হাফেজ কেফায়েত :
হিফজ শেষ করার পর আমি মাদরাসাতুল মদীনায় ভর্তি হই ১৯৯৬ সালে। এখানে আমাদেরকে বাংলা পড়াতেন কাতেব সাহেব হুজুর (বশির মেসবাহ)। হুজুর আমাদেরকে পড়া দিয়ে যেতেন, পরদিন পড়া ধরতেন। একদিন আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথের ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ মুখস্থ করতে দিলেন। পরদিন ক্লাসে এসে হুজুর একজন একজন করে কবিতাটা শুনাতে বললেন। আবুল খায়েরের পালা যখন এলো, তখন সে দাঁড়িয়ে শুরু করলো— বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠুকুর…। হুজুর মুচকি হেসে বললেন, বসো, বসো!
হুজুরের সেই হাসিটা এখনো আমি কল্পনা করতে পারি। দেখা হলে এখনো হুজুর যে হাসি দিয়ে কথা বলেন, দুই যুগ আগের সেই হাসিটা তার এখনকার হাসিতে মিলেমিশেই আছে, দেখতে পাই।
মাদরাসাতুল মদীনায় খত্তে রুকআ ছাড়া আর কোনো আরবি খত্তের চর্চা ছিলো না। বাংলার পাশাপাশি হুজুর আমাদেরকে আরবী খত্তে রুকআ শেখাতেন। হুজুর ক্লাসে এলে আমরা আরাম বোধ করতাম। তার পুরো ঘণ্টায় কোনো কঠোরতা ও চাপ ছিলো না।
বন্যাকবলিত মাদরাসাতুল মদীনা
তখন আমি প্রথমবর্ষে নাকি দ্বিতীয়বর্ষে, মনে নেই। হুজুর পড়ানো ছেড়ে দিলেন। তখনকার দিনে বাৎসরিক বন্যায় কামরাঙ্গীরচর তলিয়ে যেতো। মাদরাসাতুল মদীনার নিচতলা অর্ধেকের বেশী ডুবে যেতো। হুজুরের বাড়িতেও সম্ভবত পানি ঢুকে পড়েছিলো, তাই মাদরাসা-মসজিদের পাশে ছোট্ট একটা কামরায় হুজুর দরজা ভিড়িয়ে কী যেনো করতেন। একদিন উঁকি মেরে দেখি রঙতুলি দিয়ে বড়ো বড়ো আরবি অক্ষর আঁকছেন, জানতে পারলাম সেসব ক্যালিগ্রাফি। উঁকি দিচ্ছি দেখে হুজুর ডেকে বললেন— ‘আমি চলে গেলে আইসা দেইখো’। তারপর কয়েকদিন হুজুর যাওয়ার পর হুজুরের ক্ষুদ্রাকৃতির বিরাট সাম্রাজ্য দেখলাম। রঙতুলিতে কী কারবার হুজুর করতেন, দেখলাম। হুজুরের চেনা ছবির সঙ্গে রঙ্গীন কাজগুলো বিরাট পার্থক্যের মনে হলো— মেলানোই যাচ্ছিলো না। আমার চেনাজানা একজন মানুষ এমনসব শিল্পকর্ম এঁকে চলেছেন, অবিশ্বাস্য।
সেই সময়ের আগে অথবা পরে হুজুরের ক্যালিগ্রাফি দিয়ে কারা যেনো ক্যালেন্ডার করে, সম্ভবত আজাদ প্রোডাক্টস। সেসব সামনে রেখে আমিও কমলা আর টিয়া কালারের সাইনপেন দিয়ে ক্যালিগ্রাফি আঁকাআঁকি শুরু করি। অবশ্য, কলম আর সাইনপেন দিয়ে আমি মানুষ-ফুল-লতাপাতা আঁকি হেফজখানায় থাকতেই। টিপু সুলতান, বাকের ভাই, ইজ্জত আলী— সবই আঁকতাম ভিউকার্ড দেখে দেখে। কিন্তু ক্যালিগ্রাফির চেষ্টাটা শুরু করি হুজুরের সেই সাম্রাজ্য দেখার পর। রেজাল্ট ভালো, ভালোই পারছিলাম। একটা সময় মাদরাসাতুল মদীনা ছেড়ে দিলাম মাঝপথেই।
সৈয়দ আলী আহসানের মতো মহাসমুদ্রে
ক্রিকেট খেলতাম আর বখাটেদের সঙ্গে ঘুরতাম। রোদে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছিলাম, কালো দেখাতো। লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পর্ক নাই, কিন্তু ক্যালিগ্রাফিটা সুযোগ পেলেই করতাম। পত্রপত্রিকা পড়তাম, পত্রিকা দেখে দেখে ছবি আঁকতাম। লেখালেখিও ধরতে চাইলাম, পারলাম না। কবিতা আসে না, গল্প আসে না, মগজ খালি। মাদরাসাতুল মদীনায় থাকতে লেখাপড়ায় মন না থাকলেও বখাটেপনার সময়টাতে আঁকাআঁকির পাশাপাশি বইপড়া পেয়ে বসলো। সিরিজ ছাড়া সব পড়া শুরু করলাম। অন্যান্য বইয়ের পাশাপাশি ইনকিলাবের সাহিত্য পড়তে পড়তে কাবু হয়ে গেলাম একপ্রকার। বশির মেসবাহর ঘোর কাটতে না কাটতেই সৈয়দ আলী আহসানের মতো মহাসমুদ্রে তখন অবচেতন মনে পড়ে যাই।
আমাদের বাড়ির কাছেই মাদরাসাতুল মদীনা। সেখানকার প্রায় অনেক খবর কানে আসতো। শুনতাম অমুকে তমুকে সৈয়দ আলী আহসানের বাসায় গিয়ে দেখা করে এসেছে। আবার শুনলাম আদিব (আবু তাহের মেসবাহ) হুজুরও সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। তাদের কয়েকজনকে বললাম আমাকে সৈয়দ আলী আহসানের কাছে নিয়ে যেতে, কেউ নিলো না। পরে তার বইয়ের ভূমিকা থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে বন্ধু সোলেমানকে (মাওলানা সুলাইমান ঢাকুবী) সঙ্গে করে চলে যাই সৈয়দ আলী আহসানের বাসায়।
প্রথম দিনই তিনি আমাদের মতো দুই পিচ্চিকে দেড় ঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন। তারপর থেকে সময়ে-সুযোগে কলাবাগানে স্যারের বাসায় চলে যেতাম। যখনই যেতাম, তিনি রাত ৮টা পর্যন্ত আমাদেরকে সময় দিতেন। আমি ক্যালিগ্রাফি আঁকার চেষ্টা করি শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন— তোমাদের (হুজুর) মধ্যে অনেক মানুষ ক্যালিগ্রাফি আঁকাআঁকি করে?
আমি না বুঝেই বলে বসলাম, হ্যাঁ, অনেকেই করে।
তখন তিনি বললেন, এটা (ক্যালিগ্রাফি) তো ইসলামী শিল্পকলা। তোমাদের মধ্যে কেউ কি ইসলামী শিল্পকলা নিয়ে লেখালেখি করে?
আমি বললাম, না, কাউকে লিখতে দেখিনি, এমন কাউকে চিনিও না।
তখন তিনি বললেন, কাউকে তো লিখতে হবে। শিল্পকর্ম নিয়ে যদি লেখালেখি না হয়, তাহলে তো এই ধর্মাশ্রয়ী শিল্পচর্চায় বেগ আসবে না।
তারপর তিনি ইসলামী শিল্পকলা, ক্যালিগ্রাফি, কামালুদ্দীন বিহযাদ, রশীদ চৌধুরী ইত্যাকার বিষয়ে অনেকক্ষণ কথা বললেন। ভয়ে ভয়ে আমি আমার কিছু ক্যালিগ্রাফি ব্যাগ থেকে বের করে দেখালাম। দেখে তিনি বললেন, কোথায় শিখেছো?
বললাম, আমাদের এক হুজুর বশির মেসবাহ সাহেব করতেন। তারগুলো দেখে নিজে নিজেই করছি।
তিনি বললেন, তাহলে শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য পড়ো, অবনের (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর) বাগেশ্বরী পড়ো, ইসলামী শিল্পকলা ও ক্যালিগ্রাফি নিয়ে লেখার চেষ্টাও করো। দুটো (ক্যালিগ্রাফি ও লেখালেখি) একসাথেও চেষ্টা করে যেতে পারো।
তারপর শূন্য থেকেই লেখালেখিটা শুরু করলাম। না গল্প, না কবিতা, না ডায়েরি। শুরুই করলাম শিল্পসমালোচনা দিয়ে। প্রথম লেখাই লিখলাম শিল্পী বশির মেসবাহর একক প্রদর্শনী নিয়ে। লেখাটা নিয়ে গেলাম ইনকিলাবে, নদভী (উবায়দুর রহমান নদভী) সাহেবকে লেখাটা দিলাম। উনি লেখাটা হাতে না নিয়ে বললেন, টেবিলে রেখে যান। তার কথা শুনেই বুঝলাম, লেখাটা যাবে না। শুক্রবার পত্রিকা খুলে দেখলাম, আসলেই লেখাটা যায়নি। একই বিষয়ে গিয়েছে শরীফ মুহাম্মদের লেখা। অথচ, শরীফ মুহাম্মদের লেখাটা আমার লেখার সামনে কিছুই হয়নি। তখনও মনে হয়েছিলো, আজও তা-ই মনে হয়। পরে সেই লেখার একটা কপি বশির মেসবাহর হাতে দিয়েছিলাম। তিনি সম্ভবত পড়েছিলেন। তবে, সাব-এডিটর নদভীর কাছে আমি আর কখনো যাইনি। ইনকিলাবে নদভীর পাশের রুম ছিলো শিকদার (আবদুল হাই শিকদার) ভাইয়ের রুম। অনেক বছর শিকদারের এই রুম ছিলো আমার অনেক বড়ো আশ্রয়-আস্তানা। শিকদারের রুম থেকে জীবনে পাশের রুমে আর তাকাতে হয়নি।
মাঝে হাজী সাহেব হুজুর (সাঈদ আল মিসবাহ) আমাকে ধরে নিয়ে যান বশির মেসবাহর সালসাবীল-এ কাজ শেখার জন্য, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার জন্য। কয়েকমাস সালসাবীল-এ যাতায়াত করেছি। চা আনতাম, কাপে ঢেলে পরিবেশন করতাম, কাস্টমার এলে চেয়ার ঠিক করে দিতাম আর গ্রাফিক্স-এর কাজ দেখতাম দূর থেকে। পরে হঠাৎ সালসাবীলেও যাওয়া বন্ধ করে দিই।
এরই মাঝে জাতীয় জাদুঘরে একটা ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীতে অংশ নিই। ক্যালিগ্রাফি নিয়ে নিজের প্রতি নিজের যে আস্থা ছিলো এতোদিন, প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেটা হাজারগুণ বেড়ে যায়। লেখালেখিটাও চলতে থাকে প্রচণ্ড বেগে। বশির মেসবাহ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের এমন কোনো বড় শিল্পী নেই, যার উপর আমি লিখিনি। পৃথিবীতেও এমন কোনো বড় শিল্পী নেই, যার উপর আমি লিখিনি— শুরুটা ছিলো ওই অপ্রকাশিত বশির মেসবাহ।
ইনকিলাব, ইত্তেফাক, যুগান্তর, আমার দেশসহ ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রভাবের সঙ্গে জায়গা করে নিলাম। কোনো পত্রিকা থেকেই আমার কোনো লেখা কখনো ফেরত আসেনি। নদভী ছাড়া আর কেউ আমার কোনো লেখা অপ্রকাশিত রাখেনি। ততদিনে বাংলাভাষায় রচিত শিল্পকলা, ছন্দ ও নন্দনতত্ত্ববিষয়ক সকল বই গিলে খেয়ে ফেলেছি। শিল্পসমালোচনা হয়ে উঠেছে আমার প্রধান পেশা। রাষ্ট্রের শিল্পবিষয়ক সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন তাদের সকল আনুষ্ঠানিকতায় আমাকে ডাকতেন, আমি লিখতাম। দেশের সকল শিল্পীর কাজ আমার নখদর্পণে ছিলো, বিশ্বশিল্পের সকল কাজও আমার নখদর্পণেও থাকতো। এখন লেখালেখিটা না করলেও বিশ্বের সকল শিল্পীর কাজ আমার মুখস্থ।
ক্যালিগ্রাফি শিল্পের দানবিক প্রতিভা শিল্প নিয়ে আসলে কম্পারেটিভ লিটারেচার হয় না। হলেও সেটা প্রাথমিক অথবা মাধ্যমিকপর্যায়। শিল্প নিয়ে আপনি যতো উপরে উঠবেন, আপনার ভেতর থেকে ততোই তুলনামূলক সাহিত্য নাই হয়ে যাবে। তুলনা নাই হয়ে গেলেও যদি তর্কের খাতিরে তুলনা করি এবং শিল্পের বিষয়, বৈচিত্র্য ও দক্ষতার নিরিখে কিছু বলার থাকে, তখন বশির মেসবাহর নামটা বেশ দাপট নিয়ে সামনে এসে যায়।
হতে পারে ক্যালিগ্রাফি বিশ্বশিল্পের একটা পার্ট। কিন্তু বশির মেসবাহর ক্যালিগ্রাফিতে বাকিসব শিল্পের তাণ্ডব চোখে পড়ে। শিল্পের সকল শাখা-প্রশাখা তিনি তার ক্যালিগ্রাফির ক্যানভাসে একাকার করে ফেলেছেন। দাদাবাদ বলি আর পরাবাস্তববাদ বলি বা হাইপাররিয়েলিজম বলি, কামরাঙ্গীরচরের ওই বশির মেসবাহর ক্যানভাসে আমি শিল্পবিষয়ক সব ইজমের দুর্দান্ত দাপট দেখেছি।
অনেকে বলে থাকেন, বিশেষ করে আরিফ ভাই (আরিফুর রহমান) ক্যালিগ্রাফির নিজেই একটা পরিপূর্ণ শিল্প। আমিও তাই মানি, বিশ্বাস করি। তবে এই পরিপূর্ণ ক্যালিগ্রাফি শিল্পকে বশির মেসবাহ অন্যান্য শিল্পধারা ও পদ্ধতির সংমিশ্রণে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন, সেটা আসলেই অস্পৃশ্য।
এখন কথা হচ্ছে বশির মেসবাহ বিশ্বশিল্পকে কী দিয়েছেন, অথবা বিশ্ব ক্যালিগ্রাফিশিল্পকে কী দিয়েছেন! আমি বলবো, অবশ্যই বিরাট কিছু দিয়েছেন। বিশেষ করে, তার ক্যালিগ্রাফিতে একটা কমন কাজ আছে, যার কোনো পরিভাষা আমি বিশ্বশিল্পের সমালোচনায় পাইনি। তাই আমি তার নাম দিয়েছি- ‘অর্থ ঠিক রেখে বাক্যে শব্দের সঙ্কুলান’। এটাই বিশ্বশিল্পে বশির মেসবাহর সবচেয়ে বড়ো কীর্তি। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক— একটা বাক্যে শব্দ আছে ১৫টা, বশির মেসবাহ সেই ১৫ শব্দের বাক্যই লিখে ফেললেন ১৩ শব্দে, মাই গুডনেস!!!
আবার আপনি যখন ক্যালিগ্রাফির অন্তরে ঢুকে পড়বেন, সেখানে অনেক নন্দনতত্ত্বের মুখোমুখি হবেন, যার সবই অচেনা। ইরানের এক বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফিশিল্পী মানেশ (নাসের নওরোজি মানেশ) একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। ইরান কালচারাল সেন্টার তখন আমাদেরকে বলেছিল, শিল্পীকে যেনো আমরা আমাদের কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানাই। আমাদের ক্যালিগ্রাফি একাডেমীর কার্যালয় ছিলো আরিফ ভাইয়ের অফিসটাই। সেখানেই মানেশ এলেন। দীর্ঘক্ষণ আমরা তার সঙ্গে আলাপ করি, সেখানে বশির মেসবাহ সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। কথা বলতে বলতে মানেশ একপর্যায়ে বললেন— ‘২৭ বছর হলো ক্যালিগ্রাফি করছি, আজও মনের মতো আলিফ আঁকতে পারলাম না’। ক্যালিগ্রাফি শিল্পের অন্তরে অন্দরে আপনি যখন ঢুকে পড়বেন, তখন মানেশের কথার মতো অনেক কথার মুখোমুখি হবেন। আমি বিশ্বাস করি, মানেশের কথায় কোনো অতিরঞ্জন বা বিনয় ছিলো না, খাঁটি বাস্তবতা। আসলেই, ক্যালিগ্রাফিশিল্পে আলিফের এতো গঠন, এতো আকৃতি, এতো ছন্দ, এতো স্থিতি, এতো চলমানতা, এতো গতি— ওইভাবে ধ্যানমগ্ন না হলে সেই রেস-এর সন্ধানই আপনি পাবেন না, রেস-এ প্রবেশ করা তো দূরের কথা। মানেশ সেই রেস-এ ২৭ বছর কাটিয়ে বললেন— ‘২৭ বছর হলো ক্যালিগ্রাফি করছি, আজও মনের মতো আলিফ আঁকতে পারলাম না’। মানেশ যেই রেস-এ আছেন, সেই রেস-এ বশির মেসবাহ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
হুজুরের ইরান সফর লাগে না, বাংলাদেশের অনেক শিল্পী ক্যালিগ্রাফি নিয়ে ইরান সফর করেছেন, অনেক আলতুফালতু শিল্পীও ইরান গেছেন ক্যালিগ্রাফি নিয়ে। বশির মেসবাহ এখনো যাননি। কেনো যাননি? কারণ, ইরান যাওয়ার লোভ তার নেই। ইরান যাওয়ার জন্য ইরানিয়ান কালচারাল সেন্টারের কর্মচারীদেরকে স্যার স্যার বলার মতো ছোটলোকি বশির মেসবাহর মধ্যে নেই। ইরান ও তাদের কালচারাল কর্তৃপক্ষের দুর্ভাগ্য যে, বশির মেসবাহর মতো মহান শিল্পী তাদের ভূমিতে পদধূলি দেননি। এই হিসেবে, ইরানের জন্য আমার করুণা হয়…। পৃথিবীর ক্যালিগ্রাফিতে ইরান সবচেয়ে দাপুটে দেশ, বশির মেসবাহ সেখানে গেলে ইরানের বড়ো বড়ো শিল্পীরা ক্যালিগ্রাফির নতুন এক জগতের সন্ধান পেতো। তাদের জন্য আবারো করুণা প্রকাশ করলাম…।
শিল্প গেলো, এইবার বলি কমার্শিয়াল চ্যাপ্টার, মানে ব্যবহারিক শিল্প লেটারিং বলতে একটা ব্যাপার আছে, বাজারে এর বিশাল চাহিদা। ফ্রিহ্যান্ড লেটারিং-এর বাইরে গিয়ে জনপ্রিয় শিল্পীরা জীবনে এক বা দুই অথবা তিন স্টাইলের লেটারিং সর্বঅক্ষর নিয়ে করতে পারে, নিজ বৈশিষ্ট্যে। বাংলায় সত্যজিৎ রায়ই অনেকরকম লেটারিং করেছেন, কিন্তু তার কোনোটাই সর্বঅক্ষরের না, পূর্ণেন্দু পত্রীরও সর্বঅক্ষর আমি পাইনি। লেটারিং-এ বাংলাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মাত্র একটা লেটারিং সর্বঅক্ষর নিয়ে করে গেছেন। হাশেম খানও করেছেন একটা, তবে তার লেটারিং-এ সর্বঅক্ষর আমি এখনো খুঁজে পাইনি। আফজাল হোসেনের কয়েকটা লেটারিং আছে, তবে একটাও সর্বঅক্ষরের না। সর্বঅক্ষরের লেটারিং সহজ ব্যাপার নয়, অনেক বড়ো দক্ষতা ও সাধনার ব্যাপার, বড় বড় শিল্পীরাও এক আকৃতির সর্বঅক্ষর করে যেতে পারেননি। অনেকক্ষেত্রে সম্ভবও না। কিংবদন্তিরা যেখানে জীবনে একটা আকৃতির সর্বঅক্ষরে ব্যর্থ, সেখানে বশির মেসবাহ চাইলে ৩৬০ দিনে ৩৬০টা সর্বঅক্ষরের লেটারিং বাংলাদেশকে দিতে পারবেন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা বশির মেসবাহকে কাছে পেয়েও তার কাছ থেকে কোনো সর্বঅক্ষরের ডেলিভারি নিচ্ছি না।
বশির মেসবাহ এ পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে যতো ধরণের বাংলা অক্ষররীতি তৈরি করেছেন, বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার শিল্পীরা মিলেও তার ১০ ভাগের একভাগ বাংলা অক্ষররীতি তৈরি করতে পারেননি। এবং তার সকল অক্ষর হচ্ছে সুপারফিনিশড। তিনি একটা অক্ষরকে আকৃতি দেওয়ার পর আমাদের কারো সাধ্য নেই সেই আকৃতিতে রিটাচ করার বা এডিট করার। সেই অর্থে বশির মেসবাহই হচ্ছে বাংলা অক্ষরশিল্পের শেষ কথা।
বাতাসের সঙ্গে খেলা
পৃথিবীতে একজন শিল্পী যতো বড়োই হন না কেনো, যত খ্যাতিই কামান না কেনো, তার ড্রয়িং আলাদা বিবেচ্যবিষয়। এটা সকল শিল্পীরই আলাদা বিবেচ্য বিষয়। তবে একজন বড়ো শিল্পী ড্রয়িং-এ বড় নাও হতে পারেন। প্রথম আলোতে একসময় যে কার্টুন করতেন শিশির ভট্টাচার্য (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের প্রফেসর), তিনি কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ড্রয়িং আর্টিস্ট। আপনি বাতাস চোখে দেখেন না, কিন্তু শিশির বাতাসকে এমন আকৃতি দিবে যে, আপনি বাতাসের মাত্রাও অনুভব করতে পারবেন, শীতলতা ও উষ্ণতাও। প্রতিবছর বাংলাদেশে হাজারো ছেলেমেয়ে চারুকলায় গ্রাজুয়েশন করে বের হচ্ছে কিন্তু শিশিরের মতো ড্রয়িং তাদের কাছে একটা দুঃস্বপ্ন।
বশির মেসবাহ এখন ড্রয়িং করেন কিনা, জানি না। হয়তো প্রয়োজন পড়ে না বলেই করেন না। আদিব হুজুর একসময় আরবী ভাষায় ‘আল-কলম’ বের করতেন। তখন বাংলাদেশে কম্পিউটার ছিলো না। পুরো পত্রিকাই হাতে লেখা হতো, সব ছবিও হাতে আঁকা থাকতো। সেই পুরো পত্রিকা হাতে করতেন বশির মেসবাহ। সেই আরবী আল-কলমের অনেকগুলো সংখ্যা আমি দেখেছি। তার প্রতিটা ড্রয়িং আমি ভালোভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, চর্চা অব্যাহত রাখলে শিশিরের বাতাসকে নির্দ্বিধায় অতিক্রম করতে পারতেন বশির মেসবাহ।
কামলা খাটা
আধুনিক সময়ে বাংলাদেশে প্রথম ক্যালিগ্রাফিক মসজিদ হয় কুমিল্লার দেবীদ্বারে। সেই মসজিদের নকশার দায়িত্বে ছিলেন আরিফুর রহমান। ওই মসজিদে কুরআনের আয়াতের যে লেটারিং, তার সবটাই করেছেন বশির মেসবাহ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মসজিদ সম্ভবত বরিশালের গুঠিয়া মসজিদ। এই মসজিদের সব টানা লেটারিংও বশির মেসবাহর করা। হতে পারে, এ দুই মসজিদের একটাতেও শিল্পী বশির মেসবাহর নাম নেই। শুনেছি, সেই কাজের জন্য হুজুর পর্যাপ্ত টাকা পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সব মাদরাসার আরবী নাম টানা লেটারিংয়ে হাতে লেখা হয়। বাংলাদেশে যতো মাদরাসার নাম হাতে লেখা হয়েছে, তার অন্তত ৯০ ভাগই লিখেছেন বশির মেসবাহ।
পরিপূর্ণ কুরআনিক ক্যালিগ্রাফিশিল্পী
পৃথিবীর সব দেশেই ক্যালিগ্রাফিশিল্পীদের একটা স্বপ্ন থাকে- ‘পুরো ৩০ পারা কুরআন শরীফ নিজ হাতে লেখা’। এ মহাপুণ্যের কাজ সম্ভবত বশির মেসবাহ একাধিকবার করেছেন। এর বাইরেও অনেক আরবী-উর্দু বই আছে, সম্পূর্ণটাই তার হাতে লেখা।
শিল্পীজীবনের পাশাপাশি অন্যকিছু
বাংলা বইয়ের বাজারে একটা বেস্টসেলার বই আছে, যার অনুবাদক বশির মেসবাহ। এর বাইরেও অনেক বই তিনি অনুবাদ করেছেন। শিল্পীর পাশাপাশি তিনি একজন মাঝারি মানের অনুবাদকও। তার কিন্তু সরকারি দফতরে রেজিস্টার্ড একটা মাসিক পত্রিকাও আছে, নাম হচ্ছে ‘যমযম’। তিনিই প্রকাশক। পত্রিকাটি যখন বের হতো, তখন তিনি নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। একসময় আমি সেই পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতাম, শিরোনাম ছিলো ‘শেরেবাংলার খাঁচায়’। পত্রিকাটা এখন আর বের হয় না, নিয়মিত বের হলে সম্ভবত আমার লেখালেখিটাও চলমান থাকতো।
হুজুর খুব ভালো একজন মনোযোগী সংবাদপত্র পাঠক। যে কেউ পত্রিকা না পড়ে যদি বিকেলে বা সন্ধ্যায় হুজুরের সঙ্গে বসে চা-পুরি খান, নিশ্চিতভাবেই তিনি সেদিনের সব খবরের নির্যাস পেয়ে যাবেন। হুজুরের পেছনে আমি অনেকদিন নামাজ পড়েছি। হুজুরের তেলাওয়াতের কণ্ঠ সাধারণ অর্ধে মধুর নয়, কিন্তু তার কুরআন তেলাওয়াতে আলাদা দরদ আছে। দীর্ঘসময় হুজুরের লম্বা তেলাওয়াত শুনতে পারিনি, এটা ধরা যায় আমার একটা আক্ষেপ।
শেষের কথা
আমি নিজেও হুজুরের অফিসে বছরে একদিনও যাই না এখন। এলাকায় হুজুরের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমাকে দেখলেই হুজুর জিজ্ঞেস করেন কেমন আছি। দাঁড়িয়ে দুচার মিনিট কথাও বলেন। শান্তি পাই। আরাম বোধ করি।
হুজুর আমাদেরকে অনবরত দিয়েই যাচ্ছেন। আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশীই দিয়ে যাচ্ছেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমাদের প্র্যাক্টিকাল মুসলিমরা যে জগত সম্পর্কে কিছুই জানতো না, বশির মেসবাহ সেই জগতের একটা একটা দরজা খুলে দিয়েছেন আমাদের সামনে…।
তবে, আমি কাউকে কোনোদিন বলিনি হুজুরের কাছে যেতে। এখনো চাই না, কেউ, কোনো শিল্পশিক্ষার্থী হুজুরের কাছে যাক। কারণ, এখনকার অসহিষ্ণু প্রজন্ম হুজুরকে নিতে পারবে না। এরা হুজুরকে বুঝতে পারবে না, হুজুরকে পড়তে পারবে না, পাঠ করতে পারবে না। হুজুরকে বুঝতে পারাটাও একটা বিদ্যা, সেই বিদ্যা বাংলাদেশে ম্যাক্সিমাম ১০ জন মানুষ অর্জন করেছে, তারমধ্যে সৌভাগ্যবান একজন আমি হাফেজ কেফায়েত। হুজুর আমাকে চিনতে পারেন, আমাকে দেখলে খোঁজখবর নেন, এটা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।
The post কাতেব সাহেব, শিল্পী বশির মেসবাহ ও আমার হুজুর! appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%80-%e0%a6%ac%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%ae/
No comments:
Post a Comment