Friday, June 19, 2020

সহকর্মীদের চোখে নেজামি: ‘হিংসাপূর্ণ রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না’

মুনশি নাঈম:

আশাবাদী একজন ইসলামী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি। তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। অনেক মতামত তিনি প্রকাশ করে ফেলতেন খুব সহজেই। একই সময়ে নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি এবং ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার ঋজুতা, অটুট মনোবল, সময়ের উপযোগিতায় মুগ্ধ তার সহকর্মীরা। সহকর্মীদের বয়ানে আবদুল লতিফ নেজামি একজন অসাধারণ ইসলামি চিন্তাবিদ, দূরদর্শী আলেম রাজনীতিবিদ।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ স্মৃতিচারণে বলেন, ‘মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি রহ. একজন হক্কানি আলেম এবং প্রচার বিমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ছিলেন শীর্ষ ইসলামি চিন্তাবিদ, ঈমানি সকল আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন আল্লাহভীরু, মুখলিস, বিচক্ষণ, সময়োপযোগী দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম। তার চিন্তা ও প্রজ্ঞা ছিল অভিভূত হবার মতো। তার যুক্তিনির্ভর, গাম্ভীর্যপূর্ণ উচ্চারণে প্রতিবার অনুপ্রাণিত হয়েছি, তার আন্তরিকতাপূর্ণ দোয়া লাভ করেছি।’

ইসলামী ঐক্যজোটে মাওলানা নেজামির দীর্ঘ একটা জার্নি রয়েছে। সেই জার্নিটার শুরু এবং শেষ কোথায় জানতে চাইলাম। মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে মাওলানা নেজামির সম্পৃক্ততা সেই শুরু থেকে। ১৯৯৮ সালে যখন ইসলামি ঐক্যজোট গঠিত হয়, তিনি তার নেজামি পার্টি নিয়ে ঐক্যজোটে যোগ দেন। ২০০১ সালে জোটের চেয়ারম্যান হন মুফতি ফজলুল হক আমিনি। ২০১২ সালের শেষদিন যখন মুফতি আমিনি ইন্তেকাল করেন, জোটের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাওলানা নেজামি। জোটের তিন টার্মেই তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ইসলামি রাজনীতির ময়দানে ঝানু একজন রাজনৈতিক ছিলেন। ছাত্রকাল থেকেই তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। পরবর্তীতে তিনি কাজ করেছেন খতিব উবায়দুল হক, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক, মুহিউদ্দিন খান সাহেব, ফজলুল হক আমিনির সঙ্গে। বর্ষিয়ান এই আলেম শুধু রাজনীতিই করতেন না। সঙ্গে লিখতেনও দারুণ। দৈনিক সরকার নামে একটি দৈনিকও করেছেন তিনি।’

মাওলানা নেজামির হঠাৎ চলে যাওয়ায় বিমর্ষ মুফতি ফয়জুল্লাহ। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘তিনি খুব ভালো পরামর্শ দিতে পারতেন এবং দিতেনও। এই দুঃসময়ে তিনি ছিলেন জাতির অভিভাবকতুল্য। পথনির্দেশক আলোকবর্তিকা। এ মুহূর্তে তার ব্যক্তিত্ব ও অভিভাবকত্বের জায়গাটিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করার মতো আর কেও কি আছেন?’

রাজনীতির ময়দানে সুষম, সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী ছিলেন মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি। তিনি চর্চা করতেন উদার রাজনীতির। রাজনীতির ময়দানে তার উদারতার চর্চা কাছ থেকে দেখেছেন ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি তৈয়্যব। তারই স্মৃতিচারণ করে তিনি বললেন, ইসলামি আন্দোলনের নিতান্তই মুখলিস একজন নেতা ছিলেন। কর্মীদের প্রতি তার ছিল একান্ত ভালোবাসা, অন্যান্য ইসলামি আন্দোলনের নেতাদের প্রতি ছিল শ্রদ্ধা। যদি অন্য নেতাগণ তার বিপরীত মেরুতেও অবস্থান করতো, তবুও তাদের তীর্যকভাবে আক্রমণ করতেন না। বরং উদার মনে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তিনি হিংসাপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। সবাইকে এক প্লাটফর্মে রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। ‘

আবদুল লতিফ নেজামির সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। কখনো তাকে হতাশাগ্রস্ত হতে দেখেছেন? কতটুকু আশাবাদী ছিলেন তিনি? মুফতি তৈয়্যব বলেন, ‘মাওলানা নেজামি কখনো হতাশ হতেন না। কোনো কর্মসূচিতে প্রচুর লোক আসতে হবে—এই চিন্তাও পোষণ করতেন না। আন্দোলনে কোনো নেতাকর্মী না এলে তিনি একাই ঝাঁপিয়ে পড়তেন। দুএকজন নেতাকর্মী নিয়ে আন্দোলনে নামতে দ্বিধা করতেন না। আর তিনি ছিলে ইসলামি আন্দোলনের সার্বক্ষণিক নেতা। অন্যদের মতো অবসরে তিনি রাজনীতি করতেন না। তিনি বলতেন, ইসলামি আন্দোলনের জন্য সার্বক্ষণিক কয়েকজন নেতা থাকা প্রয়োজন। তবে তিনি অন্যদের অস্বীকারও করতেন না। তিনি বলতেন, যারা রাজনীতি করবে, তারা শুধু রাজনীতিই করবে। যারা মাদরাসায় পড়াবে তারা শুধু মাদরাসায় পড়াবে। তারা ব্যবসা করবে, তারা শুধু ব্যবসাই করবে। তাই তিনি রাজনীতির ময়দানে সবসময় তৎপর এবং সক্রিয় ছিলেন।’

ইসলামি রাজনীতির অঙ্গনে মাওলানা নেজামির অনন্যতা কোথায়? প্রশ্নের জবাবে ইসলামী ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত রাজি বলেন, ‘ইসলামি রাজনীতির ময়দানে সবাই পার্ট টাইম রাজনীতি করে। কিন্তু মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি ফুল টাইম রাজনীতি করতেন। তিনি বলতেন, পার্ট টাইম করে ইসলামি রাজনীতি হবে না। এরজন্য ফুলটাইম কর্মী লাগবে, নেতা লাগবে। তাই তিনি সার্বক্ষণিক রাজনীতির সঙ্গেই ছিলেন। নিঃস্বার্থ এবং নিঃস্বতার সঙ্গে রাজনীতি করতেন। দেখা যেতো পল্টন থেকে লালবাগ, লালবাগ থেকে পল্টন—হেঁটে আসা-যাওয়া করছেন। বাসে ঝুলে দলের কাজ করতে যাচ্ছেন কোথাও। তিনি জানতেন, রাজনীতি থেকে তেমন উপার্জন হবে না। কিন্তু তবুও তিনি পেশার মতোই আমৃত্যু রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’

সাখাওয়াত রাজি আরও বলেন, ‘মাওলানা নেজামি মনে করতেন—কোনোকিছুর প্রতিবাদ করতে হবে সঙ্গে সঙ্গে। চাই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অল্প মানুষই থাকুক। কারণ, বিলম্বে প্রতিবাদ করলে তখন সেটা প্রতিবাদ থাকে না। মাওলানা নেজামির আরেকটি বিশেষ গুণ হলো—সব কর্মীদের নিকট সফর করা। কোথাও একজন কর্মী থাকলেও তিনি সেখানে সফর করতেন। তিনি ভাবতেন—শুরুতে একজনকে কাস্টমাইজড করতে পারলে ধীরে ধীরে অনেকেই এর সঙ্গে যুক্ত হবে। অনেকেই যেমন মনে করেন—কোথাও সফরে যেতে হলে অনেক মানুষ লাগবে, তিনি তেমন ভাবতেন না।’

এই সময়ে কতটুকু প্রাসঙ্গিক মাওলানা নেজামি? মুফতি সাখাওয়াত রাজি বললেন, ‘মাওলানা নেজামি প্রতিকূল পরিবেশে রাজনীতি করেছেন। কারণ, যখন অনুকূল পরিবেশ ছিলো, তখন তিনি রাজনীতি করেছেন বড়দের ছায়ায়। নিজে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে গেছে। তাই অনেক বাধা সয়ে তাকে কাজ করতে হয়েছে। ইসলামি রাজনীতির অঙ্গনে মাওলানা নেজামির হয়তো কোনো প্রভাব থাকবে না, তার নামও উচ্চারিত হবে না, কিন্তু কেউ রাজনীতির পথনির্দেশ নিতে চাইলে তার জীবন থেকে নিতে পারে। এতে উপকারই হবে।’

The post সহকর্মীদের চোখে নেজামি: ‘হিংসাপূর্ণ রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না’ appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%80%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a7%8b%e0%a6%96%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%bf/

No comments:

Post a Comment