বিস্তৃতির প্রসঙ্গটি সামনে আনলেন। তিনি বললেন, ‘বস্তুবাদী ও ভোগবাদী মানসিকতা সারা দুনিয়ায় এখন প্রবল, পরাক্রান্ত। মানুষের রিপুর চাহিদাকে লাগামছাড়া করে দেয়া হয়েছে। মিডিয়া পর্ণোসংস্কৃতিকে বিশ্বময় দিয়েছে প্রতিষ্ঠা। জীবনকে উদ্দাম ভোগের একটি মাত্র উপলক্ষ হিসেবে দেখানো ও বুঝানো হচ্ছে। জীবন একটাই এবং এখানেই মৌজ- মাস্তির যা কিছু করার, করে যেতে হবে! কামের ও যৌনতার সকল অভিপ্রায় ও সুযোগকে চেখে নিতে হবে। এটা ব্যক্তির স্বাধীনতা। পশ্চিমা চিন্তা ও দর্শন এ স্বাধীনতাকে এক নৈতিকতা হিসেবে দেখায়। তার চোখে এটি নৈতিকতা বিরোধী নয়, এটি নিজেই এক নৈতিকতা। সারা বিশ্বে এই মানসিকতাকে বাজারজাত করা হয়েছে। তরুণদের বড় এক অংশের কাছে একে জনপ্রিয় করা হয়েছে। তারা কামের স্বাধীনতা চেয়েছে, জরায়ুর স্বাধীনতা চেয়েছে। সেখানে ধর্মগুলো বাঁধা দিতে আসে। ফলে তারা ধর্মকে নিজের জীবনকে ভোগের পথে বাঁধা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। নিজেদের কামনা পূরণের পথে এ বাঁধাকে তাঁরা গুরুত্ব দিতে চায়নি। মানে ধর্মের কথা শুনতে রাজী না হয়ে অনেকেই ধর্মহীন হয়েছে, হচ্ছে ।’
তাহলে ব্যাপারটা কি শুধু যৌনতার ক্ষেত্রেই ঘটেছে? বিদগ্ধ এই গবেষক বিষয়টির ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘না, ব্যাপারটা শুধু যৌনতার ক্ষেত্রে নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ঘটেছে। জীবন ও জগতের বিবিধ বাস্তবতা, জাগতিক ভোগ এবং জীবনদৃষ্টির প্রশ্নে বস্তুবাদী দর্শন নিত্যনতুন যুক্তি ও ভাবধারা নিয়ে হাজির হয়েছে। পশ্চিমা শিক্ষাধারা এসব যুক্তিকে ক্রমাগতভাবে প্লেস দিয়েছে। এসব দর্শন ও ভাবধারা ধর্মের বক্তব্যকে হেয় করেছে, তাচ্ছিল্য করেছে, অবজ্ঞা করেছে। অনেকের মেধা ও মনে নিজের আবেদন গড়ে নিয়েছে। অপরদিকে এসব আর্গুমেন্ট এর জবাবি আর্গুমেন্ট তারা কদাচিৎ শুনেছে। তারা বরং ধার্মিক এলাকা থেকে হুমকি, গালি, প্রাণাশঙ্কা ইত্যাদির মুখোমুখি হয়েছে। তাদের সংশয় ও আর্গুমেন্ট এর দ্বারা মোটেও দুর্বল হয়নি। উলটো বরং এতে তারা ধর্মকে একটি যুক্তিবর্জিত বর্বর ব্যাপার হিসেবে চলমান প্রচারণায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।’
কথার পিঠে কথা আসে। আমি বললাম, তারা ধার্মিক এলাকা থেকে হুমকি, গালি, প্রাণাশঙ্কা ইত্যাদির মুখোমুখি হয় প্রথম ধাপেই। যখন তারা অপেক্ষা করছে এমন বক্তব্যের, যা তাদের ভ্রান্তিনিরসন করবে। যখন তারা নাস্তিক হয়ে উঠেনি, তখনই তারা নাস্তিক অভিধা পেতে থাকে। যখন তারা কোনো বিষয়ে প্রশ্নবোধক অবস্থানে থাকছে, তখন প্রত্যাশিত জবাবের বিপরীতে নাস্তিক বলে আখ্যায়িত হচ্ছে। সে হয়তো নাস্তিক হতে চাইতো না। কিন্তু এখন জেদ করে নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে। দুনিয়ার প্রেক্ষাপট এ জায়গায় তাকে প্রেরণা দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে নাস্তিকতা ইসলামবিদ্বেষের আকারে প্রকাশিত হয়। এর পেছনে থাকে এই জেদ এবং মুসলিমদের নানাকিছুর প্রতি হেইট। আরেকটি বড় বিষয় হলো আন্তর্জাতিক পৃষ্টপোষকতা। এসব দেশে একজন মতলবী নাস্তিক সবসময় অপেক্ষা করে, কখন সে হুমকির মুখে পড়বে? কারণ, হুমকির সম্মুখিন হলেই আন্তর্জাতিক মহলের নেক নজর সে লাভ করবে। আন্তর্জাতিক পৃষ্টপোষকরাও অপেক্ষা করে, কখন এসব দেশে কোনো নাস্তিক বা অমুসলিম হুমকির কবলে পড়লো? এতে তারা আরো মনোযোগী হয়, এদেশে তাদের বিকাশ, বিস্তার ও নিরাপত্তার প্রতি। নানা সংস্থা এগিয়ে আসে। বাড়ে বিনিয়োগ। নিরাপত্তা সংকটের নামে নাস্তিক ব্যক্তি পায় তাদের সরাসরি আতিথ্য। নাস্তিকতার বিস্তারে নানা বিষয় কাজ করে। শিক্ষিত তরুণদের নানাভাবেই ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করা হয়। তাদের সামনে মিডিয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অনৈতিক ব্যাপারাদি হাজির হতে থাকে। খুব বেশি করে হাজির হতে থাকে।
বিপরীতে এমন সব ব্যক্তির মানবতাবাদী আচরণের নজিরসমূহ হাজির হতে থাকে, যারা নাস্তিক বা ধর্মহীন। তাদের সামনে বারবার এটা তুলে ধরা হয় যে, ধর্মকে কত উপায়ে লোকেরা অন্যায়ের পথে হাতিয়ার বানাচ্ছে! দেখানো হয়, ধর্ম অনেক দরকারী হলেও চলমান বিশ্ববাস্তবতায় সে বিজ্ঞান ও মানবপ্রগতির সহযাত্রী হতে পারছে না। ধর্মকে অপব্যবহারের নমুনাসমূহ দেখিয়ে বুঝানো হচ্ছে, ধর্মের আসল রূপ হচ্ছে এই। মুসলিম দুনিয়ায় মুসলমানদের আচরণ সমূহকে ইসলামের ভালো- মন্দ যাচাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। এ আচরণ যেহেতু নানা মাত্রায় হতাশার, তাই এর নেতিবাচক প্রভাব ছিলো অনিবার্য। বিশেষত সেসব তরুণমনে, যারা ইসলামের আসল রূপ জানে না। ইসলামী বলে পরিচিত নানা গোষ্ঠী ও ইসলামের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণ ও দৃষ্ঠান্তসমূহ মোটাদাগে তরুণদের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি করছে। নিজেদের শিক্ষা, রুচি, যুগমানস ও জ্ঞানচাহিদার জায়গা থেকে তারা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন বয়ানকে ক্রিটিক করে আরো বেশি বীতশ্রদ্ধ হয়েছে।’
আমি প্রশ্ন করি না। মিডিয়ার চালবাজির প্রসঙ্গটি তিনি তুলে ধরে বলেন, ‘পশ্চিমা শিক্ষা, বস্তুবাদী ও ভোগবাদী দর্শন থেকে প্রতিদিনের পত্রিকা, টেলিভিশন, হাজারো লেখক- বুদ্ধিজীবীর চিন্তাধারা, নাটক, সিনেমা, উপন্যাস, গল্প, কবিতা ইত্যাদি থেকে সে জানতে পারছে, সুখী ও আনন্দময় জীবনের জন্য আল্লাহকে না মানলেও চলে। এমনকি দেখানো হয়েছে, মানতে যাওয়াটা জীবনেরই পরাধীনতা এবং পশ্চাদগামিতা। বুঝানো হয়েছে তার কী কী দরকার। তার দরকার, মানবতাবাদী হওয়া। অবাধ ভোগের স্বাধীনতা। জ্ঞান ও অগ্রগতি। কারো ক্ষতি না করেই জীবনের স্বাদ আস্বাদন। বুঝানো হয়েছে, এর কোনোটার জন্যই ধর্ম জরুরী নয়। সুবিধাজনক নয়। বরং বাঁধা। এ পরিস্থিতিতে ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতা আজকের দুনিয়ায় ও বাংলাদেশে বিস্তৃত হচ্ছে।’
আমি চাচ্ছিলাম কথা সংক্ষিপ্ত করতে। তার অসুস্থতার কথা ভেবেই। কিন্তু তিনি আমার মতো দুর্বল নন। বিষয়টি যেহেতু গুরুতর, তিনি বলেই যাচ্ছিলেন। সবশেষে জানতে চাইলাম, আমরা যারা ধর্মানুরাগী, ধর্ম যাদের আশ্রয় এবং অবলম্বন, ধর্মের এই বিরুদ্ধ-স্রোতের বিপরীতে কী করা উচিত? ইসলামি এই চিন্তাবিদ বললেন, বিবেচনায় আনলে দেখা যায়, ‘নাস্তিকতা বিরোধী বেশির ভাগ প্রতিক্রিয়া ক্ষেত্রবিশেষে নাস্তিকতাকেই আরো শক্তিশালী করেছে। ফলত এর মোকাবেলায় কাজ ও বক্তব্য যাচ্ছেতাই কোনো ব্যাপার নয়। এ জন্য দ্বীনি ও সমকালীন জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি এবং নৈতিকতা ও দরদ- হৃদয়বৃত্তির যথার্থ মার্গ অর্জন এবং কালের ভাষা ও প্রবণতা আর প্রতিপক্ষ মতবাদের চিত্র ও চরিত্রকে আত্মস্থকরণ একান্ত প্রয়োজন। এ ধারায় কাজ দু’ চার জনের বিষয় নয়। দু’চার দিনের বিষয় নয়। নাস্তিকতা এক অব্যাহত শক্তিশালী স্রোত। এ স্রোতের বিপরীতে প্রয়োজন অব্যাহত ও শক্তিশালী কল্যাণী স্রোত। ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, এর সাথে যুক্ত আছে শিক্ষা,সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন,মূল্যবোধ, সমাজ, মিডিয়া এবং আমাদের সামগ্রিক নৈতিকতা।’
The post নাস্তিকতা কেন বাড়ছে? appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a6%9b%e0%a7%87/
No comments:
Post a Comment