Friday, June 5, 2020

শাহবাগ: বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের সিলসিলা

সালাহউদ্দিন আহসান:

চলমান দশকে বাংলাদেশ ও এদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ভয়ানক সময়টির কথা বললে আমরা নির্দ্বিধায় ২০১৩ সালের কথা বলবো। এসময় একইসাথে বাংলাদেশ দুটি শক্তির মুখোমুখী হয়েছিল। যার ফলে একদিকে যেমন রচিত হয়েছিল রক্তক্ষয়ী সময় সেইসাথে শুরু হয়েছিল এক স্নায়ুযুদ্ধের সিলসিলাও। একটি হলো শাহবাগকেন্দ্রিক শক্তি, অন্যটি হেফাজতে ইসলামমুখী শক্তি।

শাহবাগ আন্দোলন যেভাবে শুরু হলো:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ‘অভিযুক্ত’ আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে তাকে ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ চাইছিল তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হোক। এবং এ দাবিকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এঁকে তারা একটা আন্দোলন দাঁড় করাবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। মিডিয়ার কল্যাণে তারা সফলও হয়। এভাবেই শাহবাগ চত্ত্বর থেকে বীজ বুনে গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিষবৃক্ষের শিকড়গুলো।

প্রথমদিকে তারা ঢাল হিসেবে যুদ্ধপরাধীদের বিচার কার্যকরণের দাবিগুলোকে সামনে রাখলেও ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে থাকে আন্দোলনের পেছনের রহস্য।

বেরিয়ে এল থলের বিড়াল

যুদ্ধপরাধের বিচার যে কখনোই শাহবাগ আন্দোলনের মুখ্য ছিল না তা ক্রমান্বয়েই প্রকাশিত হচ্ছিল। কেননা, আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ের পূর্বেও আদালত তার প্রথম রায়ে আবুল কালাম আযাদ (বাচ্চু রাজাকার)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কাদের মোল্লার অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে অভিন্ন শাস্তির মুখে দাঁড় করানো সম্ভব ছিল না। কিন্তু ব্লগাররা এবং তাদের আভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো চাচ্ছিল তাদের ভেতরকার স্বার্থ আদায়ের একটা সুযোগ তৈরি করতে। তারা আন্দোলন দাঁড় করিয়েছে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছাতে। মাঝে সরকারও নির্বাচনকে সামনে রেখে দিল সাময়িক ভেটো।  এখানে সরকারের উদ্দেশ্য আর শাহবাগীখ্যাত ব্লগারদের উদ্দেশ্য ভিন্ন ছিল; সুতরাং গুলিয়ে ফেলা যাবে না।

শাহবাগীরা কোন বিন্দুতে পৌঁছাতে চেয়েছিল তার একটা হদিস পূর্বে থেকেই তারা দিয়ে আসছিল। যা এদেশের আপামর জনতার চোখের আড়ালে ছিল। ফলে প্রথমদিকে সর্বসাধারণ অনেকেই না বুঝে একাত্মতার ঘোষণা দিয়ে আসছিল। কিন্তু যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের সাথে তারা মঞ্চ থেকে  বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া যুক্ত করেছে, ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে, ভিন্ন মতের নাগরিকদের ব্যাংক-বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার উস্কানি দিয়েছে এমন কি তাদের অপছন্দের নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার আবদারও করেছে। তাদের নিত্যনতুন স্লোগান ও দাবি দাওয়া থেকে তখন  ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তারা যুদ্ধাপরাধ বিচারের আড়ালে আসলে দেশ থেকে ইসলামী সংগঠন ও ইসলামী রাজনীতি উৎখাত করতে চায়। তারা চায় এদেশ থেকে ইসলামকে দূর করতে। চায় ইসলামোফোবিয়ার বীজ বুনে দিতে। এর মাধ্যমেই জনসম্মুখে শাহবাগ আন্দোলনের থলের বিড়াল বের হয়ে এল।

যেমন ছিল শাহবাগীদের জীবনাচার

শাহবাগ চত্বরে নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্লগারদের জীবন-যাপন ও লেখালেখি বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি করা যায় তারা কতটা ইসলামবিদ্বেষী। অথচ এসময় ব্লগার রাজীবকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে অভিহিত করা হলো। প্রহসনের উপাধি জুড়ে দিয়ে সরকার এবং আন্দোলনকারীরা চাচ্ছিল জনগণের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের আবেগ তুলে আন্দোলনটিকে আরও বেগবান করতে। আরও গণমুখী করতে। ভাবুন তো, ‘শহীদ’ শব্দটি ইসলামের একটি পরিভাষা। রাজীব কি এই পরিভাষায় ইসলাম ধর্মের মূল বিষয়গুলোকে বিশ্বাস করতো?

রাজীব হত্যাকাণ্ডকেও পরবর্তীতে ইসলামবিদ্বেষে ও অনৈতিক সমালোচনার উপায় হিসেবে ব্যবহারের প্রয়াস করা হয়েছিল। মৌলবাদীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে জনমানুষের মনে ঘৃণার বীজ বপন করা হয়েছিল। অথচ প্রচণ্ড  ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে তার গার্লফ্রেন্ড তানজিলা। তিন মাস ধরে স্ত্রী অনিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না রাজীবের। স্ত্রী শ্বশুরবাড়িতে রেখে গার্লফ্রেন্ড তানজিলাকে নিয়েই থাকতো রাজীব। তানজিলা ছাড়াও আরেক প্রেমিকা রাফির সঙ্গে অবাধ মেলামেশার তথ্য প্রকাশ করে দেয় রাজীবের আত্মীয় ও তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ঘটনার দিন রাজীবের বাসাতেই ছিল তানজিলা। পুলিশ রাজীবের মা নার্গিস হায়দারের বাসা থেকে তানজিলাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। ঐ বাসায় প্রচুর নেশার উপকরণ ও মদের বোতল পাওয়া গিয়েছিল।

শুধু রাজীবই নয়, অনলাইনে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো ও নাস্তিক্যবাদ প্রসারে তৎপর শাহবাগ আন্দোলনের আরেক উদ্যোক্তা আসিফ মহিউদ্দিন। তাদের ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের ফিরিস্তি তুলে ধরার সাহসও আমার হচ্ছে না। এতটাই কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য তারা ব্যবহার করে ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ সা. কে তীরবিদ্ধ করেছে!সে সময়কার সকল ব্লগার মূলত আন্দোলনের আড়ালে ইসলাম ধর্মকে টার্গেটে পরিণত করেছিল।

বর্ণবাদী মনোভাবের ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রকাশ

মৌলবাদী ইহুদি ও খ্রিস্টানদের একাংশের তীব্র ইসলাম বিদ্বেষের কারণে কখনও কখনও আমাদের ধর্ম এবং রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা.-কে সময়ে সময়ে আক্রমণের নিশানা বানানো হলেও তার অসভ্যতা অথবা ব্যাপকতা এখনও কথিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশে নাস্তিকতার আবরণে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধই ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে একদিকে এদেশের ইসলাম নির্মম সমালোচনার শিকার হয়েছিল, অপরদিকে ইসলামী সংস্কৃতিমনা মানুষগুলো বিপুল পরিমাণে বর্ণবাদের শিকার হয়ে চলেছেন—বলতেই হবে। আন্দোলন চলাকালীন ১৯৭১ সালের জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার সুযোগ নিয়ে এ শাহবাগী সম্প্রদায় অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে ইসলামের সব প্রতীককে অনবরত আক্রমণ করেছিল; এখনও তা বিরাজমান।

রাজাকারের ছবি আঁকতে গেলেই তাবৎ তথাকথিত আন্দোলনরত ব্লগাররা সুশীল(?) মিডিয়ায়, ওয়েবে এবং নানান ব্লগে বীভৎস মুখ এঁকে মাথায় চাঁদ-তারা খচিত টুপি এবং থুতনিতে দাড়ি দেখিয়ে চিহ্নিত করেছিল। অথচ ইসলামের আগমনকাল থেকেই চাঁদ-তারা আমাদের পূর্বপুরুষের পতাকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দাড়ি এবং টুপি আমাদের মহানবী সা.-এর সুন্নত। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান জনগোষ্ঠীর এক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মুখে দাড়ি এবং মাথায় টুপি রয়েছে। অনেক মুসলিম মুক্তিযোদ্ধার মুখেও দাড়ি রয়েছে। নামাজ পড়ার সময় তারাও টুপি ব্যবহার করেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও একই ধরনের ভয়াবহ ইসলামবিরোধী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। নাটক ও সিনেমায় অবলীলাক্রমে রাজাকার দেখাতে গিয়ে অহরহ মুসল্লিদের অপমান করা হয়েছে। এ দেশের নাট্যকর্মীদের অধিকাংশই ভারত-প্রেমে বুঁদ হয়ে আছেন। সেই ভারতের নাটক, সোপ অপেরা ও সিনেমায় সাধারণভাবে হিন্দু ধর্মকে মহৎভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে; এখনও তাই হচ্ছে। এ বর্ণবাদী আচরণের বীজ বহু আগ থেকেই ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছিল। শাহবাগ আন্দোলন তাকে যেন মহীরূহে পরিণত করে দিয়েছে।

এক চিত্রসাংবাদিক তো ভয়াবহ এক ছবি তুলে নিয়ে এসেছিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল— টুপি মাথায় এক তরুণ রাজাকার সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর হাস্যোজ্জ্বল এক বালিকা তার মাথায় জুতো দিয়ে পেটাচ্ছে! ধর্মের প্রতি এমন ঘৃণার বীজ শিশুর কোমল মনে রোপন করার প্রয়াস কাদের ইশারায় ঘটেছে তা কালক্রমেই প্রকাশ হয়ে এসেছে।

শাহবাগের নাস্তিকদের লেখাজোখা ও কর্মতৎপরতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তাদের মৌখিক স্লোগান মোটামুটি হিফজ করা এক বুলিই—সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তবে দুঃখের বিষয় হলো তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঠিক তাৎপর্যপূর্ণ অর্থটি আজ অব্দি নির্ণয় করতে সক্ষম হয়নি। ফলে স্বার্থসিদ্ধি করতে একচেটিয়া যত আক্রোশ কেবল ইসলাম ধর্মের প্রতিই আবর্তিত হয়েছে। তাদের গড়া বিতর্কিত ব্লগগুলোতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মকে আক্রমণ করে কোনো পোস্ট দেয়া হয় না। ভাবটা যেন যত দোষ নন্দ ঘোষ-এর মত। তারা সবসময় আজান, নামাজ, বিবাহ ও ইসলামকর্তৃক নারী অধিকার নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার পসরা সাজায়। বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিমায় এগুলোকে চিত্রিত করে। ফলে এমন চেতনাগত ভাইরাসটি সাধারণ শিক্ষিত বহু ছাত্রছাত্রীদের সংশয়বাদিতা ও ইসলামোফোবিয়ার গহীন অন্ধকারে নিয়ে চলে। এতে যেমন এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঠিক অর্থটি বাস্তবায়িত হতে বিলম্বিত হচ্ছে তেমনই বহুগুণ দূষিত হচ্ছে রাজনীতির জলঘোলা অঙ্গনটিও। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় একটিই— বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের ধারাটি মাটিচাপা দেয়া। তরুণ বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষিত সমাজকেই নিতে হবে সে দায়িত্বের অনর্পিত গুরুভার।

The post শাহবাগ: বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের সিলসিলা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%93-%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%bf/

No comments:

Post a Comment