Tuesday, September 14, 2021

স্মৃতিতে মুফতীয়ে আজম আব্দুস সালাম চাটগামী রহ.

রুহুল আমিন খান উজানি:

১৯৮৭ সালে আমার মনে ইলমী তাহকীকের উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে সফর করার এক নতুন তাড়না অনুভব করি। তখন আমি জামিয়া আরাবিয়া এমদাদুল উলূম ফরিদাবাদে ইলমে হাদিসের খিদমতে ছিলাম। লেখালেখি করি। মাদানি কাফেলার একজন সদস্য হিসেবে ভারত বিভাগ ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে তত্ব ও তথ্য অনুসন্ধানের অদম্য স্পৃহা তখন। ফরিদাবাদ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও তখন আমাকে করাচি পাঠানোর তাকাজা দেখালে বিষয়টি আমি সোনায় সোহাগা হিসেবে ধরে নিলাম।

গেলাম করাচি সফরে। আল্লামা সলিমুল্লাহ খান রহ. এবং তকী উসমানী সাহেব থেকে শুরু করে বড়দের একটা তালিকা হাতে নিলাম। সেই চৌত্রিশ বছর পূর্বের কথা বলছি। পাকিস্তানের তদানীন্তন শীর্ষ ওলামাদের মধ্যে পাঁচ নম্বরে যার নামটা পেলাম, তিনিই মুফতিয়ে আযম আল্লামা আবদুস সালাম চাটগামী রহ.।

খুবই শওক নিয়ে হাজির হলাম করাচির প্রাণকেন্দ্র ইসলামিয়া কলেজের পার্শ্বের জামে মসজিদে হযরতের খেদমতে। সব বড়দের একই কাহিনি। প্রথম সাক্ষাতে কেমন কেমন যেনো, তবুও তেমন কিছু নয়। ধীরে ধীরে তাদের সুবাস বিকশিত হয়। আমাকে চেনলেন। আশাতীত কদর তিনি করলেন। মাহে রমজানের এক বিশাল অংশ তারই সুশীতল পরশে কাটানোর মহা সুযোগ হলো। তখনকার দিনে এমন কম বয়সী একজন যুবক আলেমের অবস্থান এতো উঁচু ছিল কিভাবে? তাও আবার বিদেশের মাটিতে? বিশেষ করে পাকিস্তানের মাটিতে এই বাঙালি আলেমের এমন বিস্ময়কর অবস্থান কী করে? আমার সফরটিই ছিলো যেহেতু একটি ইলমী সফর, তাই আমি একান্ত মনে ওসব খুঁটিনাটি প্রশ্নাদির জবাবের অনুসন্ধানে সচেষ্ট হলাম।

হজরতের কাছে জানতে চাইলাম, আপনি কিভাবে এখানে এলেন?

মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতি আবদুস সালাম রহ. একে একে বলতে থাকেন করাচি বাননুরী টাউন মাদ্রাসার খিদমতে নিয়োগের ট্র‍্যাজেডি মাখা কাহিনি। একপর্যায়ে করাচি ইসলামিয়া কলেজের ইতিহাস যখন বলতে লাগলেন, তখন আমার মনে জাগছিল মাওলানা নদবি রহ.-এর একটি বাক্য— ‘জা রাহে থে মুসা (আঃ) আগ লেনে কো/ মেল রাহি থী উনুকো নূরে নবুওয়ত; আমি যেন বের হয়েছিলাম তামার সন্ধানে, কুড়াচ্ছি হীরার টুকরাগুলো।

সংক্ষেপে মুফতি সাহেব রহ.-এর ইসলামিয়া কলেজ সম্পর্কীয় বর্ণিত ট্রাজেডিক ইতিহাসের কিয়দাংশ তুলে ধরেছি। তুলে ধরছি বর্তমান ইসলামী জেনারেশনের বাসিরাত সৃষ্টির লক্ষ্যে। কেননা সুতীক্ষ্ণ সুচতুর সচেতন আলেমের সংখ্যা নিতান্তই স্বল্প এই যুগে। করাচির সর্বাপেক্ষা ফরওয়ার্ড জোন বাননুরী টাউন মাদ্রাসা এরিয়া। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম সারির সিপাহসালার, কাসেমি তরজুমান আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ, যিনি পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বপ্রথম পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনকারী। তার আবাসভবন এই ইসলামিয়া কলেজ। দারুল উলুম করাচি এখানে প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রত্যাশা ছিল। আল্লামা উসমানী রহ.-এর ইন্তেকালের সাথে সাথেই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কৌশলে তার ভবনটিকে ইসলামিয়া কলেজের জন্য নিয়ে নেয়া হয় অতি সন্তর্পণে। অথচ আল্লামা উসমানির মাকবারা এখানেই। এটি নিয়ে ভাবলেই সব অন্ধকারের মুখোশ উন্মোচিত হবে।

মুফতি আযম আল্লামা আবদুস সালাম রহ. বললেন, এদিকে পাকিস্তানের ঐকান্তিক সমর্থন হওয়ার কারণে দেওবন্দ ছেড়ে হিজরত করে করাচি এসেছিলেন হাকীমুল উম্মাহ আল্লামা আশরাফ আলী থানবী রহ.-এর প্রসিদ্ধ খলিফা মুফতিয়ে আজম আল্লামাহ শফী রহ.। আল্লামা উসমানী রহ.-এর একান্ত আপন পীর ভাই। তার দারুল উলুম করাচি প্রতিষ্ঠার শেষ ঠিকানাটি যখন হাতছাড়া হয়ে যায়, চিন্তা পেরেশানিতে তিনি খুবই ভেঙ্গে পড়েন।
এদিকে যুক্তফ্রন্টের তিন বরেণ্য নেতা হক, ভাসানী ও আতহার আলী। হাকীমুল উম্মাহ হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর প্রথম সারির খলিফা হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ.। তিনি তার রাজনৈতিক সফরে গ্রেট লিডার হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানে এসে বিষয়টা জানতে পেরে বর্তমান দারুল উলুম করাচি এর এই বিশাল ভূমি তাৎক্ষণিক বরাদ্দের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ওলামাদের স্মরণীয় খেদমত সমূহের মধ্যে এটি অন্যতম।

মুফতিয়ে আজম আল্লামা আবদুস সালাম চাটগামী রহ. এ জাতীয় অসংখ্য ঘটনা পেশ করে আমাকে ঋণী করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিখুঁত সত্য অনুসন্ধানী, প্রশস্থ হৃদয়বান। তিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিতে ইসলামকে দেখতেন না, ইসলামের প্রাচীন দৃষ্টিতে রাজনীতিকে জরিপ করতেন।

এক মাস করাচি সফরে মুফতি সাহেব এবং হযরত লুধিয়ানবী রহ. ছিলেন আমার মারকায। কোথায় গেলাম, কি পেলাম এই দুই মুরুব্বিকে জানাতাম।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ধারা মননে ও চলনে যে গুটি কয়েকজন মনীষীকে দেখার সুযোগ হয়েছিল, তন্মধ্যে আল্লামা মুফতি আবদুস সালাম চাটগামী অন্যতম। পাঁচটি অঙ্গনে তাকে সমানতালে পেয়েছি।
১. আকীদার জগতে তিনি আপাদমস্তক পরিপক্ক (দেওবন্দ)।
২. আখলাকের জগতে খাঁটি তাযকিয়ায় মুকাম্মাল নিদর্শন।
৩. আমলী ময়দানে গুণে গুণে শেষনবীজীর সুন্নাতকার দিয়ে অলংকৃত থাকতেন। ইশকে এলাহী ও ইশকে রাসূলের মেছালী ব্যক্তিত্ব।
৪. ইলমী গভীরতায় যেনো আরেকজন অবিকল মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ.।
৫. সুসাহিত্য, ইসলামী সংস্কৃতি ও লিখনী চর্চায় তার নজির তিনি-ই। একজন মেধাবী লেখকের যতো বৈশিষ্ট্য হতে পারে সব ছিলো মুফতী সাহেব রহ.-এর মধ্যে।

এক কথায় মুফতি সাহেব ছিলেন হক্কানী মুতাকাদ্দিমীন ওলামায়ে কিরামের শেষ নমুনা। তার সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী যতো কিছু বলা হচ্ছে, সবই খুব সামান্য, হালকা ধ্বনি। তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

মুফতি সাহেব একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমাকে যেভাবে দেখে গেলেন, এতে আপনার কোনো কথা আছে কি?

বললাম, অবশ্যই আছে। আমাদের দেশে বহু উঁচু মাপের বিশ্ব মডেল হওয়ার উপযোগী আলেম আছেন আল্লাহর রহমতে। তবে পাকিস্তান এবং ভারতের ওলামাদের ন্যয় তারা তাদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে আশানুরূপ পেরে উঠছেন না। আপনার লিখনি খিদমত ঈর্ষনীয়। উপমহাদেশের ঘরে ঘরে আপনার এই খিদমত পৌঁছে গেছে। আপনি বাংলাদেশে চলে আসেন। বাংলাদেশে বর্তমানে কীর্তিমানের যে শূন্যতা, সে শূন্যতা কিছুটা হলেও কাটবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি একদম নীরব হয়ে গেলেন। তাকওয়ার তরজুমান হযরত মুফতী সাহেব শিশুর মতো হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কথাটি তো অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। এতে দ্বীনের ফায়দা কতটুকু?

উনার সান্ত্বনার জন্য সাথে সাথে বললাম, মুফতীজী! দ্বীন ইসলাম অঞ্চলকে যুক্ত করেই চমকেছে। পবিত্র মদীনা কি একটা অঞ্চল নয়?

তিনি আমাকে উন্নত মানের আইসক্রিম দিয়ে বললেন, আপনি আমাকে সকুনত দিলেন, আল্লাহ আপনাকে সখুনত দিন।

মুফতীজীকে হারিয়ে নিজেকে খুব এতিম মনে হচ্ছে। মুফতীজীর সে আদর আজও আমার স্মৃতিতে অমলীন হয়ে আছে। নব্বই দশকের শুরুতে মুফতীজী এক দীর্ঘ চিঠি পাঠালেন নগণ্যের কাছে। করাচি থেকে চলে আসবেন, খিদমতের একটি জায়গার তো দরকার। জানিয়ে দিলাম, আসুন। এন্তেজাম হচ্ছে ইনশাআল্লাহ।

শায়খুল ইসলাম আল্লামা শফী রহ. ঢাকা আসলেন। ডেপুটি স্পিকার আঃ মতিন সাহেবের বাসা পল্টনে। আমি হাজির হলাম। হযরতের খেদমতে মুফতীজীর কথা বললাম। হযরতের চিরাচরিত নিয়ম এইভাবেই রইলেন; তিনি শুনলেন, নাকি শুনলেন না, আমার কিছুই মনে হলো না। কিছুদিন পর জামিয়াতুস সাহাবাতে হযরতের সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথেই সর্বপ্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৌলভি আঃ সালাম কি করাছিত্তন ছলি আইসচে?’ আমি বিস্মিত হলাম হযরতের স্মরণশক্তি দেখে। কেননা ,হযরত তো থাকেন সীমাতীত ব্যস্ততায়।

জানতে পারলাম আরো কিছু মাধ্যমে যোগ হয়ে মুফতীজীর নিয়োগ হয়ে যায় দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে। মুফতীজীর সাথে হাটহাজারীতে দেখা হলেই বলতেন, যখন ছিলেন সফরে তখন প্রথম আসতেন আমার ঘরে। আর এখন আপনি আমার কথা ভুলেই গেছেন।

কান্না আসে আজ। ভাবিনি মুফতীজীকে এতো তাড়াতাড়ি হারাবো। তিনি তো বড়দের সারিতে আসীন আছেন সজীব। আমরা বিলকুল একাকী এতিম নির্জীব। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহর সমস্ত দ্বীনি খেদমত কবুল করে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা হিসেবে কবুল করুক।

দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী ও মুফতীজী রহ.- এর একটা কথা নিয়ে অনেকেই টানাটানি করে। মাকানকে (স্থান) দিয়ে মাকীন (ব্যক্তি) নাকি মাকীনকে দিয়ে মাকান? মুরুব্বীরা এভাবে সমাধান দিয়েছেন যে, একটি অপরটির পরিপূরক। কখনো মাকানকে দিয়ে মাকীন আবার কখনো কখনো মাকীনকে দিয়ে মাকান। আসলে একটি অপরটিকে দিয়ে দেদিপ্যমান। কোনটি এককভাবে ধনাত্মক কিংবা ঋণাত্মক না। শায়খ আল্লামা মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী রহ. এবং হাটহাজারীর দিকে তাকালে সূত্রটি সুস্পষ্ট হয়। মুফতীজিকে দিয়ে হাটহাজারী আবার হাটহাজারীকে দিয়ে মুফতীজী কতোইনা প্রোজ্জ্বল হয়েছিলেন। মুফতীজীর বিদায় হাটহাজারীর জন্য যেনো একজন সুশ্রী মানুষের সামনের দুই দাত খসে পড়ার মতো। হাটহাজারী মাদ্রাসার একে একে তিনজন মুরব্বি চলে যাওয়া লক্ষণটি যেনো কেমন কেমন।

চলুন আল্লাহমুখী হয়ে সবাই সবাইকে মেনে নিই। সবার জন্য সবাই দুয়া করি। এটিতো আমরা সবাই জানি, কিয়ামতের পূর্বে ইলম তুলে নেয়া হবে ওলামাদের তুলে নেয়ার মাধ্যমে। ওলামাদের কদর ওলামাদের কাছে না থাকা ইলম উঠিয়ে নেয়ারই নামান্তর। মহান আল্লাহ মুফতীজীকে জান্নাতের উঁচু মাকামে আসীন করুন।

ইলমী বাগানের সুযোগ্য পরিচর্যাকারী শায়খুনা শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী রহ. প্রতিভাধর সুযোগ্য ওলামাদেরকে নির্বাচন করে যেভাবে হাটহাজারী মাদ্রাসার ঐতিহ্যকে অম্লান রেখেছিলেন, জাতি, দেশ ও মুসলিম বিশ্ব এ ধারা অক্ষুণ্ণ রাখা ও থাকার জন্য একান্তভাবে হাটহাজারীর দিকে তাকিয়ে আছে। আকাবিরে ওলামায়ে দেওবন্দ ও হাটহাজারীর রুহানী পরশের কদরদানী করে বর্তমান জিম্মাদারগণ যেন এগিয়ে নিয়ে যান দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীকে। একান্ত একাগ্রচিত্তে।

আকাবিরে হাটহাজারীর গর্বিত সন্তান, মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সফল মুহতামিম, আমাদের মুহসিন ওস্তাদ আল্লামা হাফেজ হামেদ সাহেব কুদ্দিসা সিররুহু এর একটি স্মরণীয় উক্তি দিয়ে এই ক্ষুদ্র এলোমেলো প্রবন্ধটির সমাপনী টানছি।

মাওলানা হামদ রহ. ১৯৮৫ সালে সেই ফিৎনার যমানায় বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, এমনটি ভাবা ভুল হবে, এই হাটহাজারী মাদ্রাসা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষত থাকবে। তিনি বলেছিলেন, তোরা তোদের মাদ্রাসা রাখলে থাকবে, ভাঙলে ভেঙে যাবে। সেসময় তিনি সমরখন্দ বুখারার প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মাদ্রাসাগুলো নজীর হিসেবে পেশ করছিলেন। যেগুলোর ছাত্রসংখ্যা ছিলো সেই যুগে-৫০,০০০, ৬০,০০০।

খোলাসা কথা হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী মাদ্রাসাকে আমাদের সর্বশক্তি ও কুরবানী দিয়ে আমাদেরই হেফাজত করতে হবে। সুন্দর মন, সুন্দর চিন্তা ও সুন্দর আখলাক্ব দিয়ে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে এটিকে প্রহরা দিতে হবে। আল্লাহ তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, জামিয়াতুস সাহাবাহ উত্তরা ঢাকা।

The post স্মৃতিতে মুফতীয়ে আজম আব্দুস সালাম চাটগামী রহ. appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%ab%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%ae-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%8d/

No comments:

Post a Comment