ইফতেখার জামিল
মানুষ সামাজিক জীব, সে সমাজবদ্ধ হয়েই বসবাস করে। তবে সমাজবদ্ধতা থাকলেও কোন সমাজে পরিপূর্ণ ঐক্য বিরাজ করে না। বিরোধ, সংঘাত ও বৈচিত্র্য সামাজিক সম্পর্কের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কোন সমাজ ও সংঘই এর থেকে মুক্ত নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই বিরোধ ও সংঘাত রুপান্তরিত হয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতিতে। সেক্ষেত্রে তাকে সামাজিক সমস্যা বলে চিহ্নিত করতে হয়।
বিরোধ ও সংঘাতের সাথে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতির পার্থক্য কোথায়? শব্দ থেকেই অনেকটা আন্দাজ করা যায়। বিরোধ ও সংঘাত সমাজের স্বাভাবিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অংশ। মানুষের মধ্যে দ্বিমত ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে, সেই দ্বন্দ্ব থেকেই বিরোধ ও সংঘাতের তৈরি হয়। সে আদর্শিক বিরোধও হতে পারে, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতও হতে পারে। এটা সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।
অপরদিকে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি বিশেষ মানসিক অবস্থা ; যখন দ্বিমত ও বিরোধ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মীমাংসা না হয় বা টিকে থাকতে না পারে, তখন তার অবদমিত ক্রোধ থেকে জন্ম নেয় বিশেষ মানসিক অবস্থা, তার থেকেই তৈরি হয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি অবদমিত ক্রোধের রুপান্তরিত রুপ। বস্তুত এই মানসিক অবস্থাগুলো স্থায়ীভাবে বিশেষ রূপ ও আকার পেলে অসুস্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সমকালীন সময়ে যেসব ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি তুমুলভাবে আলোচিত হয়, তার মধ্যে ইসলামোফোবিয়া অন্যতম। মুসলমানদেরকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে অযৌক্তিকভাবে ভয় বা ঘৃণা করাকেই ইসলামোফোবিয়া হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। কিছু প্রেক্ষাপটের কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামবিদ্বেষের পরিমাণ আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। তাই এই বিষয়ে আলোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে। এই লেখায় আমরা ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষের সুলুক সন্ধানের চেষ্টা করবো।
বিদ্বেষ ও ভীতি
আগেই যেমন বলেছি, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিরোধ সামাজিকভাবে মীমাংসা না হলে বা বিরোধ টিকে থাকতে না পারলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও ক্রোধের সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলে ক্ষোভ ও ক্রোধও অস্বাভাবিক কিছু নয়। মানুষ মাত্রই স্বার্থ ও অবস্থান রক্ষার জন্য ক্ষোভ ও ক্রোধ দেখিয়ে থাকে। তবে ক্রোধের প্রতিক্রিয়া না দেখাতে পারলে মানুষের মন সংকুচিত হয়ে যায় ; ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতির সৃষ্টি হয়। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি সৃষ্টির এটি সাধারণ প্রক্রিয়া, তবে সামাজিক সম্পর্কে অস্বাভাবিকতা থাকলে অন্যভাবেও এগুলো সৃষ্টি হতে পারে।
ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি কোন যুক্তি বা নৈতিকতা মানে না। অযৌক্তিকভাবে কাউকে ক্ষতি করার ইচ্ছা তার মধ্যে প্রবলভাবে উপস্থিত থাকে। রুচিগত পার্থক্য বা অপছন্দকে বিদ্বেষ বলা যায় না। কেননা তাতে অবদমিত রাগ, অযৌক্তিক বা অনৈতিক ক্ষতি করার প্রবণতা থাকে না। অহেতুক ভীতি বা ঘৃণার ব্যাপার থাকে না। মোটকথা দ্বিমত, রুচিগত পার্থক্য বা অপছন্দকে অস্বাভাবিকতা বলা যায় না।
অনেকেই অনেক খাবার খান না। কেউ পাঙ্গাস মাছ খেতে পারেন না, কেউ কড়লা খেতে পারেন না। একে কি বিদ্বেষ বলা যাবে? অবশ্যই না, কেননা এটা রুচিগত ভিন্নতা ও অপছন্দ। এটা মানুষের স্বাভাবিক রুচিপ্রক্রিয়ার অংশ। তবে যদি অযৌক্তিকভাবে কেউ পাঙ্গাস মাছের ক্ষতি করতে চান বা পাঙ্গাস মাছ দেখলে ভয় পান, সেটাকে ফোবিয়া হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অর্থাৎ ফোবিয়া ও বিদ্বেষের মূল ভিত্তি অযৌক্তিক ও অনৈতিক, কোন ব্যাখ্যায় তাকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
মুসলমানদেরকে অনেকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ করতে পারেন। বিরোধও লালন করতে পারেন। একে ইসলামফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ বলা যাবে না। কেউ ইসলামকে অসত্য বা ভুল বললেও ইসলামফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ বলা যায় না। তবে কেউ অযৌক্তিক ও অনৈতিকভাবে ইসলাম সংশ্লিষ্ট সবকিছুকে অবদমিত ক্ষোভ বা ক্রোধ পূরণের অংশ হিসেবে ঘৃণা বা ভয় করলে তাকে ইসলামফোবিয়া আখ্যা দিতে হবে।
অর্থাৎ যেখানে যুক্তি বা নৈতিকতা ছাড়াই ক্ষতি বা ভয় করার ইচ্ছা থাকে, তাকেই বিশেষভাবে ইসলামফোবিয়া আখ্যা দিতে হবে। এটি একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা, যা অবদমিত ক্রোধ থেকে জন্ম নেয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্রোধের সমাধান হয়ে গেলে বা স্বাভাবিক বিরোধ টিকে থাকতে পারলে তাতে সাধারণত ফোবিয়া জন্ম নেয় না।
যারা ইসলামফোবিয়াকে অস্বীকার করেন বা ভিন্ন ব্যাখ্যা-এজেন্সি দিয়ে সূত্রায়ন করেন, তাদের অনেকেই ইসলামভীতি লালন করেন। ইসলামকে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে অস্বীকার করতে চান।
পরিভাষার সমালোচনা
অনেকে ইসলামোফোবিয়া ধারণার সমালোচনা করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশেও বামপন্থীদের মধ্যে ইসলামোফোবিয়া অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা গেছে। অমুসলিমদের দ্বিমত, ঘৃণা ও বিরোধকে মুসলমানরা অনেকক্ষেত্রে সাধারণভাবে এক শব্দে ইসলাম অবমাননা বা কটুক্তি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করে থাকেন, তাতে আলাদাভাবে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষের কদর্যতা ঢাকা পড়ে যায়। হেফাজতের আন্দোলনেও এই পরিভাষায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি।
তার প্রতিক্রিয়ায় অনেকে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেন। সামাজিকভাবে মুসলমানদের বিরোধিতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়, একইভাবে অবমাননাও ধর্মীয় সম্মানবোধের সাথে সম্পর্কিত— প্রধানত এটি ধর্মতত্ত্বের বিষয়। পক্ষান্তরে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ মানসিক অসুস্থতা ও আইনি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তবে ধর্মীয় এজেন্সি অস্বীকার, উগ্র সেকুলারিজম ও নিউ নাস্তিক্যবাদের দোহাইয়ে অনেকে একে বৈধতা দিতে চান বা অস্বীকার করেন।
দুই হাজার উনিশ সালের ১০ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানীতে ইসলামোফোবিয়ার প্রতিবাদে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে পহেলা নভেম্বর বামপন্থী পত্রিকা লিবারেশনে ইসলামোফোবিয়ার প্রতিবাদে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, সেখানে অনেক বামপন্থী নেতা অনুপস্থিত থাকেন, পরবর্তীতে প্রতিবাদ মিছিল থেকেও অনেক বামনেতা নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেন। সোশ্যালিস্ট পার্টি ( পিএস ) ব্যাখ্যা দেন, তারা সেকুলার আইন বিরোধী কোন প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। প্রধানত মসজিদে আক্রমণের প্রতিবাদে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হলেও ফ্রান্সের প্রধান সব রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেন, সরকারী দলের মুখপাত্র একে রাজনৈতিক ইসলামের পক্ষে মার্চ হিসেবে আখ্যা দেন।
এখানে পশ্চিমা রাষ্ট্রকাঠামোর ব্যাপারও আছে। সেখানে ডানপন্থীরা ধর্ম ও সংস্কৃতি বিরোধী বলে ইসলামোফোবিয়াকে প্রশ্রয় দেন, বামপন্থীরা ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয় বলে ইসলামোফোবিয়ার বিরোধিতা করাকে জরুরী মনে করে না। ফ্রান্সে ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে তারা ২০০৪ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় চিহ্ন ব্যবহার এবং ২০১০ সালে জনপরিসরে নিকাব পরা নিষিদ্ধ করে। সম্প্রতি সুইমারদের জন্য ‘স্পোর্টস হিজাব’ নিষিদ্ধের কথা উঠেছে, ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের ‘ধর্মীয় চিহ্ন’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবও উঠেছে।
ফ্রেঞ্চ বুদ্ধিজীবি হেনরি পেনারুইজ ( Henri Pena-Ruiz ) ইসলামোফোবিক হওয়ার অধিকার থাকা দরকার বলে যুক্তি দেন। পাশাপাশি Philippe d’Iribarne ও Pascal Bruckner-এর মতো বুদ্ধিজীবিরা ইসলামোফোবিয়া ধারণাকে বিপদজনক বলে আখ্যা দেন। ফ্রান্সে সাধারণভাবে ইসলামোফোবিয়া শীর্ষক কোন আলোচনা ও সেমিনার করতে দেওয়া হয় না। ফ্রান্সের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইসলামোফোবিয়াকে সালাফিদের ট্রয়ের ঘোড়া বলে আখ্যা দেন। অর্থাৎ তার মতে ইসলামোফোবিয়াকে অসিলা করে সালাফিরা সুবিধাগ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
শুধু ফ্রান্স নয়, সারাবিশ্বেই এই প্রবণতা বিশেষভাবে উপস্থিত আছে। বাংলাদেশে কিছুদিন আগে কয়েকজনকে ইসলামবিদ্বেষী আখ্যা দিলে তারা জবাবে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা না করে অভিযোগকারীদের জঙ্গি ও ‘শিবির’ আখ্যা দেন। পাশাপাশি অনেকে ইসলামবিদ্বেষকে শ্রেণীবৈষম্য ও নেটিভবিদ্বেষ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিছুদিন আগে ইতালির এনজিও কর্মী সিলভিয়া রোমানো ইসলামগ্রহণ করলে তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আক্রমণ করা হয়। এই ঘটনাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামোফোবিয়াকে নিছক শ্রেণীবৈষম্য ও নেটিভবিদ্বেষ বলে অভিহিত করা সম্ভব নয়।
আগেই যেমন বলেছি, ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষের মূলভিত্তি অযৌক্তিক ও অনৈতিক ভীতি ও ঘৃণা, একে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলে সামাজিক অসুস্থতা ও অস্বাভাবিকতাকে মেনে নেওয়া হবে। পাশাপাশি একে শ্রেণীবৈষম্য ও নেটিভবিদ্বেষ বলে আখ্যা দিলে তাতে ইসলাম ও মুসলমানদের এজেন্সিকে অস্বীকার হয়, এটাও একরকম পরোক্ষ ইসলামবিদ্বেষের কারণেই করা হয়ে থাকে।
ইসলামবিদ্বেষের প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি
খৃস্টীয় উনিশ ও বিশ শতকে পশ্চিমাদের ব্যাপক উত্থানের প্রেক্ষিতে অপরাপর সভ্যতা ও পক্ষগুলোকে সমাজের স্বাভাবিক-সাধারণ সম্পর্ক ও বৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও অবস্থান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকেই ভদ্রতা, যৌক্তিকতা ও নৈতিকতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির প্রশ্রয়ে পশ্চিমা ( কায়েমি ) শিক্ষা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে এন্ড অফ হিস্ট্রির মতো পরিভাষা জন্ম নিয়েছে।
এন্ড অফ হিস্ট্রির মর্ম হচ্ছে, পশ্চিমা পুঁজিবাদী লিবারেল ডেমোক্রেটিক ব্যবস্থাই মানবিক চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর, মানুষের মুক্তির পরম পয়গাম—মাগফেরাত, নাজাত ও সালভেশনের একমাত্র অসিলা। অপরাপর সকল সংঘ ও সংস্কৃতিকে তাই পশ্চিমাদের অনুসরণ করতে হবে। এর প্রেক্ষিতে দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও হান্টিংটন সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বে মুসলিম সভ্যতাকে পশ্চিমা সংস্কৃতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন, তার মতে মুসলমানরা কখনোই পশ্চিমা সভ্যতায় যোগ দিতে আগ্রহী বা সক্ষম হবে না। মূলত এখান থেকেই ইসলামবিদ্বেষের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমা কায়েমি ব্যবস্থা ও মুসলিম সংস্কৃতির বিরোধটা কোন স্বাভাবিক বিরোধ নয় ; এখানে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সংঘাতের পরিবেশ ও অবস্থা নেই। আদতে মুসলমানদের সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করার সক্ষমতা নেই, পাশাপাশি পশ্চিমা কায়েমি গোষ্ঠীরও এই বিরোধ ও বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়ার ইচ্ছা নেই। ফলে এই বিরোধটা অস্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। সবাই পশ্চিমা সংস্কৃতি মেনে নিলেও মুসলমানরা কেন ভিন্ন রাজনীতি, নৈতিকতা ও সংস্কৃতি লালন করবে, এটা নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে ব্যাপক অবদমিত ক্ষোভ কাজ করে। এখান থেকেই তৈরি হয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভীতি।
এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ একপর্যায়ে সোভিয়েতপন্থী বামদের প্রতিও ছিল, তবে সেটা ততটা ভয়ঙ্কর রূপধারণ করেনি, কেননা সেখানে সামরিক যুদ্ধ বিরাজমান ছিল, পাশাপাশি সোভিয়েতপন্থীরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা কায়েমি ব্যবস্থা না মেনে নিলেও সাংস্কৃতিকভাবে মেনে নিয়েছিল। তাদের পোশাক, মূল্যবোধ, আনুষ্ঠানিকতা ও শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে পশ্চিমা কায়েমিব্যবস্থার অনুসারী ছিল। মুসলমানরা এসব দিক থেকেও ব্যতিক্রম। মুসলমানদের সাথে পশ্চিমা কায়েমি ব্যবস্থার সরাসরি কোন সামরিক সংঘাত নেই, তবে রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিকভাবেও মুসলমানদের সাথে পশ্চিমা কায়েমি সংস্কৃতির ব্যাপক ভিন্নতা আছে। সে প্রেক্ষিতে পশ্চিমাদের মধ্যে একরকম অবদমিত ক্ষোভ ও ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকেই এই ব্যাপক ইসলামবিদ্বেষ।
সাম্প্রতিক সময়ে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে। অনেকে স্বধর্ম ত্যাগ করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে, এর প্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোতে স্বতন্ত্র ‘নাগরিক-ইসলামে’র উত্থান ঘটেছে। পশ্চিমারা যখন নিজ দেশে মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা দেখছেন, তারা ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হচ্ছেন। নাগরিক অধিকার আইনের কারণে মুসলিম নাগরিক সংস্কৃতিকে বাঁধা দেওয়ার সুযোগও সীমিত। এই অবদমিত ক্রোধ থেকেও ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে। এক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের মুসলিম ব্যানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ট্র্যাম্প যে বক্তব্যে মুসলিম ব্যানের ঘোষণা দেন, সে বক্তব্যের শব্দ ও বাক্যচয়ন বিশেষ মনোযোগের দাবী রাখে।
পাশাপাশি এখানে মিডিয়ার ভূমিকার কথাও বলা যেতে পারে। পশ্চিমা কায়েমি পক্ষ যেহেতু মনে করে, সারাবিশ্বের সর্বক্ষেত্রেই তাদের স্বার্থ আছে, বন্ধু ও শত্রু আছে, তাই আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিতে তারা ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’দের প্রতিপক্ষ, পশ্চাদপদ ও অপরাধী হিসেবে চিত্রায়নেরও চেষ্টা করে। যার প্রভাবে জনপরিসরে ইসলামবিদ্বেষ, ঘৃণা ও ভীতি ব্যাপকভাবে বাড়ছে।
আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও লিবারেল ইসলামোফোবিয়া
ফ্রান্সের গতবছরের ঘটনা উল্লেখ করে আমরা দেখিয়েছি, অনেকে ইসলামোফোবিক হওয়ার অধিকার থাকা জরুরী মনে করেন। অনেকেই ইসলামোফোবিয়া বিষয়ক আলোচনাকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে চান। অর্থাৎ মুসলমানদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক ও অনৈতিক অবদমিত ক্ষোভ ও ক্রোধ থেকে জন্ম নেওয়া হিংসা ও ঘৃণার চর্চায় অনেকের সমর্থন আছে। অনেকে এভাবে, পরোক্ষভাবে, ইসলামবিদ্বেষকে নৈতিক ও যৌক্তিক মনে করেন। এটাকে মৌলিকভাবে লিবারেল ইসলামোফোবিয়া হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
এখানে আধুনিক রাষ্ট্রর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা বিশেষ মনোযোগের দাবী রাখে। আধুনিক লিবারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে জনসমর্থনমূলক মনে করা হলেও সেখানে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। যার প্রেক্ষিতে অনেকের মতে আধুনিক লিবারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেবল ব্যক্তিগত অধিকার ও জনসমর্থন একমাত্র কেন্দ্রীয় বিষয় নয়, এর পাশাপাশি অধিকার আদায়ের জন্য পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গ্রহণ করাও জরুরী।
কাজেই আধুনিক রাষ্ট্রীয় পরিসরে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিমা সভ্যতা কবুল করাও জরুরী মনে করা হয়। এভাবে আধুনিক রাষ্ট্রের এই অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের কারণে অধিকার ও জনসমর্থনের মতো নৈতিক ও যৌক্তিক অবস্থানে ইসলামবিদ্বেষের মোকাবেলা করা যাচ্ছে না। লিবারেল ইসলামোফোবিয়া সেই পথ বন্ধ করে দিচ্ছে বা সংকুচিত করে ফেলছে।
শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও নব্যনাস্তিক্যবাদ
এর পাশাপাশি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও নব্যনাস্তিক্যবাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা জরুরী। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ একটি বর্ণবাদী প্রকল্প, যার মতে আমেরিকা ও ইউরোপ পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গদের প্রমিজল্যান্ড, এখানে অন্য কারো সুষম অধিকার লাভের সুযোগ নেই। পাশাপাশি পৃথিবীর প্রতিটা দেশে তাদের স্বার্থ ও পক্ষ বিদ্যমান। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে আক্রমণকারী ব্রেনটন টারান্টের ইশতেহারে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।
তবে সবকিছুর কেন্দ্রে আছে নব্যনাস্তিক্যবাদ। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আসিফ মহিউদ্দিন ফেসবুকে প্রকাশ্যে নিজেকে ইসলামোফোবিক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কেননা নব্যনাস্তিক্যবাদীদের মতে ইসলাম হচ্ছে, মানসিক অসুস্থতা, অকল্যাণের মূলকেন্দ্রবিন্দু, তাই নিছক ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধিতাকেই তারা যথেষ্ট মনে করেন না ; ‘মানবতার মুক্তির জন্য’ ক্রমাগত বিদ্বেষ, ঘৃণা ও ভীতি ছড়ানোকেই তারা প্রকৃত কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের লক্ষ্য তাই বিরোধ নয়, ইসলামের বিনাশ।
পৃথিবীতে সবযুগেই সীমিত পরিসরে নাস্তিক্যবাদের উপস্থিতি ছিল। তবে সেটা ছিল বিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিতৎপরতায় সীমিত। নব্যনাস্তিক্যবাদ প্রচারকামী— অনলাইন মিম, কটূক্তি ও আক্রমণের প্রধান প্রণোদনা তারাই যোগান দেন। নব্যনাস্তিক্যবাদী তাত্ত্বিক হারিসের মন্তব্য, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নয়, বলুন ইসলাম বিরোধী যুদ্ধ।’ অর্থাৎ এককাট্টাভাবে ধর্মবিরোধিতা করার কথা থাকলেও নব্যনাস্তিক্যবাদীদের মধ্যে ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার প্রবণতাই প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
অস্টেলিয়ান গবেষক উইলিয়াম এমিলসনের মতে প্রবল ইসলামবিদ্বেষই নব্যনাস্তিক্যবাদীদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আদতে নব্যনাস্তিক্যবাদীরা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ থেকে মুক্ত নয়। ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের মতো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা ইসলামবিদ্বেষ প্রতিষ্ঠায় নব্যনাস্তিক্যবাদীদের প্রশ্রয় ও সমর্থন জানান। পাশাপাশি আধুনিক রাষ্ট্র ও লিবারেল সংঘও ইসলামবিদ্বেষের প্রটেকশনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
শেষকথা
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে পশ্চিমা কায়েমি শক্তির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্থানে সামাজিক বিরোধিতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে, তার পরিবর্তে অবদমিত ক্ষোভ ও ক্রোধ থেকে ইসলামবিদ্বেষের জন্ম হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও লিবারেলিজমের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও নব্যনাস্তিক্যবাদের সক্রিয়তায় ইসলামবিদ্বেষ প্রচারিত ও প্রসারিত হচ্ছে।
ইসলামবিদ্বেষ নিছক অল্পকিছু মানুষের মাধ্যমে চর্চিত নয় ; পশ্চিমা ও আধুনিক লিবারেল সমাজের অনেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামবিদ্বেষ লালন করেন। এতে আধুনিক রাষ্ট্র ও লিবারেলিজমের অন্তর্নিহিত দার্শনিক ও আদর্শিক সীমাবদ্ধতা প্রশ্রয় যোগান দেয়। ইসলামবিদ্বেষ, তাদের সবার সম্মিলিত সমষ্টিগত একটা বোধ। কাজেই ইসলামবিদ্বেষ কী ও কেন, এটার কোন সরল উত্তর ও সমাধান নেই…
সূত্রগ্রন্থ
১) ইবনে খালদুন। মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন।
২) আবু হামেদ গাজালি। ইহইয়াউ উলুমিদ দ্বীন।
৩) মুহাম্মদ আলী থানবী । কাশশাফু ইসতিলাহাতিল ফুনুন।
৪) আশরাফ আলী থানবী। গাওয়ায়েলুল গাদাব ; আনফাসে ঈসা, কামালাতে আশরাফিয়াহ।
৫) Al Jazeera English। Why the French left has a problem with Islamophobia
৬) মু’তায আল খাতীব। জাহেরাতু কারাহিয়াতুল ইসলাম।
৭) Fernando Bravo López । Towards a definition of Islamophobia: Approximations of the early twentieth century।
৮) William W. Emilsen। The New Atheism and Islam।
The post কাকে বলে ইসলামবিদ্বেষ ? appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b7/
No comments:
Post a Comment