Friday, October 15, 2021

বাংলাদেশী বাংলা : আজমের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মোকাবেলা

মুনশী নাঈম:

একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অসংখ্য ভাষারূপ ব্যবহার করে। শ্রেণি-পেশা-বয়স-লিঙ্গভিত্তিক ভিন্নতার ফলে তৈরী হয় ভাষার আঞ্চলিক বিভিন্নতা। একভাষী রাষ্ট্রেও মানুষ এত বিচিত্র ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করে যে, ওই বিচিত্র ভাষাভঙ্গি অফিসের নথি, আদালতের বয়ান বা পাঠ্যপুস্তকের কাজ চালানো সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্রের দরকার হয় একটা স্ট্যান্ডার্ড বা প্রমিত ভাষার।

প্রমিত ভাষার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজধানীতত্ত্ব’-কে একটু স্পষ্ট করে বলেছেন মোহাম্মদ আজম। তিনি বলেছেন, ‘দুনিয়ার প্রধান ভাষাগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কেন্দ্রের—মূলত রাজধানীর প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর ভাষাই গৃহীত হয়েছে প্রমিত ভাষা রূপে। ভদ্র জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাই খানিকটা সাফ-সুতরো করে, খানিকটা পরিমিত বা প্রমিত করে গড়ে তোলা হয়েছে মান ভাষা।’

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো। ফলে বাংলা-প্রধান পূর্ব পাকিস্তানেরও দরকার হলো প্রমিত বাংলার। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে এখানেও গড়ে উঠলো একটা মান ভাষা। একটি ভাষার কয়েকটি প্রমিত মান থাকতে পারে। বাংলা ভাষার প্রমিত মান এখন কমপক্ষে দুটো; কলকাতা এবং ঢাকার। ঢাকার প্রমিত বাংলা তথা বাংলাদেশী বাংলার সংকট কোথায়, কীভাবে সংকট থেকে উত্তরণ পাওয়া যাবে, এর সুরাহা পেশ করেছেন মোহাম্মদ আজম। এখানে সে সুরাহা সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোকপাত করা হলো।

ঢাকার প্রমিত বাংলার সংকট

সংকটের কথা তুলে ধরার আগে আরেকটি কথা বলে রাখা ভালো। ব্রিটিশদের হাতে এই উপমহাদেশের যেমন উপনিবেশায়ন ঘটেছিল, তেমনি বাংলা ভাষারও উপনিবেশায়ন ঘটেছিল। প্রচলিত বাংলা অশুদ্ধ—এই ধারণা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উপনিবেশিত কলকাতায়; হ্যালহেড, কেরি প্রমুখের প্রযোজনায়। কলকাতার উপনিবেশিত ভদ্রলোকসমাজ এই ধারণা পুরোপুরি মেনে নিয়েছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত আর কলকাতার নতুন গদ্য-লিখিয়েদের রচনায় এই ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছিল। ভাষাটা মুখ থেকে কলমে না গিয়ে কলম থেকে মুখে আসছিল। তবু কলকাতায় শত বছরের কথায়-লেখায় কাজ-চলতি একটা প্রমিত বাংলা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। উপনিবেশিত মনস্তত্ত্বের দুর্মতিগুলো সেখানে এখনো প্রবল। ভাষার শুদ্ধতার দিকটা এখনো প্রধানত সংস্কৃতের সঙ্গে মিলিয়েই দেখা হয়। অভিধান-ব্যাকরণে প্রাধান্য পায় লেখার বাংলা।

উচ্চারণ বিধিতে সংকট

এখন সংকটটা খুব সহজেই বুঝে আসবে। সংকট তুলে ধরে মোহাম্মদ আজম লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে প্রমিতের বাতচিত যখন হচ্ছিল বা হওয়ার কথা, সে সময় আমরা ছিলাম পাকিস্তান নামক এক আজদাহার খপ্পরে। ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বিচড়ে দেখলেই বোঝা যাবে, আমরা ওই সময় ব্যস্ত ছিলাম নিজেদের কাছা সামলানোর কাজে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র-প্রযোজিত সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে গিয়ে আমরা বাধ্য হয়েছি কলকাতার দ্বারস্থ হতে। কলকাতায় জমে ওঠা প্রমিত ভাষাটিকেই আমরা হুবহু আমাদের প্রমিত হিসেবে গ্রহণ করেছি বা করতে বাধ্য হয়েছি। ফলে বাংলাদেশের প্রমিত বাংলার মূল সংকট এই যে বিধিবদ্ধ হওয়ার কালে এতে পূর্ব বাংলা বা পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকার উচ্চারণবিধি মোটেই গুরুত্ব পায়নি। বরং ঢাকার উচ্চারণ অভিধানগুলো আনুশাসনিক, বর্ণনামূলক নয়। অর্থাৎ কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে তা শেখানো হয়েছে, কিন্তু ঢাকার ভদ্রলোকসমাজের উচ্চারণ গুরুত্ব পায়নি। প্রাধান্য পেয়েছে উনিশ শতকীয় সংস্কৃতঘেঁষা উচ্চারণ। অনুসৃত হয়েছে কলকাতার উচ্চারণভঙ্গি। ঢাকায় আবৃত্তি বা বাক্শিল্প বা শুদ্ধ উচ্চারণ হিসেবে যে বস্তু প্রতিষ্ঠিত আছে, তা উচ্চারণ অভিধানের বিশ্বস্ত অনুসরণ মাত্র। ব্যবহারিক-মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ।’

শব্দ ব্যবহারে সংকট

ঢাকার প্রমিত বাংলার উচ্চারণের ক্ষেত্রেই কেবল সংকট নয়, বরং শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই সংকট আছে। মোহাম্মদ আজম লিখেছেন, ‘উপনিবেশ আমলের বিশেষ কার্যকারণে বাংলা ভাষার শুদ্ধতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় সংস্কৃত ভাষার বিধি। পবিত্রতার ধারণাটি সম্ভবত সেখান থেকেই এসেছে। সংস্কৃত দুনিয়ার সবচেয়ে বিধিবদ্ধ ভাষা। আজ পর্যন্ত বাংলা উচ্চারণ, বানান বা ‘ভালো’ শব্দের ধারণা সংস্কৃত বিধিতেই নির্ণীত হয়। শুদ্ধতার ধারণার আরেকটা দিক হলো ভাষামিশ্রণ। আরবি-ফারসি শব্দ বাংলার জাত নষ্ট করছে—এ আবিষ্কার উপনিবেশক ভাষা পরিকল্পকদের। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন (১৯২৬), কলকাতার হিন্দু ভদ্রলোকদের মুখের ভাষায় এ ধরনের শব্দের সংখ্যা শতকরা আট ভাগ। মুসলমান ভদ্রলোকদের জবানে, তাঁর মতে, সংখ্যাটা স্বভাবতই আরেকটু বেশি। দুনিয়ার তাবৎ ভাষাবিজ্ঞান এ ধরনের চালু শব্দকে ভাষার আবশ্যিক অঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করে। উপনিবেশিত ভাষাদর্শনে বাংলার ক্ষেত্রে ভিন্ন রীতি গৃহীত হয়েছিল। তার অনুসরণে বাংলাদেশেও আরবি-ফারসিজাত চালু শব্দকে প্রমিতের পংক্তিতে বসানোর অনীহা প্রবল। কথাটা ইংরেজির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলায় চালু বিকল্প থাকলে ইংরেজি বা বিদেশি শব্দের ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যেসব বিদেশি নামশব্দ লোকমুখে নিত্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর জন্য সংস্কৃত বিকল্প তৈরি করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। যদি খুঁজতেই হয়, তাহলে খোঁজা উচিত চালু ভাষায়। দেবেশ রায় উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, চালু বাংলায় সুন্দর শব্দ থাকা সত্ত্বেও বহু ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দ বানানো হয়েছে সংস্কৃত থেকে। অথচ অচলিত সংস্কৃত আমদানির চেয়ে লোকমুখে চালু ইংরেজি শব্দ ব্যবহারই সুবিধাজনক। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার চর্চায় এটাই প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ।’

মোহাম্মদ আজমের মোকাবেলা

রবীন্দ্রনাথের প্রমিত ভাষার রাজধানীতত্ত্ব অনুযায়ী ঢাকার প্রমিত বাংলায় প্রাধান্য পাওয়ার কথা বাংলাদেশের উচ্চারণভঙ্গি এবং শব্দরীতি। যদি এমন হতো, তাহলে বাংলা ভাষার প্রতি অশ্রদ্ধা হতো না? একই ভাষার দুটি প্রমিত রূপ কেমন করে হয়?

এর উত্তরে মোহাম্মদ আজম বলেছেন, ‘এর মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কলকাতার মান বাংলা কোনো সংজ্ঞাতেই ‘একমাত্র বাংলা ভাষা’ বলে গণ্য হতে পারে না। ইংল্যান্ডীয় আর আইরিশ ইংরেজির ফারাক ইংরেজি ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেনি। লন্ডন আর ওয়াশিংটনের ইংরেজির পার্থক্যের কারণে ইংরেজির জাত যায়নি। পূর্ব বাংলার ভাষা চিরকালই পশ্চিম বাংলা থেকে আলাদা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সমগ্র ভাষা আলোচনায় বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর আলোচনা ‘কলিকাতা বিভাগে’র মুখের ভাষা অবলম্বনে করা হয়েছে।’

বাংলাদেশের প্রমিত বাংলা নির্ধারণ করতে গিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ উপভাষা বৈচিত্রকে। তার পরিবর্তে বেছে নেয়া হয়েছে কলকাতার সেই উপনিবেশবাদী রীতিনীতিকে। উচ্চারণ ও শব্দ ব্যবহার—দুটো ক্ষেত্রেই। এই সংকট উত্তরণে মোহাম্মদ আজমের পেসক্রিপশন—’এ অবস্থার অবসানের জন্য আসলে ‘প্রমিত ভাষার তত্ত্ব’ সম্পর্কে সচেতন হওয়াই যথেষ্ট। প্রমিত ভাষার ধারণা একটা জরুরি ধারণা। কারণ, ভাষা শুধু বাতচিতের জন্য নয় বা সাহিত্য-শিল্প করার জন্য নয়। বরং এতে শিক্ষা চালাতে হয়, আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম চালাতে হয়। প্রমিত ভাষা ব্যবহৃত হয় চারপাশের ভাষাবৈচিত্র্যের মধ্যেই। একদিকে সে নিজেও পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে চারপাশের ভাষাবৈচিত্র্যও তাকে প্রভাবিত করে। প্রমিত ভাষাকে তাই হতে হয় সুস্থিত, কিন্তু নমনীয়। বিধিবদ্ধ, কিন্তু গ্রহিষ্ণু। ব্যবহারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে যথাসম্ভব হালনাগাদ করতে হয়। জনগোষ্ঠীর শি‌ক্ষিত নাগরিক অংশের উচ্চারণ ও ব্যবহারভঙ্গি আমলে এনে প্রতিনিয়ত গ্রহিষ্ণু এবং পরিবর্তনশীল থাকার মাধ্যমেই কেবল প্রমিতরীতি নিজের অবস্থানকে তুলনামূলক সর্বজনীন করে তুলতে পারে।’

সূত্র :

১.প্রথম আলো/২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
২.প্রথম আলো/২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
৩. www.youtube.com/বাংলা ভাষার প্রমিতকরণ ও উপনিবেশায়ন

The post বাংলাদেশী বাংলা : আজমের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মোকাবেলা appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%80-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a4%e0%a6%be-2/

No comments:

Post a Comment