রাকিবুল হাসান :
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। শিবসেনা ও করসেবকদের হাতে শহীদ হয় বাবরি মসজিদ। মসজিদের গম্বুজে শাবল চালিয়ে বিজেপির করসেবকরা মূলত আঘাত হেনেছিল মুসলমানদের হৃদয়ে। হৃদয়ের ব্যথা ও অসহ্য যন্ত্রণার চিৎকারে তখন জেগে উঠেছিল গোটা উপমহাদেশের মুসলিম উম্মাহ। জাগরণের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মাটিতেও। মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিল বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বাংলাদেশের মসনদে সেসময় বিএনপির শাসন।
লংমার্চের আহ্বান
তখন এদেশে ইসলামী নেতা ছিলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.। বিদেশি শক্তির প্রতি বাংলাদেশের নতজানু সরকার বাবরি মসজিদ ভাঙার কোনো প্রতিবাদ না করলেও তৌহিদি জনতার ঈমানদীপ্ত দাবিকে সামনে রেখে মুজাহিদে মিল্লাত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রাহঃ এর প্রস্তাবে শায়খুল হাদীস রহ. ঢাকা থেকে বাবরি মসজিদ অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের আহ্বান করেন। এই লংমার্চ কর্মসূচির সদস্যসচিব ছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.।
নব্বইয়ের দশকে এ দেশের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং শরিক হয়েছেন আজকের ইসলামি ঘরানার বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। বাবরি মসজিদ অভিমুখে লংমার্চের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন, বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে আয়োজিত লংমার্চের একমাত্র বড় নেতা ছিলেন শাইখুল হাদীস আজিজুল হক রহমাতুল্লাহি আলাইহি। আমি বলব, বরং এই মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আরও একজন বড় নেতা ছিলেন। তিনি হচ্ছেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। আমিনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন হজরত শাইখুল হাদীসের স্নেহধন্য ছাত্র এবং ওই লংমার্চের সদস্য সচিব। লংমার্চের প্রচার-প্রচারণা, মিডিয়া সংযোগ ইত্যাদি যাবতীয় কাজ তদারকি হতো লালবাগ মাদরাসা থেকে। হাফেজ্জি হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামফলক টানানো রুম থেকে এসব কাজ তদারকির কারণে রুমের নাম-ই পড়ে গিয়েছিলো ‘কন্ট্রোল রুম’ হিসেবে। লংমার্চের কিছু কাজ আঞ্জাম দেয়া হতো পল্টনে খেলাফত মজলিসের অফিস থেকে। শাইখুল হাদীস এবং মুফতি আমিনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি দুজন ছিলেন দুটি ইসলামিক রাজনৈতিক দলের। কিন্তু এই লংমার্চ করেছেন একসঙ্গে।’
লংমার্চের যাত্রা
১৯৯৩ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকা বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে বেনাপোল অভিমুখে বাবরি মসজিদ রক্ষার দাবিতে লংমার্চের যাত্রা শুরু হয়। ঢাকা থেকে শুরু হওয়া লংমার্চ সাভার, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাগুরা হয়ে যশোর বাসস্ট্যান্ডে সমাবেশ শেষে বেনাপোলের দিকে ১৬ মাইল পথ অতিক্রম করে ৪ জানুয়ারি ঝিকরগাছা পৌঁছলে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যারিকেড দেয়া হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার যাদের অন্যতম দলীয় মূলনীতি ছিল বাংলাদেশের স্বার্থে হিন্দুস্তানের সামনে বশ্যতা স্বীকার কিংবা নমনীয়তা প্রদর্শন না করা, তারা এই লংমার্চের বিরোধিতা করে। এরপরেও বিক্ষুব্ধ তৌহিদি জনতা পায়ে হেঁটে ইন্ডিয়ার দিকে অগ্রসর হতে চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন ৪ জন। ঝিকরগাছায় মাগরিব আদায়ের পর শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহমাতুল্লাহি আলাইহি লংমার্চ স্থগিত ঘোষণা করেন।
লংমার্চ স্থগিত করার পরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘যেমন সংঘবদ্ধভাবে লংমার্চে অংশগ্রহণকারীরা বেনাপোলের দিকে গিয়েছিলো, ঠিক তেমনি সংঘবদ্ধভাবে ফিরে আসে। তখন ঢাকায় কোনো উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন না। কারণ শাইখুল হাদীস এবং মুফতি আমিনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন লংমার্চে; এবং তাঁদের সঙ্গে ছিলেন অন্য নেতারাও। এই সময় লংমার্চ-ফিরতি জনগণকে রিসিভ করতে ঢাকায় বাইতুল মোকাররমের দক্ষিণ গেইটে একটি সমাবেশ করার দায়িত্ব দেয়া হয় আমার ওপর। আমি একটা খোলা ট্রাক ও মাইকের ব্যবস্থা করে মঞ্চ সাজাই। লংমার্চের চতুর্থ দিন ছিল বোধহয়। মার্চকারীরা ফিরে আসতে আসতে সন্ধা হয়ে যায়।’
দেশে এবং দেশের বাইরে লংমার্চের প্রভাব
দেশে এবং দেশের বাইরে লংমার্চের কেমন প্রভাব পড়েছিলো জানতে চাইলে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘দেশে যেমন প্রভাব পড়েছে, তেমনি দেশের বাইরে ভারতেও এর প্রভাব পড়েছে। এই লংমার্চের কারণে একদিকে ভারতীয় মুসলিমরা হিম্মত এবং সাহস পেয়েছে। নাহ, আমরা একা নই; আমাদের পক্ষে কথা বলার মানুষ আছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্ধ হয়েছে ভারতের অমুসলিমরা।
দেশের রাজনীতিতে বড় ধরণের একটা প্রভাব পড়েছে। বিএনপি আগে ইসলামি দলগুলোকে গ্রাহ্য করতো না। কিন্তু আলেমদের নেতৃত্বে ৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে লংমার্চ, ৯৪ সালে তসলিমা বিতাড়ন আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার পর বিএনপির টনক নড়ে। তখন তারা জোট গঠনের পরিকল্পনা করছিলো। যেহেতু আলেমরা এদেশে বিরাট এক শক্তি, তাদের সঙ্গে যেহেতু জড়িত এদেশের অধিকাংশ মানুষের সেন্টিমেন্ট, জোটে তাই বিএনপি আলেমদেরও ডাকে। তৎকালীন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের বেশ-ভূষা ও কৌশলেও কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তখন। আমরা মনে করি একটি আন্দোলন শেষ হয়ে যায়। আসলে একেবারেই শেষ হয় না; তার রেশটুকু রয়ে যায়।’
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘এরপর ভারতের তখনকার কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও বাংলাদেশে এসেছিলেন। আলেমগণ তার বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন। কারণ এই কথাটুকু জানাজানি হয়ে গিয়েছিলো, নরসীমা রাও চাইলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। নিশ্চুপ থেকে এই ধ্বংসযজ্ঞে মৌন সমর্থন দিয়েছেন। তাই শাইখুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন একদম কঠিন। তার দাবি, নরসীমা রাওকে বাংলাদেশে আসতেই দেয়া যাবে না। এলে আমরা বিমানবন্দর ঘেরাও করব। অন্যদিকে মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঠিক, কিন্তু শাইখুল হাদীসের মতো এত কঠোর হননি তিনি। বিমানবন্দর ঘেরাওয়ের পক্ষে তিনি ছিলেন না। নাযুক এই পরিস্থিতিতে শাইখুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় দুমাস বন্দী থেকে নরসীমা রাও বাংলাদেশ সফর করে যাবার আরও একমাস পর মুক্তি পান তিনি।’
বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে কেমন প্রতিবাদ দরকার
কিন্তু সেই আন্দোলনের দিন এখন আমাদের নেই। মিয়ানমার থেকে, আসাম থেকে অগণিত মানুষকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, আমরা কথা বলারও সাহস পাচ্ছি না। সাহস করে কথা বললেও মিডিয়ার কারসাজিতে তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে অন্তরালে। এর আগে আমাদের টুপিপড়া সাহসী মানুষেরা করে গেছেন খেলাফত আন্দোলন, বাবরি মসজিদ অভিমুখে লংমার্চ, কাদিয়ানিবিরোধী আন্দোলন, তসলিমা নাসরীন খেদাও আন্দোলন, ফতোয়াবিরোধী রায় বাতিল আন্দোলন এবং নাস্তিক-মুরতাদদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন। অথচ বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের রায় দিলো ভারতের সুপ্রিমকোর্ট, কোনো জাগরণ, কোনো বড় প্রতিবাদ হলো না কোথাও। এর নেপথ্যের কারণ তুলে ধরেছেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ওই সময়ের মতো এত বড় আন্দোলন করার নেতৃত্ব ও পরিবেশ এখন বাংলাদেশে নেই। শাইখুল হাদীস, খতিব উবায়দুল হক এবং মুফতি আমিনীর মতো সাহস করে বুক চিতিয়ে প্রতিবাদ জানানোর মতো মানুষ এখন কই। তাদের উঁচু ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়ানোটা ছিলো মুশকিল। আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এখন যেই আচরণ ও সম্পর্ক, ভারতের কোনো বিষয় নিয়ে আন্দোলন করাটাও কঠিন।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, এটাও ঠিক, প্রতিবাদ না করলে তাদের সাহস আরও বাড়বে। আরও মসজিদ টার্গেট করবে। কিন্তু ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু। প্রতিবাদ করতে গেলেই তারা নির্যাতিত হবে। যেমন বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সৃষ্ট দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মুসলমান মারা গিয়েছিলো। এখনও এমন হতে পারে। এইদিকে লক্ষ্য করেই হয়তো ভারতের আলেমগণ একটু চুপ আছেন। আর বাংলাদেশেও ৯২ সালের মতো এতবড় লংমার্চ করার নেতৃত্ব ও পরিবেশ নেই। সময় বদলেছে, মনোভাব বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে। তাই যতটুকু পারা যায়, প্রতিবাদ করা আমাদের দায়িত্ব।
The post বাবরি মসজিদ লংমার্চ : বাংলাদেশী মুসলমানরা যেভাবে প্রতিবাদ করেছেন appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a6-%e0%a6%b2%e0%a6%82%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9a-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2-2/
No comments:
Post a Comment