Friday, October 15, 2021

সুখের মতো বেঁচে রই

উম্মে মুহাম্মাদ:

মধ্যম পরিবারের মেয়ে। অল্প লেখাপড়া করেছে। ছলছল নদীর ওপারে তাদের বাড়ি। সবুজ লতা বিতানে ঘেরা তাদের বাড়িটি। একপাশে গবাদি পশুর ঘর এবং খোঁয়াড়। লাল, কালো গরু আর ছাগলগুলো তারা কত যত্নে লালন করে। নদীর পাশে তিরতির করে বেড়ে ওঠা সতেজ লতাগুল্ম। ঘাস কেটে আনে কাঁচি দিয়ে, কচকচ করে। তারপর গরুগুলো গচগচ করে চিবায়। ভাতের মাড়, কালো জিরা, আরো কত স্বাস্থ্যকর খাবার তারা পশুদের খেতে দেয়। গরুর পুষ্টিকর খাঁটি দুধ নৌকা বেয়ে নদীর এপাড়ে হাঁটে এসে বিক্রি করে মেয়েটির বাবা। জাল দিয়ে নদীর লাফানো মাছ ধরে খায়। কখনো মাছও বিক্রি করে, হাঁটে এসে।

নাম তার মৌসুমি। নামের মতোই মৌ মৌ সুন্দর মেয়েটি। দেহ-সৌষ্ঠবে সাবালিকা হয়েছে মাত্র। বাবা-মা চিন্তা করছেন— লাচার ঘরের সুন্দরী মেয়ে, বেশিদিন ঘরে রাখলে বিপদ। পড়ালেখাও বেশিদূর হবে না, অর্থের অভাবে। তাই বিয়ে দিয়ে দেয়াই নিরাপদ এবং কল্যাণ।

এ অঞ্চলে মেয়েরা যা একটু পড়ালেখা করলেও শিক্ষিত ছেলের অভাব। ছেলেদের কামাই করতে হয় অল্প বয়স থেকেই। পড়ালেখার বয়সে কেউ মন দেয় কৃষিকাজে, কেউ উড়াল দেয় বিলেতে। মৌসুমির বাবা-মা ভাবছেন—কেমন ছেলের কাছে বিয়ে দেয়া যায়। বাবা ভাবছেন— বিলেতি ছেলের কাছে মেয়ে দিবো না। বিয়ে করে যে ছেলেরা বিদেশ যায়, বছরের পর বছর ফেরার আর নাম থাকে না, সেসব ছেলের কাছে মেয়ের জীবনে অর্থ আসলেও সুখ আসে না। অঢেল অর্থ দিয়ে কী লাভ, যদি মনে-মনে তৃপ্তি না থাকে! মেয়ে কাছে পায় না স্বামীকে, সন্তানরা দেখে না বাবাকে। মেয়ের বুকে থাকে হাহাকার, সন্তানের মনে থাকে পিতৃস্নেহের অভাব। ওখানে-প্রবাসে ছেলের মনেও থাকে না অনাবিল শান্তি। একা মায়ের পক্ষে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা সম্ভব হয় না, সবকিছু সামাল দিতে পারে না—সামাজিক অব্যবস্থাপনার কারণে। তার চেয়ে এমন ছেলের কাছে মেয়ে দিবো, যেনো দুজন দুজনকে কাছে পায়। দরকার হলে ছেলে ক্ষেত-খামারে খেটে খাবে, আমারই মতো ফসল ফলাবে, পশু পালবে, হাজারো কষ্ট শেষে তবু দিনশেষে স্ত্রী-সন্তানের চেহারায় ভালোবাসার চোখে তাকাবে—পুলক অনুভব করবে।

মৌসুমির বাবার বয়ান শুনে মা পান চিবাতে চিবাতে বলেন— হ্যাঁ, আপনি যেমন, জামাইও চান তেমন! মেয়েরে আমি বিলেতি ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবো। ছেলে মেলা ট্যাকা কামাবে, মেয়ে আমর সুখে থাকবে। পাকা দালানে থাকবে।

মৌসুমির বাবা বলেন, শোনো মৌসুমির মা! ট্যাকা মানুষেরে সুখ দেয় না। ঐ যে তোমার বোনজীটা—জামাই বিদেশ থাকে। দশ বছরেও আসতে পারে না। এখানে মেয়ে বেবাক বেটা মানুষেরে পিছে পিছে ঘুরায়। দেখো না!

মুখভর্তি পানের পিক ফেলে লালঠোটে ক্ষেপে ওঠে মৌসুমির মা— উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না। আমার মেয়ে তেমন না।

মৌসুমির বাবা আর কথা বাড়ান না। তকদিরের উপর ছেড়ে দেন সব। বলেন— কুপি টা দাও। রাত পড়ছে। এ সময় মাছেরা শান্ত থাকে। কয় খেপ জাল ফেলি নদীতে। দেখি কিছু পাই কিনা। তাজা মাছের ঝালঝাল সুড়–য়া খেতে হবে।

এ রাতের বেলা মাছ কুটে আবার রাঁধতে হবে! আপনে আমারে শুধু কষ্ট দেন। বলে মৌসুমির মা।

নদীর শোঁ শোঁ বাতাসে মিশে যায় মৌসুমির মায়ের কথাগুলো। অভিমানী কণ্ঠে আবার বলে— আপনি তো আমাকে সারা জীবন ছনের ঘরে রাখলেন। টিনের ঘরও দেখালেন না, পাকা দালান তো দূরের কথা। এখন মেয়ের জীবনও আমার মতো বানাতে চান!

মৌসুমির বাবা বলেন, শোনো মৌসুমির মা! এভাবে বলো না। আল্লাহ নারাজ হবে। আল্লাহ যা দিছেন, তাতে তুষ্ট থাকা সই। এই যে নদীর বাতাস, নদীর মাছ, গাইয়ের দুধ, মাঠে সোনার মতো নুইয়ে থাকে ধানের শীষ, এই তো আমাদের জীবন সুন্দর চলছে। দেখো না— নদী কী সুন্দর শব্দ করে, গরুগুলো ডাকে হাম্বা-হাম্বা, বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দে টিনের চালা মুখরিত হয়ে থাকে। একটু চিন্তা করে দেখো তো, এমন একটি পরিবেশে আমি তোমার পাশে নাই। তুমি দালান ঘরে একলা ঘুমাচ্ছ, আর আমি বছরের পর বছর তোমার পাশে নাই। চোখ বুঝে দেখো তো— কেমন লাগে! আমি বিলেতে গিয়ে ট্যাকা কামালে তুমি এতো সুন্দর জীবন পাবে না, মৌসুমির মা!

কথাগুলো যেনো হৃদয়ে গেঁথে যায়। মৌসুমির মা আনমনে বলে উঠে— না গো, আমি তো এভাবে ভাবি নি আগে!

The post সুখের মতো বেঁচে রই appeared first on Fateh24.



source https://fateh24.com/%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%81%e0%a6%9a%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a6%87/

No comments:

Post a Comment