ইফতেখার জামিল:
উদ্বিগ্ন ভাবালোক ও ভালোবাসার সাম্পান
আমি দাওরা শেষ করি দুই হাজার পনের-ষোল শিক্ষাবর্ষে। সরাসরি মিজানে ভর্তি হওয়ায় মেয়াদ নেমে আসে আট বছরে, বেশ অল্পবয়সেই ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ধারায় সনদ লাভ করি। আমি ধর্মীয় পরিবারের সন্তান, আমাদের বংশে ধর্মীয় শিক্ষার দীর্ঘ সিলসিলা বহমান, দাদা-পরদাদা-নানা দেওবন্দে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন—তাই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা আমার কাছে ছিল প্রধানত তথ্যমূলক। আমি যে ভাবালোকে বড় হয়েছিলাম, উচ্চাশিক্ষায় তাতে বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। সেই ভাবালোক ছিল পবিত্র, মাড়ের পাঞ্জাবির মতো সফেদ— মাঝেমাঝে আমার বালক-কিশোরবয়সী ছবিগুলো দেখি— কি অদ্ভুত রকমের সরল একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছা করে খুব।
দুই হাজার তেরোর বিপর্যয়ে আমার মধ্যে অনেক রকমের অভিঘাত তৈরি হয়। প্রশ্ন ছিল অনেক আগে থেকেই, তবে তেরোতে প্রশ্নের সাথে যুক্ত হয় বেদনা-ক্রোধ ; নিজস্ব ভাবালোককে প্রচণ্ড ভালোবাসা সত্ত্বেও তার প্রতি সংশয় তৈরি হতে থাকে। শাপলা চত্বরে মঞ্চের পেছনে বসেছিলাম, মাথার ওপর একটার পর একটা সাউন্ড গ্রেনেড ফুটছিল, সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল শহীদদের বিকৃত লাশ। সেই ভয়ঙ্কর সন্ধ্যা-রাতের কথা আমি এখনো ভুলতে পারি না। মঞ্চে চলছে একের পর উত্তেজিত ভাষণ। শ্রোতাদের মধ্যে নেই মনোযোগ, চারদিকে চাপা অস্থিরতা-উদ্বেগ, ইসলামি ব্যাংকের সামনে কয়েকজন মধ্যবয়সী লোক বলছিলেন, নেতারা সমাবেশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। এর মধ্যেই নামছিল ধূসর সন্ধ্যা, ফ্যাকাসে গোধূলিআলোয় মনে হচ্ছিল এ এক কারবালার প্রান্তর। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে আতঙ্ক, সাউন্ডগ্রেনেডের অশ্লীল উল্লাস। এবং শেষরাতে রাষ্ট্রীয় ক্র্যাকডাউন।
‘বিরহে কাতর নই হে রোদেলা পথ
হে শহরের পাষণ্ড পাথর দেয়াল
শ্রান্তিতে ঘুমায়নি রাত্রিজাগা চোখ;
তোমার ঘৃণার কাছে
আজ পরাজিত রক্ত নামের যে স্রোতেলা ক্রোধ
জেনে রেখো, রক্তঋণী এই পাথর থেকেই
একদিন জন্ম নেবে
আমার রক্তশোধের চারাগাছ’
-সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
মতিঝিল থেকে কোনমতে পালিয়ে এসেছিলাম। বাবুবাজারের কাছাকাছি ছাত্রলীগের দৌড়ানি খাই, পাশের বাসায় উঠতে চাইলে তারা বন্ধ করে দেয় গেট। পরেরদিন বাসার জানালা দিয়ে দেখছিলাম পুলিশ আহমদ শফিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, মাদরাসার সবাই কান্না ছাড়া কিছুই করতে পারছে না। আমাদের সাথে নাজমুল নামে এক ছেলে পড়তো, সে গুলিস্থানের সংঘর্ষে আটকে গেছিল, তার সামনে কয়েকজন নিহত হয়, নাজমুল মৃত্যুর স্মৃতিগুলো ভুলতে পারতো না। আমরা রাতের বেলা একসাথে তাকরারে বসলে মাঝেমাঝে পাঁচই মের গল্প করতাম। নাজমুল বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়তো, একসময় কান্না ছুঁয়ে যেত আমাদের সবাইকে। হাঁটুতে-বেঞ্চে মুখ গুজে কান্না করতে থাকতাম সবাই। এই অভিমান-অভিঘাতের মধ্যেই ইন্টারনেটের সাথে পরিচিত হই। আরবির মাধ্যমে সংযুক্ত হই আরব বিশ্বের চিন্তার সাথে, ফেসবুক-ব্লগে দেখি বাম-সেকুলারদের লেখালেখি। এরই মধ্যে শেষ হয় আমার মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষা—আমি তখন এক বিষণ্ণ সংবেদনশীলতায় উদ্বিগ্ন।
পরীক্ষা শেষে বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গেলাম আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ। আমরা ছিলাম দশ-পনেরজনের মতো। রাজনীতি-চিন্তা নিয়ে খুব বেশী আগ্রহ ছিল না, আমরা ভাবতাম নতুন নৈতিকতা-নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কাজ করবো—আমরা কেউই মাদরাসার প্রথাগত ভাবালোকে সন্তুষ্ট ছিলাম না, আবার আমাদের আগের প্রজন্মের মতো নেতিসমালোচনাতেও আস্থা ছিল না। আমরা ভান ধরতাম আমাদের কাছে সমাধান আছে, আদতে উদ্বেগ-অস্থিরতা আমাদের মধ্যেও কোন অংশে কম ছিল না। আমরা গেলাম আড়াইহাজার, মেঘনার এক চরে। সারা বিকেল ফুটবল খেললাম, সন্ধ্যায় গোসল করে নৌকার ছাদে পড়লাম নামাজ। আকাশে মেঘ করলো অনেক, মাগরিবের পর আমরা ইঞ্জিন নৌকায় মেঘনার মোহনার দিকে গেলাম, চাঁপা অন্ধকার, কোথাও কেউ নেই—এক স্বর্গীয় নীরবতা। বারবিকিউ করেছিলাম, খানা শেষে তাবু বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম।
আমরা ভাবতাম ষাট দশকের কণ্ঠস্বর সংঘের মতো শিল্প-সাহিত্যের ধারা গড়ে তুলবো, আমাদের অবশ্যই সেই সামর্থ্য ছিল, আবদুল্লাহ আবু সাইদের ভালোবাসার সাম্পান ছিল আমাদের কল্পনার জগত। প্রতিদিনের জীবন ভালোবাসার সাম্পানের মতো সুন্দর হয় না। অতীত অতীতেই সাজানো থাকে, বর্তমান অতীতের চাল মেনে চলে না। কথা ছিল আমরা ঘুরাঘুরির পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও ইসলামি চিন্তা নিয়ে কথা বলবো। ঘুরাঘুরি হয়, কিছু আলাপ-আলোচনাও, রাতে একটা ছোটখাটো ঝগড়া-মানঅভিমানে জড়িয়ে যাই। আমি ফিরে আসি ট্রলারে, কিছুক্ষণ একা কাঠের কাঠামোর ছাঁদে দাড়িয়ে থাকি। চারদিকে কোলাহলহীন চরাচর, শাখা নদী পার হলেই আড়াইহাজার, আকাশে একটুও মেঘ নেই—ভাবতে থাকি, ইট ডাজন্ট ওয়ার্ক এনিমৌর। আমরা দুইবার পত্রিকা বের করার প্রতিজ্ঞা করি, দুইবারেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। আধাঘণ্টার মধ্যে আমি আবার আড্ডায় ফিরে আসি, স্বপ্নের চেয়ে সম্পর্কের গুরুত্ব বেশী, আধো ঘুমে সবাই তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। আমাদের বন্ধুত্ব আছে আগের মতোই, হয়তো যোগাযোগ কম, সবাই কর্মজীবনে ব্যস্ত, কেউবা পড়াশোনায়, তবে ভালোবাসার সাম্পানের স্বপ্নটা শেষ।
‘তোমাদের আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে
সারা রাত মোরা ক’য়েছি যে কথা, বন্ধু পড়িছে মনে !
জাগিয়া একাকী জ্বালা ক’রে আঁখি আসিত যখন জল,
তোমাদের পাতা মনে হ’তে যেন সুশীতল করতল !
তোমারে চাহিয়া জেগেছি নিশীথ, গিয়াছে গো ভালবাসি’ !
তোমার পাতায় লিখিলাম আমি প্রথম প্রণয়-লেখা
এইটুকু হোক্ সান্ত্বনা মোর, হোক্ বা না হোক্ দেখা |—
তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করি’ সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না |
—নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধূর ধূপ !—’
-কাজী নজরুল ইসলাম
আড়াইহাজার সফরের আগে ও পরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। বিতর্কের আশঙ্কায় সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছি, আত্মজীবনীর জন্য তোলা থাকলো সেসব গল্প। আড়াইহাজার সফরের দেড়-দুই মাস পরে আমি গ্রেফতার হয়ে যাই। এখন, মাঝে মাঝে অভিমান-অভিঘাতে উদ্বিগ্ন সেই তরুণ জামিলের সাথে কথা বলতে মনে চায় খুব। সে আমার ডাকে সাড়া দেয় না, চোখ বন্ধ করে থাকে। কারাগারের দিনলিপি শুধু স্মৃতিকথা নয়, তরুণ জামিলের সাথে খোলাখুলি কথোপকথনের ব্যক্তিগত ব্রতও বটে। আমি তার কাছে সবকিছু খুলে বলতে চাই।
‘আখী আনতা হুররুন’
চারই আগস্ট বৃহস্পতিবার, দুই হাজার ষোল। দুপুরে ইফতার ক্লাস শেষ করে আগারগাও রওনা দিলাম। রিকশায় আজিমপুর, বাসে আগারগাও নেমে পাসপোর্টের কাজ। আপাতত পাসপোর্ট করে রাখি, বিদেশে পড়তে যাবার স্বপ্নের প্রথম ধাপ। কীভাবে ও কোথায় যাবো, এখনো ঠিক করিনি। মাদরাসা থেকে সাধারণ ধারায় পরীক্ষা দেওয়া নিষিদ্ধ, এখন আবার সরাসরি এসএসসিতে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না। এইট থেকে শুরু করতে হয়, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর। এতদিন তো অপেক্ষা করা যাবে না। বন্ধু যুবায়ের মিসরে গিয়েছে, কেউ কেউ গিয়েছে দেওবন্দ, যারা আলিয়ায় পরীক্ষা দিয়েছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাদরাসা ও রাষ্ট্র মিলে আমাদের ভিন্নধারায় শিক্ষার পথ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না, প্রত্যেকের নিজস্ব যুক্তি আছে, তবে এতে মাদরাসার সাধারণ ছাত্রদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
বিকেলে জারির নদবির সাথে দেখা। চট্টগ্রামের ছেলে, ফেসবুকেই পরিচয়। তার বাবা এখন আইআইইউসির অধ্যাপক, ঘটনাচক্রে আমার বাবার একসময়ের ছাত্র। একটা রেস্টুরেন্টে কিছুক্ষণ কথা বললাম, কী কী যেন খেলাম, ঠিক মনে নেই। দ্রুত উঠতে হবে, গন্তব্য ফরহাদ মজহারের চিন্তা পাঠচক্র। আজ তাত্ত্বিক গৌতম দাস হাজী শরিয়তুল্লাহর আন্দোলন নিয়ে কথা বলবেন। দুই হাজার তেরোর অভিঘাতের পর আমার মনে হতে থাকে, দেশের সকল শ্রেণীর সাথে মিশতে হবে। পক্ষ-বিপক্ষ-প্রতিপক্ষ বাছাই করা যাবে না, জানতে হবে সবাইকেই। তার অংশ হিসেবে তেরো সালের মে-জুন থেকে প্রায় নিয়মিত চিন্তা পাঠচক্রে যেতে থাকি। আমার শিক্ষকরা কেউ কেউ জানতেন, তারা বাঁধা দেননি। চারই আগস্টের সপ্তাহ খানেক আগে মুহাম্মদপুরে বন্ধু মাহমুদ হুদা ও আবু তোরাব মাসুমের সাথে দেখা হয়। তারা জানতে চাচ্ছিলেন, আমি কেন বিভিন্ন পাঠচক্রে যাই। তাদেরকে যে উত্তর দিয়েছিলাম, এখনো আমি সেটাই বিশ্বাস করি। তাদেরকে বলেছিলাম, আমাদের সবার চিন্তার সাথে পরিচিত হতে হবে, বই পড়ে সবকিছু জানা যায় না। অবশ্য সবার জন্য এই কাজ আমি নিরাপদ মনে করি না।
আজকের বিষয়বস্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পাঠচক্র সংশ্লিষ্টরা বাঙালি মুসলিম আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চেষ্টা করছেন, তাই আজ প্রচুর মানুষ। আমি কোনমতে পেছনে বসলাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই আলোচনা শেষ হয়ে গেল। আগেই ফোন করেছিল আশরাফ আজিজ ইশরাক, সে মাদরাসা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চায়। মুহাম্মদপুরেই বাসা। আমি বললাম পাঠচক্র শেষ হবার পর হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যায়। আড়ং ভবনের পাশ থেকে বাসে উঠতে হবে। আড্ডায় ঢাবির সমাজবিজ্ঞানের রাসেল ভাইও ছিলেন, নির্বিরোধী নিরীহ মানুষ। আড্ডা জমে গেলে আমরা আড়ং ভবনের পাশে চটপটি খেতে ঢুকলাম। আমরা খুব একটা নিরাপত্তা-সচেতন নই, দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়, কয়েকদিন পরেই মীর কাসেম আলীর ফাঁসি। আমরা ভাবছি, আমরা রাজনৈতিক কথা বলছি না, সরাসরি কোন দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই, আমাদের কেন হবে অসুবিধা? তরুণ জামিল ভুলে গেছিল অপরাধ বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নয়, সন্দেহের মুখে মুসলিম আত্মপরিচয়—সাদা পাঞ্জাবি, দাড়ি ও পাঁচকল্লি টুপি।
চটপটি খেতেখেতেই সন্দেহজনক কেউ একজন আমাদের দেখে গেল। আমরা খেয়াল করলাম না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়াকিটকি নিয়ে পুলিশ উপস্থিত—একজন অফিসার গোছের, বাকিরা আটকে রেখেছে দোকানের মুখ । অফিসার সাথেসাথেই মোবাইল চেয়ে নিলেন, জিজ্ঞাসা করলেন পরিচয়। এমন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছি আরও কয়েকবার, ভাবছিলাম দ্রুত ছাড়া পাবো। পুলিশের প্রশ্ন শেষই হচ্ছিল না। বাসা থেকে বারবার ফোন আসছিল, আমাদের ধরতে নিষেধ করা হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় দারোগা আসেন, থানায় নিয়ে যেতে নির্দেশ প্রদান করেন। আমাদেরকে উঠানো হয় প্রিজনভ্যানে। গাড়ির পেছনের খোলা দিকটায় বসে থাকে তিনজন পুলিশ। একজনের বয়স পঞ্চাশের বেশী, বাকি দুইজনের বয়স ত্রিশের মতো। বয়স্কজনকে বাকি দুইজন জিজ্ঞাসা করলেন, আসামি পালাতে চাইলে আটকাতে পারবেন, ‘জঙ্গিদের গায়ে কিন্তু অনেক শক্তি।’ বয়স্কজন গর্ব করলেন, ‘আটকাতে পারবো না মানে, কয়েকজনকে ক্রসফায়ারে দিয়েছি’। আমার মনটা আরও সংকুচিত হতে লাগলো, পুলিশ সদস্যরা কি দেখছে না আমাদের চেহারাও তাদের সন্তানের মতো? আমি স্মরণ করতে লাগলাম বাসা-মাদরাসার কথা।
রাত নেমেছে অনেক আগে। এখন বোধহয় দশটার মতো বাজে। এগিয়ে চলছে প্রিজনভ্যান, মুহাম্মদপুর আবাসিক এলাকা, পুরান ঢাকার মতো জনকোলাহল নেই, রাস্তাঘাট অন্ধকার। চায়ের দোকানগুলো এখনো খোলা, রাস্তার পাশের দালানকোঠাগুলোতে আলো জ্বলছে, প্রতিটা পরিবারে সদস্যরা নিরাপদে কথা বলছেন, আগত ছুটির দিনের অলসতায় ঘুমাতে যাচ্ছেন দেরীতে। আমরা তিন তরুণ বসে আছি প্রিজনভ্যানে। দুইজন মাদরাসার ছাত্র রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, পাশেই বোধহয় মিনার মসজিদ। এদিকে এসেছি অনেকবার। ছেলেদুটি আমার দাড়ি-টুপি দেখে দাড়িয়ে গেল কিছুক্ষণ, হয়তো স্বজাতির জন্য কোথাও ব্যাথা লাগছে, তারা কি আমাকে চিনে? আধা ঘণ্টার মধ্যে প্রিজনভ্যান থানায় পৌঁছল। ওসি থানায় নেই, আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল এসির রুমে। আমাকে ও রাসেল ভাইকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গারদে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ইশরাককে জিজ্ঞাসাবাদ করলো দীর্ঘক্ষণ। আমি তখনো ভাবছি বাসায় জেনে গেলে কি বকাটাই খাবো।
আমার বারবার মনে হচ্ছে ইয়াসিনের কথা। চার-পাঁচ মাস আগে কয়েকজন জুনিয়র দোহার ঘুরতে যায়। ঘটনাচক্রে আটক হয় পুলিশের হাতে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ছুটিয়ে আনলেও বড়রকমের শাস্তি প্রদান করে। ছাত্রদের সবাইকে ডাকা হয়, সবার সামনে তাদেরকে প্রচণ্ড তিরস্কার করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। শিক্ষকরা সবাই চলে গেলে আমি ইয়াসিনের পাশে দাড়াই, ইয়াসিন আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে অঝোরধারায়। আমাদের সমাজে বিপদে পড়লে বিপদগ্রস্থকেই গালি খেতে হয়, শিকার হতে হয় ভৎষনার, যেনবা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না। আমি ভাবতে থাকি আমার দিকটা কেউই বুঝতে চাইবে না। নিজেকে অনেক একা মনে হতে থাকে। ইশরাককে আবার ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি তখনো বিশ্বাস করছিলাম, আমরা ছাড়া পেয়ে যাবো। ইশরাক দ্বিতীয়বারের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে ফিরে বলল, খুব দ্রুত ছাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। কারাগারে যেতে হবে। কথাটা শুনে আমরা সবাই মুষড়ে পড়লাম।
প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যেই আমি কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলাম। ফাতিহা শেষে সূরা বাকারা। আমার মন শান্ত হতে থাকে, মনে হতে থাকে আমাদের ওপর নাজিল হচ্ছে কুরআনের সাকিনা। প্রতিটা আয়াত মনোযোগ দিয়ে আন্তরিকতার সাথে পড়তে থাকি। বিপদের তিলাওয়াতের সাথে স্বস্থির তিলাওয়াতের কোন তুলনা হয় না। মনে হতে থাকে আমি নতুন করে বুঝছি কুরআনের মর্ম।
তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারদের সাথে প্রতারণা করে। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। তারা তা অনুভবও করতে পারে না। তাদের মন ব্যধিগ্রস্ত, আল্লাহ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দেন। তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, পৃথিবীতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি। মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, যদিও তারা তা উপলব্ধি করতে পারে না।
সূরা বাকারা আয়াত ৯-১২
পাঁচ পৃষ্ঠা পড়তেই আমাদেরকে তিলাওয়াত বন্ধ করতে বলা হয়। বলা হয় অন্যদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে। ছোট গারদে কয়েকটা ময়লা কম্বল, অসম্ভব দুর্গন্ধ।
গারদ-হাজত-জেলখানায় কখনো বাতি নিভানো হয় না। চারদিক থেকে অপলক তাকিয়ে থাকে সিসিটিভি ক্যামেরা। সেই অপরিচ্ছন্ন মেঝেতেই ঘুমানোর চেষ্টা করি, মনে হতে থাকে ঘুমালেই ভুলে যাবো মনোযন্ত্রণা। ঘুম আসে না। এখন মধ্যরাত, সাতমসজিদ রোডে থেমে থেমে গাড়ি চলছে। আমি চোখ বন্ধ করে নিজের সাথে কথা বলতে চেষ্টা করি, আনমনে আবৃত্তি করতে থাকি সাইয়েদ কুতুবের সেই বিখ্যাত কবিতা,
আখী আনতা হুররুন ওয়ারাআস সুদুদ/ আখী আনতা হুররুন বিতিলকাল কুয়ুদ
ইযা কুনতা বিল্লাহি মুসতা’সিমা/ ফামা যা ইয়াদ্বিরুকা কাইদুল ‘আবীদ
The post কারাগারের দিনলিপি (২য় পর্ব) appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a6%bf-%e0%a7%a8%e0%a7%9f-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d/
No comments:
Post a Comment