Saturday, April 10, 2021

সাহিত্য ও তাসাউফ

আবদুল্লাহিল বাকি:

তাসাউফ নিছক কোনও ধর্মীয় ধারা নয়। তাসাউফ লুকিয়ে আছে মানবপ্রকৃতির ভেতরেই। জগতের গভীর সত্যকে স্পর্শ করার জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টি হল তাসাউফ। একজন সুফি সাধক তার চারপাশের জগতকে দেখেন হৃদয়ের চোখে। এজন্যই তাসাউফের নিবিড় সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই শিল্প-সাহিত্যের সাথে। এটা এমন জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি— যা প্রচলিত যুক্তির নিয়ম অগ্রাহ্য করে বিষয়গত ও রহস্যময় অর্থে প্রবেশ করে।

সুফিদেরকে সাধারণত ডাকা হত ‘কুররা’ (পাঠক), ‘যুহহাদ’ (দুনিয়াবিমুখ) ইত্যাদি নামে। তাদের অনেকেই মুসলিম সভ্যতায় সাহিত্য ও শিল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক জাহিয তাদের মধ্যে দুটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন। ১. উচ্চাঙ্গের সাহিত্য, ২. নৈতিকতার শক্তি। (আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, ৩/ ৬৫)

মদীনার এক বয়োবৃদ্ধ লোক বলেছিল, ‘আমি কোনও সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলে স্বস্তি বোধ করি না, তবে যদি তাদের মধ্যে এমন কেউ থাকে, যে হাসান বসরীর বর্ণনা আর ফারাযদাকের কবিতা শোনাতে পারে— তাহলে ভিন্ন কথা।’ (আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন ৩/ ১১৩)

তার এই কথার অর্থ কী? এর অর্থ হল, হাসান বসরীর বর্ণনাগুলোতে তিনি যেই সাহিত্যগত আনন্দ পান, তা কোনও অংশে ফারাযদাকের কবিতার সাহিত্য সৌন্দর্য থেকে কম না।

সুফিদের বিভিন্ন কথায় যে ‍রূপকতা, গভীরতা আছে, তার ভাবসৌন্দর্য অন্য ভাষার রূপান্তরে কখনোই ফুটে উঠবে না। তারা যেই সাহিত্যালঙ্কার রেখে গিয়েছেন— তা কিছুটা তুলে এনেছেন পূর্ববর্তীদের মধ্যে জাহিয, ইবনে কুতাইবা প্রমুখ।

সুফি-সাহিত্য কেবল জগতকে নিরিক্ষণের ক্ষেত্রে সাহিত্যপ্রবণতার পরিচয় দেয়নি। তৈরি করেছে নিজস্ব পরিভাষা ভাণ্ডার। পরিভাষা না বলে— বলা উচিত, তারা প্রচলিত শব্দকে নতুন অর্থের মধ্যে প্রবাহিত করেছে। এভাবেই শব্দের অর্থগত কাঠামোবদ্ধতা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এসেছে তাদের ব্যবহারে। প্রচলিত শব্দগুলোকে তারা যেভাবে অর্থ প্রদান করেছে— তার মধ্যে ফুটে উঠেছে অনুভূতিগত আত্মিক শুদ্ধতার প্রবণতা। সুফি সাধকদের এই বিশেষ শব্দগুলো তুলে ধরেছেন জুরজানী তার ‘তারিফাত’ গ্রন্থে, আবদুর রাযিক তার ‘কামুস’ গ্রন্থে। এছাড়াও এর একত্রিত সংকলন আমরা দেখতে পাই শায়েখ মুহিউদ্দিন ইবনে আরবীর ‘ইসতিলাহাতুস সুফিয়্যাহ’ গ্রন্থে। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিভাষা, সেখানের উল্লেখিত অর্থসহ তুলে ধরছি।

· মুরিদ: নিজের সকল ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে একক ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণকারী।

· সালেক: আপন জ্ঞানের সঙ্গ নিয়ে নয়— বরং আত্মিক অবস্থার আলোকে যে স্তরের পর স্তর পার হয়ে যাচ্ছে।

· সফর: হৃদয় যখন সত্যের দিকে যাত্রা করে।

· মুসাফির: যার চিন্তাভাবনা ভ্রমণ করছে বোধগম্য ও অবোধগম্য অনুভূতির পৃথিবীতে।

· হাল: কোনও ধরণের ইচ্ছা ও কষ্টকল্পনা ছাড়া হৃদয়ে যে অবস্থা তৈরি হয়।

· ওয়াক্ত: বর্তমানের সরোবরে ব্যক্তির অবগাহন। যার সাথে অতীত ও ভবিষ্যতের কোনও সংযোগ নেই।

· উনস: ঐশী উপস্থিতির সৌন্দর্যের মহিমা হৃদয়ে অনুভূত হওয়া।

· ওজুদ: অস্তিত্বের মধ্যে সত্যের অনুভূতি।

· সাকার: ঐশী স্নেহের মাদকতায় স্নায়ুতন্ত্রীগুলো শিথিল হয়ে পড়া।

· তাজাল্লি: অদৃশ্যের নূরের ঝলকানী হৃদয়ে পরিস্ফুট হয়ে উঠা।

সুফি সাধকদের গ্রন্থাবলিতে কল্পনা, চিত্র আর অলঙ্কারে ভরপুর। এই সাহিত্যের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে মনোবিজ্ঞানের সাথে এর গভীর সম্পর্ক। তাসাউফের গ্রন্থাবলির স্বাদ আস্বাদন করতে হলে এর মধ্যে নিজের সত্তাকে নিয়ে ডুব দিতে হবে। বুঝতে হবে, এটা আসলে তাদের আত্মিক শুদ্ধতার সারনির্যাস। অল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশের যে শিল্প— তা সুফি সাধকদের বিভিন্ন কথাবার্তায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তাদের কথায় যে শিল্পবোধ ফুটে উঠত— তা অসাধারণ। এখানে কিছু নমুনা তুলে না ধরলেই নয়।

সুফি সাহল বিন আবদুল্লাহ মারওয়াযিকে প্রশ্ন করা হল, ‘এত সদকা কেন করেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কেউ যদি বাড়ি পাল্টে অন্য বাড়িতে উঠতে চায়, তাহলে কি প্রথম বাড়িতে সে কোনোকিছু রেখে যায়?’

এক দুনিয়াবিমুখ সুফিকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘সবচেয়ে প্রভাবদীপ্ত নসিহত কী?’ তিনি বললেন, ‘কবরস্তান।’

হাসান বসরীকে প্রশ্ন করা হল, ‘দুনিয়া সম্পর্কে আপনার মতামত কী?’ তিনি বললেন, ‘এর বিপদের ভয় আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে এর সুখ স্বাচ্ছন্দের কথা।’

রবী বিন খাইছামকে বলা হল, ‘কোনোদিন তো আপনার মুখে অন্য কারও নিন্দা শুনলাম না।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি তো নিজের অবস্থা নিয়েই সন্তুষ্ট না। অন্যের সমালোচনার সময় কিভাবে বের করব।’

সুফি শিবলীকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘সুফিদেরকে কেন সময়ের সন্তান বলা হয়।’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কারণ তারা অতীত হয়ে যাওয়া বিষয়ের উপর আফসোস করেন না, আর ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বসে থাকেন না।’

শিবলীকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘বন্ধু কে?’ তিনি বললেন, ‘যে তোমাকে নিয়ে প্রতিটা মুহূর্তে চিন্তা করে।’ (সিয়াসাতুল ফুহুল, মরহুম হাসান তাওফিকুল আদল)

প্রতিটি সাহিত্য ধারায়ই কিছু কিছু শব্দ ও ধারণা খুব বেশি ব্যবহৃত হয়। তেমনিভাবে সুফিসাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দের নাম হল দুনিয়া। কুরআনে আমরা দেখতে পাই, দুনিয়াকে উপমা দেওয়া হয়েছে উদ্ভিদের সাথে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে সুফিগণ বেশিরভাগ সময় দুনিয়ার উপমায় টেনে আনেন রমনীর কথা। দুনিয়ার উপমায় কুরআন উদ্ভিদের কথা উল্লেখ করেছে; কারণ, মরুতে বসবাসকারী আরবদের জন্য গাছ ছিল অত্যন্ত ভালোবাসার একটা বিষয়। আর সুফিরা দুনিয়াকে যে রমনীর সাথে তুলনা দেয়— এই ধারণাটা সম্ভবত ঈসা আ.-এর একটা রূপক ঘটনা থেকে ধারণকৃত। কথিত আছে, ঈসা আ. দুনিয়াকে একটা সুন্দরী বৃদ্ধা নারীর আকৃতিতে দেখলেন।

: তুমি কতজনের সাথে বিয়ে করেছ?— জিজ্ঞেস করলেন ঈসা আ. দুনিয়াকে।

: সংখ্যাতীত মানুষের সাথে।

: সবাই কি মারা গেছে বা তোমাকে তালাক দিয়েছে?

: আমিই সবাইকে হত্যা করেছি— দুনিয়া বলল।

: তোমার বিদ্যমান স্বামীদের জন্য ধিক্কার। তারা তোমার বিগত স্বামীদের জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারল না। (উদ্দাতুস সাবিরীন, পৃ. ১৭৪)

মুসলিম ঐতিহ্যে যে সাহিত্য গড়ে উঠেছে— তার বিশাল একটা অংশ মূলত সুফিসাহিত্য অথবা সুফিদের ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত সাহিত্য। এখন প্রশ্ন হল, সুফি সাহিত্য বলে আসলে কী বোঝানো হয়? এ দ্বারা মূলত দুটি বিষয় বোঝানো হয়। ১. সুফি সাধকগণ যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাসাউফের বিভিন্ন অনুসঙ্গ নিয়ে অথবা তাসাউফকে তাত্ত্বিক রূপ দান করার জন্য। ২. যেসব গ্রন্থ তাসাউফের শাস্ত্রীয় আলাপে প্রবেশ করেনি বটে— তবে সুফিদের চিন্তাপদ্ধতি ও ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এই ধারায় আছে কবিতা, গজল ও গল্প। এই দ্বিতীয় ধারার অনেক গ্রন্থই বিশ্বসাহিত্যের আসরে স্থান করে নিয়েছে।

তবে অনেক সময় এই দুই ধারার ভেতরে পার্থক্য করা কঠিন। কারণ, যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছে তাসাউফকে তাত্ত্বিক রূপ প্রদান করার জন্যে— তার মধ্যেও উচ্চাঙ্গের সাহিত্যের রূপ মাধুর্য ফুটে উঠেছে। আবার যেসব গ্রন্থ সুফিদের ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তার মধ্যেও গল্প বা কবিতার মাধুর্যের মধ্য দিয়ে অনুরণিত হয়েছে তাসাউফের বিভিন্ন অনুসঙ্গ।

ক্লাসিক সুফিসাহিত্যে অনেক অমূল্য গ্রন্থ বিদ্যমান। এরমধ্যে রয়েছে আবদুল কারিম কুশাইরীর ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’। এখানে তিনি তুলে ধরেছেন প্রধান প্রধান সুফি সাধকদের জীবনবৃত্তান্ত, তাদের প্রজ্ঞাপূর্ণ বচন, তাসাউফের মূলনীতিমালা, পদ্ধতি, তাসাউফকেন্দ্রিক নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি।

সুফিসাহিত্যের অন্যতম একটি গ্রন্থ ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারীর লেখা ‘আল-হিকামুল আতাইয়্যাহ’। এই গ্রন্থে ছোট বড় মিলিয়ে উঠে এসেছে ২৬৪ টি প্রজ্ঞাপূর্ণ বচন। এই বচনগুলোর মধ্যে সুফিসাহিত্যের গভীর ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। আধুনিক যুগে অনেক বিজ্ঞ আলেম এই গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে আছেন, ড. সাঈদ রামাদান আল-বুতী, ড. আলী জুমা, শায়েখ সাঈদ হাওয়া প্রমুখ। এই বইয়ের মধ্যে অনেক সুন্দর সুন্দর প্রজ্ঞাবচন আছে। যেমন, বলা হয়েছে, ‘উত্তম জ্ঞান হল সেটা— যার সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকে শংকা। জ্ঞান ও শংকা পাশাপাশি থাকলে— তোমার পক্ষে। নাহলে তোমার বিপক্ষে।’

আরও বলা হয়েছে, ‘তোমার দিকে মানুষ ভ্রুক্ষেপ করছে না, বা তোমার নিন্দা করছে সবাই— এটা তোমাকে কষ্ট দেয়। এই কষ্ট নিয়ে তুমি বসে থেকো না। তোমার সম্পর্কে আল্লাহর ধারণা কী— সেটা অনুধাবণ করো। আল্লাহর ধারণা নিয়েই তুমি সন্তুষ্ট থাকো। যদি আল্লাহর ধারণা নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট না থাকো, তাহলে এই বিষয়টা তাদের নিন্দার চেয়েও বেশি মারাত্মক।’

ইমাম আবু হামেদ গাযালীও তাসাউফ সাহিত্যের ক্লাসিক ধারায় বেশ অবদান রেখেছেন। তাছাড়া তার যেহেতু উসুলি ও কালামী ধারায় যোগ্যতা ছিল, তাই তিনি সেখানের বিশ্লেষণপদ্ধতি প্রয়োগ করতে পেরেছেন তাসাউফসাহিত্যে। ‘আল-মুনকিয মিনাদ দালাল’ গ্রন্থের মাধ্যমে তাসাউফকে তিনি তুলে ধরেছেন সত্যের কাছে পৌঁছার সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে। তার সমসাময়িক সকল দলের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে সুফিসাধনার পথ কেন শ্রেষ্ঠ— সেটার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাশ্চাত্যের বিখ্যাত দার্শনিক রেনে দেকার্তের সন্দেহতত্ত্বের উপর এই গ্রন্থের প্রভাব আছে বলে মনে করেন অনেক চিন্তক। এই তত্ত্বের মূলকথাই হল, প্রচলিত জ্ঞানের সূত্র নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে হবে, যতক্ষণ না সেটার সত্যতা প্রমাণিত হয়।

তাসাউফ নিয়ে ইমাম গাযালী আরও লিখেছেন ফারসি ভাষায় ‘কিমিয়ায়ে সাআদাত’ ও আরবি ভাষায় ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দিন’। এই দুটি গ্রন্থ যুগ যুগ ধরে যেমন মুসলিম বোদ্ধামহলে গবেষণার বিষয়, তেমনিভাবে সাধারণ আমজনতাও ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে এই গ্রন্থদ্বয় দ্বারা প্রভাবিত। মুসলমানদের সংস্কৃতির বিকাশেও এর ভূমিকা কম নয়। বিশেষত দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি, সামা ও ধর্মীয় সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি বিষয়গুলো এই গ্রন্থদ্বয় থেকেই অনেকটা আগত।

সুফিসাহিত্যের গঠনে আরও অবদান রেখেছে আবু তালেব মাক্কীর ‘কুতুল কুলুব’। মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবী সুফিসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা। তিনি শুধু ধর্মীয় জ্ঞানীই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে মরমী পরাবাস্তব কবি, দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক। তাই তার লেখালেখির মাধ্যমে তাসাউফসাহিত্য ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে— যেখানে একত্রে মিশে গেছে কবিতার কল্পনা, দর্শনের তাত্ত্বিকতা আর ধর্মের নৈতিক আবহ। সুফি ধারায় তিনি কুরআনের তাফসির রচনা করেছেন। রচনা করেছেন অনবদ্য গ্রন্থ ‘ফুতুহাতে মাক্কিয়্যাহ’, ‘ফুসুসুল হিকাম’, ‘তারজুমানুল আশওয়াক’।

সুফিসাহিত্যের অন্যতম ধারা হল সুফি কবিতা। মুসলিম সভ্যতার বেশিরভাগ সুফিই কবিতা আবৃত্তি করতেন। অনেকেই সৃজন করেছেন নতুন ধারার কবিতা। তাদের কবিতায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি, প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে ঐশি আবহের কল্পনা, রূপকের আধিক্য, পীরের কাছে আত্মনিবেদন, পরম সত্যের প্রতি অনন্ত আগ্রহ ফুটে উঠেছে।

সুফি কবিতায় যারা প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে আছেন আবুল হাসান ইয়ামিন উদ্দিন আমির খসরু। তিনি ফার্সি ও উর্দু দুই ভাষায় লিখেছিলেন। তিনি ছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়ার আধ্যাত্মিক শিষ্য। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, ছিলেন এক অনন্য গায়ক, তিনি প্রাচীনতম জ্ঞাত মুদ্রিত অভিধান ( খালীক-ই-বারি ) লিখেছিলেন। তিনি ফার্সি, আরবি এবং তুর্কি উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। খসরুকে কখনও কখনও ‘ভারতের কণ্ঠস্বর’ বা ‘ভারতের তোতাপাখি’ (তুতই-ই হিন্দ) বলা হয়।

সুফি কবিতায় প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন ইবনুল ফারিদ। তার কবিতাগুলো সংকলিত করে ‘দিওয়ান’-রূপে বর্তমানে প্রকাশিত হয়েছে। তার কবিতায় রূপকভাবে উঠে এসেছে ঐশী ভালোবাসার কথা। তাকে বলা হয় ‘সুলতানুল আশেকিন’ (প্রেমিকদের সম্রাট)।

সুফিদের মধ্যে কবিতায় সর্বাধিক প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন মৌলভী জালালুদ্দিন রুমি। তিনি ছিলেন একাধারে আইনজ্ঞ, ধর্মতাত্ত্বিক, কালামবিদ, অতীন্দ্রিয়বাদী ও সুফি কবি। রুমির প্রভাব দেশের সীমানা এবং জাতিগত পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে পড়েছে; ফার্সি, তাজাকিস্তানি, তুর্কি, গ্রিক, পশতুন, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলামানরা বিগত সাত শতক ধরে বেশ ভালভাবেই তার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে যথাযথভাবে সমাদৃত করে আসছে। তার কবিতা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিভিন্ন ধারায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। তার মুরশিদ শামস তাবরিজীকে নিয়ে তিনি বলেছেন,

আমি কেন তাকে খুঁজব?
সে আর আমি তো একই
তাঁর অস্তিত্ব আমার মাঝে বিরাজ করে
তাই আমি নিজেকেই খুঁজছি!’

তার কবিতায় পরাবাস্তবতার প্রতিফলনও ঘটেছে। রূপকের উপত্যকায় ঘুরতে ঘুরতে যেন অনেক দূরে হারিয়ে গিয়েছে তার কবিতার বিভিন্ন পংক্তি। তিনি মসনবীতে বলেছেন,

আমি পাথর হয়ে মরি আবার গাছ হয়ে জন্মাই
গাছ হয়ে মরি আবার পশু হয়ে জাগি,
পশু হয়ে মরি আবার মানুষ হয়ে জন্মাই
তাহলে ভয় কীসের? কীবা হারাবার আছে মৃত্যুতে?
পরবর্তি পদক্ষপে আমি মানুষের প্রকৃতিতে মারা যাব,
যাতে স্বর্গদূতদের সাথে আমার মাথা এবং ডানা উঁচু করতে পারি,
এবং অবশ্যই স্বর্গদূতদের নদী থেকে লাফ দিব,
সবকিছুই নশ্বর শুধুমাত্র তিনি (সৃষ্টিকর্তা) ছাড়া।’

ভালোবাসা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘ভালোবাসার উদ্দেশ্য অন্য সব উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন। ভালোবাসা হলো ঈশ্বরের রহস্যপুঞ্জের জ্যোতির্বিজ্ঞান।’ রুমির প্রধান কাজ হচ্ছে “মাসনবীয়ে মানভী” (আধ্যাত্মিক দ্বিপদী)। অনেক সূফী এটিকে বিবেচনা করেন ফার্সি ভাষার কুরআন হিসাবে। এই কথার মধ্যে অতিরঞ্জন স্পষ্ট— তবুও সুফিদের হৃদয়ে এই গ্রন্থের মূল্য বোঝা যায় এই কথা থেকে।

সুফি কবিতায় অবদান রেখেছেন আরও অনেকেই। এধারায় উঠে আসবে যাদের নাম, তারা হলেন— রাবেয়া বসরী, হুসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ, হাকিম সানাঈ গজনবী (গ্রন্থ: গরিবনামা, কারনামা, ইশকনামা ইত্যাদি), শেখ সাদী (গ্রন্থ: গুলিস্তা, বোস্তা), আবদুর রহমান জামি (গ্রন্থ: লাইলি ও মজনুঁ, ইউসুফ জোলেখা ইত্যাদি), ফরিদুদ্দিন আত্তার (গ্রন্থ: মানতেকুত তাইর), আফজালুদ্দিন কাশানী (গ্রন্থ: আরজনামা, জামিউল হিকমাহ, রাহে আনজামনামা ইত্যাদি), বুল্লে শাহ (পাঞ্জাবি কবি, সুফি, দার্শনিক এবং মানবতাবাদী। তার পুরো নাম ছিল সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাহ কাদরি। ১৬৮০–১৭৫৭), হাফিজ শিরাজী, খাজা মীর দরদ, খাজা কিরমানী, জাহানারা বেগম, জেবুন্নেসা, মুঈনুদ্দিন চিশতী, মিয়া মুহাম্মদ বখশ প্রমুখ।

সুফি সাহিত্য নিয়ে বর্তমানের মুসলিমরা যেমন নতুনভাবে গবেষণা করছে, তেমনিভাবে প্রাচ্যবিদরাও গবেষণা করছে। বৈশ্বিকভাবে পরিচিত অনেক কবি সাহিত্যিকই মুসলমানদের তাসাউফ সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত— যা আধুনিক অনেক গবেষণায় তুলনামূলক পাঠে উঠে আসছে। রবীন্দ্রনাথের কথাই ধরা যাক। তিনি কেবল যে সন্তু কবির ও বাউল লালনের দর্শনেই প্রভাবিত ছিলেন এমন নয়; বরং বিশ্বসভ্যতায় ইরানের সুফিসাহিত্যের যে চিরস্থায়ী অবদান অর্থাৎ কবি জালালুদ্দিন রুমি, শেখ সাদী, হাফিজের মরমি সুফিবাদী দর্শনও তাঁকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে রুমি ও হাফিজের প্রভাব তাঁর কাব্যে স্পষ্ট।

রবীন্দ্রকাব্যে হাফিজের প্রভাব পড়েছে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই। বাংলার অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মতোই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে তৎকালীন রাজভাষা ফারসির প্রচলন ছিল। পরিবারের সদস্যরা বাংলার পাশাপাশি ফারসিতেও কথা বলতেন। শুধু তাই নয়, ঠাকুর পরিবারে ইরানি সুফি কবিদের কাব্য, রুমির ‘মসনভী’, ফেরদৌসির ‘শাহনামা’, হাফিজের ‘দিওয়ান’ এবং আরব্যোপন্যাস, হাতেম তায়ী, ইউসুফ-জুলেখা-র মতো কাহিনী পড়া হতো। আর রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হাফিজের সমগ্র ‘দিওয়ান’ মুখস্থ করেছিলেন এবং অর্থসহ এর যে কোনও জায়গা থেকে যে কোনও সময় উদ্ধৃতি দিতে পারতেন। তাই তাঁকে বলা হতো ‘হাফিজে হাফেজ’।

শেষ জীবনে ৭০ বছর বয়সে ইরান সফরকালে রবীন্দ্রনাথ শিরাজ শহরে কবি হাফিজের মাজার পরিদর্শন করেন। পরে তিনি হাফিজের সমাধিকে ‘পিতার তীর্থস্থান’ বলে উল্লেখ করেন।

এভাবেই মূলত তাসাউফের সাথে সাহিত্য মিশে গিয়েছিল দুই স্রোত থেকে এক মোহনায়। তাসাউফ কখনওই সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটখোট্টা তাত্ত্বিকতার রূপ লাভ করেনি। বরং শাস্ত্রীয় তাসাউফের সাহিত্য থেকে জন্ম নিয়েছে রূপক ভালোবাসার কবিতা। সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম সাহিত্যে শিরীঁ-ফরহাদ, লাইলি মজনুঁর মত অনবদ্য চরিত্র। ইউসুফ জোলেখা যদিও ঐতিহাসিক চরিত্র— কিন্তু সুফিদের সাহিত্যে যখন তা চলে এসেছে, তখন তা নিছক ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা হয়ে উঠেছে রূপকথা। বর্তমানে বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় মুসলিমদের সাহিত্য সম্পদের কথা উঠলে, স্বাভাবিকভাবেই সুফিদের সাহিত্য নিদর্শনগুলোর কথা উঠে আসে। তাই মুসলিমদের মধ্যে যারা সাহিত্য চর্চায় আগ্রহী—তাদের উচিত পেছনের তাসাউফ ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকানো। সেখান থেকে উঠে আসতে পারে আধুনিক ইসলামী সাহিত্যের নতুন মণি মুক্তা।

The post সাহিত্য ও তাসাউফ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%93-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%89%e0%a6%ab/

No comments:

Post a Comment