Friday, June 19, 2020

ছেলের মুখে বাবার স্মৃতি: যেমন ছিলেন আবদুল লতিফ নেজামি

রাকিবুল হাসান:

রাজনীতির ময়দানে দারুণ কর্মব্যস্ত মানুষ ছিলেন মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি। ইসলামি অঙ্গনে যারা রাজনীতি করেন, তারা সবাই পার্ট টাইম রাজনীতি করেন। মসজিদ-মাদরাসার খেদমতের অবসরে চালান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু নেজামি সাহেব ছিলেন তাদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তিনি ফুলটাইম রাজনীতি করতেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই ছিলো তার জীবনে সবচে প্রধান ব্যস্ততা। বাইরে দারুণ ব্যস্ত এই মানুষটি ঘরে কেমন ছিলেন—জানতে চেয়েছিলাম। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিলেন তার দুই ছেলে—ফারুক আহমেদ এবং উবায়দুল হক। বাবাকে নিয়ে তাদের মুগ্ধতার শেষ নেই।

ফারুক আহমাদের সঙ্গে যখন কথা বলি, তখন মুষলধারায় বৃষ্টি ঝরছে। টিনের চালে বেজে চলছে রিমঝিম সঙ্গীত। আমি বি-বাড়িয়ায়, ফারুক ঢাকায়। এই বৃষ্টিস্নিগ্ধ সকালে বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই কেমন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন তিনি। মুচকি হেসে বললেন, ‘বাবা বাইরে যতটাই প্রাণখোলা, ঘরে ততটাই অন্তর্মুখী ছিলেন। যতটুকু কথা না বললেই নয় ততটুকুই কথা বলতেন, এর বেশী নয়। সারাদিন বাইরে কী করলেন, কোথায় গেলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেমন চলছে—ঘরে কিছুই বলতেন না। কাপড় ধুতে গিয়ে মা বাবার পকেটে হয়তো বঙ্গভবনে দাওয়াতের কার্ড পেলেন, কিংবা আমি দেখলাম টেবিলে, তখন জিজ্ঞেস করতাম—আজ কী বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন? অমুক জায়গায় গিয়েছিলেন? বিএনপির আমলে একদিন বাবার সঙ্গে একটা ইফতার পার্টিতে গেলাম। তখন আবদুল মান্নান ভুঁইয়া মন্ত্রী ছিলেন। বিশাল হলরুমে ইফতার পার্টি। আমরা হলরুমের দরজায় ঢুকতেই আবদুল মান্নান ভুঁইয়া চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছিলেন আর বলছিলেন, ‘আসেন নেজামি ভাই, আসেন।’ বাবার সঙ্গে থাকায় ঘটনাটা দেখতে পেরেছি। নয়তো বাবা কিন্তু ওই ঘটনার কথা ঘরে একবারও বলেননি। সিরিয়াসভাবে তো নয়-ই, এমনকি আনন্দ করেও নয়।’

সন্তানের পড়ালেখার পেছনে বাবাদের একটা ভূমিকা থাকে। ছেলেটা কোথায় পড়বে, কীভাবে পড়বে এইসব। আপনাদের পড়ালেখা নিয়ে নেজামি সাহেব কতটুকু কেমন ছিলেন?

বৃষ্টির শব্দে ফোনে ফারুকের কণ্ঠ একটু অস্পষ্ট মনে হলো। কানে আরও জোরে ফোন চেপে ধরলাম। ফারুক আহমাদ বললেন, ‘রাজনীতির ময়দানে দারুণ সক্রিয় এই মানুষটি ঘরে একপ্রকার নির্লিপ্তই ছিলেন। এটা তার স্বভাবের একটা অংশ। প্রথমে যে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম, পরবর্তীতে শিক্ষার ধারা বদলানোর কোনো উদ্যোগ তিনি নেননি। ফলত জেনারেল লাইনেই আমি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি। কওমি কিংবা আলিয়ায় পড়তে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা তিনি কখনোই চাপিয়ে দেননি। মাঝেমধ্যে খোঁজ নিতেন—কেমন পড়াশুনা হচ্ছে। কোনো বিষয় পছন্দ না হলে অল্প শব্দে বলতেন। ত্যানা পেঁচাতেন না। একবার ইসলামি ছাত্র শিবিরের একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। কুরআনের আয়াত লিখিত একটা কার্ড এনেছিলাম সেখান থেকে। কার্ডটি দেখে বাবা বললেন, ‘এই কার্ড কোত্থেকে?’ আমি বললাম, ‘বন্ধুদের সঙ্গে ইসলামি ছাত্র শিবিরের একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে এনেছি।’ বাবা বললেন, ‘আর কখনো ওখানে যাবে না।’ এই এতটুকুই। কেন গেলাম, কার সঙ্গে গেলাম—এসব জিজ্ঞেস করেননি আর।’

আমার প্রশ্ন করতে হয় না নতুন করে। বলে যেতে থাকেন ফারুক—’আমাদের ঘরের নব্বই ভাগ সিদ্ধান্ত আমাদের মা-ই নেন। বাবা তার সিদ্ধান্তে সমর্থন দিতেন, সাহায্য করতেন। আমাদের পড়াশুনা, বেড়ানো, ঘরের কাজ সবকিছুতেই। দেখা যেতো ঈদে আমরা মামার বাড়ি চলে যাচ্ছি আমাদের মতো করে, বাবা তার সুযোগমতো পরে আসতেন। তাকে আমরা আটকে রাখতাম না, তিনিও আমাদের আটকে রাখতেন না। ফলে আমাদের মাঝে বড় কোনো মনোমালিন্য হতো না। মা কিছু আনতে বলেছেন, বাবা ভুলে গেছেন—এমন টুকটাক মনোমালিন্য তো সবখানেই হয়। মা ঘর পুরো সামলাতেন বলেই বাবা পূর্ণ নিমগ্নতায় রাজনীতির ময়দানে সময় দিতে পেরেছেন। তবে বাবা বাজার করতে খুব ভালোবাসতেন। সঙ্গে কাউকে নিয়ে বাজারে চলে যেতেন ইচ্ছে হলেই। সঙ্গে নিয়ে আসতেন হাতভর্তি বাজার।’

আপনি গ্রেজুেয়ট করেছেন জেনারেল লাইনে। আপনার বাবা করছেন ইসলামি রাজনীতি। আপনাদের মাঝে কখনো মতানৈক্য হতো না? ফারুক বললেন, ‘বাবা ঘরে খুবই কম কথা বলতেন। এসব নিয়ে আমাদের মাঝে তেমন বাতচিতই হতো না। তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ এক রাজনীতিবিদ। বিএনপি আমলে বাড়িতে তার কাছে অনেকেই আসতো। বিভিন্ন জনের জন্য তিনি বিভিন্ন তদবির করতেন। কারো চাকরি পাইয়ে দিতেন। কোনো মাদরাসার জন্য রেশন বরাদ্দ করে দিতেন। কিন্তু কারো থেকে কোনো বিনিময় নিতেন না। একবার এক লোক এসে বাবার হাতে গাড়ির চাবি দিয়ে বললো, ‘আপনার জন্য একটা গাড়ি দিলাম। ব্যবহার করবেন।’ বাবা তখন টাকা না থাকলে সায়দাবাদ থেকে পল্টন হেঁটে যান। তবুও তিনি গাড়িটি নেননি। তার এই নিঃস্বার্থবাদিতার দৃশ্য দেখে বারবার বিস্মিত হয়েছি।’

বাবার সঙ্গে বেশী সফর করেননি ফারুক আহমাদ। তার বড় ভাই উবায়দুল হক সফর করেছেন অনেক। ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন নেজামি সাহেবের সঙ্গে। তার কাছে যখন ফোন করি, তখন বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। জানালা খুলে দেখলাম, বৃষ্টি কমলেও আকাশ অন্ধকার। আবার বৃষ্টি বাড়বে এমন প্রস্তুতি।

উবায়দুল হক ভণিতা না করে অকপটেই বললেন সব কথা। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম রাজনৈতিক সফরে নেজামি সাহেবের কর্মকাণ্ড কেমন থাকতো। তিনি বললেন, ‘প্রথমত, তার সফরসঙ্গী যারা হতো, তিনি তাদের খোঁজখবর নিতেন খুব। খেলো কিনা, শুইলো কিনা, অসুবিধা হচ্ছে কিনা—এইসব। দ্বিতীয়ত, তিনি সবার সঙ্গেই মিশতেন। এর সাথে কথা বলা যাবে না, ওর সঙ্গে কথা বলা যাবে না—এমন কোনো বিধিনিয়ম তার ছিলো না। সফরে জৌলুশ রাখতেন না। খুব সাধারণভাবে সফর করতেন। তৃতীয়ত, অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদের সাথেও তিনি এমনভাবে মিশতেন, মনেই হতো না তিনি অন্য কোনো দলের। দেখা হলেই কথা বলছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। কী দিলখোলা আলাপ! বিরোধী কাউকেই তিনি আক্রমণ করে কথা বলতেন না। নরম ভাষায়, যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনায় বুঝাতে চাইতেন। সবসময় তার সামনে থাকতো এই হাদীস—’যার হাত এবং মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ, সে-ই প্রকৃত মুসলমান।’ চতুর্থত, দল-পরিচয়ের উর্ধ্বে তার ব্যক্তিত্বটাই বেশী ফুটে উঠতো। মানুষ তাকে দলের অবস্থান দিয়ে বিচার করতো না। বরং তিনি যেমন মানুষকে আপন করে নিতেন, মানুষও তাকে আপন করে নিতো। আলাপে বসলে পেরিয়ে যেতো সময়। কিন্তু তার আলাপ শেষ হতো না। পরবর্তী শিডিউলে টানটানি পড়ে যেতো।’

আপনি তার বড় ছেলে। পরিবারের দায়িত্ব তিনি আপনার ওপর কতটুকু চাপিয়ে দিতেন? উবায়দুল হক বললেন, ‘মাঝেমধ্যে বলতেন এটা করো, ওটা করো। তবে ঘরের নব্বই ভাগ সিদ্ধান্ত মা-ই নেন। বাবা সমর্থন করতেন। আমি বাবার সহকারী হিসেবে কাজ করেছি। অন্যান্য রাজনীতিবিদের চেয়ে বাবা একটু অনন্য ছিলেন। তা হলো—রাজনৈতিক দলে একেকজনের একেকটা দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। কিন্তু নেজামে ইসলাম পার্টির প্রায় সব কাজই ছিলো তার ওপর নির্ভরশীল। আমি তাকে বারবার বলতাম, একজন সহকারী নিয়োগ দেন। কিন্তু অন্যের কাজ তার পছন্দ হতো না। তাই বাধ্য হয়ে নিজে সব করতেন। তারপর ইসলামি ঐক্যজোটেও দায়িত্ব পালন করতেন। সব মিলিয়ে তীব্র চাপে থাকতেন। একজন মানুষের দ্বারা এত কাজ একসাথে করা সম্ভব না। বাবা করতেন।’

একই সময়ে নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি এবং ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি। দুটো দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু শ্রম দিতে হয়েছে তার। ইসলামি রাজনীতিতে বিপ্লবের যে স্বপ্ন দেখতেন তিনি, সে স্বপ্নে দিনরাত জল ঢেলেছেন তিনি। বড় করতে চেয়েছেন, পরিণত করতে চেয়েছেন মহীরূহে। তাই পরিবারে, সংসারে তেমন মন দিতে পারেননি তিনি।

বৃষ্টিভেজা সকাল একজন ত্যাগী ইসলামি রাজনীতিবিদের স্মৃতিচারণে কেমন মুখর হয়ে উঠলো। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ছেলেদের আক্ষেপ ঝমঝমিয়ে উঠলো—বাবাকে মনে পড়ে ভীষণ!

The post ছেলের মুখে বাবার স্মৃতি: যেমন ছিলেন আবদুল লতিফ নেজামি appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%96%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%af/

No comments:

Post a Comment