আবদুল্লাহিল বাকি:
ইসলাম হল বিশুদ্ধ একত্ববাদী ধর্ম। বান্দা ও আল্লাহর মাঝে কোন মাধ্যম, ওসিলা বা সাহায্যকারীর সম্পর্ক এখানে নেই। যার কাছে গিয়ে প্রার্থনার মুখাপেক্ষী হতে হয়। আর রাসূল ও আম্বিয়াগণ রিসালাতের দায়িত্ব প্রচারের ক্ষেত্রে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধন। নবী রাসূলগণ বান্দাদেরকে আল্লাহর পরিচয় জানান। পরিচালিত করেন সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন- ‘আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।’[1]
আল্লাহ আরো বলেছেন- ‘জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’[2]
কিন্তু মানুষের প্রকৃতি তো মানুষেরই বটে। মানুষ সবসময় এমন কিছু চায়, যা সে দেখে দেখে ইবাদত করতে পারবে। যেখানে নিবেদন করবে তার মনের আকুতি। ঢেলে দিবে ভালবাসার সম্বল। মহত্ব ও বড়ত্বের সামনে নত হওয়ার যে পিপাসা আছে, সেটা তৃপ্ত করবে।[3]
আল্লাহর শাআয়ের (নিদর্শন) ও তাৎপর্য
আল্লাহ তায়ালা কিছু প্রকাশ্য বাহ্য বিষয়কে নির্ধারণ করে নিয়েছেন। সম্বন্ধযুক্ত করেছেন নিজের দিকে। সেসব বিষয়ের উপর নাজিল করেছেন আপন রহমত। সেগুলো দেখলেই আল্লাহর কথা স্মরণ হয়। সেগুলোর সাথে জড়িয়ে গেছে এমনসব ঘটনা, যা আল্লাহর দীন ও তাওহিদের বার্তাবাহক। এগুলোকেই বলা হয় আল্লাহর শিআর তথা চিহ্ন (বহুবচন: শাআয়ের)।[4]
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী রহ. বলেছেন, ‘সকল ঐশী ধর্ম ও শরীয়ার ভিত্তি আল্লাহর শিআরগুলোর মর্যাদা প্রদান ও এর মাধ্যমে নৈকট্য অর্জনের উপর। কারণ, মানুষের জন্য আল্লাহ যে পথ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, জৈবিকতা থেকে যতই দূরে যাওয়া যাবে ততই সেই পথ চলা সহজ হবে। শাআয়ের বলতে বোঝানো হচ্ছে, এমন বাহ্যিক বিষয়, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করা হয়, এগুলোকে সম্মান করা মানে আল্লাহকেই সম্মান করা। এগুলোকে মনে প্রাণে ভালবাসা মানে আল্লাহকেই ভালবাসা…
আল্লাহর চারটি মৌলিক শিআর তথা নিদর্শন হল: ১. কোরআন, ২. কাবা, ৩. নবী-রাসূল, ৪. সালাত। অনেক আগে থেকেই এই ধারা চালু ছিল যে, রাজা বাদশাহগণ তাদের প্রজাদের নিকট বিভিন্ন চিঠি পত্র প্রেরণ করতেন। সেসব চিঠিপত্রকে সম্মান করা মানে খোদ বাদশাহকে সম্মান করা বলে বিবেচিত হত। তেমনি নবী রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষের কাছে পাঠানো হত বিভিন্ন আসমানী কিতাব ও সহিফা। প্রেরিত গ্রন্থকে সম্মান করা ও এর আদেশ মানা প্রকারান্তরে আল্লাহকে সম্মান করা ও তার আদেশ মানা। কোরআনের ক্ষেত্রেও একই কথা। এবার কাবার কথা বলি। ইবরাহিম আ.এর যুগে মানুষ বিভিন্ন মন্দির ও উপাসনালয় বানাতো, নিজেদের আধ্যাত্মিকতাকে সূর্য, তারকা অথবা এরকম অন্যান্য বিষয়ের কাছে নিবেদন করার জন্য। কিন্তু তারা বিশ্বাস করত, এসবের মধ্যে আল্লাহর হুলুল বা অবতারণ হয়। এগুলো থেকে ফেরানোর লক্ষ্যে আল্লাহর রহমত তাদের সামনে উপস্থিত হল একটা ঘরের সুরতে। এর চারপাশে তারা প্রদক্ষিণ করতো। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতো। ইবরাহিম আ. তাদেরকে এই ঘরের দিকে আহ্বান করলেন। বললেন মর্যাদা প্রদর্শন করতে। শতাব্দির পর শতাব্দি বয়ে যেতে লাগল, এই বিশ্বাসের উপর, কাবাকে সম্মান করা মানে আল্লাহকে সম্মান করা। এর সাথে বেয়াদবি করা মানে আল্লাহর সাথে বেয়াদবি করা। এরপর ধীরে ধীরে হজ্ব ফরজ করা হল। আদেশ করা হল পবিত্রতার সাথে এর চারিদিক প্রদক্ষিণের। নির্দেশ দেয়া হল সালাতে কাবার অভিমুখী হওয়ার।[5]
আল্লাহর যাবতীয় শিআর তথা চিহ্ন সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এটিই (হজ্বের বিধান) আর কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র বিষয়সমূহকে সম্মান করলে তার রবের নিকট তা-ই তার জন্য উত্তম।’[6] আরো বলা হয়েছে, ‘এই (তার অবস্থা), আর যে কেউ আল্লাহর (শাআয়ের) নিদর্শনগুলোকে সম্মান করবে সে তো তার অন্তরস্থিত আল্লাহ-ভীতি থেকেই তা করবে।’[7]
বিশ্বাসীর মানসিক তৃষ্ণা ও হজ্ব
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী মানুষের আত্মিক চাহিদা বুঝতে পেরেছিলেন। হজ্বের সাথে মানবাত্মার যে তৃষ্ণা ও পরিতৃপ্তির সম্পর্ক আছে, এটা তুলে ধরেছিলেন তিনি। মানুষের ভেতরে যে আধ্যাত্মিক আকুতি, তা পূরণ করতে পারে এই বাইতুল আতিক (প্রাচীণ গৃহ) ও তার চারপাশের আল্লাহর শিআর ও নিদর্শনগুলো। তাকে তৃপ্ত করতে পারে হজ্ব ও এর মধ্যের অন্যান্য আমলগুলো।
আল্লাহ বলেছেন, ‘আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বায়তুল্লাহ) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পাক সাফ রাখবে তাওয়াফকারী, রুকূ-সিজদা ও দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর জন্য। আর মানুষের নিকট হজ্বের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটে চড়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে। যেন তারা নিজেদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিয্ক দিয়েছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে খেতে দাও। তারপর তারা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানতসমূহ পূরণ করে এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে।’[8]
ইমাম গাযালী বলেছেন, ‘মুমিনের মাঝে লুকিয়ে আছে আল্লাহকে দেখা ও সাক্ষাত করার কামনা। এই কামনা তাকে সাক্ষাতের মাধ্যমের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। প্রেমিক তো প্রেমাস্পদের সাথে সম্বন্ধযুক্ত প্রতিটি বিষয়ের প্রতিই ভালবাসায় আকৃষ্ট হয়ে যায়। আর বাইতুল্লাহ আল্লাহর দিকে সম্বন্ধযুক্ত। কেবল এই সম্বন্ধের কারণেই মানুষ বাইতুল্লাহর প্রেমে পড়ে যাবার কথা। তার সাথে আবার যুক্ত হয়েছে সাওয়াবের আশা আর পাপ মোচনের কামনা।’[9]
এর সাথে আরেকটু যুক্ত করেছেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী। অল্প কথায় তিনি তুলে ধরেছেন হজ্বের আধ্যাত্মিক মাকসাদ। তিনি বলেছেন, ‘কখনো কখনো মানুষ আপন প্রতিপালকের প্রতি প্রেম ও ভালবাসায় নুয়ে পড়ে। অশান্ত হয়ে উঠে তার হৃদয়। তপ্ত হয়ে উঠে তার মনের ভূমি। তখন সে এমন কোন আশ্রয় খুঁজে, যা তার অশান্ত হৃদয়কে শান্ত করে তুলবে। তৃষ্ণ করবে তার তপ্ত মন। তখন সে হজ্ব ছাড়া নিজের সামনে আর কোন গতি দেখতে পায় না।’[10]
বস্তুবাদের পূজা ছেড়ে নিঃশর্ত আদেশের সামনে আত্মসমর্পণ
আবুল হাসান আলি নাদাবি রহ. বলেছেন, ‘একজন মুসলিম মাত্রই অন্ধ অনুসারী বিবেকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বাধ্য। সেই জীবনে কী স্বাদ, যেখানে নেই কোন বিপ্লব, নেই কোন উত্তাল তরঙ্গ? মানুষ তার চারপাশের রুসুম রেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠান, মানবরচিত কানুন, মেকি সভ্যতা, ভেঙে পড়া সমাজের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে চায়। ছিঁড়ে ফেলতে চায় সকল বন্ধন শৃংখল। আপন বুদ্ধির হাত থেকে লাগাম ফেলে দিতে চায়, যা তাকে ধরে রেখেছিল অনেক কাল। সেই লাগাম সে তুলে দিতে চায় আপন হৃদয় ও অনুভূতির হাতে। ভালবাসার পথে যতদূর নিয়ে যাক, কোন আপত্তি নেই।
কারণ, তার কোন স্বাধীনতা নেই, যাকে ধরে রেখেছে সমাজ। আধিপত্য বিস্তার করে আছে যার উপর আধুনিক সভ্যতা। রসম রেওয়াজের মূর্তিরা জেঁকে ধরেছে যাকে। তার কোন একত্ববাদ নেই, যাকে আটকে ফেলেছে প্রথাবাদিতা, প্রবৃত্তির পূজা। সে তো প্রকৃত মুসলমান বলেই গণ্য হবেনা, যে সকল প্রসঙ্গে তাকিয়ে থাকে আপন যুক্তি ও বুদ্ধির দিকে। প্রতিটি ধর্মীয় কাজেই তো সে যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা খুঁজবে। বস্তুবাদী প্রবণতায় আচ্ছন্ন করে ফেলবে নিজের দ্বীন ধর্ম।
কিন্তু হজ্ব বস্তুবাদী বা বুদ্ধিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বোঝা যাবে না। এটা তো সূক্ষ্ম, মানুষের বোধের বাইরের একটা বিষয়। যুক্তির পূজারীরা এর গভীরতা কিভাবে বুঝবে? তাদের যুক্তি তো এখানে সময়, অর্থ আর সামর্থের অপচয় হিসেবেই দেখবে। হজ্ব তো একটা দাওয়াত, অনন্ত আহ্বান- অদৃশ্যে বিশ্বাসের প্রতি। আল্লাহর আদেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। কিছু সময়ের জন্য বুদ্ধির কাজকে স্থগিত করে রাখা। এখানে মানুষের স্থুল বিবেক কোন প্রমাণ, প্রজ্ঞা, মানতেক, দর্শন দর্শানোর আদেশ দিতে পারবে না।’[11]
ইমাম গাযালী রহ. অনেক সুন্দর করে বিষয়টা ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ কাবাকে বাইতুল্লাহ তথা নিজের দিকে সম্বন্ধযুক্ত ঘর বানিয়েছেন। এটি যেন রাজা বাদশাহদের দরবারের দৃষ্টান্ত। তাদের দরবারে যেমন জমা হয় প্রজাগণ, তেমনি আল্লাহর বান্দারা কাবার দিকে ছুঁটে আসেন, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হয়ে। সাথে সাথে তারা স্বীকার করে, আল্লাহর মহান সত্ত্বাকে কোন কিছুই ধারণ করতে পারে না। এভাবেই তাদের আবদিয়্যাত ও দাসত্ব আল্লাহর সামনে পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়।
হজ্বের মধ্যে তাদের উপর বিভিন্ন পদ্ধতির ইবাদত ও উপাসনার আদেশ দেয়া হয়েছে, মানুষ স্বাভাবিকভাবে যেসব আচারের সাথে পরিচিত নয়। এসব ইবাদতের মর্মও বুঝতে অক্ষম মানুষের মেধা। যেমন, কংকর নিক্ষেপ করা, সাফা মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাত চক্কর দেয়া প্রভৃতি। এসব ইবাদতের মাধ্যমে বান্দার চূড়ান্ত দাসত্ব ও বিনয় প্রকাশ পায় আল্লাহর সামনে। এটা শুধুই আল্লাহর আদেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
অন্যান্য কিছু ইবাদতের বাহ্যিক কিছু উপকার দেখা যায়। যেমন, জাকাতের মাধ্যমে অন্য দরিদ্রদের প্রতি সদাচার করা হয়। সামাজিক দারিদ্র বিমোচিত হয়। যুক্তি ঠিক ঠিক অনুধাবণ করে ফেলে জাকাতের উপকার। রোজা হল, প্রবৃত্তির তাড়নায় আঘাত। বিভিন্ন কাজ থেকে নিজেকে ফারেগ রেখে একমনে আল্লাহর ইবাদত করে যাওয়া। সালাতের রুকু সেজদা হল আল্লাহর নিকট স্বাভাবিক আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ। এসব বিষয় খুব ভালভাবেই বুঝে মানুষের বিবেকযন্ত্র। কিন্তু হজ্বের বিভিন্ন দিক বোঝার মত যোগ্যতা আকলের নেই। যুক্তি ও বুদ্ধি এখানে নিশ্চল। এখানে শুধুই আল্লাহর আদেশের স্বার্থহীন অনুসরণ।’[12]
মাকাসেদে হজ্ব
প্রতিটি বিধানের পেছনে আল্লাহ গভীর উদ্দেশ্য ও মাকাসেদ রেখে দিয়েছেন। শরীয়ার বিভিন্ন মাকসাদ কোরআন হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে। একজন মুমিন যখন এই মাকাসেদ ও মহান উদ্দেশ্যগুলো জানতে পারেন, তখন তার ইতিবাচক সফলতা অর্জিত হয়। যেমন এগুলো না জানা থাকলে কখনো কখনো নেতিবাচক ফলাফলও সামনে আসে। ইবাদতের মাকসাদ সম্পর্কে অবগতি, মুমিনকে ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ অনুধাবনে সাহায্য করে। এজন্যই আলেমগণ হজ্ব সম্পর্কীয় আয়াত ও হাদিসগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করে হজ্বের মাকাসেদ বের করেছেন। কোরান, হাদিসে উল্লেখিত হজ্ব সম্পর্কিত উদ্ধৃতিগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে ড. ইয়াহিয়া বিন ইবরাহিম আল-ইয়াহিয়া ২৯-টা মাকাসেদ বের করেছেন।[13] এখানে কয়েকটি সামগ্রিক ও মৌলিক উদ্দেশ্য তুলে ধরছি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হজ্বের।
১. আকিদাগত উদ্দেশ্য: আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা ও তার স্মরণ
হজ্বের সকল উদ্দেশ্যের ভিত্তিই হল আকিদা ও নিয়তের বিশুদ্ধকরণ। ইহরাম বাঁধা থেকে নিয়ে শুরু করে তালবিয়া পাঠ শুরু হয়। উচ্চারিত হয় তাওহিদ, তাকবির ও একত্ববাদের বাণী। হজ্বের দিনগুলোতে চলতেই থাকে আল্লাহর জিকির, তাকবির, তাহলিল। এজন্যই তো আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিনসমূহে।’[14] আল্লাহর নবী সা. বলেছেন, ‘বাইতুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা মারওয়ার চক্কর, পাথর নিক্ষেপের বিধান দেয়া হয়েছে, আল্লাহর স্মরণ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।[15]
২. ইবাদতগত উদ্দেশ্য: নিঃশর্ত আনুগত্য ও তাকওয়ার পাথেয় সংগ্রহ
আল্লাহ বলেছেন, ‘বল, ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব।’[16] এখানে শুধুই দাসত্বকে বোঝানো হয়েছে। হজ্বের বিভিন্ন ইবাদত আরকান কেবলই আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশের সামনে নিজের আত্মত্যাগের নাম।
আল্লাহ আরো বলেছেন, ‘এবং পাথেয় গ্রহণ কর। নিশ্চয় উত্তম পাথেয় তাকওয়া। আর হে বিবেক সম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর।’[17] আর হজ্বের মধ্যে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম হল আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান প্রদর্শন করা। এসব চিহ্ন ও নিদর্শনকে মর্যাদা প্রদান করা তার ভেতরের তাকওয়ার প্রমাণ। তাকওয়া অর্জন হজ্বের অনেক বড় একটা মাকসাদ। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘এটাই হল আল্লাহর বিধান; যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই।’[18]
৩. নৈতিক উদ্দেশ্য
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হজ্বের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ্ব আরোপ করে নিল, তার জন্য হজে অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। আর তোমরা ভাল কাজের যা কর, আল্লাহ তা জানেন।’[19] এই আয়াতটি হজ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। হজ্বের নৈতিক দিক সম্পর্কে এখানে স্বল্প কথায় সামগ্রিক দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মানুষের মাঝে যে জৈবিকতা ও পাশবিকতা লুকিয়ে থাকে, তা নিঃশেষ করে দেবার জন্য হজ্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। পারস্পারিক হিংসা বিদ্বেষ, শত্রুতা-মারামারি-কাটাকাটি, দূর করে, একটা শান্তিপূর্ণ জীবন ধারণ করার প্রস্তুতি হয় হজ্বের মাঝে।
তাছাড়া হজ্বের মাধ্যমে মুমিন ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা পায়। এখানে সে আত্মসংবরণের দীক্ষা লাভ করে। হজ্বের সময় ও স্থানসীমা গণ্ডিবদ্ধ। এই বদ্ধতার মধ্যে সে শৃংখলাপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক চলাফেরায় অভ্যস্ত হয়ে উঠে। আধ্যাত্মিকতা ও আত্মিক উন্নতির সোপানে সে উঠতে থাকে একে একে। কারণ, হজ্বের মধ্যে মুহরিম অবস্থায় অনেক হালাল কাজও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। হজ্বের মধ্যে বদান্যতা, পারস্পারিক সহযোগিতারও অনেক বিষয় আছে।
৪. সামাজিক উদ্দেশ্য: মুসলমানদের পারস্পারিক ঐক্য
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’[20] মুসলমানদের মাঝে অনেক মতপার্থক্য আছে, সত্যি। এই মতপার্থক্য থাকবেই। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য রহমত। এই মতপার্থক্যগুলো না থাকলে, চিন্তার জমাটবদ্ধতা তৈরি হত। কিন্তু মতপার্থক্যের জের ধরে এখন মুসলমানগণ নিজেদের মাঝে বিভক্তি তৈরি করছে। আকিদা, ফিকহ, মানহাজের ক্ষেত্রে অন্যকে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে না বৈধতার। খুব সহজেই একে অন্যকে বের করে দিচ্ছে ইসলামের গণ্ডি থেকে।
কিন্তু আল্লাহর ঘর কাউকেই ফেলে দেয়নি। সবাইকেই আহ্বান জানায় নিজের দিকে। সকল মত, ধারা ও চিন্তার মুসলমানগণ এখানে একত্রিত হয় প্রতি বছর। ঈমান ও ইসলামের বন্ধনটুকু সকল মুমিনকে এক প্লাটফর্মে এনে একত্রিত করে দেয়। হজ্ব হল বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের মিলনমেলা। এখান থেকে আমরা উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা পাই। হজ্ব মুমিনদেরকে ঐক্যের শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মুসলমানদেরকে হজ্ব দীক্ষা দেয়, অন্যের সাথে কিভাবে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ সামাজিক জীবন যাপন করতে হবে। বর্তমানে আমাদের মাঝে সামাজিক জীবন যাপনে যেসব সংকট দেখা দিচ্ছে, তা শুধুই সামাজিক বোধের অভাব। নিঃসন্দেহে হজ্ব মুসলমানদেরকে সামাজিক জীবনের শিল্প শিক্ষা দিতে পারে।[21]
তথ্যসূত্র:
[1] সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬
[2] সূরা যুমার, আয়াত: ৩
[3] আবুল হাসান আলি নাদাবী, আরকানে আরবাআ, পৃ. ২২২
[4] আবুল হাসান আলি নাদাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২২ – ২২৩
[5] শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, প্রকাশ: দারুল জীল, বৈরুত, ২০০৫ ই., খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৩৩ – ১৩৪
[6] সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩০
[7] সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩২
[8] সূরা হজ্ব, আয়াত: ২৬, ২৭, ২৮, ২৯
[9] আবু হামেদ আল-গাযালী, ইহয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ১, পৃ. ২৪
[10] শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৫৯
[11] আবুল হাসান আলি নদবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৭ – ২২৮
[12] ইমাম গাযালী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৪০
[13] আল-হাজ্জ ওয়া ফাজায়িলুহু ওয়া মাকাসিদুহু, https://ar.islamway.net/article/50969/-15-الحج-وفضائله-ومقاصده
[14] সূরা বাকারা, আয়াত: ২০৩
[15] আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি। তিরমিযি বলেছেন, এটি হাসান সহিহ।
[16] সূরা আনআম, আয়াত: ১৬২
[17] সূরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭
[18] সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩২
[19] সূরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭
[20] সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১০
[21] আবদুল ওয়াহেদ আল-মিসকাদ, তাআম্মুলাত ফী মাকাসিদির হজ্জ, https://ift.tt/30hNzoo
The post ইসলামে হজ্বের হিকমত ও তাৎপর্য appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%a4-%e0%a6%93-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a7%8e/
No comments:
Post a Comment