Friday, August 13, 2021

৩২ নম্বর রোড

রাকিবুল হাসান:

আমার নাম সহিদুর রহমান।

আপনারা নিশ্চয়ই আমার নাম শুনে চোখেমুখে একটা উদাসীন ভাব ফুটিয়ে বলতে চাইছেন, আপনার নাম সহিদুর রহমান তাতে আমাদের কী হয়েছে। আপনি কি ম্যাজিস্ট্রেট—আপনার কথা শুনতে হবে? আসলে আমি ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা আপনাকে আমার গল্প শুনতে আদেশ করতে পারি—এমন কেউ নই। আমি নিতান্তই সাধারণ একজন মানুষ। তাবলীগ করি; বৃহস্পতিবারে কাকরাইলে শবগুজারি করি। বেঁচে থাকতে আমার বাবা মৌলভি ইদ্রিস আলীও তাবলীগ করতেন। সন্দ্বীপের পীর সাহেব মাওলানা ইদ্রীস সন্দ্বীপীর সঙ্গে তিনি তাবলীগে সময় দিয়েছেন।

আমার আরেকটা পরিচয়—আমি একজন সিপাই। ১৯৬৯ সনে পাকিস্তানে ট্রেনিং করে সেখানেই এই পদে যোগদান করি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমি আর পাকিস্তানে থাকি নাই। দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। তারপর আবার সিপাই পদে যোগ দেই। আমার স্কোয়াডের সিও ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুমিন সাহেব। টু-আই-সি ছিলেন মেজর ফারুক রহমান। ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রায়ই কাকরাইল আসতাম। রাতেই ক্যান্টনমেন্ট ফিরে যেতাম। তবে বৃহস্পতিবার ফিরতাম না। সঙ্গে ছোট্ট একটা ব্যাগ এবং চাদর নিয়ে যেতাম। রাতের আমল শেষে চাদর বিছিয়ে ব্যাগটি বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়তাম মসজিদেই৷ শেষরাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে যিকির করতাম। তারপর ফজর পড়ে ব্যারাকে ফিরতাম।

ঘটনার দিন ব্যতিক্রম হলো। আসলে ব্যতিক্রম করতে বাধ্য হলাম। সেদিন আমার সিও লেফটেন্যান্ট মুমিনুল হক ছুটিতে ছিলেন। তাই চার্জে ছিলেন টু-আই.সি মেজর ফারুক। বিকেলে তিনি আমাকে বললেন, ‘আজ কিন্তু নাইট ট্রেনিং। সুতরাং আজকের জন্য শবগুজারি বাদ। আগে দেশ, তারপর নিজের খেশ। জলদি জলদি চলে আসবা।’

ক্যান্টনমেন্টে মাসে দুদিন নাইট ট্রেনিং হতো। আল্লাহর রহমতে কোনোদিন ট্রেনিং বৃহস্পতিবারে পড়ে নাই। কিন্তু আজ হুট করেই ঘোষণা হলো, ‘রাতে ট্রেনিং।’ মেজর ফারুকের কথায় কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হলাম। সৈনিক জীবনে মন খারাপের দাম নেই। কমান্ড মেনে চলতে হয় কাটায় কাটায়। তাই সেদিন কাকরাইল যাবার সময় ব্যাগ কিংবা চাদর কিছুই নেইনি। কেবল মুরুব্বিদের বয়ান শুনে রাত দশটার মধ্যেই ব্যারাকে ফিরে এলাম। ব্যারাকে ফিরে খাবার খাই। খাবার খেতে খেতে সঙ্গী সমদ্দর বললো, ‘মেজরদের মধ্যে কেমন কানাঘুষা চলছে। ব্যাপার কি বল তো?’

আমি বললাম, ‘আমি ত জানি না। ফারুক সাহেব বললেন চলে আসতে; আমি শবগুজারি না করেই চলে এলাম।’

সমদ্দর বললো, ‘ব্যাপার তো একটা আছে। নইলে হুট করে নাইট ট্রেনিং কেন?’

আমি খাবারে মন দিয়ে বললাম, ‘তা আমারও প্রশ্ন।’

খাবার শেষ করার পর মেজর ফারুক আমাকে বললেন, ‘জিপ নিয়ে রেডি থেকো।’ রাতে জিপে করে কোথাও যেতে হবে—মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। জিপটা আমি আবার ভালো চালাই। আমার নীতি হলো—যত গতি, তত আনন্দ। এই আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে সিও মুমিনুল হকের কাছে একদিন তীব্র ধমক খেয়েছি। তারপর থেকে সাবধান হয়ে গেছি। রাতে আরও সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়। আজ কোথায় যেতে হবে, সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, যে কমান্ড আসে মানতে হবে। নইলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তখনও জানতাম না—ভয়ংকর এক ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমি।

নাইট ট্রেনিংয়ের রাতে পুরা রাত জেগেই কাটাতে হয়। আবার আমার ওপর বিশেষ নির্দেশ। রাত তখন চারটা। সুনসান নীরবতা চারদিকে। তাহাজ্জুদ পড়ে আমি কেবল গাড়ির নিকট এসেছি, ইউনিফর্ম পরা মেজর ডালিম স্টেনগান হাতে গাড়ির নিকট এলেন। গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, ‘জলদি চালাও!’

আমি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেই। সামনে একটি ট্রাক। ট্রাকটি পেছনে ফেলে এগিয়ে চলি। মিররে তাকিয়ে দেখি ট্রাক আমাদের গাড়ি অনুসরণ করছে। ব্যাপার কী! ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন হয়ে মহাখালি পার হয়ে মগবাজার চৌরাস্তা অতিক্রম করার পর মেজর ডালিম গাড়ি থামাতে বললেন। আমি ব্রেক কষলাম। তিনি গাড়ি থেকে নেমে পেছনের ট্রাক থেকে আর্মি ফোর্স নামান। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়ির চারদিকে ফোর্স মোতায়েন করেন। আনুমানিক দশ-পনেরো মিনিট পর তিনি গাড়িতে উঠে বললেন, ‘গাড়ি চালাও।’

আমি গাড়ি স্টার্ট দেই। সেরনিয়াবাতের বাড়ির উত্তর পাশের রাস্তা দিয়ে বর্তমান শেরাটন হোটেলের দিকে যেতে থাকি। শেরাটনের পুবদিকে গোলচক্করের নিকট পৌঁছে শুনতে পাই—সেরনিয়াবাতের বাড়িতে গুলির শব্দ। আমার কলজে কেঁপে উঠে। ভয়ে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। মেজর ডালিম আবার বললেন, গাড়ি ওই বাড়ির দিকে নিয়ে যাও। সেরনিয়াবাতের বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণের রাস্তায় এনে গাড়ি থামাই। তিনি বাড়ির ভেতর চলে যান। ততক্ষণে ফজরের আজান পড়ে গেছে। গাড়িতে বসেই আমি দু’রাকাত ফজর পড়ে নেই। প্রথম ওয়াক্তে। টের পাচ্ছিলাম—যা ঘটছে নামাজ পড়ার সুযোগ পাব না হয়তো।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেজর ডালিম বললেন, রেডিও স্টেশনের দিকে যাও। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মেজর ডালিমকে মনে হচ্ছে হন্তদন্ত। সবকিছুতে তাড়াহুড়ো করছেন। আমি গাড়ি রেডিও স্টেশনে এনে থামালাম। একজন সশস্ত্র আর্মি এগিয়ে এলো। মেজর ডালিম তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভেতরে চলে গেলেন।

ভেতরে গিয়ে তিনি অনেক্ষণ সময় কাটালেন। তার অপেক্ষা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে গেলাম। সারারাত জাগরণ। ঘুম অপেক্ষা করছিলো কখন গাড়িটা বন্ধ হবে। তাই গাড়ি বন্ধ করতেই চোখে চেপে বসলো। চোখ বন্ধ হতেই আমি দেখলাম, আমার বাবার মুখ খুব চিন্তিত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি এত চিন্তিত কেন বাবা?’
বাবা বললেন, ‘তোকে নিয়ে।’
আমি কপাল কুঞ্চিত করে বললাম, ‘আমাকে নিয়ে? আজ শবগুজারিতে যাইনি বলে?’
বাবা মাথা নাড়ালেন, ‘উহু।’
‘তাহলে?’
‘তুই একটা টোপের ভেতর আটকে গেছিস। বের হতে পারছিস না। আর পারবিও না।’
‘কিসের টোপ?’
‘দেখতে পাচ্ছিস না?’
‘টের পাচ্ছি। এসবে কী হচ্ছে বাবা?’
‘ভয়ংকর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে এই শহরে, রাতের আঁধারে। আর তুই সেই হত্যাকাণ্ডের নায়কদের গাড়িতে করে ঘুরাচ্ছিস।’

আরেকটি প্রশ্ন করতে যাব, তখনই গাড়ির দরজায় টোকা পড়লো। চোখ খুলে দেখি শরীরে ঘাম ছুটছে। মেজর ডালিম গাড়িতে উঠে বললেন, ‘ঘুম চলে এসেছে?’
আমি বললাম, ‘জ্বি। একটু।’
মেজর ডালিম একটু হেসে বললেন, ‘এবার গাড়ির গন্তব্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোড। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। আরেকটি কাজ করো সহিদ। রেডিওটা চালিয়ে দাও। ঘুম কেটে যাবে।’
আমি বিনীতভাবে বললাম, ‘স্যার, আমি রেডিও তেমন শুনি না। গান-টান তো একদমই শুনি না। মাঝেমধ্যে খবরাখবর শুনি।’
মেজর ডালিম বললেন, ‘শুনলাম তুমি নাকি তাবলীগ করো?’
আমি বললাম, ‘তাবলীগ করার সময় পাই কই। সময় পেলে কাকরাইল মসজিদে যাই। আজকেও মসজিদে শবগুজারির ইচ্ছা ছিল। হয় নাই। ডিউটিতে আসতে হলো।’
মেজর ডালিম হেসে বললেন, ‘করো করো। পুণ্যের কাজ যত করা যায়, ততই ভালো। বঙ্গবন্ধু তাবলীগের কাজকে খুব স্পেস দিয়েছেন। কাকরাইল মসজিদ এবং বিশ্ব ইজতেমার জায়গা দিয়েছেন। পৃথিবীতে কত বড় বড় দেশ আছে, মহাদেশ আছে। কেউ কিন্তু বিশ্ব ইজতেমার জায়গা দিতে পারেনি। এত ছোট দেশ হয়েও বঙ্গবন্ধু জায়গা দিয়েছেন। এর উসিলায় আল্লাহ যদি তাকে মাফ করেন।’
আমি দীর্ঘস্বরে বললাম, ‘আমিন। শুনছি—ইজতেমার জন্য তিনি আরও বড় জায়গা দিবেন। মাঠের আরও উন্নয়ন ঘটাবেন।’
মেজর ডালিম বললেন, ‘আল্লাহ কখন কাকে তুলে নিয়ে যায়, তাতো বলা যায় না। এবার রেডিওটা অন করো। সকালের খবরটা শুনো মন দিয়ে।’

গাড়িটা এনে থামালাম ৩২ নম্বর রোডের মাথায়। আমার গাড়ির পেছনে খোলা জিপে সশস্ত্র আর্মি ছিলো। তারাও এসে থামলো। মেজর ডালিম জিপ থেকে নেমে আর্মিদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলেন। আমি ভাবলাম, এবার তবে সকালের খবরটা শুনাই যাক। রেডিও অন করতেই আমাকে স্তম্ভিত করে ভেসে এলো মেজর ডালিমের কণ্ঠ। সেই কণ্ঠ শুনে রক্ত হিম হয়ে গেলো। শুকিয়ে গেলো কলজে। আমাকে বিদ্ধ করে মেজর ডালিম বারবার ইথার থেকে বলছিলেন—শেখ মুজিবকে স্বপরিবারে হত্যা করা হইয়াছে। খোন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে। সারা দেশে কারফিউ জারি করা হইয়াছে।

The post ৩২ নম্বর রোড appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a7%a9%e0%a7%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%a1/

No comments:

Post a Comment